তৃতীয় অধ্যায় : আল-আমীন (বিশ্বস্ত)*
মধ্যপন্থা : রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ইসলামের সরাসরি সম্পর্ক নেই; বরং পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতি ইসলাম নির্ধারণ করেছে, যা মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। প্রফেসর ম্যাসাইননের মতে, ‘ইসলাম দুই চরমতম বিপরীতের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে এবং যে উন্নত চরিত্র সভ্যতার ভিত্তিস্বরূপ, তা গঠনে ইসলামের ভূমিকা খুবই সহায়ক’।
এটাকে সুরক্ষিত করা হয়েছে উত্তরাধিকারের আইন দ্বারা, সংগঠিত ও অনিবার্য দান ব্যবস্থা দ্বারা, যেটা যাকাত বলে পরিচিত। সাথে ঐ সমস্ত কাজ-কর্ম নিষিদ্ধ করার দ্বারা, যেগুলোকে অর্থনৈতিক ময়দানে সমাজবিরোধী ও বেআইনি বলে গণ্য করা হয়। যেমন একাধিকার, সূদ, অনর্জিত উপার্জন ও বৃদ্ধি পূর্বাহ্ণে নির্ধারিত করা, বাজার কোণঠাসা ও কব্জা করা, দাম বাড়ানোর জন্য বাজারের সমস্ত সামান ক্রয় করে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করা। ইসলামে জুয়া খেলা একেবারে নিষিদ্ধ। শিক্ষা-সংস্থা, উপাসনার স্থান এবং হাসপাতালের সহযোগিতা করা, কুয়া খনন করা এবং অনাথাশ্রম স্থাপিত করা- এই সমস্ত কাজকে ইসলামে অত্যন্ত উঁচুমানের পুণ্যকর্ম বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এটা বলা হয় যে, অনাথাশ্রমের স্থাপনার আরম্ভ ইসলামের পয়গম্বরের শিক্ষার দ্বারাই হয়। সারা বিশ্বজগৎ অনাথাশ্রম স্থাপনের জন্য ইসলামের এই পয়গম্বরের কাছে ঋণী, যিনি নিজেও ছিলেন একজন অনাথ। এই সমস্ত কল্যাণের কথা বলতে গিয়ে কার্লাইল মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্পর্কে নিজের মন্তব্য ব্যক্ত করেন যে, ‘মানবতা, ধার্মিকতা এবং ন্যায্যতার এক স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর মরুভূমির এই সন্তানের হৃদয়ে বসবাস করত’।
পরীক্ষা : একজন ইতিহাসবিদ বলেন যে, কোনো মহান ব্যক্তির পরীক্ষা তিনটি জিনিস দ্বারা করা যায়। আর তা হলো—
(১) তাঁর সমসাময়িক লোকেরা কি তাকে সত্যিকারের সাহসী এবং তেজস্বী পেয়েছে?
(২) সে কি তার যুগের মান থেকে ঊর্ধ্বে উঠার জন্য উল্লেখযোগ্য মাহাত্ম্যের পরিচয় দিয়েছে?
(৩) সে কি পুরো বিশ্বের জন্য স্থায়ী উত্তরাধিকার ছেড়ে গেছে?
এই তালিকা আরো বাড়ানো যায়, কিন্তু যদি নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা বলা যায়, তাহলে তিনি মাহাত্ম্যের এই তিনটি পরীক্ষাতেই পুরোপুরিভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। শেষোক্ত দুটি বিষয়ে ইতোমধ্যে কিছু আলোচনা হয়েছে। এখন প্রথম শর্তটির দিকে লক্ষ্য করি, ইসলামের পয়গম্বরের সমসাময়িক লোকেরা কি তাঁকে সাহসী ও তেজস্বী পেয়েছেন?
মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সমসাময়িক লোকেরা, মিত্র-শত্রু সবাই জীবনের সর্বক্ষেত্রে ও সর্বপথে মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উৎকৃষ্ট গুণ, নিষ্কলঙ্ক ন্যায়পরায়ণতা, উন্নতমানের গুণাবলি, পরম আন্তরিকতা এবং পরম নির্ভরযোগ্যতার স্বীকার করেছেন। এমনকি ইয়াহূদীরা এবং যারা তাঁর বাণীতে আদৌ বিশ্বাস করত না, তারাও তাঁকেই নিজেদের যে-কোনো বিবাদ মীমাংসার জন্য বিচারক মেনে নিত। কেননা তাদের তাঁর নিরপেক্ষতার প্রতি পুরো বিশ্বাস ছিল। ঐ ব্যক্তিরা যারা তাঁর বার্তায় বিশ্বাস করত না, তারাও এটা বলতে বাধ্য ছিল যে, হে মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমরা তোমাকে মিথ্যাবাদী বলি না, কিন্তু আমরা তাকে অস্বীকার করি, যিনি তোমাকে গ্রন্থ দিয়েছেন এবং পয়গম্বর ও নবী বানিয়েছেন। আসলে তারা ভাবত যে, তিনি একজন ভূতাবিষ্ট। তাঁর আরোগ্যের জন্য হিংস্রতায় পর্যন্ত তারা নেমে আসত। কিন্তু তাদের মধ্যে যারা শ্রেষ্ঠ লোক ছিলেন, তাঁরা দেখলেন যে, এক নতুন আলো এসেছে, তাই তাঁরা এই আলো আর জ্ঞানের অনুসন্ধানে দ্রুত ছুটে এসেছিলেন।
ইসলামের পয়গম্বরের ইতিহাসের এটা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য যে, তাঁর নিকটতম আত্মীয়, প্রিয় চাচাতো ভাই এবং তাঁর প্রিয় বন্ধু পরিজনরা যারা তাঁকে ঘনিষ্ঠভাবে জানতেন, তারা তাঁর বার্তার সত্যতাকে হৃদয় থেকে গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর ইলাহী অনুপ্রেরণা অর্থাৎ অহীর প্রতিও সেই মতো অন্তর থেকে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। ‘এই বুদ্ধিমান, উন্নত চরিত্র ও উচ্চ শিক্ষিত পুরুষ এবং মহিলারা মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মধ্যে যদি পার্থিব উদ্দেশ্য, চালাকি, ফাঁকিবাজি অথবা বিন্দুমাত্র বিশ্বাসের অভাব লক্ষ্য করতেন, তাহলে মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চরিত্র গঠন এবং সমাজ সংস্কারের কামনা এক মুহূর্তেই ধূলিস্যাৎ হয়ে যেত’- সৈয়দ আমীর আলী একথা বলেন। এর বিপরীত আমরা দেখছি যে, তাঁর অনুগামীদের ভক্তি এবং একনিষ্ঠতা এমনরূপে ছিল যে, তাঁরা স্বেচ্ছায় নিজের জীবন সমর্পণ করে তাঁর নেতৃত্ব স্বীকার করেছিলেন। তাঁরা মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য নিপীড়ন এবং বিপদকে সাহসিকতার সাথে সহ্য করেছিলেন, তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিলেন, তাঁকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছিলেন, তাঁর আজ্ঞা পালন করেছিলেন, এমনকি অতি যন্ত্রণাদায়ক নিপীড়ন এবং সামাজিক বহিষ্কারের কারণে মানসিক যন্ত্রনাকেও খুশি মনে সহ্য করেছিলেন। শুধু তাই নয় মৃত্যুকেও তাঁরা খুশি হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন।
যদি তাঁরা তাঁদের নেতার মধ্যে ভ্রষ্টতা বা অনৈতিকতা দেখতেন, তখনও কি এটা সম্ভব হতো?
পবিত্র নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি অশেষ ভালোবাসা : প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণকারীদের ইতিহাস পড়লে, নির্দোষ পুরুষ এবং নারীদের প্রতি নৃশংস আচরণের দৃশ্য পড়ে মন শিউরে উঠে। সুমাইয়া রাযিয়াল্লাহু আনহা একজন নির্দোষ মহিলা, তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে বর্শা দ্বারা মেরে টুকরো টুকরো করা হয়েছিল। এরূপ একটি উদাহরণ ইয়াসের রাযিয়াল্লাহু আনহু-এরও পাওয়া যায়, তাঁর দুটি পা দুই উটের সঙ্গে বেঁধে উট দুটিকে দুই দিকে হাঁকানো হয়েছিল। খাব্বাব বিন আরিত রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জ্বলন্ত কয়লায় শুইয়ে দিয়ে এক নির্দয় নিষ্ঠুর তাঁর বুকের উপর এমন সজোরে পা তুলে দাঁড়িয়েছিল, যাতে তিনি নড়াচড়া করতে না পারেন এবং চামড়া ও চর্বি গলে না যাওয়া পর্যন্ত তাঁর বুকে চেপে থাকত। খাব্বাব বিন আদি রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মাংস কেটে টুকরো টুকরো করে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। এই যন্ত্রণার মধ্যে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, তুমি কি এখন চাইবে যে, তোমার জায়গাতে মুহাম্মাদ হতো এবং তুমি তোমার পরিবারের সাথে বাড়িতে থাকতে? তো এর উত্তরে পীড়িত খাব্বাব রাযিয়াল্লাহু আনহু উচ্চৈঃস্বরে বলেছিলেন, নবী মোহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সামান্য কাঁটা লাগার পরিবর্তে আমি নিজের পরিবার, নিজের সন্তান এবং সবকিছু উৎসর্গ করে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার উদাহরণ অনেক দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন হলো এই সমস্ত ঘটনা কী প্রমাণ করে? এটা কীভাবে সম্ভব হলো যে, ইসলামের নারী ও পুরুষরা তাদের নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি শুধু নিষ্ঠাবানই নন, বরং তাঁরা তাঁদের শরীর, হৃদয় এবং আত্মা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। অনুগামীদের এই গভীর বিশ্বাস ও আস্থা থেকে কি প্রমাণিত হয় না যে, মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্পিত দায়িত্বের প্রতি কত সৎ ও নিষ্ঠাবান ছিলেন?
