কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ইসলামে মুরদান (দাড়িবিহীন কিশোর-যুবক) সম্পর্কিত বিধিবিধান (শেষ পর্ব)

post title will place here

(ফেব্রুয়ারি’২৬ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)

মুরদানের প্রতি আসক্তির কারণ: মুরদানের প্রতি আসক্তি ও সমকামিতা ছড়িয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে নানাবিধ কারণ। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—

  • ঈমানের দুর্বলতা, মহান আল্লাহর ভালোবাসা থেকে হৃদয়ের দূরত্ব, তাঁর নজরদারির প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করা এবং তাঁর প্রতি ভয়ের অভাব: সমলিঙ্গের প্রতি আসক্তিসহ অন্যান্য অপরাধের পেছনেও মূলত এই বিষয়গুলো কাজ করে থাকে।
  • নির্লজ্জতা ও বিকৃত মানসিকতা: ইসলামে লজ্জাশীলতাকে ঈমানের শাখা বলা হয়েছে। কারো যখন লজ্জা না থাকে, তখন সে যা খুশি তা করতে পারে; যা খুশি তা বলতে পারে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথার্থই বলেছেন,إِنَّ مِمَّا أَدْرَكَ النَّاسُ مِنْ كَلاَمِ النُّبُوَّةِ الأُولَى: إِذَا لَمْ تَسْتَحْيِ فَاصْنَعْ مَا شِئْتَ ‘পূর্ববর্তী নবীগণের বাণীসমূহের মধ্যে যে বাণী মানুষ পেয়েছে, তা হলো, যদি তুমি লজ্জা-শরম না কর, তাহলে তুমি যা ইচ্ছা তাই করতে পারো’।[1]
  • সুন্দর তরুণ-যুবকদের সাথে মেশা, তাদের দিকে অবাধে বারবার তাকানো এবং তাদের সৌন্দর্য ও অবয়ব উপভোগ করা: এটিই হলো পাপাচারের প্রথম পথ, যে পথ একজন আসক্ত ব্যক্তি মাড়িয়ে থাকে। অথচ তার প্রতিপালক আল্লাহ তাকে হারাম বিষয় থেকে দৃষ্টি অবনত রাখার আদেশ দিয়েছেন এবং তাঁর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাকে অনুরূপ আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু যখন সে আদেশ লঙ্ঘন করে নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হয়, তখন ইবলীস তার হৃদয়ে একটি বিষাক্ত তির বিঁধে দেয়। এভাবে সে তাকে ধ্বংস করে ফেলে। ইবনুল ক্বাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘দৃষ্টি হলো মানুষের ওপর আপতিত অধিকাংশ বিপদের মূল উৎস। কারণ দৃষ্টি মনে ক্ষণিক কল্পনার জন্ম দেয়; সেই কল্পনা জন্ম দেয় গভীর চিন্তার; সেই চিন্তা জন্ম দেয় লালসার; সেই লালসা জন্ম দেয় ইচ্ছার; এরপর সেই ইচ্ছা আরও শক্তিশালী হয়ে দৃঢ় সংকল্পে রূপ নেয়। পরিশেষে পাপ কাজটি অবশ্যই সংঘটিত হয়, যদি না বড় কোনো বাধা তাকে প্রতিহত করে। একারণেই বলা হয়ে থাকে, ‘দৃষ্টি অবনত রাখার ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করা, দৃষ্টি দেওয়ার পরবর্তী যাতনার ওপর ধৈর্য ধরার চেয়ে অনেক বেশি সহজ’।[2]

একারণেই আলেমগণ দাড়িবিহীন কিশোর-যুবকদের দিকে দৃষ্টি দেওয়াকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এমনকি তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ একে নারীদের দিকে তাকানোর চেয়েও গুরুতর বলে গণ্য করেছেন।

  • কুরআন মাজীদ তেলাওয়াত বর্জন করা এবং নেককারদের জীবনী ও ইমামদের জীবনচরিত পাঠ বর্জন করা: মহান আল্লাহর কিতাবের মধ্যে রয়েছে হেদায়াত, আলো এবং আরোগ্য। এটি একজন মুসলিমকে পাপ ও অবাধ্যতায় লিপ্ত হওয়া থেকে বাঁচানোর সর্বোত্তম সুরক্ষা এবং যারা পাপে লিপ্ত হয়েছে, তাদের জন্য সর্বোত্তম চিকিৎসা।

