ভূমিকা :
যাকাতুল ফিতর মূলত যাকাতেরই একটি অংশ। এটা রামাযানের শেষে ঈদের দিন বা এর ২/১ দিন পূর্বে আদায় করতে হয়। আমাদের দেশে অনেকের মাঝে প্রচলিত আছে যে, যব, পনির, কিশমিশ দিলে এক ছা‘ দিতে হবে। পক্ষান্তরে গম দিয়ে ফিতরা আদায় করলে অর্ধ ছা‘ প্রদান করতে হবে। গমের ক্ষেত্রে অর্ধ ছা‘ দেওয়ার পক্ষে বেশ কিছু বর্ণনাকে দলীল হিসাবে পেশ করা হয়। যেগুলোর কোনটাই সনদের দিক থেকে ছহীহ নয়; বরং সবগুলোতেই ত্রুটি বিদ্যমান। অনেকে আবার এগুলোর বাজার মূল্যমানকে নির্ধারণ করে টাকা প্রদান করেন। এটাও সুন্নাতের খেলাফ। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে ফিতরা আদায় করেছেন ঠিক সেভাবে, সে নিয়মেই আমাদেরকে তা আদায় করতে হবে। নিমেণ অর্ধ ছা‘-এর পক্ষের দলীল সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হল :
মারফূ‘ বর্ণনাসমূহ :
দলীল-১ :
حَدَّثَنَا عُقْبَةُ بْنُ مُكْرَمٍ البَصْرِيُّ قَالَ حَدَّثَنَا سَالِمُ بْنُ نُوحٍ عَنْ ابْنِ جُرَيْجٍ عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعَثَ مُنَادِيًا فِي فِجَاجِ مَكَّةَ أَلَا إِنَّ صَدَقَةَ الفِطْرِ وَاجِبَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى، حُرٍّ أَوْ عَبْدٍ، صَغِيرٍ أَوْ كَبِيرٍ، مُدَّانِ مِنْ قَمْحٍ، أَوْ سِوَاهُ صَاعٌ مِنْ طَعَامٍ.
তিরমিযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘আমাদেরকে উক্ববাহ ইবনে মুকরাম বাছরী হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, সালেম ইবনে নূহ আমাদেরকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন ইবনে জুরাইজ হতে। তিনি আমর ইবনে শু‘আইব হতে, তিনি তার পিতা হতে, তিনি তার দাদা হতে (বর্ণনা করেছেন) যে, নিশ্চয়ই নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন ঘোষক প্রেরণ করলেন যেন সে মক্কার পথে পথে এ ঘোষণা করে যে, জেনে রাখ! প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, গোলাম-স্বাধীন, ছোট-বড় সবার উপর ছাদাক্বায়ে ফিতরা অপরিহার্য। দু’মুদ (অর্ধ ছা‘) গম বা এক ছা‘ অন্য খাদ্যবস্ত্ত’।[1]
তাহক্বীক্ব : হাদীছটির সনদ যঈফ। এর সনদে দু’জন সমালোচিত রাবী রয়েছেন। প্রথম রাবী সালেম ইবনে নূহ। সেজন্য শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ যঈফুল ইসনাদ[2] এবং শায়খ যুবায়ের আলী যাঈ রাহিমাহুল্লাহ সনদ যঈফ বলেছেন।[3]
এই হাদীছের আরেক রাবী ইবনে জুরাইজ সম্পর্কে ইমাম নাসাঈ রাহিমাহুল্লাহ,[4] ইবনুল ইরাক্বী রাহিমাহুল্লাহ,[5] বুরহানুদ্দীন হালাবী রাহিমাহুল্লাহ[6] ‘মুদালিস্নস’ ‘প্রসিদ্ধ মুদাল্লিস’ ইত্যাদি বলেছেন। ইবনে হাজার আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, عبد الملك ابن عبد العزيز ابن جريج الأموي مولاهم المكي ثقة فقيه فاضل وكان يدلس ويرسل ‘আব্দুল মালিক ইবনে আব্দুল আযীয ইবনে জুরাইজ আল-উমাবী একজন ছিক্বাহ, ফক্বীহ, সম্মানিত ব্যক্তি। তিনি তাদলীস ও মুরসাল রেওয়ায়াত বর্ণনা করতেন’।[7] তিনি অন্যত্র বলেন,فقيه الحجاز مشهور بالعلم والثبت كثير الحديث وصفه النسائي وغيره بالتدليس قال الدارقطني شر التدليس تدليس بن جريج فإنه قبيح التدليس لا يدلس إلا فيما سمعه من مجروح ‘তিনি হিজাযের ফক্বীহ। ইলম ও দৃঢ়তার কারণে প্রসিদ্ধ। তিনি অত্যধিক হাদীছ বর্ণনাকারী। নাসাঈ ও অন্যরা তাকে তাদলীসকারী বলেছেন। দারাকুৎনী বলেছেন, ইবনু জুরাইজের তাদলীস হল সর্বনিকৃষ্ট তাদলীস। কেননা তিনি নিকৃষ্টতম মুদাল্লিস রাবী। তিনি স্রেফ সমালোচিতদের থেকেই তাদলীস করতেন।[8] এছাড়াও ইবনে হিববান রাহিমাহুল্লাহ,[9] হাফেয যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ[10] ও আহমাদ শাকের রাহিমাহুল্লাহ তাকে মুদালিস্নস রাবী বলেছেন।[11]
