রামাযান—একটি মাস, অথচ শুধু একটি মাস নয়। এটি এক রুহানী বসন্ত, আত্মিক জাগরণের এক স্বর্ণসময়, যখন মানুষের হৃদয় নতুন আলোয় ভরে ওঠে, আর মুমিনের আত্মা ডানা মেলে আকাশের দিকে তাকায়। ১২ মাসের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় রামাযান যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হওয়া এক বিশেষ উপহার, যা আসে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে।
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রামাযান মাসের ব্যাপারে যে হাদীছ শুনিয়েছেন, যেখানে দুষ্ট জিন ও শয়তানকে শিকলবন্দি করে দেওয়া হয়, জান্নাতের দরজাগুলো উন্মুক্ত করে রাখা হয় আর জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়[1]—এই সংবাদই যেন মুমিনের হৃদয়ে এক অনাবিল উচ্ছ্বাস জাগায়। প্রথম রাত থেকেই এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যা মুমিনকে স্বাগত জানায়, টেনে নিয়ে যায় আলোর দিকে, দয়ার দিকে, মুক্তির দিকে। রামাযানের এই মর্যাদা উপলব্ধি করতে পারলেই স্পষ্ট হয় যে, এত বড় নেয়ামতকে বরণ করতে প্রস্তুত হওয়া কতটা জরুরী।
রামাযানের প্রস্তুতি আসলে শুরু হয় অন্তর থেকে। কালিমাযুক্ত হৃৎপিণ্ড, গোনাহে ভারাক্রান্ত আত্মা, অহংকার ও হিংসায় জড়ানো মন নিয়ে রামাযানে প্রবেশ করা মানে যেন নোংরা পোশাক পরে রাজদরবারে প্রবেশ করা। রামাযানের জন্য প্রস্তুতি মানে নিজের অন্তরকে পরিষ্কার করা, মনের কালিমা ধুয়ে ফেলা, অপরাধবোধকে তওবার অশ্রুতে গলিয়ে দেওয়া। মনকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত করা দরকার, যেন আল্লাহর আমন্ত্রণ শুনলেই তা সাড়া দিতে পারে, যেন ফজরের আযানে ঘুম ভেঙে যায়, যেন ইফতারের মুহূর্তে চোখ ভিজে ওঠে কৃতজ্ঞতায়, যেন ক্বিয়ামুল লায়লের রাতে চিন্তা ফুলের মতো ফুটে ওঠে। নিয়্যতকে পরিশুদ্ধ না করলে রামাযান আসে যায় কিন্তু মানুষের ভেতরে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। তাই দৃঢ় নিয়্যতই রামাযানের প্রস্তুতির প্রথম ধাপ।
সুস্থ দেহও রামাযানের ইবাদতে বড় সহায়। নির্জীব শরীর ইবাদতের ভার বহন করতে পারে না। রামাযানের দীর্ঘ ছিয়াম, তারাবীহর ছালাতে দাঁড়ানো এবং কুরআন তেলাওয়াতে সময় ব্যয় করার জন্য শক্তি ও মানসিক প্রশান্তি প্রয়োজন। তাই শা‘বানের সময়েই শারীরিক যত্ন নেওয়া জরুরী। খাদ্যাভ্যাস কিছুটা ঠিক করা, অতিরিক্ত রাত জাগা কমানো, ঘুমের সুষমতা ফিরিয়ে আনা এবং প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়াও এই প্রস্তুতির অংশ। রামাযান এক বিশাল সমুদ্র। সেই সমুদ্রে নামার আগে শক্তি ও প্রাণশক্তিকে সঠিকভাবে গুছিয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
রামাযান হলো কুরআনের মাস। তাই রামাযানের প্রস্তুতিতে অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রস্তুতি হলো কুরআনকে নিজের জীবনে ফিরিয়ে আনা। আগামী রামাযানে খতম করার ইচ্ছা থাকলে এখন থেকেই কুরআন হাতে নেওয়া উচিত। তাফসীর পড়া, আয়াতের অর্থ বুঝে তেলাওয়াত করা এবং অন্তরে তা ধারণের চেষ্টা করা এসব প্রস্তুতি রামাযানের তেলাওয়াতকে মধুর করে তোলে। পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য ছিয়ামের মাসায়েল জানা, হালাল ও হারাম সম্পর্কে অবহিত হওয়া, দু‘আ ও যিকির শিখে রাখা এগুলোও প্রস্তুতির অংশ। কারণ ছহীহ জ্ঞান ছাড়া আমল কখনো পূর্ণতা পায় না।
