কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

কিতাবুল ইলম: জ্ঞান অর্জনের স্বরূপ (মিন্নাতুল বারী-১৫তম পর্ব)

post title will place here

حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: حَدَّثَنِي إِبْرَاهِيمُ بْنُ سَعْدٍ، عَنْ صَالِحٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُتْبَةَ بْنِ مَسْعُودٍ، أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَبَّاسٍ أَخْبَرَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بَعَثَ بِكِتَابِهِ رَجُلًا وَأَمَرَهُ أَنْ يَدْفَعَهُ إِلَى عَظِيمِ البَحْرَيْنِ فَدَفَعَهُ عَظِيمُ البَحْرَيْنِ إِلَى كِسْرَى، فَلَمَّا قَرَأَهُ مَزَّقَهُ فَحَسِبْتُ أَنَّ ابْنَ المُسَيِّبِ قَالَ: فَدَعَا عَلَيْهِمْ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنْ يُمَزَّقُوا كُلَّ مُمَزَّقٍ.

৬৪. ব্যাখ্যামূলক অনুবাদ: ইসমাঈল ইবনু আব্দুল্লাহ আমাদেরকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমাকে ইবরাহীম ইবনু সা‘দ হাদীছ বর্ণনা করেছেন, তিনি ছালেহ থেকে, তিনি ইবনু শিহাব থেকে, তিনি উবায়দুল্লাহ ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু উতবা ইবনু মাসঊদ থেকে বর্ণনা করেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা তাকে সংবাদ দিয়েছেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়ার সন্ধি পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজা-বাদশাহর নিকটে ইসলামের লিখিত দাওয়াত পাঠাতে শুরু করেন। তারই ধারাবাহিকতায় তিনি একটি চিঠি পারস্য সম্রাট কিসরার উদ্দেশ্যে লেখেন। তিনি তার একজন ছাহাবীকে এই চিঠি বাহরাইনের শাসকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন, যেন বাহরাইনের শাসক সেই চিঠিটি কিসরার কাছে পাঠিয়ে দেয়। বাহরাইনের শাসক যখন চিঠিটি কিসরার কাছে পৌঁছে দিলেন এবং কিসরা যখন চিঠিটি পড়ল, তখন সে তা ছিঁড়ে ফেলল। বর্ণনাকারী বলেন, আমার ধারণা, ইবনুল মুসাইয়িব বলেছেন, তখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিসরার উপর বদদু‘আ করে বললেন, ‘তাদেরকেও যেন সম্পূর্ণরূপে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হয়’। অর্থাৎ যেমন তারা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চিঠি ছিঁড়ে ফেলেছে, তেমনি তাদের সাম্রাজ্যও যেন টুকরো টুকরো হয়ে যায়।

অধ্যায় ও হাদীছের সাথে সম্পর্ক:

ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ এই হাদীছটি এমন এক অধ্যায়ে এনেছেন, যেখানে মূলত দুটি বিষয় বোঝানো হয়েছে।

প্রথম বিষয়: লিখিত বার্তা বহন করা বৈধ। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দূতের হাতে চিঠি দিলেন এবং তাকে বাহরাইনের শাসকের কাছে পাঠালেন। দূত নিজে হয়তো চিঠির ভেতরের সব কথা পড়েননি বা শুনেননি; কিন্তু তিনি জানতেন যে, এটি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চিঠি। তাই তিনি সেটি যথাযথভাবে পৌঁছে দিলেন। এতে বোঝা যায়, কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তি লিখিত বার্তা বহন করতে পারে, যদিও সে বার্তার সব বিস্তারিত বিষয় নিজে না-ও জানে।

দ্বিতীয় বিষয়: লিখিত বার্তা থেকে জ্ঞান ও দলীল গ্রহণ বৈধ। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু মৌখিকভাবে দাওয়াত দেননি; বরং লিখিত চিঠির মাধ্যমেও রাজা-বাদশাহ ও শাসকদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন।

এতে প্রমাণিত হয় যে, কুরআন ও হাদীছ লিখিতভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো বৈধ তথা মুনাওয়ালা জায়েয। বই, চিঠি, পত্রিকা, দাওয়াতী লিফলেট, লিখিত ফতওয়া, রাষ্ট্রীয় বার্তা এসবই দাওয়াত ও জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার বৈধ মাধ্যম হতে পারে।