মোটকথা, এটা ইবনু জুরাইজের তাদলীস ও সালেমের বিতর্কিত হওয়ার দরুন যঈফ। অতএব এর দ্বারা দলীল গ্রহণ শুদ্ধ নয়।
দলীল-২ :
হাসান বর্ণনা করেছেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা রামাযানের শেষ দিকে বাছরার মিম্বারের উপর খুৎবা প্রদানকালে বলেছেন, فَرَضَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هَذِهِ الصَّدَقَةَ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ، أَوْ شَعِيرٍ، أَوْ نِصْفَ صَاعٍ مِنْ قَمْحٍ، عَلَى كُلِّ حُرٍّ أَوْ مَمْلُوكٍ، ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى، صَغِيرٍ أَوْ كَبِيرٍ ‘রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাদাক্বাতুল ফিতর অপরিহার্য করেছেন এক ছা‘ খেজুর বা যব কিংবা অর্ধ ছা‘ গম, গোলাম-স্বাধীন, নারী-পুরুষ, ছোট-বড় প্রত্যেকের উপর’।[12]
তাহক্বীক্ব : সনদ যঈফ। শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
إسناده ضعيف؛ وعلته الانقطاع، فقد جزم جماعة من الأئمة بأن الحسن لم يسمع من ابن عباس. ولو ثبت سماعه منه؛ فهو مدلس لم يصرح بسماعه فيه.
‘এই সনদটি যঈফ। এর ত্রুটি হল, (এর মধ্যে) ইনক্বিত্বা‘ রয়েছে। ইমামদের একটি জামা‘আত দৃঢ়তার সাথে বলেছেন যে, নিশ্চয়ই হাসান রাহিমাহুল্লাহ ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে শ্রবণ করেননি। যদি তার শ্রবণ করা ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে প্রমাণিত হয়েও থাকে, তদুপরি তিনি মুদালিস্নস রাবী। তিনি এই রেওয়ায়াতের মধ্যে হাদীছ শ্রবণের স্পষ্টতা ব্যাখ্যা করেননি।[13] ইবনে হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ‘তিনি ছিক্বাহ, অত্যধিক ইরসাল ও তাদলীস করতেন’।[14] সুতরাং এ হাদীছও গ্রহণযোগ্য নয়।
দলীল-৩ :
عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ عَنِ ابْنِ شِهَابٍ عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ ثَعْلَبَةَ قَالَ خَطَبَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ النَّاسَ قَبْلَ الْفِطْرِ بِيَوْمٍ أَوْ يَوْمَيْنِ فَقَالَ : أَدُّوا صَاعًا مِنْ بُرٍّ، أَوْ قَمْحٍ بَيْنَ اثْنَيْنِ، أَوْ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ عَلَى كُلِّ أَحَدٍ صَغِيرٍ أَوْ كَبِيرٍ.
আব্দুলাহ ইবনে ছা‘লাবাহ বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের একদিন বা দু’দিন আগে ছাহাবীদের উদ্দেশ্যে খুৎবা প্রদান করেছেন। সে খুৎবায় তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা প্রতি দু’জনের পক্ষ থেকে এক ছা‘ গম বা ছোট বড় প্রত্যেকের পক্ষ থেকে মাথাপিছু এক ছা‘ খেজুর অথবা এক ছা‘ যব প্রদান করবে’।[15]
তাহক্বীক্ব : সনদ যঈফ। এখানে ইবনে জুরাইজ নামক মুদালিস্নস রাবী আছেন, যার সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। তার উস্তাদ ইবনে শিহাব যুহরীও রাহিমাহুল্লাহ তাদলীস করেছেন।[16]
দলীল-৪ :
حَدَّثَنَا عَتَّابُ بْنُ زِيَادٍ قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ اللهِ يَعْنِي ابْنَ الْمُبَارَكِ قَالَ : أَخْبَرَنَا ابْنُ لَهِيعَةَ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ نَوْفَلٍ عَنْ فَاطِمَةَ بِنْتِ الْمُنْذِرِ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ قَالَتْ كُنَّا نُؤَدِّي زَكَاةَ الْفِطْرِ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُدَّيْنِ مِنْ قَمْحٍ، بِالْمُدِّ الَّذِي تَقْتَاتُونَ بِهِ.
