কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ঈমানের শাখা (পর্ব-৪)

(১৬) কুরআন মাজীদের সম্মান করা। নিজে শিক্ষা অর্জন করা এবং অপরকে শিক্ষাদান করা। এর মধ্যকার হুদূদ, হুকুম-আহকাম হিফয করা, তার মধ্যকার হারাম-হালাল বিষয়াদি শেখা এবং আমল করা। এর ধারক-বাহকদের সম্মান করা, এর মধ্যে যে মহান আল্লাহ জাহান্নামের শাস্তি উল্লেখ্য করেছেন, তার ভয়ে ক্রন্দন করা এবং জান্নাত লাভের জন্য সৎ আমল করা :

মহান আল্লাহ বলেন,لَوْ أَنْزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُتَصَدِّعًا مِنْ خَشْيَةِ اللهِ ‘যদি আমি এই কুরআন পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি দেখতে যে, ওটা আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ হয়ে গেছে’ (হাশর, ৫৯/২১)। মহান আল্লাহ আরো বলেন,إِنَّهُ لَقُرْآنٌ كَرِيْمٌ- فِيْ كِتَابٍ مَكْنُوْنٍ- لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُوْنَ – تَنْزِيْلٌ مِنْ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ ‘নিশ্চয় এটা সম্মানিত কুরআন, যা আছে সুরক্ষিত কিতাবে, পূত-পবিত্ররা ব্যতীত অন্য কেউ তা স্পর্শ করে না। এটা জগৎসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ’ (ওয়াক্বি‘আহ, ৫৬/৭৭-৮০)

কুরআন আল্লাহ্র কালাম। আল্লাহ্র পক্ষ থেকে মানবজাতির হেদায়াতের জন্য রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর জিবরীল আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। এতে মানবজাতির জন্য ইহকালে ও পরকালে কল্যাণের পথ এবং নে‘মতরাজি বর্ণিত হয়েছে। এটি মানুষকে অন্ধকারের পথ থেকে আলোর পথে নিয়ে আসে। এর মধ্য মানবজাতির জীবনের চলার পথ নিহিত রয়েছে। অতএব কুরআন পড়তে হবে, বুঝতে হবে, নিজে শিক্ষা অর্জন করে অপরকে শিক্ষা দিতে হবে। এর মধ্যকার হুকুম-আহকাম, হালাল-হারাম, সকল বিষয় বুঝে-শুনে আমল করতে হবে। কারণ এর মধ্যেই উভয় জীবনের কল্যাণ নিহিত রয়েছে।[1] অতএব কুরআনের উপর বিশ্বাস করে, আল্লাহ্র উপর ঈমান এনে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ করে, সালাফে ছালেহীনের পথ অনুসরণের মাধ্যমে উভয় জীবন সুখময় করতে হবে। এছাড়া নাফরমানী করলে কঠিন শাস্তি আস্বাদন করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,وَلَوْ أَنَّ قُرْآنًا سُيِّرَتْ بِهِ الْجِبَالُ أَوْ قُطِّعَتْ بِهِ الْأَرْضُ أَوْ كُلِّمَ بِهِ الْمَوْتَى بَلْ لِلَّهِ الْأَمْرُ جَمِيْعًا أَفَلَمْ يَيْأَسِ الَّذِيْنَ آمَنُوْا ‘যদি কোন কুরআন এমন হত, যার দ্বারা পর্বতকে গতিশীল করা যেত অথবা পৃথিবীকে বিদীর্ণ করা যেত অথবা মৃতের সাথে কথা বলা যেত, তবুও তারা তাতে বিশ্বাস করত না’ (রা‘দ, ১৩/৩১)

ওছমান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ ‘তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম, যে কুরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়’।[2] আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,تَعَاهَدُوْا الْقُرْآنَ فَوَالَّذِىْ نَفْسِى بِيَدِهِ لَهُوَ أَشَدُّ تَفَصِّيًا مِنَ الْإِبِلِ فِىْ عُقُلِهَا ‘তোমরা কুরআনের প্রতি লক্ষ্য রাখবে (নিয়মিত তেলাওয়াত করবে)। আল্লাহ্র কসম! যার হাতে আমার জীবন, কুরআন বাঁধন ছাড়া উটের চেয়েও দ্রুত গতিতে দৌঁড়ে যায়’।[3]

