হাত তুলে দু‘আর প্রমাণে কিছু ছহীহ হাদীছ :
عَنْ اَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه و سلم يَدْعُوْ هكَذَا بِبَاطِنِ كَفَّيْهِ وَ ظَاهِرهِمَا
(১) আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দু’হাতের পেটের এবং পিঠের দিকে দু‘আ করতে দেখেছি।[1]
عَنْ سَلْمَانَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ إِنَّ رَبَّكُمْ تَبَارَكَ و تَعَالَى حَيْىٌّ كَرِيْمٌ يَسْتَححْىِ مِنْ عَبْدِهِ اِذَا رَفَعَ يَدَيْهِ إِلَيْهِ أنْ يَرُدَّهُمَا صِفْرًا
(২) সালমান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক মঙ্গলময়, খুবই লজ্জাশীল। তাঁর বান্দা যখন হাত উঠিয়ে তাঁর নিকট চায়, তখন তিনি খালি হাত ফেরত দিতে লজ্জাবোধ করেন’।[2]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ اَلْمَسْأَلَةُ اَنْ تَرْفَعَ يَدَيْكَ حَذْوَ مَنْكِبَيْكَ اَوْ نَحْوَهُمَا وَالْاِسْتِغْفَارُ اَنْ تُشِيْرَ بِاِصْبَعٍ وَاحِدَةٍ وَالْإِبْتِهَالُ اَنْ تَمُدَّ يَدَيْكَ جَمِيْعًا
(৩) ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, চাওয়ার নিয়ম হচ্ছে- তুমি তোমার দু’হাতকে কাঁধ পর্যন্ত অথবা কাঁধের কাছাকাছি উঠাবে আর ক্ষমা প্রার্থনা (নিয়ম) হচ্ছে, তুমি তোমার অঙ্গুলি দ্বারা ইশারা করবে আর বিনীতভাবে চাওয়ার নিয়ম হচ্ছে, তুমি তোমার হাত পূর্ণ প্রসারিত করবে।[3]
عَنْ مَالِكِ بْنِ يَسَارٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ اِذَا سَأَلْتُمُ اللهَ فَاسْأَلُوْهُ بِبُطُوْنِ اَكُفِّكُمْ وَلاَ تَسْأَلُوْهُ بِظُهُوْرِهَا
(৪) মালেক ইবনে ইয়াসার রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যখন তোমরা আল্লাহ্র নিকট চাইবে, তখন তোমাদের হাতের পেটের মাধ্যমে চাইবে, হাতের পিঠের মাধ্যমে চেয়ো না’।[4]
عَنْ عَلِىٍّ قَالَ رَاَيْتُ إِمْرَأَةَ الْوَلِيْدِ جَاءَتْ اِلَى النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ تَشْكُوْ اِلَيْهِ زَوْجَهَا ... فَرَفَعَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ يَدَاهُ وَ قَالَ اَللّهُمَّ عَلَيْكَ بِالْوَلِيْدِ
(৫) আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি ওয়ালীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর স্ত্রীকে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসতে দেখলাম এবং তার স্বামীর ব্যাপারে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অভিযোগ পেশ করতে দেখলাম। তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাত উঠালেন এবং বললেন, ‘হে আল্লাহ্! ওয়ালীদকে দেখার দায়িত্ব আপনার উপরই রয়েছে’।[5]
عَنْ عُثْمَانَ قَالَ كُنَّا نَحْنُ وَ عُمَرَ يَؤُمُّ النَّاسَ ثُمَّ يَقْنُتُ بِنَا عِنْدَ الرُّكُوْعِ وَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ حَتّى يَبْدُوَ كَفَّيْهِ وَ يُخْرِجَ ضَبْعَيْهِ
(৬) ওছমান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার আমরা এক জায়গায় অবস্থান করছিলাম, আর ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকদের ইমামতি করছিলেন। তিনি আমাদের সাথে নিয়ে রুকূর সময় তাঁর দু’হাত উঠিয়ে কুনূত পাঠ করছিলেন, তাঁর দু’হাত ও দু‘বগল প্রকাশ হয়ে পড়েছিল।[6]