আসমা বিনতে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, ‘যে মুদ (পাত্র) দ্বারা তোমরা খাদ্যবস্ত্ত গ্রহণ কর এমন দুই মুদ (অর্ধ ছা‘) গম আমরা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ছাদাক্বাতুল ফিতর হিসাবে আদায় করতাম’।[17]
তাহক্বীক্ব : যঈফ। এখানে ইবনে লাহী‘আহ রাহিমাহুল্লাহ তাদলীস করেছেন। তাছাড়াও তার মস্তিষ্ক বিকৃত হয়েছিল। ইবনে হাজার আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ‘আব্দুল্লাহ ইবনে লাহী‘আহ হাযরামী মিশরের ক্বাযী ছিলেন। শেষ বয়সে তার মস্তিষ্ক বিকৃত হয়েছিল এবং তার বর্ণনায় অত্যধিকহারে মুনকার রেওয়ায়াতসমূহের উপস্থিতি ঘটে’।[18] বুরহানুদ্দীন হালাবী বলেছেন, ‘তিনি যঈফ রাবীদের থেকে তাদলীস করতেন’।[19] ইমাম সুয়ূত্বীও তাকে মুদালিস্নস বলেছেন।[20]
দলীল-৫ :
حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ حَدَّثَنَا اللَّيْثُ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ خَالِدٍ يَعْنِي ابْنَ مُسَافِرٍ عَنِ ابْنِ شِهَابٍ عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيِّبِ قَالَ فَرَضَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَكَاةَ الْفِطْرِ مُدَّيْنِ مِنْ حِنْطَةٍ.
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েব বলেন, ‘রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাদাক্বাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন দু’মুদ গম দ্বারা’।[21]
তাহক্বীক্ব :প্রথমত, এটা মুরসাল বর্ণনা, যা দলীলযোগ্য নয়। দ্বিতীয়ত, এখানে ইবনে শিহাব যুহরী রাহিমাহুল্লাহ তাদলীস করেছেন।[22]
দলীল-৬ :
حَدَّثَنَا رَبِيعٌ الْجِيزِيُّ قَالَ ثنا أَبُو زُرْعَةَ قَالَ أنا حَيْوَةُ قَالَ أنا عُقَيْلٌ عَنِ ابْنِ شِهَابٍ أَنَّهُ سَمِعَ سَعِيدَ بْنَ الْمُسَيِّبِ وَأَبَا سَلَمَةَ بْنَ عَبْدِ الرَّحْمَنِ وَعُبَيْدَ اللهِ بْنَ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُتْبَةَ يَقُولُونَ : أَمَرَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِزَكَاةِ الْفِطْرِ بِصَاعٍ مِنْ تَمْرٍ أَوْ بِمُدَّيْنِ مِنْ حِنْطَةٍ.
ইবনে শিহাব যুহরী বলেছেন, তিনি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব, আবু সালামাহ ইবনে আব্দুর রহমান ও ওবায়দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে উতবাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রমুখকে বলতে শুনেছেন যে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ছা‘ খেজুর বা দুই মুদ (অর্ধ ছা‘) গমকে ছাদাক্বাতুল ফিতর হিসাবে আদায় করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।[23]
তাহক্বীক্ব : এটি মুরসাল বর্ণনা। সুতরাং যঈফ। এর রাবী আল-জীযী সম্পর্কে ইমাম ইবনু ইউনুস মিছরী বলেছেন, كَتَبَ عَنْهُ قَوْمٌ مِنْ أَصْحَابِ الْحَدِيْثِ- لَمْ يَكُنْ يَشْبَهُ أَهْلَ الْعِلْمِ- ‘তার থেকে আছহাবুল হাদীছের একটি জামা‘আত হাদীছ লিখেছেন। তিনি আহলে ইলমদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলেন না’।[24]
দলীল-৭ :
حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي دَاوُدَ قَالَ ثنا ابْنُ أَبِي مَرْيَمَ قَالَ أَخْبَرَنِي يَحْيَى بْنُ أَيُّوبَ قَالَ حَدَّثَنِي عُقَيْلٌ عَنِ ابْنِ شِهَابٍ عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيِّبِ وَعُبَيْدِ اللهِ بْنِ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَتَبَةَ وَالْقَاسِمِ وَسَالِمٍ قَالُوا أَمَرَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي صَدَقَةِ الْفِطْرِ بِصَاعٍ مِنْ شَعِيرٍ أَوْ مُدَّيْنِ مِنْ قَمْحٍ.
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, ওবায়দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে উতবাহ, ক্বাসেম ও সালেম বলেছেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করেছেন ছাদাক্বাতুল ফিতর এক ছা‘ যব বা দু’মুদ (অর্থ ছা‘) গম আদায় করতে’।[25]
তাহক্বীক্ব : মুরসাল। সুতরাং যঈফ। তদুপরি ইবনে শিহাব রাহিমাহুল্লাহ এখানে তাদলীস করেছেন।
দলীল-৮ :
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ دَاوُدَ قَالَ ثنا سُلَيْمَانُ بْنُ حَرْبٍ قَالَ ثنا حَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ عَنْ عَبْدِ الْخَالِقِ الشَّيْبَانِيِّ عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيِّبِ قَالَ كَانَتِ الصَّدَقَةُ تُعْطَى عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا نِصْفَ صَاعٍ مِنْ حِنْطَةٍ.
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব বলেছেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবুবকর এবং ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর যুগে অর্ধ ছা‘ গম ফিতরা দেয়া হত।[26]
তাহক্বীক্ব : এটাও মুরসাল বর্ণনা। সুতরাং যঈফ।
দলীল-৯ :
حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ عَنْ عَبْدِ الْخَالِقِ بْنِ سَلَمَةَ الشَّيْبَانِيِّ قَالَ : سَأَلْتُ سَعِيدَ بْنَ الْمُسَيِّبِ عَنِ الصَّدَقَةِ يَعْنِي صَدَقَةَ الْفِطْرِ فَقَالَ : كَانَتْ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَاعَ تَمْرٍ أَوْ نِصْفَ صَاعِ حِنْطَةٍ عَنْ كُلِّ رَأْسٍ.
