যে কোন মোজায় মাসাহ চলে :
মুগীরা ইবনে শু‘বা (রাঃ) বলেন,تَوَضَّأَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَسَحَ عَلَى الجَوْرَبَيْنِ وَالنَّعْلَيْنِ ‘নবী করীম (ছাঃ) ওযূ করলেন আর মাসাহ করলেন মোটা কাপড়ের দু’মোজার উপর এবং দু’জুতার উপর’।[1] হাদীছটি থেকে প্রমাণিত হয় যে, কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করা যায়। চামড়ার ছাড়া অন্য কোন মোজার উপর মাসাহ চলে না- এ মন্তব্য ঠিক নয়।
ওযূর পর আকাশের দিকে তাকিয়ে দু‘আ পড়া যাবে না:
ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,
مَنْ تَوَضَّأَ فَأَحْسَنَ الْوُضُوْءَ، ثُمَّ رَفَعَ نَظَرَهُ إِلَى السَّمَاءِ، فَقَالَ: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ، فُتِحَتْ لَهُ ثَمَانِيَةُ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ يَدْخُلُ مِنْ أَيِّهَا شَاءَ.
‘যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে ওযূ করল, অতঃপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, আশহাদু আল্লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ্দাহু লা- শারীকা লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহ, তাহলে তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খোলা হয় সে যে কোন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে’।[2] হাদীছটি যঈফ।[3] তবে যে হাদীছে আকাশের দিকে তাকানোর কথা নেই, শুধু সুন্দর করে ওযূ করে উক্ত দু‘আ পড়ার কথা এসেছে, সেই হাদীছ ছহীহ।[4]
ওযূর পর সূরা ক্বদর পড়া যাবে না :
ওযূর পর সূরা ক্বদর পড়ার হাদীছের কোন ভিত্তি নেই।[5] অন্য এক হাদীছে এসেছে,
من قرأ في إثر وضوئه : { إنا أنزلناه في ليلة القدر } مرة واحدة كان من الصديقين ومن قرأها مرتين كتب في ديوان الشهداء ومن قرأها ثلاثا حشره الله محشر الأنبياء.
‘যে ব্যক্তি ওযূর পর সূরা ক্বদর একবার পড়বে সে সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। যে ব্যক্তি দু’বার পড়বে, শহীদের তালিকায় তার নাম লিখা হবে। আর যে ব্যক্তি তা তিনবার পড়বে, আল্লাহ তাকে নবীগণের সাথে ক্বিয়ামতের মাঠে একত্রিত করবেন’। হাদীছটি জাল।[6]
রক্ত বের হলে ওযূ ভাঙ্গে না :
বাকর ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,رَأَيْتُ ابْنَ عُمَرَ عَصَرَ بَثْرَةً فِيْ وَجْهِهِ فَخَرَجَ شَيْءٌ مِنْ دَمٍ فَحَكَّهُ بَيْنَ أُصْبُعَيْهِ ثُمَّ صَلَّى وَلَمْ يَتَوَضَّأْ ‘আমি ইবনে ওমর (রাঃ)-কে দেখেছি, তিনি তার মুখে উঠা ফোড়ায় চাপ দিলেন। ফলে, কিছু রক্ত বের হল। তখন তিনি আঙ্গুলের মাঝে মুছে দিলেন। তারপর তিনি ছালাত আদায় করলেন, ওযূ করলেন না’।[7] আব্দুল্লাহ ইবনু আবী আউফা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি একদা তার ছালাতের মাঝে রক্তথুথু ফেললেন, তারপরও তিনি ছালাতে বহাল থাকলেন।[8] রক্ত বের হলে ওযূ করতে হবে মর্মে কোন ছহীহ হাদীছ নেই, রক্ত কম হোক বা বেশী হোক।[9]
বমি হলে ওযূ ভাঙ্গে না :
বমি হলে ওযূ ভেঙ্গে যায় মর্মে বর্ণিত হাদীছ আমলযোগ্য নয়। আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,
مَنْ أَصَابَهُ قَيْءٌ أَوْ رُعَافٌ أَوْ قَلَسٌ أَوْ مَذْيٌ، فَلْيَنْصَرِفْ، فَلْيَتَوَضَّأْ ثُمَّ لِيَبْنِ عَلَى صَلَاتِهِ، وَهُوَ فِي ذَلِكَ لَا يَتَكَلَّمُ.