রাবীগণের সংক্ষিপ্ত পরিচয়:

এই হাদীছের সনদে মোট ছয়জন রাবী রয়েছেন। তাদের সকলেরই বিস্তারিত পরিচয় ইতঃপূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে। আমরা শুধু তাদের পূর্ণ নাম উল্লেখ করলাম।

১. ইসমাঈল ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু আবী উয়াইস আল-মাদানী।

২. ইবরাহীম ইবনু সা‘দ। তিনি আব্দুর রহমান ইবনু আওফ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বংশধর।

৩. ছালেহ ইবনু কায়সান আল-মাদানী।

৪. বিখ্যাত ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু মুসলিম ইবনু শিহাব আয-যুহরী রাহিমাহুল্লাহ।

৫. উবায়দুল্লাহ ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু উতবা, তিনি মদীনার প্রসিদ্ধ সাত ফক্বীহের একজন।

৬. বিখ্যাত ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা।

সনদের সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য:

এই হাদীছের সনদে কয়েকটি لطائف বা সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য আছে।

(১) হাদীছে বর্ণনার শব্দের ধরনে বিভিন্নতা আছে। সনদে এসেছে-

حدّثنا (হাদ্দাছানা) তিনি আমাদেরকে হাদীছ শুনিয়েছন।

حدّثني (হাদ্দাছানি) তিনি আমাকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।
عن (আন) অমুক থেকে।

أخبره (আখবারাহু) তিনি তাকে সংবাদ দিয়েছেন।

এতে বোঝা যায়, মুহাদ্দিছগণ হাদীছ গ্রহণ ও বর্ণনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিভাষা ব্যবহার করতেন।

(২) সব রাবী মাদানী তথা এই সনদের রাবীগণ সবাই মদীনার অধিবাসী।

(৩) তাবেঈ থেকে তাবেঈর বর্ণনা আছে।

এই সনদে একজন তাবেঈ আরেকজন তাবেঈ থেকে বর্ণনা করেছেন। যেমন ইবনু শিহাব আয-যুহরী রাহিমাহুল্লাহ নিজে একজন তাবেঈ, তিনি এই হাদীছে আরেক তাবেঈ উবায়দুল্লাহ ইবনু আব্দুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন।

শব্দ বিশ্লেষণ:

البحرين- এখানে বাহরাইন বলতে শুধু বর্তমান আধুনিক রাষ্ট্র বাহরাইন উদ্দেশ্য নয়। প্রাচীনকালে বাহরাইন ছিল একটি বিস্তৃত অঞ্চল, যা বাছরা ও ওমানের মধ্যবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

كِسْرَى- কিসরা হলো পারস্য সম্রাটদের উপাধি। যেমন রোমের সম্রাটদের বলা হতোقَيْصَر (কায়ছার)। কায়ছার শব্দটি রোমান বাদশাহ জুলিয়াস সিজারের নাম থেকে গৃহীত। তেমনি পারস্য সম্রাটদের বলা হতো كِسْرَى (কিসরা)। এটি মূলত পারস্য সম্রাট খসরু (خسرو) শব্দ থেকে আরবীতে গৃহীত।

কিছুপ্রশ্নওফিক্বহীব্যাখ্যা:

‘আমার ধারণা’ দ্বারা কে উদ্দেশ্য?

فَحَسِبْتُ أَنَّ ابْنَ الْمُسَيَّبِ قَالَ ‘আমার ধারণা, ইবনুল মুসাইয়িব বলেছেন’। এখানেفحسبت কথাটির বক্তা হলেন ইমাম ইবনু শিহাব আয-যুহরী রাহিমাহুল্লাহ। তিনি বলছেন, ‘আমার ধারণা, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব বলেছেন...’।

এটি মূলত হাদীছ বর্ণনায় মুহাদ্দিছদের সতর্কতা। যেখানে তিনি নিশ্চিত ছিলেন, সেখানে নিশ্চিত ভাষা বলেছেন আর যেখানে সামান্য সন্দেহ ছিল, সেখানে বলেছেন, فحسبت অর্থাৎ ‘আমার ধারণা’।

رَجُلًا বা একজন ব্যক্তি দ্বারা কাকে বোঝানো হয়েছে?

