কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থে গরু ও প্রাণীর মাংস খাওয়ার বিধান (পর্ব-৩)

যজুর্বেদে গরু : 

কৃষ্ণ যজুর্বেদের কয়েক স্থানে সরাসরি গরু বলির কথা বলা আছে—

‘On the full moon (the Soma) is pressed for the gods; during this half-month it is pressed forth for them, and a cow for Mitra and Varuna is to be slaughtered for them at the new moon. In that [4] he sacrifices on the day before, he makes the sacrificial enclosure. In that he drives away the calves, he metes out the seat and the oblation holder. In that he sacrifices, he produces with the gods the pressing day. He drinks for the half-month Soma in carouse with the gods. In that he sacrifices at the new moon with clotted curds for Mitra and Varuna, the cow which is slaughtered for the gods becomes his also’.[1] আর—

‘At the time of the (offering of the) cow, he should offer on one potsherd to Mitra and Varuna, this (offering) corresponds to his foe’s cow which is to be slaughtered; his (offering) is on one potsherd, for he cannot obtain the animal (offering) by means of (many) potsherds’.[2]

যজুর্বেদ এর এক স্থান হতে পরোক্ষভাবে গরু বলির কথা জানা যায়—

‘সৃষ্টির পূর্বে প্রজাপতি একাই ছিলেন, তিনি কামনা করলেন প্রজা ও পশু সৃষ্টি করব। তিনি শরীর থেকে বপা উদ্ধৃত করে অগ্নিতে নিক্ষেপ করলেন, তা থেকে শৃঙ্গরহিত অজ উৎপন্ন হলো। তাকে তার অনুরূপ দেবতাকে অর্পণ করে তিনি প্রজা ও পশু লাভ করেন। যে ব্যক্তি প্রজা ও পশু কামনা করবে সে প্রজাপতির উদ্দেশ্যে শৃঙ্গরহিত অজ অর্পণ করবে। প্রজাপতিকে তার ভাগ দিয়ে সেবা করলে প্রজাপতি প্রজা ও পশু উৎপন্ন করে থাকেন। যাদের শ্মশ্রু আছে, তা পুরুষের রূপ, যা শৃঙ্গহীন তা অশ্বাদির, নিচে দন্তপাটি যাদের আছে তা গাভী প্রভৃতির, মেষের খুরের মতো শফবিশিষ্ট যারা তারা অজ জাতি— এগুলো গ্রাম্য পশু, এভাবে প্রজাপতি সকল পুরুষাদি লাভ করলেন। যে তিনটি পশু একসঙ্গে লাভ করতে চায়, সে সোম ও পুষার উদ্দেশ্যে এরূপ তিনটি পশু দেবে’।[3]

অথর্ববেদে গরু :

অথর্ববেদেও ঋগবেদের বিবাহ সুক্তে উল্লেখিত ঋকটি রয়েছে—

সূর্যয়া বহতুঃ প্রাগাৎ সবিতা যমবাসৃজৎ। মঘাসু হন্যতে গাবঃ ফল্গুনীষু ব্যুহ্যতে।।[4]

গ্রিফিথ এর অনুবাদ করেছেন—

‘The bridal pomp of suryaa, which savitar started, moved along. In magha days are oxen slain, in Phalgunis they wed the bride’.[5] 

হুইটনিও গ্রিফিথ এর মতো একই ধরনের অনুবাদ করেছেন।

তুলসীরাম আচার্যসহ অনেকে এর অন্যরকম অনুবাদ করেছেন—

‘The bridal procession of Surya proceeds which Savita, her father, starts. The bullocks are made to move in Magha nakshatra and the bride is inducted into the groom’s home in Phalguni nakshatra’.

ঋগবেদের মতো অথর্ববেদেও দেখা যায় মৃতের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় গরুর চামড়া ব্যবহার করা হতো—

অগ্নের্বর্ম পরি গোভির্ব্যয়স্ব সংস প্রোর্ণুষ্ব নেদিসা অঊভিস্ত চ। নেৎ ত্বা ধৃষ্ণুর্হরসা হির্হৃষাণো দধৃগ্ বিধক্ষন্ পরীঙ্খায়াতৈ।।[6]

‘হে প্রেত, তুমি গাভীর অবয়বের দ্বারা দাহক অগ্নির আচ্ছাদক বর্ম ধারণ করো, মেদ ও অন্যান্য স্থূল অঙ্গের দ্বারা নিজেকে আচ্ছন্ন করো, তা না হলে ধর্ষক, স্বতেজে রসহরণশীল অগ্নি তোমাকে দাহ করবার জন্য ফেলে দেবে’।[7]

ব্রাহ্মণ গ্রন্থে গরু :

বেদের সংহিতা অংশের পরে ব্রাহ্মণ অংশ রচিত হয়। বিভিন্ন ব্রাহ্মণ গ্রন্থেও গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণের কথা পাওয়া যায়।

