শাওয়াল মাসের অন্যতম মাসনূন আমল হচ্ছে— ৬ দিন ছিয়াম রাখা। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتًّا مِنْ شَوَّالٍ كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ ‘যে ব্যক্তি রামাযানের ছিয়ামের পর শাওয়ালের ৬ দিন ছিয়াম রাখবে, তার সারা বছর ছিয়াম রাখা হবে’।[1]
সারা বছর ছিয়াম রাখার হিসাব হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা প্রতিটি ভালো আমলকে ১০ গুণ বৃদ্ধি করেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا ‘যে ব্যক্তি একটি নেকী করবে, তার জন্য রয়েছে ১০ গুণ’ (আল-আনআম, ৬/১৬০)।
সেই হিসাবে রামাযান মাসের ৩০ ছিয়ামকে ১০ দ্বারা গুণ করলে (৩০×১০=৩০০) হয় ৩০০ দিন। আর শাওয়ালের ৬ ছিয়ামকে ১০ দ্বারা গুণ করলে (৬×১০=৬০) হয় ৬০ দিন। অতএব, সর্বমোট দিন হয় ৩৬০। আর আরবী বছর হয় ৩৬০ দিনে। এভাবে শাওয়াল মাসের ৬ দিন ছিয়াম রাখলে সারা বছর ছিয়াম রাখা হয়।
উপর্যুক্ত হিসাব সরাসরি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও জানিয়ে দিয়েছেন। চলুন সরাসরি তার মুখ থেকে সেই হিসাব শুনি। তিনি বলেন,مَنْ صَامَ سِتَّةَ أَيَّامٍ بَعْدَ الْفِطْرِ كَانَ تَمَامَ السَّنَةِ مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا ‘যে ব্যক্তি ঈদুল ফিতরের পর ৬ দিন ছিয়াম রাখল, তা পূর্ণ বছর ছিয়াম রাখার সমতুল্য। কেউ কোনো সৎকাজ করলে সে তার ১০ গুণ পাবে’।[2] অন্য হাদীছে তিনি বলেন,صِيَامُ شَهْرٍ بِعَشَرَةِ أَشْهُرٍ وَسِتَّةُ أَيَّامٍ بَعْدَهُ بِشَهْرِينِ فَذَلِكَ تَمَامُ السَّنَةِ ‘রামাযানের এক মাস ছিয়াম ১০ মাস ছিয়ামের সমান এবং রামাযানের পর ৬ দিন ছিয়াম দুই মাস ছিয়ামের সমান। এভাবে (রামাযানের পুরো মাস ও শাওয়ালের ৬ দিন ছিয়াম) এক বছর ছিয়ামের সমান হয়’।[3]
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কারো যদি রামাযানের ছিয়াম বাকি থাকে, তাহলে শাওয়ালের ৬টি ছিয়াম রাখার আগে তাকে রামাযানের বাকি ছিয়াম রাখতে হবে, না-কি শাওয়ালের ৬টি ছিয়াম রেখে বছরের যেকোনো সময় রামাযানের বাকি ছিয়াম রাখবে—এ নিয়ে আলেমদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। চার মাযহাবের তিন মাযহাব তথা হানাফী, মালেকী ও শাফেঈ মাযহাব মতে রামাযানের ক্বাযা ছিয়াম আদায় করার পূর্বে শাওয়ালের ৬টি ছিয়াম রাখা যাবে। আর হাম্বলী মাযহাব মতে প্রথমে রামাযানের ক্বাযা ছিয়াম আদায় করতে হবে, এরপর শাওয়ালের ছিয়াম রাখতে হবে। তাদের মতে, রামাযানের ক্বাযা ছিয়াম আদায় করার পূর্বে শাওয়ালের ছিয়াম রাখা বৈধ নয়। এমনকি কেউ কেউ তা বিদআত বলেছেন।[4]
তবে এ কথা প্রায় সবাই বলেছেন যে, যদি ক্বাযা ছিয়ামের পরিমাণ কম হয় আর শাওয়ালের ছিয়ামের পূর্বে তা আদায় করা সহজ হয়, তাহলে প্রথমে ক্বাযা ছিয়াম আদায় করার পর শাওয়ালের ছিয়াম আদায় করা ভালো।
