কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছালাত বনাম প্রচলিত ছালাত (পর্ব-১৫)

আছরের ছালাতের সময় :

আছরের ছালাত দেরী করে পড়ার যে প্রথা সমাজে চালু আছে, তার ছহীহ কোন ভিত্তি নেই। মাযহাবী গোঁড়ামি তাদেরকে ছহীহ হাদীছ হতে বঞ্চিত রেখেছে। মাযহাব তাদেরকে জাল হাদীছ মানতে বাধ্য করেছে। মাযহাব তাদেরকে ছহীহ সুন্নাহ অমান্য করা শিখিয়েছে। কোন বস্তুর ছায়া যখন মূল ছায়ার সমপরিমাণ হবে, তখন আছরের ছালাতের সময় শুরু হবে। আর দ্বিগুণ হলে সময় শেষ হবে। তবে কোন সমস্যার কারণে সূর্য ডুবা পর্যন্ত পড়া যাবে।

أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ قَالَ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّى الْعَصْرَ وَالشَّمْسُ مُرْتَفِعَةٌ حَيَّةٌ فَيَذْهَبُ الذَّاهِبُ إِلَى الْعَوَالِىْ فَيَأْتِيْهِمْ وَالشَّمْسُ مُرْتَفِعَةٌ وَبَعْضُ الْعَوَالِىْ مِنَ الْمَدِيْنَةِ عَلَى أَرْبَعَةِ أَمْيَالٍ أَوْ نَحْوِهِ.

আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আছরের ছালাত তখন পড়তেন, যখন সূর্য উপরে উজ্জ্বল অবস্থায় থাকত। অতঃপর কেউ ‘আওয়ালী অঞ্চল’-এর দিকে যেত এবং সেখানে পৌঁছত; তখনও সূর্য উপরেই থাকত। আর ‘আওয়ালী অঞ্চল’-এর কোন কোন স্থান মদীনা হতে চার মাইল বা অনুরূপ দূরে অবস্থিত।[1] অত্র হাদীছে অনুমান করা যায়, আছরের ছালাত সাড়ে ৩টা অথবা ৪টার সময় হতে পারে।

عَنْ رَافِعِ بْنِ خَدِيْجٍ قَالَ كُنَّا نُصَلِّى مَعَ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْعَصْرَ فَنَنْحَرُ جَزُوْرًا فَتُقْسَمُ عَشْرَ قِسَمٍ فَنَأْكُلُ لَحْمًا نَضِيْجًا قَبْلَ أَنْ تَغْرُبَ الشَّمْسُ.

রাফে‘ ইবনে খাদীজ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আছরের ছালাত আদায় করতাম, অতঃপর একটি উট যবেহ করতাম। তারপর তাকে ১০ ভাগে ভাগ করতাম। অতঃপর সূর্যাস্তে যাওয়ার পূর্বেই আমরা তা পাক করে খেতাম।[2]

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ تِلْكَ صَلَاةُ الْمُنَافِقِ يَجْلِسُ يَرْقُبُ الشَّمْسَ حَتَّى إِذَا كَانَتْ بَيْنَ قَرْنَىِ الشَّيْطَانِ قَامَ فَنَقَرَهَا أَرْبَعًا لَا يَذْكُرُ اللهَ فِيْهَا إِلَّا قَلِيْلًا.

আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ঐ ছালাত মুনাফিক্বের, যে বসে বসে সূর্যের অপেক্ষা করে যতক্ষণ না তা হলদে হয়ে যায় এবং শয়তানের দুই শিং-এর মাঝখানে আসে। এমন সময় উঠে চারটি ঠোকর মারে। এতে আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করা হয়।[3]

