বিদ‘আতের শারঈ সংজ্ঞা বিশ্লেষণ
বিদ‘আতের প্রদত্ত সংজ্ঞাসমূহ গভীরভাবে লক্ষ্য করলে স্পষ্ট হবে যে, ঐ জিনিসগুলোকে বিদ‘আত বলা হয়, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ছাহাবীগণ রাযিয়াল্লাহু আনহুম এবং তাবেঈগণ রাহিমাহুমুল্লাহ-এর যুগে যেগুলোর কোন অস্তিত্ব ছিল না। বর্ণিত বিদ‘আতের সংজ্ঞায় দেখা যাচ্ছে যে, কেউ বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে যা ছিল না’, কেউ বলেছেন, ‘ছাহাবী বা ফক্বীহ ছাহাবীগণের যুগে যা ছিল না’, আবার কেউ বলেছেন, তাবেঈগণের যুগে যা ছিল না’। বাহ্যত দৃষ্টিতে সংজ্ঞাগুলোর মাঝে পার্থক্য দৃষ্টিগোচর হলেও প্রকৃতপক্ষে পরস্পরের মাঝে কোন বিরোধ নেই। কেননা-
প্রথম সংজ্ঞায় প্রখ্যাত সালাফী বিদ্বান ইমাম নববী (৬৩১-৬৭৬ হি.) রাহিমাহুল্লাহ শরী‘আতের মধ্যে এমন সব নব আবিষ্কারকে বিদ‘আত বলেছেন, যা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ছিল না। অর্থাৎ তিনি কেবল রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগের সাথে সম্পর্কিত করেছেন, যা তিনি করেননি, করতে নির্দেশ দেননি কিংবা কোন রকম মৌন সম্মতিও দেননি, এমন প্রত্যেক নব আবিষ্কার বিষয়ই হল বিদ‘আত। তিনি দলীল হিসাবে নিমেণাক্ত হাদীছটি উপস্থাপন করেছেন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ أَصْدَقَ الْحَدِيْثِ كِتَابُ اللهِ وَأَحْسَنَ الْهَدْىِ هَدْىُ مُحَمَّدٍ وَشَرَّ الأُمُوْرِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ وَكُلَّ ضَلَالَةٍ فِى النَّارِ.
‘নিশ্চয় সবচেয়ে সত্য বাণী হল আল্লাহ্র কিতাব আর সর্বোত্তম হেদায়াত হল মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হেদায়াত। নব আবিষ্কার বিষয় সবই মন্দ। প্রত্যেক নতুন আবিষ্কারই বিদ‘আত। প্রত্যেক বিদ‘আতই ভ্রষ্ট এবং প্রত্যেক ভ্রষ্টই জাহান্নামী’।[1] সুতরাং এমন কিছু বিষয়, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে যা বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়নি এবং যা তাঁর যুগে ছিল না, তাই-ই বিদ‘আত। যেমন, শবেবরাত, ঈদে মীলাদুন্নবী, শবে মে‘রাজ ইত্যাদি।
দ্বিতীয় সংজ্ঞায় শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (৬৬১-৭২৮ হি./১২৬৩-১৩২৮ খ্রি.) রাহিমাহুল্লাহ কুরআন, সুন্নাহ ও সালাফের ইজমা তথা ছাহাবীগণের ইজমার বিপরীতে আক্বীদা ও ইবাদতের মধ্যে নবাবিষ্কৃত প্রত্যেক বিষয়কে বিদ‘আত বলে আখ্যায়িত করেছেন। যেমন আক্বীদার ক্ষেত্রে খারেজী, রাফেযী, ক্বাদারিয়া এবং জাহমিয়ারা বিভিন্ন ভ্রান্ত বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। অনুরূপভাবে আমলের ক্ষেত্রে ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ ও যাকাত কেন্দ্রিক আমলের বিপর্যয়, যিক্র-আযকার, কুরআন তেলাওয়াতে বিদ‘আতের ছড়াছড়ি, মসজিদে নাচ-গানের মাধ্যমে ইবাদত করা, দাড়ি কামানো ইত্যাদি। এগুলো বিদ‘আতের প্রকারসমূহের অন্তর্ভুক্ত। কুরআন ও সুন্নাহ বিরোধীদের একটি দল এভাবে তাদের ইবাদত করে থাকে’।[2] অতএব এখানে তিনি বিদ‘আত বলতে কুরআন ও সুনণাহ পরিপন্থী বিষয়কে এবং সাথে ছাহাবীগণের ইজমার বিপরীত কাজকেও অন্তর্ভুক্ত করেছেন। উল্লেখ্য যে, পৃথিবীর ইতিহাসে সর্ব প্রথম বিদ‘আত হল খারেজী বিদ‘আত। আর রাফেযী, ক্বাদারিয়া, জাহমিয়া ও শী‘আ সকলেই আহলে বিদ‘আতের অন্তর্ভুক্ত।[3]
