ভালবাসা পবিত্র ও পুণ্যময়। এ পৃথিবীর প্রত্যেক প্রাণীর মাঝে ভালবাসা, দয়া, মায়া-মমতা আছে। নির্দোষ ও পরিশীলিত ভালবাসা আমাদের ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির পথ মসৃণ করে। মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি সবিশেষ ভালবাসা ছাড়া ঈমান পূর্ণতা লাভ করে না।
আনাস ইবনু মালেক (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
ثَلاَثٌ مَنْ كُنَّ فِيْهِ وَجَدَ حَلاَوَةَ الإِيْمَانِ مَنْ كَانَ اللهُ وَرَسُوْلُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا وَمَنْ أَحَبَّ عَبْدًا لاَ يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَمَنْ يَكْرَهُ أَنْ يَعُوْدَ فِي الكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْقَذَهُ اللهُ مِنْهُ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُلْقَى فِي النَّارِ.
‘তিনটি গুণ যার মধ্যে বিদ্যমান, সে ঈমানের স্বাদ পায়: (১) যার নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অন্য সকল বস্ত্ত হতে অধিক প্রিয় (২) যে একমাত্র আল্লাহরই জন্য কোন বান্দাকে ভালবাসে এবং (৩) আল্লাহ তা‘আলা কুফর হতে মুক্তি প্রদানের পর যে কুফর-এ প্রত্যাবর্তনকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হবার মতই অপসন্দ করে’।[1]
পরম শ্রদ্ধা, গভীর ভালবাসা আর বিপুল মমতার এক চমৎকার সংমিশ্রণের সমন্বিত রূপ হচ্ছে ‘মহববত’ নামের এ আরবী অভিব্যক্তিটি।
আল্লাহর জন্য ভালবাসা :
বিভীষিকাময় রোজ ক্বিয়ামতে যখন সূর্য মাথার অতি নিকট থেকে অগ্নি বর্ষণ করতে থাকবে, প্রখর তাপে মাথার মগজ গলে পড়বে, তখন সাত শ্রেণীর লোক মহান প্রভাবশালী আল্লাহর আরশের সুশীতল ছায়াতলে স্থান পাবে। তাদের মধ্যে অন্যতম ঐ দুই ব্যক্তি, যারা শুধু আল্লাহর জন্যই একে অপরকে ভালবাসে, তাঁর জন্য মিলিত হয় আবার তাঁর জন্যই বিচ্ছিন্ন হয়।
আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللهُ تَعَالَى فِيْ ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ إِمَامٌ عَدْلٌ وَشَابٌّ نَشَأَ فِيْ عِبَادَةِ اللهِ وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِي المَسَاجِدِ وَرَجُلاَنِ تَحَابَّا فِي اللهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّي أَخَافُ اللهَ وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لَا تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِيْنُهُ وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ.
‘যেদিন আল্লাহর (আরশের) ছায়া ব্যতীত কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন আল্লাহ তা‘আলা সাত শ্রেণীর মানুষকে সে ছায়ায় আশ্রয় দিবেন: (১) ন্যায়পরায়ণ শাসক (২) যে যুবক আল্লাহর ইবাদতের ভিতর গড়ে উঠেছে (৩) যার অন্তরের সম্পর্ক সর্বদা মসজিদের সাথে থাকে (৪) আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে যে দু’ব্যক্তি পরস্পর মহববত রাখে, উভয়ে একত্রিত হয় সেই মহববতের উপর আর পৃথক হয় সেই মহববতের উপর (৫) এমন ব্যক্তি, যাকে সম্ভ্রান্ত সুনদরী নারী (অবৈধ মিলনের জন্য) আহবান জানিয়েছে; তখন সে বলেছে, আমি আল্লাহকে ভয় করি (৬) যে ব্যক্তি গোপনে এমনভাবে ছাদাক্বা করে যে, তার ডান হাত যা দান করে, বাম হাত তা জানতে পারে না (৭) যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তাতে আল্লাহর ভয়ে তার চোখ হতে অশ্রম্ন বের হয়ে পড়ে’।[2]
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,
إِنَّ اللهَ يَقُوْلُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَيْنَ الْمُتَحَابُّوْنَ بِجَلَالِي الْيَوْمَ أُظِلُّهُمْ فِيْ ظِلِّي يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلِّيْ.
