কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

সমাজে প্রচলিত বিদ‘আতসমূহ (পর্ব-৩)

বিদ‘আতের অপব্যাখ্যা ও তার জবাব

পূর্ববর্তী আলোচনায় আমরা স্পষ্ট অবগত হয়েছি যে, বিদ‘আত হল- শরী‘আতের মধ্যে এমন নতুন বিধানের আবিষ্কার করা যে ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোন নির্দেশনা নেই। এমনকি সালাফীগণ তথা ছাহাবীগণের আমলেরও বিপরীত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিদ‘আতের উক্ত প্রকৃত অর্থ জানার পরেও একশ্রেণীর মূর্খ, ভণ্ড, প্রতারক, জ্ঞানপাপী, দুনিয়াপূজারী, পেটপূজারী, পাপী তরীকাপন্থীরা মাযার ও খানকায় বসে বিদ‘আতকে বৈধ করার অপপ্রচেষ্টা করে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে কিছু ফাসিক আলেম, সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিজন, প্রফেসর, নেতৃবৃন্দ ও অতি উৎসাহী অল্পশিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ রয়েছেন। আবার কিছু মানুষ না জেনে বিদ‘আতের অপব্যাখ্যা করছেন। বিদ‘আতকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এমন কিছু বিষয়কে দলীল হিসাবে উপস্থাপন করছেন, যেগুলো রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ছিল না, কিন্তু ছাহাবীগণের সময়ে সৃষ্টি হয়েছে। আবার ছাহাবীগণের সময়ে ছিল না, কিন্তু তাবেঈগণের যুগে হয়েছে। অনুরূপভাবে তাবেঈগণের যুগে ছিল না, কিন্তু পরবর্তীতে সৃষ্টি হয়েছে। মূলত এগুলো উপস্থাপন করে একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মহল মাযহাবের বুলি আওড়িয়ে তাক্বলীদে শাখছী বা অন্ধ ব্যক্তি পূজার চোরাবালুতে নিজেরা ঈমান-আক্বীদা ও আমল যেমন ধ্বংস করছে অনুরূপভাবে তাদের অনুগামীদেরও ধ্বংস করে দিচ্ছে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পূর্ণাঙ্গ শরী‘আতকে তারা অস্পূর্ণ প্রমাণ করছে, সুন্নাতকে মাটির নীচে চাপা দিয়ে অস্তিত্বহীন করার অপচেষ্টা করছে। সুন্নাতকে গলাটিপে হত্যা করছে। এভাবে প্রকারন্তরে তারা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কেই অস্বীকার করছে। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে এ পর্বে আমরা এমন কিছু বিষয়ের অবতারণা করব, যেগুলো বিদ‘আতে হাসানার নামে বিদ‘আতের স্বপক্ষের দলীল হিসাবে অপব্যাখ্যা করা হয়। অতঃপর উপস্থাপিত অপব্যাখ্যাগুলো উল্লেখপূর্বক দালিলিক জবাব উল্লেখ করব ইনশাআল্লাহ।

অপব্যাখ্যা-১ : কুরআন মাজীদ তো রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে গ্রন্থাকারে ছিল না কিংবা হরকত দেয়া ছিল না অথবা অন্য ভাষায় অনুবাদও ছিল না। সুতরাং গ্রন্থাকারে হরকত সহ অনুবাদ কুরআন পড়া বিদ‘আত।

জবাব

বিদ‘আতীদের উক্ত দাবী সঠিক নয়। এটা বিদ‘আতে হাসানার নামে সমাজে প্রচলিত মীলাদ-ক্বিয়াম, শবেবরাত, ঈদে মীলাদুন্নবী, চল্লিশা, ছবিনা খতম, চিল্লা প্রথা ইত্যাদি ভ্রষ্ট বিদ‘আতকে বৈধ করার অপকৌশল মাত্র। সুতরাং এটা বিদ‘আত কিংবা বিদ‘আতে হাসানা নয়। দলীল সমূহ নিমণরূপ-

প্রথমতঃ কুরআন সংকলনের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশনা রয়েছে। সুতরাং এটা বিদ‘আত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِىْ سَعِيْدٍ الْخُدْرِىِّ رضي الله عنه عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَا تَكْتُبُوْا عَنِّىْ شَيْئاً غَيْرَ الْقُرْآنِ.

