কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

‘আহলেহাদীছ’ নাম নিয়ে কিছু সংশয় ও তার নিরসন

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِىْ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِيْنَ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ يَخْذُلُهُمْ حَتَّى يَأْتِىَ أَمْرُ اللهِ.

অর্থাৎ ‘আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা হক্বের উপর অটল থাকবে। পরিত্যাগকারীরা তাদের কোন ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না। এমনকি ক্বিয়ামত আগমন করবে’।[1] রাসূল (ছাঃ)-এর এই ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী সেই মুক্তিপ্রাপ্ত ও সাহায্যপ্রাপ্ত দল কারা? এর জবাবে আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (১১৮-১৮১ হিঃ), ইয়াযীদ ইবনে হারূন (১১৮-২১৭ হিঃ), আলী ইবনে মাদীনী (১৬১-২৩৪ হিঃ), আহমাদ ইবনে হাম্বল (১৬৪-২৪১ হিঃ) প্রমুখ ইমাম দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা দিয়েছেন, তারা হল ‘আহলেহাদীছ’।

আহলেহাদীছ হচ্ছে মুক্তিপ্রাপ্ত ও আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত দল। সর্বক্ষেত্রে কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহ বাস্তবায়ন করা যাদের লক্ষ্য। তারা এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে কখনো পিছপা নয়। তারা তাদের বুকে সর্বদা এই দৃঢ় প্রত্যয় লালন করে, যেভাবে হোক আমাদেরকে আমাদের মানযিলে মাক্বছাদে পৌঁছতেই হবে। তারা ভালোভাবেই জানে তাদেরকে মানযিলে মাক্বছাদে পৌঁছতে হলে অনেক কিছুই খোয়াতে হবে, পাড়ি দিতে হবে কণ্টকাকীর্ণ পথ। তারপরও তারা এসবকে পরোয়া করে না।

বড় আফসোসের ব্যাপার হচ্ছে! একটি গোষ্ঠী আজ এই মুক্তিপ্রাপ্ত দলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও অপবাদের বোঝা চাপিয়ে দিতে যেন আদাজল খেয়ে নেমেছে। তাদের জীবনের যেন একটাই মিশন, কীভাবে আহলেহাদীছকে লোকের চোখে কলুষিত করা যায়। কীভাবে আহলেহাদীছের গায়ে বিভিন্ন মিথ্যা অপবাদ ও জঘন্য দুর্নামের লেবাস পরিয়ে মানুষের হাতে তুলে দেয়া যায়। তারা ইনছাফ ও আল্লাহভীতিতে মাটি চাপা দিয়ে বলে বেড়ায় আহলেহাদীছ ইংরেজদের দালাল, আহলেহাদীছ নাম ইংরেজ কর্তৃক বরাদ্দকৃত, এদের অস্তিত্ব ইংরেজদের পূর্বে ছিল না, ইংরেজরা তাদেরকে অস্তিত্ব এনেছে ইত্যাদি।

আহলেহাদীছের অস্তিত্বকাল :

আহলেহাদীছের আগমনকাল ইংরেজ আমল নয়। আহলেহাদীছের আগমন হয় ছাহাবী ও তাবেঈদের যুগে। সে যুগে একদল লোক কুরআন ও সুন্নাহকে পিছনে ফেলে দিয়ে নিজেদের আক্বল বা বিবেক দিয়ে ইসলাম বুঝতে শুরু করে, আক্বীদাহ গ্রহণের উৎস বানায় বিবেককে। অন্যদল নিজেদের রায় ও ক্বিয়াছ দিয়ে ফৎওয়া দিতে শুরু করে। উভয় দলের কাছে নিজেদের রায় ও বিবেক কুরআন ও সুন্নাহর উপর বিজয়ী হয়। তারা বিবেক ও রায়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পর গৃহীত সিদ্ধান্তকে শক্তিশালী করার জন্য কুরআন ও সুন্নাহ থেকে দলীল পেশ করত। সে সময় তাদের নাম রাখা হয় ‘আহলুর রায়’। আহলে রায় দ্বারা যেমন উভয় দলের ইমামদের বুঝানো হত, ঠিক তেমনিভাবে যেসব সাধারণ জনগণ তাদের অনুসরণ করত, তাদেরকেও আহলে রায় বলা হত। উক্ত দলের বিপক্ষে আরেকটি দল অবস্থান নেয়। তারা নিজেদের বিবেক ও রায়কে কুরআন ও সুন্নাহর উপর প্রাধান্য দেয়াকে মেনে নিতে পারেনি। তারা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দেয়, কুরআন ও সুন্নাহর উপর কোন কিছু প্রাধান্য পেতে পারে না। কুরআন ও সুন্নাহকে নিঃশর্তভাবে আমরা মেনে নিতে বাধ্য। চাই বিবেক ও রায় তার অনুকূলে হোক বা প্রতিকূলে হোক। উক্ত দলের বিপক্ষে যারা নিজেদের বিবেক ও রায়ের উপর কুরআন ও সুন্নাহকে প্রাধান্য দিত, তারাই হচ্ছে আহলেহাদীছ। আহলেহাদীছ দ্বারা যেভাবে এই দলের ইমামদের বুঝান হত, ঠিক তেমনিভাবে তাদের অনুসারী সাধারণ জনগণকেও বুঝানো হত। আহলেহাদীছ ও আহলে রায়ের মাঝে যে পার্থক্য তা নিয়ে ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী (রহঃ) তার অতুলনীয় কিতাব ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগাহ’তে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আগ্রহী পাঠকগণ তা পড়তে পারেন।