আর যখন কেউ ইমামদের জীবনচরিত এবং আলেমদের জীবনী পাঠ করে, তখন সে তাদেরকে নিজের জন্য আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে, তাদের স্মৃতির সান্নিধ্যে প্রশান্তি পায় এবং নিজেকে নীচতা ও অশ্লীল কাজ থেকে ঊর্ধ্বে রাখে।

  • ফর ও নফল ইবাদতে অবহেলা: যদি এই আসক্ত ব্যক্তি ছালাতগুলোকে সঠিক সময়ে যথাযথ শর্তসমূহ ও ওয়াজিবসমূহসহ আদায় করত, তবে এই ছালাতই তাকে অশ্লীল ও মন্দ কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে বাধা দিত। আল্লাহ তাআলা বলেন,إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ ‘নিশ্চয় ছালাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে’ (আল-আনকাবূ, ২৯/৪৫)। তাহলে সে যদি ফরযের পাশাপাশি ফরযের আগে-পরের বিশেষ সুন্নাতগুলো ও অন্যান্য নফল ছালাতের প্রতিও যত্নশীল হতো, তবে তার অবস্থা কতই-না উন্নত হতো!
  • জ্ঞানার্জনে অবহেলা: জ্ঞান হলো আলো। এর মাধ্যমেই মানুষ হালাল সম্পর্কে জানতে পারে এবং তা আমল করতে পারে। অনুরূপভাবে হারাম চিনতে পারে এবং তা বর্জন করতে পারে। এর সাহায্যেই মানুষ তার মহান প্রতিপালকের পরিচয় জানতে পারে এবং তাঁর নামসমূহ, গুণাবলি ও তাঁর কার্যাবলি সম্পর্কে পরিচয় লাভ করতে পারে। আর এই জ্ঞানই তার হৃদয়ে রবের প্রতি লজ্জা এবং তাঁর ফেরেশতামণ্ডলীর প্রতি লজ্জাবোধ তৈরি করে, যা তাকে কোনো জঘন্য অশ্লীল কাজে লিপ্ত হতে বাধা দেয়। এর মাধ্যমেই সে পাপাচারীদের করুণ দশা এবং তাদের জন্য আল্লাহ যে শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন, সে সম্পর্কে অবগত হতে পারে।
  • ইবলীস ও তার দোসর মানব-শয়তানদের চক্রান্ত: সমলিঙ্গের প্রতি আসক্তি ও সমকামিতার পেছনে ইবলীস তো কাজ করে যাচ্ছেই, মানবরূপী ইবলীসগুলোও মোটেও পিছিয়ে নেই। বরং তারা বিশ্বের অনেক জায়গায় এর আইনী বৈধতা ও সুরক্ষা দিয়েছে এবং বাকী জায়গাগুলোতে দেওয়ার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আরও দুঃখজনক হলো, একে তারা অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচারণায় নেমেছে। ফলে এসব অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে জিন-শয়তান ও মানব-শয়তানদের ভূমিকা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট।
  • মরণঘাতী অবসর সময়: যাকে ‘সকল বিপদের মূল’ বলা হয়। আসক্ত ব্যক্তি যদি তার সময়কে ইবাদত, শারীরিক ব্যায়াম (খেলাধুলা), বৈধ কাজকর্ম এবং জ্ঞান অর্জনে ব্যস্ত রাখত, তবে সে হারাম বা নিষিদ্ধ বিষয় নিয়ে চিন্তা করার মতো কোনো সময় খুঁজে পেত না, সে কাজ করা তো অনেক পরের কথা।
  • অসৎ সঙ্গ বা খারাপ বন্ধু: যা মূলত একটি ‘মরণঘাতী বিষ’। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসৎ সঙ্গীকে কামারের হাপর চালনাকারীর সাথে তুলনা করেছেন। সে হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, না হয় তুমি তার কাছ থেকে দুর্গন্ধ পাবে। অথচ অনেকে বন্ধুত্বের পরিবর্তে বিশ্বাসঘাতকতার পথ বেছে নিয়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
  • ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট চ্যানেল: সোশ্যাল মিডিয়া ও স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোতে যৌন উত্তেজক প্রচুর কন্টেন্ট প্রচারিত হয়, যা ফেতনা-ফ্যাসাদ ছড়ায়।
  • অশ্লীল ম্যাগাজিন তন্নতন্ন করে দেখা ও পড়া: অশ্লীল ম্যাগাজিনগুলোতে বিভিন্ন ধরনের নগ্ন ছবি প্রদর্শিত হয়, যেগুলো যেন-ব্যভিচার ও সমকামিতার জন্য দায়ী।
  • বিবাহ ত্যাগ করা এবং নিজের চারিত্রিক পবিত্রতা ও লজ্জাস্থানের হেফাযতের ব্যাপারে অবহেলা করা: আল্লাহ তাআলা পুরুষদের মধ্যে স্বাভাবিক কামভাব বা যৌনচাহিদা সৃষ্টি করেছেন এবং এর বহিঃপ্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে নারীদের নির্ধারণ করেছেন। আর এর জন্য বৈধ পথ হলো বিবাহ। কিন্তু যার প্রকৃতি বা স্বভাব বিকৃত হয়ে যায়, সে এই চাহিদা নিজের সমলিঙ্গের পুরুষদের ওপর প্রয়োগ করে। এর মাধ্যমে সে পশুর স্তরের চেয়েও নিচে নেমে যায়। কেননা এই যে পশুরা, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা আমাদের সামনে সৃষ্টি করেছেন—আমরা কি কখনো দেখেছি যে একটি পুরুষ পশু অন্য একটি পুরুষ পশুর সাথে সংগমে লিপ্ত হচ্ছে?