‘ছালাতের মধ্যে কারো যদি বমি হয় অথবা নাক থেকে রক্ত ঝরে বা মুখ দিয়ে খাদ্যদ্রব্য বের হয় কিংবা মযী নির্গত হয়, তাহলে সে যেন ফিরে যায় এবং ওযূ করে। এরপর পূর্ববর্তী ছালাতের উপর ভিত্তি করে ছালাত আদায় করে। আর এই সময়ে সে কোন কথা বলবে না’।[10] হাদীছটি যঈফ।[11] যায়েদ ইবনে আলী তার পিতার মধ্যস্থতায় তার দাদা হতে বর্ণনা করেন, তার দাদা বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,الْقَلْسُ حَدَثٌ ‘বমি অপবিত্র’।[12] হাদীছটি যঈফ।[13]
ওযূ থাকা সত্ত্বেও ওযূ করলে ১০টি নেকী হয় প্রমাণে হাদীছটি যঈফ :
আবু গুত্বাইফ আল-হুযালী (রহঃ) বলেছেন, একদা আমি আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ)-এর নিকট ছিলাম। যখন যোহরের আযান দেয়া হল, তখন তিনি ওযূ করলেন এবং ছালাত আদায় করলেন। অতঃপর যখন আছরের আযান দেয়া হল, তখনও ওযূ করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ تَوَضَّأَ عَلَى طُهْرٍ كَتَبَ اللهُ لَهُ عَشْرَ حَسَنَاتٍ ‘যে ওযূ অবস্থায় ওযূ করবে, আল্লাহ তাকে ১০টি নেকী দিবেন’।[14]
ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,
مَنْ تَوَضَّأَ وَاحِدَةً فَتِلْكَ وَظِيْفَةُ الْوُضُوْءِ الَّتِي لَا بُدَّ مِنْهَا، وَمَنْ تَوَضَّأَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُ كِفْلَانِ، وَمَنْ تَوَضَّأَ ثَلَاثًا فَذَلِكَ وُضُوْئِيْ، وَوُضُوْءُ الْأَنْبِيَاءِ قَبْلِيْ.
‘যে ব্যক্তি একবার করে ওযূ করবে, সে ব্যক্তি ওযূর নিয়ম পালন করল- যা তার জন্য আবশ্যক ছিল। যে ব্যক্তি দু’বার করে ধৌত করবে, সে দ্বিগুণ ছওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি তিনবার করে ধৌত করবে, তার ওযূ আ মার ও আমার পূর্বের নবীগণের ওযূর ন্যায় হল’।[15]
উছমান (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি,
لاَ يُسْبِغُ عَبْدٌ الْوُضُوْءَ إِلاَّ غَفَرَ اللهُ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ.
‘কোন বান্দা যখন উত্তমরূপে ওযূ করে, তখন আল্লাহ তার সামনের ও পিছনের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেন’।[16]
তায়াম্মুমের সময় একবার হাত মারতে হবে এবং কব্জি পর্যন্ত মাসাহ করতে হবে :
পবিত্র হওয়ার জন্য মনে মনে নিয়ত করে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে মাটিতে দুই হাত একবার মারবে, তারপর ফুঁক দিয়ে ঝেড়ে ফেলে প্রথমে মুখ, তারপর দু’হাত কব্জি পর্যন্ত একবার মাসাহ করতে হবে।
عَنْ عَمَّارٍ قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ فَقَالَ إِنِّىْ أَجْنَبْتُ فَلَمْ أُصِبِ الْمَاءَ فَقَالَ عَمَّارُ بْنُ يَاسِرٍ لِعُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ أَمَا تَذْكُرُ أَنَّا كُنَّا فِىْ سَفَرٍ أَنَا وَأَنْتَ فَأَمَّا أَنْتَ فَلَمْ تُصَلِّ وَأَمَّا أَنَا فَتَمَعَّكْتُ فَصَلَّيْتُ فَذَكَرْتُ لِلنَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّمَا كَانَ يَكْفِيْكَ هَكَذَا فَضَرَبَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِكَفَّيْهِ الأَرْضَ وَنَفَخَ فِيْهِمَا ثُمَّ مَسَحَ بِهِمَا وَجْهَهُ وَكَفَّيْهِ.
আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি ওমর (রাঃ)-এর নিকট আসলেন এবং বললেন, আমি নাপাক হলাম, কিন্তু পানি পেলাম না। এ সময় আম্মার ওমর (রাঃ)-কে বললেন, আপনার কি স্মরণ নেই যে, এক সফরে আমি আর আপনি ছিলাম এবং উভয়ে নাপাক হয়েছিলাম, কিন্তু আপনি পানির অভাবে ছালাত আদায় করেননি। আর আমি মাটিতে গড়াগড়ি দিলাম এবং ছালাত আদায় করলাম। অতঃপর একসময় আমি এ ঘটনা নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে পেশ করলাম। তিনি বললেন, ‘তোমার জন্য এরূপ করাই যথেষ্ট ছিল। এ কথা বলে নবী করীম (ছাঃ) আপন দুই হাতের তালু মাটির উপর মারলেন এবং উভয় হাতে ফুঁক দিলেন। তারপর দুই হাত দিয়ে মুখ মাসাহ করলেন, তারপর দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত মাসাহ করলেন’।[17]
তায়াম্মুমের সময় দুইবার হাত মারা যাবে না এবং কনুই পর্যন্ত মাসাহ করা চলবে না :
ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন, التَّيَمُّمُ ضَرْبَتَانِ ضَرْبَةٌ لِلْوَجْهِ، وَضَرْبَةٌ لِلْيَدَيْنِ إِلَى الْمِرْفَقَيْنِ ‘তায়াম্মুমে দুইবার হাত মারতে হবেঃ একবার মুখম-ল মাসাহ্র জন্য এবং আরেকবার কনুই পর্যন্ত উভয় হাত মাসাহ্র জন্য’।[18] হাদীছটি যঈফ।[19]
অন্য হাদীছে এসেছে,
نَافِعٌ قَالَ: انْطَلَقْتُ مَعَ ابْنِ عُمَرَ فِيْ حَاجَةٍ إِلَى ابْنِ عَبَّاسٍ فَقَضَى ابْنُ عُمَرَ حَاجَتَهُ فَكَانَ مِنْ حَدِيْثِهِ يَوْمَئِذٍ أَنْ قَالَ: مَرَّ رَجُلٌ عَلَى رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيْ سِكَّةٍ مِنَ السِّكَكِ، وَقَدْ خَرَجَ مِنْ غَائِطٍ أَوْ بَوْلٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِ، فَلَمْ يَرُدَّ عَلَيْهِ حَتَّى إِذَا كَادَ الرَّجُلُ أَنْ يَتَوَارَى فِي السِّكَّة «ضَرَبَ بِيَدَيْهِ عَلَى الْحَائِطِ وَمَسَحَ بِهِمَا وَجْهَهُ، ثُمَّ ضَرَبَ ضَرْبَةً أُخْرَى فَمَسَحَ ذِرَاعَيْهِ، ثُمَّ رَدَّ عَلَى الرَّجُلِ السَّلَامَ» وَقَالَ: «إِنَّهُ لَمْ يَمْنَعْنِي أَنْ أَرُدَّ عَلَيْكَ السَّلَامَ إِلَّا أَنِّيْ لَمْ أَكُنْ عَلَى طُهْرٍ»