কিন্তু কেউ যদি বিনা কারণে ক্বাযা ছিয়াম প্রথমে আদায় না করে বা কোনো কারণবশত আদায় করতে না পারে, তাহলে তার ক্ষেত্রে তিন মাযহাবের মত সঠিক। অর্থাৎ রামাযানের ক্বাযা ছিয়াম আদায় করার পূর্বে শাওয়ালের ছিয়াম রাখা বৈধ। কারণ, রামাযানের ক্বাযা ছিয়াম আদায় না করলে শাওয়ালের ছিয়াম রাখা যাবে না—এ মর্মে কুরআন ও হাদীছে কোনো নিষেধাজ্ঞা আসেনি। তাছাড়া ফরয ছিয়ামের পূর্বে নফল ছিয়াম রাখা যাবে না—এমন কোনো কথাও কিতাব ও সুন্নাহতে পাওয়া যায় না।
যারা বলেন রামাযানের ক্বাযা ছিয়াম আদায় না করার পূর্বে শাওয়ালের ছিয়াম রাখা যাবে না, তাদের দলীল ও আপত্তিগুলো তিন ভাগে ভাগ করা যায়। নিম্নে তাদের দলীল ও আপত্তিগুলোর জবাবও প্রদত্ত হলো।
প্রথম আপত্তি: কেউ কেউ বলেন, শাওয়ালের ছিয়াম তিনি রাখতে পারবেন, যিনি রামাযান মাসেই রামাযানের পূর্ণ ছিয়াম আদায় করবেন। কারণ, হাদীছে বলা হয়েছে,مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتًّا مِنْ شَوَّالٍ كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ ‘যে ব্যক্তি রামাযানের ছিয়ামের পর শাওয়ালের ৬ দিন রোযা রাখবে, তার সারা বছর ছিয়াম রাখা হবে’।[5]
অতএব, যে ব্যক্তি রামাযান মাসে রামাযানের ছিয়াম পূর্ণ করেনি, তার ক্ষেত্রে বলা যাবে না যে, সে রামাযানের ছিয়াম রেখেছে; বরং সে তো রামাযানের আংশিক ছিয়াম রেখেছে।[6]
জবাব: (ক) আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ
‘যাতে তোমরা (রামাযানের ছিয়ামের) সংখ্যা পূরণ করতে পারো এবং আল্লাহ প্রদত্ত হেদায়াতের কারণে আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করতে পারো’ (আল-বাক্বারা, ২/১৮৫)। এই আয়াতের আলোকে আলেমগণ বলেন যে, রামাযান মাস শেষ হলে ঈদুল ফিতরের তাকবীর দেওয়া শুরু করতে হবে।
আয়াতের দিকে লক্ষ করুন, আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রামাযানের ছিয়াম পূর্ণ করার পর তোমরা তাকবীর দাও। অথচ কেউ বলেন না যে, ঈদের তাকবীর শুধু সে দেবে, যে রামাযান মাসে ছিয়াম পূর্ণ করেছে; যার কোনো কারণবশত বা বিনা কারণে ছিয়াম ছুটে গেছে, সে তাকবীর দিতে পারবে না। তারা এ আয়াতের যে জবাব দেবেন, সে জবাব শাওয়ালের ছিয়ামের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মূলত আয়াতে ছিয়াম পূর্ণ করার দ্বারা উদ্দেশ্য, সামর্থ্য ও সক্ষমতা অনুযায়ী ছিয়াম রাখা। অনুরূপ হাদীছে বর্ণিত রামাযানের ছিয়াম রাখা দ্বারাও একই উদ্দেশ্য।
(খ) এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‘যে ব্যক্তি রামাযানের ছিয়াম রাখবে ঈমান-সহ নেকীর আশায়, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়’।[7]