হাদীছে বলা হয়েছে, بَعَثَ بِكِتَابِهِ رَجُلًا ‘তিনি তাঁর চিঠিসহ একজন ব্যক্তিকে পাঠালেন’। এই ব্যক্তি হলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফাহ আস-সাহমী রাযিয়াল্লাহু আনহু। ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ যখন মাগাযী অধ্যায়ে এই হাদীছ নিয়ে এসেছেন, তখন তার নাম স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন। তিনি প্রাথমিক যুগের মুসলিমদের একজন এবং প্রথম দিকের মুহাজির ছাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তার মধ্যে রসিকতাপ্রবণ স্বভাবও ছিল। একবার তিনি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَنْ أَبِي؟ ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা কে?’ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, أَبُوكَ حُذَافَةُ ‘তোমার পিতা হুযাফাহ’।

তারপর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে লাগলেন, ‘আমাকে আরও প্রশ্ন করো’। তখন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে বললেন, মহান আল্লাহকে রব হিসেবে মেনে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে মেনে এবং রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নবী হিসেবে মেনে আমরা সন্তুষ্ট।

এই ছাহাবীর সাথে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর যুগে আরও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফাহ আস-সাহমী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জীবনের এই ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম একটি বীরত্বগাথা এবং আত্মমর্যাদার এক অনন্য দলীল। এটি মূলত হিজরী ১৯ সনে (কারো মতে, হিজরী ২৩ সনে) আমীরুল মুমিনীন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর খেলাফতকালে রোমানদের বিরুদ্ধে জিহাদের সময় ঘটেছিল।

উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু রোমানদের বিরুদ্ধে একদল মুজাহিদ পাঠান, যার মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুও ছিলেন। রোমানরা মুসলিমদের এই দলটিকে বন্দি করে তাদের তৎকালীন রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে সম্রাট হেরাক্লিয়াস (রোম সম্রাট)-এর দরবারে নিয়ে যায়।

রোম সম্রাট আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছাহাবীদের ঈমান ও বীরত্বের কথা জানতেন। তিনি আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে পরীক্ষা করার জন্য এবং খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করার জন্য বললেন, তুমি যদি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ কর, তবে আমি তোমাকে মুক্তি দেব এবং আমার রাজত্বের অর্ধেক তোমাকে দিয়ে দেব। আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু গর্জে উঠে বললেন, আল্লাহর কসম! তুমি যদি তোমার পুরো রাজত্ব এবং সমগ্র আরবের রাজত্বও আমাকে দিয়ে দাও যেন আমি চোখের পলকের জন্য মুহাম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দ্বীন থেকে ফিরে যাই, তবুও আমি তা করব না।

লোভে কাজ না হওয়ায় সম্রাট এবার নিষ্ঠুরতার পথ ধরলেন। দরবারে বিশাল এক তামার কড়াই এনে তাতে তেল ঢেলে ফুটানো হলো। এরপর একজন মুসলিম বন্দিকে নিয়ে এসে সেই ফুটন্ত তেলের কড়াইতে ফেলে দেওয়া হলো। মুহূর্তের মধ্যে তার মাংস গলে হাড় ভেসে উঠল। এই দৃশ্য দেখে আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। জল্লাদরা বাদশাহকে বলল, সে কাঁদছে। বাদশাহ ভাবলেন, আব্দুল্লাহ এবার ভয় পেয়েছেন। তাই তাকে ডেকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন, তখন আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি মৃত্যুর ভয়ে কাঁদছি না। আমি কাঁদছি, কারণ আমার মনে হলো আমার তো প্রাণ মাত্র একটি, যা এখন এই কড়াইতে ঢেলে দেওয়া হবে। আমার আফসোস! আমার যদি এমন শত প্রাণ থাকত এবং আল্লাহর রাস্তায় প্রতিটি প্রাণ এভাবে কুরবান হতো, তবে কতই না উত্তম হতো!

