কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছালাত বনাম প্রচলিত ছালাত (পর্ব-২২)

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ صَلَّى صَلَاةً لَمْ يَقْرَأْ فِيْهَا بِأُمِّ الْقُرْآنِ فَهِىَ خِدَاجٌ غَيْرُ تَمَامٍ. فَقُلْتُ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ فَإِنِّى أَكُوْنُ أَحْيَانًا وَرَاءَ الإِمَامِ فَغَمَزَ ذِرَاعِىْ وَقَالَ يَا فَارِسِىُّ اقْرَأْ بِهَا فِىْ نَفْسِكَ.

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ছালাত আদায় করল অথচ সূরা ফাতিহা পড়ল না, তার ছালাত অসম্পূর্ণ’। আমি বললাম, হে আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু! আমি তো কখনো কখনো ইমামের পিছনে থাকি। তখন আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু আমার বাহুর উপর আঘাত করে বললেন, হে ফারসী! তুমি সূরা ফাতিহা তোমার মনে মনে পড়’।[1]

عَنْ أَبِىْ سَعِيْدٍ قَالَ أُمِرْنَا أَنْ نَقْرَأَ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ وَمَا تَيَسَّرَ.

আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে আমরা সকলেই সূরা ফাতিহা পড়ব আর যা সহজ হয় তা পড়ব’।[2]

عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ قَالَ صَلَّى بِنَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعْضَ الصَّلَوَاتِ الَّتِى يُجْهَرُ فِيْهَا بِالْقِرَاءَةِ فَقَالَ لَا يَقْرَأَنَّ أَحَدٌ مِنْكُمْ إِذَا جَهَرْتُ بِالْقِرَاءَةِ إِلَّا بِأُمِّ الْقُرْآنِ.

ওবাদা ইবনে ছামেত রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে জেহরী ক্বিরাআতের কোন ছালাত আদায় করালেন, অতঃপর তিনি বললেন, ‘যখন আমি জেহরী ক্বিরাআত করব, তখন তোমরা ক্বিরাআত করবে না। তবে সূরা ফাতিহা পড়’।[3]

এসব হাদীছগুলো দ্বারা স্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয় যে, ইমাম-মুক্তাদী সকলকেই সূরা ফাতিহা পড়তে হবে।

আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা তার ছাহাবীগণকে নিয়ে ছালাত আদায় করলেন। যখন ছালাত শেষ করলেন, তখন তাদের দিকে মুখ করলেন। অতঃপর বললেন, ‘ইমাম ক্বিরাআত করা অবস্থায় তোমরা ছালাতে ইমামের পিছনে ক্বিরাআত পাঠ করছিলে কি? তাঁরা চুপ থাকলেন। এভাবে তিনবার জিজ্ঞেস করলেন, তখন তাদের একজন বা সকলে বললেন, হ্যাঁ, আমরা পাঠ করেছি। তখন তিনি বললেন, ‘তোমরা এমনটি কর না। শুধু নীরবে সূরা ফাতিহা পাঠ করবে’।[4] এই হাদীছ প্রমাণ করে ইমাম-মুক্তাদী সকলকেই সূরা ফাতিহা পড়তে হবে এবং মুক্তাদীকে চুপে চুপে সূরা ফাতিহা পড়তে হবে।