عَنْ عَمْرِو بْنِ دِيْنَارٍ أنَّهُ سَمِعَ طَاوُوْسًا يَقُوْلُ دَعَا النَّبِىُّ صلى الله عليه و سلم عَلَى قَوْمٍ فَرَفَعَ يَدَيْهِ فَأَشَارَ لِيْ عَمْرٌو فَنَصَبَ يَدَيْهِ جِدًّا فِيْ السَّمَاءِ فَجَالَتْ النَّاقَةُ فَأَمْسَكَهَا بِاِحْدَى يَدَيْهِ وَالْأُخْرَى قَائِمَةٌ فِيْ السَّمَاءِ
(৭) আমর ইবনে দীনার রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন যে, তিনি ত্বাঊস রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বলতে শুনেছেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা এক সম্প্রদায়ের উপর বদ দু‘আ করার সময় হাত তুলে দু‘আ করলেন। আমর ইবনে দীনার রাযিয়াল্লাহু আনহু আকাশের দিকে হাত বেশী উঠিয়ে আমাকে দেখালেন, ফলে উটটি লাফালাফি করতে লাগল। তখন তিনি এক হাত দিয়ে তার উটনী ধরলেন এবং অপর হাত আকাশের দিকে উঠিয়ে রাখলেন’।[7]
عَنْ خَالِدِ بْنِ الْوَلِيْدِ اَنَّهُ شَكَا إِلى النّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ اَلضِّيْقَ فِىْ مَسْكَنِهِ فَقَالَ اِرْفَعْ يَدَيْكَ اِلَى السَّمَاءِ وَسَلِ اللهَ السَّعَةَ
(৮) খালিদ ইবনে ওয়ালীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তার বাড়ীর সংকীর্ণতার অভিযোগ করলেন, তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি তোমার দু’হাত আকাশের দিকে উঠাও এবং আল্লাহর নিকট প্রশস্ততা চাও’।[8]
عن عائشة قَالَتْ رَاَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه و سلم رَافِعًا يَدَيْهِ يَدْعُوْ لِعُثْمَانَ
(৯) আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি একদা আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর দু’হাত তুলে ওছমান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জন্য দু‘আ করতে দেখলাম।[9]
عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ اَلْحَدِيْثُ الطَّوِيْلُ فِيْ فَتْحِ مَكَّةَ فَرَفَعَ يَدَيْهِ وَ جَعَلَ يَدْعُوْ
(১০) আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু মক্কা বিজয়ের লম্বা হাদীছ বর্ণনা করেন এবং বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দু’হাত উঠালেন এবং দু‘আ করতে লাগলেন।[10]
عَنْ عَطَاءٍ قَالَ قَالَ اُسَامَةُ بْنُ زَيْدٍ كُنْتُ رَدِيْفَ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ بِعَرَفَاتِ فَرَفَعَ يَدَيْهِ يَدْعُوْ فَمَالَتْ بِهِ نَاقَتِهُ فَسَقَطَ خِطَامُهَا فَتَنَاوَلَ الْخِطَامَ بِاِحْدَى يَدَيْهِ وَ هُوَ رَافِعٌ يَدَهُ الْاُخْرَى
(১১) আত্বা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উসামা ইবনে যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি আরাফার মাঠে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে একই আরোহীর উপরে ছিলাম। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দু’হাত তুলে দু‘আ করলেন, তখন উটনী রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে একদিকে সরে গেল এবং উটনীর লাগাম হাত থেকে পড়ে গেল। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এক হাত দ্বারা লাগাম ধরে থাকলেন এবং অপর হাত উঠিয়ে রাখলেন।[11]
عَنْ قَيْسِ بْنِ سَعَدِ ذَكَرَ الْحَدِيْثَ ثُمَّ رَفَعَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ يَدَيْهِ وَ هُوَ يَقُوْلُ اللّهُمَّ صَلوتُكَ وَ رَحْمَتُكَ عَلى آلِ سَعْدِ بْنِ عُبَادَةَ