আবু সাঈদ খুদরী হতে রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার পক্ষ থেকে কুরআন ব্যতীত কোন কিছু লিখে রেখ না।[1] এজন্য ছাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে চামড়া[2], হাড়, খেজুরের ডাল ও বাকল[3], প্রস্তর খণ্ড[4] এবং কাগজ, ফলক ইত্যাদির উপর কুরআন লিখে রাখতেন।[5] এছাড়া জীবিতদের বক্ষে ধারণের মাধ্যমে কুরআন সংরক্ষণ ছিল।[6] রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েকজনকে এই দায়িত্ব অর্পণ করেন। যেমন, মু‘আয, যায়েদ ইবনু ছাবেত, আবু যায়েদ ইত্যাদি।[7] অতএব খণ্ডখণ্ড আকারে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে লিখিত আকারে কুরআন সংকলন হয়েছিল। যা পরবর্তীতে গ্রন্থাকারে সংকলন হয়। সুতরাং গ্রন্থাকারে কুরআন সংকলন বিদ‘আত নয়।

দ্বিতীয়তঃ গ্রন্থাকারে সংরক্ষণ। এ পদ্ধতিতে প্রথমে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু সংকলন করেছিলেন।[8] অতঃপর ওছমান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সময়ে কুরআন সংরক্ষিত হয়েছিল।[9] সুতরাং কুরআনকে গ্রন্থাকারে সংকলন কোন প্রকার বিদ‘আত নয়। আর খলীফাতুল মুসলিমীন আবু বকর ছিদ্দীক্ব ও ওছমান রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর সময়ে কুরআন সংরক্ষণের ব্যাপক প্রয়োজনও ছিল। কারণ আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সময়ে সংঘটিত ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক কারী তথা হাফেযে কুরআন শহীদ হয়ে যান। ফলে কুরআনের বহু অংশ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। এজন্য ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পরামর্শে তিনি কুরআন সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।[10] অনুরূপভাবে ওছমান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর শাসনামলে কুরআনের সঠিক পাঠ নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিমদের মাঝে বিতর্ক শুরু হয়। এ কারণে তিনি একটি আনুষ্ঠানিক সংকলন করার উদ্যোগ নেন।[11]

সুধী পাঠক! উক্ত আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে যে, উম্মতের স্বার্থে পবিত্র কুরআন খলীফাগণ বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে সংকলন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাছাড়া কুরআন লিখে সংরক্ষণ করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশনাও সুস্পষ্ট। আর ইসলামী শরী‘আতে সুপথপ্রাপ্ত খলীফাগণের সুন্নাতও উম্মতে মুহাম্মাদীর উপর পালনীয় কর্তব্য। হাদীছে এসেছে,

فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِى وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّيْنَ الرَّاشِدِيْنَ تَمَسَّكُوْا بِهَا وَعَضُّوْا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ.

‘তোমরা অবশ্যই আমার সুন্নাত ও আমার হেদায়াতপ্রাপ্ত খলীফাগণের সুন্নাতকে অনুসরণ করবে, তা দাঁত দিয়ে মযবুত করে আঁকড়ে থাকবে। সাবধান! নবাবিষ্কৃত বিষয় থেকে বিরত থাকবে। কারণ প্রতিটি নবাবিষ্কৃত বিষয় হল বিদ‘আত আর প্রতিটি বিদ‘আতই ভ্রষ্ট’।[12] সুতরাং কুরআন সংকলন বিদ‘আত নয় বরং খলীফাগণের প্রতিষ্ঠিত সুন্নাত। এমনকি এগুলোতে বিদ‘আতে হাসানরও কোন দলীল নেই। কেননা যে বিষয়ে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশনা এবং সুপথপ্রাপ্ত খলীফাগণেল গৃহীত প্রচেষ্টা রয়েছে তা কখনো বিদ‘আত নয়। আর বিদ‘আত তো বিদ‘আতই। এখানে ‘হাসানাহ’ ও ‘সাইয়েয়াহ’ বলে কিছু নেই। যা যথাস্থানে আরোচনা হবে ইনশাআল্লাহ। এ বিষয়ে শায়খ মুহাম্মাদ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ তাঁর ‘ফাতাওয়াউল ইসলাম সুওয়াল ও জাওয়াব’ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।[13]