রামাযানে সময় অমূল্য। প্রতিটি সেকেন্ড যেন নেকীর সুযোগ। কিন্তু পরিকল্পনা না থাকলে মানুষ সময় হারিয়ে ফেলে, কখনো খাবারে, কখনো ঘুমে, আবার কখনো আড্ডায়। তাই রামাযানের আগে নিজস্ব লক্ষ্য ঠিক করা উচিত। কীভাবে সময় ব্যয় করব, কোন কাজগুলো বাড়াবো, কোনগুলো কমাবো, কী পরিমাণ দান করব, কতটুকু কুরআন পড়ব—এসব পূর্বনির্ধারণ রামাযানকে ফলপ্রসূ করে তোলে। মুমিনের জীবন কোনো বিশৃঙ্খল সার্কাস নয়; বরং উচ্চ লক্ষ্য ও শৃঙ্খলার এক সুন্দর পথচলা। রামাযান সেই পথচলাকে আরও পরিপাটি করার মাস।
পরিবারও রামাযানের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি ঘরে ইবাদতের বাতাবরণ তৈরি হয়, তাহলে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই এতে উৎসাহ পায়। ঘরে কুরআনের আসর বসানো, পরিবারের সবাইকে নিয়ে ইবাদত করা, সরল ইফতারী করা, দুঃস্থদের কথা মনে রাখা এসব কাজ শুধু রামাযানের বরকত বাড়ায় না, বরং পরিবারের হৃদয়গুলোকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়। রামাযানকে পারিবারিক আনন্দের মাস বানানোই উচিত, অপচয় ও চোখ ফেরানো আমোদের মাস নয়।
দান-ছাদাক্বা রামাযানের আরেক প্রাণ। মানুষের হৃদয়কে নরম করার জন্য দানের চেয়ে কার্যকর কিছু নেই। যখন একজন মুমিন তার সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, তখন তার অন্তরে অদ্ভুত এক প্রশান্তি জন্ম নেয়। গরীব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, আত্মীয়দের সহযোগিতা করা, গোপনে দান করা এসব কাজ শুধু দুনিয়ার বোঝা হালকা করে না, বরং আখেরাতে নূর হয়ে জ্বলে ওঠে। রামাযান হলো দানের মাধ্যমে নিজেকে মেহরবান বানানোর প্রশিক্ষণের সময়।
সবশেষে, রামাযানের মূল উদ্দেশ্য হলো তাক্বওয়া। এটি অর্জন করতে হলে গোনাহের দরজা বন্ধ করতে হয়। চোখকে সংযত করা, জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করা, কানের হেফাযত করা, হাতে অপকার না করা, পায়ে হারাম পথে না হাঁটা—এসবই ছিয়ামের প্রকৃত সৌন্দর্য। ছিয়াম শুধু ক্ষুধা–তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়; বরং নিজের নফসকে দাসত্বের শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনার নাম। রামাযান মানুষের ভিতরকার পশুটিকে সংযত করে মানুষের মধ্যে থাকা ফেরেশতাসুলভ গুণগুলোকে জাগিয়ে তোলে।
শেষ দশকের বিশেষ গুরুত্ব তো আলাদা করে বলতেই হয়। লায়লাতুল ক্বদরের রাত, যে রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ—তার সন্ধানেই মুমিনরা এগিয়ে যায়। এই দশকে মনোযোগ বাড়াতে হয়, গভীর রাতে আল্লাহর দরবারে কান্না বাড়াতে হয়, ই‘তিকাফের মাধ্যমে একান্তে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গাঢ় করতে হয়। এই ১০ দিনের মেহনতই রামাযানের আসল রূহ গ্রহণ করার শ্রেষ্ঠ উপায়।
শেষত, রামাযানের দরজায় দাঁড়িয়ে আমাদের প্রত্যেকের অন্তরেই উচ্চারিত হোক এক নীরব দু‘আ: হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে পবিত্র করুন, আমাদের নিয়্যতকে সুস্থ করুন, আমাদের রামাযানকে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বরকতময় রামাযানে পরিণত করুন। আমাদের আমলগুলো কবুল করুন, আমাদের আত্মাকে বদলে দিন, আমাদের অশ্রুকে কবুল করুন, আমাদের গোনাহগুলো ক্ষমা করুন।
এই রামাযান হোক আমাদের জীবনের মোড় ঘোরানো রামাযান- আমীন!
মো. আকরাম হোসেন*
শিক্ষক, শান্তিনগর দাখিল মাদরাসা, মিয়াপুর, পবা, রাজশাহী।
[1]. নাসাঈ, হা/২০৯৭, হাদীছ ছহীহ; সিলসিলা ছহীহা, হা/১৩০৭।
