দুনিয়াতেই বিভিন্ন গুনাহের যে কাফফারার বিধান দেওয়া হয়েছে, তার সারমর্ম করলে দেখা যায় যে, ইসলামে দুটি মাধ্যমে গুনাহের কাফফারা হয়ে থাকে— একটি টাকার মাধ্যমে, আরেকটি ছিয়ামের মাধ্যমে। যেমন- যিহার (الظِّهَار)-এর কাফফারা হলো স্ত্রীকে স্পর্শ করার আগে দাস মুক্ত করা। আমরা সবাই জানি, দাস মুক্ত করতে টাকা লাগে। যদি কেউ অর্থনৈতিক কারণে দাস মুক্ত করতে সক্ষম না হয়, তাহলে তাকে টানা দুই মাস ছিয়াম পালন করতে হবে (আল-মুজাদালাহ, ৫৮/৩–৪)।
উপরিউক্ত সংক্ষিপ্ত উদাহরণে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, পৃথিবীর যেকোনো গুনাহ অত্যধিক দান অথবা অত্যধিক ছিয়ামের মাধ্যমে ক্ষমা পাওয়া সম্ভব। গুনাহ মেটানোর জন্য মহান আল্লাহর নির্ধারিত যে পদ্ধতি রয়েছে, সেই পদ্ধতিতে ছিয়াম অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই ছিয়ামের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সীমাহীন।
পৃথিবীর কোনো কিছুই প্রশিক্ষণ ছাড়া অর্জন করা সম্ভব নয়। আমরা অনেকেই বিভিন্ন গুনাহ ও আসক্তিতে লিপ্ত থাকি। এগুলো থেকে বের হওয়ার বিভিন্ন উপায় খুঁজি। ইসলামে মানুষের বিধি-বিধান মানার ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে শয়তান ও নফসের সাথে যুদ্ধ করার মাধ্যমে। আর এই যুদ্ধে টিকে থাকতে হলে অন্তরের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা খুব জরুরী। আমাদের দ্বারা যত গুনাহ ও আসক্তি হয়, তার মূল কারণই হচ্ছে আমাদের নফসের উপর আমাদের কোনো ক্ষমতা না থাকার কারণে। আমাদের নফস শয়তানের গোলাম আর আমরা নফসের গোলাম। তাই সকল ধরনের সমস্যা থেকে বের হতে সর্বপ্রথম নফসের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জরুরী। নফসকে শয়তানের গোলাম থেকে আল্লাহর গোলামে পরিণত করা উচিত। আর কখনোই এই কাজটি ঘরে বসে আরামে করা সম্ভব নয়, বরং কাজ করা এবং পরিশ্রম করার মাধ্যমেই এটি অর্জিত হবে। আর সেই কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জরুরী কাজ হলো ছালাত। নফসকে মৃত্যু পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের উপর অটল রাখতে পারলে নফস মৃত্যু পর্যন্তই আল্লাহর গোলাম থাকবে। একেক ওয়াক্ত ছালাত শয়তানের বিরুদ্ধে একেকটি যুদ্ধ। ছালাতের পরে দ্বিতীয় যে ইবাদত নফসের উপর বান্দার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করে তা হচ্ছে ছিয়াম, বিশেষ করে রামাযানের ছিয়াম। রামাযানের ছিয়াম মাসব্যাপী একটি ফুল কোর্সের মতো। একটানা ৩০ দিন যদি আমরা আমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে মহান আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বিরত রাখতে পারি, তাহলে আমাদের নিজেদের নফসের উপর নিয়ন্ত্রণ অনেক মযবূতভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, যা পরবর্তীতে আমাদের জন্য দ্বীন পালন করা সহজ করে তুলবে।
মারইয়াম (আ.) যখন নির্জন এলাকা থেকে তার সন্তান ঈসা আলাইহিস সালাম-সহ লোকালয়ে প্রবেশ করলেন, তখন মানুষজন তাকে তার সন্তান বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করছিল। তিনি উত্তরে বলেছিলেন,إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمَنِ صَوْمًا فَلَنْ أُكَلِّمَ الْيَوْمَ إِنْسِيًّا ‘আমি মহান রবের উদ্দেশ্যে ছিয়ামের মানত করেছি। তাই আজকে কোনো মানুষের সাথে কথা বলতে পারব না’ (মারইয়াম, ১৯/২৬)। এই আয়াতে ছিয়াম দ্বারা মারইয়াম (আ.) কথা বলা থেকে বিরত থাকাকে বুঝিয়েছেন তথা তিনি মানুষের প্রশ্নের কোনো উত্তর দিবেন না এবং যা উত্তর দেওয়ার, তার ছেলে ঈসা আলাইহিস সালাম উত্তর দিবে। এই আয়াত প্রমাণ করে যে, ছিয়াম শুধু খাবার থেকে বিরত থাকার নাম নয়; বরং সব ধরনের বিরত থাকার ক্ষেত্রে ছিয়াম শব্দটি আরবী ভাষায় প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।
ছিয়াম পালনের সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে শুধু লজ্জাস্থান ও পেটকে তার প্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখা। এই স্তর পালন করলে ফারযিয়্যাত আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু অতিরিক্ত ফযীলত নির্ভর করবে দ্বিতীয় স্তরের উপর আর সেটাই ছিয়ামের প্রকৃত স্তর, যার মাধ্যমে ছিয়ামের সকল ধরনের ফযীলত পাওয়া যায়। সেই স্তরে পৌঁছতে হলে পেট ও লজ্জাস্থানের পাশাপাশি শরীরের সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে গুনাহ থেকে বিরত রাখতে হবে। মারইয়াম (আ.) যেমন তার জিহ্বা বা মুখের ছিয়াম রেখেছেন, ঠিক তেমনি আমাদেরকেও রামাযান মাসে জিহ্বাকে অপ্রয়োজনীয় কথা ও কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে। আমাদের চোখকে অশ্লীল দৃশ্য থেকে আর কানকে অশ্লীল আওয়াজ তথা গান-বাজনা থেকে বিরত রাখতে হবে। আর ছিয়ামের সর্বোচ্চ স্তর হচ্ছে শুধু বিরত থাকা নয়, বরং গুনাহ থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আল্লাহর আনুগত্যে কাজে লাগানো। যেমন- জিহ্বাকে অপ্রয়োজনীয় কথা ও কাজ থেকে বিরত রাখার পাশাপাশি মহান আল্লাহর যিকিরে ব্যস্ত রাখা।
মহান আল্লাহ আমাদের রামাযানকে সর্বোত্তম অবস্থায় কাটানোর তাওফীক্ব দান করুন! যাবতীয় গুনাহ থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি রাতের ছালাত, কুরআন তেলাওয়াত, দান-ছাদাক্বা, ই‘তিকাফ ও লায়লাতুল ক্বদরে রাত্রি জাগরণসহ বিভিন্ন নেক আমলে পরিপূর্ণ রেখে যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় পালন করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
* ফাযেল, দারুল উলূম দেওবান্দ, ভারত; বিএ (অনার্স), মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব; এমএসসি, ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইউনিভার্সিটি অফ ডান্ডি, যুক্তরাজ্য।