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব বলেছেন, ‘রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে তা ছিল মাথাপিছু এক ছা‘ খেজুর বা অর্থ ছা‘ গম’।[27]
তাহক্বীক্ব : মুরসাল বর্ণনা। এর রাবী ইসমাঈল ইবনে ইবরাহীম সম্পর্কে ইমাম বদরুদ্দীন আইনী হানাফী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ‘ইসমাঈল ইবনে ইবরাহীম ইবনে মুহাজির বাজালী কূফী। ......বুখারী বলেছেন, তার হাদীছে আপত্তি রয়েছে। আহমাদ বলেছেন, তার পিতা তার চাইতে শক্তিশালী। ইয়াহ্ইয়া এবং নাসাঈ বলেছেন, তিনি যঈফ রাবী। ইয়াহইয়া মুর্রাহ বলেছেন, তিনি কিছুই নন। ইবনে হিববান বলেছেন, তিনি অত্যধিক ভুলকারী। ইবনে আদী বলেছেন, তার কাছে আশ্চর্যজনক বর্ণনাসমূহ রয়েছে। তার বর্ণিত হাদীছ তিরমিযী এবং আবু জা‘ফর ত্বাহাবী বর্ণনা করেছেন।[28]
উপর্যুক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হল যে, রাবী হিসাবে তিনি দুর্বল। সুতরাং এই হাদীছ দলীলযোগ্য নয়।
দলীল-১০ :
حَدَّثَنَا هُشَيْمٌ عَنْ سُفْيَانَ بْنِ حُسَيْنٍ عَنِ الزُّهْرِيِّ عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيِّبِ يَرْفَعُهُ أَنَّهُ سُئِلَ عَنْ صَدَقَةِ الْفِطْرِ فَقَالَ عَنِ الصَّغِيرِ وَالْكَبِيرِ وَالْحُرِّ وَالْمَمْلُوكِ نِصْفُ صَاعٍ مِنْ بُرٍّ أَوْ صَاعٌ مِنْ تَمْرٍ، أَوْ شَعِيرٍ.
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিবকে ছাদাক্বাতুল ফিতর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল। তিনি নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, ছোট-বড়, গোলাম-স্বাধীন প্রত্যেকের মাথাপিছু অর্ধ ছা‘ গম বা এক ছা‘ খেজুর বা যব (প্রদান করতে হবে)।[29]
তাহক্বীক্ব : যুহরী রাহিমাহুল্লাহ এখানে তাদলীস করেছেন। যুহরীর ছাত্র সুফিয়ান ইবনে হুসাইন রাহিমাহুল্লাহ যঈফ রাবী।[30] এছাড়াও হুশাইম রাহিমাহুল্লাহ এখানে তাদলীস করেছেন।[31]
খুলাফায়ে রাশেদীনের নামে বর্ণিত আছারসমূহ :
দলীল-১ :
عَنِ الثَّوْرِيِّ عَنْ عَاصِمٍ عَنْ أَبِي قِلَابَةَ قَالَ أَنْبَأَنِي مَنْ أَدَّى إِلَى أَبِي بَكْرٍ نِصْفَ صَاعٍ مِنْ بُرٍّ بَيْنَ رَجُلَيْنِ.
আবু ক্বিলাবাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ‘স্বয়ং ঐ ব্যক্তি আমাকে বলেছেন, যিনি আবুবকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকটে এক ছা‘ গম দ্বারা দু’ব্যক্তির ছাদাক্বাতুল ফিতর আদায় করেছেন’।[32]
তাহক্বীক্ব : প্রথমত, এখানে সুফিয়ান ছাওরী রাহিমাহুল্লাহ তাদলীস করেছেন।[33]দ্বিতীয়ত, সংবাদদাতা কে? তা এখানে অজ্ঞাত। সুতরাং এ সনদে রাবী মাজহূল থাকার কারণে তা বাতিল।
দলীল-২ :
عَنْ مَعْمَرٍ قَالَ بَلَغَنِي أَنَّ أَبَا بَكْرٍ أَخْرَجَ زَكَاةَ الْفِطْرِ مُدَّيْنِ.
মা‘মার বলেছেন, আমার কাছে সংবাদ এসেছে যে, ‘নিশ্চয়ই আবুবকর দু’মুদ তথা অর্ধ ছা‘ দ্বারা ফিতরা আদায় করেছেন’।[34]
তাহক্বীক্ব : মা‘মার বলেছেন, ‘আমার কাছে সংবাদ এসেছে’। এখানে সংবাদদাতা অজ্ঞাত। সুতরাং এটাও যঈফ সনদ।
দলীল-৩ :
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرَةَ قَالَ ثنا أَبُو عُمَرَ قَالَ أنا حَمَّادٌ عَنِ الْحَجَّاجِ بْنِ أَرْطَاةَ قَالَ : ذَهَبْتُ أَنَا وَالْحَكَمُ بْنُ عُتَيْبَةَ إِلَى زِيَادِ بْنِ النَّضْرِ فَحَدَّثَنَا عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ نَافِعٍ أَنَّ أَبَاهُ سَأَلَ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ فَقَالَ إِنِّي رَجُلٌ مَمْلُوكٌ فَهَلْ فِي مَالِي زَكَاةٌ؟ فَقَالَ عُمَرُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ إِنَّمَا زَكَاتُكَ عَلَى سَيِّدِكَ أَنْ يُؤَدِّيَ عَنْكَ عِنْدَ كُلِّ فِطْرٍ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ أَوْ تَمْرٍ أَوْ نِصْفَ صَاعٍ مِنْ بُرٍّ.
