কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

মিন্নাতুল বারী শারহু ছহীহিল বুখারী (পর্ব-৭)

(জুলাই’১৯ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)

فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ فَهِجْرَتُهُ إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ

‘আর যার হিজরত হবে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য তার হিজরত মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্যই গণ্য হবে’। এই অংশটি ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেননি। অথচ ছহীহ বুখারীর অন্য ৫ জায়গায় যখন তিনি নিয়্যতের এই হাদীছটি উল্লেখ করেছেন তখন তিনি হাদীছের এই অংশসহ পূর্ণ হাদীছ উল্লেখ করেছেন। বিশেষভাবে শুধু এই হাদীছে তার এই অংশ উল্লেখ না করা নিয়ে মুহাদ্দিছগণের মাঝে মতভেদ আছে। নিমেণ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হল:

বিলুপ্তি মূলত কার পক্ষ থেকে? :

প্রথমত মুহাদ্দিছগণ হাদীছের এই অংশের মূল বিলুপ্তকারীর পরিচয় নিয়ে মতভেদ করেছেন। কারো মতে ইমাম বুখারীর উস্তাদ ইমাম হুমায়দীই হাদীছ বর্ণনার সময় এই অংশটি উল্লেখ করেননি।

যদি তাই হয় তাহলে প্রশ্ন আসবে, ইমাম বুখারী কেন এই অসম্পূর্ণ হাদীছ তার গ্রন্থের শুরুতে আনবেন অথচ তার নিকটে এই হাদীছ অন্য সনদে পরিপূর্ণভাবে আছে। এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই বলেছেন, ইমাম বুখারী যেহেতু অহির আলোচনা করছেন; আর অহি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে মক্কায়, তাই তিনি একজন মাক্কী রাবীর হাদীছ দিয়ে গ্রন্থ শুরু করতে চেয়েছেন। আর ইমাম হুমায়দী হচ্ছেন মক্কার অধিবাসী মাক্কী রাবী। তাই তার হাদীছ অসম্পূর্ণ হলেও তার হাদীছ দিয়েই গ্রন্থ শুরু করেছেন।

কিন্তু সত্যি বলতে কি, এই হাদীছের মধ্যে অসম্পূর্ণতা ইমাম হুমায়দীর পক্ষ থেকে এসেছে এই মতটি সঠিক নয়। কেননা স্বয়ং ইমাম হুমায়দী রাহিমাহুল্লাহ তার মুসনাদে হুমায়দীতে যখন এই হাদীছটি বর্ণনা করেছেন, তখন এই অংশ সহ সম্পূর্ণ বর্ণনা করেছেন।[1] এছাড়া ইমাম হুমায়দী থেকে এই হাদীছ ইমাম বুখারী ছাড়াও বাশীর ইবনে মূসা,[2] আবু ইসমাঈল তিরমিযী, কাসিম ইবনে সববাগ, আবু নুআইম, আবু আওয়ানা প্রমুখ ইমাম হুমায়দীর সূত্রে পরিপূর্ণ হাদীছ বর্ণনা করেছেন।[3] 

কেউ বলতে পারে, ইমাম হুমায়দী হয়তো যখন ইমাম বুখারীকে হাদীছ শুনিয়েছেন তখন তিনি এই অংশ উল্লেখ করেননি, আর অন্যদেরকে যখন শুনিয়েছেন তখন পরিপূর্ণ বর্ণনা করেছেন। আমরা বলব এই মন্তব্যের সম্ভাবনা থাকলেও তা অনেক দূরবর্তী। অন্ততপক্ষে এই কথার প্রমাণের জন্য ইমাম বুখারী ছাড়া আরেকজন রাবী লাগবে, যিনি ইমাম হুমায়দী থেকে অপূর্ণাঙ্গভাবে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন; অন্যথা এই দাবী শুধুই নামকাওয়াস্তে দাবী। অতএব একথাই প্রণিধানযোগ্য যে, ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ স্বয়ং ইচ্ছাকৃতভাবে হাদীছের এই অংশ বিলুপ্ত করেছেন।

তিনি কেন বিলুপ্ত করেছেন? :

ইমাম বুখারী ইচ্ছাকৃতভাবে এই অংশ বিলুপ্ত করে থাকলে স্বভাবতই প্রশ্ন থেকে যায়, তিনি কেন এই অংশটি বিলুপ্ত করেছেন। এই বিষয়েও মুহাদ্দিছগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। নিমেণ তাদের কথার সারর্মম পেশ করা হল :