তৃতীয় সংজ্ঞায় ‘আল-ক্বামূসুল মুহীত্ব’ গ্রন্থ প্রণেতা আল্লামা ফীরূযাবাদী (৭২৯-৮১৭ হি./১৩২৯-১৪১৫ খ্রি.) দ্বীন পরিপূর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরবর্তী সময়ে নতুনরূপে প্রবর্তিত সকল বিষয়কে বিদ‘আত বলে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ তিনি ছাহাবীগণের যুগের শরী‘আত পরিপন্থী বিষয়গুলোকেও বিদ‘আতের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
চতুর্থ সংজ্ঞায় জুরজানী (৭৪০-৮১৬ হি./১৩৩৯-১৪১৩ খ্রি.) রাহিমাহুল্লাহ গোটা সুন্নাতের কোন একটির পরিপন্থী বিষয়কে বিদ‘আত বলেছেন। অর্থাৎ তিনি বিদ‘আতকে সুন্নাতের সরাসরি বিপরীত ও তার সাথে সাংঘর্ষিক বলতে চেয়েছেন। অতঃপর বিদ‘আতকে ছাহাবী ও তাবেঈগণের বিপরীত কাজ করা পর্যন্ত সীমায়িত করেছেন।
পঞ্চম ও অষ্টম সংজ্ঞা প্রথম সংজ্ঞার ন্যায়। অতঃপর ষষ্ঠ সংজ্ঞায় ইমাম শাত্বেবী (মৃ. ৭৯০ হি./১৩৮৮ খ্রি.) শরী‘আতের বিপরীতে নতুনরূপে যে সমস্ত কর্মরীতি প্রচলন করা হয়, যেগুলোর মাধ্যমে ইবাদতের ক্ষেত্রে যেভাবে আতিশয্য ও বাড়াবাড়ি করা হয়, সেগুলোকে বিদ‘আত বলে আখ্যায়িত করেছেন। যেমন, ইবাদতের জন্য বিবাহ না করা, সারা বছর ছিয়াম রাখা, রাত্রি বেলায় না ঘুমিয়ে ইবাদত করা, পরিবার-পরিজন বাদ দিয়ে বৈরাগ্য জীবন-যাপন করা ইত্যাদি।
সপ্তম সংজ্ঞায় জালালুদ্দীন আস-সুয়ূত্বী (৮৪৯-৯১১ হি./১৪৪৫-১৫০৫ খ্রি.) এমন প্রত্যেক কাজকে বিদ‘আত বলেছেন, যেগুলোর মূল উদ্দেশ্য হল ইসলামের বিরোধিতা করা ও শরী‘আতকে আঘাত করা। যেমন কুরআন ও হাদীছের মনগড়া ব্যাখ্যা করা, পীর, বুযুর্গানে দ্বীন, ইমাম, নেতা প্রমুখ কর্তৃক প্রণীত বিভিন্ন বানোয়াট ও ভিত্তিহীন ধর্মাচার ও ইবাদত-বন্দেগী, আল্লাহ ও রাসূলের নামে ঠাট্টা-বিদ্রূপ, কটূক্তি ও বেয়াদবী করা, ধর্মের নামে মাযার প্রতিষ্ঠা করা, সেখানে বার্ষিক ওরস করা এবং সেখানে সকলে মিলে গাজা-মদ-ইয়াবায় মত্ত হওয়া ইত্যাদি।
অতঃপর নবম সংজ্ঞায় মুহাম্মাদ ইবনু ছালেহ আল-উছায়মীন (১৩৪৭-১৪২১ হি.) রাহিমাহুল্লাহ নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ছাহাবীগণের বিপরীতে আক্বীদা ও আমলের ক্ষেত্রে নতুন কোন কিছুকে আবিষ্কার করাকে বিদ‘আত বলে আখ্যায়িত করেছেন। অন্যদিকে দশম সংজ্ঞায় ড. মুহাম্মাদ রাওয়াস কিল‘আহজী (১৯৩৪-২০১৪ খ্রি.) রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহ তা‘আলা, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর কেবল ফক্বীহ ছাহাবীগণের নিকট থেকে যা আসেনি তথা বর্ণিত হয়নি তাকে বিদ‘আত বলেছেন। কিন্তু এখানে শুধু ফক্বীহ ছাহাবীদেরকে নির্দিষ্ট করা ঠিক হয়নি। কারণ সকল ছাহাবী ছিলেন ন্যায়ে পরিপূর্ণ ও পূর্ণ আমানতদার।[4]