বলা বাহুল্য যে, এই লোকগুলো কেউই নিম্নবংশের ও নিম্নমানের ছিলেন না। ইসলামের একেবারে প্রাথমিক যুগে যাঁরা মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশে সমবেত হয়েছিলেন, তাঁরা ছিলেন মক্কার শ্রেষ্ঠ ও উন্নত চরিত্রের মানুষ। তাঁরা উচ্চপদস্থ, ধনী এবং সভ্যও ছিলেন। এদের মধ্যে তাঁর পরিবার ও বংশের লোকও ছিলেন, যারা তাঁকে সূক্ষ্মভাবে জানতেন এবং প্রথম চার খলীফা, যারা অতি মর্যাদার অধিকারী ছিলেন, তাঁরা ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাতে উল্লেখিত রয়েছে যে, ‘সমস্ত নবী এবং ধর্মীয় ব্যক্তিদের মধ্যে মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাপেক্ষা সফল ছিলেন’। কিন্তু এই সফলতা নিছক কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, এই সাফল্যের প্রকৃত কারণ ছিল এই যে, তাঁর সমসাময়িক কালের মানুষ তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যে তেজস্বিতা ও একনিষ্ঠতা প্রত্যক্ষ করেছিল। এই সাফল্য তাঁর উচ্চ-প্রশংসিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বেরই ফল।
সত্যবাদী : পয়গম্বর মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সত্যবাদিতার পুরো জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত দুরূহ। আমরা কিঞ্চিৎ আলোকপাত করতে পারি মাত্র। কেমন চমকপ্রদ দৃশ্য সামনে আসছে? পয়গম্বর মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন চরিত্রে আমাদের সামনে আসেন। তিনি আল্লাহর নবী ও পয়গম্বর, তিনি সৈনিক, তিনি ব্যবসায়ী, তিনি রাষ্ট্রনায়ক, তিনি বক্তা, তিনি সংস্কারক, তিনি অনাথ আশ্রয়দাতা, তিনি ক্রীতদাসের রক্ষক, তিনি নারী সমাজের মুক্তিদাতা, তিনি বিচারক। এই সকল ভূমিকা ও জীবনের সর্ববিধ ক্ষেত্রেই তিনি সাফল্যের শ্রেষ্ঠতম প্রতীক ও মহানায়ক। অনাথ অবস্থা অত্যন্ত নিরুপায় এবং অনাশ্রয়ের অবস্থা, এই পৃথিবীতে ইয়াতীম অবস্থাই তাঁর জীবনের শুরু। আর এই পৃথিবীতে পার্থিব শক্তির শীর্ষ স্থান হলো বাদশাহী এবং শক্তির এই শীর্ষ স্থান অর্জন করেই তাঁর জীবনের সমাপ্তি। তাঁর জীবনের শুরু এক অনাথ বালকের আকারে হয়, তারপর আমরা তাঁকে উৎপীড়িত, অত্যাচারিত আশ্রয় প্রার্থীরূপে দেখতে পাই এবং অবশেষে আমরা দেখতে পাই তিনি এক পুরো জাতির আধ্যাত্মিক ও অনাধ্যাত্মিক অধিরাজ ও তাদের ভবিষ্যতের মালিক হয়ে গেছেন। এই পৃথিবীতে পরীক্ষা ও প্রলোভন, উত্থান-পতন ও পরিবর্তন, আলো ও অন্ধকার এবং আতঙ্ক ও সম্মানের যে পরিস্থিতিতে অগ্রসর হতে হয়, তিনি ঐ সমস্ত পরীক্ষাতেই সফল হয়েছিলেন। তাঁর সাফল্য জীবনের কোনো একটি ক্ষেত্রেই কেবল সীমাবদ্ধ নয়, মানব জীবনের সর্ববিধ ক্ষেত্রেই তিনি উত্তম আদর্শ।
মূল : প্রফেসর কে এস রামাকৃষ্ণ রাও*
* চেয়ারম্যান, দর্শন বিভাগ, মহীশুর মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়, কর্ণাটক, ভারত।
অনুবাদ ও পরিমার্জন : আব্দুর রহমান বিন লুতফুল হক ভারতী**
** পিএইচডি গবেষক, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।