কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

প্রকৃত ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন (পর্ব-২)

(মে’১৯ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)

ল্লাহ্র তাওহীদ প্রসঙ্গে পর্যালোচনা :

তাওহীদ শব্দটি (وحد) ক্রিয়ামূল থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এর আভিধানিক অর্থ: কোন জিনিসকে একক হিসাবে নির্ধারণ করা। ‘না’ বাচক ও ‘হ্যাঁ’ বাচক উক্তি ব্যতীত এটির বাস্তবায়ন হওয়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ একককৃত বস্ত্ত ব্যতীত অন্য বস্ত্ত হতে কোন বিধানকে অস্বীকার করে একককৃত বস্ত্তর জন্য তা সাব্যস্ত করা।

‘তাওহীদ’ শব্দের পারিভাষিক অর্থ প্রসঙ্গে আল্লামা জুরজানী বলেন, ‘তাওহীদ হল, অন্তরে যা কিছুর কল্পনা বা ধারণা হয়, সেসব থেকে আল্লাহ তা‘আলার যাতসত্তাকে মুক্ত করা। তাওহীদ তিনটি বিষয়ের সমষ্টি- মহান আল্লাহকে রব হিসাবে জানা, তাঁর একত্বের স্বীকৃতি প্রদান করা এবং তাত্থেকে সকল শরীকদের অস্বীকার করা’।[1]

আল্লামা জাযাইরী বলেন, ‘তাওহীদ হল, আল্লাহ তা‘আলার যাত, তাঁর গুণাবলী ও কর্মসমূহে কারো সমকক্ষ থাকা বা সে সকল ক্ষেত্রে তাঁর কোন সাদৃশ্য হওয়া এবং তাঁর রুবূবিয়্যাত ও ইবাদতে কারো অংশীদারিত্ব থাকা অস্বীকার করাকে তাওহীদ বলা হয়’।[2]

তাওহীদের প্রকারভেদ :

কুরআনের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা যায় যে, তাওহীদের তিনটি অংশ রয়েছে। যথা:

১ম প্রকার : রুবূবিয়্যাত (সৃষ্টি, সার্বভৌম প্রভুত্ব ও পরিচালনা)-এর ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তাওহীদ :

তাওহীদের এই অংশের ওপর জ্ঞানবানদের স্বভাব-প্রকৃতি প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَهُمْ لَيَقُوْلُنَّ اللهُ فَأَنَّىْ يُؤْفَكُوْنَ ‘যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ’ (যুখরুফ, ৮৭)। তিনি আরও বলেন,

قُلْ مَنْ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَمَّنْ يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَنْ يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَنْ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ فَسَيَقُولُوْنَ اللهُ فَقُلْ أَفَلَا تَتَّقُوْنَ.

‘বল, কে তোমাদেরকে আকাশ ও পৃথিবী থেকে জীবনোপকরণ সরবরাহ করেন অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন, জীবিতকে মৃত থেকে কে বের করেন এবং মৃততে জীবিত থেকে কে বের করেন এবং সকল বিষয় কে নিয়ন্ত্রণ করেন? তখন তারা বলবে, আল্লাহ। বল, তবুও কি তোমরা তাক্বওয়া অবলম্বন করবে না?’ (ইউনুস, ৩১)

অনুরূপ আরও অনেক আয়াত রয়েছে। আর এই প্রকার তাওহীদকে ফেরাঊন অহঙ্কার ও গোঁড়ামিবশত অস্বীকার করেছে। যেমন তার কথায়, قَالَ فِرْعَوْنُ وَمَا رَبُّ الْعَالَمِيْنَ ‘ফেরাঊন বলল, সৃষ্টিজগতের রব আবার কী?’ (শু‘আর, ২৩)

২য় প্রকার : ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তাওহীদ :