আহলেহাদীছ দ্বারা শুধু মুহাদ্দিছগণ উদ্দেশ্য নয় :

যখন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হয় যে, আহলেহাদীছের সূচনা ইংরেজ আমলে হয়নি; বরং তার সূচনা হয় ছাহাবী ও তাবেঈদের যুগে, তখন তারা আরেক নতুন বাহানা উত্থাপন করে বলে, আহলেহাদীছ দ্বারা জনসাধারণ উদ্দেশ্য নয়; আহলেহাদীছ দ্বারা মুহাদ্দিছগণ উদ্দেশ্য।

এটা একটা তাদের শুভঙ্করের ফাঁকি মাত্র। তৎকালীন সময় থেকে আহলেহাদীছ দ্বারা যেমন মুহাদ্দিছগণকে বুঝানো হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে জনসাধারণকেও বুঝানো হয়েছে। শুধু মুহাদ্দিছগণকে বুঝানো হয়নি। কেননা আহলেহাদীছ পরিভাষা আহলে রায়ের বিপক্ষে ব্যবহৃত হত। আর আহলে রায় দ্বারা শুধু আহলে রায়দের ইমামদের বুঝানো হয়নি; বরং তাদের অনুসারীদেরকেও বুঝানো হয়েছে। কেউ একথা বলবে না যে, আহলে রায় দ্বারা শুধু তাদের নেতা বা ইমামগণ উদ্দেশ্য। ঠিক অনুরূপভাবে আহলেহাদীছ দ্বারা শুধু আহলেহাদীছের ইমামগণ তথা মুহাদ্দিছগণ উদ্দেশ্য নন; বরং তাদের মানহাজের অনুসারী সাধারণ জনগণও আহলেহাদীছ পরিভাষার শামিল।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ)-এর বক্তব্য-

إن لم يكونوا أصحاب الحديث فلا أدري من هم؟

অর্থাৎ ‘মুক্তিপ্রাপ্ত দল যদি আহলেহাদীছ না হয়, তবে আমি জানি না তারা কারা?’ এর উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে ক্বাযী ইয়ায (রহঃ) (৪৭৬-৫৪৪ হিঃ) বলেন,

أراد أحمد أهل السنة ومن يعتقد مذهب أهل الحديث.

অর্থাৎ ‘ইমাম আহমাদ একথা দ্বারা আহলে সুন্নাত ও যারা আহলেহাদীছের মাযহাব অনুসরণ করে, তাদেরকে বুঝিয়েছেন’।[2] এখানে অতি স্পষ্টভাবে ক্বাযী ইয়ায (রহঃ) বললেন, আহলেহাদীছ দ্বারা যেমন মুহাদ্দিছগণ উদ্দেশ্য, ঠিক তেমনিভাবে যেসব সাধারণ জনগণ তাদের মানহাজের অনুসরণ করে, তারাও আহলেহাদীছ দ্বারা উদ্দেশ্যে।

আমরা চার মাযহাবের কিতাবেও অহরহ দেখতে পাই আহলেহাদীছ শব্দটি অন্যান্য মাযহাবের যেমন: হানাফী, মালেকী, শাফেঈ, হাম্বালী, যাহেরী ইত্যাদির বিপরীতে ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা চার মাযহাবের কিতাব থেকে মাত্র একটি করে উদাহরণ পেশ করব, যাতে আহলেহাদীছকে অন্যান্য মাযহাব থেকে আলাদা করে বা বিপক্ষে ব্যবহার করা হয়েছে।

(১) হানাফী মাযহাব :

এক মাসআলা বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে,خلافا للحنابلة والظاهرية وعامة أهل الحديث অর্থাৎ, ‘এটা হাম্বলী মাযহাব, যাহেরী মাযহাব ও অধিকাংশ আহলে হাদীছের বিপরীত’ ।[3]

(২) মালেকী মাযহাব :

চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণের ছালাত একই না ভিন্ন-ভিনণ, তা বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে,

ومذهب الشافعي وأحمد وداود وسائر أهل الحديث

অর্থাৎ ‘এটা শাফেঈ, আহমাদ, দাঊদ যাহেরী ও সমস্ত আহলেহাদীছের মাযহাব’।[4]

(৩) শাফেঈ মাযহাব :

لأن أهل الحديث يقولون: الخير والشر جميعا اللّٰه فاعلهما ولا إحداث للعبد فيهما، والمعتزلة يقولون: يخلقهما ويخترعهما وليس اللّٰه فيهما صنع

অর্থাৎ ‘কেননা, আহলেহাদীছরা বলে, ভালো-মন্দ উভয়ের কর্তা আল্লাহ, বান্দা তা সৃষ্টি করে না। মু‘তাযিলীরা বলে, বান্দা উভয়টা সৃষ্টি করে ও উদ্ভাবন করে, আল্লাহ তা সৃষ্টি করেন না’।[5]

(৪) হাম্বলী মাযহাব :

جمهور أهل العلم من الحنفية والمالكية والشافعية والحنابلة وطائفة من أهل الحديث رحمة الله على الجميع على أن النكاح ليس بواجب وأنه مندوب ومستحب.......وذهب فقهاء الظاهرية إلى القول بوجوب النكاح