(১২) ক্বায়েস ইবনে সা‘দ রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দু’হাত উঠালেন এবং বললেন, ‘হে আল্লাহ্! আপনার দয়া ও রহমত সা‘দ ইবনে ওবাদা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পরিবারের উপর অবতীর্ণ হৌক’।[12]
সুধী পাঠক! উক্ত হাদীছগুলো দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, হাত তুলে দু‘আ করার বিধান শরী‘আতে রয়েছে। তবে এ দু‘আ করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিয়ম-পদ্ধতির এক চুলও ব্যতিক্রম করা যাবে না। কেননা দু‘আও ইবাদতেরই অংশ বিশেষ। অতএব দু‘আর ক্ষেত্র ও পদ্ধতি বজায় রেখে হাত তুলে দু‘আ করা যাবে। অন্যথা এর ব্যতিক্রম ঘটলে তা বিদ‘আতে পরিণত হবে।[13]
তাসবীহ দানা দ্বারা তাসবীহ গণনা করা যাবে না :
সমাজে প্রায় মানুষকে তাসবীহ দানার মাধ্যমে যিকির-আযকার করতে দেখা যায়। অনেকের দামী পাথরের তাসবীহ দানা দেখা যায়। কারো আবার হাজার দানার তাসবীহ রয়েছে। কেউ আবার মেশিনের মাধ্যমে তাসবীহ গণনা করে। এ আমলের প্রথম খারাপ দিক হচ্ছে, এতে লৌকিকতা ফুটে ওঠে। অনেককে দেখা যায় তাসবীহ দানার ছড়াটিকে ঝাকি দিয়ে উঠিয়ে ধরে। এসময় মনটা চায় যে, মানুষ আমাকে এ অবস্থায় দেখুক।
সুধী পাঠক! আপনারা কী মনে করেন? রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘লোক দেখানো আমলের বিনিময় হল জাহান্নাম’।[14] যাদেরকে সর্বপ্রথম জাহান্নামে দেয়া হবে তারা হল লোক দেখানো শহীদ, লোক দেখানো দানশীল এবং লোক দেখানো আলেম।[15] তবে আঙ্গুলে তাসবীহ গণনা করলে এমন হয় না। কারণ আঙ্গুলের নীচের দিকে তাসবীহ গণনা করে। বার বার ঝাকি দিয়ে হাত উঠানো লাগে না। তাসবীহ দানার মাধ্যমে যিকির করার ছহীহ কোন হাদীছ নেই। সা‘দ রাযিয়াল্লাহু আনহু এর মেয়ে আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা, তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তার পিতা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এক মহিলার কাছে প্রবেশ করেন। তখন স্ত্রীলোকটির সামনে কিছু খেজুরের বিচি অথবা কংকর ছিল। যার দ্বারা সে তাসবীহ গণনা করছিল। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি কি তোমাকে এমন কথা বলে দিবো না, যা এটা অপেক্ষা অতীব সহজ এবং উত্তম হবে। আর তা হচ্ছে তুমি বলবে আসমানে যে পরিমাণ মাখলূক আছে তার সমপরিমাণ ‘সুবহানাল্লাহ’। যে পরিমাণ মাখলূক যমীনে সৃষ্টি করেছেন, সে পরিমাণ ‘সুবহানাল্লাহ’। আসমান-যমীনের মাঝে যে পরিমাণ মাখলূক সৃষ্টি করেছেন, সে পরিমাণ ‘সুবহানাল্লাহ’। যে পরিমাণ মাখলূক সৃষ্টি করবেন, সে পরিমাণ ‘সুবহানাল্লাহ’, সেই পরিমাণ ‘আল্লাহু আকবার’ আর সেই পরিমাণ ‘আল-হামদুল্লিাহ’ আর সেই পরিমাণ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ আর সেই পরিমাণ ‘লাহাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’।[16] হাদীছটি যঈফ।[17] এই হাদীছ আমলযোগ্য নয়। অতএব এ আমল পরিহার করতে হবে।
আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দানার মাধ্যমে যিকির করে সে হল উত্তম যিকিরকারী আর যে যমীনের উপর সিজদা করা হয় তা হল সবচেয়ে উত্তম যমীন আর সেই যমীন যা কিছু উৎপাদন করে সেটাও উত্তম’।[18] আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কংকরের মাধ্যমে তাসবীহ গণনা করতেন।[19] হাদীছ দু’টি জাল।