(১) ইমাম ইবনু হাযম রাহিমাহুল্লাহ-এর মতে, ইমাম বুখারী এই হাদীছ দিয়ে গ্রন্থ শুরু করেছেন নিয়্যতের বিশুদ্ধতার গুরুতব বুঝাতে। তার নিজের অন্তরের নিয়্যতও যেন বিশুদ্ধ হয় তারও একটা ক্ষুদ্র প্রয়াস এটি। যেহেতু ইমাম বুখারীর নিজের নিয়্যতও এই হাদীছের সাথে সংশ্লিষ্ট, সেহেতু হাদীছের এই অংশটি উল্লেখ করলে অনেকেই মনে করতে পারে যে, ইমাম বুখারী নিজের নিয়্যতের বিশুদ্ধতার দাবী করছেন। এজন্য রিয়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে তিনি হাদীছের ভাল নিয়্যতের অংশটুকু বিলুপ্ত করে দিয়েছেন এবং দুনিয়া ও নারী সংশ্লিষ্ট নিয়্যতের অংশটুকু রেখে নিজেকে নছীহত করার চেষ্টা করেছেন।[4] 

(২) হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহ-এর মতে প্রত্যেক মুহাদ্দিছ তাদের বইয়ের শুরুতে নিজ মূলনীতি ও পরিভাষা সম্পর্কে ভূমিকায় বিস্তারিত বলে থাকেন। যেহেতু ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ কোন প্রকার বিস্তারিত ভূমিকা লেখেননি, তাই অনেক কিছুই তাকে ইশারা-ইঙ্গিতে বুঝাতে হয়েছে। এই হাদীছের এই অংশটুকু বিলুপ্ত করার মাধ্যমে তিনি এই বইয়ে তার অনুসৃত একটি নীতির বর্ণনা দিতে চেয়েছেন। আর তা হচ্ছে, তিনি হাদীছকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করা জায়েয মনে করেন, যতক্ষণ না অর্থের কোন পরিবর্তন হয়। আর তিনি এই কাজটা সমগ্র বইয়ে করেছেন। যখন যেখানে যে হাদীছের যে অংশের প্রয়োজন হয়েছে, তখন হাদীছের শুধুমাত্র সেই অংশটুকুই পেশ করেছেন, অন্য অংশগুলো ছেড়ে দিয়েছেন। তথা প্রয়োজন অনুযায়ী বড় বড় হাদীছকে কেটে বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ করেছেন। তিনি তার এই মানহাজ পাঠকদেরকে জানানোর জন্য প্রথম হাদীছেরই একটা অংশ বিলুপ্ত করার মাধ্যমে পাঠকদেরকে সজাগ করতে চেয়েছেন।[5]

(৩) দারুল উলূম দেওবন্দের শায়খুল হাদীছ আমার উস্তাদ মুফতী সাঈদ আহমাদ পালানপুরী হাফিযাহুল্লাহ তার নিজের পক্ষ থেকে একটি উত্তর দিয়েছেন যা আমরা ১ম পর্বে আলোচনা করেছি। 

(৪) আর ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে মনে হয়েছে হাদীছের পরবর্তী বাক্যটি ব্যাপক অর্থবোধক, যা থেকে বিলুপ্তকৃত অংশটির অর্থও বের হয়ে আসে। হাদীছের শেষ অংশে বলা হয়েছে, ‘যে যার দিকে হিজরত করবে তার হিজরত সেই হিসেবেই গণ্য হবে’। তথা যার হিজরত আল্লাহর জন্য হবে, তারটা আল্লাহর সন্তুষ্টি হিসাবেই গৃহীত হবে। আর যার হিজরত দুনিয়ার জন্য হবে, তারটা দুনিয়ার জন্যই গণ্য হবে। হাদীছের শেষ বাক্যটি ব্যাপক হওয়ায় আলাদা করে আর আল্লাহর জন্য হিজরতের বিষয়টি উল্লেখের প্রয়োজন থাকে না; বরং সেটাও এই ব্যাপক বাক্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পাঠকের মনে চলে আসবে। অন্যদিকে যদি কল্পনা করা হয় হাদীছের এই ব্যাপক অংশটি বিলুপ্ত করা হবে এবং বিলুপ্তকৃত অংশ উল্লেখ করা হবে, তাহলে হাদীছের অর্থের মধ্যে অসম্পূর্ণতা দেখা দিবে। কিন্তু এখন শেষ অংশ থাকায় সামান্য পরিমাণও অর্থ অসম্পূর্ণ থাকে না। সুতরাং ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ-এর এই অংশ বিলুপ্ত করা কোন দিক থেকেই সমস্যা হিসাবে বিবেচিত হয় না। রাহিমাহুল্লাহ রাহমাতান ওয়াসিআ!

وَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ لدُنْيَا يُصِيبُهَا، أَوِ امْرَأَةٍ يَتَزَوَّجُهَا، فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ

‘অতএব যার হিজরত হবে দুনিয়ার উদ্দেশ্যে অথবা কোন নারীকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে তার হিজরত সে হিসেবেই গণ্য হবে যে উদ্দেশ্যে সে হিজরত করেছে’।

হিজরতের শাব্দিক ও পারিভাষিক পরিচয় :

হিজরত শব্দটির শাব্দিক অর্থ পরিত্যাগ করা, ছেড়ে দেয়া। আরবীতে এর অর্থ হচ্ছে, ترك الوطن والانتقال إلى غيره ‘নিজের মাতৃভূমিকে ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়াকে আরবীতে হিজরত বলা হয়’। মানুষ চাকুরীর স্বার্থে, ব্যবসার স্বার্থে, পড়াশোনার স্বার্থে নিজ মাতৃভূমি পরিত্যাগ করে থাকে। এগুলোকেই হাদীছে দুনিয়াবী হিজরত বলা হয়েছে। আর শরী‘আতের পরিভাষায় হিজরত হচ্ছে-

مفارقة دار الكفر إلى دار الإسلام خوف الفتنة، وطلب إقامة الدين.

‘ফিতনা থেকে বাঁচতে ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দারুল কুফর ছেড়ে দারুল ইসলামে চলে যাওয়ার নাম হিজরত’।[6]

স্বয়ং রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই লক্ষ্যেই মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। ছাহাবায়ে কেরামও তিন পর্বে হিজরত করেছেন। যথা-

(১) মক্কা থেকে হাবশায় হিজরত।

(২) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত।

(৩) মক্কা বিজয়ের পূর্বে বিভিন্ন গোত্রের মদীনায় হিজরত।

মক্কা বিজয়ের পর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, لاَ هِجْرَةَ بَعْدَ الفَتْحِ ‘মক্কা বিজয়ের পর আর কোন হিজরত নেই’।[7]

অনেকেই এই হাদীছ থেকে ভুল বুঝেন যে, মক্কা বিজয়ের পর হিজরত নিষিদ্ধ। এই হাদীছের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, যেহেতু মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে মক্কা দারুল ইসলামে পরিণত হয়েছে সেহেতু মক্কা থেকে কেউ আর হিজরত করতে পারবে না। কিন্তু পৃথিবীর অন্য যে কোন শহরে যখনই ইসলাম নিয়ে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে তখন হিজরত করা যরূরী বিধানগুলোর একটি। যেমন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

عن معاويةَ، قال: سمعتُ رسول الله -صلَّى الله عليه وسلم- يقول: لَا تَنْقَطِعُ الْهِجْرَةُ حَتَّى تَنْقَطِعَ التَّوْبَةُ، وَلَا تَنْقَطِعُ التَّوْبَةُ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا

‘মু‘আবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হিজরত বন্ধ হবে না যতক্ষণ না তওবা বন্ধ হয়। আর তওবা বন্ধ হবে না যতক্ষণ না পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হয়’।[8]

তাহক্বীক্ব : আবুদাঊদের সূত্রে এই হাদীছে একজন অপরিচিত রাবী আছেন, কিন্তু এই রাবীর মুতাবা‘আত ও হাদীছের শাহেদ থাকায় আলবানী রাহিমাহুল্লাহ সহ অনেকেই হাদীছটিকে ‘হাসান’ বলেছেন।[9]

এই হাদীছ প্রমাণ করে দ্বীন বাঁচানোর লক্ষ্যে দারুল কুফর ছেড়ে দারুল ইসলামে হিজরত ক্বিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। বর্তমানে যুগেও মুসলিমরা বিভিন্ন ইয়াহূদী-খ্রীস্টান দেশ থেকে হিজরত করছে, যার জ্বলন্ত উদাহরণ আমাদের বাংলাদেশে মায়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুহাজির ভাইয়েরা। 

বাস্তব ও প্রকৃত অর্থে হিজরত হচ্ছে-

في الحقيقة: مفارقة ما يكره الله إلى ما يحب.

