কথায় আছে ‘প্রত্যেক বস্তুকে চেনা যায় তার বিপরীত বস্তু দ্বারা’। তাই সফল এবং বিফল ব্যক্তির মাঝে তুলনা করার সময় উভয়ের অর্থ এবং বৈশিষ্ট্যাবলি স্পষ্ট হয়ে যাবে। নিম্নে তাদের মধ্যকার ১০টি পার্থক্য আলোকপাত করছি।
১. সফল ব্যক্তির জীবনে সুস্পষ্ট ও সুনির্ধারিত লক্ষ্য থাকে। তা অর্জনের জন্য সে মরণপণ চেষ্টা করে যায়। জীবনের এই স্বপ্ন পূরণের জন্য সে সুশৃঙ্খলভাবে অবিরাম কাজ করে যায়।
অপরপক্ষে বিফল ব্যক্তির জীবনে সুস্পষ্ট কোনো লক্ষ্য স্থির থাকে না। যা তাকে উদ্দেশ্যহীনতা ও সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে নিক্ষেপ করে।
২. সফল ব্যক্তির নিখুঁত কর্মপরিকল্পনা থাকে। সেই পরিকল্পনার আলোকে সে কাজ করে যায়। পাশাপাশি বিকল্প কৌশলও সে চিন্তা করে রাখে। প্রয়োজনের তাগিদে ঐ বিকল্প পথ ধরেও সে কর্ম সম্পাদন করে থাকে।
বিফল ব্যক্তির নিখুঁত কর্মপরিকল্পনা থাকে না। ফলে তার বিকল্প পথও কম থাকে এবং ভিন্ন পথে কাজ করার সুযোগও সীমিত থাকে।
৩. সফল ব্যক্তির মাঝে থাকে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সাহসিকতার সুপ্ত বাসনা। যা তাকে সকল বাধা উপেক্ষা করে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যোগায়।
বিফল ব্যক্তির কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকে না; বরং কখনও সে এমন লোকদের সাথে মিশে, যাদের মাঝে কোনো আশা-আকাঙ্ক্ষা নেই। ফলে আরাম-আয়েশের রাজ্যে বসবাসের পরিণামস্বরূপ সে পশ্চাদপদ থেকে যায়।
৪. সফল ব্যক্তি আপন প্রতিভা ও প্রচেষ্টায় মর্যাদাবান হয়; বাপ-দাদার কারণে নয়। নিজেই নিজের পথ করে নেয়। পাশাপাশি অন্যদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হতে ভুলে না।
বিফল ব্যক্তি অন্যের রেখে যাওয়া সহজ এবং আয়েশী পথ অবলম্বন করে। না পেলে অলসতা করে এবং আরাম করতে থাকে। আর তার নিয়তিকে দোষারোপ করতে থাকে। কবি তুগরাঈ বলেন, ‘প্রশান্তির বিছানা মানুষকে উচ্চাশা থেকে বিরত রাখে, আর আলস্যের ঘুম পাড়িয়ে প্রতারিত করে।’
৫. সফল ব্যক্তি কখনও ব্যর্থতার কাছে আত্মসমর্পণ করে না। অবসর সময়কে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। অবসর সময় না পেলেও নিজ গতিতে কাজ করে যায়। কেননা সে জানে, দক্ষ মাঝি বাতাস না বইলেও দাঁড় টেনে নৌকা চালিয়ে যায়। বিফল ব্যক্তি অল্পতেই দমে যায়। সফল ব্যক্তির মতো তার কাছে অবসর ও ছুটির মূল্য থাকে না।
৬. সফল ব্যক্তি পরিবেশ-পরিস্থিতি পরিবর্তনের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা থাকে এবং নতুন পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও তার থাকে।
বিফল ব্যক্তি পরিবর্তিত পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে, মুখোমুখি হতে সক্ষম হয় না; পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা করে, সরে পড়ার অজুহাত পেশ করে।
৭. সফল ব্যক্তি কোনো ধরনের অজুহাত-অভিযোগ পেশ করা ছাড়াই কাজ করে যায়। ভুল-ভ্রান্তিগুলো সে অভিজ্ঞতা মনে করে থাকে, যা তাকে জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়। থমাস আলফা এডিসন বলেন, ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঐ সকল মানুষের জীবনে ব্যর্থতার ঘটনা ঘটেছিল, যারা ব্যর্থতার কাছে আত্মসমর্পণ করার সময় বুঝতে পারেনি যে, তারা সফলতার কত কাছাকাছি ছিল।’
অপরদিকে বিফল ব্যক্তি শুরু থেকেই অজুহাত-অভিযোগ পেশ করতে থাকে, দেখা গেছে তারা অভিজ্ঞতা ও জীবনের পাঠ থেকে কোনো ফলই পায়নি।
৮. সফল ব্যক্তি সৃজনশীলতা পছন্দ করে এবং নতুন কিছু আবিষ্কারের চেষ্টা করে। কেননা, তারা অন্যদের থেকে কোনো কিছু কপি (অনুলিপি) করতে চায় না। তবে এটা অন্যদের সফলতার সূত্র ও পদ্ধতি থেকে উপকৃত হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
অপরদিকে বিফল ব্যক্তির অভিধানে ‘সৃজনশীলতা’ শব্দটি অনুপস্থিত। তাকে এমন গৎবাঁধা নিয়ম অনুসরণ করতে দেখবে, যেখান থেকে সে কখনও বের হতে চায় না। নতুনত্ব আনয়নের চেষ্টা না করে ‘কপি-পেস্ট’ এর নিয়মের উপর সীমাবদ্ধ থাকে।
৯. সফল ব্যক্তির নিজ কাজের প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ এবং আন্তরিকতা থাকে। কাজের মধ্যেই সে আনন্দ খুঁজে পায়। সফলতার শীর্ষচূড়ায় না পৌঁছা পর্যন্ত আগ্রহ হারায় না। বিফল ব্যক্তির নিজ কাজের প্রতি কোনো আগ্রহ থাকে না। ফলে সে কাজ শেষ হওয়ার প্রহর গুণতে থাকে এবং আরাম ও অলসতায় কখন ডুব দিতে পারবে সে আশায় অপেক্ষা করতে থাকে।
১০. সফল ব্যক্তি প্রতিনিয়ত নিজেকে আপডেট করে এবং সফলতার সিঁড়িতে আরোহণের চেষ্টা করে; অপারগতা স্বীকার করে না। অন্যের পরামর্শ ও সমালোচনা গ্রহণ করে এবং তা থেকে উপকৃত হতে চেষ্টা করে। বিফল ব্যক্তির কাছে যা আছে তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে। অন্যের পরামর্শ গ্রহণ করে না। ফলে প্রতিনিয়ত তার ভুলগুলো প্রকাশ হতে থাকে, কিন্তু তা শোধরানোর চেষ্টা তার মধ্যে থাকে না।
মূল : ড. আব্দুল হামীদ আল-মুহায়মিদ
অনুবাদ : আব্দুল কাদের বিন রইসুদ্দীন
* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।