এটা এমন একটি বিষয়, যাকে কেন্দ্র করেই রাসূলগণ ও বিভিন্ন জাতির মধ্যে সকল যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হয়েছে। আর এটা এমন একটি ব্যাপার, যা বাস্তবায়ন করার জন্যই নবী ও রাসূলদের প্রেরণ করা হয়েছে। আর তার মূলকথা হল, ‘আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই’। সুতরাং তা দু’টি মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। নীতি দু’টি হল, (আল্লাহ ছাড়া কোন হক্ব ইলাহ নেই) এর মধ্যকার নেতিবাচক দিক এবং ইতিবাচক দিক। বাক্যটির নেতিবাচক অর্থ হল, সকল প্রকার ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত সকল প্রকার উপাস্যকে পরিহার বা প্রত্যাহার করে নেওয়া। বাক্যটির ইতিবাচক অর্থ হল, সকল প্রকার ইবাদত তাঁর বিধিবদ্ধ শারঈ পদ্ধতিতে এককভাবে ও একমাত্র তাঁরই জন্য নির্দিষ্ট করা। আল-কুরআনের সিংহভাগ আয়াতই এই প্রকার তাওহীদ প্রসঙ্গে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِيْ كُلِّ أُمَّةٍ رَسُوْلًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوْتَ.

‘আল্লাহ্র ইবাদত করার ও ত্বাগূতকে বর্জন করার নির্দেশ দেওয়ার জন্য আমরা তো প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি’ (নাহ্ল, ৩৬)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন,

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُوْلٍ إِلَّا نُوْحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُوْنِ.

‘আমরা তোমার পূর্বে এমন কোন রাসূল প্রেরণ করিনি তার প্রতি এই অহি ব্যতীত যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) ইলাহ নেই। সুতরাং আমারই ইবাদত কর’ (আম্বিয়া, ২৫)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন,

فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوْتِ وَيُؤْمِنْ بِاللهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى لَا انْفِصَامَ لَهَا.

‘সুতরাং যে ত্বাগূতকে অস্বীকার করবে ও আল্লাহ্র প্রতি ঈমান আনবে, সে এমন এক মযবূত হাতল ধরবে, যা কখনও ভাঙ্গবে না’ (বাক্বারাহ, ২৫৬)। অন্যত্র আল্লাহ আরো বলেন,

وَاسْأَلْ مَنْ أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رُسُلِنَا أَجَعَلْنَا مِنْ دُوْنِ الرَّحْمَنِ آلِهَةً يُعْبَدُوْنَ.

‘তোমার পূর্বে আমরা যে সকল রাসূল প্রেরণ করেছিলাম, তাদেরকে তুমি জিজ্ঞেস কর, আমরা কি দয়াময় আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য স্থির করেছিলাম, যার ইবাদত করা যায়?’ (যুখরুফ, ৪৫)। এই প্রসঙ্গে আরও বহু আয়াত রয়েছে।

৩য় প্রকার : নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তাওহীদ :

এ প্রকারের তাওহীদ দু’টি মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেছেন।

প্রথমত, আল্লাহ তা‘আলাকে সৃষ্টির গুণাবলীর সাথে তুলনা করা থেকে পবিত্র রাখা।

দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তা‘আলা নিজেকে অথবা তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে যেসব গুণে গুণান্বিত করেছেন, রূপকার্থে নয় বরং প্রকৃতার্থে আল্লাহ তা‘আলার পরিপূর্ণতা ও যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সেগুলোর প্রতি ঈমান আনা। আর এটা জানা কথা যে, আল্লাহ সম্পর্কে আল্লাহ্র চেয়ে জ্ঞানী কেউ নেই যে আল্লাহ্র গুণ বর্ণনা করতে পারে, আর আল্লাহ্র পরে আল্লাহ্র গুণাবলী সম্পর্কে আল্লাহ্‌র রাসূলের চেয়ে অধিক জ্ঞানী কেউ নেই যে তাঁর গুণাবলী বর্ণনা করতে সক্ষম। আর আল্লাহ তা‘আলা নিজের ব্যাপারে বলছেন, أَأَنْتُمْ أَعْلَمُ أَمِ اللهُ ‘তোমরা কি বেশি জানো, না আল্লাহ?’ (বাক্বারাহ, ১৪০)। আর তিনি তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বলেন,وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى - إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوْحَى ‘এবং সে মনগড়া কথাও বলে না। এটা তো অহি, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়’ (নাজম, ৩-৪)। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বাণী দ্বারাই তাঁর অনুরূপ কোন কিছু নেই বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ‘কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়’ (শূরা, ১১)। আর তিনি তাঁর ইতিবাচক গুণাবলীসমূহ প্রকৃতার্থেই সাব্যস্ত করেছেন তাঁর ভাষায়,وَهُوَ السَّمِيْعُ الْبَصِيْرُ ‘আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা’ (শূরা, ১১)

