ষষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ নছীহত: ইয়াতীমের ধনসম্পদ ভক্ষণ করা নিষেধ
মহান আল্লাহ বলন,وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ ‘আর তোমরা ইয়াতীমের সম্পদের নিকটবর্তী হয়ো না, সুন্দর পন্থা ছাড়া। যতক্ষণ না সে পরিণত বয়সে উপনীত হয়’ (আল-আনআম, ৬/১৫২)। এই আয়াতে حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ বলতে পরিণত বয়সে উপনীত হওয়ার কথা বুঝানো হয়েছে।
সমাজের এক দুর্বল শ্রেণির লোক হচ্ছে ইয়াতীম তথা অনাথ শ্রেণির লোক। তাদের সাথে সদাচরণ করার অনেক ফযীলত শরীআতে এসেছে।
নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি হাদীছে অনুরূপ এসেছে, আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,كَافِلُ الْيَتِيمِ لَهُ أَوْ لِغَيْرِهِ أَنَا وَهُوَ كَهَاتَيْنِ فِي الْجَنَّةِ ‘আত্মীয় বা অনাত্মীয় ইয়াতীমের রক্ষণাবেক্ষণকারী ও আমি জান্নাতে এ দুই আঙুলের ন্যায় কাছাকাছি থাকব’।[1] وَأَشَارَ مَالِكٌ بِالسَّبَّابَةِ وَالْوُسْطَى বর্ণনাকারী মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু হাদীছ বর্ণনার সময় শাহাদাত ও মধ্যমা অঙ্গুলি দ্বারা ইঙ্গিত করে দেখালেন।
আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا هُنَّ قَالَ الشِّرْكُ بِاللَّهِ وَالسِّحْرُ وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِى حَرَّمَ اللَّهُ إِلاَّ بِالْحَقِّ وَأَكْلُ الرِّبَا وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ وَالتَّوَلِّى يَوْمَ الزَّحْفِ وَقَذْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ الْغَافِلاَتِ ‘সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে তোমরা বিরত থাকবে’। ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! সেগুলো কী? তিনি বললেন, ‘(১) আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, (২) জাদু, (৩) আল্লাহ তাআলা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, শরীআত-সম্মত কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করা, (৪) সূদ খাওয়া, (৫) ইয়াতীমের মাল গ্রাস করা, (৬) রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং (৭) সরলস্বভাবা সতীসাধ্বী মুমিন নারীদের অপবাদ দেওয়া’।[2]
সপ্তম গুরুত্বপূর্ণ নছীহত: ওযন-মাপে পূর্ণ মাত্রায় দেওয়ার আদেশ
মহান আল্লাহ বলেন,وَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ لَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ‘আর পরিমাপ ও ওযন ইনছাফের সাথে পরিপূর্ণ দেবে। আমি কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব অর্পণ করি না’ (আল-আনআম, ৬/১৫২)।
এই ব্যাপারে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি হাদীছ এসেছে। ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যবসায়ীদের বলেন, إِنَّكُمْ قَدْ وُلِّيتُمْ أَمْرًا فِيهِ هَلَكَةُ الْأُمَّةِ السَّالِفَةِ ‘তোমাদেরকে এমন কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে পূর্বের উম্মত ধ্বংস হয়ে গেছে’।[3]
অষ্টম গুরুত্বপূর্ণ নছীহত: হক্ব এবং সত্য বলার আদেশ
মহান আল্লাহ বলেন, وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى ‘আর যখন তোমরা কথা বলবে; তখন ন্যায্য বলবে, স্বজনের সম্পর্কে হলেও’ (আল-আনআম, ৬/১৫২)।
وَأَوْفُوا الْكَيْلَ-তে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ন্যায়-ইনছাফের আদেশ রয়েছে এবং وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا-তে কথাবার্তার ক্ষেত্রে ন্যায়-ইনছাফের আদেশ রয়েছে। وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى বলে এটা বুঝানো হয়েছে যে, ইনছাফের ক্ষেত্রে বংশীয় সম্পর্কের কোনো বিশেষ অবস্থান নেই। এই ব্যাপারে একটি হাদীছ এসেছে।
أَنَّ قُرَيْشًا أَهَمَّهُمْ شَأْنُ الْمَرْأَةِ الْمَخْزُومِيَّةِ الَّتِيْ سَرَقَتْ فَقَالُوْا وَمَنْ يُكَلِّمُ فِيْهَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالُوْا وَمَنْ يَجْتَرِئُ عَلَيْهِ إِلَّا أُسَامَةُ بْنُ زَيْدٍ حِبُّ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَلَّمَهُ أُسَامَةُ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَتَشْفَعُ فِيْ حَدٍّ مِنْ حُدُوْدِ اللهِ ثُمَّ قَامَ فَاخْتَطَبَ ثُمَّ قَالَ إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِيْنَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوْا إِذَا سَرَقَ فِيْهِمْ الشَّرِيْفُ تَرَكُوْهُ وَإِذَا سَرَقَ فِيْهِمْ الضَّعِيْفُ أَقَامُوْا عَلَيْهِ الْحَدَّ وَايْمُ اللهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا.
আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, মাখযূম গোত্রের এক চোর নারীর ঘটনা কুরাইশের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করে তুলল। এ অবস্থায় তারা বলাবলি করতে লাগলেন, এ ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে কে আলাপ করতে পারে? তারা বললেন, একমাত্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রিয়তম উসামা ইবনে যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এ ব্যাপারে আলোচনা করার সাহস করতে পারেন। উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে কথা বললেন। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত সীমালঙ্ঘনকারিণীর সাজা মওকূফের সুপারিশ করছ?’ অতঃপর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে খুৎবায় বললেন, ‘তোমাদের পূর্বের জাতিসমূহকে এ কাজই ধ্বংস করেছে যে, যখন তাদের মধ্যে কোনো বিশিষ্ট লোক চুরি করত, তখন তারা বিনা সাজায় তাকে ছেড়ে দিত। অন্যদিকে যখন কোনো অসহায় গরীব সাধারণ লোক চুরি করত, তখন তার উপর হদ্দ জারি করত। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মাদ এর কন্যা ফাতেমা চুরি করত, তাহলে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম’।[4]
সাথে এটাও মনে রাখা দরকার যে, وَإِذَا قُلْتُمْ এর সম্পর্ক দ্বীনের দাওয়াতের সাথেও রয়েছে। যেখানে ন্যায়-ইনছাফের অর্থ হচ্ছে যে, এদিক সেদিক করে দলীলের ভাবার্থ যেন পরিবর্তন না হয় এবং বাড়াবাড়ি ও অনর্থক জিনিস থেকে বেঁচে থাকতে হবে।
নবম গুরুত্ব পূর্ণ নছীহত: অঙ্গীকারপূরণ করার আদেশ
মহান আল্লাহ বলেন, وَبِعَهْدِ اللَّهِ أَوْفُوا ‘আর আল্লাহকে দেওয়া অঙ্গীকার পূর্ণ করবে’ (আল-আনআম, ৬/১৫২)।
এখানে أَوْفُوا-কে পরে নিয়ে এসে এটা বুঝানো হয়েছে যে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন সবার আগে।
‘ওয়াদা’ وعد এক পক্ষ থেকে হয় এবং ‘আহদ’عهد দুই পক্ষ থেকে হয় আর ‘আক্বদ’ عقد যেটা লিখিত আকারে হয়। এ ব্যাপারে একটি হাদীছ এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا أَوْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْ أَرْبَعَةٍ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ.