নাফে‘ বলেছেন, তিনি ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করেছেন যে, আমি একজন ক্রীতদাস। আমার সম্পদের কি কোন যাকাত আছে? ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তোমার যাকাত তো তোমার মনীবের উপর রয়েছে। সে তোমার পক্ষ হতে প্রতি ঈদুল ফিতরে এক ছা‘ যব বা খেজুর বা অর্ধ ছা‘ গম প্রদান করবে’।[35]
তাহক্বীক্ব : যঈফ। হাজ্জাজ ইবনে আরত্বাত রাহিমাহুল্লাহ সমালোচিত ও মুদালিস্নস রাবী।[36] ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ‘ইবনুল মুবারক বলেছেন, হাজ্জাজ তাদলীস করতেন।[37] ইবনে হিববান,[38] ইবনে আদী,[39] আবু হাফছ ওমর ইবনে আহমাদ শাহীন,[40] ইবনুল জাওযী,[41] যাহাবী,[42] নাসাঈ,[43] মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী,[44] বায়হাক্বী[45] ও দারাকুৎনী[46] প্রমুখ ইমাম তাদের স্ব স্ব গ্রন্থে হাজ্জাজকে যঈফ ও সমালোচিত বলেছেন।
দলীল-৪ :
حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي دَاوُدَ قَالَ ثنا نُعَيْمٌ عَنِ ابْنِ عُيَيْنَةَ عَنِ الزُّهْرِيِّ عَنِ ابْنِ أَبِي صُعَيْرٍ قَالَ كُنَّا نُخْرِجُ زَكَاةَ الْفِطْرِ عَلَى عَهْدِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ نِصْفَ صَاعٍ.
ইবনু আবী ছু‘আইর বলেছেন, ‘আমরা ওমর ইবনুল খাত্ত্বাবের খেলাফতকালে ছাদাক্বাতুল ফিতর দিতাম অর্ধ ছা‘ গম’।[47]
তাহক্বীক্ব : যঈফ। সুফিয়ান ইবনে উয়ায়নাহ রাহিমাহুল্লাহ তাদলীস করেছেন। ইবনু হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ‘তিনি ছিক্বাহ, হাদীছের হাফেয, ইমাম ও হুজ্জত। তবে শেষ বয়সে তার স্মৃতি পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল। আর তিনি কদাচিৎ তাদলীস করতেন। কিন্তু ছিক্বাহ রাবীদের হতে (তাদলীস করতেন)।[48] ইমাম নাসাঈ রাহিমাহুল্লাহ তাকে মুদালিস্নস রাবী বলেছেন।[49] বুরহানুদ্দীন হালাবী রাহিমাহুল্লাহ তাকে মুদালিস্নস রাবীদের গ্রন্থে উলেখ করেছেন।[50] ইবনে শিহাব আয-যুহরীও মুদালিস্নস রাবী এবং এখানে তাদলীস করেছেন।[51]
দলীল-৪ :
حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي دَاوُدَ قَالَ ثنا الْقَوَارِيرِيُّ قَالَ ثنا حَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ عَنْ خَالِدٍ الْحَذَّاءِ عَنْ أَبِي قِلَابَةَ عَنْ أَبِي الْأَشْعَثِ قَالَ خَطَبَنَا عُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ فَقَالَ فِي خُطْبَتِهِ : أَدُّوا زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ عَنْ كُلِّ صَغِيرٍ وَكَبِيرٍ حُرٍّ وَمَمْلُوكٍ ذَكَرٍ وَأُنْثَى.
আবুল আশ‘আছ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ওছমান রাযিয়াল্লাহু আনহু আমাদের উদ্দেশ্যে খুৎবা দিলেন। এই খুৎবায় তিনি বললেন, তোমরা দু’মুদ (অর্ধ ছা‘) ফিতরা আদায় কর।[52]
তাহক্বীক্ব : খালেদ ইবনে মিহরান আল-হায্যা রাহিমাহুল্লাহ মুদাল্লিস রাবী।[53] তিনি এখানে তাদলীস করেছেন। এছাড়াও তার মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে গিয়েছিল, তিনি মুরসাল হাদীছ বর্ণনা করতেন। তবে তিনি ছিক্বাহ রাবী ছিলেন।[54]
দলীল-৫ :
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَكْرٍ عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ عَنْ عَبْدِ الْكَرِيمِ عَنْ إِبْرَاهِيمَ عَنْ عَلْقَمَةَ وَالْأَسْوَدِ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، أَنَّهُ قَالَ مُدَّانِ مِنْ قَمْحٍ أَوْ صَاعٌ مِنْ تَمْرٍ أَوْ شَعِيرٍ.
