পবিত্রতার ব্যাপারে কিছু যঈফ হাদীছ :
(১) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) যখন টয়লেটে প্রবেশ করতেন, তখন আংটি খুলে রাখতেন।[1]
(২) ঈসা ইবনে ইয়াযদাদ ইয়ামানী তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ পেশাব করার পর তার লজ্জাস্থান যেন তিনবার ঝাড়ে’।[2]
(৩) আবু রাফে‘ (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) যখন ছালাতের জন্য ওযূ করতেন, তখন তাঁর আঙ্গুলের আংটি নেড়ে দিতেন।[3]
(৪) আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘এসব ঘরের দরজা মসজিদের দিক হতে অন্য দিকে ফিরিয়ে দাও। কারণ ঋতুবতী মহিলা ও অপবিত্র ব্যক্তির জন্য মসজিদে যাতায়াত আমি হালাল মনে করি না’।[4]
(৫) আলী (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘রহমতের ফেরেশতা সেই ঘরে প্রবেশ করে না, যাতে কোন ছবি রয়েছে অথবা কুকুর রয়েছে কিংবা নাপাক ব্যক্তি রয়েছে’।[5]
(৬) আলী (রাঃ) বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট এসে বললেন, আমি নাপাকির গোসল করে ফজরের ছালাত আদায় করলাম। অতঃপর সকাল হলে আমি দেখতে পেলাম যে, নখ পরিমাণ স্থানে পানি পৌছেনি। রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘যদি তুমি তখন ভেজা হাত তার উপর মুছে দিতে, তাহলে তোমার জন্য যথেষ্ট হত’।[6]
যেভাবে ওযূ করতে হয় :
প্রথমে মনে মনে ওযূ করার নিয়্যত করবে।[7] তারপর ‘বিসমিল্লাহ’ বলবে।[8] অতঃপর হাতে পানি নিয়ে দুই হাত কব্জি পর্যন্ত ধৌত করবে।[9] এ সময় হাতের আঙ্গুল খিলাল করতে হবে।[10] আংটি থাকলে আংটির নীচে পানি পৌছানোর চেষ্টা করবে।[11] অতঃপর ডান হাতে পানি নিয়ে মুখে ও নাকে একসাথে পানি দিবে এবং নাক ঝাড়বে।[12] তারপর কপালের শুরু থেকে দুই কানের লতিসহ থুতনির নীচ পর্যন্ত মুখ ধৌত করবে।[13] তারপর এক অঞ্জলি পানি নিয়ে থুতনির নীচে দিয়ে দাড়ি খিলাল করবে।[14] তারপর প্রথমে ডান হাত এবং পরে বাম হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করবে।[15] এরপর নতুন পানি নিয়ে দুই হাত দ্বারা মাথার সামনে হতে পিছনে এবং পিছন হতে সামনে নিয়ে গিয়ে একবার পূর্ণ মাথা মাসাহ করবে।[16] একই সাথে ভেজা শাহাদাত আঙ্গুল দ্বারা কানের ভিতর অংশের এবং বৃদ্ধা আঙ্গুল দ্বারা কানের পিঠ মাসাহ করবে।[17] অতঃপর ডান এবং বাম পায়ের টাখনুসহ ধৌত করবে।[18] এ সময় বাম হাতের ছোট আঙ্গুল দ্বারা পায়ের আঙ্গুলসমূহ খিলাল করবে।[19] ওযূ শেষে বাম হাতে কিছু পানি নিয়ে লজ্জাস্থান বরাবর ছিটিয়ে দিবে।[20] তারপর দো‘আ পাঠ করবে।
আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,
عُرِضَتْ عَلَىَّ أُجُوْرُ أُمَّتِىْ حَتَّى الْقَذَاةِ يُخْرِجُهَا الرَّجُلُ مِنَ الْمَسْجِدِ وَعُرِضَتْ عَلَىَّ ذُنُوْبُ أَمَّتِى فَلَمْ أَرَ ذَنْبًا أَعْظَمَ مِنْ سُوْرَةٍ مِنَ الْقُرْآنِ أَوْ آيَةٍ أُوتِيْهَا رَجُلٌ ثُمَّ نَسِيَهَا.
