কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

অন্ধভাবে মাযহাব মানার ভয়াবহ পরিণাম (পর্ব-২)

দ্বিতীয় পর্যালোচনা: হাদীছটি সম্বন্ধে আল্লামা মুহাম্মাদ হায়াত সিন্ধি বলেন,

في زيادة تحت السرة نظر بل هي غلط منشأه السهو فإني راجعت نسخة صحيحة من المصنف....إلا أنه ليس فيها تحت السرة.

‘হাদীছে উল্লেখিত ‘নাভীর নিচে’ শব্দটির ব্যাপারে কথা আছে। বরং এ শব্দের বৃদ্ধিটা ভুল ও অসাবধানতার কারণে ঘটেছে। কারণ আমি মুছান্নাফে ইবনু শায়বার মূল কপি দেখেছি, পড়েছি, কিন্তু সেখানে এ শব্দটির (নাভীর নিচে) উল্লেখ নেই’।[1]

তৃতীয় পর্যালোচনা: প্রখ্যাত হানাফী মুহাদ্দিছ, ছহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাকার আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী বলেন,

ويستدل علماءنا الحنفية بدلائل غير وثيقة.

‘নাভীর নিচে হাত বাঁধার ব্যাপারে আমাদের হানাফী আলেমরা যে প্রমাণ পেশ করেন, তা নির্ভরযোগ্য নয়’।[2]

৫নং উদাহরণ (হাদীছের অর্থে পরিবর্তন):

ছালাতে বাম হাতের উপর ডান হাত রেখে বুকের উপর রাখা অধ্যায়ে হাদীছটি হচ্ছে,

عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ كَانَ النَّاسُ يُؤْمَرُوْنَ أَنْ يَضَعَ الرَّجُلُ اليَدَ اليُمْنَى عَلَى ذِرَاعِهِ اليُسْرَى فِي الصَّلاَةِ.

‘সাহ্ল ইবনে সা‘দ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘ছালাতে লোকদেরকে ডান হাত বাম বাহুর উপর রাখার নির্দেশ দেওয়া হত’।[3]

পরিবর্তন: হানাফী মাযহাবপন্থী কিছু আলেম যখন বিশ্বখ্যাত ছহীহ হাদীছ গ্রন্থ ছহীহ বুখারীর বাংলা অনুবাদ করতে উদ্যোগী হলেন, তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত ছালাতে বুকে হাত বাঁধা বা বাহুর উপর বাহু রাখা। এ হাদীছের অর্থে পরিবর্তন করে বাহুর স্থানে কব্জি অর্থ করেছেন। মনে রাখতে হবে, এ ধরনের অপকর্ম দ্বারা হাদীছ পরিবর্তন করা যাবে না। কারণ হাদীছকে সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ নিয়েছেন। আর আমাদের আধুনিক প্রকাশনীর বাংলা তরজমাতে যে আরবী ‘যিরা’ শব্দটির অর্থ করেছেন কব্জি, যাতে মাযহাবের মতানুযায়ী হয়। কিন্তু ‘যিরা’ শব্দের অর্থ কুরআন, হাদীছসহ সকল আরবী অভিধানে বলা হয়েছে, ‘কুনুইয়ের একেবারে শেষ ভাগ থেকে শুরু করে মধ্যমা আঙ্গুলের শেষ পর্যন্ত’।[4]

কিন্তু আমাদের যে সকল ভাই এ কাজটি করলেন, তাদের এ ধরনের ন্যাক্কারজনক কাজ করার একমাত্র কারণ অন্ধ মাযহাবপ্রীতি। ইমামের মত হচ্ছে কব্জির উপর কব্জি রেখে নাভীর নিচে বাঁধা, তাই এ বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। অথচ ইমাম ছাহেব জীবিত থাকলে এ ধরনের কাজের জন্য চরম ধিক্কার জানাতেন। এই হল অন্ধভাবে মাযহাব মানার ভয়াবহ পরিণাম। এ অর্থের পরিবর্তন দেখুন।[5]