আব্দুল্লাহ (ইবনে মাসঊদ) রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ‘দুই মুদ গম অথবা এক ছা‘ খেজুর বা যব ফিতরা হিসাবে প্রদান করতে হবে’।[55]
তাহক্বীক্ব : ইবনু জুরাইজ তাদলীস করেছেন। তিনি সমালোচিত রাবীদের থেকে তাদলীস করতেন। তিনি নিকৃষ্ট তাদলীসকারী।[56] ইবরাহীম নাখাঈ তাদলীস করেছেন।[57]
দলীল-৬ :
عَنْ مَعْمَرٍ عَنِ الزُّهْرِيِّ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ زَكَاةُ الْفِطْرِ عَلَى كُلِّ حُرٍّ وَعَبْدٍ ذَكَرٍ وَأُنْثَى صَغِيرٍ وَكَبِيرٍ غَنِيٍّ وَفَقِيرٍ صَاعٌ مِنْ تَمْرٍ أَوْ نِصْفُ صَاعٍ مِنْ قَمْحٍ.
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, প্রত্যেক গোলাম-স্বাধীন, নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, ধনী-গরীবের উপর ছাদক্বাতুল ফিতর দেয়া আবশ্যক। এক ছা‘ খেজুর বা অর্ধ ছা‘ গম’।[58]
তাহক্বীক্ব : যুহরী রাহিমাহুল্লাহ তাদলীস করেছেন।[59] এছাড়াও ইমাম আব্দুর রাযযাক রাহিমাহুল্লাহ-এর উপরও সমালোচনা রয়েছে। ইবনু হাজার লিখেছেন,ثقة حافظ مصنف شهير عمي في آخر عمره فتغير وكان يتشيع ‘তিনি ছিক্বাহ, হাদীছের হাফেয, প্রসিদ্ধ লেখক, তিনি শেষ বয়সে অন্ধ হয়ে যান এবং তার মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে যায়। তার মধ্যে ‘তাশাইয়ু’ ছিল’।[60]
দলীল-৭ :
عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ قَالَ أَخْبَرَنِي عَمْرُو بْنُ دِينَارٍ أَنَّهُ سَمِعَ ابْنَ الزُّبَيْرِ يَقُولُ عَلَى الْمِنْبَرِ زَكَاةُ الْفِطْرِ مُدَّانِ مِنْ قَمْحٍ أَوْ صَاعٌ مِنْ تَمْرٍ أَوْ شَعِيرٍ الْحُرُّ وَالْعَبْدُ سَوَاءٌ.
আমর ইবনে দীনার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে মিম্বারের উপর খুৎবায় বলতে শুনেছেন যে, ছাদাক্বাতুল ফিতর হল দু’মুদ (অর্ধ ছা‘) গম বা এক ছা‘ খেজুর বা যব’।[61]
তাহক্বীক্ব : ইবনু জুরাইজ রাহিমাহুল্লাহ এখানে তাদলীস করেছেন।[62]
দলীল-৮ :
أَنَّ أَبَا بَكْرَةَ قَدْ حَدَّثَنَا قَالَ : ثنا حَجَّاجُ بْنُ الْمِنْهَالِ قَالَ ثنا حَمَّادٌ عَنْ يُونُسَ عَنِ الْحَسَنِ أَنَّ مَرْوَانَ بَعَثَ إِلَى أَبِي سَعِيدٍ أَنِ ابْعَثْ إِلَيَّ بِزَكَاةِ رَقِيقِكَ- فَقَالَ أَبُو سَعِيدٍ لِلرَّسُولِ إِنَّ مَرْوَانَ لَا يَعْلَمُ إِنَّمَا عَلَيْنَا أَنْ نُعْطِيَ لِكُلِّ رَأْسٍ عِنْدَ كُلِّ فِطْرٍ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ نِصْفَ صَاعٍ مِنْ بُرٍّ.
হাসান বাছরী বলেন, মারওয়ান ইবনুল হাকাম আবু সাঈদ খুদরীর নিকটে দূত পাঠান যে, আপনার গোলামের ফিতরার ছাদাক্বাহ আমার কাছে পাঠান। আবু সাঈদ দূতকে বললেন, মারওয়ানের তো (বিধান) জানা নেই, প্রতি ঈদুল ফিতরে আমাদেরকে মাথাপিছু এক ছা‘ খেজুর বা অর্ধ ছা‘ গম দিতে হয়।[63]
তাহক্বীক্ব : হাসান বাছরী মুদালিস্নস ও মুরসাল হাদীছ বর্ণনাকারী। তিনি অত্যধিক মুরসাল হাদীছ বর্ণনা করতেন।[64]
দলীল-৯ :
عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ قَالَ أَخْبَرَنِي أَبُو الزُّبَيْرِ أَنَّهُ سَمِعَ جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ يَقُولُ : صَدَقَةُ الْفِطْرِ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ صَغِيرٍ وَكَبِيرٍ عَبْدٌ أَوْ حُرٌّ مُدَّانِ مِنْ قَمْحٍ أَوْ صَاعٌ مِنْ تَمْرٍ أَوْ شَعِيرٍ.
জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, ‘ছোট-বড়, গোলাম-স্বাধীন সকলের পক্ষ থেকে ছাদাক্বাতুল ফিতর আদায় করা অপরিহার্য, দু’মুদ (অর্ধ ছা‘) গম বা এক ছা‘ খেজুর বা যব’।[65]
তাহক্বীক্ব : এটি ছহীহ। এর আরেকটি সনদ রয়েছে।[66] তবে একজন ছাহাবীর একক বর্ণনা মারফূ‘ হাদীছের বিরুদ্ধে গেলে তা দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য হবে না। যেমন মু‘আবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু এককভাবে নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীছের বিপক্ষে নিজস্ব গবেষণা মোতাবেক অর্ধ ছা‘ গম দেয়ার মত জারী করলে ছাহাবী আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু তা মানতে অস্বীকার করেন এবং এর প্রতিবাদ করেন।[67]
যাকাতুল ফিতরের পরিমাণ:
যাকাতুল ফিতরের পরিমাণ সম্পর্কে অসংখ্য হাদীছ ও ইমামদের ফৎওয়া রয়েছে। নিমেণ সংক্ষেপে কয়েকটি তুলে ধরা হল-
(১) আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, فَرَضَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَكَاةَ الفِطْرِ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ عَلَى العَبْدِ وَالحُرِّ، وَالذَّكَرِ وَالأُنْثَى، وَالصَّغِيْرِ وَالكَبِيْرِ مِنَ المُسْلِمِيْنَ ‘রাসূলুলাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ছা‘ খেজুর বা এক ছা‘ যব ফরয করেছেন মুসলিম দাস-স্বাধীন, পুরুষ-নারী, ছোট-বড় সবার উপর।[68]
(২) আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমরা নবীর যুগে এক ছা‘ যাকাত দিতাম। পরে মু‘আবিয়া এসে অর্ধ ছা‘-এর প্রচলন করেন।[69]
(৩) সঊদী আরবের ফতওয়া বোর্ডের স্থায়ী কমিটির ফতওয়ায় এসেছে,مِقْدَارُ زَكَاةِ الْفِطْرِ صَاعٌ مِنْ تَمْرٍ أَوْ شَعِيْرٍ أَوْ زَبِيْبٍ أَوْ أَقِطٍ أَوْ طَعَامٍ- ‘যাকাতুল ফিতরের পরিমাণ হল, এক ছা‘ খেজুর বা যব বা কিশমিশ বা পনির বা যে কোন খাদ্য’।[70] উলেখ্য, মোটামুটি আড়াই কেজি পরিমাণ খাদ্যই হল এক ছা‘-এর পরিমাণ।
উপসংহার :
উপর্যুক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, গম অর্ধ ছা‘ দিতে হবে মর্মে বর্ণিত হাদীছগুলোর সনদের মান গ্রহণযোগ্য নয়। এ মর্মে তাবেঈদের থেকেও কিছু বক্তব্য পাওয়া যায়। তবে তা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্পষ্ট হাদীছের বিরোধী বিধায় গ্রহণযোগ্য নয়। আর অর্ধ ছা‘ প্রদান মূলত মু‘আবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ইজতিহাদী ফতওয়া, যা ছাহাবী আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বাতিল ঘোষিত হয়েছে। সুতরাং ছাহাবীদের মধ্যে মতানৈক্য হলে আমাদেরকে নবীর হাদীছের প্রতি প্রত্যাবর্তন করতে হবে। আর নবীর হাদীছে এক ছা‘-এর কথাই রয়েছে। তাছাড়া কোন ছহীহ মারফূ‘ হাদীছে অর্ধ ছা‘-এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। আল্লাহ আমাদেরকে ছহীহ হাদীছের উপর আমল করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
[1]. তিরমিযী, হা/৬৭৪; মিশকাত, হা/১৮১৯।
[2]. তাহক্বীক্ব তিরমিযী, হা/৬৭৪।
[3]. আনওয়ারুছ ছহীফাহ, যঈফ তিরমিযী, হা/৬৭৪।
[4]. যিকরুল মুদালিস্নসীন, রাবী নং ১৭।
[5]. আল-মুদালিস্নসীন, রাবী নং ৪০।
[6]. আত-তাবঈন লিআসমাইল মুদালিস্নসীন, রাবী নং ৪৬।
[7]. তাকরীবুত তাহযীব, রাবী নং ৪১৯৩।
[8]. ত্ববাক্বাতুল মুদালিস্নসীন, রাবী নং ৮৩।
[9]. আছ-ছিক্বাত, রাবী নং ৯১৫৬।
[10]. তাযকিরাতুল হুফফায, রাবী নং ১৬৪/১১।
[11]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৪৬।
[12]. আবুদাঊদ, হা/১৬২২।
[13]. প্রাগুক্ত।
[14]. তাক্বরীবুত তাহযীব, রাবী নং ১২২৭।
[15]. মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক্ব, হা/৫৭৮৫।
[16]. ইবনু হাজার, ত্বাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন, জীবনী নং ১০২।
[17]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৯৩৬।
[18]. ত্বাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন, রাবী নং ১৪০; আল-ফাতহুল মুবীন, পৃঃ ১৫৯।