‘আমার উম্মতের সকল ছওয়াব আমার সামনে উপস্থাপন করা হয়, এমনকি মসজিদ হতে জঞ্জাল দূর করার ছওয়াবও। আর আমার উম্মতের গোনাহসমূহও আমার সামনে উপস্থাপন করা হয়। কাউকে কুরআনের কোন সূরা বা আয়াত প্রদান করার পর তা বিস্মৃত হওয়ার চাইতে বড় গোনাহ আমি আর দেখিনি’।[21] হাদীছটি যঈফ।
ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন,
الصَّلَاةُ فِي الْمَسْجِدِ الْجَامِعِ تَعْدِلُ الْفَرِيضَةَ حَجَّةً مَبْرُورَةً، وَالنَّافِلَةَ كَحَجَّةٍ مُتَقَبَّلَةٍ، وَفُضِّلَتِ الصَّلَاةُ فِي الْمَسْجِدِ الْجَامِعِ عَلَى مَا سِوَاهُ مِنَ الْمَسَاجِدِ بِخَمْسِمائةِ صَلَاةٍ
‘জুম‘আ মসজিদে ফরয ছালাত আদায় করা কবুল হজ্জের সমপরিমাণ ছওয়াব। নফল ছালাত আদায় করা কবুল হজ্জের সমপরিমাণ ছওয়াব। আর অন্যান্য মসজিদের চেয়ে জুম‘আ মসজিদের ছালাত আদায়ের ছওয়াব পাঁচশ’ ছালাতের সমান করা হয়েছে।[22] হাদীছটি অত্যন্ত যঈফ।
ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,تَذْهَبُ الْأَرَضُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، إِلَّا الْمَسَاجِدَ، فَإِنَّهَا تَنْضَمُّ بَعْضُهَا إِلَى بَعْضٍ ‘ক্বিয়ামতের দিন মসজিদগুলো ব্যতীত সব যমীন ধ্বংস হয়ে যাবে। মসজিদগুলো একটি আরেকটির সাথে লেগে যাবে’।[23] হাদীছটি জাল।
আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,
إِذَا مَرَرْتُمْ بِرِيَاضِ الْجَنَّةِ فَارْتَعُوْا قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ وَمَا رِيَاضُ الْجَنَّةِ قَالَ الْمَسَاجِدُ. قُلْتُ وَمَا الرَّتْعُ يَا رَسُوْلَ اللهِ قَالَ سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ.
‘তোমরা যখন জান্নাতের বাগানের পাশ দিয়ে যাবে, তখন ফল খাবে। রাবী বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! জান্নাতের বাগান কী? তিনি বললেন, মসজিদসমূহ। আমি আবার বললাম, ফল কী? তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ ওয়ালহামদুলিল্লাহ ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার’।[24] হাদীছটি যঈফ।
عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى أَنْ يُصَلَّى فِىْ سَبْعَةِ مَوَاطِنَ فِى الْمَزْبَلَةِ وَالْمَجْزَرَةِ وَالْمَقْبُرَةِ وَقَارِعَةِ الطَّرِيْقِ وَفِى الْحَمَّامِ وَفِى مَعَاطِنِ الإِبِلِ وَفَوْقَ ظَهْرِ بَيْتِ اللهِ.
ইবনে ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) সাত স্থানে ছালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেনঃ (১) আবর্জনা ফেলার স্থানে (২) প্রাণী যবেহ করার স্থানে (৩) কবর স্থানে (৪) পথিমধ্যে (৫) গোসলখানায় (৬) উট বাঁধার স্থানে এবং (৭) ক্বা‘বা ঘরের ছাদের উপর।[25] হাদীছটি যঈফ।
عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ أَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَسْتَحِبُّ الصَّلاَةَ فِى الْحِيْطَانِ.
