কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

সফল খত্বীব হওয়ার উপায় (পর্ব-২)

(জুলাই’১৭ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)

সফল খত্বীবের গুণাবলী :

সফল খত্বীবের কতিপয় গুণ ও কার্যকরী বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেগুলি একজন খত্বীবকে তার জাতি, সমাজ ও নিজের জন্য উপকার সাধনে সহায়ক করে তুলতে পারে। নিমেণ সেগুলি উল্লেখ করা হল,

(১) দায়িত্বানুভূতি :

খত্বীবের এই অনুভূতি থাকতে হবে যে, তিনি এমন একজন বার্তাবাহক (Messenger), যিনি বার্তা পৌঁছে দিবেন এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করবেন। এমনকি খুৎবা প্রদান যদি তার পেশাও হয়- যার মাধ্যমে তিনি জীবিকা নির্বাহ করেন, তথাপিও আল্লাহর সন্তুষ্টি তার অভীষ্ট লক্ষ্য হতে হবে। কেননা একজন বার্তাবাহক মানুষের নিকট তার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য তার সর্বাত্মক শক্তি ব্যয় করে থাকেন। এতে তিনি ক্লান্তও হন না, বিরক্তবোধও করেন না। আর প্রকৃতপ্রস্তাবে খত্বীবের হৃদয়ে যখনই এই অনুভূতি বিদ্যমান থাকবে, তখনই সফলতা হবে তার নিত্য সঙ্গী এবং তিনি হবেন বক্তব্য প্রদানের ক্ষেত্রে একজন উত্তম মানুষ। মহান আল্লাহ বলেন,

وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِيْ مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ.

‘আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম? যে আল্লাহর দিকে দা‘ওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, অবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত’ (ফুছছিলাত ৪১/৩৩)

অর্থাৎ যে আল্লাহর দিকে, তাঁর পথের অনুসরণ এবং তাঁর নানা বিধি-বিধান ও শিক্ষা মেনে চলার দিকে দা‘ওয়াতের প্রদীপ বহন করে, তার চেয়ে আর কারো কথা উত্তম হতে পারে না। আর দাঈ অথবা খত্বীবের উচিত নিজেকে এই বলে পরিচয় দেওয়া ও সম্পর্কযুক্ত করা যে, তিনি একজন মুসলিম এবং দলীয় সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধ চিন্তা-চেতনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কেননা ইসলামই হচ্ছে মূল ও ব্যাপক। আর সফল ও প্রভাব বিস্তারকারী খত্বীব তিনি, যার বাহন হলো ইখলাছ, যা তাকে তার চলার পথ ও অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে এবং তার যাবতীয় সম্বলকে আসমান-যমীনের ধারক মহান আল্লাহর ভীতির সাথে বেঁধে দিবে। আল্লাহ বলেন,

وَمَا أُوْتِيْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَزِيْنَتُهَا وَمَا عِنْدَ اللهِ خَيْرٌ وَأَبْقَى أَفَلَا تَعْقِلُوْنَ.

‘আর তোমাদেরকে যা কিছু দেয়া হয়েছে, তা দুনিয়ার জীবনের ভোগ ও সৌন্দর্য মাত্র। আর আল্লাহর কাছে যা আছে, তা-ই উত্তম ও স্থায়ী। তোমরা কি বুঝবে না?’ (ক্বাছাছ ২৮/৬০)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

فَمَا أُوتِيْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَا عِنْدَ اللهِ خَيْرٌ وَأَبْقَى لِلَّذِيْنَ آمَنُوْا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُوْنَ.

‘আর তোমাদেরকে যা কিছু দেয়া হয়েছে, তা দুনিয়ার জীবনের ভোগ্য সামগ্রী মাত্র। আর আল্লাহর নিকট যা আছে, তা উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী তাদের জন্য- যারা ঈমান আনে এবং তাদের রবের উপর তাওয়াক্কুল করে’ (শুরা ৪২/৩৬)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

بَلْ تُؤْثِرُوْنَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا - وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى.