সুধী পাঠক! উক্ত বিশ্লেষণে প্রমাণিত হল যে, বিদ‘আতের উল্লিখিত শারঈ সংজ্ঞায় একটি অপরটির সাথে কোন রকম দ্বন্দ্ব নেই। বরং পরস্পর পরিপূরক।
এছাড়া রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে কোন বিধান এবং আমল বা ইবাদত থাকা কিংবা না থাকার উদ্দেশ্য হল শারঈভাবে থাকা ও না থাকা। বাস্তবে থাকা ও না থাকা এখানে উদ্দেশ্য নয়। আর কোন কিছু শারঈভাবে থাকার উদ্দেশ্য হল সেটা তার বৈধতার প্রমাণ। আর না থাকা অবৈধতার প্রমাণ। অতএব সহজ কথা হল- নবাবিষ্কৃত ধর্মীয় কোন বিধান কিংবা আমল বা ইবাদতের স্বপক্ষে যখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে অর্থাৎ পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের কোন প্রমাণ পাওয়া না যায়, তখন সেটাই শারঈ বিদ‘আত হবে। তবে যে সমস্ত বিষয়ের ব্যাপারে কুরআন ও ছহীহ হাদীছে প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেগুলো ভ্রষ্ট বিদ‘আত নয়। যদিও প্রকৃতপক্ষে সেগুলো রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ছিল না বরং তাঁর পরবর্তী সময়ে অস্তিত্ব লাভ করেছে। যেমন, আবুবকর ও ওছমান রাযিয়াল্লাহু আনহুমা কর্তৃক কুরআন একত্রিকরণ, ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক রাষ্ট্রীয় নীতিমালার প্রয়োজনীয় পদ্ধতির উদ্ভাবন, হাদীছের সংকলন ও লিপিবদ্ধকরণ ইত্যাদি।
লক্ষ্যণীয় বিষয় হল- ছাহাবী ও তাবেঈগণের সুন্নাতও যেমন অনুসরণীয়, তেমনি তাদের সুন্নাত পরিপন্থী কাজ করাও বিদ‘আত হিসাবে পরিগণিত। এজন্য ইসলামী শরী‘আতে আমাদেরকে ছাহাবীগণ রাযিয়াল্লাহু আনহুম এবং তাবেঈগণের রাহিমাহুমুল্লাহ আমলসমূহ অনুসরণের ব্যাপারে বলা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের ব্যাপারে প্রশংসা করেছেন। এছাড়া আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের বিশ্বাস মতে, সকল ছাহাবীই ছিলেন ন্যায়পরায়ণ।[5] তাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন,
مُحَمَّدٌ رَسُوْلُ اللَّهِ وَالَّذِيْنَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُوْنَ فَضْلًا مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيْمَاهُمْ فِيْ وُجُوْهِهِمْ مِنْ أَثَرِ السُّجُوْدِ ذَلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنْجِيْلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْأَهُ فَآزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَى عَلَى سُوْقِهِ يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيْظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ وَعَدَ اللَّهُ الَّذِيْنَ آمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيْمًا .
‘মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল, আর যারা তাঁর সাথে আছে তারা কাফিরদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরে সহানুভূতিশীল; আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় তুমি তাদেরকে রুকূ‘ ও সিজদায় অবনত দেখবে। তাদের মুখমণ্ডলে সিজদার চিহ্ন থাকবে, তাওরাতে তাদের বর্ণনা এরূপই এবং ইঞ্জীলেও। তাদের দৃষ্টান্ত একটি শস্য ক্ষেত, যার চারাগাছগুলো অঙ্কুরিত হয়, পরে সেগুলোও পুষ্ট হয় পরে কাণ্ডের উপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে, যা চাষীকে আনন্দিত করে। এভাবে (আল্লাহ মুমিনদের সমৃদ্ধি দ্বারা) কাফিরদের অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি করেন। যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা ও মহা পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন’ (সূরা আল-ফাত্হ : ২৯)। অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন,
وَالسَّابِقُوْنَ الْأَوَّلُوْنَ مِنَ الْمُهَاجِرِيْنَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِيْنَ اتَّبَعُوْهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوْا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِيْ تَحْتَهَا الأنَّهُارُ خٰلِدِیْنَ فِیْھَآ اَبَدًاﺚ ذٰلِکَ الْفَوْزُ الْعَظِیْمُ.
‘আর যেসব মুহাজির ও আনছার (ঈমান আনয়নে) অগ্রবর্তী এবং প্রথম, আর যেসব লোক একান্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুগামী, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে, আর আল্লাহ তাদের জন্য এমন উদ্যানসমূহ প্রস্ত্তত করে রেখেছেন, যার তলদেশে নহরসমূহ বইতে থাকবে, যার মধ্যে তারা চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে, তা হচ্ছে বিরাট সফলতা’ (সূরা আত-তাওবাহ : ১০০)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِيْنَ إِذْ يُبَايِعُوْنَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ.
‘আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা বৃক্ষতলে তোমার নিকট বায়‘আত গ্রহণ করেছে’ (সূরা আল-ফাত্হ: ১৮)। এমনকি এই বায়‘আতকে ‘বায়‘আতে রিযওয়ান’ বলা হয়। কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাদের কার্যক্রমে ও তাঁদের বায়‘আতে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন।[6]
ছাহাবীগণ ছিলেন কুরআন ও সুন্নাহ্র ধারক ও বাহক এবং বাস্তব রূপকার। তাঁদের জীবনের যাবতীয় কর্মকা- তাঁরা কুরআন ও সুন্নাহ্র আলোকেই সম্পন্ন করতেন। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের অসংখ্য ফযীলত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, خَيْرُكُمْ قَرْنِىْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ‘তোমাদের মধ্যে আমার যুগ সর্বোত্তম। অতঃপর তার পরবর্তী যুগ, অতঃপর তাদের পরপর্তী যুগ’।[7] উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় আব্দুল মুহসিন আল-আববাদ হাফিযাহুল্লাহ বলেন,
هُمْ أَصْحَابُهُ الَّذِينَ سَمِعُوا مِنْهُ وَالَّذِينَ يَلُوْنَهُمْ هُمْ التَّابِعُونَ الَّذِينَ سَمِعُوا مِمَّنْ سَمِعَ مِنْهُمْ وَأَتْبَاعُ التَّابِعِينَ هُمْ الَّذِينَ سَمِعُوا الَّذِينَ سَمِعُوا مِمَّنْ سَمِعَ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