ঐতরেয় ব্রাহ্মণ, ১/৩/৪-এ রাজা অথবা অন্য কোনো সম্মানীয় ব্যক্তি উপস্থিত হলে বৃষ অথবা বৃদ্ধা গাভী হত্যা করার কথা বলা হয়েছে—

‘যেমন নররাজ অথবা অন্য পূজ্য ব্যক্তি উপস্থিত হইলে বৃষ অথবা বেহৎ (গর্ভনাশিনী বৃদ্ধা গাভী) হত্যা করে, সেইরূপ অগ্নির যে মন্থন হয়, তাহাতেই সোমের উদ্দেশ্যে অগ্নির হত্যা করা হয়, কেননা অগ্নিই দেবগণের পশু’।[8]

পরবর্তীকালের গৃহ্যসূত্র, ধর্মসূত্র, ধর্মশাস্ত্র প্রভৃতিতে এই প্রথার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়।

এছাড়া ঐতরেয় ব্রাহ্মণ, ২/৬/৮-এ দেবতারা গরুকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন—

‘(পুরাকালে) দেবগণ পুরুষকে (মনুষ্যকে) পশুরূপে আলম্ভন (যজ্ঞে হনন) করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন। সেই হননোদ্যত পুরুষ হইতে যজ্ঞভাগ পলায়ণ করিল ও অশ্বে প্রবেশ করিল। সেইজন্য অশ্ব যজ্ঞযোগ্য হইল। অনন্তর যজ্ঞভাগ কর্তৃক পরিত্যাক্ত সেই পুরুষকে দেবগণ সম্পূর্ণ রূপে বর্জন করিলেন; সেই পুরুষ (তখন) কিম্পুরুষ হইল।

তাহারা অশ্বের আলম্ভনে উদ্যত হইলেন। সেই হননোদ্যুক্ত অশ্ব হইতে যজ্ঞভাগ পলায়ণ করিল এবং গরুতে প্রবেশ করিল। সেই হইতে গরু যজ্ঞের যোগ্য হইল। দেবগণ সেই যজ্ঞভাগ কর্তৃক পরিত্যক্ত অশ্বকে বর্জন করিলেন; সেই অশ্ব (তখন) গৌর মৃগ হইল।

তাহারা গরুর আলম্ভনে উদ্যত হইলেন। সেই বধোদ্যুক্ত গরু হইতে যজ্ঞভাগ পলায়ণ করিল ও অবিতে (মেষে) প্রবেশ করিল। সেই হইতে অবি যজ্ঞের যোগ্য হইল। তখন দেবগণ যজ্ঞ ভাগ কর্তৃক পরিত্যাক্ত গরুকে বর্জন করিলেন, সে গবয় হইল।

তাহারা অবির আলম্ভনে উদ্যত হইলেন। সেই বধোদ্যুক্ত অবি হইতে যজ্ঞভাগ পলায়ণ করিল ও অজে (ছাগলে) প্রবেশ করিল। সেই হইতে অজ যজ্ঞের যোগ্য হইল। দেবগণ যজ্ঞভাগ কর্তৃক পরিত্যাক্ত অবিকে বর্জন করিলেন; সে উষ্ট্র হইল।

এই যজ্ঞভাগ অজে বহুকাল ধরিয়া ক্রিড়া করিয়াছিল। সেই হেতু এই যে অজ, সে পশুগণ মধ্যে (যজ্ঞে) সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত।

তাহারা অজের আলম্ভনে উদ্যত হইলেন। সেই বধোদ্যুক্ত অজ হইতে যজ্ঞভাগ পলায়ণ করিল ও এই (পৃথিবীতে) প্রবেশ করিল। সেই হইতে এই (পৃথিবী) যজ্ঞের যোগ্য হইল। তখন দেবগণ যজ্ঞভাগ কর্তৃক পরিত্যাক্ত অজকে বর্জন করিলেন, সে শরভ হইল’।[9]

ঐতরেয় ব্রাহ্মণ, ৪/১৮/৮-এ বৃষকে হত্যা করার কথা বলা আছে—

‘মহাব্রত দিনে সবনীয় পশুর স্থানে বিশ্বকর্মার উদ্দিষ্ট উভয় পার্শ্বে উভয় বর্ণযুক্ত বৃষভ আলম্ভনযোগ্য। অতএব (ঐ দিনে) উহারই আলম্ভন করিবে’।[10]

শতপথ ব্রাহ্মণ, ১/১/৪-এ একটি উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে। এখানে অসুরেরা মনুর বৃষকে হত্যা করার জন্য মনুর অনুমতি চাইলে তিনি কোনো আপত্তি করেন না এবং সেই বৃষটিকে হত্যা করা হয়—