সুতরাং আয়াতের প্রথমাংশ দ্বারা প্রমাণিত যে, তাঁর গুণাবলী অকার্যকর বা অসার করার অবকাশ নেই। তাই আয়াত থেকে সুস্পষ্ট যে, প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক হল কোন প্রকার সাদৃশ্য স্থাপন ছাড়া প্রকৃত অর্থেই তাঁর গুণাবলী তাঁর জন্য সাব্যস্ত করা এবং তাঁর গুণাবলী অকার্যকর না করে অন্য সব কিছুর সাথে তাঁর সাদৃশ্যতাকে অস্বীকার করা। কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টি কর্তৃক তাঁকে জ্ঞানে বেষ্টন করার অক্ষমতার কথা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيْهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيْطُوْنَ بِهِ عِلْمًا ‘তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে, তা তিনি অবগত, কিন্তু তারা জ্ঞান দ্বারা তাঁকে বেষ্টন করতে পারে না’ (ত্বো-হা, ১১০)

ল্লাহ্র ওয়াদা মুমিনরা দুনিয়ার কর্তৃত্ব পাবে :

মহান আল্লাহ মুসলিমদেরকে ওয়াদা দিচ্ছেন,

وَعَدَ اللهُ الَّذِيْنَ آمَنُوْا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِيْنَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُوْنَنِيْ لَا يُشْرِكُوْنَ بِيْ شَيْئًا وَمَنْ كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُوْنَ.

‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে এ মর্মে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি নিশ্চিতভাবে তাদেরকে যমীনের প্রতিনিধিতব প্রদান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব প্রদান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য শক্তিশালী ও সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দ্বীনকে, যা তিনি তাদের জন্য পসন্দ করেছেন এবং তিনি তাদের ভয়-ভীতি শান্তি-নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন। তারা আমারই ইবাদাত করবে, আমার সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না। আর এরপর যারা কুফরী করবে তারাই ফাসেকব’ (নূর, ৫৫)

মুসলিম দাবীদার জনসংখ্যা কর্তৃক কাফেরের সংজ্ঞাপূরণ :

আল্লাহ বলছেন, ‘আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, সে অনুযায়ী যারা হুকুম (বিচার ফায়ছালা) করে না তারা কাফের, যালেম, ফাসেক্ব’ (মায়েদাহ ৪৪, ৪৫, ৪৭)। এই আয়াতগুলোতে ‘হুকুম’ শব্দটি দিয়ে কেবল আদালতের বিচারকার্যই বোঝায় না, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক অর্থাৎ সামগ্রিক জীবন তাঁর নাযিল করা বিধান অর্থাৎ কুরআন এবং সুন্নাহ মোতাবেক পরিচালনা করাকেও বুঝায়। কিন্তু বর্তমানের মুসলিম জাতি তাদের সামষ্টিক কার্যাবলী আল্লাহ্র নাযিলকৃত বিধান দিয়ে ফায়ছালা করে না। আল্লাহ প্রদত্ত বিধানগুলোকে অপাংক্তেয় করে রেখে তারা ইয়াহূদী-খ্রীস্টানদের আইন-ক্বানূনগুলো নিজেদের দেশে প্রবর্তন করে তা দিয়ে সামষ্টিক কার্যাবলী পরিচালনা করছে। ফলশ্রুতিতে তারা ফাসেক্ব (অবাধ্য), যালেম (অন্যায়কারী) এবং কাফের (প্রত্যাখ্যানকারী) পরিণত হয়েছে।

কাফেরদের কোন রক্ষাকারী নাই, কোন অভিভাবক নাই :

আল্লাহ তাঁর পবিত্র কুরআনে বলেছেন, ‘কাফেরদের সাথে তোমাদের যুদ্ধ হলে অবশ্যই তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে (অর্থাৎ পলায়ন করবে বা পরাজিত হবে)’ (ফাতহ, ২৩)। এই উম্মাহর প্রথম ৬০-৭০ বছরের অবস্থার প্রতি দৃষ্টিপাত করলেই আমরা আল্লাহ্র এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে পাই। কিন্তু বর্তমানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, মুমিন হওয়ার দাবীদার এই জনসংখ্যাটি অন্যান্য জাতিগুলোর হাতে একের পর এক যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছে এবং তাদের পদানত গোলামে পরিণত হচ্ছে, তাদের দ্বারা শাসিত এবং শোষিত হচ্ছে, লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত হচ্ছে। এর অন্যতম প্রধান কারণই হচেছ প্রচলিত ধারায় ইসলাম শিক্ষার কারণে। কেননা সত্যিকার অহির জ্ঞান নেই বলেই আজ মুসলিম জাতির এই দুরবস্থা। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে এই অজ্ঞতা থেকে হেফাযত করুন- আমীন!

