কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

আহলেহাদীছদের উপর মিথ্যা অপবাদ ও তার জবাব (পর্ব-৮)

(আগস্ট’২১ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)

ভুল ধারণা-৮ : আহলেহাদীছগণ উম্মতের ইজমা মানে না : 

আহলেহাদীছদের ভ্রষ্ট প্রমাণ করার ক্ষেত্রে এটাও বলা হয়ে থাকে যে, ‘আহলেহাদীছগণ উম্মতের ইজমা মানে না’। বাস্তবে যারা এই কথা বলে থাকে, মূলত তারা নিজেরাই ইজমার সংজ্ঞা জানে না। কখনো তারা অধিকাংশের মতকে ইজমা বলে থাকে আবার কখনো সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচলিত আমলকে ইজমা বলে। আর কিছু কিছু ইজমার দাবি শুধু দাবিই হয়ে থাকে, আসলে তা ইজমা নয়। যখন বাস্তবতার দৃষ্টিকোণ হতে বিশ্লেষণ করা হয়, তখন দেখা যায় যে, ইজমার ব্যাপারে সালাফের মাঝেই মতানৈক্য দেখা গেছে। এমনকি ইজমার দাবিদারদের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ এমন ইজমাকে প্রত্যাখ্যান করে থাকে।

১. আহলেহাদীছদের নিকট প্রমাণিত ইজমা গ্রহণীয় : বাস্তব সত্য কথা হচ্ছে, কুরআন এবং সুন্নাহর পরে ইজমাও আহলেহাদীছদের নিকট শরীআতের দলীল। কিন্তু শর্ত হচ্ছে যে, ঐ ইজমা শুধু ধারণা এবং নিছক ইজমার দাবি হলেই হবে না, বরং প্রমাণিত ইজমা হতে হবে। ইজমা কী? আবুল মাআলী আল-জুওয়াইনী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَأَمَّا الْإِجْمَاعُ فَهُوَ اتِّفَاقُ عُلَمَاءِ الْعَصْرِ عَلٰى حُكْمِ الْحَادِثَةِ وَنَعْنِيْ بِالْعُلَمَاءِ الْفُقَهَاءَ وَنَعْنِيْ بِالْحَادِثَةِ الْحَادِثَةَ الشَّرْعِيَّةَ ‘ইজমা বলা হয়, কোনো এক যুগের আলেমগণ সংঘটিত কোনো বিষয়ে একটি সমাধানের উপর ঐকমত্য পোষণ করা। এখানে ‘উলামা’ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ফক্বীহগণ আর সংঘটিত বিষয় দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে শারঈ বিষয়াবলি’।[1]

আহলেহাদীছদের নিকট ইজমা একটি দলীল। কেননা আল্লাহ তাআলা মুমিনদের পথের বিরোধিতা করে মন মতো চলাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا ‘আর যে ব্যক্তি তার নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং বিশ্বাসীদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করবে, তাকে আমি সেদিকেই ফিরিয়ে দেব, যেদিকে সে ফিরে যেতে চায় এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা কতইনা নিকৃষ্ট আবাসস্থল’ (আন-নিসা, ৪/১১৫)

উক্ত আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়, যে বিষয়ের উপর সকল ঈমানদার ঐকমত্য হয়ে যাবে, তার বিরোধিতা করা বৈধ নয়। ঈমানদারগণের কোনো বিষয়ের উপর ঐক্য হয়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে, সে বিষয়টি আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় বা হক্ব। কেননা ঈমানদারগণকে কিয়ামত পর্যন্ত মিথ্যার উপর একমত হওয়া থেকে রক্ষা করার ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِنَّ اللهَ تَعَالٰى لَا يَجْمَعُ أُمَّتِيْ عَلٰى ضَلَالَةٍ ‘আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতকে মিথ্যা বা ভ্রষ্টতার উপর একমত করবেন না’।[2] অর্থাৎ এমনটি কখনো হবে না যে, উম্মতের সকল সদস্য একটি ভুল বিষয়ের উপর একমত পোষণ করবেন। প্রত্যেক যুগে একজন অথবা কয়েকজন এমন বিদ্বান বিদ্যমান থাকবেন, যারা সত্য এবং সঠিকতার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবেন। কিছু আলেমের ভুল করাটা স্বাভাবিক, তবে এটা অসম্ভব যে, কোনো ভ্রান্তি বা ভুলের উপর পুরো উম্মত একমত হয়ে যাবে।