অর্থাৎ ‘হানাফী, মালেকী, শাফেঈ, হাম্বলী মাযহাবের বিদ্বানদের অধিকাংশ ও আহলেহাদীছের একদলের মতে সকলের উপর বিবাহ ওয়াজিব নয়। বরং তা মানদূব, মুস্তাহাব .......। যাহেরী মাযহাবের ফক্বীহগণ এ মতের দিকে গেছেন যে, বিবাহ ওয়াজিব’।[6]

সম্মানিত পাঠক! অবশ্যই লক্ষ্য করেছেন যে, চার মাযহাবের কিতাবেই চার মাযহাব, যাহেরী মাযহাব ও মু‘তাযিলীদের পাশাপাশি আহলেহাদীছকেও স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। চার মাযহাব, যাহেরী মাযহাব ও মু‘তাযিলা বলতে যেমন তাদের অনুসরণীয় ইমামগণের সাথে সাথে তাদের অনুসারীদের বুঝায়, ঠিক তেমনিভাবে আহলেহাদীছ বলতে তাদের ইমামগণ তথা মুহাদ্দিছগণের সাথে সাথে যারা মুহাদ্দিছগণের মানহাজ অনুযায়ী চলে, তাদেরকেও বুঝায়।

হানাফী মাযহাবের কিতাব থেকে আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাচ্ছি, যার দ্বারা সূর্যালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, আহলেহাদীছ দ্বারা মুহাদ্দিছগণের পাশাপাশি আহলেহাদীছ মানহাজের অনুসারী জনসাধারণকেও বুঝানো হত। ঘটনাটি নিম্নরূপ:

حكي أن رجلا من أصحاب أبي حنيفة خطب إلى رجل من أصحاب الحديث ابنته في عهد أبي بكر الجوزجاني فأبى ألا أن يترك مذهبه فيقرأ خلف الإمام، ويرفع يديه عند الانحطاط نحو ذلك فأجابه فزوجه

‘বর্ণিত আছে, আবুবকর আল-জাওযাজানীর যুগে হানাফী মাযহাবের এক ব্যক্তি তার মেয়ের বিবাহের প্রস্তাব দিল আহলেহাদীছের এক ব্যক্তির কাছে । সে অস্বীকার করল (বিবাহ করতে) যতক্ষণ না সে তার মাযহাব ত্যাগ করে ইমামের পিছনে ক্বিরাআত পড়ে, রুকূতে যাওয়ার সময় ও এরূপ সময়ে রফউল ইয়াদাইন না করে। সে তাতে সম্মতি দিয়ে বিবাহ দিল’।[7]

এ ঘটনা থেকে প্রমাণিত হল যে, ঘটনার নারীকে হানাফী মাযহাব ত্যাগ করে আহলেহাদীছ হতে হয়। তাকে আহলেহাদীছ হওয়ার প্রমাণস্বরূপ ইমামের পিছনে ক্বিরাআত ও রফউল ইয়াদাইন করতে হয়। তাকে মুহাদ্দিছ হতে হয়নি।

আহলেহাদীছ নাম কি ইংরেজ কর্তৃক বরাদ্দকৃত?

৯৩ হিজরীতে মুহাম্মাদ ইবনে কাসেম কর্তৃক সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে ভারতবর্ষে মুসলিমদের রাজত্ব শুরু হলেও তার পূর্বে অনেক ছাহাবী ও তাবেঈ ব্যক্তিগতভাবে ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচার করেছেন। তাদের মাধ্যমে অসংখ্য লোক ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। কমপক্ষে ২৫ জন ছাহাবী ও ৪০-এর অধিক তাবেঈর পদরেণুতে উপমহাদেশের মাটি ধন্য হয়েছে। আর তখন থেকেই আহলেহাদীছের পদচারণা উপমহাদেশের বুকে।

এর প্রমাণস্বরূপ আমরা শুধু প্রখ্যাত ভূ-পর্যটক শামসুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ আল-মাক্বদেসীর একটি উদ্ধৃতি পেশ করছি। তিনি ৩৭৫ হিজরীতে ভারতের তৎকালীন ইসলামী রাজধানী সিন্ধুর মানছূরায় আসেন। মানছূরা (করাচী) সম্পর্কে তিনি বলেন, أكثرهم أصحاب الحديث অর্থাৎ ‘সেখানকার অধিকাংশ মুসলিম অধিবাসী আহলেহাদীছ’। তিনি আরো বলেন, ক্বাযী আবু মুহাম্মাদ মানছূরী নামে সেখানে দাঊদী মাযহাবের একজন ইমাম আছেন। তার লিখিত অনেক মূল্যবান কিতাব রয়েছে। মুলতানের অধিবাসীরা শী‘আ মতাবলম্বী। প্রত্যেক শহরে কিছু কিছু হানাফী ফক্বীহ আছেন। এখানে মালেকী বা মু‘তাযিলী কেউ নেই, হাম্বলীও নেই’।[8] এখানে বেশ কয়েকটি বিষয় প্রমাণিত হয়। যথা:

(ক) আহলেহাদীছ শব্দটি অন্যান্য মাযহাবের বিপরীতে ব্যবহার করা হয়েছে। যা প্রমাণ করে আহলেহাদীছ স্বতন্ত্র এক মাসলাকের নাম। যার মাঝে জনসাধারণও শামিল।