‘(আমার এই যুগ বলতে) ছাহাবীগণ, যারা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট থেকে শুনেছেন। অতঃপর পরবর্তী যুগ বলতে তাবেঈদের যুগ, যারা ছাহাবীগণের নিকট থেকে শুনেছেন। অতঃপর তার পরবর্তী যুগ বলতে তাবে‘ তাবেঈগণ, যারা তাবেঈগণের নিকট থেকে শুনেছেন, তারা শুনেছেন ছাহাবীগণের নিকট থেকে আর ছাহাবীগণ শুনেছেন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট থেকে’।[8] অনুরূপভাবে ইবনু হাজার আসক্বালানী (৭৭৩-৮৫২ হি./১৩৭২-১৪৪৮ খ্রি.)[9], ইমাম নববী (৬৩১-৬৭৬ হি./১২৩৪-১২৭৮ খ্রি.)[10], জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী (৮৪৯-৯১১ হি./১৪৪৫-১৫০৫ খ্রি.)[11], শাওকানী (১১৭৩-১২৫০ হি./১৭৫৯-১৮৩৪ খ্রি.)[12], শামসুল হক্ব আযীমাবাদী (মৃ. ১৩০০ হি./১৮৯২ খ্রি.)[13] সহ অনেক মুহাদ্দিছ একই বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন।
এজন্য মুতাক্বাদ্দেমীন তথা প্রাথমিক স্তরের মানুষদেরকে এবং পরবর্তীতে তাদের অনুসারীদেরকে ‘সালাফে ছালেহীন’ বলা হয়। ঐ তিনযুগের মানুষদের সুন্নাত ও পদ্ধতি হল সর্বোত্তম সুন্নাত ও পদ্ধতি। এ ব্যাপারে আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানী (১৩৩২-১৪২০ হি./১৯১৪-১৯৯৯ খ্রি.) বলেন,
أنهم القرون الثلاثة الخيرة التي جاء الثناء عليها عن رسول الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ في قوله (خير القرون قرني ثم الذين يلونهم، ثم الذين يلونهم ثم يأتي من بعد ذلك أناس يشهدون ولا يستشهدون ويخونون ولا يؤتمنون ويكون فيهم الكذب) فهؤلاء بشهادة رسول الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أي لهذه القرون الثلاثة أنهم خير القرون ولا شك أن هديهم وطريقتهم وسنتهم هي خير الهدي وخير السنن وخير الطرائق.
‘তাঁরা হলেন, সর্বোত্তম যুগের মানুষ, যাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, তোমাদের মধ্যে আমার যুগ সর্বোত্তম। অতঃপর তার পরবর্তী যুগ, অতঃপর তাদের পরবর্তী যুগ। এরপর এমন লোকেরা আসবে, যারা সাক্ষ্য দিবে কিন্তু তাদের নিকট সাক্ষ্য চাওয়া হবে না। তারা খিয়ানত করবে কিন্তু আমানতদার হবে না। তাদের মাঝে মিথ্যাচার প্রকাশ পাবে’। তাঁরা অর্থাৎ ঐ তিন যুগের লোকেরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য সাক্ষী হবে। কেননা তাঁরা হলেন সর্বোত্তম যুগের মানুষ। আর এটাতে কোন সন্দেহ নেই যে, তাঁদের হেদায়াত, পদ্ধতি ও সুন্নাত হল সর্বোত্তম হেদায়াত, সর্বোত্তম সুন্নাত এবং সর্বোত্তম পদ্ধতি’।[14]
ছাহাবীদের মর্যাদার ব্যাপারে অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
اِقْتَدُوْا بِاللَّذَيْنِ مِنْ بَعْدِىْ مِنْ أَصْحَابِىْ أَبِىْ بَكْرٍ وَعُمَرَ وَاهْتَدُوْا بِهَدِىْ عَمَّارٍ وَتَمَسَّكُوْا بِعَهْدِ ابْنِ مَسْعُوْدٍ.
‘তোমরা আমার পরবর্তী ছাহাবীদের মধ্যে বিশেষ করে আবু বকর ও ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর অনুকরণ করবে। আর আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর শিক্ষা মেনে চলবে এবং আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহুমা তোমাদের কাছে যা বর্ণনা করবে, তা সত্য হিসাবে গ্রহণ করবে’।১৫ অন্যত্র রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
وَأَنَا أَمَنَةٌ لِأَصْحَابِىْ فَإِذَا ذَهَبْتُ أَتَى أَصْحَابِىْ مَا يُوْعَدُوْنَ وَأَصْحَابِىْ أَمَنَةٌ لِأُمَّتِىْ فَإِذَا ذَهَبَ أَصْحَابِىْ أَتَى أُمَّتِىْ مَا يُوْعَدُوْنَ.
