মানুষ আজ এক অদৃশ্য অন্ধকারের গোলকধাঁধায় আবদ্ধ। চারিদিকে আলোর ঝলকানি থাকলেও অন্তর ক্রমশ অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে। দিশাহীন এক যাত্রায় সে কোথায় ছুটে যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, তার পরিণতি কী হতে পারে; সে বিষয়ে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ঈমান ও আমলের হিসাব তার কাছে এখন গৌণ বিষয়। পরকালের জবাবদিহিতার ভয় যেন হৃদয় থেকে মুছে গেছে। সময় থেমে নেই, বছর শেষে বছর আসে, ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায়; কিন্তু বদলায় না মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, বদলায় না আত্মার অভিমুখ।
বছরের শেষ প্রান্তে এসে সমাজের একটি বড় অংশ ব্যস্ত হয়ে পড়ে তথাকথিত নববর্ষ উদযাপনে। বর্ণিল আলোকসজ্জা, উচ্চ শব্দ, উচ্ছ্বাস আর শুভেচ্ছার জোয়ারে ডুবে যায় চারপাশ। নতুন বছর এলেই তারা এক ধরনের আত্মবিস্মৃত আনন্দে মেতে ওঠে। কিন্তু খুব কম মানুষই একবার থেমে ভেবে দেখে, নববর্ষ পালন আদৌ যৌক্তিক কিনা? এই উদযাপন কি আমাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করছে, নাকি আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে?
নতুন বছরের আগমনে তারা রচনা করে স্বপ্নের মিনার, আঁকে সুখের কল্পচিত্র। অথচ বিগত বছরের ভুল, গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের জন্য নেই কোনো অনুশোচনা। তাদের নেই আত্মসমালোচনার তাগিদ, নেই সংশোধনের দৃঢ় সংকল্প। মুখে শুধু একটাই বুলি ‘শুভ নববর্ষ’। কিন্তু প্রশ্ন হলো কার জন্য এই শুভকামনা? কোন মানদণ্ডে এই শুভকামনা নির্ধারিত?
নববর্ষকে ঘিরে সমাজে এক গভীর ভ্রান্ত বিশ্বাস গড়ে উঠেছে যে, এ দিনে নাকি পৃথিবী নতুন সাজে সেজে ওঠে, সৌভাগ্যের দুয়ার খুলে যায়, বছরের শুরু ভালো হলে পুরো বছর সুখের হবে। এই বিশ্বাস নিছক ভুল ধারণা নয়, বরং আক্বীদাগত বিচ্যুতি। কেননা সময় নিজে কোনো কল্যাণ বা অকল্যাণের ক্ষমতা রাখে না। সময় আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি, তাঁরই হুকুমে তা আবর্তিত হয়।
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رضي الله عنه قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ يُؤْذِيْنِي ابْنُ آدَمَ يَسُبُّ الدَّهْرَ وَأَنَا الدَّهْرُ بِيَدِي الْأَمْرُ أُقَلِّبُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ.
আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ বলেন, আদম সন্তানেরা আমাকে কষ্ট দেয়, তারা যামানাকে গালি দেয়; অথচ আমিই যামানা। আমার হাতেই সকল ক্ষমতা, রাত ও দিন আমিই পরিবর্তন করি’।[1] অর্থাৎ সময়ের ভালো-মন্দ নির্ধারণকারী আল্লাহ, সময় নিজে নয়।
নববর্ষে ধরণী নাকি জীর্ণতা ঝেড়ে ফেলে- এই বিশ্বাসে ব্যর্থতা ও পরাজয়ের গ্লানি ভুলে মানুষ বিজাতীয় ও দেশীয় সংস্কৃতির অনুসরণে নেচে গেয়ে মেতে উঠবে ইসলামে এমন কোনো ধারণার অস্তিত্ব নেই। বরং নির্দিষ্ট কোনো দিন বা সময়কে শুভ বা অশুভ মনে করাই কুসংস্কার।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لاَ عَدْوَى وَلاَ هَامَةَ وَلاَ نَوْءَ وَلاَ صَفَرَ.
আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সংক্রামক ব্যাধি, কুলক্ষণে প্যাঁচা, নক্ষত্র (প্রভাবে বর্ষণ) ও (ক্ষুধায় পেট কামড়ানো) পোকা- এসবের কোনো অস্তিত্ব নেই’।[2]
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামে নববর্ষের কোনো বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদা নেই। এটি অন্যান্য সাধারণ দিনের মতোই একটি দিন মাত্র। এ কারণেই ছাহাবায়ে কেরাম, খুলাফায়ে রাশেদীন কিংবা পরবর্তী যুগের কোনো প্রসিদ্ধ ইমাম বা মুহাদ্দিছকে নববর্ষ উদযাপন করতে দেখা যায় না। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ জন্মদিন, হিজরতের দিন, নবুঅত প্রাপ্তির দিন এমনকি তাঁর ইন্তিকালের দিনও কখনো পালন করেননি। শুধু পালনই নয়, এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনাও তিনি রেখে যাননি। কারণ ইসলামে নতুন কোনো আমল বা বিশ্বাস সংযোজন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ.
আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীনে এমন কিছু সংযোজন করবে যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত’।[3] এই নীতির আলোকেই উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু হিজরী সনের প্রবর্তন করলেও নববর্ষ উদযাপনের কোনো প্রথা চালু করেননি।
বাস্তবতায় আজকের নববর্ষ উদযাপন কেবল একটি নিরীহ সামাজিক আয়োজন নয়, বরং এটি বেহায়াপনার সর্বনিম্ন সীমায় নেমে যাওয়ার নামান্তর। রাত বারোটার পর তথাকথিত থার্টি ফার্স্ট নাইট, ব্যান্ড পার্টির কোলাহল, গান-বাজনা, আতশবাজি ও পটকার শব্দে পরিবেশ দূষণ, নাচ-গানে উন্মত্ততা, ব্যভিচারের উন্মুক্ত দরজা সবকিছু মিলিয়ে এক ভয়াবহ নৈতিক বিপর্যয়ের চিত্র ফুটে উঠে। এসব কাজ ইসলামে সুস্পষ্টভাবে হারাম।
এর চেয়েও ভয়ংকর দিক হলো নারীর নগ্ন বা অর্ধনগ্ন উপস্থাপন। সৌন্দর্য প্রদর্শনের নামে নারীকে পুরুষের পাশে দাঁড় করিয়ে যেনা ও ব্যভিচারকে সহজলভ্য করে তোলা।
عَنْ أُسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاء.
উসামা ইবনে যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমি পুরুষদের জন্য নারীর চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কোনো ফেতনা রেখে যাইনি’।[4]
বিধর্মীরা ইসলামের বিধান অস্বীকার করলে তাতে ইসলামের কিছু আসে যায় না; কিন্তু মুসলিম সমাজ যখন তাদের ভ্রান্ত চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতি নির্বিচারে গ্রহণ করে, তখন ঈমান মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে। এর ফলশ্রুতিতে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। আজ আমরা ঠিক সেই বাস্তবতাই প্রত্যক্ষ করছি। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মুসলিমদের একটি বড় অংশ দুনিয়ার উন্নতি ও ভোগকেই জীবনের সাফল্য মনে করে। তারা মনে করে যে, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ এবং লাগামহীন জীবনেই নাকি সুখ রয়েছে। অথচ একজন মুসলিমের জীবন কখনোই লাগামহীন নয়, বরং তার জীবন নিয়ন্ত্রিত এবং আল্লাহর বিধানের শাসনে আবদ্ধ।
রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার প্রবৃত্তি আমার আনীত বিধানের অনুগত হয়’।[5]
শয়তান মানুষের সামনে অবাধ স্বাধীনতার মোড়ক দিয়ে সীমাহীন ভোগ-বিলাসকে আকর্ষণীয় করে তোলে। সে ফিসফিস করে বলে, আবদ্ধ জীবন কষ্টদায়ক, ধর্ম মানা মানেই পশ্চাৎপদতা। অথচ বাস্তবতা হলো যেখানে জীবন নিজেই অনিশ্চিত, সেখানে সীমাহীন স্বপ্ন আর বিলাসিতার আহ্বান এক নির্মম প্রতারণা বৈ কিছুই নয়। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সতর্ক করে বলেছেন,حُفَّتِ الْجَنَّةُ بِالْمَكَارِهِ، وَحُفَّتِ النَّارُ بِالشَّهَوَاتِ ‘জান্নাতকে কষ্টকর বিষয় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে আর জাহান্নামকে প্রবৃত্তি ও লালসা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে’।[6]
অতএব, নববর্ষ আমাদের জন্য উচ্ছ্বাসের উপলক্ষ নয়; বরং আত্মসমালোচনার সুযোগ। আমাদের উচিত হলো বিগত বছরের হিসাব নেওয়া, ভুল থেকে ফিরে আসা, পরিবার ও সন্তানদের ঈমানী পরিবেশে গড়ে তোলা এবং আল্লাহর বিধানের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়া। কারণ সময় চলে যায়, কিন্তু হিসাব থেকে যায়। আজ যদি আমরা সচেতন না হই, আগামীকাল আফসোস ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হেদায়াত দান করুন, ক্ষমা করুন এবং সত্যের উপর অবিচল থাকার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
খাশিউর রহমান বিন মনছূর আলী
দাওরায়ে হাদীছ ফারেগ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৮২৬।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৬৮৭।
[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৩৮৪।
[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৯৬।
[5]. আস-সুন্নাহ, হা/১৫।
[6]. ছহীহ বুখারী, হা/২৫৫৯।