অথচ আমাদের দেশে প্রেম-প্রীতিকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে এবং আইনীভাবে বিয়েকে কঠিন করা হয়েছে!

  • এই বিশ্বাস রাখা যে, কারো প্রতি অবৈধভাবে আসক্ত হওয়া একটি স্বাভাবিক ব্যাপার এবং এটি এড়িয়ে চলা অসম্ভব: এমন বিশ্বাস মূলত শয়তানের ধোঁকা। সে এভাবে মানুষকে ধোঁকার ফাঁদে ফেলে।
  • প্রেমের উপন্যাস, প্রেমকাহিনী এবং কামোদ্দীপক কবিতা পড়া: এগুলোকে যেনা ও সমকামিতার বাহন হিসেবে গণ্য করা হয়। এসব লেখনি যেন-ব্যভিচার ও সমকামিতার বিস্তার ঘটায়।
  • একই বিছানায় বা পাশাপাশি লাগোয়া বিছানায় শোয়া: সমলিঙ্গের প্রতি আসক্তি ও সমকামিতার জন্য সরাসরি দায়ী হচ্ছে প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ-পুরুষ বা নারী-নারী পাশাপাশি শোয়া। সেজন্য রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১০ বছর বয়স হলে এমনকি সহোদর ভাই-বোনদেরকেও আলাদা থাকার আদেশ দিয়ে বলেন,مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ، وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا، وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرٍ وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে ৭ বছর বয়সে ছালাতের আদেশ করো আর ১০ বছর বয়সে ছালাত না পড়ার অপরাধে তাদেরকে প্রহার করো এবং তাদের মাঝে বিছানা আলাদা করে দাও’।[3]

মুরদানের প্রতি আসক্তি ও সমকামিতার রোগ থেকে বাঁচার উপায়: আমরা যেহেতু সমস্যার কারণগুলো চিহ্নিত করতে পেরেছি, সেহেতু সেগুলো নিয়ে কাজ করলেই উক্ত রোগ থেকে বাঁচা সম্ভব ইনশা-আল্লাহ। কারণ রোগের মূল কারণ ত্যাগ করা ছাড়া যে চিকিৎসা নেওয়া হবে, তা একটি ব্যর্থ চিকিৎসা হিসেবে গণ্য হবে, যা কখনো সফল হবে না। সুতরাং আগের আলোচনা থেকেই আমরা সমাধান খুঁজে নিতে পারি। তারপরও আমরা এখানে উক্ত সমস্যা থেকে বাঁচার কতিপয় উপায় পৃথকভাবে উল্লেখ করছি:

  • আল্লাহর সান্নিধ্য স্মরণ করুন: মনে রাখবেন, মহান আল্লাহ সবসময় আপনার সাথে আছেন এবং তিনি আপনাকে প্রতিটি মুহূর্তে দেখছেন। সুতরাং তাঁর অবাধ্য হবেন না।
  • হিসাব-দিবসের কথা স্মরণ করুন: ক্বিয়ামতের দিন হিসাব হবে কারো জন্য সহজ, কারো জন্য কঠিন। অতএব, আপনার দুনিয়ার জীবনকে এমনভাবে সাজান, যেন সেদিন আপনার হিসাব হালকা হয়।
  • সর্বদা মনে রাখুন, আপনি পাপের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছেন: আর এই পাপের পরিণতি হচ্ছে মহান আল্লাহর রাগ ও ক্রোধ প্রাপ্তি এবং তাঁর তাওফীক্ব থেকে বঞ্চিত হওয়া।
  • পাঁচটি সাক্ষীর কথা মনে রাখুন, সাবধান! আপনি কখনই এমনি এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে না:

প্রথম সাক্ষী আল্লাহ: আল্লাহ আপনার সবকিছু দেখছেন। অন্ধকারে কালো পাথরের ওপর কালো পিঁপড়াকেও তিনি দেখতে পান।

দ্বিতীয় সাক্ষী ফেরেশতা: আপনার দুই কাঁধে দুই জন সম্মানিত ফেরেশতা আছেন। আপনার প্রতিটি শব্দ তারা লিপিবদ্ধ করছেন। মহান আল্লাহ বলেন,مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে (তা লিপিবদ্ধ করার জন্য) তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে’ (কাফ, ৫০/১৮)

তৃতীয় সাক্ষী আপনার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ: বিচার দিবসে আপনার মুখ সিল করে দেওয়া হবে এবং আপনার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আপনার কথা-কাজের সাক্ষ্য দেবে। মহান আল্লাহ বলেন,الْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَى أَفْوَاهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَا أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ ‘আজ আমি তাদের মুখে মোহর মেরে দেব এবং তাদের হাত আমাদের সাথে কথা বলবে ও তাদের পা সে সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে যা তারা অর্জন করত’ (ইয়াসী, ৩৬/৬৫)

চতুর্থ সাক্ষী যমীন: আপনি যেখানে বসে পাপ করছেন, ক্বিয়ামতের দিন সেই স্থানটি আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। মহান আল্লাহ বলেন, يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا ‘সে দিন যমীন তার (নিজের উপর সংঘটিত) বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে’ (আয-যিলযাল, ৯৯/৪)

পঞ্চম সাক্ষী মানুষ: আপনার চারপাশের মানুষ, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা আপনার কাজের সাক্ষী। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أَنْتُمْ شُهَدَاءُ اللَّهِ فِي الأَرْضِ ‘তোমরা যমীনের বুকে আল্লাহর সাক্ষী’।[4]