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,لَا تَحَاسُدَ إِلَّا فِىْ اِثْنَتَيْنِ رَجُلٌ آتَاهُ اللهُ الْقُرْآنَ فَهْوَ يَتْلُوْهُ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ فَهْوَ يَقُوْلُ لَوْ أُوْتِيْتُ مِثْلَ مَا أُوْتِىَ هَذَا لَفَعَلْتُ كَمَا يَفْعَلُ وَرَجُلٌ آتَاهُ اللهُ مَالًا فَهْوَ يُنْفِقُهُ فِىْ حَقِّهِ فَيَقُوْلُ لَوْ أُوتِيْتُ مِثْلَ مَا أُوْتِىَ عَمِلْتُ فِيْهِ مِثْلَ مَا يَعْمَلُ ‘দু’টি বিষয় ব্যতীত হিংসা করা যায় না। এক ব্যক্তি হচ্ছে আল্লাহ যাকে কুরআন দান করেছেন, আর সে দিনরাত তা তেলাওয়াত করে। (পড়ে ও বুঝে-শুনে সে অনুযায়ী আমল করে)। অন্য লোকটি বলে, এ লোকটিকে যা দেয়া হয়েছে, আমাকে যদি তেমন দেয়া হত, তাহলে আমিও তেমন করতাম, সে যেমন করছে। আরেক লোক হচ্ছে সে, যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দিয়েছেন। ফলে সে তা যথাযথভাবে ব্যয় করছে। তখন অন্য লোক বলে, একে যা দেয়া হয়েছে, আমাকেও যদি তেমন দেয়া হত, আমিও তাই করতাম, যা সে করছে’।[4]

নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,لَا حَسَدَ إِلَّا فِى اثْنَتَيْنِ رَجُلٌ آتَاهُ اللهُ الْقُرْآنَ فَهْوَ يَتْلُوْهُ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ وَرَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ مَالاً فَهْوَ يُنْفِقُهُ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ ‘একমাত্র দু’টি বিষয়েই হিংসা করা যায়। একজন হচ্ছে, যাকে আল্লাহ কুরআন দান করেছেন, আর সে তা রাতদিন তেলাওয়াত করে। আরেক জন হল, যাকে আল্লাহ সম্পদ দিযেছেন আর সে রাতদিন তা ব্যয় করে’।[5] রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র বলেন,إِنَّ اللهَ يَرْفَعُ بِهَذَا الْكِتَابِ أَقْوَامًا وَيَضَعُ بِهِ آخَرِيْنَ ‘এই কুরআন দ্বারাই মহান আল্লাহ এক জাতির মান-সম্মান বাড়িয়ে উপরে উঠিয়ে দেন এবং এর দ্বারাই অন্য জাতির মান-সম্মান কমিয়ে নীচে নামিয়ে দেন’।[6]

(১৭) পবিত্রতা অর্জন করা :

মহান আল্লাহ বলেন, وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ ‘তোমার পোশাক পবিত্র রাখ’ (মুদ্দাছছির, ৭৪/৪)। এখানে পোশাক বলতে উদ্দেশ্য হতে পারে, ব্যক্তি তার সমস্ত আমলই খালেছ নিয়্যতে পবিত্রতার সাথে পালন করবে। এর পরিপূর্ণতা হল, মানবজাতি সমস্ত বাতিল আমল ও ফাসাদকারী আমল থেকে নিজের অন্তরকে পরিষ্কার রাখবে এবং পবিত্র রাখবে। ইসলাম ধ্বংসকারী শিরকী কাজকর্ম, নিফাক্বী ও লোক দেখানো আমল করা থেকে অন্তরকে পবিত্র রাখবে। গৌরব, অহংকার এবং গাফেলতী থেকে দূরে থাকবে। আরো বেঁচে থাকবে ঐ সকল কাজকর্ম থেকে, যে কর্মগুলো বান্দাকে মহান আল্লাহ্র ইবাদত করা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। পরিধানের কাপড় পবিত্র রাখবে। বিশেষ করে ছালাত আদায়ের পূর্বে। কারণ ছালাতের পূর্বশর্ত হল, শরীর বা কাপড় পবিত্র করা। পবিত্রতা বলতে আরো বলা যায়, মানবজাতি শারঈ ওযূর মাধ্যমে অর্জন করবে। আর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল প্রকার নাপাকী থেকে নিজেকে পবিত্র রাখবে।[7]

মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّ اللهَ يُحِبُّ التَّوَّابِيْنَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِيْنَ ‘নিশ্চয় আল্লাহ (অন্তর থেকে খালেছ নিয়তে) তওবাকারী ও (দৈহিকভাবে) পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালবাসেন’ (বাক্বারাহ, ২/২২২)। অন্যত্র তিনি বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوْا وُجُوْهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوْا بِرُءُوْسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ ‘হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা ছালাতের জন্য প্রস্তুত হও, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় কনুই পর্যন্ত ধৌত কর এবং তোমাদের মাথা মাসাহ কর ও পদযুগল টাখনু পর্যন্ত ধৌত কর’ (মায়েদহ,া ৫/৬)। আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,لَا تُقْبَلُ صَلَاةٌ بِغَيْرِ طُهُوْرٍ وَلَا صَدَقَةٌ مِنْ غُلُوْلٍ ‘পবিত্রতা অর্জন ব্যতীত কারো ছালাত কবুল হয় না এবং হারাম মালের ছাদাক্বাহ কবুল হয় না’।[8]

(১৮) পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করা :

মহান আল্লাহ বলেন, وَمَا كَانَ اللهُ لِيُضِيْعَ إِيمَانَكُمْ ‘এবং আল্লাহ এরূপ নন যে, তোমাদের ঈমান (ছালাত) বিনষ্ট করবেন’ (বাক্বারাহ, ২/১৪৩)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, وَأَقِيْمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ ‘তোমরা ছালাত প্রতিষ্ঠা কর ও যাকাত প্রদান কর’ (বাক্বারাহ, ২/৪৩)। অতএব, হে মানবজাতি! নির্দিষ্ট সময়ে তোমরা ছালাত আদায় কর। মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ كِتَابًا مَوْقُوْتًا ‘নিশ্চয় ছালাত বিশ্বাসীগণের উপর নির্দিষ্ট সময়ে আদায়ের জন্য নির্ধারিত হয়েছে’ (নিসা, ৪/১০৩)। অন্যত্র তিনি বলেন, وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي ‘আর তুমি ছালাত ক্বায়েম কর আমাকে স্মরণ করার জন্য (ত্ব-হা, ২০/১৪)। হে মানবজাতি! নিজে ছালাত আদায় কর এবং পরিবার, সন্তান-সন্ততিদেরকেও ছালাত প্রতিষ্ঠার জন্য আদেশ কর। মহান আল্লাহ বলেন, وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا ‘আর তোমরা পরিবারবর্গকে ছালাত আদায়ের আদেশ কর ও তাতে নিজেও অটল থাক’ (ত্ব-হা, ২০/১৩২)। মহান আল্লাহ লুক্বমান আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেন,يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ ‘যখন তিনি তাঁর সন্তানকে বলেছিলেন, ‘হে আমার প্রিয় বৎস! ছালাত ক্বায়েম কর, ভাল-কাজের আদেশ ও মন্দকাজ থেকে নিষেধ কর, আর বিপদের মুহূর্তে ধৈর্যধারণ কর, নিশ্চয় এটা দৃঢ় সংকল্পের কাজ’ (লুক্বমান, ৩১/১৭)

হে মানবজাতি! বিনয়-নম্র সহকারে ছালাত আদায় কর। মহান আল্লাহ বলেন, الَّذِيْنَ هُمْ فِيْ صَلَاتِهِمْ خَاشِعُوْنَ ‘যারা তাদের নিজের ছালাত (ভয়-ভীতি) বিনয়-নম্র সহকারে আদায় করে’ (মুমিনূন, ২৩/২)

হে মানবজাতি! পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করার চেষ্টা কর। ছালাতকে হিফাযত কর। এ ছালাতই তোমাকে কল্যাণের ও জান্নাতের পথ ধরিয়ে দিবে। মহান আল্লাহ বলেন,وَالَّذِيْنَ هُمْ عَلَى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ- أُوْلَئِكَ هُمُ الْوَارِثُوْنَ-الَّذِيْنَ يَرِثُوْنَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيْهَا خَالِدُوْنَ ‘আর যারা তাদের নিজের ছালাত যত্ন সহকারে আদায় করে, তারাই উত্তরাধিকারী হবে। উত্তরাধিকারী হবে (জান্নাতুল) ফেরদাঊসের। সেখানেই তারা চিরস্থায়ী বসবাস করবে (মুমিনূন, ২৩/৯-১১)

