কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

উকিল বাবা কালচার

আমাদের সমাজ ও দেশে অসংখ্য সামাজিক কুপ্রথা ও ধর্মীয় কৃষ্টি-কালচার বিদ্যমান। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে— ‘উকিল বাবা’ কালচার। এটি আমাদের সমাজে খুবই প্রচলিত ও পরিচিত একটি কালচার, যা হিন্দু সমাজ খেকে আমাদের সমাজে অযাচিতভাবে আগত। দীর্ঘদিন আমরা হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় বসবাস করার ফলে হিন্দুদের এরকম অনেক ধর্মীয় ও সামাজিক কৃষ্টি-কালচার আমাদের মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে। একেকটি কালচার মুসলিম সমাজে এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে বসে আছে, যা আপাতদৃষ্টিতে মুসলিমদের ধর্মীয় কালচার বলেই মনে হয়।

‘উকিল বাবা’ বলতে বুঝায় বিয়ের সময় কনের বাবার পক্ষ থেকে নিযুক্ত মেয়ের অভিভাবক, যাকে বিয়ের পর নিজের বাবার মতো মনে করে দম্পতি। বিভিন্ন দিবস উপলক্ষ্যে বিবাহিত দম্পতি ‘উকিল বাবা’ নামক নতুন সৃষ্ট এই বাবাকে দাওয়াত দিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসাতে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন, ভালোমন্দ খাবার খাওয়ান, আদর-আপ্যায়ন করেন, বিভিন্ন উপহার সামগ্রী প্রদান করেন। অপরপক্ষে মেয়ে-জামাইও বিভিন্ন সময়ে উকিল বাবার আমন্ত্রণে তার বাড়িতে যাতায়াত করেন। এভাবে দুপক্ষের সম্পর্কটা বেশ ঘনিষ্ঠ হয়। ফলে অবাধে-অনায়াসে দুপক্ষের যাতায়াতের মাধ্যমে নতুন এক সম্পর্কের সূত্র ধরে বেগানা নারী-পুরুষের সম্পর্কও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়, যা ইসলাম কোনোভাবেই সমর্থন করে না। আর এই সম্পর্কের সূত্র ধরে উকিল বাবা ও মেয়ের মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়ার পথ সুগম হয়। সমাজে যার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত রয়েছে।

উকিল বাবাকে বাবা বলে ডাকা, তার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা পরিষ্কার হারাম। কারণ কুরআন ও হাদীছে এ পরিভাষাটির কোনো অস্তিত্ব নেই, যার প্রমাণ হাদীছে এসেছে। সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ وَهْوَ يَعْلَمُ فَالْجَنَّةُ عَلَيْهِ حَرَامٌ ‘যে ব্যক্তি জেনেশুনে নিজের পিতাকে ছাড়া অন্য কাউকে পিতা বলে দাবি করে, তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যাবে’।[1]

মেয়ের বিয়েতে জন্মদাতা পিতাই মেয়ের কাছ থেকে অনুমতি গ্রহণ করবেন অর্থাৎ উকিল হবেন। এক্ষেত্রে অন্য কারো উকিল হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। তবে মেয়ের পিতার অবর্তমানে মেয়ের চাচা, মামা, ভাই বা অন্য কোনো পুরুষ মেয়ের উকিল হতে পারবেন। এটিই শরীআত সমর্থিত পদ্ধতি। কিন্তু তা না করে আমাদের সমাজে করা হয় এর উল্টোটা।

অর্থাৎ মেয়ের পিতার উপস্থিতিতে অন্য একজন পুরুষকে মেয়ের উকিল নিযুক্ত করা হয়। বিয়েতে এ পদ্ধতিটি সম্পূর্ণরূপেই একটি ভুল পদ্ধতি, একটি সামাজিক কুসংস্কার। যে কুসংস্কারটি আমাদের সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। সমাজের বর্তমান অবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কী শিক্ষিত, কী মূর্খ সবাই এই নিয়ম পালনে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। সামাজিক এই কুপ্রথা বা ব্যাধি নিরসনে কারো কোনো জোরালো পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয় না। অনেকে বিষয়টি হারাম জেনেও মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, সমাজের সিংহভাগ মানুষই বিয়ে-শাদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানগুলোর ইসলামী সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল নন। তাই তারা প্রচলিত পদ্ধতিকেই সঠিক বলে মনে করেন ও সে অনুযায়ী কাজ করেন। ফলে সমাজে সঠিক ইসলামী বিবাহের রূপরেখা তুলে ধরলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। মানুষকে ছহীহ সুন্নাহর কথা বুঝিয়ে বলা কঠিন হয়ে পড়ে।