  • মনে রাখুন, এই আসক্তি আপনার অন্তরে বিষণ্নতা সৃষ্টি করে: এর ফলে চেহারায় নেমে আসে মলিনতা এবং শেষ পরিণতি হয় ভয়াবহ। আর পরকালে কী আছে, তা আল্লাহই ভালো জানেন। তাহলে কীসের এত অপেক্ষা? অতএব, সংশোধন হোন এখনই।
  • জেনে রাখুন, আপনি এক মারাত্মক বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতির মধ্যে আছেন: আপনি মানুষের ঠাট্টা-বিদ্রুপ, ইশারা-ইঙ্গিত এবং অপবাদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে গেছেন। আপনাকে নিয়ে চারদিকে কানাঘুষা চলছে, যা আপনাকে সন্দেহ ও অভিযোগের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করবে। তাই সময় থাকতেই নিজেকে বাঁচান, ফিরে আসুন সঠিক পথে।
  • আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি করুন: বিশেষ করে ছিয়ামের মাধ্যমে। অনুরূপভাবে হৃদয়ে মহান আল্লাহর ভালোবাসার চাষ ও তাঁর শাস্তির ভয় করার মাধ্যমে।
  • দৃষ্টির হেফাযত করুন: সমলিঙ্গের প্রতি আসক্তি থেকে বাঁচতে হলে নিজেকে ‘আমরাদ’ (দাড়িবিহীন সুন্দর যুবক)-দের দিকে তাকানো থেকে বিরত রাখতে হবে— তা কামভাব নিয়ে হোক বা কামভাব ছাড়া। এছাড়া তাদের সঙ্গ দেওয়া, তাদের সাথে ওঠাবসা করা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে এবং তাদের সাথে নির্জনে অবস্থান করা ত্যাগ করতে হবে; এমনকি তা কুরআন মাজীদ শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে হলেও।
  • ছালাতের প্রতি যত্নশীল হোন: পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত যথাসময়ে আদায়ের প্রতি যত্নশীল হোন। ফরযের পাশাপাশি ফরযের আগে-পরের বিশেষ সুন্নাতগুলো ও অন্যান্য নফল ছালাতের প্রতিও যত্নশীল হোন।
  • নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করুন: সকাল-সন্ধ্যার যিকির-আযকারের প্রতি যত্নশীল হোন। সালাফে ছালেহীনের জীবনচরিত অধ্যয়ন করুন।
  • দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করুন: প্রত্যেক মুসলিমের ওপর দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ ‘প্রত্যেক মুসলিমের উপর জ্ঞান অর্জন করা ফরয’।[5] অতএব, পড়া, শোনা এবং দেখার মাধ্যমে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করুন।
  • আনুগত্যের কাজে সময়কে ব্যয় করুন: মুমিন-জীবনে অবসর বলে কিছু নেই। তাই দ্বীন বা দুনিয়ামুখী কাজে সময়কে কাজে লাগান। আপনি আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং উচ্চ নৈতিকতাসম্পন্ন ও পৌরুষদীপ্ত ব্যক্তিত্ববান মানুষের সান্নিধ্যে নিজের সময় ব্যয় করুন। উপকারী বই-পুস্তক ও পত্র-পত্রিকা পাঠে গুরুত্ব দিন। কুরআন তেলাওয়াত শুনুন, ভালো ভালো লেকচার শুনুন। স্কিল শক্ত করার জন্য বিভিন্ন উপকারী কোর্স করুন।
  • অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করুন: অসৎ সঙ্গ এড়িয়ে চলুন এবং সৎ সঙ্গীদের অনুসন্ধান করুন। আর তাঁদের সাথে ওঠাবসা করার মাধ্যমে এবং তাঁদের জ্ঞান ও চরিত্র থেকে শিক্ষা নেওয়ার মাধ্যমে তাঁদের সাথে যুক্ত থাকুন। জীবনকে পরিবর্তন করুন।
  • বাবা-মায়ের ভূমিকা: পিতা-মাতা হলেন ঘরের নিরাপত্তার দুটি প্রধান স্তম্ভ। তাদের ওপরই সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়— যদি তারা সন্তানদের সঠিকভাবে লালনপালন ও শিক্ষা দেন, ভালোর নির্দেশ এবং মন্দের নিষেধ করেন। তারা যদি সন্তানদের ভালো কাজের পথ দেখান, তাতে উৎসাহিত করেন; মন্দ কাজের পথ বুঝিয়ে দূরে থাকতে সতর্ক করেন; প্রকাশ্য ও গোপন সব ধরনের অশ্লীলতা থেকে সাবধান করেন—তাহলেই সন্তানরা সঠিক পথে বড় হবে।

পিতা-মাতার দায়িত্ব হলো সন্তানদের আল্লাহকে ভালোবাসতে শেখানো, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালোবাসতে শেখানো, সৎলোক ও আলেমদের প্রতি শ্রদ্ধা জাগানো। একই সাথে আল্লাহর শাস্তি ও অসন্তুষ্টির ভয় সম্পর্কে সচেতন করা, দুষ্কৃতিকারী ও খারাপ বন্ধুদের থেকে সতর্ক করা।

সবচেয়ে জরুরী হচ্ছে, পিতা-মাতাকে কঠোরভাবে সতর্ক থাকতে হবে, যেন তারা ঘরে এমন সব যন্ত্র বা ডিভাইস প্রবেশ করিয়ে না ফেলেন, যেগুলো সন্তানদের নৈতিকতা ও চরিত্র ধ্বংস করে দিতে পারে।

