ভূমিকা: দ্বীন ইসলাম ক্বিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম। বর্তমান যুগে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতির ফলে এমন কিছু বিষয় সামনে এসেছে, যা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ছিল না। নিচে ছিয়াম বিষয়ক এমন কিছু মাসআলা-মাসায়েল তুলে ধরা হলো:
(১) আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে চাঁদ দেখা:
বিবরণ: খালি চোখে চাঁদ দেখাই শরীআতের মূলনীতি হলেও বর্তমান যুগে টেলিস্কোপ বা আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে চাঁদ দেখার বিধান কী?
পর্যালোচনা: অধিকাংশ আধুনিক আলেমের মতে, যেকোনো উপায়ে চাঁদ দেখা নিশ্চিত হওয়াই মূল উদ্দেশ্য। সঊদী আরবের ‘মাজলিসু হাইআতি কিবারিল ওলামা’ সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে, যদি টেলিস্কোপের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে চাঁদ দেখা যায়, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে— যদিও তা খালি চোখে দেখা না যায়। হাদীছে দেখার মাধ্যম নির্দিষ্ট করা হয়নি, বরং ‘দর্শন’কে শর্ত করা হয়েছে।
(২) জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব:
বিবরণ: বর্তমানে জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব অত্যন্ত সূক্ষ্ম। চাঁদ দেখা যাওয়ার আগেই কি এই হিসাবের ওপর ভিত্তি করে রামাযান বা ঈদ ঘোষণা করা যাবে?
পর্যালোচনা: শরীআতের বিধান হলো- আকাশ পরিষ্কার থাকলে কেবল চাঁদ দেখেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে বা কারো চাঁদ দেখার সাক্ষ্য নিয়ে সন্দেহ হলে জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবকে ‘সহায়ক’ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কেবল হিসাবের ওপর নির্ভর করে ছিয়াম শুরু বা শেষ করা জায়েয নয়।
(৩) চাঁদ দেখার উদয়স্থলের ভিন্নতা:
বিবরণ: পৃথিবীর এক প্রান্তের চাঁদ দেখা কি অন্য প্রান্তের মানুষের জন্য প্রযোজ্য? নাকি ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে উদয়স্থলের ভিন্নতা অনুযায়ী আলাদা আলাদা স্থানে ভিন্ন ভিন্ন দিনে ছিয়াম বা ঈদ পালন করা যাবে?
পর্যালোচনা: উদয়স্থলের ভিন্নতা একটি বাস্তব ও প্রমাণিত বিষয়। নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী, প্রতিটি ভূখণ্ডের বা দেশের মানুষ তাদের নিজস্ব চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে ছিয়াম পালন করবে। এটি শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়্যা, শায়খ ইবনে বায এবং শায়খ ইবনে উছায়মীন রাহিমাহুমুল্লাহ-এর অভিমত। আন্তর্জাতিক ফিক্বহ অ্যাকাডেমিও একই সিদ্ধান্ত দিয়েছে। তারা মনে করেন, ঈদ বা ছিয়াম সারাবিশ্বে একদিনে পালন করার চেয়ে কুরআন ও সুন্নাহর বিধান অনুযায়ী নিজ নিজ স্থানে চাঁদ দেখে আমল করাই উম্মাহর প্রকৃত ঐক্যের ভিত্তি।
(৪) বিমান যাত্রীর ইফতার ও সূর্যোদয়:
বিবরণ: কোনো ব্যক্তি জমিনে সূর্যাস্ত দেখে ইফতার করল, কিন্তু বিমান উড্ডয়নের পর উচ্চতার কারণে পুনরায় সূর্য দেখতে পেল। তার বিধান কী?
পর্যালোচনা: সঊদী ফাতাওয়া বোর্ড ও শায়খ উছায়মীনের মতে, তার ছিয়াম বিশুদ্ধ এবং সে খানা-পিনা চালিয়ে যেতে পারবে। কারণ সে শারঈ দলীলের ভিত্তিতে ইফতার করেছে, তাই নতুন কোনো দলীল ছাড়া তা বাতিল হবে না।
(৫) আরামদায়ক বাহনে ভ্রমণকারীর ছিয়াম ভঙ্গের অনুমতি:
বিবরণ: প্রাচীনকালে সফর ছিল অত্যন্ত কষ্টের। এখন বিমান বা এসিতে সফর করলে কষ্ট হয় না। এমতাবস্থায় কি সফরকারী ছিয়াম ভাঙতে পারবে?