৬নং উদাহরণ (মাযহাবী মতের পক্ষে হাদীছ বানানো):

অনেক মাযহাবপন্থী গোঁড়া মুকালিস্নদ আছেন, যারা মাযহাবী মতের পক্ষে হাদীছ বানিয়ে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে চালিয়ে দেন, তারা সম্পূর্ণ ভুলে যান রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে মিথ্যা হাদীছ বানানের ভয়াবহ পরিণাম। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা হাদীছ বানাবে তার স্থান হবে জাহান্নাম’।[6]

তারপরও কিছু গোঁড়া মাযহাবপন্থী ভাই তাদের মাযহাবের মতকে সাব্যস্ত করতে, মাযহাবতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে, মাযহাবপন্থীদের খুশী করতে মিথ্যা হাদীছ বানান। নিমেণ তার প্রমাণ পেশ করা হল, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

صليت وراء رسول الله صلى الله عليه وسلم وخلف أبي بكر سنتين وخمسة أشهر وخلف عمر عشر سنيين وخلف عثمان اثني عشرة سنة وخلف علي بالكوفة خمس سنيين فما رفع واحد منهم يديه إلا في تكبيرة الإحرام وحدها.

‘আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে, আবুবকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পিছনে আড়াই বছর , ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পিছনে দশ বছর, ওছমান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পিছনে বারো বছর এবং কূফাতে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পিছনে পাঁচ বছর ছালাত পড়েছি। কিন্তু তাদের কেউ তাকবীরে তাহরীমার সময় ব্যতীত অন্য কোথাও হাত উঠাননি’।[7]

পর্যালোচনা: হাদীছটি যে মাযহাবের পক্ষে বানানো তার প্রমাণ- ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুবরণ করেন ওছমান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর খিলাফতকালে। তাহলে তিনি কীভাবে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পিছনে কূফাতে পাঁচ বছর ছালাত পড়েন?[8]

এছাড়াও ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ আরো বলেন, ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ওমর ও ওছমান রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর পিছনে খুব অল্প সংখ্যক ছালাত পড়েছেন। কারণ তাদের দু’জনের খিলাফতকালে ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অধিকাংশ সময় কূফাতে ছিলেন।[9]

৭নং উদাহরণ (মাযহাবের ইমামের পক্ষে ও অপর মাযহাবের ইমামের বিপক্ষে হাদীছ বানানো):

মাযহাব মানার ভয়াবহ পরিণাম হিসাবে ইতিপূর্বে যেমন আমরা দেখেছি কিছু মাযহাবপন্থী গোঁড়া আলেম হাদীছের শব্দে, অর্থে, ব্যাখ্যায় পরিবর্তন করেছেন। ঠিক তেমনি মাযহাবের মতের পক্ষে ও অন্যের বিপক্ষে হাদীছ বানিয়েছেন। যেমন- মামুন ইবনে আহমাদ আস-সুলামি, তিনি আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

يَكُوْنُ فِيْ أُمَّتِيْ رَجُلٌ يُقَالُ لَهُ مُحَمَّدُ بْنُ إِدْرِيْسَ أَضَرَّ عَلَى أُمَّتِيْ مِنْ إِبْلِيْسَ وَيَكُوْنُ فِيْ أُمَّتِيْ رَجُلٌ يُقَالُ لَهُ أَبُوْ حَنِيْفَةَ هُوَ سِرَاجُ أُمَّتِيْ.

‘আমার উম্মতের মধ্যে মুহাম্মাদ ইবনে ইদরীস নামক একজন ব্যক্তি হবেন, তিনি আমার উম্মতের জন্য ইবলীস শয়তানের চেয়ে বেশী ক্ষতিকর ও ভয়ানক হবেন। আর আমার উম্মতের আর একজন ব্যক্তি হবেন তার নাম হবে আবু হানীফা, তিনি হবেন আমার উম্মতের প্রদীপস্বরূপ।[10]

পর্যালোচনা: ইমাম ইবনে হিববান রাহিমাহুল্লাহ এই রাবী মামুন ইবনে আহমাদ আস-সুলামী সম্বন্ধে বলেন, তিনি একজন অন্যতম দাজ্জাল ও মিথ্যুক।[11]

ইমাম হাকেম রাহিমাহুল্লাহ তার সম্বন্ধে বলেন,

مأمون خبيث كذاب يروي عن الثقات أحاديث موضوعة.