শাওয়ালের ছিয়ামের ক্ষেত্রে হাদীছে যে শব্দ উল্লেখ রয়েছে, একই শব্দ এই হাদীছেও রয়েছে। তাদের কথামতো শুধু তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করা হবে, যে রামাযান মাসে পূর্ণ ছিয়াম রাখবে। আর যে ব্যক্তি কারণবশত পূর্ণ ছিয়াম রাখতে পারবে না, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করা হবে না। অথচ একথা কেউ বলবে না। অতএব, তারা এ হাদীছের যে জবাব দেবেন, সে জবাব শাওয়ালের ছিয়ামের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
দ্বিতীয় আপত্তি: শাওয়ালের ছিয়াম শুধু সেই রাখতে পারবে, যে রামাযানের ক্বাযা ছিয়াম আদায় করবে। কেউ শাওয়ালের ছিয়াম ততক্ষণ রাখতে পারবে না, যতক্ষণ না সে রামাযানের ছুটে যাওয়া ছিয়াম আদায় করে। কারণ, যে হাদীছে শাওয়ালের ছিয়ামের কথা বলা হয়েছে, সে হাদীছে প্রথমে রামাযানের ছিয়ামের কথা বলা হয়েছে এরপর ثُمَّ أَتْبَعَهُ তথা ‘রামাযানের ছিয়ামের পর’ শাওয়ালের ছিয়ামের কথা বলা হয়েছে।
জবাব: (ক) তাদের এ আপত্তির জবাবে শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ মুখতার শানকীতী বলেন,
ثُمَّ نَقُوْلُ: لَوْ كاَنَ الْأَمْرُ كَمَا ذُكِرَ لَمْ يَشْمُلِ الْحَدِيْثُ مَنْ أَفْطَرَ يَوْماً مِنْ رَمَضَانَ؛ فَإِنَّهُ لَوْ قَضَى فِيْ شَوَّالَ لَمْ يَصْدُقْ عَلَيْهِ أَنَّهُ صَامَ رَمَضَانَ حَقِيْقَةً؛ وَإِنَّمَا صَامَ قَضَاءً وَلَمْ يَصُمْ أَدَاءً.
‘তার জবাবে আমরা বলব, তারা যে আপত্তির কথা ব্যক্ত করেছেন তা সঠিক হলে, সে ব্যক্তিও শাওয়ালের ছিয়াম রাখতে পারবে না, যে রামাযানের একটি ছিয়াম ছেড়ে দিয়েছে। কারণ, সে ব্যক্তি উক্ত ছুটে যাওয়া ছিয়াম শাওয়াল মাসে ক্বাযা করলেও তার ক্ষেত্রে বলা যাবে না যে, সে রামাযানের ছিয়াম রেখেছে। বরং সে তো ক্বাযা ছিয়াম আদায় করেছে; ছিয়াম আদায় করেনি’।[8]
অতএব, তারা এ আপত্তির যে জবাব দেবেন, একই জবাব তাদের আপত্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
(খ) কোনো কোনো বর্ণনায় ثُمَّ أَتْبَعَهُ তথা ‘রামাযানের ছিয়ামের পর’ বাক্য থাকলেও কোনো বর্ণনায় بَعْدَ الْفِطْرِ তথা ‘রামাযান শেষে’ বলা হয়েছে। এ থেকে প্রমাণ হয়, রামাযান মাস শেষ হলে রামাযানের ক্বাযা ছিয়াম আদায় করা ছাড়া শাওয়ালের ৬টি ছিয়াম রাখা যাবে।
(গ) কোনো কোনো বর্ণনায় রামাযানের ছিয়ামের পর শাওয়ালের ছিয়াম রাখতে হবে—এমন কোনো ধারাবাহিকতার কথা বলা হয়নি। যেমন:
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ وَسِتًّا مِنْ شَوَّالٍ فَقَدْ صَامَ الدَّهْرَ.
‘যে ব্যক্তি রামাযানের ও শাওয়ালের ৬টি ছিয়াম রাখবে সে গোটা বছর ছিয়াম রাখবে’।[9]
صِيَامُ شَهْرٍ بِعَشَرَةِ أَشْهُرٍ وَسِتَّةُ أَيَّامٍ بَعْدَهُ بِشَهْرِينِ فَذَلِكَ تَمَامُ السَّنَةِ.