‘মহান আল্লাহ যা অপসন্দ করেন তা পরিত্যাগ করার নাম হিজরত। যেমন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

وَالْمُهَاجِرُ مَنْ هَاجَرَ مَا نَهَى اللَّهُ عَنْهُ.

‘মুহাজির সেই, যে মহান আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা থেকে হিজরত করে তথা সেই নিষিদ্ধ কাজকে ছেড়ে দেয়’।[10]

দুনিয়ার শাব্দিক ও পারিভাষিক পরিচয় :

‘দুনিয়া’ আরবী গ্রামার অনুযায়ী ইসমে তাফযীলের ছীগাহ ‘ফু‘লা’-এর ওযনে। আর দুনিয়া শব্দটি আরবী গ্রামার অনুযায়ী গায়রে মুনছারিফ।

কারো মতে, ‘দুনিয়া’ শব্দটি আরবী دنو থেকে আগত, যার অর্থ নিকটবর্তী হওয়া। যেহেতু দুনিয়া অতি নিকটে ধ্বংস হয়ে যাবে এবং দুনিয়া যেহেতু আখিরাতের অনেক নিকটবর্তী, তাই তাকে দুনিয়া বলা হয়।

আবার কেউ বলেছেন, দুনিয়া শব্দটি আরবী دناءة থেকে নির্গত, যার অর্থ হচ্ছে- নিকৃষ্ট, নীচ, হীন। যেহেতু দুনিয়া ও তার মধ্যে যা কিছু আছে তা খেল-তামাশা ও ধোঁকা মাত্র। যার মূল্য মহান আল্লাহর দরবারে মাছির ডানার সমানও নয়, তাই তার নাম দুনিয়া রাখা হয়েছে।

পারিভাষিক অর্থে, আরবীতে দুই ধরনের সংজ্ঞা পাওয়া যায়।[11] যথা-

(১) أنها ما على الأرض ‘যমীন ও যমীনের উপরে যা কিছু আছে সবই দুনিয়ার অন্তর্ভুক্ত’।

(২)والثاني أنها كل المخلوقات من الجواهر والأعراض الموجودة قبل الدار الآخرة ‘ক্বিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত জওহর ও আ‘রযসহ যত সৃষ্টিজীব আছে, আসবে এবং এসেছিল সবই দুনিয়ার অন্তর্ভুক্ত’।

জ্ঞাতব্য: জওহর ও আ‘রয মানতিকের পরিভাষা। পৃথিবীর সকল কিছুকে মানতিক পরিভাষাবিদগণ জওহর ও আ‘রয এই দুইভাগে ভাগ করেছেন। জওহর হচ্ছে, প্রত্যেক যা কিছু নিজেই নিজের অস্তিত্ব বুঝানোর জন্য যথেষ্ট। যেমন- মানুষ, টেবিল, মোবাইল ইত্যাদি। অন্যদিকে আ‘রয, যা নিজেই নিজের অস্তিত্ব বুঝাতে পারে না যতক্ষণ না কোন জওহরকে সাথে পায়। যেমন রং, গন্ধ, স্বাদ ইত্যাদি। এগুলোর অস্তিত্ব ততক্ষণ বুঝা যায় না, যতক্ষণ না কোন বস্তুও সাথে থাকে তথা জওহরের সাথে থাকে। রং, গন্ধ, স্বাদের আলাদা কোন অস্তিত্ব নেই জওহারের সহযোগিতা ছাড়া।

কিছু প্রশ্ন ও তার উত্তর :

দুনিয়ার মধ্যে তো মহিলা অন্তর্ভুক্ত, তবুও আলাদাভাবে কেন মহিলার উল্লেখ করা হয়েছে?

(১) আরবী গ্রামারের একটি নিয়ম হচ্ছে নাকিরা বা অনির্দিষ্টবাচক শব্দ যদি ‘না বোধক’ বাক্যে আসে তাহলে তা ব্যাপক অর্থ দেয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেন,