ইয়াযীদ ইবনে শারীক ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে একদা ইমামের পিছনে ক্বিরাআত পাঠ করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, তুমি শুধু সূরা ফাতিহা পাঠ কর। আমি বললাম, যদি আপনি ইমাম হন? তিনি বললেন, যদিও আমি ইমাম হই। আমি পুনরায় বললাম, যদি জোরে ক্বিরাআত পাঠ করেন? তিনি বললেন, যদি জোরে ক্বিরাআত পাঠ করি তবুও।[5] এই হাদীছ প্রমাণ করে ক্বিরাআত জেহরী হোক আর সিররী হোক মুক্তাদীকে সূরা ফাতিহা পড়তে হবে।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ صَلَّى صَلَاةً لَمْ يَقْرَأْ فِيهَا بِأُمِّ الْقُرْآنِ فَهِيَ خِدَاجٌ ثَلَاثًا غَيْرُ تَمَامٍ» فَقِيلَ لِأَبِي هُرَيْرَةَ: إِنَّا نَكُون وَرَاء الإِمَام فَقَالَ اقْرَأْ بِهَا فِي نَفْسِكَ فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «قَالَ اللَّهُ تَعَالَى قَسَمْتُ الصَّلَاةَ بَيْنِي وَبَيْنَ عَبْدِي نِصْفَيْنِ وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ فَإِذَا قَالَ الْعَبْدُ (الْحَمد لله رب الْعَالمين) قَالَ اللَّهُ تَعَالَى حَمِدَنِي عَبْدِي وَإِذَا قَالَ (الرَّحْمَن الرَّحِيم) قَالَ اللَّهُ تَعَالَى أَثْنَى عَلَيَّ عَبْدِي وَإِذَا قَالَ (مَالك يَوْم الدّين) قَالَ مجدني عَبدِي وَقَالَ مرّة فوض إِلَيّ عَبدِي فَإِذا قَالَ (إياك نعْبد وَإِيَّاك نستعين) قَالَ هَذَا بَيْنِي وَبَيْنَ عَبْدِي وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ فَإِذَا قَالَ (اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالّين) قَالَ هَذَا لِعَبْدِي وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ .

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সূরা ফাতেহা পাঠ না করে ছালাত পড়বে, তার ছালাত অসম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ। তখন আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করা হল, আমরা তো ইমামের পিছনে থাকি? তিনি বললেন, তুমি মনে মনে পড়বে। কেননা আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ বলেন, ‘আমি ছালাতকে ভাগ করেছি আমার ও আমার বান্দার মধ্যে আধাআধি করে। আর আমার বান্দার জন্য তাই রয়েছে, যা সে চাইবে। যখন বান্দা বলে, ‘আল-হামদুলিল্লাহি রবিবল আলামীন’, তখন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আমার বান্দা আমার প্রশংসা করল’। যখন বান্দা বলে, ‘আর-রহমানির রহীম, তখন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আমার বান্দা আমার গুণ ব্যক্ত করল’ এবং যখন বান্দা বলে, ‘মালিকি ইয়াওমিদ্দীন’ তখন আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দা আমার মর্যাদা বর্ণনা করল’ এবং যখন বান্দা বলে, ‘ইয়্যাকা না‘বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন’, তখন আল্লাহ বলেন, ‘ইহা আমার ও আমার বান্দার মধ্যে আধাআধি (ইবাদত আমার জন্য এবং সাহায্য তার জন্য) এবং আমার বান্দার জন্য তাই রয়েছে, যা সে চেয়েছে এবং যখন বান্দা বলে, ‘ইহদিনাছ ছিরাত্বাল মুস্তাক্বীম, ছিরাত্বাল্লাযীনা আন‘আমতা আলাইহিম, গয়রিল মাগযূবি আলাইহিম ওয়ালাযযাল্লীন’, তখন আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দা যা চেয়েছে, তার জন্য তাই রয়েছে’।[6]

عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ .

উবাদা ইবনে ছামেত রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পড়ে না, তার ছালাত হবে না’।[7] এই হাদীছ প্রমাণ করে ইমাম, মুক্তাদী সকলকেই সূরা ফাতিহা পড়তে হবে, সব ছালাতেই পড়তে হবে। সকল অবস্থাতেও পড়তে হবে। মুক্বীম অবস্থাতেও পড়তে হবে। ক্বিরাআত জেহরী হলেও পড়তে হবে, ক্বিরাআত সিররী হলেও পড়তে হবে।

আমীন জোরে বলতে হবে :

একাধিক ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, জোরে আমীন বলতে হবে। ওয়ায়েল ইবনে হুজর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

كَانَ رَسُولُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا قَرَأَ ( وَلاَ الضَّالِّينَ) قَالَ آمِينَ وَرَفَعَ بِهَا صَوْتَهُ.