সুধী পাঠক! উক্ত হাদীছ দু’টি পেশ করার পর আলবানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, নিশ্চয় তাসবীহ দানার মাধ্যমে তাসবীহ গণনা করা বিদ‘আত। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে এ প্রথা ছিল না। নিশ্চয় এ বিদ‘আত রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরে চালু হয়েছে। অতএব এমন বিদ‘আত কীভাবে মেনে নেওয়া যায় যা নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার ছাহাবীগণ করতেন না এবং এ ব্যাপারে কিছু জানতেন না।[20] আলবানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ডান হাতে তাসবীহ গণনা করা সুন্নাত। বাম হাতে তাসবীহ গণনা করা অথবা দুই হাতে তাসবীহ গণনা করা অথবা তাসবীহ দানার মাধ্যমে তাসবীহ গণনা করা সবটাই সুন্নাত বিরোধী আমল। সবার জেনে বুঝে আমল করা উচিত।[21]
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ডান হাতে তাসবীহ গণনা করতে দেখেছি।[22] ইয়াসীরা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তোমরা তাসবীহ-তাহলীল এবং পবিত্রতা বর্ণনা করবে। এতে তোমরা গাফলতি করবে না। কারণ তোমরা তাওহীদ ভুলে যাবে আর তোমরা আঙ্গুলে তাসবীহ গণনা করবে। সেগুলো জিজ্ঞাসিত হবে এবং কথা বলবে।[23] ছালত ইবনে বাহরাম বলেন, ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এক মহিলার নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন তার কাছে দানা ছিল। তা দ্বারা সেই মহিলা তাসবীহ গণনা বরছিল। ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সেগুলো কেড়ে নিলেন এবং দূরে নিক্ষেপ করলেন। অতঃপর একজন লোকের নিকট দিয়ে অতিক্রম করলেন সে পাথর বা কংকর দ্বারা তাসবীহ গণনা করছিল। ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে নিজের পা দ্বারা লাথি মারলেন। তারপর বললেন, তোমরা অগ্রগামী হয়েছো আর অন্ধকার বিদ‘আতের উপর আরোহন করছো। তোমরা কি মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছাহাবীর উপর ইলমের দিক থেকে বিজয়ী হয়েছো।[24]
উক্ত হাদীছসমূহ প্রমাণ করে ডান হাতে তাসবীহ গণনা করতে হবে এবং আঙ্গুলে তাসবীহ গণনা করতে হবে। তবে হাতের কোন দিক গণনা করতে হবে তা বলা হয়নি। অতএব যেভাবে সহজ, যেদিক থেকে সহজ সেভাবে গণনা করতে হবে।
ফজর ছালাতের পর ১৯ বার বিসমিল্লাহ বলা বিদ‘আত :
ফজর ছালাতের পর ১৯ বার বিসমিল্লাহ বলা যাবে না। এর প্রমাণে কোন ছহীহ হাদীছ নেই। ছাহাবী-তাবেঈগণ থেকেও কোন ছহীহ আছার নেই। এ উজ্জ্বল শরী‘আতে এ আমল বিদ‘আত, যা পরিহার করতে হবে।
সুন্নাতের বিবরণ :
ফজরের জামা‘আত চলা অবস্থায় কোন সুন্নাত পড়া যাবে না :
ইক্বামতের পর জামা‘আত চলা অবস্থায় মসজিদে সুন্নাত ছালাত আদায় করতে দেখা যায়। বিশেষভাবে যখন ফজরের জামা‘আত চলতে থাকে তখন অনেককেই ফজরের সুন্নাত পড়তে দেখা যায়। কোন ওয়াক্তেই ইক্বামতের পর কোন সুন্নাত পড়া যাবে না।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ - رضي الله عنه - قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ - صلى الله عليه وسلم -: " إِذَا أُقِيمَتِ الصَّلَاةُ، فلَا صَلَاةَ إِلَّا الْمَكْتُوبَةُ
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যখন ছালাতের ইক্বামত দেয়া হবে, তখন ফরয ছালাত ব্যতীত আর কোন ছালাত নেই’।[25] এ হাদীছ প্রমাণ করে ফরয ছালাতের ইক্বামত দেয়া হলে কোন সুন্নাত ছালাত চলবে না। যদি কেউ সুন্নাত শুরু করে থাকে আর ইক্বামত আরম্ভ হয়ে যায় তাহলে সুন্নাত ছেড়ে দিতে হবে।
ফজরের ফরযের পর সুন্নাত পড়া যায় :
ফজরের ফরয ছালাতের পর সূর্য উঠা পর্যন্ত ছালাত নেই।[26] এই ব্যাপক হাদীছের ভিত্তিতে বলা হয় ফজরের ছালাতের সুন্নাত আগে পড়তে না পারলে সূর্য উঠার পর পড়তে হবে। এ কারণেই উক্ত আমল সমাজে চালু হয়েছে। অথচ ফজরের ছুটে যাওয়া সুন্নাত ফজরের ফরয ছালাতের পরপরই পড়ে নেয়ার ছহীহ হাদীছ আছে।