‘রামাযানের এক মাস ছিয়াম দশ মাস ছিয়ামের সমান এবং রামাযানের পর ছয় দিন ছিয়াম দুই মাস ছিয়ামের সমান। এভাবে (রামাযানের সব ছিয়াম ও শাওয়ালের ছয় দিন ছিয়াম) এক বছর ছিয়ামের সমান হয়’।[10]
উপর্যুক্ত দুই হাদীছে রামাযানের ছিয়ামের পর শাওয়ালের ছিয়াম রাখতে হবে এমন কোনো কথা বলা হয়নি- যা থেকে প্রমাণ হয়, রামাযানের পর শাওয়াল এমন ধারাবাহিকতা মূল উদ্দেশ্য নয়; মূল উদ্দেশ্য রামাযান মাসের ছিয়াম রাখা এবং শাওয়ালের ছিয়াম রাখা।
তৃতীয় আপত্তি: ফরয ছিয়ামের পূর্বে যেকোনো ধরনের নফল ছিয়াম রাখা যাবে না। কারণ, নফল ছিয়াম আদায় করা ছাড়া কেউ মারা গেলে তাকে পাকড়াও করা হবে না, কিন্তু ফরয ছিয়াম আদায় করা ছাড়া কেউ মারা গেলে তাকে পাকড়াও করা হবে।
জবাব: (ক) তারা তাদের মতের পক্ষে নিম্নের হাদীছটি দলীল হিসেবে পেশ করেন:
وَمَنْ صَامَ تَطَوُّعًا وَعَلَيْهِ مِنْ رَمَضَانَ شَيْءٌ لَمْ يَقْضِهِ فَإِنَّهُ لَا يُتَقَبَّلُ مِنْهُ حَتَّى يَصُومَهُ.
‘যে ব্যক্তি নফল ছিয়াম রাখে আর তার ওপর রামাযানের কোনো ছিয়াম থাকে অথচ তা ক্বাযা আদায় করেনি, তার নফল ছিয়াম কবুল করা হবে না, যতক্ষণ না ক্বাযা ছিয়াম রাখে’।[11]
এ হাদীছ দুর্বল। কারণ, এর সনদে ইবনু লাহিয়্যাহ নামক একজন দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন। তাছাড়া হাদীছের শব্দে ইযত্বিরাব বা বিশৃঙ্খলা রয়েছে।
এ ব্যাপারে আবূ বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর একটি উক্তিও পেশ করা হয়। উক্তিটি হলো— وَأَنَّهُ لاَ يُقْبَلُ نَافِلَةٌ حَتَّى تُؤَدَّى الْفَرِيضَةُ ‘ফরয আদায় করা পর্যন্ত নফল কবুল করা হয় না’।[12] আবূ বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর এ আছারটি দুর্বল। কারণ, সনদে ইনক্বিতা বা বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। এ ছাড়া দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছে।
আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর একটি আছার তথা উক্তিও উল্লেখ করা হয়। আছারটি হলো—
وَسَأَلَهُ رَجُلٌ قَالَ إِنَّ عَلَيَّ أَيَّامًا مِنْ رَمَضَانَ أَفَأَصُوْمُ الْعَشْرَ تَطَوُّعًا قَالَ لَا وَلِمَ إِبْدَأْ بِحَقِّ اللهِ ثُمَّ تَطَوَّعْ بَعْدَ مَا شِئْتَ.