অনুরূপভাবে কুরআনের হরকত প্রদানও বিদ‘আত নয়। বরং কুরআন পঠন-পাঠন ও অনুশীলনের জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক। পাশাপাশি কুরআনের বঙ্গানুবাদও বিদ‘আত নয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তীতে আসবে ইনশাআল্লাহ।

অপব্যাখ্যা-২ : ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম সহ প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছগণ কর্তৃক সংকলিত হাদীছের কিতাবসমূহ তো রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ছিল না, তাহলে তাদের অনুসরণ করা ও তাদের কিতাবে বর্ণিত হাদীছ অনুযায়ী আমল করা বিদ‘আত।

জবাব

একশ্রেণীর জ্ঞানপাপী, আলেম নামের জাহেল, অর্থের গোলাম, দুনিয়া ও পেট পুজারীগণ উক্ত ধারণা করে থাকেন। অথচ এটাও সম্পূর্ণ মনগড়া ও ব্যক্তি চিন্তা প্রসূত। মূলত একজন মুসলিমের নিকট অনুসরণীয় ও গ্রহণীয় আদর্শ হল বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ। শুধু ইমাম বুখারী ও মুসলিম কেন, এমনকি ইমাম চতুষ্ঠয়ের কোন ইমাম, মুহাদ্দিছগণের মধ্যে কোন মুহাদ্দিছ, আলেমেরও অনুসরণ করা কারো জন্য জায়েয নেই।

উল্লেখ্য, হাদীছ সংকলনের ইতিহাস সম্পর্কে যাদের ন্যূনতম জ্ঞান আছে তারা এটা জানেন যে, হিজরী তৃতীয় শতাব্দীতে হাদীছ সংকলনের স্বর্ণযুগ বলা হয়। এই যুগেই ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ প্রণীত ছহীহুল বুখারী সহ প্রসিদ্ধ ‘কুতুবে সিত্তাহ’ নামে ছয়টি হাদীছের গ্রন্থ সংকলিত হয়। যা মুসলিমদের জীবন পরিচালনার জন্য শক্তিশালী পাথেয় হিসাবে কাজ করছে। সেই যুগে হাদীছ সংকলনের নীতিমালার মধ্যে ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ-এর নীতিমালা ছিল সবচেয়ে কঠোর। ছহীহ বুখারী ব্যতীত তাঁর আরো অনেক গ্রন্থ রয়েছে। সেখানে তিনি যঈফ, মুনকার ও মু‘যাল হাদীছও সংকলন করেছেন। যেমন আল-আদাবুল মুফরাদ, আত-তারীখুল কাবীর, আত-তারীখুছ ছগীর ইত্যাদি। তবে ছহীহুল বুখারীতে তিনি কোন ত্রুটিপূর্ণ হাদীছ উল্লেখ করেনি। তিনি এই গ্রন্থ সংকলনের জন্য দীর্ঘ ষোল বছর ব্যয় করে ছয় লক্ষ হাদীছ থেকে এই কিতাব প্রণয়ন করেছেন।[14] এই গ্রন্থে প্রতিটি হাদীছ লিপিবদ্ধ করার জন্য তিনি ওযূ ও গোসল করতেন এবং দু’রাক‘আত ছালাতুল ইস্তেখারা পড়তেন। ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ নিজেই বলেছেন,

مَا وَضَعْتُ فِيْ كِتَابِ الصَّحِيْحِ حَدِيْثًا إِلَّا إِغْتَسَلْتُ قَبْلَ ذَلِكَ وَصَلَّيْتُ رَكْعَتَيْنِ.