মু‘আয ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বাগানে ছালাত আদায় করতে ভাল বাসতেন।[26] হাদীছটি যঈফ।
তিন মসজিদ ছাড়া অধিক নেকীর আশায় অন্য কোন মসজিদে যাওয়া যাবে না :
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন,
لاَ تُشَدُّ الرِّحَالُ إِلاَّ إِلَى ثَلاَثَةِ مَسَاجِدَ: الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَمَسْجِدِ الرَّسُوْلِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَسْجِدِ الأَقْصَى.
‘তিনটি মসজিদ ছাড়া ভ্রমণ করা নিষেধঃ (১) মসজিদে হারাম (২) মসজিদে নববী (৩) এবং মসজিদে আক্বছা’।[27] হাদীছটিতে প্রমাণিত হয় যে, নেকীর আশায় এ তিন মসজিদ ছাড়া অন্য কোন মসজিদে যাওয়া যাবে না। হাদীছটি আরো প্রমাণ করে যে, পাশে মসজিদ রেখে দূরে কোন মসজিদে যাওয়া যাবে না। তবে আক্বীদাগত ক্রটি থাকলে পাশের মসজিদে ছেড়ে দূরে যাওয়া যায়।
কবরস্থানে মসজিদ তৈরি করা হারাম :
পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মানুষ কবরকে লক্ষ্য করে মসজিদ তৈরি করছে এবং মসজিদকে সামনে রেখে, ডানে রেখে, বামে রেখেই ছালাত আদায় করছে। কবরের উপরেও ছালাত আদায় করছে। এসব স্থানে ছালাত আদায় হবে না; বরং ছালাত আদায়কারী হবে মুশরিক।
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ألأَرْضُ كُلُّهَا مَسْجِدٌ إِلاَّ الْمَقْبَرَةَ وَالْحَمَّامَ ‘পুরো পৃথিবী মসজিদ। তবে কবরস্থান ও গোসলখানা ছালাত আদায়ের স্থান নয়’।[28] হাদীছটি প্রমাণ করে যে, কবরস্থানে ছালাত আদায় করা যাবে না। আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) কবরের মাঝে ছালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন।[29] হাদীছটিতে প্রমাণিত হয়, মসজিদের ডানে-বামে কবর থাকলে সেই মসজিদে ছালাত হবে না।
জুনদুব (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, أَلاَ وَإِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوْا يَتَّخِذُوْنَ قُبُوْرَ أَنْبِيَائِهِمْ وَصَالِحِيْهِمْ مَسَاجِدَ أَلاَ فَلاَ تَتَّخِذُوا الْقُبُوْرَ مَسَاجِدَ إِنِّىْ أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ ‘তোমাদের পূর্বের লোকেরা তাদের নবী এবং সৎলোকদের কবরগুলোকে মসজিদ তৈরি করেছিল। সাবধান! তোমরা কবরকে মসজিদ বানাইও না। নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে কবরকে মসজিদে পরিণত করতে নিষেধ করছি’।[30] হাদীছটিতে প্রমাণ হয়, পূর্বের লোকেরা ভাল মানুষদের কবরকে মসজিদ বানাতো। রাসূল (ছাঃ) কবরকে মসজিদ বানাতে কঠোরভাবে নিষেধ করছেন।
আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,
لاَ تَجْعَلُوْا بُيُوْتَكُمْ قُبُوْرًا وَلاَ تَجْعَلُوْا قَبْرِىْ عِيْدًا وَصَلُّوْا عَلَىَّ فَإِنَّ صَلاَتَكُمْ تَبْلُغُنِىْ حَيْثُ كُنْتُمْ.
