(জানুয়ারী’১৯ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)
(১১) এ মর্মে বিশ্বাস স্থাপন করা যে, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালবাসা ওয়াজিব :
মহান আল্লাহ বলেন,قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللهَ فَاتَّبِعُوْنِيْ يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ وَاللهُ غَفُوْرٌ رَحِيْمٌ ‘বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস (তাঁর ভালবাসা পেতে চাও), তবে আমার অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন ও তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। মহান আল্লাহ তো ক্ষমাশীল ও দয়ালু’ (আলে ইমরান, ৩/৩১)। আলোচ্য আয়াতটি ঐ সকল ব্যক্তির দাবীর খণ্ডন করে, যে সমস্ত ব্যক্তিরা আল্লাহকে ভালবাসার দাবী করে, অথচ সে দাবীটি মুহাম্মাদী ত্বরীকার উপর নয়, তাহলে তাদের নিজের দাবীটি মিথ্যা বলে গণ্য হবে, যতক্ষণ না তাদের সকল কাজ-কর্ম, কথা-বার্তা, চাল-চলন মুহাম্মাদী শরী‘আতের অনুসরণে হবে।[1]
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُوْنَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِيْنَ ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সকল মানুষ অপেক্ষা অধিক প্রিয় হই’।[2] আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
ثَلاَثٌ مَنْ كُنَّ فِيْهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الإِيْمَانِ أَنْ يَكُوْنَ اللهُ وَرَسُوْلُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُوْدَ فِى الْكُفْرِكَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِى النَّارِ .
‘তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে, সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে: (১) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার নিকট অন্য সকল কিছু হতে অধিক প্রিয় হওয়া (২) কাউকে একমাত্র আল্লাহ্র জন্যই ভালবাসা এবং (৩) কুফরীতে প্রত্যাবর্তনকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হবার মত অপসন্দ করা’।[3]
عَنْ أَنَسٍ أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ السَّاعَةِ فَقَالَ مَتَى السَّاعَةُ قَالَ وَمَاذَا أَعْدَدْتَ لَهَا قَالَ لاَ شَىْءَ إِلَّا أَنِّىْ أُحِبُّ اللهَ وَرَسُوْلَهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ.
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেন, ক্বিয়ামত কখন হবে? তিনি বললেন, তুমি ক্বিয়ামতের জন্য কী জোগাড় করেছ? তিনি বললেন, কোন কিছুই জোগাড় করতে পারিনি, তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসি। তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যাকে ভালবাস, তার সাথেই তোমার হাশর হবে।[4]
(১২) এ মর্মে বিশ্বাস স্থাপন করা যে, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মান-মর্যাদা দেওয়া ওয়াজিব :
মহান আল্লাহ বলেন,لِتُؤْمِنُوْا بِاللهِ وَرَسُوْلِهِ وَتُعَزِّرُوْهُ وَتُوَقِّرُوْهُ وَتُسَبِّحُوْهُ بُكْرَةً وَأَصِيْلًا ‘যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনো এবং তাকে সাহায্য কর ও সম্মান প্রদর্শন কর; সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহ্র পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর’ (ফাতহ, ৪৮/৯)। অন্যত্র তিনি বলেন, فَالَّذِيْنَ آمَنُوْا بِهِ وَعَزَّرُوْهُ وَنَصَرُوْهُ ‘সুতরাং তার (রাসূলের) প্রতি যারা ঈমান আনে, তাকে সম্মান ও সাহায্য সহানুভূতি করে’ (আ‘রাফ, ৭/১৫৭)।