নাফে‘ (রাঃ) বলেন, আমি একদা আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ)-এর সাথে তাঁর এক কাজে গিয়েছিলাম। অতঃপর তিনি তার কাজ সমাধা করলেন, সেই দিন তার কথার মধ্যে এ কথা ছিল যে, ‘একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পায়খানা অথবা পেশাব করে বের হচ্ছিলেন, এমন সময় এক ব্যক্তি একটি গলির ভিতর দিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে অতিক্রমকালে সালাম দিলেন। তিনি তার জবাব দিলেন না। লোকটি (অন্য) গলিতে ঢুকে যাওয়ার নিকটবর্তী হলে তিনি তাঁর উভয় হাত দেয়ালে মেরে মুখ মাসাহ করলেন, অতঃপর আবার মারলেন এবং দুই হাত কনুই পর্যন্ত মাসাহ করে সালামের জবাব দিলেন আর বললেন, আমি তখন পবিত্র ছিলাম না বলেই তোমার সালামের জবাব দিইনি’।[20] হাদীছটি যঈফ।[21] অতএব, মাটিতে দুইবার হাত মারা এবং কনুই পর্যন্ত মাসাহ করা যাবে না।
মুছল্লীর ওযূতে ত্রুটি থাকলে ইমামের ক্বিরাআতে ভুল হতে পারে :
মুক্তাদীর ওযূ সুন্দর না হলে ইমামের ক্বিরাআতে ভুল হতে পারে। এর প্রমাণে গ্রহণযোগ্য হাদীছ আছে:
عَنْ شَبِيْبٍ أَبِيْ رَوْحٍ، عَنْ رَجُلٍ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ صَلَّى صَلَاةَ الصُّبْحِ، فَقَرَأَ الرُّوْمَ فَالْتَبَسَ عَلَيْهِ، فَلَمَّا صَلَّى قَالَ: «مَا بَالُ أَقْوَامٍ يُصَلُّوْنَ مَعَنَا لَا يُحْسِنُوْنَ الطُّهُوْرَ، فَإِنَّمَا يَلْبِسُ عَلَيْنَا الْقُرْآنَ أُوْلَئِكَ»
শাবীব আবু রাওহ্ (রহঃ) কোন একজন ছাহাবী থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল (ছাঃ) একদা ফজরের ছালাত আদায় করলেন এবং সূরা রূম পড়লেন। কিন্তু পড়ার মাঝে কিছু গোলমাল হয়। ছালাত শেষে রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘তাদের কী হয়েছে, যারা আমাদের সাথে ছালাত আদায় করে অথচ ভাল করে ওযূ করে না। এরাই আমাদের কুরআর তেলাওয়াতে গোলযোগ সৃষ্টি করে’।[22] হাদীছটি হাসান।[23] আলবানী (রাঃ) প্রথম তাহক্বীক্বে যঈফ বলেছিলেন। দ্বিতীয় তাহক্বীক্বে হাসান বলেছেন। অতএব, মুক্তাদীর ওযূতে ক্রটি হলে ইমামের ক্বিরাআতে ভুল হতে পারে।
মাথার চুলের গোড়ায় নাপাকি থাকবে মনে করে চুল ছোট রাখা ঠিক নয় :
আলী (রাঃ) বলেন, রাসূল (রাঃ) বলেছেন,
مَنْ تَرَكَ مَوْضِعَ شَعْرَةٍ مِنْ جَنَابَةٍ لَمْ يَغْسِلْهَا فُعِلَ بِهَا كَذَا وَكَذَا مِنَ النَّارِ» قَال عَلِيٌّ: فَمِنْ ثَمَّ عَادَيْتُ رَأْسِيْ ثَلَاثًا، وَكَانَ يَجُزُّ شَعْرَهُ.