‘বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিচ্ছ। অথচ আখেরাত সর্বোত্তম ও চিরস্থায়ী’ (আ‘লা ৮৭/১৬-১৭)

অতঃপর জেনে রাখুন হে খত্বীব! অবশ্যই আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে মনোনীত করেছেন তার দা‘ওয়াত প্রদান, তার আমানত রক্ষা, তার অঙ্গীকার পূরণ এবং তার ওয়াদা পূর্ণ করার জন্য। সুতরাং মানুষকে আল্লাহর দ্বীন শিক্ষা দিন এবং তাদের সামনে দ্বীন সহজভাবে উপস্থাপন করুন। মহান আল্লাহ বলেন,

ثُمَّ أَوْرَثْنَا الْكِتَابَ الَّذِيْنَ اصْطَفَيْنَا مِنْ عِبَادِنَا.

‘অতঃপর আমি এ কিতাবটির উত্তরাধিকারী করেছি আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে, যাদেরকে আমি মনোনীত করেছি’ (ফাতির ৩৫/৩২)

অন্যত্র আল্লাহ আরো বলেন,

وَلَكِنْ كُوْنُوْا رَبَّانِيِّيْنَ بِمَا كُنْتُمْ تُعَلِّمُوْنَ الْكِتَابَ وَبِمَا كُنْتُمْ تَدْرُسُوْنَ.

‘বরং তোমরা সবাই আল্লাহওয়ালা হয়ে যাও। কারণ তোমরা মানুষকে আল্লাহর কিতাব শিক্ষা দিয়ে থাক এবং তোমরা নিজেরা তা পাঠ করে থাক’ (আলে ইমরান ৩/৭৯)

সুতরাং হে খত্বীব! আল্লাহ তা‘আলাকে নিজের কল্যাণটাই দেখান এবং জেনে রাখুন যে, আপনি আম্বিয়ায়ে কেরামের ওয়ারিশ। রাসূল (ছাঃ) বলেন,أَنَّ الْعُلَمَاءَ هُمْ وَرَثَةُ الأَنْبِيَاءِ ‘নিশ্চয় আলেমগণ নবীগণের উত্তরাধিকারী’।[1]

(২) প্রতিভা :

বক্তৃতা একটি শিল্পের নাম। এজন্য বক্তৃতায় আগ্রহী ব্যক্তিকে অবশ্যই প্রতিভার অধিকারী হতে হবে। বক্তৃতা বিদ্যার সাথে সংশিস্নষ্ট বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞান দ্বারা প্রতিভাকে আরো সমৃদ্ধ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, খুৎবাকে শক্তিশালী ও প্রভাবযুক্ত করে পেশ করার ক্ষেত্রে একজন খত্বীবের সর্বোত্তম সহায়ক হচ্ছে, জ্ঞানের প্রশস্ততা।

(৩) শিক্ষা ও সংস্কৃতি :

শিক্ষা ও সংস্কৃতি দাঈর মূল বিষয়, যার মাধ্যমে জনসাধারণ তার নিকট হতে বিভিন্ন জিজ্ঞাসার জবাব, সংকটময় অবস্থার সমাধান পেয়ে থাকে। তাছাড়া এটা খত্বীবের আসল পূঁজি, যার মাধ্যমে তিনি মানুষকে শরী‘আতের হুকুম-আহকাম, বিভিন্ন বিষয়ের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করবেন। এর মাধ্যমে তিনি কাউকে পরিতুষ্ট করতে, নানা সন্দেহ ও বিভ্রাট দূরীকরণে সক্ষম হবেন। কোন বিষয় উপস্থাপনে পারঙ্গম হবেন এবং মানুষকে দিক-নির্দেশনা প্রদানের ক্ষেত্রে হবেন অভিনব। আল্লাহর দিকে দা‘ওয়াত যেহেতু একজন বান্দার সবচেয়ে মর্যাদাবান ও সম্মানী অযীফা, সেহেতু তা জ্ঞান ছাড়া অর্জন করা সম্ভব নয়। আর দা‘ওয়াতী ময়দানে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছতে হলে জ্ঞানের বিকল্প নেই।