মুমিনদেরকে সাহায্য করা আল্লাহ্র কর্তব্য :

আল্লাহ আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে তাঁর কিতাবে বলছেন, ‘তোমরা হীনবল হয়ো না, সাহস হারাইও না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হও’ (আলে ইমরান, ১৩৯)। কিন্তু মুসলিমরা বিগত কয়েক শতাব্দীতে কোন যুদ্ধেই বিজয়ী হতে পারেনি। এর কারণ হিসাবে বলা যেতে পারে মুসলিমদের তথা আমাদের ঈমানের দুর্বলতা।

ভুল উদ্দেশ্যে ‘ধর্ম পালন’ করা হচ্ছে :

আল্লাহ যখন মানুষ সৃষ্টি করতে চাইলেন, তখন সকল ফেরেশতা মানুষ সৃষ্টির বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপন করে বলেছিলেন, ‘তোমার প্রশংসা ও গুণকীর্তন করার জন্য আমরাই কি যথেষ্ট নই। তোমার এই সৃষ্টি পৃথিবীতে গিয়ে ফাসাদ ও রক্তপাত করবে’ (বাক্বারাহ, ৩০)

আল্লাহ তাদের এই মৃদু আপত্তি সত্ত্বেও আদম আলাইহিস সালাম-কে সৃষ্টি করলেন। সকল ফেরেশতা আদমকে সেজদা করলেও ইবলীস সিজদা করল না, বরং সে আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ করল যে, তোমার এই নতুন সৃষ্টি তোমার আনুগত্য করবে না, আমি তাকে বিপথে পরিচালিত করব, অন্যায়-অশান্তিতে পতিত করব’ (আ‘রাফ, ১৭)। আল্লাহ জানিয়ে দিলেন যে, ‘তিনি প্রতি যুগে প্রতি জনপদে তাঁর নবী-রাসূল পাঠিয়ে হেদায়াত ও দ্বীন প্রেরণ করবেন। সেটাকে অনুসরণ করলেই তারা দুনিয়াতে একটি শান্তিময় ও প্রগতিশীল সমাজে বসবাস করতে পারবে’ (বাক্বারাহ, ৩৮)

সেখানে কোন ফাসাদ ও অন্যায়, অশান্তি, যুলুম, রক্তপাত, যুদ্ধ, ক্রন্দন, হতাশা ইত্যাদি থাকবে না। পাশাপাশি ইবলীসের সঙ্গে করা চ্যালেঞ্জে আল্লাহ বিজয়ী হবেন। অর্থাৎ একজন মুসলিমের জীবনের উদ্দেশ্য হবে, স্রষ্টার দেওয়া বিধান প্রতিষ্ঠা করে সমাজ থেকে ফাসাদ দূরীভূত করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা, তথা ইবলীসের চ্যালেঞ্জ আল্লাহকে বিজয়ী করা।

সামাজিক অবস্থা প্রসঙ্গে :

এ প্রসঙ্গে আল-কুরআন অন্তরের তৃষ্ণা নিবারণ করেছে এবং এর পথ-ঘাট আলোকিত করেছে। আল্লাহ তা‘আলা প্রধান সমাজপতিকে তার সমাজ ও সম্প্রদায়ের প্রতি কেমন আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন, সেদিকে লক্ষ্য করুন। তিনি বলেন,وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ ‘এবং যারা তোমার অনুসরণ করে, সেসব মুমিনদের প্রতি বিনয়ী হও’ (শু‘আরা, ২১৫)। তিনি আরও বলেন,

فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيْظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوْا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللهِ إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِيْنَ.

‘আল্লাহ্র দয়ায় তুমি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছিলে, যদি তুমি রূঢ় ও কঠোর চিত্ত হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর ও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর’ (আলে ইমরান, ১৫৯)। আর তিনি সাধারণ সমাজকে তার নেতৃবৃন্দের প্রতি কেমন আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন, সেদিকে লক্ষ্য করুন। তিনি বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوْا أَطِيْعُوا اللهَ وَأَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ وَأُوْلِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ্র, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তাদের, যারা তোমাদের মধ্যকার ক্ষমতাশীল’ (নিসা, ৫৯)। আরও লক্ষ্য করুন, তিনি মানুষকে তার বিশেষ সমাজ তথা সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রীর প্রতি যেমন আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন, সেই দিকে। তিনি বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا قُوْا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيْكُمْ نَارًا وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُوْنَ اللهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُوْنَ مَا يُؤْمَرُوْنَ.

‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মমহৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা অমান্য করে না তা, যা আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেন। আর তারা যা করতে আদিষ্ট হয়, তাই করে’ (তাহরীম, ৬)। আরও লক্ষ্য করুন, তিনি কীভাবে ব্যক্তিকে তার বিশেষ সমাজ থেকে সাবধান ও সংযমী হওয়ার ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি তাকে নির্দেশ দিয়েছেন, কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যাপার তার নযরে এলে সে যেন ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখে। তিনি প্রথমে তাকে সংযমী ও সজাগ হওয়ার নির্দেশ দেন, তারপর তাকে নির্দেশ দেন ক্ষমা ও মার্জনা করার। তিনি বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَكُمْ فَاحْذَرُوْهُمْ وَإِنْ تَعْفُوْا وَتَصْفَحُوْا وَتَغْفِرُوْا فَإِنَّ اللهَ غَفُوْرٌ رَحِيْمٌ.

‘হে মুমিনগণ! তোমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিগণের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু। অতএব, তোমরা তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাক। তোমরা যদি তাদেরকে মার্জনা কর, তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা কর এবং তাদেরকে ক্ষমা কর, তবে জেনে রাখ, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (তাগাবুন, ১৪)। আরও লক্ষ্য করুন, তিনি সাধারণভাবে সমাজের সকল ব্যক্তিকে তাদের মধ্যকার পারস্পরিক লেনদেনের ব্যাপারে যে নির্দেশনা দিয়েছেন, সেই দিকে। তিনি বলেন,

إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنَ.

‘আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন করার ব্যাপারে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর’ (নাহ্ল, ৯০)। তিনি আরও বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا اجْتَنِبُوْا كَثِيْرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوْا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا.

‘হে মুমিনগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে দূরে থাক। কারণ, অনুমান কোন কোন ক্ষেত্রে পাপ, আর তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় সন্ধান কর না এবং একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা কর না’ (হুজুরাত, ১২)। তিনি আরও বলেন,

وَتَعَاوَنُوْا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوْا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ.

‘আর তোমরা সৎকর্ম ও তাক্বওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না’ (মায়েদাহ, ২)। তিনি আরও বলেন, إِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ إِخْوَةٌ ‘মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই’ (হুজুরাত, ১০)। তিনি আরও বলেন, وَأَمْرُهُمْ شُوْرَى بَيْنَهُمْ ‘আর তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শের মাধ্যমে নিজেদের কর্ম সম্পাদন করে’ (শূরা, ৩৮)। এ বিষয়ে এগুলো ছাড়াও আরও অনেক আয়াত রয়েছে।

আর যেহেতু সমাজের কোন সদস্যই মানব ও জিন শত্রুর শত্রুতা থেকে নিরাপদ নয়; কোন ব্যক্তিই প্রতিদ্বন্দী ও বিরোধী মুক্ত নয়, যদিও সে পাহাড়ের চূড়ায় নিঃসঙ্গ থাকে; আর যেহেতু প্রত্যেক ব্যক্তিই এই ধরনের সর্বগ্রাসী ব্যাধি থেকে চিকিৎসার মুখাপেক্ষী, সেহেতু আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবের তিন জায়গায় এই ব্যাধির চিকিৎসা বর্ণনা করেছেন। তাতে তিনি বর্ণনা করেছেন যে, মানুষের শত্রুতা থেকে বাঁচার চিকিৎসা হল, তার অসদাচরণকে উপেক্ষা করা এবং সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে তার মোকাবিলা করা; আর জিন শয়তানের থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ তা‘আলার নিকট তার অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা ছাড়া আর অন্য কোন চিকিৎসা নেই।