‘তোমরা তোমাদের ঘরসমূহকে কবরে পরিণত কর না। আমার কবরকে আনন্দ-অনুষ্ঠানের জায়গা কর না। তোমরা আমার উপর দরূদ পাঠ কর। কেননা তোমরা যেখানেই থাক, তোমাদের দরূদ আমার কাছে পৌছানো হয়’।[31] হাদীছটিতে প্রমাণিত হয়, কবরকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান করা হারাম। রাসূল (ছাঃ) বলেন, বাড়ীকে কবরে পরিণত কর না। অর্থাৎ বাড়ীতে নফল ছালাত আদায় কর, নইলে বাড়ীও কবরস্থানে রূপান্তরিত হবে, যেখানে ছালাত আদায় করা হারাম।
আত্বা ইবনে ইয়াসার (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন,
اللَّهُمَّ لَا تَجْعَلْ قَبْرِيْ وَثَنًا يُعْبَدُ اشْتَدَّ غَضَبُ اللهِ عَلَى قَوْمٍ اتَّخَذُوْا قُبُوْرَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ.
‘হে আল্লাহ! আমার কবরকে মূর্তি বানাইও না, যার ইবাদত করা হবে। ঐ জাতির উপর আল্লাহর ক্ষোভ প্রবল হয়েছে, যে সম্প্রদায় তাদের নবীগণের কবরকে মসজিদ বা সিজদার স্থান বানিয়ে নিয়েছে।[32] হাদীছটিতে প্রমাণিত হয়, রাসূল (ছাঃ) এমর্মে প্রার্থনা করেন, হে আল্লাহ! আমার কবরকে মসজিদে পরিণত কর না, আমার কবরকে আনান্দ-অনুষ্ঠানের জায়গা কর না। মূর্তি যেমন সুন্দর করে বার বার তৈরি করা হয়, তেমন কবরকে সুন্দর করে তৈরি করে পাকা করা হারাম, কবরের উপর কাপড় বিছানো ও টানানো হারাম, ফুল দেওয়া হারাম, কবরকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান করা হারাম, কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করা হারাম।
عَنْ جَابِرٍ قَالَ نَهَى رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُجَصَّصَ الْقَبْرُ وَأَنْ يُقْعَدَ عَلَيْهِ وَأَنْ يُبْنَى عَلَيْهِ.
জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) কবর পাকা করতে, তার উপর বসতে এবং তার উপর সমাধি/সৌধ নির্মাণ করতে নিষেধ করেছেন।[33] হাদীছটি প্রমাণ করে, কবর পাকা করা হারাম, কবরের উপর ঘর বানানো হারাম, কবরের উপর বসা হারাম।
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষটিও তাঁর কবরকে ওরস বানাতে কঠোর ভাষায় নিষেধ করেছেন; তাহলে অন্যদের বেলায় বিষয়টি কেমন হতে পারে?! তাছাড়া তিনি সৎলোকের কবরকে মসজিদ বানাতে নিষেধ করেছেন। যারা এ ধরনের জঘন্য কাজ করে, তাদেরকে কঠোর শাস্তি দেয়ার জন্য আল্লাহর নিকট বদ-দু‘আ করেছেন। এ ধরনের কঠোর নিষেধ থাকার পরেও কেন লক্ষ লক্ষ মাযার-খানকা তৈরি করা হয়েছে এবং হচ্ছে? ঐসব স্থানে মসজিদ তৈরি করে কেন কোটি কোটি মানুষের ঈমান ধ্বংস করা হচ্ছে? কেন কবরে সিজদা করে ঈমান নষ্ট করা হচ্ছে? এর কারণ হল নগ্ন জিন-শয়তান এদেরকে মূর্তিপূজা করতে উৎসাহিত করে, এদেরকে কবরে সিজদা করতে বলে। যারা কবরে ওরস করে, কবরে আড্ডা মারে, তারা শয়তানের পূঁজা করে, তারা শয়তানের আদেশ পালন করে। নিমেণ এ সম্পর্কিত কিছু প্রমাণ পেশ করা হল:
