ফযীলতপূর্ণ পবিত্র রামাযানে মুসলিমগণ যে তাক্বওয়ার অনুশীলণ করেন, তারই ধারাবাহিকতা রক্ষায় রামাযান ব্যতীত অন্য মাসগুলোতেও রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশ কিছু নফল ছিয়াম রাখতে অভ্যস্ত ছিলেন। ফরয ইবাদতের বাইরে অন্য সব ইবাদতকেই নফল ইবাদত বলা হয়। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরয ইবাদতের বাইরেও অনেক নফল ইবাদত করতেন এবং ছাহাবীদের তা করার জন্য উৎসাহ দিতেন। তিনি ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন নফল ইবাদত দ্বারা ফরয ইবাদতের ঘাটতি পূরণ করা হবে’।[1] সুতরাং আমাদের উচিত, ফরযের পাশাপাশি নফল ইবাদতগুলো পালন করা। নফল ছালাত যেমন রয়েছে, তেমনি নফল ছিয়ামও রয়েছে। রামাযান ব্যতীত ছওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে অন্য সময়ে যেসব ছিয়াম রাখা হয়, সেগুলোই হল নফল ছিয়াম। ফরয ছিয়াম পালনের পর আল্লাহ্র সন্তুষ্টি এবং আত্মশুদ্ধি অর্জনের জন্য এই ছিয়ামগুলো বেশ সহায়ক। তাছাড়া রামাযানের ছিয়ামের মধ্যে কোন ত্রুটি হয়ে থাকলে নফল ছিয়ামের মাধ্যমে তার পূর্ণতা অর্জিত হবে। হাদীছে ছিয়ামের ফযীলত বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ الصِّيَامُ جُنَّةٌ فَلَا يَرْفُثْ وَلَا يَجْهَلْ وَإِنِ امْرُؤٌ قَاتَلَهُ أَوْ شَاتَمَهُ فَلْيَقُلْ إِنِّيْ صَائِمٌ مَرَّتَيْنِ وَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهِ لَخُلُوْفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللهِ تَعَالَى مِنْ رِيْحِ الْمِسْكِ يَتْرُكُ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ وَشَهْوَتَهُ مِنْ أَجْلِي الصِّيَامُ لِيْ وَأَنَا أَجْزِيْ بِهِ وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا.
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ছিয়াম ঢাল স্বরূপ। সুতরাং অশ্লীলতা করবে না এবং মূর্খের মত কাজ করবে না। যদি কেউ তার সাথে ঝগড়া করতে চায়, তাকে গালি দেয়, তবে সে যেন দুইবার বলে, আমি ছিয়াম পালন করছি। ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! অবশ্যই ছিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহ্র নিকট মিসকের সুগন্ধির চাইতেও উৎকৃষ্ট, সে আমার জন্য পানাহার ও কামাচার পরিত্যাগ করে। ছিয়াম আমারই জন্য। তাই এর পুরস্কার আমি নিজেই দান করব। আর প্রত্যেক নেক কাজের বিনিময় দশগুণ’।[2]
(১) শা‘বান মাসের ছিয়াম :
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বহু ছহীহ হাদীছে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি শা‘বান মাসে সবচেয়ে বেশী ছিয়াম পালন করতেন।
عَنْ عَائِشَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُوْمُ حَتَّى نَقُوْلَ لَا يُفْطِـرُ وَيُفْطِـرُ حَتَّى نَقُوْلَ لَا يَصُوْمُوَمَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اسْتَكْمَلَ صِيَامَ شَهْـرٍ اِلَّا رَمَضَانَ وَمَا رَأَيْتُهُ أَكْثَرَ صِيَامًا مِنْهُ فِيْ شَعْبَانَ.
আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধারে (এত অধিক) ছিয়াম পালন করতেন যে, আমরা বলাবলি করতাম, তিনি আর ছিয়াম পরিত্যাগ করবেন না। (আবার কখনো এত বেশি) ছিয়াম পালন না করা অবস্থায় একাধারে কাটাতেন যে, আমরা বলাবলি করতাম, তিনি আর (নফল) ছিয়াম পালন করবেন না। আমি আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রামাযান ব্যতীত কোন পুরো মাসের ছিয়াম পালন করতে দেখিনি এবং শা‘বান মাসের চেয়ে কোন মাসে এত অধিক (নফল) ছিয়াম পালন করতে দেখিনি’।[3]
عَنْ عَائِشَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ لَمْ يَكُنِ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُوْمُ شَهْرًا أَكْثَرَ مِنْ شَعْبَانَ فَاِنَّهُ كَانَ يَصُوْمُ شَعْبَانَ كُـلَّهُ وَكَانَ يَقُوْلُ خُذُوْا مِنَ الْعَمَلِ مَا تُطِيْقُوْنَ فَإِنَّ اللهَ لَا يَمَلُّ حَتَّى تَمَلُّوْا وَأَحَبُّ الصَّلَاةِ اِلَـى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا دُوْوِمَ عَلَيْهِ وَاِنْ قَلَّتْ وَكَانَ اِذَا صَلَّى صَلَاةً دَاوَمَ عَلَيْهَا.
আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শা‘বান মাসের চাইতে বেশি (নফল) ছিয়াম কোন মাসে পালন করতেন না। তিনি (প্রায়) পুরো শা‘বান মাসই ছিয়াম রাখতেন এবং তিনি বলতেন, ‘তোমাদের মধ্যে যতটুকু সামর্থ্য আছে, ততটুকু (নফল) আমল কর, কারণ তোমরা (আমল করতে করতে) পরিশ্রান্ত হয়ে না পড়া পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা (ছওয়াব দান) বন্ধ করেন না। নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে সর্বাপেক্ষা পসন্দনীয় ছালাত ছিল ঐ ছালাত, যা যথাযথ নিয়মে সর্বদা আদায় করা হত, যদিও তা পরিমাণে কম হত এবং তিনি যখন কোন (নফল) ছালাত আদায় করতেন, পরবর্তীতে তা অব্যাহত রাখতেন’।[4] উম্মু সালামা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
مَا رَأَيْتُ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُوْمُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ إِلَّا شَعْبَانَ وَرَمَضَانَ.
‘আমি নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে শা‘বান ও রামাযান ব্যতীত একাধারে দুই মাস ছিয়াম পালন করতে দেখিনি’।[5] আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
مَا رَأَيْتُ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِىْ شَهْرٍ أَكْثَرَ صِيَامًا مِنْهُ فِىْ شَعْبَانَ كَانَ يَصُوْمُهُ إِلاَّ قَلِيْلاً بَلْ كَانَ يَصُوْمُهُ كُلَّهُ.
‘আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে শা‘বান মাসের মত আর কোন মাসে এত অধিক নফল ছিয়াম রাখতে দেখিনি। এ মাসের কিছু ব্যতীত পুরো মাসই তিনি ছিয়াম রাখতেন’।[6]
(২) শাওয়াল মাসের ছিয়াম :
শাওয়াল মাসে ৬টি ছিয়াম রাখা অতি গুরুত্বপূর্ণ। হাদীছে এসেছে-
عَنْ أَبِيْ أَيُّوبَ الْأَنْصَارِيِّ رَضَىَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ حَدَّثَهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَمَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتًّا مِنْ شَوَّالٍ كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْر.
আবু আইয়ূব আনছারী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘রামাযান মাসের ছিয়াম পালন করে পরে শাওয়াল মাসে ছয় দিন ছিয়াম পালন করা সারা বছর ছিয়াম রাখার মত’।[7]
(৩) আরাফার দিনের ছিয়াম :
নফল ছিয়ামের মধ্যে যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশক ও আরাফার দিনের ছিয়ামের মর্যাদা সবচেয়ে বেশী। আরাফার দিনের ছিয়াম প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ إِنِّىْ اَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ اللَّتِىْ قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ اللَّتِىْ بَعْدَهُ.