‘আমি প্রতিটি হাদীছ ছহীহ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করার পূর্বে ওযূ ও গোসল করে দু’রাক‘আত নফল ছালাত আদায় করতাম’।[15] তিনি আরো বলেছেন,

ما أدخلت فيه (يعني الجامع الصحيح) حديثا إلا بعد ما استخرت الله تعالى وصليت ركعتين وتيقنت صحته.

‘আমি (ছহীহ বুখারীর) প্রত্যেকটি হাদীছ সম্পর্কে আল্লাহ্র নিকট থেকে ইস্তিখারার মাধ্যমে না জেনে এবং নফল ছালাত না পড়ে ও হাদীছের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে সুনিশ্চিত ও অকাট্যভাবে বিশ্বাসী না হয়ে তা গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেনি’।[16]

সুধী পাঠক! ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ-এর ব্যাপারে যারা বিদ্বেষসুলভ আচরণ করে থাকেন, এমনকি যারা বলেন যে, আহলেহাদীছগণ শুধু ইমাম বুখারী বলেছেন, ইমাম বুখারী বলেছেন, ছহীহ বুখারী ছহীহ বুখারী ইত্যাদি বলে মুখে ফ্যানা তুলে দেন; তারা নিমেণর আলোচনাটি খেয়াল করুন-

কুতায়বা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, لَو كَانَ مُحَمَّد بن إِسْمَاعِيل فِي الصَّحَابَة لَكَانَ آيَة ‘মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল তথা ইমাম বুখারী যদি ছাহাবীগণের মধ্যে থাকতেন, তাহলে তিনি নিদর্শনে পরিণত হতেন’।[17] ইমাম ইবনু খুযায়মা রাহিমাহুল্লাহ (২২৩-৩১১ হি./৮৩৮-৯২৩ হি.) বলেন,

مَا رَأَيْتُ تَحْتَ أَديْمِ السَّمَاءِ أَعْلَمَ بِحَدِيْثِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَحْفَظَ لَهُ مِنْ مُحَمَّدِ بنِ إِسْمَاعِيْلَ.

‘আমি আসমানের নীচে মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল তথা ইমাম বুখারীর চেয়ে হাদীছ বিষয়ে জ্ঞানী এবং হাফেয কাউকে দেখিনি’।[18] ইমাম হাকেম রাহিমাহুল্লাহ (৩২১-৪০৫ হি./৯৩৩-১০১৫ খ্রি.) বলেন, مُحَمَّدُ بنُ إِسْمَاعِيْلَ البُخَارِيُّ إِمَامُ أَهْلِ الحَدِيْثِ ‘ইমাম বুখারী আহলেহাদীছগণের ইমাম’।[19] ইমাম মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ-কে লক্ষ্য করে বলেন,

دَعْنِي أُقَبِّلْ رجليكَ يَا أُسْتَاذَ الأُسْتَاذِين وَسَيِّدَ المُحَدِّثِيْنَ وَطبيبَ الحَدِيْثِ فِي عِلَلِهِ.

‘হে উস্তাদগণের উস্তাদ! মুহাদ্দিছগণের সরদার! এবং ইলালে হাদীসের ডাক্তার! আমাকে আপনার পদ চুম্বন করার সুযোগ দিন’।[20]

ছহীহ বুখারীকে কটাক্ষ করে যারা বিভিন্ন রকম বাজে মন্তব্য করে থাকেন, তারা নিমেণর আলোচনাটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন ও উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন- 

ইমাম নাসাঈ রাহিমাহুল্লাহ (২১৫-৩০৩ হি./৮৩০-৯১৫ খ্রি.) বলেন,

أجود هذه الكتب كتاب البخارى وأجمعت الأمة على صحة هذين الكتابين ووجوب العمل بأحاديثهما.

‘এ গ্রন্থগুলোর মধ্যে সর্বাধিক উত্তম গ্রন্থ হচ্ছে ইমাম বুখারী প্রণীত গ্রন্থ। আর সমগ্র উম্মত এ দু’টি গ্রন্থের বিশুদ্ধতার আর এ দু’টি হাদীছের উপর আমল করা ওয়াজিব হওয়া সম্পর্কে ঐকমত্য পোষণ করেছেন’।[21]

ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ (৬৩১-৬৭৬ হি.) বলেন,

واتفق العلماء على أن أصح الكتب المصنفة صحيحا البخارى ومسلم واتفق الجمهور على أن صحيح البخارى أصحهما صحيحًا وأكثرهما فوائد.