[19]. আত-তাবঈন লি-আসমাইল মুদাল্লিসীন, জীবনী নং ৩৯।
[20]. আসমাউল মুদাল্লিসীন, জীবনী নং ২৯।
[21]. মারাসীলে আবুদাঊদ, হা/১২০।
[22]. তাক্বরীবুত তাহযীব, জীবনী নং ৬২৯৬; ত্বাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন, জীবনী নং ১০২; আল-কওলুল মাতীন, পৃঃ ৩৬; আল-ফাতহুল মুবীন পৃঃ ১২১।
[23]. শারহু মা‘আনিল আছার, হা/৩১২৯।
[24]. তারীখে ইবনে ইউনুস, ক্রমিক ৪৬১।
[25]. শারহু মা‘আনিল আছার, হা/৩১৩০।
[26]. শারহু মা‘আনিল আছার, হা/৩১৩২।
[27]. ক্বাসেম ইবনে সালাম, আল-আমওয়াল, হা/৬১৬।
[28]. মাগানিউল আখইয়ার, জীবনী নং ১০৯।
[29]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, হা/১০৩৩৭।
[30]. ইবনে হাজার আসক্বালানী, তাহযীবুত তাহযীব, জীবনী নং ১৯১।
[31]. ইবনে হাজার আসক্বালানী, তাক্বরীবুত তাহযীব, জীবনী নং ৭৩১২।
[32]. মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক্ব, হা/৫৭৭৬।
[33]. ইবনে হাজার আসক্বালানী, ত্বাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন, ক্রমিক ৫১।
[34]. মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক্ব, হা/৫৭৭৭।
[35]. শারহুল মা‘আনিল আছার, হা/৩১৩৪।
[36]. তাহযীবুত তাহযীব, জীবনী নং ৩৬৫; ত্বাবাক্বাতুল মুদালিস্নসীন, জীবনী নং ১১৮; তাক্বরীবুত তাহযীব, জীবনী নং ১১১৯।
[37]. আত-তারীখুল কাবীর, জীবনী নং ২৮৩৫; আয-যু‘আফাউছ ছগীর, জীবনী নং ৭৬।
[38]. আল-মাজরূহীন, জীবনী নং ২০৪।
[39]. আল-কামিল, জীবনী নং ৪০৬।
[40]. তারীখে আসমাঈয যু‘আফা ওয়াল কাযযাবীন, জীবনী নং ১৪৯।
[41]. আয-যু‘আফাউল মাতরূকীন, জীবনী নং ৭৬৫।
[42]. আল-কাশিফ, জীবনী নং ৯২৮; মীযানুল ই‘তিদাল, জীবনী নং ১৭২৬।
[43]. নাসাঈ, হা/৪৯৮৩।
[44]. মিরকাতুল মাফাতীহ, ৫/২১০০ পৃঃ।
[45]. আস-সুনানুল কুবরা, হা/৭৪০।
[46]. আল-ইলাল, ৫/১৬৭।
[47]. শারহু মা‘আনিল আছার, হা/৩১৩৫।
[48]. তাকরীবুত তাহযীব, জীবনী নং ২৪৫১; ত্বাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন, জীবনী নং ৫২; বিস্তারিত দেখুন : হাফেয যুবায়ের আলী যাঈ, আল-ফাতহুল মুবীন, রাবী নং ৫২ -এর আলোচনা দ্রঃ।
[49]. যিকরুল মুদাল্লিসীন, জীবনী নং ১৮।
[50]. আত-তাবঈন লি-আসমাইল মুদাল্লিসীন, জীবনী নং ২৬।
[51]. ত্বাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন, রাবী নং ১০২; আল-ফাতহুল মুবীন, পৃঃ ১২১।
[52]. শারহু মা‘আনিল আছার, হা/৩১৩৬।
[53]. ইবনে হাজার আসক্বালানী, ত্বাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন, ক্রমিক ১০; আল-ফাতহুল মুবীনসহ।
[54]. ইবনে হাজার আসক্বালানী, তাক্বরীবুত তাহযীব, ক্রমিক ১৬৮০।
[55]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, হা/১০৩৪২।
[56]. ইবনে হাজার আসক্বালানী, ত্বাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন, ক্রমিক ৮৩।
[57]. ত্বাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন, ক্রমিক ৩৫।
[58]. মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক্ব, হা/৫৭৬১।
[59]. ত্বাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন, ক্রমিক ১০২।
[60]. তাক্বরীবুত তাহযীব, ক্রমিক ৪০৬৪।
[61]. মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক্ব, হা/৫৭৬৬।
[62]. ইবনে হাজার আসক্বালানী, ত্বাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন, ক্রমিক ৮৩।
[63]. শারহু মা‘আনিল আছার, হা/৩১১৫।
[64]. ইবনে হাজার আসক্বালানী, ত্বাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন, ক্রমিক ৪০; তাক্বরীবুত তাহযীব, ক্রমিক ১২২৭।
[65]. মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক্ব, হা/৫৭৭২।
[66]. দারাকুৎনী, হা/২১২৫।
[67]. আবুদাঊদ, হা/১৬১৬।
[68]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৩; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৮৪।
[69]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৮।
[70]. ফাতাওয়া লাজনাহ দায়েমাহ, ক্রমিক ৬৩৬৪, ৯/৩৬৯ পৃঃ।