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، صَارَتِ الأَوْثَانُ الَّتِي كَانَتْ فِي قَوْمِ نُوحٍ فِي العَرَبِ بَعْدُ أَمَّا وَدٌّ كَانَتْ لِكَلْبٍ بِدَوْمَةِ الجَنْدَلِ، وَأَمَّا سُوَاعٌ كَانَتْ لِهُذَيْلٍ، وَأَمَّا يَغُوثُ فَكَانَتْ لِمُرَادٍ، ثُمَّ لِبَنِي غُطَيْفٍ بِالْجَوْفِ، عِنْدَ سَبَإٍ، وَأَمَّا يَعُوقُ فَكَانَتْ لِهَمْدَانَ، وَأَمَّا نَسْرٌ فَكَانَتْ لِحِمْيَرَ لِآلِ ذِي الكَلاَعِ، أَسْمَاءُ رِجَالٍ صَالِحِينَ مِنْ قَوْمِ نُوحٍ، فَلَمَّا هَلَكُوا أَوْحَى الشَّيْطَانُ إِلَى قَوْمِهِمْ، أَنِ انْصِبُوا إِلَى مَجَالِسِهِمُ الَّتِي كَانُوا يَجْلِسُونَ أَنْصَابًا وَسَمُّوهَا بِأَسْمَائِهِمْ، فَفَعَلُوا، فَلَمْ تُعْبَدْ، حَتَّى إِذَا هَلَكَ أُولَئِكَ وَتَنَسَّخَ العِلْمُ عُبِدَتْ.
ইবনে আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের মাঝে যেসব মূর্তির প্রচলন ছিল, পরবর্তী সময়ে তা আরবদের মাঝেও চালু হয়েছিল। ‘ওয়াদ’ ছিল ‘দূমাতুল জান্দাল’ নামক স্থানে ‘কালব’ বংশের দেবমূর্তি। ‘সুওআ’ ছিল (মক্কার) ‘হুযায়ল’ সম্প্রদায়ের দেবমূর্তি। ‘ইয়াগূছ’ ছিল প্রথমে ‘মুরাদ’ সম্প্রদায়ের, পরবর্তীতে তা মুরাদ গোত্রের শাখা গোত্র ‘বানী গুত্বাইফ’ গোত্রের হয়ে যায়। এর আস্তানা ছিল সাবার নিকটবর্তী ‘জাওফ’ নামক স্থানে। ‘ইয়াঊক্ব’ ছিল ‘হামদান’ সম্প্রদায়ের দেবমূর্তি। আর ‘নাসর’ ছিল ‘যুলক্বালা‘আ’ সম্প্রদায়ের হিম্ইয়ার শাখার দেবমূর্তি। এগুলো হচ্ছে নূহ (আঃ)-এর ক্বওমের কিছু সৎলোকের নাম। এসব লোকেরা যখন দুনিয়া থেকে বিদায় নিল, তখন শয়তান তাদেরকে তাদের বসার স্থানে মূর্তি নির্মাণ করতে আদেশ করল এবং তাদের বংশের নামসহ তাদের নাম লিখতে আদেশ করল। জনগণ শয়তানের আদেশ পেয়ে তাদের নামে তাদের মূর্তি তৈরি করল। তবে তখন মূর্তিগুলোর ইবাদত করা হত না। অতঃপর যারা মূর্তি তৈরি করেছিল, তারা যখন মারা গেল এবং মূর্তি সম্পর্কে তাদের জ্ঞান বিলুপ্ত হল, তখন লোকজন ঐসব মূর্তির ইবাদত করতে লাগল’।[34]
যারা কবর পূজা করে, যারা মূর্তি পূজা করে, তারা শয়তানের আদেশ পালন করে। তারা শয়তানের ইবাদত করে।