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَمَّنِي جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَام عِنْدَ الْبَيْتِ مَرَّتَيْنِ، فَصَلَّى بِيَ الظُّهْرَ حِينَ زَالَتِ الشَّمْسُ وَكَانَتْ قَدْرَ الشِّرَاكِ، وَصَلَّى بِيَ الْعَصْرَ حِينَ كَانَ ظِلُّهُ مِثْلَهُ، وَصَلَّى بِيَ يَعْنِي الْمَغْرِبَ حِينَ أَفْطَرَ الصَّائِمُ، وَصَلَّى بِيَ الْعِشَاءَ حِينَ غَابَ الشَّفَقُ، وَصَلَّى بِيَ الْفَجْرَ حِينَ حَرُمَ الطَّعَامُ وَالشَّرَابُ عَلَى الصَّائِمِ، فَلَمَّا كَانَ الْغَدُ صَلَّى بِيَ الظُّهْرَ حِينَ كَانَ ظِلُّهُ مِثْلَهُ، وَصَلَّى بِي الْعَصْرَ حِينَ كَانَ ظِلُّهُ مِثْلَيْهِ، وَصَلَّى بِيَ الْمَغْرِبَ حِينَ أَفْطَرَ الصَّائِمُ، وَصَلَّى بِيَ الْعِشَاءَ إِلَى ثُلُثِ اللَّيْلِ، وَصَلَّى بِيَ الْفَجْرَ فَأَسْفَرَ» ثُمَّ الْتَفَتَ إِلَيَّ فَقَالَ: «يَا مُحَمَّدُ، هَذَا وَقْتُ الْأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِكَ، وَالْوَقْتُ مَا بَيْنَ هَذَيْنِ الْوَقْتَيْنِ»

ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘জিবরীল আলাইহিস সালাম কা‘বার নিকট দু’বার আমার ইমামতি করেছেন। একবার তিনি আমাকে যোহর পড়ালেন যখনই সূর্য ঢলে পড়ল। আর তা ছিল সেন্ডেলের ফিতা পরিমাণ সামান্য। আর তিনি আছর পড়ালেন যখন প্রত্যেক বস্তুর ছায়া তার সমান হল। মাগরিব পড়ালেন যখন ছায়েম ইফতার করে। আর এশা পড়ালেন যখন লালিমা দূর হল। ফজর পড়ালেন যখন ছায়েমের উপর খানাপিনা হারাম হল। পরের দিন তিনি আমাকে যোহর পড়ালেন যখন প্রত্যেক বস্তুর ছায়া তার একগুণ হল। আর আছর পড়ালেন যখন প্রত্যক বস্তুর ছায়া তার দ্বিগুণ হল। মাগরিব পড়ালেন যখন প্রত্যেক ছায়েম ব্যক্তি ইফতার করে। এশা পড়ালেন যখন রাতের এক-তৃতীয়াংশ পার হল। অবশেষে ফজর পড়ালেন এবং ফর্সা করে ফেললেন। অতঃপর জিবরীল আলাইহিস সালাম আমার প্রতি লক্ষ্য করে বললেন, ‘হে মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! ইহা আপনার পূর্বের নবীগণের ছালাতের সময়। ছালাতের সময় আসলে এই দুই সময়ের মাঝের সময়’।[4] অন্য হাদীছে এসেছে, সবচেয়ে উত্তম আমল হল প্রথম সময়ে ছালাত আদায় করা। অত্র হাদীছে আল্লাহ তা‘আলা জিবরীল আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে আমাদের নবীকে ছালাতের প্রথম এবং শেষ সময় অবহিত করেছেন এবং রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সবচেয়ে উত্তম আমল হল ছালাতকে তার প্রথম সময়ে আদায় করা’।

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ مَا صَلَّى رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَاةً لِوَقْتِهَا الآخِرِ مَرَّتَيْنِ حَتَّى قَبَضَهُ اللهُ.

আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যু পর্যন্ত শেষ সময়ে দ্বিতীয়বার কোন ছালাত আদায় করেননি।[5] অত্র হাদীছ প্রমাণ করে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার মাত্র জিবরীলের সাথে ছালাতের শেষ সময়ে ছালাত আদায় করেছেন। আর হানাফী মাযহাবের লোকেরা সারা জীবন ছালাত আদায় করছেন ছালাতের শেষ সময়ে।

عَنِ الْعَلَاءِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ أَنَّهُ دَخَلَ عَلَى أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ فِىْ دَارِهِ بِالْبَصْرَةِ حِيْنَ انْصَرَفَ مِنَ الظُّهْرِ وَدَارُهُ بِجَنْبِ الْمَسْجِدِ فَلَمَّا دَخَلْنَا عَلَيْهِ قَالَ أَصَلَّيْتُمُ الْعَصْرَ فَقُلْنَا لَهُ إِنَّمَا انْصَرَفْنَا السَّاعَةَ مِنَ الظُّهْرِ قَالَ فَصَلُّوْا الْعَصْرَ فَقُمْنَا فَصَلَّيْنَا فَلَمَّا انْصَرَفْنَا قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ تِلْكَ صَلَاةُ الْمُنَافِقِ يَجْلِسُ يَرْقُبُ الشَّمْسَ حَتَّى إِذَا كَانَتْ بَيْنَ قَرْنَىِ الشَّيْطَانِ قَامَ فَنَقَرَهَا أَرْبَعًا لَا يَذْكُرُ اللهَ فِيْهَا إِلَّا قَلِيْلًا.

আলা ইবনে আব্দুর রহমান একদিন বাছরাতে যোহরের ছালাত আদায় করে ফেরার সময় আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাড়ীতে গেলেন। আর মসজিদের পার্শ্বেই তাঁর বাড়ী ছিল। রাবী বলেন, আমরা যখন তাঁর কাছে গেলাম তখন তিনি বললেন, তোমরা কি আছরের ছালাত আদায় করেছ? আমরা বললাম, এইমাত্র যোহরের ছালাত আদায় করে আসলাম। তিনি বললেন, তোমরা আছরের ছালাত আদায় করে নাও। অতঃপর আমরা চলে গেলাম এবং ছালাত আদায় করলাম। আমরা যখন ফিরে আসলাম, তখন তিনি বললেন, এটা হল মুনাফিক্বের ছালাত, সে বসে বসে অপেক্ষায় থাকে যখন সূর্য লাল হতে থাকে, এমনকি শয়তানের দুই শিংয়ের মাঝে যায়, তখন সে দাঁড়ায় এবং চারটি ঠোকর মারে। সে আল্লাহকে খুব সামান্যই স্মরণ করে।[6]

যারা আজ দল ও মাযহাবের কারণে ছহীহ হাদীছের উপর আমল করা থেকে বিরত থাকছে, তাদের ক্বিয়ামতের মাঠে কী হবে? তারা কি ক্বিয়ামতের মাঠে তাদের সাহায্য পাবে, যারা মাযহাবের দোহাই দিয়ে জাল ও যঈফ হাদীছের আশ্রয় নিয়ে আমল করছে? তাদের অবস্থা কী হবে?

আসুন! এবার আমরা আছরের ছালাত দেরী করে পড়ার পক্ষের কয়েকটি হাদীছ এবং সেগুলির পর্যালোচনা দেখি।

عَبْدُ الْوَاحِدِ بْنُ نَافِعٍ قَالَ دَخَلْتُ مَسْجِدَ الْمَدِيْنَةِ فَأَذَّنَ مُؤَذِّنٌ بِالْعَصْرِ قَالَ وَشَيْخٌ جَالِسٌ فَلَامَهُ وَقَالَ إِنَّ أَبِىْ أَخْبَرَنِىْ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَأْمُرُ بِتَأْخِيْرِ هَذِهِ الصَّلَاةِ.

আব্দুল ওয়াহেদ ইবনে নাফে‘ বলেন, আমি একদা মসজিদে প্রবেশ করলাম, তখন মুআযযিন আছরের আযান দিল। রাবী বলেন, তখন এক বৃদ্ধ মসজিদে বসে ছিলেন। মুআযযিন তার নিকটে আসল। তখন তিনি বললেন, আমার আববা আমাকে বলেছেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আছরের ছালাত দেরী করে পড়ার নির্দেশ দিতেন।[7] হাদীছটি যঈফ।[8]

عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: أَنَّهُ كَتَبَ إِلَى عُمَّالِهِ إِنَّ أَهَمَّ أُمُورِكُمْ عِنْدِي الصَّلَاة فَمن حَفِظَهَا وَحَافَظَ عَلَيْهَا حَفِظَ دِينَهُ وَمَنْ ضَيَّعَهَا فَهُوَ لِمَا سِوَاهَا أَضْيَعُ ثُمَّ كَتَبَ أَنْ صلوا الظّهْر إِذا كَانَ الْفَيْءُ ذِرَاعًا إِلَى أَنْ يَكُونَ ظِلُّ أَحَدِكُمْ مِثْلَهُ وَالْعَصْرَ وَالشَّمْسُ مُرْتَفِعَةٌ بَيْضَاءُ نَقِيَّةٌ قَدْرَ مَا يَسِيرُ الرَّاكِبُ فَرْسَخَيْنِ أَوْ ثَلَاثَةً قبل مغيب الشَّمْس وَالْمغْرب إِذا غربت الشَّمْسُ وَالْعِشَاءَ إِذَا غَابَ الشَّفَقُ إِلَى ثُلُثِ اللَّيْلِ فَمَنْ نَامَ فَلَا نَامَتْ عَيْنُهُ فَمَنْ نَامَ فَلَا نَامَتْ عَيْنُهُ فَمَنْ نَامَ فَلَا نَامَتْ عَيْنُهُ وَالصُّبْحَ وَالنُّجُومُ بَادِيَةٌ مُشْتَبِكَةٌ.

ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি একদা প্রশাসকদের নিকটে পত্র লিখলেন যে, আমার নিকট আপনাদের সমস্ত কাজের মধ্যে ছালাতই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি তা হেফাযত করে এবং যথাযথভাবে এর উপর অটল থাকে, সে তার দ্বীনকে রক্ষা করে। আর যে তাকে বিনষ্ট করে, সে তা ব্যতীত অন্যগুলোকে আরো অধিক বিনষ্টকারী। অতঃপর তিনি লিখলেন, যখন ছায়া একহাত হবে, তোমরা যোহরের ছালাত আদায় করবে তোমাদের প্রত্যেকের ছায়া তার সমান হওয়া পর্যন্ত। আছর আদায় করবে যখন সূর্য উঠে পরিষ্কার সাদা অবস্থায় থাকবে। যাতে একজন ভ্রমণকারী ব্যক্তি সূর্য অদৃশ্য হবার পূর্বেই দুই বা তিন মাইল অতিক্রম করতে পারে। যখনই সূর্য ডুবে যাবে মাগরিবের ছালাত আদায় করবে। এশার ছালাত আদায় করবে লালিমা দূর হয়ে যাবার পর থেকে শুরু করে রাতের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত। যে এর পূর্বে ঘুমাবে, তার চোখ না ঘুমাক। একথা তিনি তিনবার লিখেছিলেন। আর ফজর আদায় করবে যখন তারকারাজি পরিষ্কার হয় এবং চকমক করে।[9] এই হাদীছটি যঈফ এবং ছহীহ হাদীছের বিরোধী। এ হাদীছে আছরের ছালাত আদায়ের পর দুই মাইল যাওয়ার কথা আছে। আর ছহীহ হাদীছে চার মাইল যাওয়ার কথা আছে।[10]

عَنْ زِيَادِ بْنِ عَبْدِ اللهِ النَّخَعِىِّ قَالَ كُنَّا جُلُوْسًا مَعَ عَلِىٍّ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ فِى الْمَسْجِدِ الأَعْظَمِ وَالْكُوْفَةُ يَوْمَئِذٍ أَخْصَاصٌ فَجَاءَهُ الْمُؤَذِّنُ فَقَالَ الصَّلَاةُ يَا أَمِيْرَ الْمُؤْمِنِيْنَ لِلْعَصْرِ فَقَالَ اجْلِسْ فَجَلَسَ ثُمَّ عَادَ فَقَالَ ذَلِكَ فَقَالَ عَلِىٌّ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ هَذَا الْكَلْبُ يُعَلِّمُنَا بِالسُّنَّةِ فَقَامَ عَلِىٌّ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ فَصَلَّى بِنَا الْعَصْرَ ثُمَّ انْصَرَفْنَا فَرَجَعْنَا إِلَى الْمَكَانِ الَّذِىْ كُنَّا فِيْهِ جُلُوْسًا فَجَثَوْنَا لِلرُّكَبِ لِنُزُوْلِ الشَّمْسِ لِلْمَغِيْبِ نَتَرَاءَاهَا.