‘রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন গয়রিল মাগযূবি আলাইহিম ওয়ালায্যল্লীন’ বলতেন, তখন তিনি আমীনের আওয়াযটা উচ্চৈঃস্বরে করতেন’।[8] এই হাদীছ প্রমাণ করে উচ্চৈঃস্বরে আমীন বলতে হবে। ওয়ায়েল ইবনে হুজর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন গয়রিল মাগযূবি আলাইহিম ওয়ালাযযাল্লীন বলতেন, তখন আমি তাকে আমীন বলতে শুনেছি। তিনি আমীন শব্দটি দীর্ঘ ও উঁচু কণ্ঠে বলতেন। এই হাদীছ প্রমাণ করে আমীন উঁচু কণ্ঠে বলতে হবে এবং দীর্ঘ করে টান দিয়ে পড়তে হবে।[9] ইমাম তিরমিযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ছাহাবী ও তাবেঈগণ মনে করতেন মানুষ উঁচু কণ্ঠে আমীন বলবে; আমীন চুপে বলতে পারবে না। ওয়ায়েল ইবনে হুজর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি একদা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে ছালাত আদায় করলেন, তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জোরে আমীন বললেন।[10]

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا أَمَّنَ الإِمَامُ فَأَمِّنُوا فَإِنَّهُ مَنْ وَافَقَ تَأْمِينُهُ تَأْمِينَ الْمَلاَئِكَةِ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَقَالَ ابْنُ شِهَابٍ وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ آمِينَ .

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ইমাম যখন আমীন বলবেন, তখন তোমরা আমীন বল। কারণ যার আমীন ফেরেশতাদের আমীনের সাথে মিলে যাবে, তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করা হবে’। ইবনে শিহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমীন জোরে বলতেন।[11] এই হাদীছ প্রমাণ করে আমীন মুখে উচ্চারণ করে জোরে বলতে হবে। ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ ইমামকে জোরে আমীন বলতে হবে মর্মে অনুচ্ছেদ রচনা করেন। তিনি বলেন, আত্বা রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আমীন হল দু‘আ, ইবনে যুবায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং তার পিছনের মুক্তাদীগণ এমন জোরে আমীন বলতেন, যাতে মসজিদ বেজে উঠত।[12] আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ইমাম যখন গয়রিল মাগযূবি আলাইহিম ওয়ালাযযাল্লীন’ বলবেন, তখন তোমরা আমীন বল। কারণ যার কথা ফেরেশতাদের কথার সাথে মিলে যাবে তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করা হবে’।[13]

عَنْ عَائِشَةَ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَا حَسَدَتْكُمُ الْيَهُودُ عَلَى شَىْءٍ مَا حَسَدَتْكُمْ عَلَى السَّلاَمِ وَالتَّأْمِينِ.

আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা সালাম ও আমীন বলার কারণে ইয়াহূদীরা তোমাদের সাথে সবচেয়ে বেশী হিংসা করে।[14] এই হাদীছ প্রমাণ করে আমীন জোরে হতে হবে। আর আমীন জোরে হওয়ায় যদি ইয়াহূদীরা হিংসা করে, তাহলে প্রত্যেক মুমিনের ঈমানী পরিচয় এটাই হওয়া উচিত যে সকল মুমিন উচ্চৈঃস্বরে আমীন বলবে। আল্লাহ তুমি মানুষকে মাযহাবী গোঁড়ামি ত্যাগ করে কুরআন ও ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী আমল করার সুযোগ করে দাও।

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ - رَضِىَ اللهُ عَنْهُ - أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا قَالَ أَحَدُكُمْ آمِينَ . وَقَالَتِ الْمَلاَئِكَةُ فِى السَّمَاءِ آمِينَ . فَوَافَقَتْ إِحْدَاهُمَا الأُخْرَى ، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ .

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ আমীন বলে, তখন ফেরেশতা আকাশে আমীন বলেন, যখন তাদের দু’জনের কোন একজনের আমীন অপরজনের সাথে মিলে যায়, তখন তার পূর্বের সমস্ত পাপ ক্ষমা করা হয়’।[15]

ধীরে আমীন বলার যঈফ হাদীছ সমূহ :

আলক্বামা ইবনে ওয়ায়েল রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি একদা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছালাত আদায় করেন। যখন তিনি ‘গয়রিল মাগযূবি আলাইহিম ওয়ালাযযাল্লীন’ পর্যন্ত পৌঁছলেন, তখন আমীন বললেন, তিনি ধীর কণ্ঠে আমীন বললেন। হাদীছটি বর্ণনার পর ইমাম তিরমিযী ইমাম বুখারীর বরাতে বলেন, এই হাদীছে শু‘বা কয়েক জায়গায় ভুল করেছেন।[16] আব্দুল জাববার ইবনে ওয়ায়েল তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে ছালাত আদায় করেছি। যখন তিনি তাকবীর দিতেন কানের নীচ পর্যন্ত দুই হাত উঠাতেন। যখন ‘গয়রিল মাগযূবি আলাইহিম ওয়ালাযযাল্লীন’ বলতেন, তখন তিনি আমীন বলতেন আর আমি তার পিছনে থেকে শুনতে পেতাম।[17] হাদীছটি যঈফ। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ‘গয়রিল মাগযূবি আলাইহিম ওয়ালাযযাল্লীন’ তেলাওয়াত করতেন, তখন এমনভাবে আমীন বলতেন যাতে প্রথম কাতারে যারা নিকটে থাকত তারা তা শুনতে পেত।[18] হাদীছটি যঈফ।[19]

সুধী পাঠক! এই যঈফ হাদীছগুলো আমীন ধীরে বলার প্রমাণে পেশ করা হল। প্রথম কথা, হাদীছগুলো যঈফ। দ্বিতীয় কথা, হাদীছগুলো যঈফ হওয়ার পরেও হাদীছগুলোতে নীরবে আমীন বলা প্রমাণ হয় না বরং জোরে আমীন বলাই প্রমাণ হয়। অতএব সকল মুসলিম পুরুষ-নারীর মনে রাখা ভাল হবে যে, চুপে আমীন বলার কোন ছহীহ হাদীছ নেই। কোন যঈফ হাদীছও নেই। ছাহাবী, তাবেঈগণের পক্ষ থেকে কোন ছহীহ আছারও নেই।

তিনবার আমীন বলার হাদীছ যঈফ :

তিনবার আমীন বলার প্রমাণে কোন ছহীহ হাদীছ নেই। আব্দুল জাববার ইবনে ওয়ায়েল তার পিতা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ছালাতে প্রবেশ করতে দেখেছি। যখন তিনি সূরা ফাতিহা শেষ করতেন তখন তিনবার আমীন বলতেন।[20] হাদীছটি যঈফ। অতএব তিনবার আমীন বলার আমল পরিহার করতে হবে।

সূরা ফাতিহা পড়ার পূর্বে সাকতা করতে হবে :

তাকবীরে তাহরীমার পর সূরা ফাতিহা পড়ার পূর্বে কিছু সময় চুপ থাকার নাম সাকতা। জেহরী ছালাতে তাকবীরে তাহরীমার পর ইমামের সাকতা করা সুন্নাত। কারণ এ সময় ছানা পড়তে হয়। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকবীরে তাহরীমা এবং এবং ক্বিরাআতের মধ্যবর্তী সময়ে কিছু সময় চুপ থাকতেন। আমি একবার জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমার পিতা-মাতা আপনার প্রতি কুরবান হোক! আপনি যে তাকবীর ও ক্বিরাআতের মধ্যে কিছু সময় চুপ থাকেন, তাতে কী বলেন? তিনি বললেন, আমি বলি,

أَقُولُ اللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِى وَبَيْنَ خَطَايَاىَ كَمَا بَاعَدْتَ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ اللَّهُمَّ نَقِّنِى مِنَ الْخَطَايَا كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ اللَّهُمَّ اغْسِلْ خَطَايَاىَ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ.