عَنْ قَيْسِ بْنِ عَمْرو قَالَ: رَأَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلًا يُصَلِّي بَعْدَ صَلَاةِ الصُّبْحِ رَكْعَتَيْنِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «صَلَاة الصُّبْحِ رَكْعَتَيْنِ رَكْعَتَيْنِ» فَقَالَ الرَّجُلُ: إِنِّي لَمْ أَكُنْ صَلَّيْتُ الرَّكْعَتَيْنِ اللَّتَيْنِ قَبْلَهُمَا فَصَلَّيْتُهُمَا الْآنَ. فَسَكَتَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
ক্বায়েস ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা ফজরের ছালাতের পর এক ব্যক্তিকে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করতে দেখলেন। অতঃপর তিনি বললেন, ‘ফজরের ছালাত দুই রাক‘আত’। তখন ঐ ব্যক্তি বলল, ফজরের পূর্বে দুই রাক‘আত আদায় করিনি। তাই এখন সেই দুই রাক‘আত আদায় করলাম। অতঃপর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপ থাকলেন।[27] এই হাদীছ প্রমাণ করে ফজরের ছালাতের পর ফজরের সুন্নাত পড়া সুন্নাত। অতএব প্রচলিত সুন্নাত বিরোধী অভ্যাস ত্যাগ করে সুন্নাতকে প্রাধান্য দেয়া উচিত। আরো অবাক করা কাণ্ড এই যে, ‘মসজিদে লাল বাতি জ্বলে উঠলে সুন্নাত পড়বেন না’ বলা হয়। কিন্তু একথা ফজরের সময় চলে না।
মাগরিবের পূর্বে সুন্নাত পড়া ভাল :
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مُغَفَّلٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «بَيْنَ كُلِّ أَذَانَيْنِ صَلَاةٌ بَيْنَ كُلِّ أَذَانَيْنِ صَلَاةٌ» ثُمَّ قَالَ فِي الثَّالِثَةِ «لِمَنْ شَاءَ»
আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘প্রত্যেক দুই আযানের মাঝে ছালাত রয়েছে। প্রত্যেক আযান ও ইক্বামতের মাঝে ছালাত রয়েছে। প্রত্যেক আযান ও ইক্বামতের মাঝে ছালাত রয়েছে’। তিনি তৃতীয় বারে বলেন, ‘যার ইচ্ছা’।[28] এই হাদীছ প্রমাণ করে মাগরিবের আযানের পর দুই রাক‘আত সুন্নাত পড়া ভাল।
عَنْ أَنَسٍ قَالَ: كُنَّا بِالْمَدِينَةِ فَإِذَا أَذَّنَ الْمُؤَذِّنُ لِصَلَاةِ الْمَغْرِبِ ابْتَدَرُوا السَّوَارِيَ فَرَكَعُوا رَكْعَتَيْنِ حَتَّى إِنَّ الرَّجُلَ الْغَرِيبَ لَيَدْخُلُ الْمَسْجِدَ فَيَحْسَبُ أَنَّ الصَّلَاةَ قَدْ صُلِّيَتْ مِنْ كَثْرَةِ مَنْ يُصَلِّيهمَا
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা যখন মদীনায় থাকতাম তখন এমন হত যে, মুয়াযযিন মাগরিবের ছালাতের যখন আযান দিত তখন লোকেরা দৌঁড়িয়ে খুঁটির দিকে যেত এবং খুঁটির পেছনে দুই রাক‘আত করে ছালাত আদায় করতেন। এমনকি কোন অপরিচিত লোক মসজিদে প্রবেশ করলে ধারণা করত অবশ্যই মাগরিবের ছালাত হয়ে গেছে। অনেকেই এ ছালাত আদায় করতো এই কারণে মানুষ এ ধারণা করতো।[29] এই হাদীছ প্রমাণ করে ছাহাবীগণ মাগরিবের পূর্বে দুই রাক‘আত সুন্নাত পড়তেন। মাগরিবের পূর্বে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করা যাবে না মর্মে হাদীছটি যঈফ।[30]
মাগরিবের পর ছালাতুল আউয়াবীন পড়া যাবে না :
মাগরিবের পূর্বে ছালাতুল আউয়াবীন পড়ার প্রমাণে কোন ছহীহ হাদীছ নেই।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ صَلَّى بَعْدَ الْمَغْرِبِ سِتَّ رَكَعَاتٍ لَمْ يَتَكَلَّمْ فِيمَا بَيْنَهُنَّ بِسُوءٍ عُدِلْنَ لَهُ بِعِبَادَةِ ثِنْتَيْ عَشْرَةَ سَنَةً».