ছাহাবীর এই অতিপ্রাকৃতিক ঈমান দেখে রোম সম্রাট স্তব্ধ ও বিস্মিত হয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন এই মানুষকে হত্যা করে হারানো যাবে না। তখন সম্রাট নিজের সম্মান বাঁচাতে একটি আপসের প্রস্তাব দিয়ে বললেন, তুমি কি আমার মাথায় একটি চুমু দেবে? তাহলে আমি তোমাকে মুক্তি দেব। আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের ব্যক্তিগত মুক্তির জন্য একজন কাফের সম্রাটের মাথায় চুমু দেওয়াকে আত্মমর্যাদার পরিপন্থি মনে করলেন। তিনি পাল্টা শর্ত দিয়ে বললেন, তুমি যদি আমার সাথে থাকা সমস্ত মুসলিম বন্দিকে মুক্তি দাও, তবেই কেবল আমি তোমার মাথায় চুমু দিতে পারি; অন্যথা নয়।

বাদশাহ বললেন, ঠিক আছে, আমি সবাইকে মুক্তি দেব। তখন আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু সকল মুসলিম বন্দির প্রাণের খাতিরে সম্রাটের কপালে বা মাথায় চুমু দিলেন এবং সম্রাট তার ওয়াদা অনুযায়ী সমস্ত মুসলিম বন্দিকে সসম্মানে মুক্তি দিল।

বন্দিদের নিয়ে যখন আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনায় ফিরে এলেন, তখন আমীরুল মুমিনীন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু এই ঘটনা শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। তিনি মদীনার সকল মুসলিমদের ডেকে বললেন,حَقٌّ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ أَنْ يُقَبِّلَ رَأْسَ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ حُذَافَةَ، وَأَنَا أَبْدَأُ ‘প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব হলো আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফাহর মাথায় চুমু দেওয়া, আর এ কাজ আমি নিজেই প্রথম শুরু করছি। অতঃপর উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে গিয়ে সবার সামনে আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কপালে চুমু খেলেন’।[1]

বাহরাইনের শাসক কে ছিলেন?

হাদীছে এসেছে, عَظِيمُ الْبَحْرَيْنِ ‘বাহরাইনের প্রধান ব্যক্তি/শাসক’। তিনি ছিলেন, আল-মুনযির ইবনু সাওয়া। তিনি বাহরাইনের শাসক ছিলেন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে আলা ইবনুল হাযরামী রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে পাঠিয়েছিলেন। তিনি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দাওয়াত পেয়ে সশ্রদ্ধচিত্তে ইসলাম কবুল করেন। তার ইসলাম গ্রহণের কারণে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকেই বাহরাইনের আমীর হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিলেন। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর কিছুদিন পরে আল-মুনযিরও মৃত্যুবরণ করেন। তিনি মৃত্যু পর্যন্ত ঈমানের উপর অটল ছিলেন। তার মৃত্যুর পর বাহরাইন অঞ্চলে মুরতাদ ও মিথ্যা নবীর ফিতনা দেখা দেয়, যা আবূ বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু কঠোর হস্তে দমন করেন।

কিসরার সাম্রাজ্য টুকরা টুকরা হওয়ার বিস্ময়কর ঘটনা এবং রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মু‘জিযা:

কিসরা যখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দাওয়াতের খবর পেল, তখন সে শুধু চিঠি ছিঁড়ে ফেলেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং ইয়ামানে তার প্রতিনিধি বাযান-এর কাছে পাল্টা লিখে পাঠায় এভাবে— ‘আমার কাছে খবর পৌঁছেছে যে, কুরাইশের এক ব্যক্তি নিজেকে নবী বলে দাবি করছে। তুমি তার কাছে যাও এবং তাকে তওবা করতে বলো। যদি সে তওবা করে, তাহলে ভালো আর যদি না করে, তাহলে তার মাথা কেটে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও’।

বাযান এই বার্তা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পাঠালেন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জবাবে লিখলেন,إِنَّ اللهَ وَعَدَنِي بِقَتْلِ كِسْرَى فِي يَوْمِ كَذَا وَكَذَا مِنْ شَهْرِ كَذَا وَكَذَا ‘আল্লাহ আমাকে ওয়াদা করেছেন যে, অমুক মাসের অমুক দিনে কিসরাকে হত্যা করা হবে। তথা কিসরা নিহত হবে’।

বাযান চিঠি পেয়ে বললেন, إِنْ كَانَ نَبِيًّا سَيَكُونُ مَا قَالَ অর্থাৎ তিনি যদি সত্যিই নবী হন, তাহলে তিনি যা বলেছেন তা অবশ্যই ঘটবে।

