(১) আল্লাহ কে?
(২) আল্লাহ কোথায়?
(৩) আল্লাহ কেমন?
(৪) বান্দার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক কী?
সুধী পাঠক! এটা সকলের জানাশোনা বিষয় যে, কবরে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করে তিনটি প্রশ্ন করা হবে। তন্মধ্যে প্রথমটি হলো, مَنْ رَبُّكَ؟ ‘তোমার রব কে?’ দ্বিতীয়টি হলো, مَا دِينُكَ؟ ‘তোমার দ্বীন কী?’ তৃতীয়টি হলো, مَنْ نَبِيُّكَ؟ ‘তোমার নবী কে?’
যারা উত্তর দিতে সক্ষম হবে, তাদের চতুর্থ আরেকটি প্রশ্ন করা হবে। তা হলো, وَمَا يُدْرِيكَ؟ ‘কীভাবে তুমি এসব বিষয়ে জেনেছো?’
এসব প্রশ্নের উত্তর হাদীছে বলে দেওয়া হয়েছে। চতুর্থ প্রশ্ন ও উত্তর অনেকেই জানে না। কিন্তু প্রথম তিনটি প্রশ্নের উত্তর দুনিয়ার প্রায় শতকরা ৯৯ জন বালেগ মুসলিম জানে বলা যায়। উত্তর অত্যন্ত সহজ, মাত্র একটি করে শব্দ। যথা : (১) আল্লাহ (২) ইসলাম (৩) মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
এমনকি মুসলিম অধ্যুষিত ও সংখ্যালঘু কাফের দেশের কাফেররা এবং নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ও সর্বযুগের মুনাফেক্বরা এসব প্রশ্নের উত্তর জানত ও জানে। কিন্তু কাফের বাদে প্রায় সবার দুনিয়ায় জানা থাকা সত্ত্বেও কবরে কাফের ও মুনাফেক্বরা কেউ এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না।[1] তার কারণ তারা দুনিয়াতে উত্তর জানলেও আল্লাহর পরিচয় ঠিকঠাক মতো জানত না। জেনে থাকলেও পরিচয় অনুযায়ী বিশ্বাস, সম্মান ও মর্যাদা দিত না।
সঠিক কথা এটাই যে, শুধু কাফের ও মুনাফেক্বরাই নয়; বরং মুসলিম নামধারীরাও যদি আল্লাহর সঠিক পরিচয় দুনিয়াতে না জানে, তবে তারাও কাফের, মুশরিক ও মুনাফেক্বদের মতো এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না; বরং দুনিয়াতে তারা মুসলিম পরিচয়ে বসবাস করলেও তারা এক ধরনের কাফের বলে গণ্য হবে। এটা নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছহীহ হাদীছ ও ইমামগণের ফতওয়া অনুযায়ী প্রমাণিত। অতএব, আল্লাহর পরিচয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখিত ৪টি প্রশ্নের সঠিক উত্তর কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহ থেকে জানলেই যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ।
প্রথম প্রশ্ন : ‘আল্লাহ কে?’