‘আরাফার দিনের ছিয়াম সম্পর্কে আমি আল্লাহ্র নিকট আশা করি যে, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছর ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন’।[8]
عَنْ أُمِّ الْفَضْلِ بِنْتِ الْحَارِثِ أَنَّ نَاسًا تَمَارَوْا عِنْدَهَا يَوْمَ عَرَفَةَ فِيْ صَوْمِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ بَعْضُهُمْ هُوَ صَائِمٌ وَقَالَ بَعْضُهُمْ لَيْسَ بِصَائِمٍ فَأَرْسَلَتْ اِلَيْهِ بِقَدَحِ لَبَـنٍ وَهْوَ وَاقِفٌ عَلَى بَعِيْـرِهِ فَشَـرِبَهُ
উম্মুল ফযল বিনতে হারিছ রাযিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, কিছু সংখ্যক লোক আরাফাতের দিনে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছিয়াম পালন সম্পর্কে তার কাছে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তাদের কেউ বললেন, তিনি ছিয়াম পালন করেছেন। আর কেউ বললেন, না, তিনি করেননি। এতে উম্মুল ফযল রাযিয়াল্লাহু আনহা এক পেয়ালা দুধ আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পাঠিয়ে দিলেন এবং তিনি তা পান করে নিলেন। এ সময় তিনি উটের পিঠে (আরাফাতে) অবস্থানরত অবস্থায় ছিলেন।[9]
عَنْ مَيْمُوْنَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهَا أَنَّ النَّاسَ شَكُّوْا فِيْ صِيَامِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ عَرَفَةَ فَأَرْسَلْتُ اِلَيْهِ بِحِلَابٍ وَهُوَ وَاقِفٌ فِي الْمَوْقِفِ فَشَرِبَ مِنْهُ وَالنَّاسُ يَنْظُرُوْنَ.
মুসলিম জননী মায়মূনা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, লোকজন আরাফাতের দিন নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছিয়াম রাখার সম্পর্কে সন্দেহ করছিল। (তিনি বলেন) তখন আমি তার নিকটে কিছু দুধ পাঠালাম। এ সময় তিনি আরাফাতে অবস্থানরত ছিলেন। তিনি তখনই দুধটুকু পান করে ফেললেন। আর লোকজন তা দেখছিল।[10]
যিলহজ্জের প্রথম দশকের ছিয়ামের ফযীলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيْهَا أَحَبُّ إِلَى اللهِ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ يَعْنِىْ الْعَشْرَ قَالُوْا يَارَسُوْلَ اللهِ وَلَا الْجِهَادُ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ قالَ وَلاَ الْجِهَادُ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ إِلَّا رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَالِكَ بِشَيْءٍ.
‘আল্লাহ্র নিকট যিলহজ্জ মাসের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক পসন্দনীয় নেক আমল আর নেই। ছাহাবীগণ বলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদও নয়? তিনি বললেন, না, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়। তবে যে ব্যক্তি তার জান, মাল নিয়ে বের হয়ে ফিরে আসেনি (তার সৎকাজ এর চেয়েও বেশী মর্যাদাপূর্ণ)’।[11]
(৪) আশূরার ছিয়াম :
রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হিজরত করে মদীনায় গেলেন, তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন, ইয়াহূদীরা এই দিনে ছিয়াম পালন করছে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, এই দিনে আমাদের নবী মূসা আলাইহিস সালাম যালেম ফিরাঊনের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। তাই আমাদের নবী মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ্র কৃতজ্ঞতা আদায়ের জন্য এ দিন ছিয়াম পালন করতেন। এজন্য আমাদের নবীর অনুসরণ করে আমরা এই দিনে ছিয়াম পালন করি। তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন ‘আমরাই বেশি হক্বদার মূসা আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে সুসম্পর্কের’। তারপর তিনি ছাহাবীদেরকেও এ দিনের ছিয়াম রাখার নির্দেশ দেন।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ قَدِمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِيْنَةَ فَرَأَى الْيَهُوْدَ تَصُوْمُ يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ فَقَالَمَا هَذَا قَالُوْا هَذَا يَوْمٌ صَالِحٌ هَذَا يَوْمٌ نَجَّـى اللهُ بَنِيْ اِسْرَائِيْلَ مِنْ عَدُوِّهِمْ فَصَامَهُ مُوْسَىقَالَ فَأَنَا أَحَقُّ بِمُوْسَى مِنْكُمْفَصَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ.