এখানে এ বিষয়টিও লক্ষ্যণীয় যে, কিছু মানুষ বা অধিকাংশ মানুষের কোনো বিষয়ে একমত হয়ে যাওয়া ইজমা নয়। কেননা যদি এ সকল মানুষ আলেম না হয়, বরং সাধারণ মানুষ হয়, তাহলে এমন ঐকমত্য মূল্যহীন। ইজমার ক্ষেত্রে এটাও জরুরী যে, ইজমায় অংশগ্রহণকারীগণ যেন নামমাত্র আলেম না হন, বরং তারা যেন কুরআন এবং সুন্নাহর গভীর জ্ঞানের অধিকারী হন। কেননা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে অপারগতার কথা বলে কোনো মাযহাবের মুক্বাল্লিদ ব্যক্তিকে ফক্বীহ বা আলেম কী করে বলা যেতে পারে? (অর্থাৎ মাযহাবের অনুসারীগণের ইজমা গ্রহণীয় নয়, কেননা তাদেরকে আলেম বলা যায় না)। আলেম তো তারাই, যারা নবীগণ হতে বর্ণিত জ্ঞানের অধিকারী। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর পরে ‍কুরআন ও সুন্নাহর যে জ্ঞান রেখে গেছেন, তার ধারক ও বাহক। কারণ তিনি কোনো ব্যক্তিগত বানোয়াট ক্বিয়াস বা ব্যক্তিগত দর্শন রেখে যাননি। সুতরাং আলেম এবং ফক্বীহ তাকেই বলা যায়, যার অন্তর কুরআন এবং সুন্নাহর জ্ঞান দ্বারা সুসজ্জিত।

২. অনেক ইজমার দাবি নিছক ধারণা নির্ভর হয়ে থাকে : আহলেহাদীছগণ ইজমা মানেন, কিন্তু ইজমার প্রত্যেকটি দাবি কি দলীল এবং যাছাই-বাছাই ব্যতীত কি মেনে নিতে হবে? না। বাস্তবতা হলো, অনেক বক্তা এবং লেখক অনেক মাসআলার ক্ষেত্রে ইজমার দাবি করে বসেন, কিন্তু যখন বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়, তখন সেই মাসআলায় আলেমদের ইখতিলাফ পরিলক্ষিত হয়। এই জন্যই ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, مَنِ ادَّعَى الْإِجْمَاعَ فَهُوَ كَذَبَ لَعَلَّ النَّاسَ قَدِ اخْتَلَفُوْا ‘যে ব্যক্তি ইজমার দাবি করল, সে মিথ্যা কথা বলল। কেননা অনেক বেশি সম্ভাবনা রয়েছে যে, সে বিষয়ে মানুষদের মাঝে ইখতিলাফ (মতানৈক্য হয়েছে যার বিষয়ে তার অবগতি নেই) হয়েছে।[3] আরেকটি বিষয় এই যে, একজন মুজতাহিদও যদি ঐকমত্য পোষণ না করেন, তাহলেও ইজমা সাব্যস্ত হবে না। ইখতিলাফ কম কিংবা বেশি এর উপর নির্ভর করে সমাধান করা যাবে না। বরং কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী সমাধান করতে হবে। সুতরাং কোনো মতানৈক্যপূর্ণ বিষয়ে কিছু আলেম শুধু নিজের মত প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ইজমার দাবি তেমন মূল্যহীন, মাকড়সার জাল যেমন মূল্যহীন।

৩. আহলেহাদীছদের নিকট মতামতের ক্ষেত্রে সংখ্যাধিক্যতা কোনো দলীল নয় : কিছু আলেম বিশেষ করে সাধারণ মানুষ নিজের ধারণা অনুযায়ী আধিক্যকে ইজমা ভেবে নিজের বক্তব্য মানানোর জন্য অন্যের উপর জোর করে থাকে। অথচ মৌলিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে ইজমা এবং আধিক্যের মাঝে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আবার তাদের এই আধিক্যের দাবি পৃথিবীব্যাপী হয় না, বরং এলাকাভিত্তিক আধিক্য হয়ে থাকে। এর বাস্তব রহস্য হচ্ছে, একজন মানুষ যখন তার পছন্দের বিষয়কে প্রমাণ করার জন্য উঠেপড়ে লাগে, তখন সে ব্যক্তি ভিত্তিহীন জিনিসকে সঠিক ও সত্য বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করে এবং নিজের ধারণাকে দলীল হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আরম্ভ করে। মহান আল্লাহ বলেন, وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ إِنْ يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ ‘আর আপনি যদি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথামতো চলেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করে দেবে। তারা তো শুধু অলীক কল্পনার অনুসরণ করে এবং সম্পূর্ণ অনুমানভিত্তিক কথাবার্তাই বলে থাকে’ (আল-আনআম, ৬/১১৬)

