মনস্তাত্ত্বিক ও কনটেন্ট-ডিজাইনের দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান সময়ের রাশিফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এতে একদিকে যেমন প্রচলিত জ্যোতিষশাস্ত্রের উপাদান রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে বাজারমুখী (Market-Oriented) কনটেন্ট তৈরির কৌশল। তবে রাশিফলের ভাষা ও গঠন বিশ্লেষণ করলে এটি মূলত পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখা (Audience Retention) এবং সম্পৃক্ততা (Engagement) বৃদ্ধির জন্য পরিকল্পিত বলে মনে হয়।
মনোবিজ্ঞানে একটি পরিচিত ধারণা হলো Barnum Effect, এর মাধ্যমে এমন কিছু সাধারণ বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়, যা অধিকাংশ মানুষ নিজের জীবনের সঙ্গে সহজেই মিলিয়ে নিতে পারে। যেমন— ‘মানসিক চাপ বাড়তে পারে’, ‘নতুন সুযোগ আসতে পারে’, ‘খরচের ব্যাপারে সতর্ক থাকা ভালো’, ‘সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে’ অথবা ‘আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে’। এগুলো মানুষের জীবনে খুবই সাধারণ ও বহুল প্রচলিত অভিজ্ঞতা। ফলে পাঠকের মনে হয়, এ তো আমার জীবনেই ঘটছে!
রাশিফলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো Negative-Hope Balance। অর্থাৎ প্রথমে সামান্য উদ্বেগ বা আশঙ্কা তৈরি করা হয়, এরপর আশ্বাস দেওয়া হয়। যেমন— ‘চাপ বাড়তে পারে, তবে শেষ পর্যন্ত আপনি পরিস্থিতি সামলে নিতে পারবেন’ অথবা ‘কিছু অস্থিরতা থাকবে, তবে পরে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে’। এই কৌশলটি পাঠকের আবেগ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে এবং লেখার সঙ্গে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ (Psychological Attachment) তৈরি করে।
এ ধরনের লেখায় সাধারণত কর্মজীবন, সম্পর্ক, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, বিদেশযাত্রা ও বিবাহের মতো আবেগঘন বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ এগুলো সাধারণ মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ ও প্রত্যাশার ক্ষেত্র। ফলে এসব বিষয় পাঠকের আগ্রহ বাড়ায় এবং কনটেন্টের পাঠকসংখ্যা, শেয়ার ও পুনরায় পাঠের প্রবণতা বৃদ্ধি করে।
ভাষাগত দিক থেকেও রাশিফল সাধারণত এমনভাবে লেখা হয়, যাতে তা সহজে ভুল প্রমাণ করা না যায়। যেমন— ‘হতে পারে’, ‘সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, ‘ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে’, ‘অনুভব করতে পারেন’। এ ধরনের শব্দ ও বাক্যাংশ ব্যবহারের ফলে ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত হলেও তা সহজে যাচাই করা যায় না।
খেয়াল করলে দেখা যায়, অধিকাংশ রাশিফলের কাঠামো প্রায় একই ধরনের তথা প্রথমে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, তারপর কিছু সমস্যা বা দ্বন্দ্ব, পরিশেষে আশাবাদী সমাপ্তি। অর্থাৎ শুরুতে আত্মবিশ্বাস জাগানো হয়, মাঝখানে কিছু উদ্বেগের কথা বলা হয় এবং শেষে আশার বার্তা দেওয়া হয়। এই গল্পধর্মী কাঠামো (Storytelling Arc) পাঠককে পুরো লেখা পড়তে উৎসাহিত করে।
প্রচলিত বা Classical Astrology-তে সাধারণত গ্রহের অবস্থান, Houses, Transit, Aspect ইত্যাদি কারিগরি বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়। কিন্তু আধুনিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত রাশিফলে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা, অনুপ্রেরণামূলক ভাষা এবং জীবনধারাবিষয়ক পরামর্শের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। ফলে এটিকে পুরোপুরি ঐতিহ্যগত জ্যোতিষশাস্ত্র না বলে আধুনিক মিডিয়া-ভিত্তিক জ্যোতিষ কনটেন্ট বলা অধিকতর যৌক্তিক।
বড় বড় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কনটেন্ট প্রকাশ করে, কারণ এটি তুলনামূলকভাবে কম খরচে তৈরি করা যায় এবং উচ্চমাত্রার পাঠক-সম্পৃক্ততা সৃষ্টি করে। এর মাধ্যমে ওয়েবসাইটে পুনরাবৃত্ত ট্রাফিক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার, পাঠকের সম্পৃক্ততা এবং বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের সুযোগ বৃদ্ধি পায়।
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি:
ইসলামের দৃষ্টিতে ভবিষ্যতের নির্ভুল জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই রয়েছে। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন, قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ ‘বলুন, আসমানসমূহ ও পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানে না’ (আন-নামল, ২৭/৬৫)।
অতএব, গ্রহ-নক্ষত্র মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে বা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য দিতে পারে এমন বিশ্বাস ইসলামে সমর্থিত নয়। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন যে, বৈজ্ঞানিক জ্যোতির্বিজ্ঞান (Astronomy) এবং ভাগ্যনির্ভর জ্যোতিষশাস্ত্র (Astrology) এক বিষয় নয়। জ্যোতির্বিজ্ঞান একটি বিজ্ঞানভিত্তিক অধ্যয়নের ক্ষেত্র, পক্ষান্তরে রাশিফল ও ভাগ্যগণনা বিশ্বাস ও অনুমানের উপর নির্ভরশীল।
উপসংহার:
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের আলোকে রাশিফলকে পুরোপুরি ভুয়া বলে উড়িয়ে দেওয়া যেমন সরলীকরণ হবে, তেমনি এটিকে নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবেও গ্রহণ করা যৌক্তিক নয়। বাস্তবে এটি এমন এক ধরনের গণমাধ্যমভিত্তিক কনটেন্ট, যেখানে জ্যোতিষ, অনুপ্রেরণামূলক লেখা এবং আচরণগত মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন কৌশল একত্রে ব্যবহার করে পাঠকের আগ্রহ ও সম্পৃক্ততা সৃষ্টি করা হয়।
তবে মুসলিম সমাজে ভাগ্যনির্ভর বিশ্বাস ও কুসংস্কার প্রতিরোধের স্বার্থে রাশিফল প্রকাশ ও প্রচারের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের গঠনমূলক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
নাফিউল হাসান
প্রকৌশলী (ইইই)৷