পর্যালোচনা: সফর আরামদায়ক হলেও মুসাফিরের জন্য ছিয়াম না রাখার সুযোগ বহাল থাকবে। ইসলামে সফরকে শর্ত করা হয়েছে, সফর ‘কষ্টকর’ হওয়াকে আবশ্যিক শর্ত করা হয়নি।
(৬) দীর্ঘ দিন বা রাতের দেশে ছিয়াম:
বিবরণ: যেসব দেশে দিন বা রাত ২৪ ঘণ্টার বেশি দীর্ঘ অথবা দিন অস্বাভাবিক বড় (২০ ঘণ্টার বেশি), তারা কীভাবে ছিয়াম পালন করবে?
পর্যালোচনা: ১. যেখানে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার বেশি, সেখানে নিকটতম স্বাভাবিক দেশের সময় অনুযায়ী ‘হিসাব’ (Estimate) করতে হবে। ২. যেখানে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আবর্তিত হয় (যেমন ২০ ঘণ্টা দিন), সেখানে ফজর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ছিয়াম পালন ওয়াজিব, যদি না জীবনহানির শঙ্কা থাকে। দাজ্জাল-সংক্রান্ত হাদীছে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘ দিনের ক্ষেত্রে সময় অনুমান করার নির্দেশ দিয়েছেন।
(৭) কুলি (গার্গল) এবং মুখে ব্যবহারের স্প্রে:
বিবরণ: ছিয়াম অবস্থায় গলা পরিষ্কার বা ব্যথার জন্য কুলি (Gargling) করা অথবা মুখের ভেতরে ব্যবহারের ঔষধযুক্ত স্প্রে (Oral Spray) ব্যবহার করার বিধান কী?
পর্যালোচনা: এগুলো ব্যবহারের কারণে ছিয়াম নষ্ট হবে না। তবে শর্ত হলো, গার্গল করার সময় পানি বা স্প্রে করার সময় ঔষধের কোনো অংশ যেন কোনোভাবেই কণ্ঠনালি অতিক্রম করে পেটে চলে না যায়। এই মাসআলাটি কুলি করা বা মেসওয়াক করার মাসআলার অন্তর্ভুক্ত। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো কিছু সরাসরি খাদ্যনালি দিয়ে পাকস্থলীতে প্রবেশ না করে, ততক্ষণ ছিয়াম নষ্ট হয় না।
(৮) ইনহেলার বা পাফার ব্যবহারের বিধান:
বিবরণ: এ্যাজমা রোগীদের ব্যবহৃত ইনহেলারের অতি সামান্য অংশ পাকস্থলীতে পৌঁছাতে পারে। এতে ছিয়াম ভাঙবে কি?
পর্যালোচনা: এতে ছিয়াম নষ্ট হবে না। কারণ পাকস্থলীতে যে পরিমাণ ওষুধ যায় তা এক ফোঁটারও কম এবং তা কুলি করার পর অবশিষ্ট পানির চেয়েও নগণ্য। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিয়াম অবস্থায় অসংখ্যবার মিসওয়াক করতেন। মিসওয়াকের রাসায়নিক উপাদান যেভাবে লালার সাথে পেটে যায়, ইনহেলারও তদ্রূপ।
(৯) অক্সিজেন গ্রহণ:
বিবরণ: শ্বাসকষ্টে রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া হয়, এর বিধান কী?
পর্যালোচনা: অক্সিজেন দিলে ছিয়াম নষ্ট হয় না। কারণ এটি কোনো খাদ্য বা পানীয় নয়। এটি পাকস্থলীতে পুষ্টি সরবরাহ করে না।
(১০) জিহ্বার নিচে রাখার ট্যাবলেট (Sublingual Tablet):
বিবরণ: হার্ট অ্যাটাকের মতো জরুরী অবস্থায় অনেক সময় জিহ্বার নিচে বিশেষ ট্যাবলেট রাখা হয়। এতে ছিয়াম ভাঙবে কি?