‘যে ব্যক্তি নাপাকির একচুল পরিমাণ স্থানও ছেড়ে দিবে এবং সে স্থান ধৌত করবে না। তার সাথে আগুনের দ্বারা এই এই আচরণ করা হবে। আলী (রাঃ) বলেন, আমি তখন থেকে আমার মাথার সাথে শত্রুতা করেছি। একথা তিনি তিনবার বললেন। তিনি তার মাথার চুল খুব ছোট করে রাখতেন’।[24] হাদীছটি যঈফ।[25]
আবু আইয়ূব আনছারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন,
الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ، وَالْجُمُعَةُ إِلَى الْجُمُعَةِ، وَأَدَاءُ الْأَمَانَةِ، كَفَّارَةٌ لِمَا بَيْنَهَا» قُلْتُ: وَمَا أَدَاءُ الْأَمَانَةِ، قَالَ: «غُسْلُ الْجَنَابَةِ، فَإِنَّ تَحْتَ كُلِّ شَعَرَةٍ جَنَابَةً»
‘পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত, এক জুম‘আ থেকে অপর জুম‘আ, আমানত আদায় করা- এগুলোর মধ্যবর্তী সময়ের গোনাহের কাফফারা। আমি বললাম, আমানত আদায়ের অর্থ কী? তিনি বললেন, জানাবাত বা বড় নাপাকির গোসল করা। কারণ প্রতিটি পশমের গোড়ায় নাপাকি রয়েছে’।[26] হাদীছটি যঈফ।[27]
অপবিত্র ব্যক্তি ও ঋতুবতী মহিলা কুরআন পড়তে পারে:
ইমাম বুখারী (রাঃ) তাঁর ‘ছহীহ’-এর পবিত্রতা অধ্যায়ে ঋতুবতী মহিলাদের ব্যাপারে একটি অনুচ্ছেদ উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি বলেন,باب تَقْضِى الْحَائِضُ الْمَنَاسِكَ كُلَّهَا إِلاَّ الطَّوَافَ بِالْبَيْتِ ‘ঋতুবতী মহিলা হজ্জের সকল বিধান পালন করবে, তবে কা‘বা ঘর ত্বাওয়াফ করবে না’। তারপর ঋতুবতী মহিলারা কুরআন পড়তে পারে মর্মে বেশ কিছু হাদীছ ও আছার পেশ করেন:
(১) ইবরাহীম (রহঃ) বলেন, لاَ بَأْسَ أَنْ تَقْرَأَ الآيَةَ ‘(ঋতুবতী) কুরআনের আয়াত পড়াতে কোন দোষ নেই’।
(২) لَمْ يَرَ ابْنُ عَبَّاسٍ بِالْقِرَاءَةِ لِلْجُنُبِ بَأْسًا ‘ইবনে আববাস (রাঃ) নাপাক ব্যক্তির জন্য কুরআন তেলাওয়াতকে দোষের কিছু মনে করতেন না’।
(৩) وَكَانَ النَّبِىُّ - صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - يَذْكُرُ اللهَ عَلَى كُلِّ أَحْيَانِهِ ‘নবী করীম (ছাঃ) সব সময় আল্লাহর যিকির করতেন’। আর কুরআন তেলাওয়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ যিকির।
(৪) উম্মু আত্বিইয়্যা (রাঃ) বলেন, كُنَّا نُؤْمَرُ أَنْ يَخْرُجَ الْحُيَّضُ، فَيُكَبِّرْنَ بِتَكْبِيرِهِمْ وَيَدْعُوْنَ ‘ঈদের দিন আমাদেরকে আদেশ করা হত, যেন ঋতুবতী মহিলারা ঈদের মাঠে যাওয়ার জন্য বের হয় যেন তারা তাকবীর পাঠ করে এবং দু‘আ পড়ে’। আর দু‘আ পড়ার জন্য কুরআনের কত আয়াত রয়েছে, যা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ঋতুবতী মহিলারা কুরআন পড়তে পারে।