‘মামুন হচ্ছে একজন খবীছ বা নিকৃষ্ট ও মিথ্যাবাদী, সে ছিক্বাহ বা গ্রহণযোগ্য রাবীদের নামে মিথ্যা হাদীছ বর্ণনা করে।[12] ইমাম ইবনুল জাউযি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এ হাদীছটি বানোয়াট। আল্লাহ উক্ত হাদীছ বানোয়াটকারীকে অভিশাপ করুন।[13]

৮নং উদাহরণ (হাদীছের অপপ্রয়োগ):

عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ صَلَّيْتُ مَعَ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكُنَّا إِذَا سَلَّمْنَا قُلْنَا بِأَيْدِيْنَا السَّلَامُ عَلَيْكُمْ السَّلَامُ عَلَيْكُمْ فَنَظَرَ إِلَيْنَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ مَا شَأْنُكُمْ تُشِيْرُوْنَ بِأَيْدِيْكُمْ كَأَنَّهَا أَذْنَابُ خَيْلٍ شُمْسٍ إِذَا سَلَّمَ أَحَدُكُمْ فَلْيَلْتَفِتْ إِلَى صَاحِبِهِ وَلَا يُوْمِئْ بِيَدِهِ.

জাবের ইবনে সামুরা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছালাত পড়েছি। কিন্তু যখন আমরা সালাম ফিরাতাম, তখন আমরা হাত দ্বারা ইশারা করে বলতাম, আস-সালামু আলাইকুম। একদা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের এ কার্যকলাপ দেখে বললেন, ‘তোমাদের কী হয়েছে? তোমরা অবাধ্য ঘোড়ার লেজের ন্যায় হাত ইশারা করছো! এ রকম না করে বরং তোমাদের কেউ যখন সালাম ফিরাবে, তখন হাত ইশারা না করে বরং তার পার্শ্ববর্তী সাথীর দিকে তাকাবে’।[14]

পর্যালোচনা: উল্লেখিত হাদীছটিতে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাহাবীদেরকে সালামের সময় দুই হাত উঁচু করে ইশারা করতে নিষেধ করেছেন। এ হাদীছ রাফঊল ইয়াদায়েন বা ছালাতে হাত উত্তোলন করার সঙ্গে আদৌ সম্পৃক্ত নয়। কিন্তু আমাদের তাকলীদপন্থী মাযহাবী ভাই যারা রুকূতে যাওয়ার সময় ও রুকূ হতে উঠার সময়কার হাত উত্তোলন করা সুন্নাতকে মানতে চায় না, তারা এ হাদীছের অপপ্রয়োগ করে এটাকে ছালাতে রুকূর সময় ও রুকূ হতে উঠার সময় হাত উত্তোলন না করার ক্ষেত্রে দলীল হিসাবে উপস্থাপন করেন। এটা কি ঠিক?

(২) মাযহাবকে কেনদ্র করে মুসলিম জাতির মধ্যে ফিতনা-ফাসাদ ও দলাদলির সৃষ্টি হয়:

ইসলাম ধর্ম মানবতার ধর্ম, মহান ধর্ম, শান্তি ও ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের ধর্ম। যেখানে নেই কোন মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানি, হিংসা-বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা, ফিতনা-ফাসাদ ও দলাদলির স্থান। কিন্তু তারপরেও কেন আমাদের এ মুসলিম জাতির মধ্যে এত বিভক্তি? এর কারণ অনেক। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে, মাযহাবকে নিয়ে বাড়াবাড়ি, তাকলীদকে নিয়ে অতিরঞ্জন ও হানাহানি। এ মাযহাবকে কেন্দ্র করে পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে ঘৃণা, বিদ্বেষ, গীবত হিংসার তীর নিক্ষেপ করছে। শুধু তাইনা বরং এ মাযহাবকে কেন্দ্র করে মুসলিম মিল্লাতের মাঝে কতই না মারামারি, হানাহানি, কাটাকাটি, দ্বন্দ্ব-কলহ হয়েছে ও হচ্ছে। কিন্তু কেন আমরা মুসলিম জাতির ঐক্যের জন্য নিজস্ব গোঁড়ামি ও অন্ধ তাকলীদকে বর্জন করতে পারছি না। অথচ যাদের নামে মাযহাব বানিয়ে হন হন করে চলছি, সেই মহামতি ইমাম চতুষ্টয় তো ছিলেন একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু কেন তাদের মাযহাব মেনে তাদের নামীয় অনুসারী হয়ে অন্যকে ঘায়েল করতে উদ্যত, কেন বিভেদ ও দলাদলির দুয়ার উন্মুক্ত করার প্রচেষ্টা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَاعْتَصِمُوْا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيْعًا وَلَا تَفَرَّقُوْا.

‘তোমরা সকলে মিলে আল্লাহ্র রজ্জুকে আঁকড়ে ধর। পরস্পর বিছিন্ন হয়ো না’ (আলে ইমরান, ১০৩)। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন, وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْل ‘ফিতনা-ফাসাদ করা হত্যা করা অপেক্ষা ঘৃণিত’ (বাক্বারাহ, ১৯১)। অথচ এই মাযহাবকে কেন্দ্র করে, তাকলীদকে ধর্মীয় বিষয় মনে করে অতীতে মুসলিম জাতির মধ্যে কত মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানি, জখম, হত্যাই না হয়েছে! এগুলো সব ইসলামে হারাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَلَا تَكُوْنُوْا كَالَّذِيْنَ تَفَرَّقُوْا وَاخْتَلَفُوْا مِن بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُوْلَٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيْمٌ.

‘তোমরা সেই লোকদের মত হয়ো না, যারা তাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শন পৌঁছার পরেও দলে দলে বিভক্ত হয়েছে ও মতবিরোধ করেছে, তাদের জন্য রয়েছে ভয়ঙ্কর আযাব’ (আলে ইমরান, ১০৫)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

مِنَ الَّذِيْنَ فَرَّقُوْا دِيْنَهُمْ وَكَانُوْا شِيَعًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُوْنَ.

‘যারা নিজেদের দ্বীনকে বিভক্ত করে ফেলেছে এবং বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে গেছে। প্রত্যেক দল নিজেদের কাছে যা আছে তাই নিয়ে উল্লাসিত’ (রূম, ৩২)

মুসলিম জাতির মধ্যে ফির্কা বা বিভক্তি সৃষ্টি করা নিন্দনীয় কাজ, গুনাহের কাজ, যা থেকে বিরত থাকা থাকা আবশ্যক। কারণ এ ফির্কা, দলাদলি, বিভক্তির ভয়াবহ পরিণাম সম্বন্ধে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَإِنَّ بني إسرائيل تَفَرَّقَتْ عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِيْنَ مِلَّةً وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِيْ عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِيْنَ مِلَّةً كُلُّهُمْ فِيْ النَّارِ إِلَّا مِلَّةً وَاحِدَةً قَالُوْا وَمَنْ هِيَ يَا رَسُوْلَ اللهِ قَالَ مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِيْ.

‘বনী ইসরাঈল (ইয়াহূদী-খ্রীস্টান) ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল, আর আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে, তাদের মধ্যে একটি দলই নাজাতপ্রাপ্ত বা জান্নাতী আর বাকী সকলেই জাহান্নামে যাবে। তখন ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! সেই দল কোন্টি? প্রতি উত্তরে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে পথ, মত ও আর্দশের উপর আমি ও আমার ছাহাবীগণ আছি’।[15]+[16] অন্যত্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

لَيْسَ مِنَّا مَنْ دَعَا إِلَى عَصَبِيَّةٍ وَلَيْسَ مِنَّا مَنْ قَاتَلَ عَلَى عَصَبِيَّةٍ وَلَيْسَ مِنَّا مَنْ مَاتَ عَلَى عَصَبِيَّةٍ.