আবূ হুরায়রাকে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেন, আমার রামাযানের কিছু ছিয়াম ক্বাযা আছে। এমতাবস্থায় আমি কি যিলহজ্জ মাসের ১০ দিনের নফল ছিয়াম রাখব? তিনি বললেন, না। কেন এমন করবে? আল্লাহর হক্ব প্রথমে আদায় করো, এরপর তোমার ইচ্ছামতো নফল ছিয়াম রাখো।[13]
আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর এ হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয় না যে, তিনি ফরযের পূর্বে নফল ছিয়াম রাখার পক্ষে ছিলেন না। সম্ভাবনা আছে, তিনি নফল ছিয়ামের পূর্বে ফরয ছিয়াম পূর্ণ করাকে উত্তম মনে করতেন। কারণ, তিনি হারাম মনে করলে তাকে বলে দিতেন, ফরযের পূর্বে নফল ছিয়াম রাখা হারাম। তা না বলে তিনি তাকে বলেন, আল্লাহর হক্ব প্রথমে আদায় করো, এরপর তোমার ইচ্ছামতো নফল ছিয়াম রাখো।
ইমাম ইবনু হাজার আসক্বালানী এ ধরনের কথা উল্লেখ করার পর বলেন,وَظَاهِرُ قَوْلِهِ جَوَازُ التَّطَوُّعِ بِالصَّوْمِ لِمَنْ عَلَيْهِ دَيْنٌ مِنْ رَمَضَانَ إِلَّا أَنَّ الْأَوْلَى لَهُ أَن يَّصُوْمَ الدَّيْنَ أَوَّلًا ‘তার কথা থেকে বোঝা যায়, যার ওপর রামাযানের ছিয়াম ক্বাযা আছে, তার জন্য নফল ছিয়াম রাখা বৈধ। তবে প্রথমে ক্বাযা আদায় করে নেওয়া উত্তম’।[14]
ইবনু হাজার আসক্বালানী যে কথা বলেছেন, তা আরও শক্তিশালী হয় স্বয়ং আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর আরেকটি আছার থেকে। তিনি বলেন,اِبْدَأ بِالْفَرِيضَةِ لاَ بَأْسَ أَنْ تَصُومَهَا فِي الْعَشْرِ ‘তুমি ফরয দিয়ে শুরু করো। যিলহজ্জ মাসের ১০ দিনে তা পালন করতে কোনো সমস্যা নেই’।[15]
(খ) উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত যে, কোনো কারণ ছাড়াই শা‘বান মাস পর্যন্ত ক্বাযা ছিয়াম আদায়ে বিলম্ব করা যাবে।[16]
যদি বিনা কারণে শা‘বান মাস পর্যন্ত ক্বাযা ছিয়াম বিলম্ব করা বৈধ হয়, তাহলে শাওয়ালের ছিয়ামের কারণে বিলম্ব করা কেন বৈধ হবে না? কেউ শাওয়ালের ছিয়ামের কারণে বিলম্ব করলে তাতে দোষ ও সমস্যা কী?! কী বিস্ময়কর কথা যে, বিনা কারণে শা‘বান পর্যন্ত ক্বাযা আদায়ে বিলম্ব করা হালাল কিন্তু শাওয়ালের ছিয়ামের কারণে বিলম্ব করা হারাম! কেউ যদি শাওয়ালের ছিয়াম রাখার কারণে ক্বাযা ছিয়াম শা‘বান মাস পর্যন্ত বিলম্বে করে এবং ক্বাযা ছিয়াম আদায় করার পূর্বে মারা যায়, তাহলে তাকে পাকড়াও করা হবে; অপরপক্ষে কেউ যদি বিনা কারণে ক্বাযা ছিয়াম শা‘বান মাস পর্যন্ত বিলম্বে করে এবং ক্বাযা ছিয়াম আদায় করার পূর্বে মারা যায়, তবে তাকে পাকড়াও করা হবে না—এমন কথাও কি চরম উদ্ভূত নয়?
শায়খ হামাদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুল আযীয হামাদ বলেন,
قَالَ شَيْخُ الْإِسْلَامِ : اَلرَّجُلُ يُؤَخِّرُ الصَّوْمَ مِنْ رَمَضَانَ، يُرِيْدُ أَن يُّؤَخِّرُ قُبَيْلَ رَمَضَانَ اَلآخَرِ، فَإِنَّ هَذَا جَائِزٌ لَهُ وَالْقَضَاءُ مِنْ رَمَضَانَ إِلَى رَمَضَانَ وَقْتٌ مُوَسَّعٌ، فَالْفَضِيْلَةُ فِي اْلاِسْتِعْجَالِ بِذَلِكَ، وَلَكِنِ الْجَوَازُ وَقْتُهُ مُوَسَّعٌ، فَإِذَا أَخَّرَ الْقَضَاءَ - حَيْثُ يَجُوْزُ لَهُ - فَمَاتَ قَبْلَ أَن يَّقْضِيَ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ بِالْإِجْمَاعِ.