যিয়াদ ইবনে আব্দুল্লাহ নাখাঈ বলেন, আমরা একদা আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে বড় মসজিদে বসেছিলাম। কূফাতে সে সময় অনেক কুঁড়ে ঘর ছিল। অতঃপর মুআযযিন এসে বলল, হে আমীরুল মুমিনীন! আছরের ছালাত আদায় করতে হবে। তিনি বললেন, তুমি বস। তাই সে বসল। মুআযযিন ফিরে এসে একই কথা বলল। তখন আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, এই কুকুরটি আমাদেরকে সুন্নাত শিক্ষা দিতে চাচ্ছে। অতঃপর তিনি দাঁড়ালেন এবং আমাদেরকে নিয়ে আছরের ছালাত আদায় করলেন। তারপর ছালাত থেকে ফিরে ঐ স্থানে ফিরে আসলাম যেখানে আমরা বসে ছিলাম। অতঃপর সূর্য ডুবে যাওয়ার কারণে আমরা সওয়ারীর উপরে হাঁটু গেড়ে বসে গেলাম, সূর্য ডুবার অপেক্ষায়।[11] হাদীছটি যঈফ।[12]

عَبْدُ الرَّزَّاقِ، عَنِ الثَّوْرِيِّ، عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ يَزِيدَ، أَنَّ ابْنَ مَسْعُودٍ: «كَانَ يُؤَخِّرُ الْعَصْرَ»

ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আছরের ছালাত দেরী করে আদায় করতেন।[13] বর্ণনাটি যঈফ।[14]

ইয়াযীদ ইবনে আব্দুর রহমান তাঁর পিতা থেকে দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন যে,قَدِمْنَا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ فَكَانَ يُؤَخِّرُ الْعَصْرَ مَا دَامَتْ الشَّمْسُ بَيْضَاءَ نَقِيَّةً ‘আমরা মদীনায় রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলাম। তিনি সূর্য সাদা ও পরিষ্কার থাকা পর্যন্ত আছরের ছালাত দেরী করতেন’।[15] হাদীছটি যঈফ।[16]

قَالَ أَبُوْ عَمْرٍو يَعْنِى الأَوْزَاعِىَّ وَذَلِكَ أَنْ تَرَى مَا عَلَى الأَرْضِ مِنَ الشَّمْسِ صَفْرَاءَ.

আবু আমর বলেন, আছরের ছালাতের ঐ সময়টা হল যখন সূর্যের আলো যমীনে হলুদ আকারে পড়বে।[17] হাদীছটি যঈফ।[18]

দ্বীনি মুসলিম ভাই-বোন! আছরের ছালাত দেরী করে পড়ার প্রমাণে দেখানো হল কিছু জাল ও যঈফ হাদীছ। এগুলোকে পুঁজি করে এক শ্রেণীর নামধারী আলেম সহজ-সরল মুমিন পুরুষ-নারীকে হাদীছের নামে প্রতারণা করে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ আছরের ছালাত তার প্রথম সময়ে আদায় করতে হবে তার প্রমাণে কত ছহীহ হাদীছ রয়েছে। যার কিছু হাদীছ আমরা পেশ করেছি। আমরা আরো অবগত হয়েছি যে, সবচেয়ে উত্তম আমল হল, ছালাত তার প্রথম সময়ে আদায় করা। আরো অধিক অবগত হয়েছি যে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সারা জীবনে একদিন মাত্র জিবরীল (আঃ)-এর সাথে ছালাতের শেষ সময়ে ছালাত আদায় করেছেন।

মাগরিবের সময় :

মাগরিবের ছালাতের সময় শুরু হয় সূর্য ডুবার সাথে সাথেই। আর সূর্যের লালিমা থাকা পর্যন্ত এর সময় অবশিষ্ট থাকে।

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ ...وَوَقْتُ صَلاَةِ الْمَغْرِبِ مَا لَمْ يَغِبِ الشَّفَقُ...