‘ঐ ব্যক্তি আমাদের মুসলিম মিল্লাতের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে অন্যায়ভাবে গোত্রের দিকে অথবা যুলুমের দিকে ডাকে এবং যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে গোত্রীয় খাতিরে যুদ্ধ করে ও মারা যায় সেও আমাদের মুসলিম মিল্লাতের অন্তর্ভুক্ত নয় ’।[17]

এতক্ষণ দেখলেন ফিতনা-ফাসাদ, ফির্কা, বিভক্তি করার পরিণতি সম্পর্কে কুরআন-হাদীছের বক্তব্য। আর বাস্তবতার দিকে তাকালে তো শরীর শিউরে উঠে, মানুষ হতভম্ব হয়ে যায়, কী করেছে এ মাযহাবতন্ত্র ও তাকলীদে শাখছী। এর কারণে মুসলিম জাতির যে ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়। এর কিছু প্রমাণ ও বাস্তব উদাহরণ নিচে তুলে ধরা হল:

১নং উদাহরণ: প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আবুল ফিদা ইসমাঈল ইবনে কাছীর রাহিমাহুল্লাহ তার জগত বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’তে মাযহাব কেন্দ্রিক সংঘর্ষ ও মারামারি, কাটাকাটির একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন,

وَفِيْهَا وَقَعَتْ فِتْنَةٌ بِبَغْدَادَ بَيْنَ أصحاب أبي بكر المروذي الْحَنْبَلِيِّ وَبَيْنَ طَائِفَةٍ مِنَ الْعَامَّةِ، اخْتَلَفُوْا فِيْ تَفْسِيْرِ قَوْلِهِ تَعَالَى (عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَحْمُوْدًا) فَقَالَتِ الْحَنَابِلَةُ يُجْلِسُهُ مَعَهُ عَلَى الْعَرْشِ. وَقَالَ الْآخَرُوْنَ الْمُرَادُ بِذَلِكَ الشَّفَاعَةُ الْعُظْمَىْ فَاقْتَتَلُوْا بِسَبَبِ ذَلِكَ وَقُتِلَ بَيْنَهُمْ قَتْلَى فَإِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ.

‘৩১৭ হিজরীতে বাগদাদে হাম্বলী মাযহাবের ইমাম আবুবকর আল-মারওয়াযী ও অন্যান্য মাযহাবের অনুসারীগণের মধ্যে চরম মারামারি, কাটাকাটি ও সংগ্রাম শুরু হয়। তারা কুরআনের উল্লেখিত সূরা ইসরার ৭৯ আয়াত (শীঘ্রই আপনার প্রভু আপনাকে মাক্বামে মাহমূদে উন্নীত করবেন) এ আয়াতের অর্থকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়, হাম্বলীগণ বলেন, মাক্বামে মাহমূদের অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ তাঁর রাসূলকে তাঁর সাথে আরশে আযীমে সমাসীন করবেন। আর অন্য মাযহাবপন্থীরা এর অর্থে বলেন, বড় শাফা‘আত। আয়াতের এ অর্থকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে চরম মারমারি ও সংগ্রাম শুরু হয়। আর এ মাযহাব কেন্দ্রিক মারামারিতে শত শত লোক নিহত হয়। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন’।[18]