মানবজাতির করণীয় হল, কুরআন ও সুন্নাহকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্মান করা, এ বিষয়ে ইয়াহূদী-খ্রীস্টানদের ন্যায় বাড়াবাড়ি না করা, কবর পূজা না করা, মহান আল্লাহ তাকে যে শরী‘আত দিয়েছেন, সে শরী‘আতের অনুসরণ করা। মহান আল্লাহ বলেন,لَا تَجْعَلُوْا دُعَاءَ الرَّسُوْلِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُمْ بَعْضًا ‘রাসূলের আহবানকে তোমরা একে অপরের প্রতি আহবানের মত গণ্য কর না’ (নূর, ২৪/৬৩)। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হে মুহাম্মাদ! হে আবুল কাসেম! বলে ডাকা হত, এভাবে ডাকতে মহান আল্লাহ নিষেধ করেছেন; বরং সম্মানের সাথে ডাকতে বলা হয়েছে, যেমন করে ডাকলে তার মান-মর্যাদা ঠিক থাকে, হে আল্লাহ্র রাসূল, হে আল্লাহ্র নবী।[5]
ইবাদতের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর প্রমাণ পাওয়া গেলে, আল্লাহ ও তার রাসূলের কথা মাথা পেতে মেনে নিতে হবে। সালাফে ছালেহীনের পথ ধরতে হবে, কোন মাযহাবী গোঁড়ামি চলবে না। মহান আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا لَا تُقَدِّمُوْا بَيْنَ يَدَيِ اللهِ وَرَسُوْلِهِ ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহ ও তার রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রগামী হয়ো না’ (হুজুরাত, ৪৯/১)। রাসূলের কণ্ঠস্বরের উপর কণ্ঠস্বর উঁচু করে কথা বলাও সম্পূর্ণভাবে নিষেধ। মহান আল্লাহ বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا لَا تَرْفَعُوْا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ ‘তোমরা নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কণ্ঠস্বরের উপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু কর না’ (হুজুরাত, ৪৯/২)।
সুধী পাঠক! এটাই হল আল্লাহ ও তার রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে উত্তম আদব, রাসূলের সম্মান-মর্যাদা দেওয়া, আল্লাহ্র উপর ঈমান আনা এবং তার রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা, আল্লাহ্র আদেশ মত চলা, তার নিষেধকৃত কাজ-কর্ম থেকে দূরে থাকা। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের অনুসরণ করা, তার দেখানো পদ্ধতি জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা, আল্লাহ ও তার রাসূলের আগে বেড়ে কোন কথা না বলা, যেটা যেভাবে বলা হয়েছে, সেটা ঠিক সেভাবেই বলা, যেভাবে আদেশ করা হয়েছে ঠিক সেভাবেই পালন করা। মূলত এগুলোই হল আল্লাহ ও তার রাসূলের সাথে প্রকৃত আদব এবং আদায়কৃত ওয়াজিব বিষয়সমূহ। এটাই হল মানবজাতির ইহকাল ও পরকালে কল্যাণকর বিষয়।[6]
(১৩) ব্যক্তির দ্বীন কমতে কমতে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া কিংবা তার নিকটবর্তী হওয়া কুফরী থেকে অনেক উত্তম :
আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,ثَلاَثٌ مَنْ كُنَّ فِيْهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الْإِيْمَانِ أَنْ يَكُوْنَ اللهُ وَرَسُوْلُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُوْدَ فِى الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِى النَّارِ ‘তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে, সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে। (এক) আল্লাহ ও তার রাসূল তার নিকট অন্য সকল কিছু হতে অধিক প্রিয় হওয়া। (দুই) কাউকে একমাত্র আল্লাহ্র জন্যই ভালবাসা। (তিন) কুফরীতে প্রত্যাবর্তনকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার থেকে অধিক অপসন্দ করা’।[7]
(১৪) ইলম অন্বেষণ করা :
মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّمَا يَخْشَى اللهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ ‘আল্লাহ্র বান্দাদের মধ্যে যারা আলেম, তারাই তাকে বেশী ভয় করে’ (ফাতির, ৩৫/২৮)। তিনি আরো বলেন, شَهِدَ اللهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُوْلُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيْزُ الْحَكِيْمُ ‘আল্লাহ সাক্ষ্য প্রদান করেন যে, নিশ্চয় তিনি ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই এবং ফেরেশতাগণ, ন্যায়নিষ্ঠ বিদ্বানগণও (সাক্ষ্য প্রদান করেন)। তিনি ব্যতীত অন্য কোন সত্য মা‘বূদ নেই, তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’ (আল ইমরান, ৩/১৮)। অন্যত্র তিনি বলেন,وَأَنْزَلَ اللهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللهِ عَلَيْكَ عَظِيْمًا ‘আল্লাহ আপনার প্রতি গ্রন্থ ও বিজ্ঞান অবতীর্ণ করেছেন এবং আপনি যা জানতেন না, তিনি তা আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন এবং আপনার প্রতি আল্লাহ্র অসীম করুণা রয়েছে’ (নিসা, ৪/১১৩)।
মানবজাতি দুনিয়া ও পরকাল উভয় জীবনে কল্যাণ লাভ করবে, যদি তারা আল্লাহ্র প্রতি ঈমান আনে, ইলম অর্জন করে ও রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণের মাধ্যমে জীবন-যাপন করে। মহান আল্লাহ বলেন, الَّذِيْنَ آمَنُوْا مِنْكُمْ وَالَّذِيْنَ أُوْتُوْا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে উচ্চ মর্যাদা দান করবেন’ (মুজাদালাহ, ৫৮/১১)।
কুরআন-সুন্নাহ সম্পর্কে যারা জ্ঞান রাখেন আর যারা জ্ঞান রাখেন না, তারা কখনো সমান নয়। অনুরূপভাবে যারা কুরআন-সুন্নাহ বুঝে-শুনে আমল করে আর যারা করে না, তারাও কখনো সমান হতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন, قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِيْنَ يَعْلَمُوْنَ وَالَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُوْلُو الْأَلْبَابِ ‘বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান? বোধশক্তি সম্পন্ন লোকেরাই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে’ (যুমার, ৩৯/৯)। অতএব হে মানবজাতি! নিজে কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞানার্জন কর এবং সন্তান-সন্ততিদেরকেও শিক্ষা দাও।
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আছ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি,إِنَّ اللهَ لَا يَقْبِضُ الْعِلْمَ انْتِزَاعًا يَنْتَزِعُهُ مِنَ الْعِبَادِ وَلَكِنْ يَقْبِضُ الْعِلْمَ بِقَبْضِ الْعُلَمَاءِ حَتَّى إِذَا لَمْ يُبْقِ عَالِمًا اتَّخَذَ النَّاسُ رُءُوْسًا جُهَّالًا فَسُئِلُوْا فَأَفْتَوْا بِغَيْرِ عِلْمٍ فَضَلُّوْا وَأَضَلُّوْا ‘আল্লাহ তার বান্দাদের অন্তর থেকে ইলম উঠিয়ে নেন না। কিন্তু আলেম উঠিয়ে নেয়ার মাধ্যমে ইলম উঠিয়ে নেন। যখন কোন আলেম অবশিষ্ট থাকবে না, তখন লোকেরা মুর্খদেরকেই নেতা বানিয়ে নিবে। তাদের জিজ্ঞেস করা হলে না জানলেও তারা ফতওয়া প্রদান করবে। ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যকেও পথভ্রষ্ট করবে’।[8]
(১৫) ইলম প্রচার করা :
কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান অর্জনকারীদের বসে থাকলে চলবে না। সর্বাগ্রে নিজের জীবনে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, শিরক-বিদ‘আত ও সকল অন্যায়-অপকর্ম থেকে দূরে থাকতে হবে। এরপর দাওয়াতী কাজ শুরু করতে হবে। এক্ষেত্রে নিজের পরিবার থেকে সন্তান-সন্ততি, নিজের স্ত্রী, মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর সকলের মাঝে কুরআন-সুন্নাহর বাণী পৌঁছাতে হবে। আমলে বাস্তবায়নের প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। তাওহীদ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। নিজেকে, পরিবারকে, আত্মীয়-স্বজনকে ও এলাকাবাসীকে বাঁচাতে তাদের সকলের মাঝে দাওয়াতী কাজ করতে হবে। এমনি করে দেশবাসী সহ সারা বিশ্বে ইলম প্রচারের মহতী কাজ আঞ্জাম দিতে হবে। ইলম প্রচারের ক্ষেত্রে ছাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে ছালেহীনের পথ অনুসরণ করতে হবে। নিজেদের মনগড়া কোন পথ-পদ্ধতির মাধ্যমে নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُوْنَهُ ‘তোমরা নিশ্চয় এটা লোকদের মধ্যে ব্যক্ত করবে (ইলম লোকদের মাঝে প্রচার-প্রসার করবে) এবং তা গোপন করবে না’ (আল ইমরান, ৩/১৮৭)। অতএব আলেমগণের উচিত হবে, তাদের নিকট যে কল্যাণকর জ্ঞান রয়েছে, তা নিজে আমল করা, মানবজাতির মাঝে প্রচার করা, অন্যদের সৎ আমল করার জন্য উৎসাহিত করা এবং এ ব্যাপারে কোন জ্ঞান গোপন না করা।[9]
সুধী পাঠক! মানুষকে আক্বীদা সংশোধনের দাওয়াত দেওয়া, শিরক-বিদ‘আত থেকে দূরে থাকার আহবান করা, সৎ আমল করার, অন্যায় থেকে বেঁচে থাকার, রাসূলের চরিত্র নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করে সেদিকে ডাকা, হালাল ব্যবসা বাণিজ্য করার প্রতি জোরালো আহবান জানানো, সূদ-ঘুষ খাওয়া থেকে দূরে থাকার প্রতি আহবান করা। সর্বদা সত্য কথা বলা, মিথ্যা পরিহার করা, আমানত রক্ষা করা, খিয়ানত করা থেকে দূরে থাকা, জান্নাতের পথে ডাকা, জাহান্নাম থেকে দূরে থাকার আহবান করা, সকল সৎ কর্মের দিকে ও অন্যায় থেকে দূরে থাকার আহবান করা, ছাত্রদের মাঝে কুরআন-সুন্নাহর সঠিক বুঝ দেওয়া, সালাফে ছালেহীনের পথ অনুসরণ করতে বলা এভাবে ইলম প্রচার করা ও দাওয়াতী কাজ করা। মহান আল্লাহ বলেন,وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُوْنَ لِيَنْفِرُوْا كَافَّةً فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوْا فِي الدِّيْنِ وَلِيُنْذِرُوْا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوْا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُوْنَ ‘আর মুমিনদের এটাও সমীচীন নয় যে, (জিহাদের জন্য) তারা সবাই একত্রে বের হয়ে পড়বে। সুতরাং এমন কেন করা হয় না যে, তাদের প্রত্যেকটি বড় দল হতে এক একটি ছোট দল বের হবে, যাতে তারা ধর্মজ্ঞান অর্জন করতে পারে, আর যাতে তারা নিজ সম্প্রদায়কে (নাফরমানী অন্যায় অপকর্ম হতে) ভয় প্রদর্শন করতে পারে, যখন তারা ওদের নিকট প্রত্যাবর্তন করে, যেন তারা সতর্ক হয়’ (তওবা, ৯/১২২)।
সুধী পাঠক! একজন মানুষ জ্ঞানার্জন করে তার সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে গেলে তাদের মাঝে সে ইসলামের সঠিক জ্ঞান দান করতে পারবে, শিরক-বিদ‘আত থেকে দূরে রাখতে পারবে, এর ভয়াবহতা সম্পর্কে জানাতে পারবে, জান্নাতের সুসংবাদ দান করবে, জাহান্নামের ভয়াবহতা সম্পর্কে ভয় দেখাবে, ইসলামের বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা সম্পর্কে শিক্ষাদান করতে পারবে।[10] রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনার খুৎবায় বলেন,
فَإِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ بَيْنَكُمْ حَرَامٌ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِىْ شَهْرِكُمْ هَذَا فِىْ بَلَدِكُمْ هَذَا لِيُبَلِّغِ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ فَإِنَّ الشَّاهِدَ عَسَى أَنْ يُبَلِّغَ مَنْ هُوَ أَوْعَى لَهُ مِنْهُ.
‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন-সম্পদ, তোমাদের সম্মান তোমাদের পরস্পরের জন্য হারাম, যেমন আজকের তোমাদের এ দিন, তোমাদের এ মাস, তোমাদের এ শহর মর্যাদা সম্পন্ন। অতএব এখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা (আমার এ বাণী) যেন অনুপস্থিত ব্যক্তিদের নিকট পৌঁছে দেয়। কারণ উপস্থিত ব্যক্তি সম্ভবত এমন এক ব্যক্তির নিকট পৌঁছাবে, যে এ বাণীকে তার চেয়ে অধিক আয়ত্ত্বে রাখতে পারবে’।[11]
মোদ্দাকথা, ইলম অর্জনে, জ্ঞান প্রচার-প্রসারে, আল্লাহ্র পথে দাওয়াতী কাজে সর্বপ্রথম নিয়্যত বা ইখলাছ বিশুদ্ধ করতে হবে। এর নেকী আল্লাহ্র নিকট চাইতে হবে, মানুষকে দেখানোর জন্য নয়, মানুষের সন্তুষ্টির জন্য নয়, দ্বীনের খেদমত করে পরকালে নাজাতের জন্য এবং সর্বোপরি আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে যেতে হবে। যার প্রতিদান মহান আল্লাহ দিবেন।
মহান আল্লাহ হূদ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেন,يَا قَوْمِ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى الَّذِيْ فَطَرَنِيْ أَفَلَا تَعْقِلُوْنَ ‘হে আমার সম্প্রদায়! আমি এর (দাওয়াতের) জন্য তোমাদের নিকট কোন বিনিময় চাই না, আমার বিনিময় শুধু তারই যিম্মায় রয়েছে, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তবুও কি তোমরা বুঝ না’? (হূদ, ১১/৫১)। হূদ আলাইহিস সালাম তাঁর সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে বলেছেন, আমি যে তোমাদের একমাত্র আল্লাহ্র ইবাদতের জন্য আহবান করছি, নছীহত করছি, কল্যাণের পথে ডাকছি, শিরক কাজ ছাড়তে বলছি, এর বিনিময় ছওয়াব আল্লাহ্র নিকটই রয়েছে। এ দাওয়াতী কাজ আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য ও পরকালে নাজাতের জন্য করছি, আল্লাহ্র যমীনে আল্লাহ্র দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য করছি। আর যাতে তোমাদের ইহকাল ও পরকাল কল্যাণময় হয়, এর জন্য কল্যাণের পথে ডাকছি। এর প্রতিদান তোমাদের নিকট চাই না। এর প্রতিদান আল্লাহ্র নিকটই রয়েছে, যিনি তোমাদেরকে এবং আমাকে সৃষ্টি করেছেন।[12]
(চলবে)
[1]. তাফসীর ইবনু কাছীর, ৩/৪৬ পৃঃ।
[2]. বুখারী, হা/১৫; মুসলিম, হা/৪৪।
[3]. বুখারী, হা/১৬; মুসলিম, হা/৪৩।
[4]. বুখারী, হা/৩৬৮৮; মুসলিম, হা/২৬৩৯; আহমাদ, হা/১৩১৭১; বায়হাক্বী, আল-জামে‘ লি শু‘আবিল ঈমান, ২/৫০১ পৃঃ।
[5]. তাফসীর ইবনু কাছীর, ১০/২৭৯ পৃঃ।
[6]. তাফসীর আস-সা‘দী, পৃঃ ৭৯৯।
[7]. বুখারী, হা/১৬; মুসলিম, হা/৪৩; আহমাদ, হা/১২০০২; ।
[8]. বুখারী, হা/১০০; মুসলিম, হা/২৬৭৩; আহমাদ, হা/৬৫১১: ।
[9]. তাফসীর ইবনু কাছীর, ৩/২৯০ পৃঃ।
[10]. তাফসীর ইবনু কাছীর, ৭/৩১৯ পৃঃ।
[11]. বুখারী, হা/৬৭; মুসলিম, হা/১৬৭৯; আহমাদ, হা/২০৩৮৭।
[12]. তাফসীর ইবনু কাছীর, ৭/৪৪৭ পৃঃ।