(খ) আহলেহাদীছ দ্বারা যে জনসাধারণ উদ্দেশ্য, তা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে। কেননা একটি রাজধানীর অধিকাংশ মানুষ মুহাদ্দিছ হওয়া অসম্ভব।

(গ) ইংরেজদের বহুকাল পূর্বে উপমহাদেশে আহলেহাদীছের অস্তিত্ব ছিল।

(ঘ) আহলেহাদীছ নাম ইংরেজরা দেয়নি। কারণ ৩৭৫ হিজরীতে তাদের কোন অস্তিত্ব ছিল না ভারতীয় উপমহাদেশে।

অতএব প্রমাণিত হয়, ইংরেজদের বহুকাল পূর্ব থেকে ভারত উপমহাদেশে আহলেহাদীছের অস্তিত্ব ছিল এবং তারা আহলেহাদীছ নামই তাদের পরিচয়ে ব্যবহার করত। তাই একথা বলার কোন সুযোগই নেই যে, আহলেহাদীছ নাম ইংরেজরা রাখে, উপমহাদেশে আহলেহাদীছের কোন অস্তিত্বই ছিল না ইংরেজদের পূর্বে।

কিন্তু আফসোস! একটি গোষ্ঠী আহলেহাদীছের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও নিজেদের মাঝে জমিয়ে রাখা বিষ উদগীরণ করতে গিয়ে বলে, আহলেহাদীছ নাম ইংরেজরা দিয়েছে। ইতিপূর্বে এ নাম ছিল না। তাদের এ দাবীর বাতুলতা প্রমাণের জন্য উপরে উল্লেখিত আল-মাক্বদেসীর বক্তব্যই যথেষ্ট।

তারা তাদের দাবীর পক্ষে আল্লামা হুসাইন আহমাদ বাটালাভী (রহঃ)-এর একটি চিঠির উদ্ধৃতি প্রদান করে থাকে। আমরা উক্ত চিঠির সে অংশটুকু উল্লেখ করব, যা তারা তাদের দাবীর পক্ষে পেশ করে থাকে।

اس فرقہ کے حق میں استعمال لفظ وہابی سرکاری خط و کتابت میں موقوف کیا جاوے اور اھل نام سے مخاطب کیاجائے

‘সুতরাং এ দলের লোকজনের বেলায় এ শব্দের (ওয়াহাবী) ব্যবহারের উপর খুবই আপত্তিকরণ এবং পূর্ণ সম্মান ও বিনয়ের সাথে সরকারের নিকট আবেদন করে যে, যেন সরকারীভাবে (হিতাকাঙক্ষী ও নিমক হালালের প্রেক্ষিতে) এ শব্দটি নিষিদ্ধ করে তার ব্যবহার অবৈধ ঘোষণা করা হোক এবং তাদেরকে আহলেহাদীছ নামে সম্বোধন করা হোক। এই দলের ব্যাপারে ওয়াহাবী শব্দের ব্যবহার সরকারী চিঠিপত্রে বন্ধ করা হোক এবং আহলেহাদীছ নামে সম্বোধন করা হোক।[9]

হানাফী মাযহাবের কিতাব ‘তাক্বলীদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা’তে স্যার সৈয়দ আহমাদ থেকে একটি বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। তা নিমণরূপ:

মৌলভী মুহাম্মাদ হোসাইন সরকারকে আবেদন করে যে, এই ফের্কাটি যারা প্রকৃতপক্ষে আহলেহাদীছ, সরকার যেন তাদেরকে ওয়াহাবী নামে সম্বোধন না করে। মৌলভী মুহাম্মাদ হোসাইনের প্রচেষ্টায় সরকার তা অনুমোদন করে। যেন আগামীতে সরকার লেখা-লেখিতে এই দলটিকে ওয়াহাবী শব্দের স্থলে আহলেহাদীছ নামে উল্লেখ করে।[10]

আমরা উপরে হানাফী মাযহাবের কিতাবের উদ্ধৃতিতে দেখলাম, আল্লামা হুসাইন আহমাদ বাটালাভী (রহঃ) সরকারকে এমর্মে চিঠি লিখেননি যে, আপনারা গোটা দেশে এ হুকুম জারী করেন যে, আজ থেকে আমাদের ওয়াহাবী নামে ডাকা যাবে না, আমাদেরকে আহলেহাদীছ নামে ডাকতে হবে এবং আপনারা আমাদের নাম রাখুন ‘আহলেহাদীছ’। শুধু তিনি এমর্মে চিঠি লিখেন যে, যেন সরকারী চিঠিপত্রে ওয়াহাবী লেখা না হয়। ওয়াহাবী শব্দের স্থানে যেন আহলেহাদীছ ব্যবহার করা হয়। অতএব, যারা প্রচার করে বেড়ায় ইংরেজরা আহলেহাদীছ নাম দেয় তারা মূলত সত্যকে ধামাচাপা দিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেয়।

ইংরেজ সরকার আল্লামা হুসাইন আহমাদ বাটালাভী (রহঃ)-এর উক্ত চিঠির উত্তরও তাকে দেয়। আমরা এখন সেই উত্তর পাঠকদের সামনে তুলে ধরব। কেননা সেই উত্তর এই মিথ্যাচারের অট্টালিকাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট করে দিবে আহলেহাদীছ ইংরেজ কর্তৃক দেয়া কোন নাম নয়। প্রথম উত্তর হচ্ছে, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি ইন্ডিয়া গভর্নমেন্ট-এর পক্ষ থেকে পাঞ্জাবের সেক্রেটারি বরাবর লিখেন।

Date 3rd December 1886

From the officiating Secretary to the government of India, Home Department,

To the Secretary of the Punjab.