শায়খুল ইসলাম বলেছেন, কেউ যদি এ নিয়্যতে রামাযানের ক্বাযা ছিয়াম আদায়ে বিলম্ব করে যে, সামনের রামাযানের কিছুদিন পূর্বে ক্বাযা আদায় করে নেবে, তবে তা জায়েয। কারণ, এক রামাযান থেকে আরেক রামাযান পর্যন্ত যেকোনো সময় তার জন্য ক্বাযা আদায় করা জায়েয। তবে তাড়াতাড়ি আদায় করে নেওয়া উত্তম। কিন্তু আরেক রামাযান পর্যন্ত বিলম্ব করা জায়েয। অতএব, কেউ যদি জায়েযের ভিত্তিতে বিলম্ব করে এবং ক্বাযা আদায়ের পূর্বেই মারা যায়, তাহলে ইজমা অনুযায়ী সে পাপী হবে না।[17]
(গ) নফলের পূর্বে ফরয আদায়ের তাকিদ তখন দিতে হবে, যখন সময় এত সংকীর্ণ হবে যে, ফরয ও নফলের যেকোনো একটা আদায় সম্ভব হবে। ফরয আদায় করলে নফল আদায়ের সময় হবে না অথবা নফল আদায় করলে ফরয আদায়ের সময় হবে না। এ ক্ষেত্রে অবশই নফলের পূর্বে ফরয আদায় করতে হবে। কিন্তু যদি সময় এত প্রশস্ত হয় যে, ফরয ও নফল দুটোই আদায় করা যাবে, তখন ফরযের পূর্বে নফল আদায়ে কোনো সমস্যা নেই। এ ক্ষেত্রে ফরযের পূর্বে নফল আদায়ের শিক্ষা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়েছেন। যেমন যোহরের ফরযের পূর্বে চার রাকআত এবং ফজরের ফরযের পূর্বে দুই রাকআত সুন্নাত আদায় করতে তিনি ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করেছেন। একই কথা রামাযানের ক্বাযা ছিয়াম আদায়ের পূর্বে শাওয়ালের ছিয়াম রাখার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এক রামাযান থেকে আরেক রামাযান পর্যন্ত যেহেতু ক্বাযা আদায়ের সময়, তাই ক্বাযা আদায় না করে এর মাঝে যেকোনো নফল ছিয়াম আদায় করা জায়েয। এ কারণে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা শা‘বান পর্যন্ত ক্বাযা ছিয়াম আদায়ে বিলম্ব করতেন।[18]
আর আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা গোটা বছরে কোনো নফল ছিয়াম রাখতেন না, তা হতেই পারে না। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তায়মিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
لِأَنَّ عَائِشَةَ أَخْبَرَتْ أَنَّهَا كَانَتْ تَقْضِيْ رَمَضَانَ فِيْ شَعْبَانَ، وَيَبْعُدُ أَن لَّا تَكُوْنَ تَطَوَّعَتْ بِيَوْمٍ، مَعَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَصُوْمُ حَتَّى يُقَالَ: لَا يُفْطِرُ، وَيُفْطِرُ حَتَّى يُقَالَ: لَا يَصُوْمُ، وَكَانَ يَصُوْمُ يَوْمَ عَرَفَةَ وَعَاشُوْرَاءَ، وَكَانَ يُكْثِرُ صَوْمَ اْلِاثْنَيْنِ وَالْخَمِيْسِ، وَكَانَ يَصُوْمُ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ.