আবুত-ত্বোফায়েল (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) যখন মক্কা বিজয় করলেন, তখন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রাঃ)-কে একটা খেজুর গাছের নিকট পাঠালেন। সেখানে উয্যা মূর্তি ছিল। খালিদ (রাঃ) সেখানে আসলেন। মূর্তিটি তিনটি বাবলা গাছের উপর ছিল। তিনি সেগুলো কেটে ফেললেন এবং তার উপর যে ঘর তৈরি করা ছিল, তা ভেঙ্গে দিলেন। অতঃপর তিনি রাসূল (ছাঃ)-কে খবর দিলেন। তিনি বললেন, খালিদ তুমি ফিরে যাও, তুমি কোন অপরাধ করোনি। অতঃপর খালিদ (রাঃ) ফিরে গেলেন। যখন পাহারাদারেরা খালিদ (রাঃ)-কে দেখল, তখন তারা ঐ মূর্তিকে পাহাড়ের মধ্যে ঘিরে রাখল এবং হে উয্যা বলে ডাকতে লাগল। খালিদ (রাঃ) সেখানে গিয়ে দেখলেন, লম্বা চুল বিশিষ্ট এক নগ্ন মহিলা, যার মাথা কাদায় ল্যাপ্টানো। তিনি তাকে তরবারি দিয়ে আঘাত করলেন এবং তাকে হত্যা করলেন। অতঃপর ফিরে এসে রাসূল (ছাঃ)-কে খবর দিলেন। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, এটাই সেই উয্যা’।[35]
উক্ত হাদীছে প্রমাণিত হয়, শয়তানের পরামর্শেই মূর্তিপূজার সূচনা হয়েছে। শয়তান জিনের রূপ ধারণ করে প্রত্যেক মূর্তির মাঝে অবস্থান করে এবং মানুষকে এভাবেই পথভ্রষ্ট করে। এ কারণেই মক্কা বিজয়ের দিন কা‘বা ঘরের মূর্তিগুলো রাসূল (ছাঃ) নিজ হাতে ভেঙ্গে দিয়েছিলেন।
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ دَخَلَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَكَّةَ وَحَوْلَ الْكَعْبَةِ ثَلاَثُمِائَةٍ وَسِتُّوْنَ نُصُبًا فَجَعَلَ يَطْعَنُهَا بِعُودٍ فِىْ يَدِهِ وَجَعَلَ يَقُولُ (جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ) الآيَةَ
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) যখন বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন, তখন কা‘বা ঘরের চারপাশে তিনশ’ ষাটটি মূর্তি ছিল। নবী করীম (ছাঃ) নিজের হাতের লাঠি দিয়ে মূর্তিগুলোকে আঘাত করতে থাকেন আর বলতে থাকেন, ‘সত্য এসেছে এবং মিথ্যা চলে গেছে’ (বনী ইসরাঈল ৮১)।[36]
মূর্তির মাধ্যমে জিন মানুষকে মূর্তি পূজা করতে উৎসাহিত করে। মূলতঃ এ কারণেই ইবরাহীম (আঃ) মূর্তি ভেঙ্গে ছিলেন। মুহাম্মাদ (ছাঃ) মূর্তি নিজ হাতে ভেঙ্গেছেন এবং ভাঙ্গার আদেশ করেছেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘আমাকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে মূর্তি ভেঙ্গে খান খান করার জন্য এবং আল্লাহর তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করার জন্য- যেন তার সাথে কোন কিছুকে শরীক করা না হয়’।[37]