ইবনু আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমন করে দেখতে পেলেন যে, ইয়াহূদীরা আশূরার দিনে ছিয়াম পালন করে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার? (তোমরা এ দিনে ছিয়াম পালন কর কেন?) তারা বলল, এটা অতি উত্তম দিন, এ দিনে আল্লাহ তা‘আলা বনী ইসরাঈলকে তাদের শত্রুর কবল হতে নাজাত দান করেন। ফলে এ দিনে মূসা আলাইহিস সালাম ছিয়াম পালন করেন। আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আমি তোমাদের অপেক্ষা মূসার অনুসরণের অধিক হক্বদার’। এরপর তিনি এ দিনে ছিয়াম পালন করেন এবং ছিয়াম পালনের নির্দেশ দেন।[12]
عَنْ حُمَيْدِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمٰنِ اَنَّهُ سَمِعَ مُعَاوِيَةَ بْنِ أَبِيْ سُفْيَانَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ عَامَ حَجَّ عَلَى الْمِنْبَـرِ يَقُوْلُ يَا أَهْلَ الْمَدِيْنَةِ أَيْنَ عُلَمَاؤُكُمْ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ هَذَا يَوْمُ عَاشُوْرَاءَ وَلَمْ يَكْتُبْ اللهُ عَلَيْكُمْ صِيَامُهُ وَأَنَا صَائِمٌ فَمَنْ شَاءَ فَلْيَصُمْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيُفْطِرْ.
হুমাইদ ইবনে আবদুর রহমান রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, যে বছর মু‘আবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু হজ্জ করেন, সে বছর আশূরার দিনে (মসজিদে নববীর) মিম্বারে তিনি (রাবী) তাকে বলতে শুনেছেন যে, হে মদীনাবাসীগণ! তোমাদের আলেমগণ কোথায়? আমি আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, ‘আজকে আশূরার দিন আল্লাহ তা‘আলা এর ছিয়াম তোমাদের উপর ফরয করেননি বটে, তবে আমি (আজ) ছিয়াম পালন করছি। যার ইচ্ছা সে ছিয়াম পালন করুক, যার ইচ্ছা সে পালন না করুক’।।[13]
ইবনু আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আশূরার দিনের ছিয়ামের উপরে অন্য কোন দিনের ছিয়ামকে প্রাধান্য প্রদান করতে দেখিনি এবং এ মাস অর্থাৎ রামাযান মাস (এর উপর অন্য মাসের গুরুত্ব প্রদান করতেও দেখিনি)।[14]
২য় হিজরী সনে রামাযান মাসের ছিয়াম ফরয করা হলে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই নির্দেশ শিথিল করে দেন। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে আশূরার ছিয়াম পালনের নির্দেশ দেন। পরে যখন রামাযান মাসের ছিয়াম ফরয করা হয়, তখন আশূরার ছিয়াম ছেড়ে দেয়া হল। যার ইচ্ছা সে পালন করত, যার ইচ্ছা সে ছেড়ে দিত।
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,صُوْمُوْا يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ وَخَالِفُوا الْيَهُوْدَ وَصُوْمُوْا قَبْلَهُ يَوْمًا أَوْ بَعْدَهُ يَوْمًا ‘তোমরা আশূরার ছিয়াম রাখো এবং ইয়াহূদীদের বিপরীত কর। তোমরা আশূরার সাথে তার পূর্বে একদিন অথবা পরে একদিন ছিয়াম পালন কর’।[15] সুতরাং আশূরার ছিয়াম মুহাররমের ৯, ১০ অথবা ১০, ১১ তারিখে রাখা যায়। তবে ৯ ও ১০ তারিখে ছিয়াম রাখাটাই অধিক উত্তম।
এ ছিয়ামের ফযীলত প্রসঙ্গে রাসূলুলাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,وَصِيَامُ يَوْمِ عَاشُوْرَاءَ اَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُّكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِىْ قَبْلَهُ ‘আর আশূরার ছিয়াম সম্পর্কে আমি আল্লাহ্র নিকটে আশা রাখি যে, উহা বিগত এক বছরের পাপ মোচন করে দিবে’।[16]
(৫) প্রতি মাসে তিনদিন ছিয়াম :
প্রতি মাসে তিনদিন ছিয়াম রাখা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিয়মিত ও পসন্দনীয় আমল। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আইয়ামে বীয তথা প্রতি মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে ছিয়াম পালন করতেন,
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ أَوْصَانِيْ خَلِيْلِـىْ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِثَلَاثٍ صِيَامِ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ وَرَكْعَتَـىِ الضُّحَـى وَأَنْ أُوتِرَ قَبْلَ أَنْ أَنَامَ.