(৫) ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, أَخْبَرَنِىْ أَبُوْ سُفْيَانَ أَنَّ هِرَقْلَ دَعَا بِكِتَابِ النَّبِىِّ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَرَأَ فَإِذَا فِيْهِ «بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ وَ (يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ)». الآيَةَ. ‘আমাকে আবু সুফিয়ান (রাঃ) সংবাদ দিয়েছেন, রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস নবী করীম (ছাঃ)-এর চিঠি চেয়ে নিলেন এবং তা পড়লেন, তাতে লেখা ছিল এ আয়াতদ্বয়: «بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ وَ (يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ)»। এ দ্বারা প্রমাণিত হয়, অমুসলিম যারা কোন সময় পবিত্র নয়, তারা কুরআন মাজীদ পড়তে পারে।
(৬) জাবের (রাঃ) বলেন, ‘আয়েশা (রাঃ) ঋতুবতী হলেন এবং হজ্জের সব নিয়ম পালন করলেন। তবে ত্বাওয়াফ করলেন না এবং ছালাত আদায় করলেন না’। এ বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আয়েশা (রাঃ) ত্বাওয়াফ এবং ছালাত ব্যতীত সব ইবাদত করতেন। কুরআন তেলাওয়াত তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।
(৭) হাকাম (রাঃ) বলেন, ‘আমি অপবিত্র অবস্থায়ও পশু-প্রাণী যবেহ করি। আর আল্লাহ বলেন, وَلاَ تَأْكُلُوْا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللهِ عَلَيْهِ ‘আর যাতে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি, তা থেকে তোমরা খেও না’। এই হাদীছ দ্বারা বুঝা যায়, ‘বিসমিল্লাহ’ কুরআন মাজীদের আয়াতাংশ, যা অপবিত্র অবস্থায় পড়া যায়।
‘মু‘আল্লাক্ব’ হিসাবে উক্ত আছার ও হাদীছগুলো উল্লেখের পর ইমাম বুখারী নিমেণাক্ত মার‘ফূ হাদীছটি বর্ণনা করেন:
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ خَرَجْنَا مَعَ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لاَ نَذْكُرُ إِلَّا الْحَجَّ فَلَمَّا جِئْنَا سَرِفَ طَمِثْتُ فَدَخَلَ عَلَىَّ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا أَبْكِى فَقَالَ مَا يُبْكِيْكِ قُلْتُ لَوَدِدْتُ وَاللهِ أَنِّى لَمْ أَحُجَّ الْعَامَ قَالَ لَعَلَّكِ نُفِسْتِ قُلْتُ نَعَمْ قَالَ فَإِنَّ ذَلِكَ شَىْءٌ كَتَبَهُ اللهُ عَلَى بَنَاتِ آدَمَ فَافْعَلِىْ مَا يَفْعَلُ الْحَاجُّ غَيْرَ أَنْ لاَ تَطُوْفِى بِالْبَيْتِ حَتَّى تَطْهُرِىْ.
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা একমাত্র হজ্জের উদ্দেশ্যে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে বের হলাম, আমরা সারিফ নামক স্থানে পৌঁছলে আমি ঋতুবতী হয়ে গেলাম। এ সময় নবী করীম (ছাঃ) আমার কাছে আসলেন, তখন আমি কাঁদছিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কাঁদছ কেন? আমি বললাম, আল্লাহর কসম! এ বছর হজ্জ না করাই আমার জন্য ভাল ছিল। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, সম্ভবত তুমি ঋতুবতী হয়েছ? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, এটা তো আল্লাহ আদমের মেয়েদের উপর নির্ধারণ করেছেন। অতএব, তুমি একজন হাজী যা করে, তার সবই করতে থাক, তবে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত কা‘বা ঘরের ত্বাওয়াফ কর না’।[28]