يَوْمَ لا تَمْلِكُ نَفْسٌ لِنَفْسٍ شَيْئاً 

‘সেই দিন কোন মানুষ কোন মানুষের কাজে আসবে না’ (ইনফিতার, ১৯)। এই আয়াতটি একটি ‘না বোধক’ বাক্য। এই ‘না বোধক’ বাক্যে ‘নাফস’ শব্দটি অনির্দিষ্ট ব্যবহার করা হয়েছে। যার ফলে সকল মানুষ এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। এজন্যই আমরা অনুবাদ করেছি কোন মানুষ। তথা একটা মানুষও এই বিপদ থেকে মুক্ত থাকবে না। না কোন পীর-দরবেশ না নবী-রাসূল। কেউই কারো কোন উপকার করতে পারবে না। এটা বুঝানোর জন্যই মহান আল্লাহ এই আয়াতে ‘না বোধক’ বাক্যে অনির্দিষ্টসূচক শব্দ ব্যবহার করেছেন।

কিন্তু আমাদের আলোচিত নিয়্যতের হাদীছে যেহেতু দুনিয়া ‘হ্যাঁ বোধক’ বাক্যে এসেছে, তাই নাকিরা হলেও ব্যাপক অর্থ দিচ্ছে না; এজন্য তার মধ্যে দুনিয়ার সবকিছুই প্রবেশ করবে মর্মে দাবী করা ঠিক হবে না। সুতরাং আলাদাভাবে নারীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

একথার জবাবে অনেকেই বলেছেন, নাকিরা শুধু ‘না বোধক’ বাক্যে ব্যাপকতার ফায়দা দেয় এমনটি নয়, বরং শর্তসূচক বাক্যেও নাকিরা ব্যাপক অর্থ দেয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেন,

وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ

‘যদি আপনার কোন অমঙ্গল কিছু স্পর্শ করে তাহলে সেটা দূর করার ক্ষমতা সেই মহান সত্তা ব্যতীত কারো নেই’ (ইউনুস, ১০৭)। এই আয়াতে শর্তসূচক বাক্যে অমঙ্গলকে অনির্দিষ্ট হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তথা যে কোন প্রকারের অনিষ্ট চাহে ছোট থেকে ছোট হোক অথবা বড় থেকে বড় হোক, দুনিয়াবী হোক, পরকালীন হোক, পারিবারিক হোক, ব্যক্তিগত হোক, সামাজিক হোক, অর্থনৈতিক হোক অথবা রাষ্ট্রীয় হোক সকল প্রকার অনিষ্ট এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে এবং একমাত্র মহান আল্লাহ সেই সকল প্রকার অনিষ্ট দূর করার ক্ষমতা রাখেন।

সুতরাং আমাদের আলোচ্য হাদীছে দুনিয়া শর্তবাচক বাক্যে এসেছে। তাই দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে নারীসহ সবই এর মধ্যে চলে আসবে। ফলে আলাদা করে নারীর কথা উল্লেখ করার কোন প্রয়োজন নেই। এ মতটিই সঠিক।

(২) সবচেয়ে উপযুক্ত জবাব হচ্ছে, নারীর ভয়াবহতার গুরুত্ব বুঝানোর জন্য দুনিয়ার পরে আবার আলাদাভাবে দুনিয়ারই অংশ নারীর কথা উল্লেখ করতে হয়েছে। এটাকে আরবীতে বলা হয় ‘যিকরুল খাছ বা‘দাল আম’ তথা ব্যাপক বিষয়ের পর গুরুত্বপূর্ণ নির্দিষ্ট বিষয়ের আলোচনা। যেমন মহান আল্লাহ বলেন,

حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى 

‘তোমরা ছালাতসমূহ ও মধ্যবর্তী ছালাতের হিফাযত করিও’ (বাক্বারাহ, ২৩৮)। এই আয়াতে ছালাতের মধ্যে সকল ছালাত অন্তর্ভুক্ত কিন্তু তারপরেও আবার মধ্যবর্তী ছালাতের কথা আলাদাভাবে বলা হয়েছে তার গুরুত্ব বুঝানোর জন্য।

(৩) যেহেতু হাদীছের শানে উরুদের মধ্যে উম্মে ক্বায়েস নামক ছাহাবিয়্যার বিষয়টি আছে, তাই সেই ঘটনাকে সামনে রেখে আলাদাভাবে নারীর কথা বলা হয়েছে।

বিবাহ করা তো হালাল কাজ। হালাল কাজের উদ্দেশ্যে হিজরত করলে সমস্যা কি?