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মাগরিবের ছালাতে ৬ রাক‘আত ছালাত আদায় করবে কিন্তু মাঝে কোন খারাপ কথা বলবে না তাহলে তার জন্য তা ১২ বছরের ইবাদতের সমান হবে’।[31] হাদীছটি জাল।[32]
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ صَلَّى بَعْدَ الْمَغْرِبِ عِشْرِينَ رَكْعَةً بَنَى اللَّهُ لَهُ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ» .
আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি মাগরিবের পর ২০ রাক‘আত ছালাত আদায় করবে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন’।[33] হাদীছটি জাল।[34] মুহাম্মাদ ইবনে মুনকাদির রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মাগরিব থেকে এশা পর্যন্ত ছালাত আদায় করবে সেটা তার জন্য ছালাতুল আউয়াবীন হবে’।[35]
উক্ত হাদীছগুলো জাল ও যঈফ। অতএব মাগরিবের পরে ছালাতুল আউয়াবীন নামে কোন ছালাত আদায় করা যাবে না।
(চলবে)
[1]. আবুদাঊদ, হা/১৪৮৭, সনদ ছহীহ।
[2]. আবুদাঊদ, হা/১৪৮৮, সনদ ছহীহ; মিশকাত, হা/২২৪৪।
[3]. আবুদাঊদ, হা/১৪৮৯, সনদ ছহীহ; মিশকাত, হা/২২৫৬।
[4]. আবুদাঊদ, হা/১৪৮৬, সনদ ছহীহ; মিশকাত, হা/২২৪২।
[5]. ইমাম বুখারী, রাফ‘উল ইয়াদায়েন, পৃঃ ১৭।
[6]. রাফ‘উল ইয়াদায়েন, পৃঃ ১৮, হাদীছ ছহীহ।
[7]. মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক, ২/২৪৭ পৃঃ, সনদ ছহীহ।
[8]. মাজমাঊয যাওয়ায়েদ, ১০/১৬৯ পৃঃ।
[9]. ফাৎহুল বারী, ১১/১৪২ পৃঃ, ‘রাফ‘উল ইয়াদায়েন’ অধ্যায়, সনদ ছহীহ।।
[10]. ফাৎহুল বারী, ১১/১৪২, পৃঃ ‘রাফ‘উল ইয়াদায়েন’ অধ্যায়, সনদ ছহীহ।
[11]. নাসাঈ, হা/৩০১১।
[12]. আবুদাঊদ, হা/৫১৮৫; ফাৎহুল বারী, ১১/১৪২ পৃঃ, হাদীছ ছহীহ।
[13]. ছহীহ বুখারী, ছহীহ মুসলিম, মিশকাত, হা/২৭।
[14]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯০৫; মিশকাত, হা/২০৫।
[15]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯০৫; মিশকাত, হা/২০৫।
[16]. তিরমিযী, হা/৩৫৬৮; আবুদাঊদ, হা/১৫০০; মিশকাত, হা/২৩১১।
[17]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৮৩; যঈফ আল-জামে‘, হা/২১৫৫; যঈফ তারগীব, হা/৯৫৯।
[18]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৮৩। হাদীছটি জাল, হা/ঐ।
[19]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/১০০২। হাদীছটি জাল, সিলসিলা যঈফাহ, হা/ঐ।
[20]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৮৩ -এর আলোচনা দ্রষ্টব্য।
[21]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/১০০২ -এর আলোচনা দ্রষ্টব্য।
[22]. আবুদাঊদ, হা/১৫০২; তিরমিযী, হা/৩৪৮৬।
[23]. মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/২০০৭।
[24]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৮৩ -এর আলোচনা দ্রষ্টব্য।
[25]. ছহীহ মুসলিম, হা/৭১০; মিশকাত, হা/১০৫৮।
[26]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৬; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৯৭৪।
[27]. আবুদাঊদ হা/১২৬৭; মিশকাত, হা/১০৪৪; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৯৭৭।
[28]. ছহীহ বুখারী, হা/৬২৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৩৮; মিশকাত, হা/৬৬২।
[29]. ছহীহ মুসলিম, হা/৮৩৭; মিশকাত, হা/১১৮০।
[30]. বায়হাক্বী, হা/৪৬৬৯।
[31]. তিরমিযী, হা/৪৩৬; ইবনে মাজাহ, হা/১১৬৭; মিশকাত, হা/১১৭৩; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১১০৫।
[32]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৪৬৯।
[33]. তিরমিযী, হা/৪৩৬; মিশকাত, হা/১১৭৪; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১১০৬।
[34]. যঈফ তারগীব, হা/৩৩২।
[35]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৪৬১৭।