  • তীব ও ওয়ায়েযদের ভূমিকা: জুমআর খুতবা ও ওয়ায মাহফিলে এই ধরনের অপরাধ ও এর কুফল নিয়ে আলোচনা করতে হবে। কারণ খুতবায় সব ধরনের মানুষ উপস্থিত থাকে। সমাজের সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান দেওয়া খতীবদের গুরু দায়িত্ব।
  • শিক্ষার ভূমিকা: শিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের প্রতি বিশেষ যত্ন ও মনোযোগ দেওয়া জরুরী। কারণ তারাই এই দ্বীনের মূল ভরসা ও ভবিষ্যৎ বাহক। আমরা আজ তাদের যে বীজ রোপণ করছি, অদূর ভবিষ্যতে ইনশা-আল্লাহ তার ফল আমরা দেখতে পাব। তাই ছেলে-মেয়ে সবার জন্য শিক্ষাক্রমে অবশ্যই অশ্লীলতা এবং অনৈতিক কাজের ভয়াবহতা, এর পরিণতি ও শাস্তি সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে আলোচনা থাকা প্রয়োজন।
  • বিবাহ সহজ করা: অশ্লীলতা দূর করার অন্যতম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হলো বিবাহ সহজ করা, যাতে মানুষ হালাল পথে তার জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে পারে।
  • ছিয়াম পালনা করা: নিশ্চয়ই নববী হেদায়াত বা নির্দেশনা হারামের দিকে ধাবিতকারী সকল মাধ্যমকে বন্ধ করার নীতি নিয়ে এসেছে। এটি তাঁর উম্মতের প্রতি গভীর দয়া ও মমতার অংশ, যাতে তারা আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচতে পারে।

এই সব পথ বন্ধ করার জন্য তিনি এমন এক নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে একজন মানুষ তিনটি বড় ছওয়াব লাভ করতে পারে— আল্লাহর জন্য হারাম থেকে বিরত থাকার ছওয়াব, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ মানার ছওয়াব এবং ছিয়াম রাখার ছওয়াব, যা মানুষকে তার রবের আরো নিকটবর্তী করে এবং শয়তানের প্রভাবকে দুর্বল করে। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ، مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ، وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ، وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ، فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ ‘হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যার পক্ষে সামর্থ্য আছে, সে যেন বিবাহ করে। আর যার সামর্থ্য নেই, তাকে ছিয়াম রাখতে হবে। কারণ ছিয়াম তার জন্য ঢালস্বরূপ’।[6]

  • নির্জনতা থেকে সাবধান: একা থাকা শয়তানের কুমন্ত্রণা ডেকে আনে। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ ‘কোনো পুরুষ যেন অপর কোনো মহিলার সাথে তার মাহরাম ছাড়া নির্জনতা অবলম্বন না করে’।[7] অন্য বর্ণনায় এসেছে,لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلاَّ كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ ‘কোনো পুরুষ কোনো মহিলার সঙ্গে নির্জনতা অবলম্বন করলেই তাদের তৃতীয় জন হয় শয়তান’।[8] তাই একা থাকা পরিহার করা উচিত।
  • গণমাধ্যমের ভূমিকা: রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের মতো গণমাধ্যমগুলোকে কাজে লাগিয়ে আলেম সমাজকে চারিত্রিক পরিশুদ্ধির দাওয়াত পৌঁছে দিতে হবে।
  • তার থেকে দূরে থাকুন: তার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করুন এবং যেকোনো অজুহাতে সব ধরনের কথোপকথন ও সাক্ষাৎ এড়িয়ে চলুন, এজন্য আপনাকে যত বড় ত্যাগই স্বীকার করতে হোক-না কেন।
  • একটা কথা মনে রাখুন: তারও ভুলভ্রান্তি, পদস্খলন এবং দোষত্রুটি রয়েছে। সেও আপনার মতোই একজন মানুষ; আপনার পেটে যেমন নোংরা ও বর্জ্য আছে, তার পেটেও তেমনটাই আছে।
  • এই নিষিদ্ধ প্রেমে যারা আসক্ত হয়েছে, তাদের পরিণতির দিকে তাকিয়ে শিক্ষা নিন: কীভাবে এটি তাদেরকে উন্মাদনা, নানাবিধ রোগ এবং এমনকি ধর্মত্যাগ বা মুরতাদ হওয়ার দিকে নিয়ে গেছে। ইবনুল ক্বাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘আর এই ভয়াবহ রোগের ঔষধ হলো— অন্তরের পরিবর্তনকারী আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা, যথাযথভাবে তাঁর আশ্রয় নেওয়া, তাঁর যিকিরে মশগূল থাকা এবং তাঁর ভালোবাসা ও নৈকট্যের মাধ্যমে নিষিদ্ধ ভালোবাসার বিকল্প খুঁজে নেওয়া। পাশাপাশি সেই ব্যথার কথা চিন্তা করা, যা এই নিষিদ্ধ প্রেমের পরিণামে আসবে এবং সেই বিশাল তৃপ্তি সম্পর্কে ভাবা, যা এই পাপের কারণে সে হারাবে। এর ফলে সে তার সবচেয়ে বড় প্রিয়তম আল্লাহকে হারাবে এবং সবচেয়ে বড় অপছন্দনীয় ও ভয়াবহ পরিণতির শিকার হবে। এতসব জানার পরেও যদি তার নফস এই পাপের দিকেই এগিয়ে যায় এবং একেই প্রাধান্য দেয়, তবে সে যেন তার নিজের ওপর জানাযার তাকবীর পড়ে নেয় (অর্থাৎ নিজেকে মৃত ঘোষণা করে) এবং জেনে রাখে যে, বিপদ তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছে’।[9]
  • মহান আল্লাহর কাছে দু‘আ করুন: নিজের চেষ্টার পাশাপাশি মহান আল্লাহর কাছে দু‘আ করুন। দু‘আ হচ্ছে মুমিনের অস্ত্র। আপনি এই অস্ত্র ব্যবহার করুন, যাতে তিনি আপনাকে এই ব্যাধি ও পরীক্ষা থেকে মুক্তি দান করেন।[10]