হে মানবজাতি! ছালাত ঠিকভাবে আদায় কর। ছালাতই তোমাকে শিরক-বিদ‘আত, কুফরীসহ সকল অপকর্ম থেকে হিফাযতে রাখবে। মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ ‘নিশ্চয় ছালাত সকল অন্যায়-অশ্লীল কাজ-কর্ম থেকে বিরত রাখে’ (আনকাবূত, ২৯/৪৫)। অতএব, তোমরা রাসূলের দেখানো পদ্ধতিতে ছালাত আদায় কর। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, صَلُّوْا كَمَا رَأَيْتُمُوْنِىْ أُصَلِّى ‘তোমরা ছালাত আদায় কর সেভাবে, যেভাবে আমাকে ছালাত আদায় করতে দেখছ’।[9] তাই মানবজাতির উচিত, ছালাত ঠিকভাবে আদায় করা। কারণ ছালাত ত্যাগকারীর পরিণতি খুবই ভয়াবহ। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছালাত ত্যাগকারীকে ইসলাম থেকে খারিজ বলে ঘোষণা করেছেন। যেমন তিনি বলেন,إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلَاةِ ‘মুমিন ও কাফের মুশরিকের মধ্যে পার্থক্য হল ছালাত’।[10] সুতরাং ছালাত ত্যাগ না করে ছালাতে যত্নবান হয়ে সঠিক সময়ে ছালাত আদায় করা সবার উপর আবশ্যক। হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِيْ عَمْرٍو الشَّيْبَانِىِّ يَقُولُ حَدَّثَنَا صَاحِبُ هَذِهِ الدَّارِ وَأَشَارَ إِلَى دَارِ عَبْدِ اللهِ قَالَ سَأَلْتُ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَىُّ الْعَمَلِ أَحَبُّ إِلَى اللهِ قَالَ الصَّلَاةُ عَلَى وَقْتِهَا قَالَ ثُمَّ أَىُّ قَالَ ثُمَّ بِرُّ الْوَالِدَيْنِ قَالَ ثُمَّ أَىُّ قَالَ الْجِهَادُ فِىْ سَبِيلِ اللهِ قَالَ حَدَّثَنِىْ بِهِنَّ وَلَوِ اسْتَزَدْتُهُ لَزَادَنِى.

আবু আমর শায়বানী রাহিমাহুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাড়ীর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এ বাড়ীর মালিক আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন, আমি আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, কোন আমলটি আল্লাহ্র নিকট অধিক প্রিয়? তিনি বললেন, যথাসময়ে ছালাত আদায় করা। ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, অতঃপর কোন্টি? তিনি বললেন, অতঃপর পিতা-মাতার খিদমত করা (তাদের উভয়ের সাথে উত্তম ব্যবহার করা)। ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আবার জিজ্ঞেস করলেন, অতঃপর কোন্টি? আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অতঃপর আল্লাহ্র পথে জিহাদ করা। (আল্লাহ্র যমীনে আল্লাহ্র দ্বীনকে সমুন্নত করার জন্য খালেছ নিয়্যতে আল্লাহ্র পথে জিহাদ করা)। ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এগুলোতো আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেনই, যদি আমি আরও অধিক জানতে চাইতাম, তাহলে তিনি আরও বলতেন।[11]

পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত যারা নিয়মিত ঠিক সময় পড়বে, তাদের জীবনের পাপসমূহ মহান আল্লাহ মার্জনা করে দিবেন। তবে বড় গুনাহ করলে তওবা করতে হবে। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন,

أَرَأَيْتُمْ لَوْ أَنَّ نَهَرًا بِبَابِ أَحَدِكُمْ يَغْتَسِلُ فِيْهِ كُلَّ يَوْمٍ خَمْسًا مَا تَقُوْلُ ذَلِكَ يُبْقِى مِنْ دَرَنِهِ قَالُوا لَا يُبْقِى مِنْ دَرَنِهِ شَيْئًا قَالَ فَذَلِكَ مِثْلُ الصَّلَوَاتِ الْخَمْسِ يَمْحُو اللهُ بِهَا الْخَطَايَا.

‘বলতো যদি তোমাদের কারো বাড়ীর সামনে একটি নদী থাকে আর সে তাতে প্রত্যহ পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার দেহে কোন ময়লা থাকবে? তারা বললেন, তার দেহে কোনরূপ ময়লা বাকী থাকবে না। আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ হল পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের উদাহরণ। এর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা (বান্দার) গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেন’।[12] অতএব, মানবজাতির উচিত জামা‘আতের সাথে ছালাত আদায় করা। আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, صَلَاةُ الْجَمَاعَةِ تَفْضُلُ صَلاَةَ الْفَذِّ بِسَبْعٍ وَعِشْرِيْنَ دَرَجَةً ‘জামা‘আতে ছালাত আদায়ের ফযীলত (একাকী) আদায়কৃত ছালাত অপেক্ষা সাতাশ গুণ বেশী’।[13]