মানুষ রুযী-রুটির জন্য, পড়াশোনার জন্য, উন্নত জীবনের জন্য নিজ মাতৃভূমি ছাড়তে পারে। শরী‘আতের দৃষ্টিতে এটি একটি হালাল কাজ। দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে মাতৃভূমি ছাড়ার মত হালাল কাজকে কেন এই হাদীছে নিন্দাসূচক হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মূল কারণ হচ্ছে- যে কাজ দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে করা হয়, সেটাকে শুধু দুনিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখাই উচিত। যখন সেই দুনিয়াবী কাজের উপর ধর্মীয় লেবাস লাগানোর চেষ্টা করা হয়, তখনই সেটা গুনাহে পরিণত হয়। আপনি মানুষকে দেখানোর চেষ্টা করেন যে, আপনি দ্বীনী কাজ করছেন কিন্তু ভিতরে আপনার দুনিয়াবী উদ্দেশ্য, এটা রিয়া। এটা মহা গুনাহ।

শর্ত ও তার উত্তর একই কেন?

তুমি যদি ভাত খাও, তাহলে তুমি ভাত খাবে। এই ধরনের বাক্য আসলে অর্থবোধক নয়। কেননা এখানে শর্তযুক্ত অংশের সাথে শর্তের উত্তরের মধ্যে কোন পার্থ্যক্য নেই। শর্তও করা হচ্ছে ভাত খাওয়া নিয়ে আবার সেই শর্ত পূরণ করলে যা হবে সেটাও ভাত খাওয়া নিয়ে। বরং শর্তযুক্ত বাক্যের নিয়ম হচ্ছে শর্ত ও তার ফলের মধ্যে ভিন্নতা থাকতে হবে। তুমি যদি ভাত খাও তাহলে তুমি শক্তি পাবে। এখানে শর্ত ও তার ফলের মধ্যে ভিন্নতা আছে। ঠিক তেমনি হাদীছের বাক্য, ‘তার হিজরত যদি হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য তাহলে সেটি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য গণ্য হবে’। এই বাক্যে শর্ত ও তার ফলের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এই সমস্যার মুহাদ্দিছগণ বিভিন্নভাবে জবাব দিয়েছেন। যথা-

(১) মূলত শর্ত ও ফলের পরে কিছু শব্দ গোপন আছে, যেগুলো শর্ত ও তার ফলের অর্থকে স্পষ্ট করে। আর তা হচ্ছে

فمن كانت هجرته إلى الله ورسوله نية وعقدًا، فهجرته إلى الله ورسوله حكمًا وشرعًا

‘আর যার হিজরতের (নিয়্যত, ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য) হবে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য, তার হিজরতের (হুকুম তথা কবুল হওয়াটা) হবে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্যই’। বন্ধনীর মধ্যকার অংশগুলো বাক্যের মধ্যে গোপন ছিল যা শর্ত ও ফলের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করে। তথা শর্ত হচ্ছে, নিয়্যত বিষয়ক আর ফল হচ্ছে হুকুম ও কবুল বিষয়ক। নিয়্যতে ইখলাছ থাকলে সেই আমলের হুকুম হচ্ছে তা কবুল হবে ইনশাআল্লাহ।[12] 

(২) প্রথম জবাবটিই বেশী প্রণিধানযোগ্য হলেও কেউ কেউ আরো একটি জবাব দিয়েছেন। আর তা হচ্ছে, সাধারণত আরবী বাক্যে শর্ত ও ফল মূলত গুরুত্ব বা তাকীদ বুঝানোর জন্য একই করা হয়। যেমন আমরা অনেক সময় বলে থাকি, আমিই সেই আমি। এই বাক্যে উদ্দেশ্য ও বিধেয় উভয়ই একই হলেও অর্থের মধ্যে পার্থক্য আছে। অর্থের মধ্যে তাকীদ দিয়ে গুরুত্বারোপ করে বলা হয়েছে যে, তোমরা যে আমিকে চিনো সেই বিখ্যাত আমি মূলত আমিই। ঠিক তেমনি এই হাদীছে গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে যে, যার আমল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য হবে তার আমল সত্যিই অবশ্যই নিঃসন্দেহে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্যই গণ্য হবে। এই তাকীদ বা গুরুত্বারোপের জন্য শর্ত ও ফলকে হাদীছে একই করা হয়েছে। ওয়াল্লাহু আলাম।[13]

ল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য হিজরতের ক্ষেত্রে স্পষ্ট উত্তর ও দুনিয়ার জন্য হিজরতের ক্ষেত্রে কেন অস্পষ্ট উত্তর?