In reply to your letter No 1044 of the 8th June last, I am directed to say that the Governor General in council issued expresses his concurrence with the views of sir Charles Aithison that the use of the term Wahhabi should be discontinued in official correspondence.

তারিখ: ৩ ডিসেম্বর ১৮৮৬

ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি ভারত সরকার, স্বরাষ্ট্র অধিদপ্তর-এর পক্ষে থেকে

পাঞ্জাব সেক্রেটারি বরাবর।

আপনার চিঠি নাম্বার ১০৪৪, তারিখ ৮ জুন ১৮৮৬-এর জবাবে আমাকে বলতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, গভর্নর জেনারেল কাউন্সিলের জারীতে স্যার চার্লস ইচিসন এর সাথে এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছে যে, আগামীতে সরকারী চিঠিপত্রে ‘ওয়াহাবী’ নামের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

এবার দেখুন ২য় উত্তর, যা আল্লামা হুসাইন আহমাদ বাটালাভী (রহঃ)-কে পাঠানো হয়।

From U.M. Young, Secretary to the Government of Punjab

To Maulvi abu saeed Mohammad Hussain Editor of Ishaat ul sunnah, Lahore

In reply to your letter No 195 of the 12th May last, asking that the use of the expression Wahhabi in reference to the members of the community which you claim to represent may be prohibited in government order.

I am directed to forward the enclosed copy of a letter No 1738 of the 3rd from the officiating Secretary to the government of India in the Home Department, sanctioning discontinuance of the use of the term Wahabi in official correspondence.

I return the books received with your letter No 547 of the 21 September last, together with the original signed notices which you have been good enough to submit in your subsequent letters for the persual of the government.

ইউ.এম ইয়াং পাঞ্জাব সরকারের সেক্রেটারি-এর পক্ষ থেকে

মৌলভী আবু সাঈদ মুহাম্মাদ হুসাইন ইসহাত উল সুন্নাহ, লাহোর এর সম্পাদক বরাবর,

আপনার চিঠি নাম্বার ১৯৫, ১২ই মে এর জবাবে, তাতে আপনি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সদস্যের জন্য ওয়াহাবী শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন, যার প্রতিনিধিত্ব আপনি করেন, সরকারী চিঠিপত্রে এটির ব্যবহার নিষিদ্ধ হতে পারে। জনাব লেফটেনেন্ট গভর্নমেন্ট-এর বিধিমত আপনার কাছে চিঠি নাম্বার ১৭৩৮ মোহরকৃত ৩য়-এর অনুলিপি পাঠাচ্ছি। যাতে ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি অধ্যাদেশ জারী করেছে যে, সরকারী চিঠিপত্রে ওয়াহাবী শব্দ যেন ব্যবহার না করা হয়। উক্ত চিঠির সাথে সেসব বইও ফেরত পাঠাচ্ছি, যা আপনি গত ২১ সেপ্টেম্বর চিঠি নাম্বার ৫৪৭-এর সাথে নিরীক্ষণের জন্য পাঠিয়েছিলেন। আর অরজিনাল স্বাক্ষরিত নোটিশও পাঠানো হল, যেটি সরকারের দৃষ্টি অর্জনের জন্য পরবর্তী চিঠির সাথে আপনাকে জমা দিতে হয়েছে।

এইসব ইংরেজি চিঠি মুসলিম আহলেহাদীছ গেজেট দিল্লী, ডিসেম্বর ১৯৯৩ থেকে গৃহীত। উক্ত গেজেট এসব ইংরেজি চিঠি ‘আখবারে ইংলিশম্যান কলকাতা, নাম্বার ৪৪, প্রকাশ ২২ ফেব্রুয়ারী ১৮৮৭, থেকে নকল করে।[11]

ইংরেজ সরকারের উপরের প্রত্যুত্তরপত্র পাঠকগণ দেখলেন। তারা আহলেহাদীছ নামকরণ করে- এ দাবী তো বহু দূরের কথা। তারা উভয় চিঠিতে একবারের জন্য ‘আহলেহাদীছ’ শব্দটি উল্লেখ করেনি। তারা শুধু বলেছে আগামীতে আমরা আমাদের সরকারী চিঠিপত্রে ওয়াহাবী লিখব না। আর ইতিপূর্বে আল্লামা হুসাইন আহমাদ বাটালাভী (রহঃ)-এর চিঠি ও স্যার সৈয়দ আহমাদের বক্তব্য দেখেছি যে, আল্লামা হুসাইন আহমাদ বাটালাভী (রহঃ) শুধু এমর্মে চিঠি দেন যেন সরকারী চিঠিপত্রে ওয়াহাবী না লেখা হয়। তিনি আবেদন করেননি যে, আমাদের আহলেহাদীছ নামকরণ করা হোক।