ইতিহাসের বর্ণনায় এসেছে, কিসরা নিজের ছেলে শেরওয়েহ-এর হাতে নিহত হয়। ইবনু কাছীর উল্লেখ করেন, ওয়াকিদীর বর্ণনা অনুযায়ী কিসরা তার ছেলে শিরোয়াহ-এর হাতে ৭ হিজরীর জুমাদাল উলা মাসের ১০ তারিখ মোতাবেক মঙ্গলবার রাতে নিহত হয়।

ইতিহাসে আরও বর্ণিত হয়েছে, কিসরা পারভেজ আগে থেকেই বুঝেছিল যে, তার ছেলে তাকে হত্যা করতে পারে। তাই সে একটি শিশিতে বিষ রেখে তার উপর লিখে রাখে, الدواء النافع للجماع অর্থাৎ ‘সহবাসের জন্য উপকারী ঔষধ’।

পরে শিরোয়াহ তার পিতা পারভেজকে হত্যা করে রাজকোষে প্রবেশ করে। রাজকোষের গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহশালায় সে এই শিশিটি পায়। সে সেটিকে যৌন শক্তিবর্ধক ঔষধ ভেবে সেবন করে এবং কিছুদিনের মধ্যে সে নিজেও মারা যায়। এভাবেই পারস্য সাম্রাজ্য টুকরা টুকরা হয়ে যায়।

যাহোক, যখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী কিসরা সেই দিনেই নিহত হলো, যেদিনের কথা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছিলেন। তখন এ সংবাদ বাযানের কাছে পৌঁছল এবং সে নিজে ইসলাম গ্রহণ করল। তার সঙ্গে থাকা পারসিকরাও ইসলাম গ্রহণ করল।

এ ঘটনা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুঅতের একটি স্পষ্ট নিদর্শন। তিনি নিজের পক্ষ থেকে গায়েবের খবর দেননি; বরং আল্লাহ তাঁকে যা জানিয়েছিলেন, তিনি তা-ই বলেছেন।[2]

এই হাদীছের শিক্ষা বা সারমর্ম:

১. রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চেইন অফ কমান্ড বা নেতৃত্বের শৃঙ্খল অনুসরণ করতেন। কিসরার কাছে চিঠি পাঠাতে কার মাধ্যমে পাঠাতে হবে, তা তিনি জানতেন।

২. দাওয়াতকে যত মাধ্যমে সম্ভব ছড়িয়ে দেওয়া উচিত। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লেখাপড়া না জানার পরও তাঁর চিন্তাশক্তি এত স্মার্ট ছিল যে, তিনি শুধু মক্কা বা মদীনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং চিঠির মাধ্যমে তৎকালীন বিশ্বের সকল সাম্রাজ্যের কাছে দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন।

৩. অহংকার করা ভালো নয়। অহংকারে অনেক সময় পতন হয়।

৪. সত্য গ্রহণের মানসিকতা সবসময় থাকা উচিত।

৫. নবীদের বদদু‘আ ও অভিশাপ থেকে বেঁচে থাকা উচিত। কেননা নবীদের দু‘আ মহান আল্লাহ কবুল করে থাকেন।

৬. একটি ছোট্ট চিঠি থেকেও একটি সাম্রাজ্যের পতন হয়ে যেতে পারে। তাই কোনো জিনিসকে ক্ষুদ্র হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।

(ইনশা-আল্লাহ! চলবে)


-আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক*

* ফাযেল, দারুল উলূম দেওবান্দ, ভারত; বিএ (অনার্স), মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব;
এমএসসি, ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইউনিভার্সিটি অফ ডান্ডি, যুক্তরাজ্য।


[1]. হাফেয ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী, আল-ইছাবাহ ফী তামঈযিছ ছা্হাবাহ, ৪/৫৮-৫৯ (আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জীবনী); ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/১৪-১৫; ইমাম ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৭/১১১-১১২ (হিজরী ১৯ সনের ঘটনাবলি); আবূ নুয়াইম আল-আসফাহানী, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/১৩৫; ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক, ২৭/৩৪৭-৩৪৯।

[2]. ইমাম ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৪র্থ খণ্ড, ‘নবুঅতের প্রমাণাদি’ অধ্যায়; ইমাম ইবনু জারীর আত-তাবারী, তারীখুত তাবারী, ২/৬৫৪-৬৫৭ (হিজরী ৮ম সনের ঘটনাবলি)।

Magazine