এটা আল্লাহর পরিচয় জানার ক্ষেত্রে একেবারে প্রাথমিক প্রশ্ন এবং সবচেয়ে মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ। সম্পূর্ণ কুরআনের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ আয়াত এই প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট। বলা যেতে পারে, অন্য প্রশ্নগুলো এরই ব্যাখ্যামূলক ও অন্তর্ভুক্ত। এরূপ প্রশ্ন আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার দরজা খুলে দেয়। মক্কার কাফেররাও এ প্রশ্ন করেছিল- انْسُبْ لَنَا رَبَّكَ؟ ‘হে মুহাম্মাদ! আপনি আমাদের নিকট আপনার রবের পরিচয় তুলে ধরুন’। তাদের এ প্রশ্নটিকে আল্লাহ অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করে উত্তর হিসেবে সূরা ‘ইখলাছ’ নাযিল করেছেন।[2] এই সূরাটিকে আল্লাহর পরিচিতির সূরাও বলা হয়।[3] সূরাটি হচ্ছ-قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ۞ اللهُ الصَّمَدُ۞ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ۞ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ ‘বলুন, তিনি আল্লাহ, এক অদ্বিতীয়। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। তার সমকক্ষ কেউ নেই’ (আল-ইখলাছ, ১১২/১-৪)।
এই পরিচয়ের প্রতি ঈমান-বিশ্বাস রাখতে হবে এবং যথাযথভাবে বুঝতে হবে আর আল্লাহর এই পরিচয় অনুযায়ী তাঁকে সম্মান ও মর্যাদা দিতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়, কাফের-মুশরিকরা তো দূরের কথা অধিকাংশ মুসলিম নামধারীরাও এই পরিচয় অনুযায়ী আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ ও মর্যাদা প্রদান করে না। অনেক মুসলিম আল্লাহ এক বিশ্বাস করলেও সর্বক্ষেত্রে এক বিশ্বাস করে না। বিপদাপদ ও বিভিন্ন প্রয়োজনে অন্য মা‘বূদে বিশ্বাসী। পীর-ফক্বীর ও মাযার-কবরে ধর্না দেয় এবং প্রার্থনা করে থাকে। এভাবে সে এগুলোকে আল্লাহর সমকক্ষ বানায়। ইয়াহূদীরা বলে, উযাইর আল্লাহর পুত্র। খ্রিষ্টানরা বলে, যিশুখ্রিষ্ট (ঈসা আলাইহিস সালাম) আল্লাহর পুত্র’। হতভাগা অনেক মুসলিম পরিচয় দানকারীরা বলে, মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর যাতি নূর বা নূর থেকে তৈরি বলে বিশ্বাস ও দাবি করে। এ ধরনের আক্বীদা-বিশ্বাস পোষণকারীরা আল্লাহর পরিচয় নষ্টকারী। সূরা ইখলাছের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণকারী হিসেবে কাফের ও মুরতাদ বলে গণ্য হবে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন : ‘আল্লাহ কোথায়?’
মুসলিম সমাজে এই প্রশ্নের তিন রকম উত্তর শোনা যায়। যেমন :
(ক) কেউ বলে আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান।
(খ) আবার কেউ বলে আল্লাহ মুমিনদের ক্বলবের ভিতর।
(গ) কেউ বলে, আল্লাহ আরশের উপরে রয়েছেন। শেষের বক্তব্যটির ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে সাতটি আয়াত রয়েছে (আল-আ‘রাফ, ৭/৫৪;ইউনুস, ১০/৩; ত্বোহা, ২০/৫; আর-রা‘দ, ১৩/২; আল-ফুরক্বান, ২৫/৫৯; আস-সাজদাহ, ৩২/৪; আল-হাদীদ, ৫৭/৪)।
প্রথম দুটি উত্তর ভারতবর্ষের অধিকাংশ মুসলিম বলে থাকে এবং বিশ্বাস করে। কিন্তু মক্কা মদীনাসহ অধিকাংশ আরব মুসলিমদের উত্তর ও আক্বীদা বিশ্বাস হলো, ‘আল্লাহ উপরে, আসমানে বা আরশের উপরে’। আল্লাহ তদীয় নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, কুরআন, সুন্নাহ, ছাহাবী, তাবেঈ ও আইম্মায়ে মুজতাহিদীন ইমামগণের দৃষ্টিতে সঠিক আক্বীদা-বিশ্বাস এটাই। আল্লাহর উপরে বিদ্যমান থাকার ব্যাপারে এক হাজারের বেশি দলীল রয়েছে।[4]
নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মহিলাকে দাসত্বের শিকলমুক্ত করার জন্য এবং তিনি মুমিনা কি-না এটা যাচাই করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আল্লাহ কোথায়?’ মহিলাটি উত্তরে বলেছিলেন, আল্লাহ আসমানে। আবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি কে? সেই মহিলাটি বলেছিলেন, আপনি আল্লাহর রাসূল। নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মালিককে বলেছিলেন, ‘তুমি একে স্বাধীন করে দাও, নিশ্চয়ই মহিলাটি মুমিনা’।[5]
তৃতীয় প্রশ্ন : ‘আল্লাহ কেমন?’