২নং উদাহরণ: ৩২৩ হিজরীর ঘটনা। জেহরী ছালাতে ‘বিসমিল্লাহ’ উচ্চৈঃস্বরে পড়তে হবে না আস্তে পড়তে হবে। এ মাসআলাকে কেন্দ্র করে যে চরম মারমারি ও সংগ্রাম হয়, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে ইবনুল আছীর বলেন, ‘৩২৩ হিজরীর জুমাদাল আখের মাসে পুলিশের বড়কর্তা হাম্বলী মাযহাবের অনুসারীদের বাগদাদে ডেকে তাদেরকে শাফেঈ মাযহাব অনুযায়ী ছালাত পড়তে বলেন এবং হাম্বলী মাযহাবপন্থীদের একে অপরের সাথে চলাফেরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেন এবং অনেক হাম্বলী মাযহাবপন্থীকে বন্দী করেন এবং তাদেরকে শাফেঈ মাযহাব অনুযায়ী ছালাত পড়তে বাধ্য করেন। আর তখনকার খলীফা রাযীবিল্লাহ হাম্বলীদিগকে তাদের মতবাদ পরিহার করার আদেশ দেন। মোটকথা এ মাযহাবী ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাফেঈ ও হাম্বলীদের মাঝে যে মারামারি হয়, তাতে বাগদাদের অনেক বড় বড় আলেমসহ অসংখ্য লোক মারা যান’।[19]

৩নং উদাহরণ: অন্ধ মাযহাবভক্তির কারণে মুসলিমদের মধ্যে যে ফিতনা-ফাসাদ, মারামারি, কাটাকাটি হাঙ্গামা সৃষ্টি হয়, সে সম্পর্কে সম্বন্ধে ভৌগলিক ইয়াকুত আল-হামাবী ৬১৭ হিজরীর ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘রাঈ নগরীর অধিবাসীরা তিন দলে বিভক্ত ছিল। শাফেঈ মাযহাবপন্থী ছিল অল্পসংখ্যক, হানাফী ছিল তুলনামূলক তাদের চেয়ে বেশী আর শী‘আ সম্প্রদায় সবচয়ে বেশী। ...৬১৭ হিজরীতে সেখানকার শী‘আ ও সুন্নী সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সংঘর্ষে শাফেঈ ও হানাফী মিলে শী‘আদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয় এবং শী‘আদেরকে পরাজিত করে নিঃশেষ করে দেয়। অতঃপর যখন শী‘আদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়, তখন শাফেঈ ও হানাফী সম্প্রদায় পরস্পর মাযহাবী কোন্দলে পতিত হয়। পরিশেষে এ যুদ্ধ শাফেঈদের বিজয় ও হানাফীদের পরাজয়ের মাধ্যমে শেষ হয়। এ অবস্থায় তাদের প্রতিবেশী নগরী রুস্তাক এর হানাফী মাযহাবপন্থীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এসে রাঈ নগরীর হানাফীদের সাহায্য করতে শুরু করে, এতেও কোন লাভ হয়নি। পরিশেষে রাঈ নগরী শাফেঈদের দ্বারা শী‘আ ও হানাফী মুক্ত করা হয়। আর যে সকল শী‘আ ও হানাফী ছিল তারা তাদের মাযহাবকে গোপন করে থাকত’।[20]

৪নং উদাহরণ: ইয়াকুত আল-হামাবী তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মু‘জাম আল-বুলদানে’ ৫৫৪ হিজরীর ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, নিশাপুর শহরে হানাফী ও শাফেঈদের মধ্যে সংগ্রাম ও মারামারি শুরু হয়। শী‘আ সম্প্রদায় হানাফীদের পক্ষ অবলম্বন করেন। ফলে শাফেঈরা পরাস্ত হয় এবং তাদের বহুলোক নিহত হয়। এছাড়াও হানাফীরা শাফেঈদের হাট-বাজার, মাদরাসা, স্কুল, কলেজ ইত্যাদি পুড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে শাফেঈরা শক্তি সঞ্চয় করে প্রবলভাবে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে এবং শাফেঈদের যতগুলো লোক হানাফীরা হত্যা করেছিল, তা অপেক্ষা অধিক হানাফীকে শাফেঈরা হত্যা করে। পুনরায় ৫৬০ হিজরীতে হানাফী-শাফেঈ সংঘর্ষ আরম্ভ হয়। আট দিন পর্যন্ত নর হত্যা, লুটতরাজ চলতে থাকে এবং বাসগৃহ দগ্ধীভূত করা হয়।[21]