(১৯) যাকাত আদায় করা :

যাকাত প্রদান সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ حُنَفَاءَ وَيُقِيْمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذَلِكَ دِيْنُ الْقَيِّمَةِ ‘তারাতো আদিষ্ট হয়েছিল বিশুদ্ধচিত্তে ও একনিষ্টভাবে আল্লাহ্র আনুগত্য করতে, তাঁরই একমাত্র ইবাদত করতে এবং ছালাত ক্বায়েম করতে ও যাকাত প্রদান করতে। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত সঠিক দ্বীন’ (বাইয়্যেনাহ, ৯৮/৫)

কারো উপর যাকাত ফরয হলে অবশ্যই তাকে তা আদায় করতে হবে, নচেৎ এর জন্য পরপারে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيرًا مِنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُوْنَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّوْنَ عَنْ سَبِيْلِ اللهِ وَالَّذِيْنَ يَكْنِزُوْنَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُونَهَا فِيْ سَبِيلِ اللهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيْمٍ- يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِيْ نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوْبُهُمْ وَظُهُوْرُهُمْ هَذَا مَا كَنَزْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ فَذُوْقُوْا مَا كُنْتُمْ تَكْنِزُوْنَ.

‘আর যারা (অতিলোভের বশবর্তী হয়ে) স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহ্র পথে ব্যয় করে না, (হে মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আপনি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক এক শাস্তির সুসংবাদ শুনিয়ে দিন। যেদিন জাহান্নামের আগুনে ঐগুলোকে উত্তপ্ত করা হবে অতঃপর তা দ্বারা তাদের ললাটসমূহে, পার্শ্বদেশ সমূহে এবং পৃষ্ঠদেশ সমূহে দাগ দেয়া হবে। (আর বলা হবে) এটা হচ্ছে সেটাই, যা তোমরা নিজেদের জন্য সঞ্চয় করেছিলে। অতএব, তোমরা তার স্বাদ গ্রহণ কর’ (তওবাহ, ৯/৩৪-৩৫)। মহান আল্লাহ আরো বলেন,وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِيْنَ يَبْخَلُوْنَ بِمَا آتَاهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَهُمْ ‘আর আল্লাহ যাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহ হতে কিছু দান করেছেন, সে বিষয়ে যারা কার্পণ্য করে, তারা যেন এরূপ ধারণা না করে যে, ওটা তাদের জন্য কল্যাণকর হবে; বরং সেটা তাদের জন্য ক্ষতিকর’ (আলে ইমরান, ৩/১৮০)

মানবজাতির আবশ্যকীয় কর্তব্য হল, যাকাত দেয়া এবং এর অধিকারীদের মাঝে সুষ্ঠুভাবে বণ্টন করা। যেসব কৃপণ যাকাত বের না করে জমা করে রাখে এবং ধারণা করে যে, তাদের জন্য সে মাল উপকারে আসবে, প্রকৃতপক্ষে তাদের সে মাল দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য কোন উপকারে আসবে না। অন্যদিকে যাকাতের মাল বের না করলে তাদের কোন মালে বরকত থাকে না, আল্লাহ বরকত উঠিয়ে নেন। বরং যাকাত প্রদান করলে মালের পবিত্রতা অর্জিত হয়, মাল বৃদ্ধি পায় এবং সে ক্বিয়ামতের কঠিন বিপদ থেকে রক্ষা পাবে’।[14] ইবনু আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মু‘আয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ইয়ামানে (দাওয়াতী কাজ ও শাসক নিয়োগ করে) পাঠানোর সময় আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছিলেন,

إِنَّكَ سَتَأْتِىْ قَوْمًا أَهْلَ كِتَابٍ فَإِذَا جِئْتَهُمْ فَادْعُهُمْ إِلَى أَنْ يَشْهَدُوْا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوْا لَكَ بِذَلِكَ فَأَخْبِرْهُمْ أَنَّ اللهَ قَدْ فَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فِى كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لَكَ بِذَلِكَ فَأَخْبِرْهُمْ أَنَّ اللهَ قَدْ فَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ فَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوْا لَكَ بِذَلِكَ فَإِيَّاكَ وَكَرَائِمَ أَمْوَالِهِمْ وَاتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُوْمِ فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ اللهِ حِجَابٌ.