আহলেহাদীছকে ওয়াহাবী বলা ছিল সুস্পষ্ট অন্যায় ও বেইনছাফী। এর বিরুদ্ধে আল্লামা হুসাইন আহমাদ বাটালাভী (রহঃ) আওয়ায বুলন্দ করেন। তারই প্রেক্ষিতে তিনি সরকারকে চিঠি দেন যেন ওয়াহাবী বাদ দিয়ে আসল নাম আহলেহাদীছ সরকারী চিঠিপত্রে লেখা হয়। চিঠিতে ছিল না যে, আমরা ওয়াহাবী আর ওয়াহাবী নাম আমাদের ভালো লাগে না। তাই আমাদের নতুন নাম দেয়া হোক বা আহলেহাদীছ নাম দেয়া হোক। তারপরও যদি মেনে নেয়া হয় যে, আল্লামা হুসাইন আহমাদ বাটালাভী আহলেহাদীছ নামকরণের জন্য চিঠি দিয়েছিলেন, তবুও প্রমাণ হয় না যে, ইংরেজরা আহলেহাদীছ নামকরণ করে। কেননা তারা তাদের প্রত্যুত্তরপত্রে আহলেহাদীছ শব্দটি একটি বারের জন্যও উল্লেখ করেনি। এবার পাঠকগণের হাতে ছেড়ে দিলাম, আপনারা বলুন! ইংরেজরা কি আহলেহাদীছ নামকরণ করেছে?

আরো কথা হচ্ছে, এই চিঠি দেয়ার বহু পূর্ব থেকেই ভারতবর্ষে আহলেহাদীছ নাম ব্যবহার হয়ে আসছিল। যারা এই নামে অবহিত হতেন, তারা ইংরেজ সরকারকে চিঠি দেয় তাদের মূল নাম ব্যবহার করার জন্য। কেননা ওয়াহাবী তাদের আসল নাম নয়। তাই তারা এই নতুন নাম নিজেদের জন্য মেনে নিতে পারেননি। তারা ফিরিয়ে পেতে চেয়েছিলেন তাদের মূল সম্পত্তি তথা আহলেহাদীছ নাম।

উক্ত চিঠি ১৮৮৬ সালে দেয়া হয়। যিনি (আল্লামা বাটালাভী) উক্ত চিঠি দেন স্বয়ং তিনি এর পূর্ব থেকে নিজেদেরকে আহলেহাদীছ বলতেন এবং এই নাম পসন্দ করতেন। উক্ত চিঠির পূর্বেই তিনি তার ‘ইশা‘আতে সুন্নাহ’ পত্রিকায় নিজের এবং নিজেদের দলের জন্য আহলেহাদীছ নাম ব্যবহার করতেন। আমরা ১৮৮৬ সালের পূর্বে তার ‘ইশা‘আতে সুন্নাহ’ পত্রিকা থেকে আহলেহাদীছ নাম ব্যবহারের প্রমাণ পেশ করব। স্বয়ং আল্লামা বাটালাভী (রহঃ) লিখেছেন, মাওলানা সাইয়্যেদ নাযীর হুসাইন মুহাদ্দিছ হিন্দুস্থানে এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি ইলমে হাদীছ, ছাত্র ও অনুসারীদের সংখ্যাধিক্যতা এবং জনসাধারণের মাঝে মান্যবরতার দিক থেকে অদ্বিতীয়। সম্মানিত ও মর্যাদাবান ব্যক্তিত্ব এই আহলেহাদীছ জামা‘আতে আরো রয়েছে, যাদের লেখনীর মাধ্যমে ইলমের প্রচার-প্রসার, প্রবন্ধের মাধ্যমে সুন্নাত প্রতিষ্ঠা এবং বিদ‘আদ ও গর্হিত কাজ দূর করার মাধ্যমে দ্বীনের সংস্কার হয়েছে। এই চারটি গুণ বিশেষ করে চতুর্থ গুণের ব্যাপারে তার সমতুল্য আমি কাউকে পাইনি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা বলতে পারি এবং সরকারকে নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, সম্মানিত মাওলানাকে সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন করা মানে আহলেহাদীছ জামা‘আতের সকলকে সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন করা। আর তাকে অসম্মান করা মানে আহলেহাদীছ জামা‘আতকে অসম্মান করা।[12]

আহলেহাদীছের ব্যাপারে কিছু লোক কিছু অপবাদ আরোপ করলে তিনি এক ইশতিহার প্রদান করেন। তা নিম্নরূপ:

এই খাকসার ইশতিহারের মাধ্যমে বর্তমানে প্রচলিত এক হাযার রূপী সে ব্যক্তির জন্য পুরস্কার দেয়ার অঙ্গীকার করছি, যে আহলেহাদীছের উপর আরোপিত অভিযোগ ও অপবাদ তাদের মামুলী ও গ্রহণযোগ্য কিতাব থেকে (পূর্ব, পশ্চিম, আগের ও পরের লোকদের নিকট গ্রহণযোগ্য) প্রমাণ করবে। অথবা সে যে আহলেহাদীছের অনুসারী তা এমন উছূল ও কানূন থেকে প্রমাণ করবে, যার ব্যাপারে অবহিত করেছেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ, মীযানে শা‘রানী বা ইকাফে মুল্লা হায়াত সিন্ধী। অথবা ইশা‘আতে সুন্নাহ সংখ্যা নাম্বার ৬, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৮৪ তে বর্ণিত হয়েছে, তা প্রমাণ করবে।

ইশতিহার দাতা: আবূ সাঈদ মুহাম্মাদ হুসাইন লাহোরী।[13]

পাঠকগণ! লক্ষ্য করলেন তিনি ১৮৮৩ সালে আহলেহাদীছ নাম ব্যবহার করেছেন। আর তিনি ইংরেজদের চিঠি দেন ১৮৮৬ সালে। তার মানে চিঠি দেয়ার ৩ বছর পূর্ব থেকেই তিনি আহলেহাদীছ নাম ব্যবহার করে আসতেন। তাহলে এই আহলেহাদীছ নাম কীভাবে ইংরেজদের দেয়া নাম হতে পারে?