‘হে আল্লাহ! আমার ও আমার পাপসমূহের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে দাও, যেরূপ তুমি দূরতব সৃষ্টি করেছ পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে আমার পাপসমূহ হতে পরিচ্ছন্ন কর, যেরূপ পরিচ্ছন্ন করা হয় ময়লা থেকে সাদা কাপড়কে। হে আল্লাহ! তুমি আমার পাপসমূহ ধুয়ে ফেল পানি, বরফ ও শিশির দ্বারা’।[21] এই হাদীছ প্রমাণ করে তাকবীরে তাহরীমার পর সাকতা করতে হবে এবং এ সময়ে ছানা পড়তে হবে।

সূরা ফাতিহা শেষে সাকতা করতে হবে না :

সূরা ফাতিহা শেষে সাকতা করার কোন ছহীহ হাদীছ নেই। সামুরা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দু’টি সাকতা মুখস্থ করেছি। কিন্তু ইমরান ইবনে হুছায়েন রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বিরোধিতা করে বলেন, আমি একটি সাকতা মুখস্থ করেছি। তখন আমরা মদীনার উবাই ইবনে কা‘বের কাছে লিখে জানতে চাইলাম। অতঃপর তিনি লিখলেন যে, সামুরা সঠিকটা মুখস্থ করেছে। সাঈদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা ক্বাতাদাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বললাম, কোথায় সাকতা করতে হবে? তিনি বললেন, যখন ছালাত শুরু করবে এবং যখন ক্বিরাআত শেষ করবে।[22] হাদীছটি যঈফ।[23] আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইমামের সাথে ফরয ছালাত আদায় করবে সে যেন ইমামের সাকতার সময় সূরা ফাতিহা পাঠ করে। আর যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা শেষে আসবে তার জন্য উহা যথেষ্ট হবে’।[24] হাদীছটি যঈফ।[25] আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যখন তুমি ইমামের সাথে থাকবে তখন তুমি আগেই সূরা ফাতিহা পড়ে নিবে যখন ইমাম চুপ থাকেন’।[26] হাদীছটি যঈফ।[27] আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ইমামের জন্য দু’টি সাকতা রয়েছে, তোমরা দুই সাকতার মাঝে ক্বিরাআত পড়াকে গনীমত মনে কর।[28] হাদীছটি যঈফ।[29] তবে, মাসআলাটি নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ আছে।

নীরবে আঊযুবিল্লাহ পড়তে হবে :

‘আঊযুবিল্লাহ-হি মিনাশ শায়ত্বনির রজীম’ চুপে চুপে পড়তে হবে। উচ্চৈঃস্বরে পড়ার কোন প্রমাণ নেই। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলেন, আপনি যখন কুরআন তেলাওয়াত করবেন, তখনই অভিশপ্ত শয়তান থেকে আল্লাহ্র নিকট আশ্রয় চাইবেন’ (নাহ্ল, ৯৮)। মহান আল্লাহ কুরআন পড়লেই ‘আঊযুবিল্লাহ-হি মিনাশ শায়ত্বনির রজীম’ পড়ার জন্য আদেশ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,

خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ - وَإِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ.

‘ক্ষমা করে দেয়ার অভ্যাস করুন। ভাল কাজের নির্দেশ দিন এবং মূর্খদের দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নিন। যদি শয়তানের কোন কুমন্ত্রণা এসে যায়, তবে সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাতা আল্লাহ্র নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করুন’ (আ‘রাফ, ১৯৯-২০০)। এই আয়াতে শয়তানের কুমন্ত্রণা আসলেই আল্লাহ্র কাছে আশ্রয় চাইতে বলা হয়েছে। অতএব কুরআন পড়ার সময় বেশী বেশী আশ্রয় চাইতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,

وَقُلْ رَبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ - وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَنْ يَحْضُرُونِ.