‘আমি আমার ছাহাবীদের জন্য নিরাপত্তা স্বরূপ। অতঃপর আমি যখন চলে যাব, তখন আমার ছাহাবীদের উপর প্রতিশ্রুত সময় এসে যাবে। আমার ছাহাবীরা হলো আমার উম্মতের জন্য নিরাপত্তা স্বরূপ। আর যখন আমার ছাহাবীরা চলে যাবে, তখন আমার উম্মতের ওপর প্রতিশ্রুত বিপদ নেমে আসবে’।১৬ আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لَا تَسُبُّوْا أَصْحَابِىْ فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيْفَهُ.
‘তোমরা আমার ছাহাবীদেরকে গালি দিও না। কেননা তোমাদের কেউ যদি ওহুদ সমান স্বর্ণ দান করে, তথাপিও তাদের কারো অর্ধ এক ছা‘ বা অর্ধ ছা‘ দানের সমান হবে না’।১৭
ইবনুল জাওযী (৫০৮-৫৯৭ হি./১১১৬-১২০১) রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘তারা ছিলেন সুন্নাতের পূর্ণ অনুসারী। তাদের সময় কোনরূপ নতুন কোন বিষয় উদ্ভাবিত হয়নি।
মূলত রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং ছাহাবীগণ রাযিয়াল্লাহু আনহুম-এর পরেই বিদ‘আত সৃষ্টি হয়েছে’।১৮
উক্ত আলোচনায় প্রতীয়মান হল যে, ছাহাবীগণ ছিলেন আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একান্ত বিশ্বস্ত। তাদের পরবর্তীদর জন্য তাঁরা সকলেই ছিলেন ন্যায়পরায়ণ। আর তাবেঈগণ ও তাবে‘ তাবেঈগণও ছিলেন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ঘোষিত উত্তম বা প্রশংসিত যুগের অধিবাসী। সুতরাং বিদ‘আতের পরিচয়ে উল্লিখিত ছাহাবী, তাবেঈ ও তাবে‘ তাবেঈগণের যুগেও যেটা শরী‘আত হিসাবে প্রচলিত ছিল না, পরবর্তীতে শরী‘আত মনে করে তা নতুনরূপে চালু করাই হল বিদ‘আত। তবে যেগুলোর ব্যাপারে দলীল পাওয়া যাবে, সেগুলো বিদ‘আত বলে গণ্য হবে না, যদিও সেগুলো সেই সমস্ত যুগে ছিল না। বলা বাহুল্য, উক্ত তিনযুগের কোন সুন্নাত ও পদ্ধতি যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শরী‘আতের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে সেটাও বিদ‘আত হিসাবে গণ্য হবে। যেমন, ঈদের ছালাতের পূর্বে খুৎবা প্রদান করা, ঈদগাহে মিম্বার স্থাপন করা, এক ছা‘য়ের পরিবর্তে অর্ধ ছা‘ যাকাতুল ফিতর প্রদান করা ইত্যাদি।
অতএব বিদ‘আতের শারঈ সংজ্ঞা বিশস্নষণে বিদ‘আতের শারঈ সংজ্ঞা দাঁড়ায় যে- নেকী অর্জনের আশায় আক্বীদা ও আমলের ক্ষেত্রে এমন সব বিষয় নতুনরূপে আবিষ্কার করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বিধিবদ্ধ করেননি এবং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে করেননি বা করতে নির্দেশ দেননি কিংবা করার ব্যাপারে কোন মৌন সম্মতিও ছিল না এবং যে বিষয়গুলো সালাফ তথা ছাহাবীগণের ইজমার বিপরীত, তাকে বিদ‘আত বলা হয়।
(চলবে)
[1]. সুনানু নাসাঈ, হা/১৫৭৮; ছহীহ ইবনু খুযায়মাহ, হা/১৭৮৫, সনদ ছহীহ।
[2]. মাজমূঊল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া, তাহক্বীক্ব : আনওয়ার আল-বায ও আমের আল-জাযযার (দারুল ওয়াফা, ৩য় সংস্করণ, ১৪২৬ হি./২০০৫ খ্রি.), ১৮তম খ-, পৃ. ৩৪৬।