আমার মনে হয়, শুরুতে আপনার কিছুটা কষ্ট হতে পারে, কিন্তু শেষটা হবে আরামদায়ক। এটি ছেড়ে দিলে আপনি কিছুই হারাবেন না, বরং আপনি একজন স্বাধীন মানুষের মতো জীবনযাপন করতে পারবেন এবং সেই উন্মত্ত বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাবেন।

আপনার প্রতি আমার অছিয়ত হলো, অন্যের প্রতি আপনার ভালোবাসা যেন হয় পরিমিত এবং একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য; তাদের ঈমান ও তাক্বওয়ার ভিত্তিতে। সৌন্দর্য, বংশমর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা শারীরিক গঠন ও বাহ্যিক অবয়বের ভিত্তিতে যেন না হয়।

সব সময় মনে রাখবেন, প্রকৃত সৌন্দর্য হলো চরিত্রের সৌন্দর্য— হৃদয়ের পবিত্রতা, আত্মার নির্মলতা, উচ্চতর নৈতিকতা এবং মার্জিত শিষ্টাচার। আর চেহারার সৌন্দর্য? তা তো দ্রুতই বিলীন হয়ে যায়, ধ্বংস হয় এবং বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। কিন্তু আত্মার সৌন্দর্য সর্বদা বেঁচে থাকে, যা মানুষ চিরকাল স্মরণ রাখে। নিশ্চয়ই বাহ্যিক সৌন্দর্য নিয়ে গর্ব করা পুরুষোচিত আচরণের অন্তর্ভুক্ত নয়।[11]

মহান আল্লাহ সমলিঙ্গের প্রতি আসক্তি, সমকামিতাসহ যাবতীয় অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করুন। আমীন!

আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী

 বিএ (অনার্স), উচ্চতর ডিপ্লোমা, এমএ এবং এমফিল, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব;
অধ্যক্ষ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৮৩, ৩৪৮৪, ৬১২০।

[2]. আল-জাওয়াবুল কাফী লিমান সাআলা আনিদ-দাওয়াইশ শাফী, পৃ. ১৫৩।

[3]. https://islamqa.info/ar/answers/94836/مبتلى-بحب-المردان-فكيف-يتخلص-من-مرضه-هذا

https://almoslim.net/node/80108

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/১৩৬৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৪৯।

[5]. সুনানে ইবনে মাজাহ, হা/২২৪, ‘ছহীহ’।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৬৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪০০।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৫২৩৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৪১।

[8]. সুনানে তিরমিযী, হা/১১৭১, ‘ছহীহ’।

[9]. আল-জাওয়াবুল কাফী লিমান সাআলা আনিদ-দাওয়াইশ শাফী, পৃ. ২৪১।

 [10]. দ্রষ্টব্য: https://saaid.org/Doat/yahia/61.htm https://islamqa.info/ar/answers/94836/مبتلى-بحب-المردان-فكيف-يتخلص-من-مرضه-هذا

 [11]. দ্রষ্টব্য: https://almoslim.net/node/80108

Magazine