‘চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকে, সে মুনাফেক্ব অথবা যার মধ্যে এ চারটি স্বভাবের কোনো একটা থাকে, তার মধ্যেও মুনাফেক্বীর একটি স্বভাব থাকে, যে পর্যন্ত না সে তা পরিত্যাগ করে— (১) সে যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, (২) যখন ওয়াদা করে ভঙ্গ করে, (৩) যখন চুক্তি করে তা লঙ্ঘন করে এবং (৪) যখন ঝগড়া করে অশ্লীল বাক্যালাপ করে’।[5]
গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট:
১৫১ নম্বর আয়াতের শেষে تَعْقِلُونَ রয়েছে। ইমাম রাযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এই আয়াতে পাঁচটি এমন আদেশ-নিষেধ রয়েছে, যেগুলো জানা ও বুঝা জরুরী।
আর ১৫২ নম্বর আয়াতে تَذْكُرُوْنَ এর পরিবর্তে تَذَكَّرُونَ নিয়ে এসে এটা বুঝানো হয়েছে যে, শুধু স্মরণ করা উদ্দেশ্য নয়; বরং অন্তরে সেই উপদেশগুলোকে বারবার জায়গা দেওয়া এবং তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করাই মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সাথে সাথে এটাও জানা গেল যে, যখন অন্তরের মাধ্যমে স্মরণ করা হবে; তখন মুখ দিয়েও স্মরণ করা হয়ে যায়।
১৫১ নম্বর আয়াতের পাঁচটি নছীহতে تَعْقِلُونَ নিয়ে এসে এটা বুঝানো হয়েছে যে, সেগুলো একদম স্পষ্ট এবং এখানে تَذَكَّرُونَনিয়ে এসে এটা বুঝানো হয়েছে যে, এই চারটি নছীহতে চিন্তাভাবনা আর পরিশ্রমের প্রয়োজন রয়েছে, যাতে করে সমতা বজায় থাকে।
দশম গুরুত্বপূর্ণ নছীহত: সরল পথের অনুসরণ
মহান আল্লাহ বলেন,وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ‘আর এ পথই আমার সরল পথ। কাজেই তোমরা এর অনুসরণ করো এবং বিভিন্ন পথ অনুসরণ করবে না, করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করবে। এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা তাক্বওয়ার অধিকারী হও’ (আল-আনআম, ৬/১৫৩)।
এই হাদীছে এটা উপদেশ রয়েছে যে, শুধু সরল পথেরই অনুসরণ করতে হবে। ছিরাতে মুস্তাক্বীম এর ব্যাখ্যা এক হাদীছে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই করেছেন। হাদীছটি হলো এরকম, জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
كُنَّا عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَخَطَّ خَطًّا وَخَطَّ خَطَّيْنِ عَنْ يَمِينِهِ وَخَطَّ خَطَّيْنِ عَنْ يَسَارِهِ ثُمَّ وَضَعَ يَدَهُ فِي الْخَطِّ الأَوْسَطِ فَقَالَ " هَذَا سَبِيلُ اللَّهِ ثُمَّ تَلاَ هَذِهِ الآيَةَ وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلاَ تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ
আমরা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত থাকা অবস্থায় তিনি একটি সরলরেখা টানলেন এবং তার ডান দিকে দুটি সরলরেখা টানলেন এবং বাম দিকেও দুটি সরলরেখা টানলেন। অতঃপর তিনি মধ্যবর্তী রেখার উপর তাঁর হাত রেখে বলেন, ‘এটা আল্লাহর রাস্তা। অতঃপর তিনি এ আয়াত তেলাওয়াত করেন, আর এ পথই আমার সরল পথ। অতএব, তোমরা এ পথেরই অনুসরণ করো এবং বিভিন্ন পথ অনুসরণ করো না; অন্যথা তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে’।[6]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজের পথকে ‘ছিরাত’ বলেছেন। কেননা সেটা সহজ।
অন্যান্য পথ ছেড়ে দিয়ে শুধু নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পথকে গ্রহণ করাই হচ্ছে ছিরাতে মুস্তাক্বীম বা সরল পথ। মতানৈক্য ও মতপার্থক্য থেকে বাঁচার এটাই একমাত্র রাস্তা। যেমন মহান আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
‘আর কারো নিকট সৎ পথ প্রকাশিত হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যেদিকে সে ফিরে যায় সে দিকেই তাকে আমরা ফিরিয়ে দেব এবং তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করাব আর তা কতই না মন্দ আবাস!’ (আন-নিসা, ৪/১১৫)।