‘হাদীছের সকল আলিম এ সম্পর্কে সম্পূর্ণ একমত যে, গ্রন্থাবদ্ধ হাদীছের কিতাবসমূহের মধ্যে সর্বাধিক ছহীহ হচেছ ‘ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিম’ গ্রন্থদ্বয়। আর অধিকাংশের মতে, এ দু’টির মাঝে অধিক ছহীহ এবং জনগণকে অধিক উপকার দানকারী হচ্ছে ছহীহুল বুখারী’।[22]

সুধী পাঠক! উপরে শুধু ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। যেখানে স্পষ্ট হয়েছে যে, ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য আল্লাহ প্রদত্ত এক অন্যতম নে‘মত। যার মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত অহীয়ে গায়রে মাতলূ তথা হাদীছ শাস্ত্রকে সংরক্ষণ করেছেন। সুতরাং তাঁকে ও তাঁর প্রণীত হাদীছ গ্রন্থকে বিদ‘আত বলার কোন সুযোগ নেই। বরং দেওবন্দী, ব্রেলভী, ছূফীবাদ ও মাযহাবীদের পথের কাটায় পরিণত হয়েছে এবং হিংসুকদের কপটতার অসহায় শিকার হয়েছেন। যেমন ইমাম মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ বললেন,

لا يُبْغِضُكَ إِلا حَاسِدٌ وَأشْهَدُ أَنَّ لَيْسَ فِي الدُّنْيَا مِثْلُكَ.

‘আপনাকে হিংসুক ছাড়া কেউ ঘৃণা করতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, দুনিয়াতে আপনার সমকক্ষ কেউ নেই’।[23] উল্লেখ্য, প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় বাকী ছয়টি গ্রন্থ যেমন ছহীহ মুসলিম, সুনানে আবী দাঊদ, সুনানে নাসাঈ, জামেঊত তিরমিযী এবং সুনানে ইবনি মাজাহ সম্পর্কে পৃথক পৃথক আলোচনা করা সম্ভব হল না। তবে এ সম্পর্কে জানার জন্য রিজাল শাস্ত্র, হাদীছ সংকলনের ইতিহাসের বইগুলো অধ্যয়নের অনুরোধ রইল।

[চলবে]


[1]. মুসনাদে আহমাদ, হা/১১৫৫৩, সনদ ছহীহ।

[2]. তিরমিযী, হা/৩৯৫৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/২১৬৪৭; মুসতাদরাক আলাছ ছহীহাইন, হা/৪২১৭, সনদ ছহীহ।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৬৭৯।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৯৮৬; মিশকাত, হা/২২২০।

[5]. আহমাদ ইবনু আলী ইবনু হাজার আসক্বালানী, ফাৎহুল বারী শারহু ছহীহিল বুখারী (বৈরূত : দারুল মা‘আরিফাহ, ১৩৭৯ হি.), ৯ম খ-, পৃ. ১৪।

[6]. সূরা আল-ক্বিয়ামাহ : ১৭; ইবনু মাজাহ, হা/১৩৪৬ ‘ছালাত আদায় করা ও তার নিয়ম-কানুন’ অধ্যায়-৫, ‘কতদিনে কুরআন খতম করা বৈধ’ অনুচ্ছেদ-১৭৮, সনদ ছহীহ।

[7]. আহমাদ ইবনু ওমর ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আবির রিযা আল-হামাভী, আল-ক্বাওয়াঈদু ওয়াল ইশারাতু ফী উছূলিল ক্বিরায়াত (দামেস্ক : দারুল কলম, ১ম সংস্করণ, ১৪০৬ হি.), পৃ. ৩৭।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৬৭৯, ‘কুরআনের ফযীলত’ অধ্যায়, ‘কুরআন একত্রিতকরণ’ অনুচ্ছেদ, হা/৪৯৮৬ ও ৭১৯১; মিশকাত, হা/২২২০।