‘তুমি আহলে কিতাবের কাছে যাচ্ছ। কাজেই তাদের কাছে যখন পৌঁছবে, তখন তাদেরকে একথার দিকে দাওয়াত দিবে- তারা যেন সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য মা‘বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্র রাসূল ও বান্দা। যদি তারা তোমার একথা মেনে নেয়, তবে তাদের বলবে, আল্লাহ তাদের উপর দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরয করেছেন। যদি তারা একথাও মেনে নেয়, তবে তাদের বলবে, আল্লাহ তাদের উপর ছাদাক্বাহ (যাকাত) ফরয করেছেন, যা তাদের ধনীদের নিকট হতে গ্রহণ করা হবে এবং অভাবগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। তোমার একথা যদি তারা মেনে নেয়, তবে (কেবল) তাদের উত্তম মাল গ্রহণ হতে বিরত থাকবে এবং মাযলূমের বদ দো‘আকে ভয় করবে। কেননা তার (বদ দো‘আ) এবং আল্লাহ্র মাঝে কোন পর্দা থাকে না’।[15] আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

مَنْ آتَاهُ اللهُ مَالًا فَلَمْ يُؤَدِّ زَكَاتَهُ مُثِّلَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ شُجَاعًا أَقْرَعَ لَهُ زَبِيْبَتَانِ يُطَوَّقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثُمَّ يَأْخُذُ بِلِهْزِمَتَيْهِ يَعْنِى شِدْقَيْهِ ثُمَّ يَقُوْلُ أَنَا مَالُكَ أَنَا كَنْزُكَ ثُمَّ تَلَا لَا يَحْسِبَنَّ الَّذِيْنَ يَبْخَلُوْنَ الآيَةَ.

‘যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু সে এর যাকাত আদায় করেনি, ক্বিয়ামতের দিন তার সম্পদকে টেকো (বিষের তীব্রতার কারণে) মাথা বিশিষ্ট বিষধর সাপের আকৃতি দান করে তার গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে। সাপটি তার মুখের দু’পার্শ্বে কামড়ে ধরে বলবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার জমাকৃত মাল। অতঃপর আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিলাওয়াত করেন, ‘আল্লাহ যাদেরকে সম্পদশালী করেছেন অথচ তারা সে সম্পদ নিয়ে কার্পণ্য করছে, তাদের ধারণা করা উচিত নয় যে, সেই সম্পদ তাদের কল্যাণ বয়ে আনবে, বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকর হবে। অচিরে ক্বিয়ামত দিবসে যা নিয়ে কার্পণ্য করেছে, তা দিয়ে তাদের গলদেশ শৃংখলাবদ্ধ করা হবে’।[16]

(চলবে)


[1]. তাফসীর আস-সা‘দী, পৃঃ ৮৩৬।

[2]. বুখারী, হা/৫০২৭; আহমাদ, হা/৪১২।

[3]. বুখারী, হা/৫০৩৩; মুসলিম, হা/৭৯১; আহমাদ, হা/১৯৫৪।

[4]. বুখারী, হা/৭৫২৮; আহমাদ, হা/১০২১৪।

[5]. বুখারী, হা/৭৫২৯; মুসলিম, হা/৮১৫; আহমাদ, হা/৪৫৫০।

[6]. মুসলিম, হা/১৯৩৪; শু‘আবুল ঈমান, ৩/৩২৭ পৃঃ।

[7]. তাফসীর আস-সা‘দী, পৃঃ ৮৯৫।

[8]. মুসলিম, হা/২২৪; আহমাদ, হা/৫৪১৯।

[9]. বুখারী, হা/৬৩১।

[10]. মুসলিম, হা/২৫৬; আহমাদ, হা/১৪৯৭।

[11]. বুখারী, হা/৫২৭; মুসলিম, হা/৮৫; আহমাদ, হা/৩৮৯০।

[12]. বুখারী, হা/৫২৮; মুসলিম, হা/৬৬৭; আহমাদ, হা/৮৯২৪।

[13]. বুখারী, হা/৬৪৫; মুসলিম, হা/৬৫০; আহমাদ, হা/৫৩৩২।

[14]. তাফসীর ইবনে কাছীর, ৩/২৭৭-২৭৮ পৃঃ।

[15]. বুখারী, হা/১৪৯৬; মুসলিম, হা/১৯; আহমাদ, হা/২০৭১।

[16]. সূরা আলে ইমরান, ৩/১৮০; বুখারী, হা/১৪০৩; আহমাদ, হা/৮৬৬১।

Magazine