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার বন্ধু ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তিনটি বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন, প্রতি মাসে তিনদিন করে ছিয়াম পালন করা, দুই রাক‘আত ছালাতুয-যুহা এবং ঘুমানোর পূর্বে বিতর ছালাত আদায় করা।[17]
তিনদিন ছিয়াম রাখার বিনিময়ে পুরো মাস ছিয়াম রাখার সমান নেকী পাওয়া যায়। আবু যার রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতি মাসে তিনদিন ছিয়াম রাখে, তা যেন সারা বছর ছিয়াম রাখার সমান। এর সমর্থনে আল্লাহ তার কিতাবে নাযিল করেন, ‘যদি কেউ একটি ভাল কাজ করে, তার প্রতিদান হল এর দশগুণ’ (আন‘আম, ১৬০)। সুতরাং একদিন দশদিনের সমান’।[18]
(৬) সোমবার ও বৃহস্পতিবারের ছিয়াম :
সোমবার ও বৃহস্পতিবারের ছিয়ামের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার ও বৃহস্পতিবার ছিয়াম রাখতেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি সোমবার ও বৃহস্পতিবার ছিয়াম রাখেন কেন? রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার আমলনামা আল্লাহ্র নিকটে পেশ করা হয়। আমি পসন্দ করি যে, ছিয়াম অবস্থায় আমার আমলনামা আল্লাহ্র নিকটে পেশ করা হোক’।[19]
عَنْ أَبِيْ قَتَادَةَ الْأَنْصَارِيِّ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُئِلَ عَنْ صَوْمِ الْاِثْنَيْنِ فَقَالَفِيْهِ وُلِدْتُ وَفِيْهِ أُنْزِلَ عَلَىَّ.