‘১৪। মনুর একটি ঋষভ (বৃষ) ছিল। ঐ ঋষভে অসুর ও শত্রুগণের হননকারী শব্দ (বাক) প্রবেশ করে তাহার শ্বাস ও শব্দে পীড়িত হইয়া অসুর ও রক্ষোগণ চলিয়া গিয়াছিল। অনন্তর তাহারা এই আলাপ করে— ‘হায়! এই ঋষভ আমাদের পাপ (পরাজয়) সম্পাদন করিতেছে; কী প্রকারে আমরা ইহাকে বিনাশ করিব!’ কিলাত ও আকুলি নামে অসুরগণের দুই পুরোহিত ছিলেন।

১৫। তাহারা উভয়ে বলিলেন— ‘মনু শ্রদ্ধাদেব (অত্যন্ত শ্রদ্ধালু— সহজে অন্যের কথায় বিশ্বাস করেন); আমরা ইহার অভিপ্রায় জানিব’। তাহারা আগমন করিয়া তাহাকে বলিলেন— ‘হে মনু! আমরা আপনার যাগ করিব!’

‘কাহার দ্বারা?’

‘এই ঋষভের দ্বারা’।

মনু ‘তাহাই হউক’ বলিলে তাহারা সেই ঋষভকে বধ করায় ঐ শব্দ (বাক) অপগত হইল’। (শতপথ ব্রাহ্মণে, ১/১/৪/১৪-১৫, অনুবাদক— শ্রী বিধূশেখর ভট্টাচার্য) । শতপথ ব্রাহ্মণ, ৩/১/২/২১-এ গাভী ও ষাঁড়ের মাংস খেতে অনেক বারণ করা হয়েছে। কিন্তু তারপরেই বিখ্যাত যাজ্ঞবল্ক্যের কথা বলা হয়েছে। যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন, গরুর মাংস নরম হলে তিনি তা খান—

‘তারপর তিনি (অধ্বর্যু) তাকে শালায় নিয়ে যান। সে গরু বা ষাঁড়ের মাংস না খাক কারণ গরু এবং ষাড় পৃথিবীর সব কিছুকে ধারণ করে থাকে। দেবতারা বললেন, ‘সত্যই, গাভী এবং ষাঁড় এখানে সবকিছুকে ধারণ করেঃ এস, অন্য প্রজাতির যত বীর্য (পরাক্রম) তা গাভী ও ষাঁড়কে প্রদান করি’। সেইমতো তারা অন্য প্রজাতিদের যত বীর্য ছিল তা গাভী ও ষাঁড়কে প্রদান করলেন এবং তাই গাভী এবং ষাঁড় সবচাইতে বেশি ভোজন করে। তাই গাভি বা ষাঁড়ের মাংস খেলে সবই খাওয়া হয়। সর্বনাশী গতিযুক্ত সে বিচিত্র যোনিতে জন্মগ্রহণ করবে। মানুষেরা বলবে সে মায়ের গর্ভ নষ্ট করেছে, পাপ করেছে। সে গাভী এবং ষাঁড়ের মাংস না খাক। তবুও যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন, ‘আমি তো খাই যদি তা নরম (অংশল) হয়’। (শতপথ ব্রাহ্মণ, ৩/১/২/২১)।

He (the adhvaryu) then makes him enter the hall. Let him not eat (the flesh) of either cow or the ox; for the cow and the ox doubtless support everything here on earth. The gods spake, ‘Verily, the cow and the ox support everything here : come, let us bestow on the cow and the ox whatever vigour belongs to other species!’ Accordingly they bestowed on the cow and the ox whatever vigour belonged to other species (of animals); and therefore the cow and the ox eat most. Hence, were one to eat (the flesh) of an ox or a cow, there would be, as it were, an eating of everything, or, as it were, a going on to the end (or, to destruction). Such a one indeed would be likely born (again) as a strange being, (as one of whom there is) evil report such as ‘he has expelled an ambryo from a woman, he has committed a sin; let him not eat (the flesh) of the cow and the ox. Nevertheless yajnavalkya said , ‘I, for one, eat it, provided that it is tender’. (Shatapath Brahman, 3/1/2/21, Translated by eggeling). 

মুর্শিদাবাদ, ভারত।


[1]. Krishna yajurveda, taittiriya samhita, 2/5/5, Translated by Keith.

[2]. Krishna yajur veda, taittiriya samhita, 2/2/9, Translated by Keith.

[3]. কৃষ্ণ যজুর্বেদ তৈত্তিরীয় সংহিতা ২ কাণ্ড/১ম প্রপাঠক।

[4]. অথর্ববেদ, ১৪/১/১৩।

[5]. Atharva Veda, 14/1/13, Translated by Griffith.

[6]. অথর্ববেদ, ১৮/২/৬/৮।

[7]. অথর্ববেদ, ১৮/২/৬/৮, অনুবাদক— বিজন বিহারী গোস্বামী।

[8]. ঐতরেয় ব্রাহ্মণে, ১/৩/৪, অনুবাদক— রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী।

[9]. ঐতরেয় ব্রাহ্মণে, ২/৬/৮, অনুবাদক— রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী।

[10]. ঐতরেয় ব্রাহ্মণ, ৪/১৮/৮, অনুবাদক— রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী।

Magazine