প্রথম স্থান : আল্লাহ তা‘আলা সূরা আল-আ‘রাফের শেষে দুষ্ট মানুষের সাথে আচরণবিধি প্রসঙ্গে বলেন, ‘তুমি ক্ষমাপরায়ণতা অবলম্বন কর, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অজ্ঞদেরকে এড়িয়ে চল’ (আ‘রাফ, ১৯৯)। অনরূপভাবে জিন শয়তানের সাথে আচরণবিধির দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে বলেন,وَإِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللهِ إِنَّهُ سَمِيْعٌ عَلِيْمٌ ‘আর যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহ্র আশ্রয়প্রার্থী হবে, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ (আ‘রাফ, ২০০)

দ্বিতীয় স্থান : সূরা মুমিনূনের এক আয়াতে এই প্রসঙ্গে বলেন, ادْفَعْ بِالَّتِيْ هِيَ أَحْسَنُ السَّيِّئَةَ نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَصِفُوْنَ ‘যা উত্তম, তা দ্বারা মন্দের মোকাবেলা কর; তারা যা বলে, আমি সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত’ (মুমিনূন, ৯৬)। অনুরূপভাবে জিন শয়তান সম্পর্কে তিনি বলেন,وَقُلْ رَبِّ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِيْنِ - وَأَعُوْذُ بِكَ رَبِّ أَنْ يَحْضُرُوْنِ ‘আর বল, হে আমার রব! আমি শয়তানের প্ররোচনা থেকে তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করি। হে আমার রব! আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করি আমার নিকট তাদের উপস্থিতি থেকে (মুমিনূন, ৯৭-৯৮)

তৃতীয় স্থান : সূরা ফুছছিলাত; আর তাতে আল্লাহ তা‘আলা আরও বেশি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, এই আসমানী চিকিৎসা ঐ শয়তানী রোগকে নির্মূল করে দিবে এবং তাতে তিনি আরও একটু বেশি করে বলেছেন যে, এই আসমানী চিকিৎসা সকল মানুষকে দেওয়া হয় না, বরং এটা শুধু ঐ ব্যক্তিকেই দেওয়া হয়, যিনি সৌভাগ্যের অধিকারী। আল্লাহ তা‘আলা তাতে বলেন,

ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِيْ بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيْمٌ -وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِيْنَ صَبَرُوْا وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُوْ حَظٍّ عَظِيْمٍ.

‘মন্দ প্রতিহত কর উৎকৃষ্ট দ্বারা। ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত। এই গুণের অধিকারী করা হয় কেবল তাদেরকেই, যারা ধৈর্যশীল, আর এই গুণের অধিকারী করা হয় কেবল তাদেরকেই, যারা মহাভাগ্যবান’ (ফুছছিলাত, ৩৪-৩৫)

আর জিন শয়তান প্রসঙ্গে তিনি বলেন,وَإِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللهِ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ ‘যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহ্র আশ্রয়প্রার্থী হবে, তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ (ফুছছিলাত, ৩৬)। আর তিনি অন্যান্য জায়গায় বর্ণনা করেন যে, এই কোমল আচরণ ও নম্র ব্যবহার বিশেষভাবে মুসলিমদের জন্য প্রযোজ্য, কাফেরদের জন্য নয়।[3] আল্লাহ তা‘আলা বলেন,فَسَوْفَ يَأْتِي اللهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِيْنَ ‘নিশ্চয় আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায়কে নিয়ে আসবেন, যাদেরকে তিনি ভালোবাসবেন এবং যারা তাঁকে ভালোবাসবে; তারা মুমিনদের প্রতি কোমল ও কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে’ (মায়েদাহ, ৫৪)। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,يَاأَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِيْنَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ ‘হে নবী! কাফের ও মুনাফিক্বদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর ও তাদের প্রতি কঠোর হও’ (তাওবা, ৭৩; তাহরীম, ৯)। কোমলতার জায়গায় কঠোরতা হল নির্বুদ্ধিতা ও বোকামী; আর কঠোরতার স্থানে কোমলতা হল দুর্বলতার পরিচায়ক ও এক ধরনের শৈথিল্য প্রদর্শন। কবির ভাষায়,

‘যখন সহিষ্ণুতার কথা বলা হবে,

তখন বল, নির্ধারিত স্থান রয়েছে সহিষ্ণুতার,

আর যুবকের অপাত্রে সহিষ্ণুতা প্রকাশ এক ধরনের মূর্খতা।’

ইসলামে পরিবার ব্যবস্থা :