পর্যালোচনা: এটি জায়েয এবং এতে ছিয়াম নষ্ট হয় না। তবে শর্ত হলো, লালার সাথে ঔষধের কোনো অংশ গিলে ফেলা যাবে না। এই ঔষধটি জিহ্বার নিচ থেকে সরাসরি রক্তের মাধ্যমে হৃদপিণ্ডে পৌঁছে যায় এবং এটি খাদ্যনালি দিয়ে পাকস্থলীতে প্রবেশ করে না। তবে, জরুরী অবস্থা ছাড়া এটা এড়িয়ে চলা উচিত।
(১১) কানের ড্রপ ও কান পরিষ্কার করা (Ear Wash):
বিবরণ: ছিয়াম অবস্থায় কানে ঔষধের ড্রপ দেওয়া অথবা কোনো তরল বা সলিউশন দিয়ে কান পরিষ্কার করার বিধান।
পর্যালোচনা: নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী, কানে ড্রপ দিলে বা কান পরিষ্কার করলে ছিয়াম নষ্ট হয় না। কারণ কান মূলত কণ্ঠনালির সাথে সরাসরি যুক্ত কোনো ছিদ্র বা পথ নয়। তবে যদি কারও কানের পর্দা ফাটা থাকে এবং ঔষধ বা পানি কণ্ঠনালিতে পৌঁছে যায়, তবে বিষয়টি লক্ষ্যণীয়: যদি তা পরিমাণে খুব সামান্য হয় (যেমন ওযু বা কুলির পর মুখে লেগে থাকা অবশিষ্ট আর্দ্রতা), তবে তা ক্ষমাযোগ্য এবং ছিয়াম নষ্ট হবে না। কিন্তু যদি কান পরিষ্কার করার সময় অধিক পরিমাণে তরল কণ্ঠনালিতে পৌঁছে যায় এবং ব্যক্তি তা গিলে ফেলে, তবে ছিয়াম ভেঙে যাবে।
(১২) চোখের ড্রপ (Eye Drops):
বিবরণ: ছিয়াম অবস্থায় চোখের ঔষধ বা ড্রপ ব্যবহারের বিধান।
পর্যালোচনা: চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে চোখের সাথে নাক ও গলার একটি সংযোগকারী নালি (Tear Duct) রয়েছে। ফলে চোখে ড্রপ দিলে তা গলার ভেতরে পৌঁছানোর একটি পথ রয়েছে। এ কারণে সমসাময়িক আলেমদের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশ ফক্বীহ এবং শায়খ ইবনে বায রাহিমাহুল্লাহ ও শায়খ ইবনে উছায়মীন রাহিমাহুমাল্লাহ-এর মতে— চোখে ড্রপ দিলে ছিয়াম নষ্ট হয় না।
(১৩) নাকের ড্রপ (Nasal Drops):
বিবরণ: ছিয়াম অবস্থায় নাকের ভেতরে ঔষধের ড্রপ বা অন্য কোনো তরল ব্যবহারের বিধান।
পর্যালোচনা: অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতে, নাকে ড্রপ ব্যবহার করলে ছিয়াম ভেঙে যায়। তাঁদের মতে, নাকে দেওয়া ড্রপ বা ঔষধ কণ্ঠনালি হয়ে পাকস্থলীতে পৌঁছতে পারে, যা ছিয়াম ভঙ্গের কারণ হয়। শায়খ ইবনে উছায়মীন রাহিমাহুল্লাহ এই মতটিই গ্রহণ করেছেন।
(১৪) স্বেচ্ছায় রক্তদান:
বিবরণ: বর্তমান যুগে মুমূর্ষু রোগীর প্রয়োজনে রক্তদান করা হয়। এর বিধান কী?
পর্যালোচনা: রক্তদানের বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে অধিকতর স্পষ্ট মতটি হলো— রক্তদানের বিষয়টি ‘হিজামা’ (শিঙা লাগানো) থেকে ভিন্ন। এর বিধান নির্ভর করে শরীর থেকে কতটুকু রক্ত নেওয়া হচ্ছে, তার পরিমাণের ওপর। সুতরাং যখন দান করা রক্তের পরিমাণ অনেক বেশি হবে, তখন তা ছিয়াম ভঙ্গের কারণ হবে; আর যখন রক্তের পরিমাণ সামান্য হবে, তখন তা ছিয়াম ভঙ্গের কারণ হবে না।
(১৫) রক্ত পরীক্ষা (Blood Test):
বিবরণ: শারীরিক বিভিন্ন কারণে রক্ত পরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে, এর বিধান কী?