উক্ত আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ‘আধিক্যতা সর্বদা সত্যের মানদণ্ড’ কুরআনের কোনো নীতিমালা নয়, বরং এই মূলনীতিতে বিশ্বাসীদের নিন্দা করা হয়েছে। এমন মূলনীতিই মানুষের পথভ্রষ্টতার কারণ হয়ে থাকে। কেননা কখনো আহলে হক্ব বা সত্যপন্থী লোক বেশি হয় আবার কখনো কম হয়। বরং আহলে হক্ব বা সত্যপন্থী লোক সাধারণত কমই হয়ে থাকে।

ফুযায়েল ইবনু ইয়ায রাহিমাহুল্লাহ বলেন, لَا تَسْتَوْحِشْ طُرُقَ الْهُدَى لِقِلَّةِ أَهْلِهَا وَلَا تَغْتَرَّ بِكَثْرَةِ الْهَالِكِيْنَ ‘হেদায়াতপন্থীদের সংখ্যালঘুতা দেখে ভয় পেয়ো না এবং ধ্বংসশীলদের আধিক্যতা দেখে ধোঁকা খেয়ো না’।[4] অর্থাৎ আধিক্যের পিছু অনুসরণের ফলে মানুষ বড় ধোঁকায় পতিত হতে পারে। কেননা ধ্বংসশীলদেরও সংখ্যা বেশি হতে পারে, যা হাদীছ দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত।

৪. সংখ্যায় অধিকহওয়া সত্ত্বেও ভুলের উপর থাকতে পারে : আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, بَدَأَ الإِسْلاَمُ غَرِيبًا وَسَيَعُودُ كَمَا بَدَأَ غَرِيبًا فَطُوبَى لِلْغُرَبَاءِ ‘অপরিচিত অবস্থায় ইসলামের সূচনা হয়েছিল, অচিরেই তা আবার পূর্বের মতো অপরিচিত হয়ে যাবে। সুতরাং এরূপ অপরিচিত অবস্থায়ও যারা ইসলামের উপর ক্বায়েম থাকবে, তাদের জন্য সুসংবাদ’।[5] অন্য বর্ণনায় রয়েছে, فَقِيلَ مَنِ الْغُرَبَاءُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ أُنَاسٌ صَالِحُونَ فِى أُنَاسِ سَوْءٍ كَثِيرٍ مَنْ يَعْصِيهِمْ أَكْثَرُ مِمَّنْ يُطِيعُهُمْ ‘রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! এই অপরিচিত লোকগুলো কারা? তিনি বললেন, তারা হলেন, বহুসংখ্যক অসৎ লোকের মাঝে স্বল্প সংখ্যক সৎ মানুষ। তাদের অনুগত লোকের চেয়ে অবাধ্য লোকের সংখ্যা অধিক হবে’।[6]

উক্ত হাদীছ দ্বারা বুঝা যায় যে, এই পরবর্তী সময়ে হক্বপন্থী লোকের সংখ্যা নগণ্য হবে এবং বাতিলপন্থীদের সংখ্যা অধিক হবে। সত্যপন্থীদের কথা মানার লোকসংখ্যা স্বল্প হবে এবং তাদের বিরোধীদের সংখ্যা বেশি হবে। আধিক্যের উপর বিশ্বাসীদের নিকট প্রশ্ন হলো, সত্যপন্থীদের সংখ্যালঘুতা কি সত্যকে বাতিল সাবস্ত করে দেয়? কখনো নয়, বরং সত্য চিরদিনই সত্য থেকে যাবে- যদিও তাদের অনুসারী কম হোক বা বেশি। সুতরাং শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে সত্য-মিথ্যার মানদণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়াই নিজেকে এবং অন্যকে পথভ্রষ্ট বানানোর মূল কারণ।

(চলবে)

মূল (উর্দূ) : আবু যায়েদ যামীর

অনুবাদ : আখতারুজ্জামান বিন মতিউর রহমা

শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।


[1]. আল-ওয়ারাক্বাত, পৃ. ২৪|

[2]. তিরমিযী, হা/২১৬৭; ছহীহুল জামে‘, হা/১৮৪৮|

[3]. মাসায়েলুল ইমাম আহমাদ রিওয়ায়াতু ইবনিহি আব্দিল্লাহ, পৃ. ৪৩৮-৪৩৯, মাসআলা নং ১৫৮৭|

[4]. আল-আদাবুশ শারঈয়া, ১/২৬৩|

[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/২০৮ ‘কিতাবুল ঈমান’|

[6]. মুসনাদে আহমাদ, ছহীহুল জামে‘, হা/৩৯২১|

Magazine