মানবসমাজে পরিবার ব্যবস্থা একটা গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক স্থাপনা, যা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তবে ইসলামী পারিবারিক ব্যবস্থা স্বামী-স্ত্রী, শিশু ও নিকটজনদের অধিকারকে পারস্পরিক ভারসাম্য বজায় রেখে অত্যন্ত চমৎকার ও যথাযথভাবে নিশ্চিত করেছে। চমৎকার পারিবারিক বন্ধন ভালোবাসা ও মহানুভবতার সৃষ্টি করে। যা শান্তি ও নিরাপত্তার মাধ্যমে পরিবারে ভারসাম্য বজায় রাখে। এ ব্যবস্থাকে পরিবারের সদস্যদের আত্মিক সমৃদ্ধির উপাদান বলে গণ্য করা হয়। সমাজে চমৎকার শৃঙ্খলার সাথে যৌথ পরিবার পরিচালিত হয় এবং শিশুরা সেবাযত্নের সাথে বেড়ে ওঠে।

বৃদ্ধদের সাথে মুসলিমদের ব্যবহার :

মুসলিম বিশ্বে ‘বৃদ্ধাশ্রম’ খুঁজে পাওয়া দুর্লভ ব্যাপার। কারণ, ইসলামে পিতামাতার সাথে চমৎকার সম্পর্ক রাখার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তাদের জীবনের কঠিন সময়ে এটাকে সম্মান ও বরকত লাভে ধন্য হওয়ার সুযোগ হিসাবে গণ্য করা হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে আমরা আমাদের পিতামাতার জন্য শুধু দু‘আ করব এতেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে দয়া-মায়া ও সুহৃদয়তার বন্ধনে আবদ্ধ থেকে তাদের সাথে সদাচরণ করে যাওয়া; আমাদের শিশুকালে যখন আমাদের কোন শক্তি ছিল না, কিছুই করার ক্ষমতা ছিল না, তখন তারা নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ করে আমাদের কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাদের এ অসাধারণ ভূমিকা ও ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা স্মরণ রাখা উচিত। এজন্যই আমরা মায়ের মর্যাদাকে উচ্চাসনে আসীন দেখতে পাই। কারো পিতামাতা যখন বার্ধক্যে উপনীত হয়, তখন তাদের সাথে উদারতা, সহানুভূতি ও নিজের সুখ-দুঃখকে বাজি রেখে তাদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যকে প্রাধান্য দেয়া উচিত। ইসলামে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদাতের পরেই পিতামাতার সাথে সদাচরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পিতামাতার কঠিন সময় বার্ধক্য বয়সে তারা অসন্তুষ্ট হন এমন যে কোন কথাবার্তা বলা মুসলিমদের উচিত নয়। কারণ, অকর্মণ্য হয়ে পড়া তাদের কোন অপরাধ নয়। তাদের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوْا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيْمًا - وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيْرًا.

‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারও উপাসনা কর না এবং পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর। তাদের একজন বা উভয়ই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদেরকে ‘উহ’ শব্দটিও বলো না, তাদেরকে ধমক দিও না এবং তাদের সাথে শিষ্টাচারমূলক কথা বল। তাদের সামনে ভালোবাসার সাথে, নম্রভাবে মাথা অবনমিত হও এবং বল, হে আমার পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি অনুগ্রহ কর, যেমনি তারা আমাকে শৈশবে লালনপালন করেছেন’ (বানী ইসরাইল, ২৩-২৪)

[1]. আল-জুরজানী, শরীফ আলী ইবনে মুহাম্মাদ, কিতাবুত তা‘রীফাত (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৯৮৩ খ্রীঃ), পৃঃ ৬৭।

[2]. আল-জাযাইরী, আবুবকর জাবির, আক্বীদাতুল মুমিন (জেদ্দা: দারুস সুরুক, ৫ম সংস্করণ, ১৯৮৭ খ্রীঃ), পৃঃ ৮৭।

[3]. তবে এখানে সাধারণভাবে যুদ্ধ বা ষড়যন্ত্ররত কাফেরদের বিষয়ে তা বলা হচ্ছে। কিন্তু যেসব কাফের রাষ্ট্র কর্তৃক নিরাপত্তাপ্রাপ্ত হয়ে এসেছে কিংবা কোন দেশের নিজস্ব নাগরিক তাদের নিরাপত্তা রক্ষা করা ও তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করার জন্য আমরা সর্বদা আদিষ্ট। যেমনটি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনা সমাজে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

Magazine