পর্যালোচনা: রোগ নির্ণয়ের জন্য সামান্য রক্ত বের করলে ছিয়াম নষ্ট হয় না।
(১৬) গ্যাস্ট্রোস্কোপি (Gastroscopy)বা পাকস্থলী পর্যবেক্ষণ:
বিবরণ: গ্যাস্ট্রোস্কোপি হলো এমন একটি পর্যবেক্ষণ যন্ত্র, যা শরীরের ভেতরটা সরাসরি দেখার সুযোগ করে দেয়। এটি মূলত পরিপাকতন্ত্রের উপরের অংশ পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয়।
পর্যালোচনা: মুখ দিয়ে যন্ত্র প্রবেশ করালে যদি তার সাথে কোনো তেল বা ঔষধ থাকে, তবে ছিয়াম ভেঙে যাবে। কিন্তু শুধু শুকনো যন্ত্র প্রবেশ করালে অধিকাংশের মতে ছিয়াম ভাঙবে না।
(১৭) জরায়ুর এন্ডোস্কোপি (Uterine Endoscopy):
বিবরণ: পরীক্ষার জন্য জরায়ুর ভেতরে ক্যামেরা বা এন্ডোস্কোপ প্রবেশ করানো হয়।
পর্যালোচনা: এতে ছিয়াম ভাঙবে না; এমনকি যন্ত্রের গায়ে লুব্রিকেন্ট থাকলেও সমস্যা নেই। কারণ জরায়ু বা প্রজনন অঙ্গের সাথে পাকস্থলীর সরাসরি কোনো পথ নেই।
(১৮) অ্যানেস্থেশিয়া বা অজ্ঞান করার গ্যাস ও ইনজেকশন:
বিবরণ: অস্ত্রোপচার বা চিকিৎসার প্রয়োজনে রোগীকে অজ্ঞান করার জন্য নাক বা মুখ দিয়ে শ্বাসক্রিয়ার মাধ্যমে বিশেষ গ্যাস (Inhaled Anesthesia) গ্রহণ করা অথবা ইনজেকশনের মাধ্যমে শিরার (Intravenous) ঔষধ প্রয়োগ করা হয়। এতে কি ছিয়াম থাকবে?
পর্যালোচনা: আন্তর্জাতিক ফিক্বহ অ্যাকাডেমির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অজ্ঞান করার গ্যাস গ্রহণ করলে ছিয়াম নষ্ট হয় না। কারণ এটি পানাহার নয় এবং এতে কোনো বস্তুগত কণা (Mass) নেই, যা পাকস্থলীতে প্রবেশ করে। মূলত অজ্ঞান করার গ্যাস ফুসফুসে যায় এবং শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ক্রিয়া করে, যা ওযূ বা কুলি করার পর মুখে লেগে থাকা সামান্য পানির আর্দ্রতার মতো ক্ষমাযোগ্য।
তবে যদি অ্যানেস্থেশিয়ার কারণে ফজর থেকে মাগরিব পর্যন্ত পুরো সময় অজ্ঞান থাকে, তাহলে জমহূর ফক্বীহ-এর মতে ছিয়াম হবে না এবং তাকে ক্বাযা আদায় করতে হবে। কারণ ছিয়ামের জন্য ‘নিয়্যত’ ও ‘জ্ঞান’ থাকা জরুরী। অবশ্য যদি দিনের কিছু অংশে অজ্ঞান থাকে, তাহলে ছিয়াম শুদ্ধ হবে।
আর যদি শরীরের নির্দিষ্ট অংশ অবশ করা হয়, তাহলে তাতে ছিয়াম ভঙ্গ হয় না।
(১৯) খাদ্যগুণসমৃদ্ধ ইনজেকশন:
বিবরণ: রোগীকে অনেক সময় খাদ্যগুণসমৃদ্ধ ইনজেকশন দিতে হয়, এটা যাবে কি?
পর্যালোচনা: গ্লুকোজ বা পুষ্টিবাহী ইনজেকশন, যা পানাহারের বিকল্প হিসেবে কাজ করে, তা গ্রহণ করলে ছিয়াম ভেঙে যাবে। এটি মূলত ছিয়ামের মূল উদ্দেশ্য পরিপন্থি।
(২০) ঔষধযুক্ত ইনজেকশন (Medicinal Injection):
বিবরণ: বিভিন্ন রোগে রোগীকে ইনজেকশন নিতে হয়, এর কারণে ছিয়াম ভাঙবে কি?