উক্ত হাদীছে প্রমাণিত হয়, নবীগণকে পাঠানোর মৌলিক লক্ষ্যে একটি হচ্ছে, মূর্তি ভেঙ্গে ফেলা। কারণ মূর্তির মাধ্যমে আল্লাহর একত্ব নষ্ট হয়। শয়তান আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত করতে সাহায্য করে। আর এ কারণেই তিনি মূর্তি ভেঙ্গেছেন এবং মূর্তি ভাঙ্গার জন্য কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আলী (রাঃ)-কে বলেছিলেন, ‘যখন তোমার চোখে কোন মূর্তি পড়বে, তখন তা একেবারে নিশ্চিহ্ন না করে ছাড়বে না। আর উঁচু কোন কবর দেখলে তাকে সমতল না করে রাখবে না’।[38]
উপরিউক্ত নির্দেশ থেকে বুঝা যায়, শিরকের আস্তানা মুহূর্তের জন্য বরদাশত করা যাবে না। যে কোন মূল্যে শিরকের আস্তানাকে উপড়ে ফেলতে হবে। হাদীছটিতে আরো প্রমাণিত হয়, শিরকের আস্তানা হচ্ছে কবর ও মূর্তি।
(চলবে)
[1]. আবুদাঊদ হা/১৯; নাসাঈ হা/৫২১৩; তিরমিযী হা/১৭৪৬, হাদীছটি যঈফ।
[2]. ইবনু মাজাহ হা/৩২৬, হাদীছটি যঈফ।
[3]. ইবনু মাজাহ হা/৪৪৯, হাদীছটি যঈফ।
[4]. আবুদাঊদ হা/২৩২, হাদীছটি যঈফ।
[5]. আবুদাঊদ হা/২২৭, হাদীছটি যঈফ।
[6]. ইবনু মাজাহ হা/৬৬৪, হাদীছটি যঈফ ।
[7]. ছহীহ বুখারী হা/১।
[8]. তিরমিযী হা/২৫।
[9]. ছহীহ বুখারী হা/১৫৯।
[10]. তিরমিযী হা/৭৮৮; নাসাঈ হা/১১৪।
[11]. ছহীহ বুখারী তরজমাতুল বাব ‘ওযূ’ অধ্যায়, ২৯ নং অনুচ্ছেদ।
[12]. ছহীহ বুখারী হা/১৯১; ছহীহ মুসলিম হা/৫৭৮।
[13]. ছহীহ বুখারী হা/১৫৯।
[14]. আবুদাঊদ হা/১৪৫; তিরমিযী হা/৩১।
[15]. ছহীহ বুখারী হা/১৪০।
[16]. ছহীহ বুখারী হা/১৪৫।
[17]. নাসাঈ হা/১০২।
[18]. ছহীহ বুখারী হা/১৪৫।
[19]. আবুদাঊদ হা/১৪৮।
[20]. আবুদাঊদ হা/২৪১।
[21]. তিরমিযী হা/২৯১৬; আবুদাঊদ হা/৪৬১।
[22]. সিলসিলা যঈফা হা/৩৮০৬।
[23]. ত্বাবারানী, সিলসিলা যঈফা হা/৭৬৫।
[24]. তিরমিযী হা/৩৫০৯; সিলসিলা যঈফা হা/২৭১০।
[25]. তিরমিযী হা/৩৪৬।
[26]. তিরমিযী হা/৩৩৪; সিলসিলা যঈফা হা/৪২৭০।
[27]. ছহীহ বুখারী হা/৪২৭০।
[28]. তিরমিযী হা/৩১৭; ইবনু মাজাহ হা/৭৭৫; আহমাদ হা/১১৮০৫; মিশকাত হা/৭৩৭।
[29]. ছহীহ ইবনে হিববান হা/২৩১৩।
[30]. ছহীহ মুসলিম হা/১২১৬; মিশকাত হা/৭১৩।
[31]. আবুদাঊদ হা/২০৪২; মিশকাত হা/৯২৬।
[32]. মুওয়াত্ত্বা মালেক হা/৫৯৪।
[33]. ছহীহ মুসলিম হা/২২৮৯; মিশকাত হা/১৬৭০।
[34]. ছহীহ বুখারী হা/৪৯২০।
[35]. নাসাঈ, সুনানে কুবরা হা/১১৪৮৩।
[36]. ছহীহ বুখারী হা/২৪৭৮।
[37]. ছহীহ মুসলিম হা/৮৩২।
[38]. ছহীহ মুসলিম হা/২২৮৭; মিশকাত হা/১৬৯৬।