‘নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন বলবেন, কোথায় আমার মর্যাদার প্রতি মহববতকারীরা? আজকের দিন আমি তাদেরকে আমার আপন ছায়াতলে ছায়া দান করব, যেদিন আমার ছায়া ব্যতীত আর কোন ছায়া থাকবে না’।[3]
উক্ত হাদীছদ্বয়ে উল্লেখিত যে কেউ আল্লাহর মর্যাদার প্রতি আন্তরিকভাবে ভালবাসা প্রদর্শন করলে অথবা প্রভুর উদ্দেশ্যে পরস্পর পরস্পরকে ভালবাসলে, বিনিময়ে আল্লাহ তাদেরকে ক্বিয়ামতের দিন আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দিয়ে তাদেরকে ধন্য করবেন।
রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি ভালবাসা :
ঈমানের আলোকে আলোকিত প্রত্যেক মুমিনের অন্তর আলোড়িত হয়, শিহরিত হয়, মনে আনন্দের সুর বাজতে থাকে, যখন প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নাম উচ্চারিত হয়, তাঁর জীবন-চরিত আলোচিত হয় কিংবা তাঁর মুখ নিঃসৃত বাণী পাঠ করা হয়। সত্যের দীক্ষায় দীক্ষিত অন্তর তাঁর আদর্শের শ্রেষ্ঠতায় ও সৌন্দর্যে মোহিত হয়, উম্মতের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ভালবাসায় আপস্নুত হয়। তাঁর একনিষ্ঠ দিক নির্দেশনায় পথ খুঁজে পায় পথহারা বিভ্রান্ত মানব সমাজ, আর দুর্বল চিত্তের লোকেরা ফিরে পায় মনোবল।
মানবতার কল্যাণকামীরূপেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁকে প্রেরণ করেছেন এ বিপর্যস্ত দুনিয়ায়। সত্যিই তিনি তাঁর যুগের যমীনকে মুক্ত করেছেন অশান্তির বেড়াজাল হতে, উদ্ধার করেছেন অজ্ঞানতা ও মুর্খতার নিকষ অন্ধকার হতে। তাইতো জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই তাঁকে বরণ করে নিয়েছে মানবতার বন্ধুরূপে।
সত্যের এহেন প্রতিষ্ঠাতা, চারিত্রিক মাধুর্য ও ব্যবহারিক সৌন্দর্যের এমন রূপকারের প্রতি একটু বেশী পরিমাণে ভালবাসা পোষণ করা এবং তাঁর প্রতি পাহাড়সম প্রগাঢ় শ্রদ্ধা রাখা মুমিন জীবনে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। ইসলামী শরী‘আত নবী করীম (ছাঃ)-এর প্রতি ভালবাসা ও মহববত পোষণকে ওয়াজিব ও অপরিহার্য বলে আখ্যায়িত করেছে। সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর প্রতি ভালবাসার গুরুত্বারোপ করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللهَ فَاتَّبِعُوْنِيْ يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ وَاللهُ غَفُوْرٌ رَحِيْمٌ.
‘(হে নবী!) তুমি বলে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ্কে ভালবাস, তবে আমার অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। বস্ত্তত আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (আলে ইমরান ৩/৩১)।
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলার ভালবাসা পাওয়ার আগেই প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর পূর্ণ অনুসরণ ও অনুকরণের মাধ্যমে চরম ভালবাসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর প্রতি ভালবাসা ছাড়া আল্লাহর ভালবাসা অর্জন করা সম্ভব নয়।
এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত একটি হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,
فَوَ الَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهِ لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُوْنَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ.
‘সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের কেউ ততক্ষণ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা ও সন্তানাদির চেয়ে অধিক ভালবাসার পাত্র হই’।[4]
অনুরূপই অপর একটি হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُوْنَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِيْنَ.
‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার নিকট তার পিতামাতা, সন্তান-সন্ততি ও পৃথিবীর সকল মানুষ অপেক্ষা অধিক ভালবাসার পাত্র না হই’।৫
পরিশেষে বলা যায়, পিতামাতা, সন্তানাদি এমনকি পৃথিবীর সকল মানুষ অপেক্ষা অধিক ভালবাসতে হবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে। অন্যথা ঈমানের পূর্ণতা লাভ করা সম্ভব হবে না। নেতা-নেত্রী, আত্মীয়-স্বজন এবং স্বীয় আপনজনদের চেয়েও বেশী ভালবাসতে হবে নবী করীম (ছাঃ)-কে। আর তাঁকে ভালবাসার মাধ্যমে মহান প্রভু আল্লাহ তা‘আলার ভালবাসা লাভে স্বীয় জীবন ধন্য হবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন-আমীন!
মাক্বছুদুর রহমান
[1]. ছহীহ বুখারী হা/২১, ১৬, ইফা. হা/২০, আপ্র. হা/২০, ‘কুফরীতে প্রত্যাবর্তন করাকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হবার ন্যায় অপসন্দ করা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত’ অধ্যায়; ছহীহ মুসলিম হা/৪৩; তিরমিযী হা/২৬২৪; নাসাঈ হা/৪৯৮৮; ইবনু মাজাহ হা/৪০৩৩; মিশকাত হা/৮।
[2]. ছহীহ বুখারী হা/১৪২৩, ৬৬০, ৬৮০৬, ইফা. হা/১৩৩৭, আপ্র. হা/১৩৩১, ‘ডান হাতে ছাদাক্বা প্রদান করা’ অধ্যায়; ছহীহ মুসলিম হা/১০৩১, ‘গোপনে দান করার ফযীলত’ অধ্যায়; তিরমিযী হা/২৩৯১; নাসাঈ হা/৫৩৮০; মিশকাত হা/৭০১।
[3]. ছহীহ মুসলিম হা/২৫৬৬, ‘আল্লাহর প্রতি ভালবাসার ফযীলত’ অধ্যায়; দারেমী হা/২৭৯৯; মিশকাত হা/৫০০৬।
[4]. ছহীহ বুখারী হা/১৪, ইফা. হা/১৩, আপ্র. হা/১৩, ‘আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-কে ভালবাসা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত’ অধ্যায়; ছহীহ মুসলিম হা/৪৪, ‘রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি ভালবাসার আবশ্যকতা’ অধ্যায়; নাসাঈ হা/৫০১৩; ইবনু মাজাহ হা/৬৭; মিশকাত হা/৬।
[5]. ছহীহ বুখারী হা/১৫; ছহীহ মুসলিম হা/১৭৮; মিশকাত হা/৭।