হাদীছের বাক্যে যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে হিজরতের কথা বলা হয়েছে, তখন তার ফলটা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্যই গণ্য হবে। অন্য দিকে যখন দুনিয়ার জন্য হিজরতের কথা বলা হয়েছে তখন তার ফলটা স্পষ্টভাবে না বলে অস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, তার হিজরত সেই জন্যই গণ্য হবে যেজন্য সে হিজরত করেছে। এর কারণ বিষয়ে মুহাদ্দিছগণ যা বলেছেন তা নিমণরূপ-

(১) প্রথমত, মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম আলাদাভাবে উল্লেখ করার মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি আছে। তাদের নাম সম্মানজনক। বার বার পড়লেও কোন বিরক্তি আসবে না। অন্যদিকে দুনিয়া ও নারীর জন্য হিজরত করা কোন সম্মানজনক বিষয় নয়, বরং তা একটি গুনাহের কাজ। তাই যত কম উল্লেখ করা যায়, তত ভাল।[14] 

(২) দ্বিতীয়ত, দুনিয়ার নিয়্যতের মধ্যে অনেক কিছু আছে। যেমন, ধন-সম্পদের জন্য হিজরত, জমি-জায়গার জন্য হিজরত, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য হিজরত ইত্যাদি। তাই দুনিয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক বাক্য ব্যবহার করাই যুক্তিসঙ্গত যাতে সকল কিছুই তার মধ্যে চলে আসে। এজন্য হাদীছের শেষ বাক্য, ‘আর তার হিজরত সেই হিসাবেই গণ্য হবে যে জন্য সে হিজরত করেছে’ যথোপযুক্ত। এই বাক্যের জন্য হিজরতকারী যে দুনিয়াবী উদ্দেশ্যেই হিজরত করুক না কেন এই হাদীছের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।[15]

সর্বনাম কেন ব্যবহার করা হল না :

এমনকি এখানে সর্বনামও ব্যবহার করা হয়নি। তথা যদি বলা হত, ‘আর যে হিজরত করবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য তার হিজরত তাদের উভয়ের জন্যই গণ্য হবে’। পুনরায় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম আলাদাভাবে না বলে তার পরিবর্তে সর্বনাম ব্যবহার করা যেত। কিন্তু আমাদের জানা থাকা যরূরী যে, মহান আল্লাহকে কোন কিছুর সাথে সর্বনামের মধ্যে একত্রিত করা উচিত নয়। কেননা তিনি একক। তার সাথে কোন ধরনের অংশীদারিত্ব জায়েয নয়। এমনকি শাব্দিক অংশীদারত্বি থেকেও তিনি পাক ও পবিত্র। তাই একই শব্দে মহান আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে সর্বনাম হিসাবে একত্রিত করা উচিত। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে একজন ব্যক্তি এই রকম মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সর্বনাম হিসাবে একত্রিত করে বলায় তিনি তাকে নিষেধ করেন।[16] উল্লেখ্য, স্বয়ং রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করলেও তিনি নিজে অনেক হাদীছে মহান আল্লাহ ও তাঁর নামকে সর্বনামের মধ্যে একত্রিত করেছেন।[17] এর উত্তরে অধিকাংশ মুহাদ্দিছ বলেছেন, এটা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে খাছ। আমাদের কখনই মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামকে সর্বনামের মধ্যে একত্রিত করা উচিত হবে না।

হাদীছ থেকে নির্গত মাসআলা-মাসায়েলের সারমর্ম :

(১) সকল কাজের শুরুতে অন্তরের নিয়্যতকে সংশোধন করে নেওয়া যরূরী। এমনকি কাজ চলমান অবস্থায়ও শয়তান ধোঁকা দিলে বারবার অন্তরের নিয়্যত সংশোধন করতে থাকতে হবে।

(২) যে কাজের নিয়্যত বিশুদ্ধ মহান আল্লাহ তা কবুল করে নেন।

(৩) ইবাদতে নিয়্যত যরূরী। নিয়্যত বিহীন ইবাদত তথা ত্রুটিযুক্ত নিয়্যত ইবাদতকে নষ্ট করে দেয়।

(৪) ইবাদতে রিয়া চলে আসলে তা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হয়।

(৫) অযূতেও নিয়্যত করতে হবে, এটাই সঠিক মত।

(৬) নিয়্যত অন্তরের কাজ। মুখে নিয়্যত উচ্চারণ করা বিদ‘আত।

(৭) নিয়্যতের মাধ্যমে দুনিয়ার সকল কাজকেই নেকীতে পরিণত করা সম্ভব।

(৮) হিজরত ক্বিয়ামত পর্যন্ত বাকী থাকবে।

(৯) অর্থ ঠিক রেখে প্রয়োজন মাফিক হাদীছের শব্দ ও বাক্য বিলুপ্ত করা জায়েয।

(১০) খুৎবার মধ্যে আজে-বাজে মনগড়া কথা বাদ দিয়ে হাদীছ বলা উত্তম, যেমনটা ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন।