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘...আর মাগরিবের সময় হচ্ছে সূর্য ডুবার পর থেকে লালিমা অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত...’।[19] তবে মাগরিবের আযানের পরেও দু’রাক‘আত সুন্নাত পড়া যায়, বরং পড়া ভাল।[20]

মাগরিবের ছালাতের সময় সম্পর্কেও জাল ও যঈফ হাদীছ রয়েছে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মাগরিবের প্রথম সময় হল যখন সূর্য ডুবে যায়’।[21] বর্ণনাটি জাল।[22] রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করা হয়েছে যে, মাগরিবের শেষ সময় হল দিগন্তে যখন কালো রেখা দেখা যাবে।[23] বর্ণনাটি জাল।[24]

এশার ছালাতের সময় :

মাগরিবের ছালাতের সময়ের পর থেকে এশার ওয়াক্ত শুরু হয় এবং মধ্যরাত পর্যন্ত থাকে। কোন কারণে ফজর পর্যন্ত পড়া যাবে। তবে এশার ছালাত দেরী করে পড়া উত্তম।

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِىْ لأَمَرْتُهُمْ أَنْ يُؤَخِّرُوا الْعِشَاءَ إِلَى ثُلُثِ اللَّيْلِ أَوْ نِصْفِهِ.

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর হবে মনে না করলে তাদেরকে এশার ছালাত রাতের এক-তৃতীয়াংশ অথবা অর্ধ-রাত পর্যন্ত দেরী করে পড়ার নির্দেশ দিতাম’।[25]

আউয়াল ওয়াক্তে ছালাত আদায়ের গুরুত্ব ও ফযীলত:

দেরী নয়, বরং ওয়াক্ত হওয়ার সাথে সাথেই ছালাত আদায় করতে হবে। বিশেষ করে ফজর ও আছরের ছালাতে কোন ছাড় নেই। একাকী হলেও নির্ধারিত সময়ে ছালাত আদায় করতে হবে।

عَنْ أَبِىْ ذَرٍّ قَالَ قَالَ لِىْ رَسُوْلُ اللهِ كَيْفَ أَنْتَ إِذَا كَانَتْ عَلَيْكَ أُمَرَاءُ يُؤَخِّرُوْنَ الصَّلَاةَ عَنْ وَقْتِهَا أَوْ يُمِيْتُوْنَ الصَّلَاةَ عَنْ وَقْتِهَا قَالَ قُلْتُ فَمَا تَأْمُرُنِىْ قَالَ صَلِّ الصَّلَاةَ لِوَقْتِهَا فَإِنْ أَدْرَكْتَهَا مَعَهُمْ فَصَلِّ فَإِنَّهَا لَكَ نَافِلَةٌ.

আবু যার রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেন, তোমার আমীরগণ যখন ছালাতের ওয়াক্ত থেকে সরিয়ে ছালাত দেরী করে পড়বে বা ছালাতকে তার ওয়াক্ত থেকে মেরে ফেলবে, তখন তুমি কী করবে? আমি তখন বললাম, আমাকে আপনি কী নির্দেশ দিচ্ছেন? তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ছালাতের সময়েই ছালাত আদায় করে নাও। অতঃপর তাদের সাথে যদি আদায় করতে পার, তাহলে আদায় কর। তবে তা তোমার জন্য নফল হবে।[26] 

উক্ত হাদীছে প্রমাণিত হয়, নেতারা সময়মত ছালাত আদায় নাও করতে পারে। এমন সময়ে একাই নির্ধারিত সময়েই ছালাত আদায় করতে হবে; জামা‘আতের অপেক্ষা করা যাবে না।

عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ يَعْجَبُ رَبُّكَ مِنْ رَاعِى غَنَمٍ فِىْ رَأْسِ شَظِيَّةِ الْجَبَلِ يُؤَذِّنُ بِالصَّلَاةِ وَيُصَلِّى فَيَقُوْلُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ انْظُرُوْا إِلَى عَبْدِىْ هَذَا يُؤَذِّنُ وَيُقِيْمُ الصَّلَاةَ يَخَافُ مِنِّىْ قَدْ غَفَرْتُ لِعَبْدِىْ وَأَدْخَلْتُهُ الْجَنَّةَ.