আল্লাহর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, ‘ওলী ছাড়া বিয়ে হয় না’।[2] অর্থাৎ মেয়ের পিতার বর্তমানে তাকে ছাড়া বিবাহ বৈধ হয় না। অথচ সমাজে তা দেদারসে চলছে বৈকি! সম্পূর্ণ বিপরীত এক কর্মকাণ্ড। আর ওলী ছাড়া সমাজে বিবাহ হওয়ার সুযোগ থাকায় ছেলে-মেয়েরা অবৈধ প্রেমের সম্পর্ক গড়ে অভিভাবকের অনুমতি ব্যতিরেকে গোপনে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করছে। অভিভাবকরা কষ্ট করে সন্তান লালনপালন করেও তার বিয়ে দিতে পারছে না। সন্তান তার খেয়ালখুশি মতো কাউকে পছন্দ করে তার হাত ধরে চলে যাচ্ছে, বিয়ে করছে। এভাবে সমাজে নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক, যেনা-ব্যভিচার ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে। পিতার জীবদ্দশায় পিতার অনুমতি ব্যতিরেকে নিজে নিজে তার বিয়ে বাস্তবায়ন করার অধিকার ইসলাম কোনো মেয়েকে দেয়নি। তবে হ্যাঁ, পিতা যদি পাগল বা অজ্ঞান হয়, তখন সে বিষয়টি আলাদা। সেক্ষেত্রে পিতা ব্যতিরেকে অন্য কারও ওলী বা অভিভাবক হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আল্লাহর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীছ ‘অলী ছাড়া বিবাহ হয় না’-একথা প্রমাণ করে যে, আমাদের সমাজে যে সমস্ত বিবাহ অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তার সিংহভাগই বাতিল বলে গণ্য। কেননা এখানে একদিকে পিতা বিবাহে উপস্থিত থেকেও নিজে ওলী না হয়ে অন্য কাউকে ‘উকিল’ নিয়োগ করছে আবার অন্যদিকে মেয়েরা ওলী থাকা সত্ত্বেও নিজেই নিজের বিয়ে সম্পন্ন করছে। দু’টি কাজই শরীআতের বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাই হাদীছে এমন বিবাহকে চূড়ান্তভাবে বাতিল বলে আখ্যায়িত করেছেন।

বিবাহ পদ্ধতি নিঃসন্দেহে ইসলামী শরীআতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এর মাধ্যমে একজন ছেলে-মেয়ের দাম্পত্য জীবনের শুভ সূচনা হয়। আবার বৈধ পন্থায় সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে সমাজ বিনির্মাণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে কাজ করে। এজন্য ধর্মীয় ও সামাজিক এই অনুষ্ঠানটি সম্পূর্ণ শরীআত সমর্থিত পন্থায় হওয়া বাঞ্ছনীয়। এর অন্যথা করার কারণে বিয়ে-শাদী থেকে আল্লাহর রহমত উঠে যায়।

যার ফলশ্রুতিতে আমরা সমাজে দেখি বিয়ের পরপরই বিয়ে ভেঙে যাওয়া, সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি, পরকীয়া; অবশেষে তা তালাকের চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করা। এসবই হলো আল্লাহর বিধান অমান্য করে চলার বিষময় ফল। আমরা আপাতদৃষ্টিতে মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি-সমৃদ্ধি দেখে থাকলেও বাস্তবে পারিবারিক ব্যবস্থায় মারাত্মক ধস নামার করুণ চিত্র দেখে কেবলই উদ্বিগ্ন হতে হয়। তাই পরিবার ব্যবস্থায় শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় রাখতে আসুন সবাই মিলে আমরা এই ‘উকিল বাবা’ নামক কালচারসহ বিবাহ ব্যবস্থায় প্রচলিত সমস্ত সামাজিক কুপ্রথা ও কুসংস্কার সমাজ থেকে দূরীভূত করি। অনৈসলামিক কৃষ্টি-কালচারের আগাছা হৃদয়-মন থেকে সমূলে উৎপাটন করে শরীআত পালনে প্রত্যেকে সচেষ্ট হই।

বিয়েবন্ধনের জন্য মেয়ের বাবা বা অভিভাবক, ছেলে (বর) ও দুজন সাক্ষীর উপস্থিতি জরুরী। এর সঠিক পদ্ধতি হচ্ছে— মেয়ের বাবা সাক্ষীদ্বয়ের উপস্থিতিতে বিয়ের খুৎবা পাঠের পর ছেলেকে (বর) ইজাব (প্রস্তাব) দিবেন আর ছেলে তা কবুল (গ্রহণ) করবে। এভাবেই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যাবে। বিয়েবন্ধনের জন্য কনের কবুল পড়ানোর নিয়ম ইসলামে নেই।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন- আমীন!

-মুহাম্মাদ সিরাজ উদ্দীন

 শৌলমারী, জলঢাকা, নীলফামারী।


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৩২৬।

[2]. আবূ দাঊদ, হা/২০৮৫; তিরমিযী, হা/১১০১।

Magazine