আর খত্বীব যখন ইলমের একটা বড় অংশ সংগ্রহে সক্ষম হবেন এবং জ্ঞানপিপাসুদের তালিকাভুক্ত হবেন, তখন তিনি তার সমাজে এমন প্রদীপে পরিণত হবেন- যদ্বারা পথ-নির্দেশ পাওয়া যাবে। যেমন ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) ফক্বীহগণ সম্পর্কে বলেন, فَهُمْ فِي الْأَرْضِ بِمَنْزِلَةِ النُّجُومِ فِي السَّمَاءِ، بِهِمْ يَهْتَدِي الْحَيْرَانُ فِي الظَّلْمَاءِ، وَحَاجَةُ النَّاسِ إلَيْهِمْ أَعْظَمُ مِنْ حَاجَتِهِمْ إلَى الطَّعَامِ وَالشَّرَابِ، وَطَاعَتُهُمْ أَفْرَضَ عَلَيْهِمْ مِنْ طَاعَةِ الْأُمَّهَاتِ وَالْآبَاءِ بِنَصِّ الْكِتَابِ ‘আসমানে তারকারাজি যেমন, যমীনে ফক্বীহগণের মর্যাদা তেমন। অন্ধকারে তাদের মাধ্যমে দিশেহারা পথনির্দেশ পায়। মানুষের খাদ্য ও পানীয়ের প্রয়োজন যতটুকু, তার চেয়ে বেশী প্রয়োজন ফক্বীহগণের। আর কুরআনের বক্তব্য অনুযায়ী তাদের আনুগত্য পিতা-মাতার আনুগত্যের চেয়ে বড় ফরয’।[2]

আর দাঈ (খত্বীব) যখন তার ইলম প্রসারে, মানুষের মাঝে সংশোধনে এবং তাদের গাফলতি ও বিপর্যয় দূরীকরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন, তখন তিনি সেই মর্যাদা লাভে ধন্য হবেন, যার কথা ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলে গেছেন, ‘যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর, যিনি নবী-রাসূলগণের পরস্পরের মধ্যবর্তী সময়ে কিছু আলেম তৈরী করেন, যারা দিকভ্রান্ত মানুষকে হেদায়াতের পথ দেখান, এর পরিপ্রেক্ষীতে তাদের পক্ষ থেকে আপতিত নির্যাতনের সময় ধৈর্য্যধারণ করেন। তারা আল্লাহর কিতাব দ্বারা মৃতদেরকে জীবিত করেন, আল্লাহর নূর দ্বারা অন্ধদেরকে চক্ষুষ্মান করেন। ইবলীস কর্তৃক নিহত কতজনকেই না তারা জীবন দান করেছেন। দিকভ্রান্ত কতজনকেই না তারা দিক-নির্দেশনা দান করেছেন। জনগণের প্রতি তাদের প্রভাব কতই না সুন্দর! আর তাদের প্রতি জনগণের প্রভাব কতই না মন্দ! ইতিহাস সাক্ষী আছে, আলেম দাঈদের দ্বারা পথহারা পথের সন্ধান পেয়েছে, দ-ায়মান সামনে অগ্রসর হয়েছে, পশ্চাদগামী সামনে এগিয়েছে, অপূর্ণাঙ্গ ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গতা পেয়েছে, পিছে গমনকারী ফিরে এসেছে এবং দুর্বল শক্তি সঞ্চার করেছে’।

আবু হেলাল আল-আসকারী তার الحث على طلب العلم বইয়ে বলেন, ‘সম্মানিত ভাই! আপনি যদি সৃষ্টির মধ্যে উচ্চ মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা পেতে চান, আপনি যদি এমন সম্মান পেতে চান, যাকে রাত-দিন আচ্ছাদিত করতে পারবে না, পারবে না যুগ-যুগান্তর নিঃশেষ করতে, আপনি যদি ক্ষমতা ছাড়াই প্রভাব, মাল ছাড়াই ধনাঢ্যতা, অস্ত্র ছাড়াই প্রতিরোধ, নিকটাত্মীয় ছাড়াই আশ্রয়, পারিশ্রমিক ছাড়াই সহযোগী এবং বেতন ছাড়াই সৈনিক পেতে চান, তাহলে যরূরী ভিত্তিতে ইলম অর্জন করুন। ইলমের যথার্থ ক্ষেত্র থেকে তা অন্বেষণ করুন, তাহলে এমনিতেই আপনার দুয়ারে কল্যাণ এসে হাযির হবে’।

(চলবে)

মূল : আমীর ইবনে মুহাম্মাদ আল-মাদরী

অনুবাদ : শরীফুল ইসলাম

 

 

[1]. তিরমিযী হা/২৬৮২; ইবনু মাজাহ হা/২২৩; মিশকাত হা/২১২।

[2]. এ‘লামুল মুওয়াক্কে‘ঈন, ১/৮।

Magazine