আয়েশা জানাচ্ছেন, তিনি শা‘বান মাসে রামাযানের ক্বাযা আদায় করতেন। আর এটা হতেই পারে না যে, তিনি এর মাঝে একদিনও নফল ছিয়াম রাখতেন না। অথচ নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনভাবে ছিয়াম রাখতেন যে, বলা হতো তিনি আর ছিয়াম ছাড়বেন না, আবার এমনভাবে ছিয়াম ছাড়া শুরু করতেন যে, বলা হতো তিনি আর ছিয়াম রাখবেন না। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফা ও আশূরার ছিয়াম রাখতেন, বেশি বেশি সোম ও বৃহস্পতিবারের ছিয়াম রাখতেন এবং প্রত্যেক মাসে তিন দিন ছিয়াম রাখতেন।[19]
বরং আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা শা‘বানের পূর্বে নফল ছিয়াম রাখতেন তা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। তিনি বলেন,مَا مِنَ السَّنَةِ يَوْمٌ أَحَبُّ إلَيَّ أَنْ أَصُومَهُ مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ ‘আরাফার দিনের তুলনায় বছরে এমন কোনো দিন নেই, যেদিন ছিয়াম রাখা আমার কাছে বেশি প্রিয়’।[20]
ইবনু শিহাব যুহরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,أَنَّ عَائِشَةَ وَحَفْصَةَ زَوْجَيْ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَصْبَحَتَا صَائِمَتَيْنِ مُتَطَوِّعَتَيْنِ فَأُهْدِيَ لَهُمَا طَعَامٌ فَأَفْطَرَتَا عَلَيْهِ ‘নবী-পত্নী আয়েশা ও হাফছা দুজন নফল ছিয়াম অবস্থায় ছিলেন। উভয়ের কাছে খাবার হাদিয়া দেওয়া হয়। তারা সেই খাবার খেয়ে ইফতার করেন’।[21]
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় তিনি ক্বাযা আদায়ের পূর্বে নফল ছিয়াম রাখতেন অথচ তিনি তাতে বাধা দেননি। অতএব, প্রমাণিত হয়- ক্বাযা ছিয়াম আদায়ের পূর্বে নফল ছিয়াম রাখতে কোনো অসুবিধা নেই।
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয়, রামাযানের ক্বাযা ছিয়াম আদায় করার পূর্বেই শাওয়ালের ৬টি ছিয়াম রাখতে কোনো অসুবিধা নেই।
আব্দুল্লাহ মাহমুদ
শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বীরহাটাব-হাটাব, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।
[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৪৮; তিরমিযী, হা/৭৫৯।
[2]. ইবনু মাজাহ, হা/১৭১৫, হাদীছ ছহীহ।
[3]. সুনানুন কুবরা লিন নাসাঈ, হা/২৮৭৩, হাদীছ ছহীহ।
[4]. আল-বুরহানুল মুবীন ফিত তাসাদ্দী লিল বিদা ওয়াল আবাতীল, ১/৫২৭।
[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৪৮; তিরমিযী, হা/৭৫৯।
[6]. শারহু যাদিল মুস্তাকনী, ৩/১৫।
[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৮।
[8]. শারহু যাদিল মুস্তাকনী, ১১/২১।
[9]. মুসনাদ আহমাদ, হা/২৩৫৫৬, হাদীছটি গ্রহণযোগ্য।
[10]. সুনানুন কুবরা লিন নাসাঈ, হা/২৮৭৩, হাদীছ ছহীহ।
[11]. মুসনাদ আহমাদ, হা/৮৬২১।
[12]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, হা/৩৫৫৭৪।
[13]. মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হা/৭৭১৫, আছারটি ছহীহ।
[14]. ফাতহুল বারী, ৪/১৪৯।
[15]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, হা/৯৬১০, আছারটি ছহীহ।
[16]. আল-ফুরূ ওয়া তাসহীহুল ফুরূ, ৫/৬২।
[17]. শারহু যাদিল মুস্তাকনী লিল হামদ, ৩/১৮।
[18]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৫০।
[19]. শারহুল উমদাহ লি-ইবনে তায়মিয়া, ‘কিতাবুছ ছিয়াম’, ১/৩৫৮।
[20]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, হা/৯৮০৯, আছারটি ছহীহ।
[21]. মুওয়াত্ত্বা মালেক, হা/১০৮৪।