উক্ত হাদীছ প্রমাণ করে যে, ঋতুবতী মহিলারা কুরআন মাজীদ পড়তে পারে। কারণ এখানে ত্বাওয়াফ নিষেধ করা হয়েছে এবং অন্য হাদীছে ছালাত আদায় করা নিষেধ করা হয়েছে। তবে কুরআন তেলাওয়াত করা নিষেধ করা হয়নি, সাথে সাথে অন্যান্য হাজীরা যা করে তা করতে বলা হয়েছে। হাদীছের এই অংশ প্রমাণ করে, ত্বাওয়াফ এবং ছালাত ব্যতীত সব ইবাদত চলবে এবং হাজীদের সাথে তা করতে থাকতে হবে। অন্য বর্ণনায় এসেছে আল্লাহর নবী বললেন, ‘তুমি কর যা হাজীগণ করেন। তবে পবিত্র হওয়া পযমর্ত্ম কা‘বা ঘর ত্বাওয়াফ কর না’।[29]
ঋতুবতী অবস্থায় কুরআন পড়া যাবে না মর্মে হাদীছগুলো যঈফ:
(১) ইবনে ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘ঋতুবতী এবং অপবিত্র ব্যক্তি কুরআনের কোন অংশ পড়বে না’।[30]
(২) আলী (রাঃ) বলেন,كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُقْرِئُنَا القُرْآنَ عَلَى كُلِّ حَالٍ مَا لَمْ يَكُنْ جُنُبًا ‘রাসূল (ছাঃ) অপবিত্র অবস্থা ছাড়া সব সময় আমাদের কুরআন পড়াতেন’।[31]
(৩) আলী (রাঃ) বলেন, إِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، كَانَ يَخْرُجُ مِنَ الخَلَاءِ فَيُقْرِئُنَا الْقُرْآنَ، وَيَأْكُلُ مَعَنَا اللَّحْمَ وَلَمْ يَكُنْ يَحْجُبُهُ - أَوْ قَالَ: يَحْجِزُهُ - عَنِ الْقُرْآنِ شَيْءٌ لَيْسَ الْجَنَابَةَ ‘রাসূল (ছাঃ) পায়খানা হতে বের হয়ে আমাদেরকে কুরআন পড়াতেন এবং আমাদের সাথে গোশত খেতেন। অপবিত্রতা ছাড়া কুরআন পড়া হতে তাঁকে কোন কিছু বাধা দিতে পারত না’।[32]
(চলবে)
[1]. মুসনাদে আহমাদ হা/১৮২৩১; তিরমিযী হা/৯৯; আবুদাঊদ হা/১৫৯; ইবনু মাজাহ হা/৫৫৯; মিশকাত হা/৫২৩; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৮৮।
[2]. মুসনাদে আহমাদ হা/১২১।
[3]. যঈফ আবুদাঊদ ১/৫৭।
[4]. ছহীহ মুসলিম হা/৫৭৬; মিশকাত হা/২৮৯।
[5]. সিলসিলা যঈফাহ হা/৬৮।
[6]. সিলসিলা যঈফাহ হা/১৪৪৯।
[7]. বায়হাক্বী, সুনানে কুবরা, হা/৬৬৭; সিলসিলা যঈফাহ হা/৪৭০, ১/৬৮৩।
[8]. সিলসিলা যঈফাহ হা/৪৭০, ১/৬৮৩।
[9]. দারাকুৎনী হা/৫৭১; মিশকাত হা/৩৩৩, ১/১০৮, টীকা দ্রষ্টব্য; সিলসিলা যঈফাহ হা/৪৭০, ১/৬৮৩।
[10]. ইবনু মাজাহ হা/১২২১।
[11]. যঈফ আবুদাঊদ ১/৬৮।
[12]. দারাকুৎনী হা/৫৭৪, ১/১৬২।
[13]. প্রাগুক্ত।
[14]. আবুদাঊদ হা/৬২; যঈফ জামে‘ ছাগীর হা/৫৫৩৬; মিশকাত হা/২৯৩, হাদীছ যঈফ।
[15]. মুসনাদে আহমাদ হা/৫৭৩৫, হাদীছটি যঈফ।
[16]. মুসনাদে বাযযার হা/৪২২; সিলসিলা যঈফাহ হা/৫০৩৬, হাদীছটি মুনকার।
[17]. ছহীহ বুখারী হা/৩৩৮; মিশকাত হা/৫২৮; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৯৩।
[18]. মু‘জামে কাবীর হা/১৩৩৬৬।
[19]. সিলসিলাহ যঈফা হা/৩৪২৭, ৭/৪৩৩।
[20]. আবুদাঊদ হা/৩৩০; মিশকাত হা/৪৬৬।
[21]. যঈফ আবুদাঊদ ১/১৩৬।
[22]. নাসাঈ হা/৯৪৭।
[23]. দ্রষ্টব্য : আছলু ছিফাতি ছালাতিন নাবী ২/৪৪০।
[24]. আবুদাঊদ হা/২৪৯।
[25]. যঈফ আবুদাঊদ হা/৩৮।
[26]. ইবনু মাজাহ হা/৫৯৮।
[27]. সিলসিলাহ যঈফাহ হা/৩৮০১।
[28]. ছহীহ বুখারী হা/৩০৫, ১/৬৮; ছহীহ মুসলিম হা/১২১১; মিশকাত হা/২৫৭২।
[29]. ছহীহ বুখারী হা/৮৬, ৮৯, ৯১, ৯২।
[30]. আবুদাঊদ, তিরমিযী, ইরওয়া হা/১৯২।
[31]. তিরমিযী হা/১৪৬, হাদীছটি যঈফ।
[32]. আবুদাঊদ হা/২২৯, হাদীছটি যঈফ।