[3]. শামসুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ আস-সাফফারীনী, লাওয়ামিঊল আনওয়ারিল বাহিয়্যাহ ওয়া সাওয়াত্বিঊল আসরারিল আছরিয়্যাহ (দামেস্ক : মুওয়াসসাসাতুল খাফেক্বীন, ২য় সংস্করণ, ১৪০২ হি./১৯৮২ খ্রি.), ১ম খ-, পৃ. ৭১।
[4]. আবু শামাহ, আল-বাঈছু আলা ইনকারিল বিদাঈ, তাহক্বীক্ব : ওছমান আহমাদ আম্বার (কায়রো : দারুল হুদা, ১ম সংস্করণ, ১৩৯৮ হি./১৯৭৮ খ্রি,), পৃ. ৫০।
[5]. মুহাম্মাদ ইবনু খালীফাহ আত-তামীমী, হুকূকুন নাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলা উম্মাতিহি ফী যাওইল কিতাবি ওয়া সুন্নাতি (রিয়ায, সঊদী আরব : আযওয়াউস সালাফ, ১ম সংস্করণ, ১৪১৮ হি./১৯৯৭ খ্রি.), ২য় খণ্ড, পৃ. ৪৮৭।
[6]. ছালেহ আলুশ শায়খ, শারহুল আক্বীদাতিত ত্বাহাবিয়্যাহ, পৃ. ৬২৪।
[7]. ছহীহ বুখারী, হা/২৬৫১, ৬৪২৮, ৬৬৯৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৩৫; নাসাঈ, হা/৩৮০৯; মিশকাত, হা/৬০০১।
[8]. আব্দুল মুহসিন আল-আববাদ, শারহু সুনানি আবী দাঊদ, ১৯ তম খণ্ড, পৃ. ২৯৫।
[9]. ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী, ফাৎহুল বারী শারহু ছহীহিল বুখারী (বৈরূত : দারুল মা‘রিফাহ, ১৩৭৯ হিঃ), ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃঃ ৮৯।
[10]. নববী, আল-মিনহাজ শারহু ছহীহ মুসলিম (বৈরূত : দারু ইহইয়াউত তুরাছিল আরাবী, ২য় সংস্করণ, ১৩৯২ হি.), ১৬ তম খণ্ড, পৃ. ৮৫।
[11]. জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী, আদ-দীবাজু আলা ছহীহ মুসলিম (সঊদী আরব : দারু ইবনি আফফান, ১ম সংস্করণ, ১৪১৬ হি./১৯৯৬ খ্রি.), ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৪৮১।
[12]. শাওকানী, নায়লুল আওত্বার (মিসর : দারুল হাদীছ, ১ম সংস্করণ, ১৪১৩ হি./১৯৯৩ খ্রি.), ৮ম খণ্ড, পৃ. ৩৪১।
[13]. শামসুল হক্ব আযীমাবাদী, ‘আওনুল মা‘বূদ শারহু সুনানি আবী দাঊদ (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, ২য় সংস্করণ, ১৪১৫ হি.), ১২ তম খণ্ড, পৃ. ২৬৭।
[14]. মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানী, দুরূসুন লিশ শায়খ মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানী, ৩৮ তম খণ্ড, পৃ. ২।
[15]. তিরমিযী, হা/৩৮০৫; মিশকাত, হা/৬২২১; সনদ ছহীহ, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১২৩৩।
[16]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৩১; মিশকাত, হা/৫৯৯৯।
[17]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৬৭৩; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৪০; মিশকাত, হা/৫৯৯৮।
[1৮]. আবুল ফারয ইবনুল জাওযী, তালবীসু ইবলীস (বৈরূত, লেবানন : দারুল ফিকর, ১ম সংস্করণ, ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.), পৃ. ১৭- وآثار أصحابه هم أهل السنة لأنهم على تلك الطريق التي لم يحدث فيها حادث وإنما وقعت الحوادث والبدع بعد رسول الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وأصحابه.