‘আর হে নবী! আপনি বেশি বলতে থাকুন, হে আল্লাহ! শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং তাদের উপস্থিতি হতে আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি’ (মুমিনূন, ৯৭-৯৮)। এই আয়াতে আল্লাহ শয়তান হতে আশ্রয় চাইতে বলেছেন। অতএব কুরআন তেলাওয়াতের সময় বেশী বেশী আশ্রয় চাইতে হবে।

আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন রাতে তাঁর ছালাত আদায়ের জন্য দাঁড়াতেন, তখন তাকবীরে তাহরীমা দ্বারা ছালাত আরম্ভ করতেন। তখন তিনি বলতেন, سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ تَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ ‘হে আল্লাহ! তোমার প্রশংসা সহকারে তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। তোমার নাম বরকতময়, উচ্চ তোমার মর্যাদা এবং তুমি ব্যতীত কোন মা‘বূদ নেই’। তারপর তিনি তিনবার لاَ إِلَهَ إِلَّا اللهُ বলতেন, তিনবার اللَّهُ أَكْبَرُ كَبِيرًا বলতেন, তারপর বলতেন,اللَّهُمَّ إِنِّى أَعُوذُ بِكَ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ مِنْ هَمْزِهِ وَنَفْخِهِ وَنَفْثِهِ।[30]

উক্ত হাদীছ দ্বারা স্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয় যে, তাক্ববীরে তাহরীমার পর ছানা পড়তে হবে। তারপর أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ পড়তে হবে। তারপর বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম-এর কথা পরে আসছে।

 (চলবে)


[1]. ইবনে মাজাহ, হা/৮৩৮।

[2]. আবুদাঊদ, হা/৮১৮।

[3]. নাসাঈ, হা/৯২০।

[4]. ইবনে হিববান, হা/১৮৪১; মুসনাদে আবী ইয়ালা, হা/২৮০৬, হাদীছটি ছহীহ।

[5]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৯৯১ নং হাদীছের আলোচনা, সনদ ছহীহ।

[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৯৫; মিশকাত, হা/৮২৩; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৭৬৬।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৫৬।

[8]. আবুদাঊদ, হা/৯৩২।

[9]. তিরমিযী, হা/২৪৮।

[10]. আবুদাঊদ, হা/৯৩৩।

[11]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৮০।

[12]. ছহীহ বুখারী, অত্র অনুচ্ছেদ।

[13]. আবুদাঊদ, হা/৯৭২।

[14]. ইবনে মাজাহ, হা/৮৫৬।

[15]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৮১।

[16]. তিরমিযী, হা/২৪৯।

[17]. নাসাঈ, হা/৯৩২।

[18]. আবুদাঊদ, হা/৯৩৪।

[19]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৯৫২।

[20]. মু‘জামুল কাবীর, হা/১৭৫০৭।

[21]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৪৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৯৮; মিশকাত, হা/৮১২।

[22]. তিরমিযী, হা/২৫১; আবুদাঊদ, হা/৭৭৯; ইবনে মাজাহ, হা/৮৪৪; মিশকাত, হা/৮১৮।

[23]. প্রাগুক্ত; যঈফ আবুদাঊদ, হা/৭৭৭; ইরওয়া, হা/৫০৫।

[24]. দারাকুৎনী, হা/১২২২, ১২৩৬।

[25]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৯৯১।

[26]. বায়হাক্বী, হা/১৩৯।।

[27]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৯৯২।

[28]. বায়হাক্বী, হা/৯৬৭।

[29]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৫৪৬।

[30]. আবুদাঊদ, হা/৭৭৫; ইবনু মাজাহ, হা/৮৫৬; মিশকাত, হা/১২১৭।

Magazine