(চলবে)


[1]. মুহাম্মাদ হায়াত সিদ্ধি, ফাতহুল গফূর, পৃঃ ২০।

[2]. আইনী, উমদাতুল কারী, ৫/২৭৯; মুকারবপুরী, আবকারুল মিনান, পৃঃ ৩৮০-৩৯৯।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৪০, ‘আযান’ অধ্যায়; ছহীহ বুখারী (আধুনিক প্রকাশনী, ১ম খণ্ড), হা/৬৯৬; ছহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২য় খণ্ড), হা/৮৫১, ‘ছালাত’ অধ্যায়; আবুদাঊদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১ম খণ্ড), হা/৭৫৯; তিরমিযী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১ম খণ্ড), হা/২৫২।

[4]. কুরআন, হাদীছ ও লিসানুল আরব, কামুছ আল-মুহিত, মাকায়িছ আল-লুগাহ সহ সকল আরবী অভিধান।

[5]. ছহীহ বুখারী (আধুনিক প্রকাশনী, ১ম খ-), হা/৬৯৬।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/১০৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৩।

[7] জাওয়াবে ফী ওয়াজ হিস সুন্নাহ, পৃঃ ২৭০-২৭১।

[8]. যাহাবী, মীযানুল ই‘তিদাল, ১/২৬৯-২৭০; ইবনে হাজার, লিসানুল মীযান, ১/৪৫৮-৪৫৯; জাওযাবে ফী ওয়াজ হিস সুন্নাহ, পৃঃ ৩৫৯।

[9]. মীযানুল ই‘তিদাল, ১/২৭।

[10]. ইবনে হিববান, আল-মাজরুহীন, ৩/৪৬; আল-মাউযূ‘আত ২/৪৮-৪৯; তারীখে বাগদাদ, ১৩/৩৩৫; মীযানুল ই‘তিদাল, ৩/৪৩০।

[11]. আল-মাজরুহীন, ৩/৪৫-৪৬।

[12]. আল-মাদখাল ইলাল ছহীহ হাকেম, পৃঃ ২১৫।

[13]. ইবনুল জাউজি, আল-মাউযূ‘আত, ২/৪৮ পৃঃ।

[14]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৩১, ‘ছালাত’ অধ্যায়।

[15]. সুনানে তিরমিযী, ৫/২৫-২৬, ‘ঈমান’ অধ্যায়, ‘ফির্কা’ পরিচ্ছেদ; আবুদাঊদ, ৫/৪, হা/৪৫৯, ‘সুন্নাহ’ অধ্যায়; সুনানে ইবনে মাজাহ, ২/১৩২১, হা/৩৯৯১, ‘ফিতনা’ অধ্যায়; মুসনাদে আহমাদ, ২/৩৩২।

[16]. এখানে জাহান্নামে যাওয়ার অর্থ এ নয় যে, তারা চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে বরং তাদের কুকর্মের জন্য প্রথমে জাহান্নামে দেওয়া হবে, তারপর গুনাহ অনুযায়ী জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করে তাদেরকে আবার জান্নাতে পাঠানো হবে। (লেখক)

[17]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৫০; আউনুল মা‘বূদ, হা/৪৪৫৬।

[18]. ইবনে কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১১/১৯৩; ঘটনাটা আরো আছে: ইবনে আছীর, আল-কামেল ফিত-তারীখ, ৭/৫৭; আহমাদ আমীন, যুহুরুল ইসলাম, ১/৯৭; আল্লামা কাফী, ফির্কাবন্দী বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি, ১৮/১৯।

[19]. আল-কামেল ফিত-তারীখ, ৭/১১০-১১৪।

[20]. মু‘জাম আল-বুলদান, ৪/৩৫৫; বিদ‘আতু তাআচ্ছুব আল-মাযহাবী, পৃঃ ২১৪।

[21]. আব্দুল্লাহিল কাফী আল-কুরাইশী, ফির্কাবন্দী বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি, ১/২০।

Magazine