[9]. ড. আলী ইবনু সুলায়মান আল-ঊবাইদ, জামঊল কুরআনিল কারীম হিফযান ও কিতাবাতান (রিয়ায : জামে‘আতুল ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সুঊদ আল-ইসলামিয়্যাহ (পিএইচ.ডি অভিসন্দর্ব), পৃ. ৪৬৯ ও ৫১২।

[10]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৬৭৯, ‘কুরআনের ফযীলত’ অধ্যায়, ‘কুরআন একত্রিতকরণ’ অনুচ্ছেদ, হা/৪৯৮৬ ও ৭১৯১; মিশকাত, হা/২২২০।

[11]. ফাৎহুল বারী শারহু ছহীহিল বুখারী, ৯ম খ-, পৃ. ১৮।

[12]. আবু দাঊদ, হা/৪৬০৭ ‘সুন্নাহ’ অধ্যায়-৩৪, ‘সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা’ অনুচ্ছেদ-৬; তিরমিযী, হা/২৬৭৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭১৮৪; মিশকাত, হা/১৬৫; সনদ ছহীহ, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২৭৩৫।

[13]. শায়খ মুহাম্মাদ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ, ফাতাওয়াউল ইসলাম সুওয়াল ও জাওয়াব, ফাতাওয়া নং-১৩৪৭৮।

[14]. আস-সুবকী, ত্বাক্বাতুশ শাফিঈয়্যাহ আল-কুবরা (২য় সংস্করণ, ১৪১৩ হি.), ২য় খ-, পৃ. ২২১।

[15]. আবুল হুসাইন ইবনু আবী ইয়ালা, ত্বাবাক্বাতুল হানাবিলাহ, তাহক্বীক্ব : মুহাম্মাদ হামিদ আল-ফাক্বী (বৈরূত : দারুল মা‘আরিফাহ, তাবি), ১ম খণ্ড, পৃ. ২৭৪; ত্বাক্বাতুশ শাফিঈয়্যাহ আল-কুবরা, ২য় খণ্ড, পৃ. ২২০; ইবনু আসাকীর, দারীখে দিমাষ্ক, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ৭২।

[16]. শায়খ আব্দুল মুহসিন আল আববাদ, আল-ইমমুল বুখারী ও কিতাবুহু আল-জামেঈ আছ-ছহীহ, পৃ. ১০।

[17]. ফাৎহুল বারী শারহু ছহীহিল বুখারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৮২। 

[18]. আবুল ফিদা ইসমাঈল ইবনু কাছীর আদ-দিমাস্কী, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (দারুল ফিকর, ১৪০৭ হি./১৯৮৬ খ্রি.), ১১তম খণ্ড, পৃ. ২৬; ইমাম নববী, তাহযীবুল আসমা ওয়াল লুগাত, তাহক্বীক্ব : মুছত্বফা আব্দুল কাদের আত্বা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৯৭।

[19]. ইবনু হাজার আসকালানী, তাগলীকুত তা‘লীকি আলা ছহীহিল বুখারী (বৈরূত : আল-মাকতাবাতুল ইসলামী, ১ম সংস্করণ, ১৪০৫ হি.), ৫ম খণ্ড, পৃ. ৪১৩।

[20]. ফাৎহুল বারী শারহু ছহীহিল বুখারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৮৮; মোল্লা আলী ক্বারী, মিরক্বাতুল মাফাতীহ শারহু মিশকাতিল মাছাবীহ (বৈরূত : দারুল ফিকর, ১ম সংস্করণ, ১৪২২ হি./২০০২ খ্রি.), ১ম খণ্ড, পৃ. ১৫।

[21]. তাহযীবুল আসমা ওয়াল লুগাত, ১ম খণ্ড, পৃ. ১০০।

[22]. প্রাগুক্ত।

[23]. খালীল ইবনু ইসহাক আল-মালেকী, আত-তাওযীহু শারহু মুখতাছার ইবনিল হিজাব (সঊদী আরব : উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৪২৭ হি./২০০৬ খৃ.), ১ম খণ্ড, পৃ ৬৫ । 

Magazine