ভারতবর্ষের মুসলিমদের নিকট এ প্রশ্নের দুইরকম উত্তর শোনা যায় :
(ক) আল্লাহ নিরাকার :
এ আক্বীদা দুই দিক থেকে বাতিল ও ভ্রান্ত। যথা :
(১) হিন্দু ও শিখ ধর্মের সাথে মিলে যায়। এই দুই ধর্মের লোকেরা (ঈশ্বর) আল্লাহকে নিরাকার বিশ্বাস করে।
(২) কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। আল্লাহর যাত ও ছিফাতের যে বর্ণনা কুরআন মাজীদে এবং নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিশাল হাদীছের ভাণ্ডারে পাওয়া যায়, তা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তিনি অবশ্যই নিরাকার নন। আল্লাহকে নিরাকার বলা মানে আল্লাহর সত্তাগত অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। অথচ আল্লাহর সত্তাগত অস্তিত্ব ছাড়া তাঁর প্রভাবগত (স্রষ্টাগত) অস্তিত্বের কল্পনাই করা যায় না। যাঁর সত্তাই নেই, তিনি কীভাবে সৃষ্টি করেন বা করবেন? কুরআনে স্পষ্টভাবে আল্লাহ বলেছেন যে, তিনি কথার মাধ্যমে সৃষ্টি করেন আবার দুই হাত দ্বারাও সৃষ্টি করেন। আল্লাহ বলেন, إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ ‘শুধু এভাবেই তাঁর কাজ সম্পাদিত হয়, যখন তিনি কোনো কিছু করতে ইচ্ছা পোষণ করেন তখন বলেন, হয়ে যাও, আর সাথে সাথে তা হয়ে যায়’ (ইয়াসীন, ৩৬/৮২; অনুরূপ তথ্য রয়েছে : আল-বাক্বারা, ২/১১৭; আলে ইমরান, ৩/৪৭, ৫৯; আল-আনআম, ৬/৭৩; আন-নাহল, ১৬/৪০;মারইয়াম, ১৯/৩৫; গাফির/মুমিন, ৪০/৬৮)।
দুই হাত দ্বারা সৃষ্টি করেছেন আমাদের আদি পিতা আদম আলাইহিস সালাম-কে। মহান আল্লাহ বলেন, يَاإِبْلِيسُ مَا مَنَعَكَ أَنْ تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ ‘হে ইবলীস! তোকে কীসে বাধা দিল ওই ব্যক্তিকে সিজদা করতে যাকে আমি আমার দুই হাত দ্বারা সৃষ্টি করেছি’ (ছোয়াদ, ৩৮/৭৫)। সুতরাং দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে গেল যে, আল্লাহ নিরাকার নন। যে নিরাকার বলবে, সে এক প্রকার নাস্তিক এবং হিন্দু ও শিখ ধর্মের অনুসারী। অতএব বুঝাই যাচ্ছে যে, যেহেতু আল্লাহ নিরাকার নন, তাহলে তার বিপরীতটাই সঠিক হওয়ার কথা। আর তা হচ্ছে তিনি আকারবিশিষ্ট বা সাকার।
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)
[1]. আবূ দাঊদ, হা/৪৭৫৩; তিরমিযী, হা/৩১২০; নাসাঈ, হা/২০৫৭।
[2]. ছহীহ মুসলিম, তিরমিযী, হা/৩৩৬৪; ইবনু কাসীর, ৪/৩৪০।
[3]. ইবনু কাসীর, ৪/৩৪০।
[4]. দেখুন : উসুলুদ্ দ্বীন ইন্দাল ইমাম আবী হানীফাহ, পৃ. ৩১১, টীকা-২; ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রহ.) এই দলীলগুলোকে ২০ প্রকারে ভাগ করেছেন; দেখুন : প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০৮।
[5]. ছহীহ মুসলিম, ৫৩৭/৩৩; আবূ দাঊদ, হা/৯৩০; নাসাঈ, হা/১২১৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩৭৬২।