আল্লামা হুসাইন আহমাদ বাটালাভী (রহঃ)-এর চিঠি দেয়ার কারণ :

আল্লামা হুসাইন আহমাদ বাটালাভী (রহঃ) বেশ কিছু কারণকে সামনে রেখে উক্ত চিঠি প্রদান করেছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে:

(ক) তৎকালীন সময়ে ইংরেজ সরকার, বিদ‘আতপন্থীসহ আহলেহাদীছের দুশমনরা আহলেহাদীছকে সমাজের চোখে কলুষিত করার জন্য ওয়াহাবী শব্দের ব্যবহার শুরু করে। যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে তৎকালীন সময়ে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে ডাব্লিউ ডাব্লিউ হান্টার কর্তৃক লিখিত ‘দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস’ কিতাব। আর ওয়াহাবী শব্দ সে সময়ে গালি, বিদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতক অর্থে ব্যবহার হত। তাই তিনি মেনে নিতে পারেননি এরূপ ঘৃণিত শব্দ আহলেহাদীছের ব্যাপারে ব্যবহার হোক। যেহেতু ইংরেজ সরকার ওয়াহাবী শব্দের প্রচলন বেশি ঘটায়, তাই তিনি তাদের কাছে এ শব্দ বন্ধের জন্য চিঠি দেন। স্বয়ং আল্লামা হুসাইন আহমাদ বাটালাভী (রহঃ) একথা চিঠিতে উল্লেখ করে বলেন, ওয়াহাবী শব্দ, যা সাধারণত বিদ্রোহী এবং নিমক হারামের অর্থে ব্যবহার হয় এবং যে শব্দের ব্যবহার হিন্দুস্তানের মুসলমিদের ঐ দলটির ব্যাপারে ব্যবহার হয়, যাদেরকে আহলেহাদীছ বলা হয়।[14]

(খ) ওয়াহাবী শব্দের ব্যবহার সে সময়ে ব্যাপকহারে শুরু হয়। এমনকি মূল নাম আহলেহাদীছ হারিয়ে যেতে বসেছিল। তিনি ভাবলেন যদি এই অবস্থা চলতে থাকে, তবে আহলেহাদীছ নামের হয়তো একদিন অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। এর পিছনে যেহেতু ওয়াহাবী শব্দের প্রচলন বেশি দায়ী ছিল, তাই তিনি ওয়াহাবী শব্দের ব্যবহার বন্ধ করতে চান।

(গ) সবচেয়ে বড় কারণ হল, তিনি এর মাধ্যমে আহলেহাদীছ জনগণকে ইংরেজদের নির্যাতন, জেল, মামলা, হত্যা ইত্যাদির মত ভয়ানক অবস্থা থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। কেননা ওয়াহাবী শব্দ আহলেহাদীছদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হত। আর ওয়াহাবী মানেই ইংরেজ বিরোধী। অতএব, তাদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা কর, তাদেরকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলাও, কালাপানিতে নির্বাসন দাও ইত্যাদি। এর সত্যতা আমরা অনেক ইতিহাসবিদের কিতাবাদি থেকে পাই। যা উল্লেখ করার স্থান এটা নয়। প্রয়োজনে অন্য কোন দিন উল্লেখ করা যাবে। এর প্রমাণসরূপ বলতে পারি ১৮৫৭ সালে ইংরেজ বিরোধী আযাদী আন্দোলনের পরে ইংরেজরা আহলেহাদীছের বিরুদ্ধে আম্বালার প্রথম বিদ্রোহ মামলা, আযীমবাদের প্রথম বিদ্রোহ মামলা, মালদহ বিদ্রোহ মামলা, রাজমহল বিদ্রোহ মামলা ও আযীমাবাদের ২য় বিদ্রোহ মামলার মত পাঁচ পাঁচটি মামলা দায়ের করে। এসব মামলার মাধ্যমে তারা আহলেহাদীছদের অবদমিত করার জন্য যুলুম-নির্যাতনের স্টিম রুলার চালিয়েছিল। সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল। জেলখানার নিভৃত প্রকোষ্ঠে অনেককে তিলে তিলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয়েছিল। অনেককে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করা থেকে বিরত রাখার জন্য আন্দামান দ্বীপে কালাপানিতে নির্বাসন দেয়া হয়েছিল। এসব মামলার কারণে অনেক আহলেহাদীছ পরিবার সর্বস্বান্ত হয় এবং বিভিন্ন প্রকার পাশবিক নির্যাতনের সম্মুখীন হয়। এই তৃতীয় কারণ সম্পর্কে স্বয়ং আল্লামা হুসাইন আহমাদ বাটালাভী (রহঃ) এভাবে বলেছেন, একজনের কর্মকাণ্ডর কারণে দলের সকলকে খারাপ ভাবা বিবেক ও ইনছাফে পূর্ণ কথা নয়।