কুরআন মাজীদের প্রথম সূরাতেই ‘ছিরাতে মুস্তাক্বীম’-এর ব্যাখ্যা করে দেওয়া হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ - صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ ‘আমাদেরকে সরল পথের হেদায়াত দিন। তাদের পথ, যাদেরকে আপনি নেয়ামত দিয়েছেন’ (আল-ফাতিহা, ১/৫-৬)। তাই সেই পথ হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্যের পথ। যেমন মহান আল্লাহ বলেন,
وَلَهَدَيْنَاهُمْ صِرَاطًا مُسْتَقِيمًا - وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَئِكَ رَفِيقًا
‘আর অবশ্যই আমরা তাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করতাম। আর কেউ আল্লাহ এবং রাসূলের আনুগত্য করলে সে নবী, ছিদ্দীক্ব (সত্যনিষ্ঠ), শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন তাদের সঙ্গী হবে এবং তারা কতই না উত্তম সঙ্গী!’ (আন-নিসা, ৪/৬৮-৬৯)।
আল্লাহ তাআলার সাথে দৃঢ় সম্পর্ক এবং নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্য ও অনুসরণই হচ্ছে ছিরাতে মুস্তাক্বীম বা সরল পথ। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَمَنْ يَعْتَصِمْ بِاللَّهِ فَقَدْ هُدِيَ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ ‘আর কেউ আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে অবলম্বন করলে সে অবশ্যই সরল পথের হেদায়াতপ্রাপ্ত হবে’ (আলে ইমরান, ৩/১০১)। আল্লাহ তাআলা বলেন,إِنَّ اللَّهَ هُوَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمٌ ‘নিশ্চয় আল্লাহ, তিনিই আমার রব এবং তোমাদেরও রব। অতএব, তোমরা তাঁর ইবাদাত করো, এটাই সরল পথ’ (আয-যুখরুফ, ৪৩/৬৪)। আল্লাহ তাআলা বলেন,وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ - صِرَاطِ اللَّهِ الَّذِي لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ أَلَا إِلَى اللَّهِ تَصِيرُ الْأُمُورُ ‘আর আপনি তো অবশ্যই সরল পথের দিকে দিকনির্দেশ করেন। সেই আল্লাহর পথ, যিনি আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে তার মালিক। জেনে রাখুন! সব বিষয় আল্লাহরই দিকে ফিরে যাবে’ (আশ-শূরা, ৪২/৫২-৫৩)। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَاتَّبِعُونِ هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمٌ ‘আর তোমরা আমারই অনুসরণ করো। এটাই সরল পথ’ (আয-যুখরুফ, ৪৩/৬১)।
যদি কোনো বিষয়ে মতভেদ সৃষ্টি হয়, তাহলে তার সমাধানও এটা যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে ফিরে যেতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا
‘হে ঈমাদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসূলের আনুগত্য করো, আরও আনুগত্য করো তোমাদের মধ্যকার ক্ষমতাশীলদের। অতঃপর কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে তা উপস্থাপিত করো আল্লাহ ও রাসূলের নিকট, যদি তোমরা আল্লাহ ও আখেরাতে ঈমান এনে থাক। এ পন্থাই উত্তম এবং পরিণামে প্রকৃষ্টতর’ (আন-নিসা, ৪/৫৯)।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে এসব বাস্তবায়নের তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
মূল: হাফেয জালালুদ্দীন কাসেমী
বিশিষ্ট দাঈ, ভারত।
পরিমার্জিত অনুবাদ: তাওহীদুর রহমান সালাফী**
ফারেগ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বানারাস, উত্তরপ্রদেশ, ভারত; শিক্ষক, সরল পথ একাডেমি, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
[1]. ছহীহ মুসলিম, ‘মর্মস্পর্শী বিষয়সমূহ ও দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণহীনতা’ অধ্যায়, হা/২৯৮৩।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/২৭৬৬।
[3]. মুসতাদরাক হাকেম, ‘ব্যবসা’ অধ্যায়, ২/৩০, হা/২২৩২, সূত্র দুর্বল। এই বর্ণনায় হুসাইন ইবনে কায়স নামে মাতরূক রাবী রয়েছে।
[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৭৫।
[5]. ছহীহ বুখারী, ‘অত্যাচার ও লুণ্ঠন’ অধ্যায়, হা/২৪৫৯।
[6]. ইবনু মাজাহ, ‘সুন্নাহ’ অধ্যায়, হা/১১, ইমাম আলবানী হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন, যদিও কিছু মুহাক্কিক্ব সেই হাদীছের সূত্রকে দুর্বল বলেছেন।