আবু ক্বাতাদাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে সোমবারের ছিয়াম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘ঐদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং ঐদিন আমার উপর (কুরআন) নাযিল হয়েছে’।[20]
(৭) জুম‘আর দিনের ছিয়াম :
আমাদের সমাজে জুম‘আর দিনে নফল ছিয়াম রাখার ব্যাপারেও অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয় অথচ হাদীছে শুধুমাত্র জুম‘আর দিনে ছিয়াম পালন করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে যদি কেউ জুম‘আর দিনে ছিয়াম রাখতে চায়, তাহলে সে যেন জুম‘আর আগের দিন বা পরের দিন ছিয়াম পালন করার নিয়ত করে।
عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَبَّادٍ قَالَ سَأَلْتُ جَابِرًا رَضِىَ اللهُ عَنْهُ أَنَـهَـى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ الْجُمُعَةِ؟ قَالَ نَعَمْزَادَ غَيْرُ أَبِيْ عَاصِمٍ يَعْنِىْ أَنْ يَنْفَرِدَ بِصَوْمِهِ
মুহাম্মাদ ইবনু আববাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি জুম‘আর দিনে (নফল) ছিয়াম পালন করতে নিষেধ করেছেন? উত্তরে তিনি বললেন, হ্যাঁ। আবু আছিম রাযিয়াল্লাহু আনহু ব্যতীত অন্যরা অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, পৃথকভাবে জুম‘আর দিনের ছিয়াম পালন (করাকে নিষেধ করেছেন)।[21]
জুয়াইরিয়া বিনতে হারিছ রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুম‘আর দিনে তার নিকট প্রবেশ করেন তখন তিনি (জুয়াইরিয়া) ছিয়াম পালনরত ছিলেন। আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি গতকাল ছিয়াম পালন করেছিলে? তিনি বললেন, না। আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি আগামীকাল ছিয়াম পালনের ইচ্ছা রাখো? তিনি বললেন, না। আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে ছিয়াম ভেঙ্গে ফেল। হাম্মাদ ইবনুল জা‘দ রাযিয়াল্লাহু আনহু স্বীয় সূত্রে জুয়াইরিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আদেশ দেন এবং তিনি ছিয়াম ভঙ্গ করেন।[22]
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, ‘তোমাদের কেউ যেন শুধু জুম‘আর দিনে ছিয়াম পালন না করে, কিন্তু তার পূর্বে একদিন অথবা পরেরদিন (যদি পালন করে তবে জুম‘আর দিনে ছিয়াম পালন করা যায়)।[23]
আলোচনার শেষ প্রান্তে এসে আমরা এ কথা বলতে পারি যে, নফল ছিয়ামের গুরুত্ব অত্যধিক। এই নফল ছিয়াম আমাদের পরকালীন মুক্তির পাথেয়। ক্বিয়ামতের কঠিন ময়দানে যখন আমরা একটু ছওয়াবের জন্য এদিক-সেদিক ছুটাছুটি করব, তখন এসব নফল ইবাদতই আমাদের জন্য স্বস্তির সুসংবাদ নিয়ে আসবে। তাই আমরা যেন বেশি বেশি নফল ছিয়াম তথা নফল ইবাদতে অভ্যস্ত হতে পারি, আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সেই তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
[1]. আবুদাঊদ, হা/৮৬৪; তিরমিযী, হা/৪১৩, ৪৬৫-৪৬৭; ইবনু মাজাহ, হা/১৪২৫-১৪২৬; আহমাদ, হা/৭৮৪২; দারেমী, হা/১৩৫৫।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/১৮৯৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৫১; আহমাদ, হা/৭৩০৮।
[3]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৬৯।
[4]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৭০।
[5]. তিরমিযী, হা/৬৩৬, সনদ ছহীহ।
[6]. তিরমিযী, হা/৬৩৭, সনদ হাসান, ছহীহ।
[7]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৪৮।
[8]. তিরমিযী, হা/৭৪৯, সনদ ছহীহ; ইবনু মাজাহ, হা/১৭৩০।
[9]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৮৮।
[10]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৮৯; ছহীহ মুসলিম, হা/১১২৪।
[11]. ইবনু মাজাহ, হা/১৭২৭; তিরমিযী, হা/৭৫৭, সনদ ছহীহ।
[12]. ছহীহ বুখারী, হা/২০০৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৩০।
[13]. ছহীহ বুখারী, হা/২০০৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১১২৯।
[14]. ছহীহ বুখারী, হা/২০০৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৩২।
[15]. বায়হাক্বী, ৪/২৮৭ পৃঃ ।
[16]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬২; মিশকাত, হা/২০৪৪।
[17]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৮১।
[18]. তিরমিযী, হা/৭৬২; ইবনু মাজাহ, হা/১৭০৮, সনদ ছহীহ।
[19]. তিরমিযী, হা/৭৪৭, সনদ ছহীহ।
[20]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬২; মিশকাত, হা/২০৪৫।
[21]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৮৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৪৩; আহমাদ, হা/১৪১৫৬।
[22]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৮৬।
[23]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৮৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৪৪; আহমাদ, হা/১০৮০৮।