উক্ত দ্বিতীয় কারণকে ইনছাফের দৃষ্টিতে দেখলে প্রমাণিত হয় যে, সীমান্ত এলাকায় বিদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রকে যারা আহলেহাদীছের কাঁধে চাপাচ্ছে তারাও ভালভাবে জানে যে, সেসব বিদ্রোহী ও ষড়যন্ত্রকারীদের কারণে গোটা আহলেহাদীছকে খারাপ বলে চিহ্নিত করা ইনছাফ বিরোধী।[15]

এর আগে তিনি বৃটেনে বিদ্রোহমূলক ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা তুলে ধরে বলেন, এসব লোকদের বিদ্রোহের কারণে কেউ তো গোটা খ্রীস্টান জাতিকে বিদ্রোহী বলে চিহ্নিত করে না।

আহলেহাদীছ পরিচয় দেয়া কি যাবে না?

বর্তমানে আহলেহাদীছ নাম নিয়ে আরেকটি বড় সংশয় সৃষ্টি করে বলা হয় যে, আল্লাহ আমাদেরকে মুসলিম বলে পরিচয় দিতে বলেছেন। তাই আহলেহাদীছ বলে পরিচয় দেয়া যাবে না।

মূলত আহলেহাদীছ একটি বৈশিষ্ট্যগত নাম। কোন গোষ্ঠী কিংবা ব্যক্তির দিকে সম্পৃক্ত করে এ নাম নয়। আর বৈশিষ্ট্যগত নাম নিষিদ্ধ নয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদের অনেক জায়গায় মুসলিমদের একাধিক বৈশিষ্ট্যগত নাম উল্লেখ করেছেন। যেমন: মুহসিন, মুমিন, মুত্তাক্বী, মুহাজির, আনছার ইত্যাদি।

আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি যে, ছাহাবী ও তাবেঈদের যুগ থেকে আহলেহাদীছ নাম চলে আসছে। কেউ কোনদিন এই নাম নিয়ে আপত্তি করেননি। অতএব, যারা আজকে এই নামে পরিচয় দেয়া যাবে না বলছে, তাদের এ ধরনের মত ছাহাবী ও তাবেঈ থেকে শুরু করে সকল সালাফে উম্মাহর উপর নিজের জ্ঞান যাহির করা এবং তাদের উপর মাতাববরি করার শামিল।

তাদেরকে সর্বশেষে একটি প্রশ্ন করতে চাই, আচ্ছা বলুন তো আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত বলে নিজেদের পরিচয় দেয়া যাবে কি-না? এই নামে পরিচয় দিতে না আল্লাহ বলেছেন, না তাঁর রাসূল (ছাঃ) বলেছেন। যদি বলেন, দেয়া যাবে না, তাহলে আপনি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের ইজমা থেকে বেরিয়ে গেলেন। কেননা ইতিপূর্বে এ মত আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের কেউ দেননি। আর যদি বলেন দেয়া যাবে, তাহলে বলব, কেন? আল্লাহ তো শুধু মুসলিম পরিচয় দিতে বলেছেন, আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত বলে পরিচয় দিতে বলেননি। এর জবাবে আপনি যে জবাব দিবেন, সেই জবাব আমাদেরও। আল্লাহ আমাদের বুঝার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

আব্দুল্লাহ মাহমূদ বিন শামসুল হক


[1]. তিরমিযী হা/২৩৯৩।

[2]. ফাতহুল বারী ১/১১৫।

[3]. শারহু ফাৎহিল ক্বাদীর ২/৪৬৩।

[4]. আশরাফুল মাসালিক ৬১, টীকা; ইরশাদুস সালিক ৫৩, টীকা।

[5]. আল-মাজমূ‘ ৩/২৬৪।

[6]. শারহু যাদিল মুস্তাকনি‘ লিশ-শানকীতী ১১/১৭৫ পৃঃ।

[7]. রদ্দুল মুহতার ১৫/২৬৮; হাশিয়া রদ্দুল মুহতার ৪/২৪৯।

[8]. আহসানুত তাক্বাসীম, পৃঃ ৪৮১; আহলেহাদীছ কী ও কেন? ২৮নং পাদটীকা দ্রষ্টব্য।

[9]. প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাসঊদ আহমাদ, ‘তাকলীদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা’, ভাষান্তর: মাওলানা হারূন ইযহার, প্রকাশক: মুহাম্মদ আবু তৈয়ব চৌধুরী, প্রকাশকাল: ১৫ এপ্রিল ২০১১, পৃঃ ৬৩।

[10]. তাকলীদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা, পৃঃ ৬৪।

[11]. তারীখে আহলেহাদীছ, সংকলক: ড. বাহাউদ্দীন ১/১২৪-১২৫।

[12]. ইশা‘আতে সুন্নাহ, খণ্ড ৬, ১৮৮৩ খ্রীস্টাব্দ।

[13]. ইশা‘আতে সুন্নাহ, সংখ্যা নাম্বার ৫, খণ্ড ৬, মে ১৮৮৩।

[14]. ‘তাক্বলীদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা, পৃঃ ৬৪।

[15]. ইশা‘আতে সুন্নাহ, খণ্ড ৮, ১৮৮৬; তারীখে আহলেহাদীছ, ১/১১৬।

Magazine