পর্যালোচনা: এসব ইনজেকশনে ছিয়াম নষ্ট হয় না। কারণ এটি পানাহার নয় এবং খাদ্যনালি দিয়ে পাকস্থলীতে প্রবেশ করে না।
(২১) ক্যাথেটার (Catheter):
বিবরণ: ক্যাথেটার হলো একটি বিশেষ ধরনের সরু নল, যা চিকিৎসার প্রয়োজনে শরীরের কোনো অঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর অনেক ধরনের ব্যবহার থাকলেও, সাধারণ অর্থে ক্যাথেটার বলতে আমরা মূত্রথলির ক্যাথেটার বা ইউরিনারি ক্যাথেটারকেই (Urinary Catheter) বুঝে থাকি।
পর্যালোচনা: মূত্রনালিতে ক্যাথেটার বা ঔষধ প্রয়োগে ছিয়াম নষ্ট হয় না। মূত্রনালির সাথে পাকস্থলীর কোনো সরাসরি সংযোগ নেই।
(২২) ধমনী ক্যাথেটার (Arterial Catheterization):
বিবরণ: হৃদরোগ বা অন্য চিকিৎসার প্রয়োজনে ধমনীতে যে সরু নল (Catheter) প্রবেশ করানো হয়, তাতে ছিয়ামের কোনো ক্ষতি হবে কি?
পর্যালোচনা: আন্তর্জাতিক ফিক্বহ অ্যাকাডেমির মতে, এটি ছিয়াম ভঙ্গ করে না। কারণ এই নলটি ধমনীতে প্রবেশ করানো হয়, যা সরাসরি পানাহার নয় এবং পানাহারের সমপর্যায়ভুক্তও নয়। এছাড়া এটি পাকস্থলীতেও প্রবেশ করে না।
(২৩) মলদ্বার বা যোনিপথে সাপোজিটরি (Suppository) ও ডুশ ব্যবহার:
বিবরণ: অর্শ রোগ বা অন্য চিকিৎসার জন্য মলদ্বার বা যোনিপথে সাপোজিটরি বা ডুশ (Enema) ব্যবহার করা হয়।
পর্যালোচনা: শায়খ ইবনে উছায়মীন রাহিমাহুল্লাহ-এর মতে, এতে ছিয়াম ভঙ্গ হয় না। এটি আধুনিক অধিকাংশ ফক্বীহ-এরও মত। কারণ মলদ্বার বা যোনিপথের সাথে পাকস্থলীর কোনো সরাসরি সংযোগ নেই। এছাড়া সাপোজিটরী কোনো খাদ্য বা পানীয় নয় এবং এটি শরীরকে পুষ্টি জোগায় না।
(২৪) যোনিপথের ধৌতকরণ (Vaginal Wash) ও পরীক্ষা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি:
বিবরণ: নারীদের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার জন্য যোনিপথে জীবাণুনাশক বা ঔষধযুক্ত তরল দিয়ে ধৌত করা (Vaginal Wash), অথবা জরায়ু ও যোনি পরীক্ষার জন্য ক্যামেরা (Endoscope) বা অন্য কোনো আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্র প্রবেশ করানোর বিধান কী?
পর্যালোচনা: এসকল প্রক্রিয়ার কোনোটির মাধ্যমেই ছিয়াম নষ্ট হয় না। এটি আধুনিক অধিকাংশ ফক্বীহ এবং আন্তর্জাতিক ফিক্বহ অ্যাকাডেমির (OIC Fiqh Academy) সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। কারণ যোনিপথে যা প্রবেশ করানো হয়, তা পানাহার নয় এবং পানাহারের কোনো অর্থ বা উদ্দেশ্যও এর দ্বারা পূরণ হয় না। তাছাড়া চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, জরায়ু বা যোনিপথের সাথে পাকস্থলীর সরাসরি কোনো সংযোগ নেই।
(২৫) ত্বকে মলম, ক্রিম এবং ঔষধযুক্ত ব্যান্ডেজ ব্যবহার:
বিবরণ: ছিয়াম অবস্থায় চামড়ার ওপর বিভিন্ন প্রকার মলম, লোশন বা ঔষধযুক্ত ব্যান্ডেজ ব্যবহারের বিধান কী?