হাদীছের শিক্ষা :

ফিক্বহী আলোচনার একটা মৌলিক সমস্যা হচ্ছে, পাঠক হাদীছের বিভিন্ন মাসায়েল নিয়ে ইমামগণের মতভেদ, হাদীছের বিভিন্ন শব্দ ও বাক্যের আরবী গ্রামারগত বিশ্লেষণ ইত্যাদি পড়তে পড়তে একটা পর্যায়ে হাদীছের মূল রূহটাই হারিয়ে ফেলে। অথচ স্বয়ং রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হাদীছটি বলেছিলেন, তখন তার সাথে এত বিস্তারিত ব্যাখ্যা ছাহাবীদের শিক্ষা দেওয়া উদ্দেশ্য ছিল না; বরং হাদীছের মূল শিক্ষা, হাদীছের আসল প্রাণটা যেন ছাহাবায়ে কেরাম হৃদয়াঙ্গম করতে পারেন, সেটার উপর আমল করতে পারেন- এটাই ছিল মূল উদ্দেশ্যে। আমাদের এই নিয়্যতের হাদীছের উপর দীর্ঘ আলোচনা শেষে আমাদের অবশ্যই হাদীছের মূল শিক্ষায় ফিরে যাওয়া উচিত। ঠিক যেজন্য আমাদের রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে হাদীছটি শুনিয়েছেন। আর তা হচ্ছে ইখলাছ। আমরা এই হাদীছের সকল ব্যাখ্যা ভুলে গেলেও যেন এতটুকু না ভুলি যে, আমাদের সকল আমল হতে হবে ইখলাছের সাথে। যদি ইখলাছ না থাকে তাহলে আমাদের সৎ আমলই আমাদের জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে। জান্নাত তো বহুদূর। ইখলাছ না থাকলে আমরা ছালাত আদায় করে জাহান্নামে যাব। ছিয়াম রেখে জাহান্নামী হব। দাওয়াত দিয়ে জাহান্নামী হব। কুরআন-হাদীছ লিখে জাহান্নামী হব। হে আল্লাহ আপনি আমাদের অন্তরে ইখলাছ দান করুন! আমাদের এই গ্রন্থ মিন্নাতুল বারীও শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্য কবুল করুন হে আল্লাহ! ইখলাসের স্বাদে আমাদের হৃদয় পূর্ণ করে দিন! একনিষ্ঠতার বারি সিঞ্চনে আমাদের তৃঞ্চার্ত হৃদয়ের পিপাসা দূর করুন! নিশ্চয় আমার ছালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু উভয় জাহান ও তার মাঝে যা কিছু আছে তার একচ্ছত্র অধিপতি মহান আল্লাহর জন্য। আর তিনিই সর্বশক্তিমান, পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু! আমরা তারই ক্ষমা ও দয়ার ভিখারী! তারই গোলাম!

(চলবে)


[1]. হুমায়দী, মুসনাদ, হা/২৮। 

[2]. ইমাম জাওহারী, মুসনাদুল মুওয়াত্ত্বা, হা/৪; ইমাম বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা, হা/১৪৯৯৬। 

[3]. আসক্বালানী, ফাতহুল বারী, ১/১৫। 

[4]. প্রাগুক্ত। 

[5]. প্রাগুক্ত। 

[6]. প্রাগুক্ত। 

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/২৭৮৩। 

[8]. আবুদাঊদ, হা/২৪৭৯। 

[9]. আলবানী, ইরওয়াউল গালীল, হা/১২০৮।। 

[10]. ছহীহ ইবনু হিববান, হা/২৩০। 

[11]. আসক্বালানী, ফাতহুল বারী, ১/১৫। 

[12]. আইনী, উমদাতুল ক্বারী, ১/২৪। 

[13]. প্রাগুক্ত। 

[14]. সালিমুল্লাহ খান, কাশফুল বারী, ১/২৮৬। 

[15]. প্রাগুক্ত। 

[16]. ছহীহ মুসলিম, হা/৮৭০। 

[17]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৬৯৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৩; আবুদাঊদ, হা/১০৯৭। 

Magazine