উক্ববা ইবনু আমের রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমার প্রতিপালক খুশি হন সেই ছাগলের রাখালের প্রতি, যে একা পর্বতশিখরে দাঁড়িয়ে ছালাতের আযান দেয় এবং ছালাত আদায় করে। তখন আল্লাহ ফেরেশতাগণকে ডেকে বলেন, তোমরা আমার এই বান্দাকে দেখ? সে আযান দেয় ও ছালাত ক্বায়েম করে এবং আমাকে ভয় করে। (তোমরা সাক্ষী থাক) আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম এবং জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিলাম’।[27] উম্মু ফারওয়া রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত অন্য এক হাদীছে এসেছে, سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَيُّ الْأَعْمَالِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: الصَّلَاةُ فِي أَوَّلِ وَقْتِهَا ‘রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হল, সর্বোত্তম আমল কোন্টি? তিনি বললেন, আউয়াল ওয়াক্তে ছালাত আদায়’।[28] এসব হাদীছে আউয়াল ওয়াক্তে ছালাত আদায়ের গুরুত্ব ও ফযীলত প্রমাণিত হয়।

(চলবে)


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫০; ছহীহ মুসলিম, হা/৬২১; মিশকাত, হা/৫৯২; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৫৪৪।

[2]. ছহীহ বুখারী হা/২৪৮৫; ছহীহ মুসলিম হা/৬২৫; মিশকাত হা/৬১৫; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৫৬৬।

[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৪৩; মিশকাত, হা/৫৯৩; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৫৪৫।

[4]. আবুদাঊদ, হা/৩৯৩; তিরমিযী, হা/১৪৯; মিশকাত, হা/৫৮৩; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৫৩৬।

[5]. তিরমিযী, হা/১৭৪; মিশকাত, হা/৬০৮।

[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬২২।

[7]. দারাকুৎনী, হা/১০০৩।

[8]. তুহফাতুল আহওয়াযী, ১/৪২০ পৃঃ।

[9]. মুওয়াত্ত্বা মালেক, হা/৬; মিশকাত, হা/৫৮৫; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৫৩৮।

[10]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫০; মিশকাত, হা/৫৯২।

[11]. মুসতাদরাক হাকেম, হা/৬৯০।

[12]. দারাকুৎনী, ৩/৯৭ পৃঃ।

[13]. আব্দুর রাযযাক, হা/২০৮৯।

[14]. তুহ্ফাতুল আহওয়াযী, ১/৪১৮ পৃঃ।

[15]. আবুদাঊদ, হা/৪০৮।

[16]. যঈফ আবুদাঊদ, হা/৩৪৫।

[17]. আবুদাঊদ, হা/৪১৫।

[18]. যঈফ আবুদাঊদ, হা/৩৫১।

[19]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬১২; মিশকাত, হা/৫৮১; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৫৩৪।

[20]. ছহীহ বুখারী, হা/৬২৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৩৮; মিশকাত, হা/৬৬২; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৬১১।

[21]. যায়লাঈ, ১/২৩০ পৃঃ।

[22]. তানক্বীহ, পৃঃ ২৬৭।

[23]. নাছবুর রায়াহ, ১/২৩৪ পৃঃ।

[24]. তানক্বীহুল কালাম, পৃঃ ২৬৭ ।

[25]. তিরমিযী, হা/১৬৭; ইবনে মাজাহ, হা/৬৯১; মিশকাত, হা/৬১১।

[26]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৪৮; মিশকাত, হা/৬০০; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৫৫২।

[27]. আবুদাউদ, হা/১২০৩; নাসাঈ, হা/৬৬৬; মিশকাত, হা/৬৬৫; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৬১৪।

[28]. আবুদাউদ, হা/৪২৬; তিরমিযী, হা/১৭০।

Magazine