পর্যালোচনা:
শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ এবং আন্তর্জাতিক ফিক্বহ অ্যাকাডেমির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চামড়ায় যা কিছু লাগানো হয়, তাতে ছিয়াম নষ্ট হয় না। একইভাবে লেজার দিয়ে ত্বকের চিকিৎসাও বৈধ। কারণ চামড়া বা ত্বক পাকস্থলীতে কোনো কিছু পৌঁছানোর স্বাভাবিক প্রবেশপথ (Normal Inlet) নয়। ছিয়াম ভঙ্গের জন্য কোনো কিছু সরাসরি পাকস্থলীতে পৌঁছানো শর্ত।
(২৬) কিডনি ডায়ালাইসিস (Kidney Dialysis):
বিবরণ: কিডনি বিকল রোগীদের রক্ত পরিশোধনের জন্য ডায়ালাইসিস করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় ছিয়ামের বিধান কী?
পর্যালোচনা: শায়খ ইবনে বায রাহিমাহুল্লাহ এবং সঊদী আরবের স্থায়ী ফতওয়া কমিটির মতে, ডায়ালাইসিস করলে ছিয়াম ভেঙে যাবে। ডায়ালাইসিস প্রক্রিয়ায় শরীর থেকে রক্ত বের করে তা শোধন করা হয় এবং পুনরায় শরীরে প্রবেশ করানোর সময় তাতে প্রয়োজনীয় খনিজ ও পুষ্টি উপাদান যুক্ত করা হয়, যা মূলত খাদ্যের বিকল্প হিসেবে কাজ করে।
(২৭) দন্ত চিকিৎসা (দাঁত তোলা, ফিলিং ও লেজার):
বিবরণ: ছিয়াম অবস্থায় দাঁত তোলা, ড্রিল করা বা লেজার দিয়ে মাড়ির চিকিৎসা করা যাবে কিনা?
পর্যালোচনা: দাঁত তোলা বা ফিলিং করা জায়েয এবং এতে ছিয়াম নষ্ট হয় না। তবে কোনো ঔষধ বা রক্ত যেন পেটে চলে না যায়—সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। যেহেতু এই কাজগুলো মুখ গহ্বরের ভেতরে সীমাবদ্ধ এবং এগুলো খাদ্য বা পানীয় নয়, ফলে তাতে ছিয়াম ভঙ্গ হবে না।
(২৮) বায়োপসি (Biopsy) বা টিস্যু নমুনা (Tissue Sampling) সংগ্রহ:
বিবরণ: বায়োপসি বা টিস্যু নমুনা সংগ্রহ হলো, এমন একটি মেডিকেল প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে শরীরের কোনো অস্বাভাবিক এলাকা থেকে পরীক্ষার জন্য কোষ বা টিস্যুর নমুনা নেওয়া হয়। এটা করা যাবে কি?
পর্যালোচনা: আন্তর্জাতিক ফিক্বহ অ্যাকাডেমির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এটি ছিয়াম ভঙ্গ করে না। নমুনা সংগ্রহের এই প্রক্রিয়াটি পানাহার নয়। তবে শর্ত হলো, যন্ত্রের সাথে যেন কোনো তরল বা পুষ্টি উপাদান ভেতরে প্রবেশ না করে।
(২৯) ছিয়াম অবস্থায় ধূমপান:
বিবরণ: বিড়ি, সিগারেট বা হুক্কা সেবন করলে কি ছিয়াম ভেঙে যায়?
পর্যালোচনা: ধূমপান করলে ছিয়াম নিশ্চিতভাবে ভেঙে যায়। এটি আধুনিক ফক্বীহদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। কারণ সিগারেটের ধোঁয়া কেবল বাতাস নয়, এতে নিকোটিন ও সূক্ষ্ম কণা থাকে, যা খাদ্যনালি দিয়ে পেটে প্রবেশ করে এবং রক্তে মিশে শরীরের চাহিদা পূরণ করে।
(৩০) নিকোটিন প্যাচ:
বিবরণ: ধূমপান ছাড়ার জন্য চামড়ায় লাগানো প্যাচ, যা রক্তে নিকোটিন সরবরাহ করে।
পর্যালোচনা: এটি ছিয়াম ভঙ্গ করবে না।
-আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী
বিএ (অনার্স), উচ্চতর ডিপ্লোমা, এমএ এবং এমফিল, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব; অধ্যক্ষ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।
