(আগস্ট’১৮ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)
দৃষ্টি হিফাযত ও সৌন্দর্য প্রকাশের সীমারেখা তথা পর্দা :
মহান আল্লাহ সমাজ থেকে ব্যভিচার, অশ্লীলতা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড উচ্ছেদের জন্য মুমিন নারী-পুরুষকে দৃষ্টি হিফাযত ও সৌন্দর্য প্রকাশের সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং এ বিধানকে উত্তম ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেন,
قُلْ لِلْمُؤْمِنِيْنَ يَغُضُّوْا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوْا فُرُوْجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللهَ خَبِيْرٌ بِمَا يَصْنَعُوْنَ.
‘মুমিনদেরকে বল, তারা যেন দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে, এতে তাদের জন্য উত্তম পবিত্রতা রয়েছে। তারা যা করে, সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবহিত’ (নূর ২৪/৩০)। আল্লাহ আরো বলেন,
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوْجَهُنَّ وَلَا يُبْدِيْنَ زِيْنَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوْبِهِنَّ وَلَا يُبْدِيْنَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُوْلَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُوْلَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُوْلَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِيْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِيْ أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِيْنَ غَيْرِ أُوْلِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِيْنَ لَمْ يَظْهَرُوْا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاءِ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِيْنَ مِنْ زِيْنَتِهِنَّ وَتُوْبُوْا إِلَى اللهِ جَمِيْعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ.
‘ঈমান আনয়নকারী নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে আর তারা যেন যা সাধারণ প্রকাশমান তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে। তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে। তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নীপুত্র, আপন নারীগণ, তাদের মালিকাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন কামনা রহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত কারও নিকট প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের গোপন আবরণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না ফেলে। হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহ্র দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার’ (নূর ২৪/৩০-৩১)।
আলোচ্য আয়াত দু’টির প্রতি দৃষ্টিপাত করলে তিনটি বিধান পাওয়া যায়, যা আল্লাহ তা‘আলা মুমিন নারী-পুরুষদেরকে নির্দেশ প্রদান করেছেন: (১) দৃষ্টির হিফাযত করা (২) লজ্জাস্থানের হিফাযত করা (৩) সৌন্দর্য প্রকাশের সীমারেখা।
নিমেণ এগুলো সম্পর্কে আলোচনা পেশ করা হল :
(১) দৃষ্টির হিফাযত করা :
দৃষ্টি হিফাযত করা সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, قُلْ لِلْمُؤْمِنِيْنَ يَغُضُّوْا مِنْ أَبْصَارِهِمْ ‘মুমিনদের বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে’ (নূর ২৪/৩০)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ ‘ঈমান আনয়নকারী নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে’ (নূর ২৪/৩১)।
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মুমিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন, যেগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করা আমি হারাম করেছি, সেগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত কর না। হারাম জিনিস হতে চক্ষু নীচু করে নাও। যদি আকস্মিকভাবে দৃষ্টি পড়েই যায়, তাহলে দ্বিতীয়বার আর দৃষ্টি ফেল না।[1] দৃষ্টি হিফাযত সম্পর্কে হাদীছে এসেছে,
عَنْ أَبِىْ سَعِيْدٍ الْخُدْرِىِّ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِيَّاكُمْ وَالْجُلُوْسَ عَلَى الطُّرُقَاتِ فَقَالُوْا مَا لَنَا بُدٌّ إِنَّمَا هِىَ مَجَالِسُنَا نَتَحَدَّثُ فِيْهَا قَالَ فَإِذَا أَبَيْتُمْ إِلَّا الْمَجَالِسَ فَأَعْطُوا الطَّرِيْقَ حَقَّهَا قَالُوْا وَمَا حَقُّ الطَّرِيْقِ قَالَ غَضُّ الْبَصَرِ وَكَفُّ الأَذَى وَرَدُّ السَّلاَمِ وَأَمْرٌ بِالْمَعْرُوْفِ وَنَهْىٌ عَنِ الْمُنْكَرِ.
আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘পথের উপর বসা হতে তোমরা বেঁচে থাক’। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! যদি অন্য কোন ব্যবস্থা না থাকে এবং কথা বলাও যরূরী হয়ে যায়? উত্তরে তিনি বললেন, ‘এমতাবস্থায় পথের হক্ব আদায় করবে’। ছাহবীগণ আবার জিজ্ঞেস করলেন, পথের হক্ব কী, হে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম? জবাবে তিনি বললেন, ‘দৃষ্টি নিম্নমুখী করা, সালামের উত্তর দেওয়া, ভাল কাজের আদেশ দেওয়া ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা’।[2]
عَنْ جَرِيْرٍ قَالَ سَأَلْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ نَظْرَةِ الْفَجْأَةِ فَقَالَ اصْرِفْ بَصَرَكَ.
জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ আল-বাজালী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হঠাৎ দৃষ্টিপাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি আমাকে আমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে নির্দেশ দেন।[3]
عَنْ أَبِىْ رَبِيْعَةَ عَنِ ابْنِ بُرَيْدَةَ عَنْ أَبِيْهِ رَفَعَهُ قَالَ يَا عَلِىُّ لاَ تُتْبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ فَإِنَّ لَكَ الأُوْلَى وَلَيْسَتْ لَكَ الآخِرَةُ.
আব্দুল্লাহ ইবনে বুরায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি তার পিতা থেকে মারফূ‘ সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘হে আলী! বার বার তাকাবে না। তোমার প্রথম দৃষ্টি জায়েয হলেও পরের দৃষ্টি নয়’।[4]
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ اللهَ كَتَبَ عَلَى ابْنِ آدَمَ حَظَّهُ مِنَ الزِّنَا أَدْرَكَ ذَلِكَ لَا مَحَالَةَ فَزِنَا الْعَيْنِ النَّظَرُ وَزِنَا اللِّسَانِ الْمَنْطِقُ وَالنَّفْسُ تَمَنَّى وَتَشْتَهِى وَالْفَرْجُ يُصَدِّقُ ذَلِكَ كُلَّهُ وَيُكَذِّبُهُ.
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা বনী আদমের জন্য যিনার একটি অংশ নির্ধারিত রেখেছেন। সে তাতে অবশ্যই জড়িত হবে। চোখের যিনা হল দেখা, জিহবার যিনা হল কথা বলা, কুপ্রবৃত্তি কামনা ও খায়েশ সৃষ্টি করা এবং যৌনাঙ্গ তা সত্য অথবা মিথ্যা প্রমাণ করে’।[5] আল্লামা খাত্বাবী (রহঃ) এ হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, দেখা ও কথা বলাকে যিনা বলার কারণ এই যে, দু’টিই হচ্ছে প্রকৃত যিনার ভূমিকা, যিনার মূল কাজের পূর্ববর্তী স্তর। কেননা দৃষ্টি হচ্ছে মনের গোপন জগতের উদ্বোধক আর জিহবা হচ্ছে বাণী বাহক আর যৌনাঙ্গ হচ্ছে বাস্তবায়নের হাতিয়ার, সত্য প্রমাণকারী।[6]
সুধী পাঠক! দৃষ্টি পড়ার পর অন্তরে ফাসাদ সৃষ্টি হয় বলেই লজ্জাস্থানকে রক্ষা করার জন্য দৃষ্টি নিম্নমুখী রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দৃষ্টি হল ইবলীসের তীরসমূহের মধ্যে একটি তীর। সুতরাং ব্যভিচার হতে বেঁচে থাকার জন্য দৃষ্টিকে নিমণমুখী করা যরূরী।
(২) লজ্জাস্থানের হিফাযত করা :
আল্লাহ তা‘আলা মুমিন নারী-পুরুষকে তাদের লজ্জাস্থান হিফাযতের নির্দেশ প্রদান করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَيَحْفَظُوْا فُرُوْجَهُمْ ‘তারা যেন তাদের লজ্জাস্থান হিফাযত করে’। وَيَحْفَظْنَ فُرُوْجَهُنَّ ‘মুমিনা নারীগণ যেন তাদের লজ্জাস্থান হিফাযত করে’ (নূর ২৪/৩০-৩১)।
লজ্জাস্থান হিফাযত করা মুমিনের অন্যতম গুণ। আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِيْنَ هُمْ لِفُرُوْجِهِمْ حَافِظُوْنَ - إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُوْمِيْنَ.
‘যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে। তবে তাদের স্ত্রী ও মালিকানাভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে সংযত না রাখলে তারা তিরস্কৃত হবে না’ (মুমিন ২৫/৫-৬)। এখানে উল্লেখ্য যে, লজ্জাস্থান হিফাযত অর্থ হচ্ছে যিনা এবং যিনার দিকে আহবানকারী কাজ যেমন তাকানো, স্পর্শ করা ইত্যাদি যাবতীয় কাজ থেকে নিজেকে হিফাযত করা।[7]
লজ্জাস্থান হিফাযত সম্পর্কে হাদীছে এসেছে,
عَنْ بَهْزِ بْنِ حَكِيْمٍ عَنْ أَبِيْهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ عَوْرَاتُنَا مَا نَأْتِىْ مِنْهَا وَمَا نَذَرُ قَالَ احْفَظْ عَوْرَتَكَ إِلَّا مِنْ زَوْجَتِكَ أَوْ مَا مَلَكَتْ يَمِيْنُكَ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ إِذَا كَانَ الْقَوْمُ بَعْضُهُمْ فِىْ بَعْضٍ قَالَ إِنِ اسْتَطَعْتَ أَنْ لَا يَرَيَنَّهَا أَحَدٌ فَلاَ يَرَيَنَّهَا قَالَ قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ إِذَا كَانَ أَحَدُنَا خَالِيًا قَالَ اللهُ أَحَقُّ أَنْ يُسْتَحْيَا مِنْهُ مِنَ النَّاسِ.
বাহ্য ইবনু হাকীম রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও তার দাদা সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাদের লজ্জাস্থান কতটুকু ঢেকে রাখব এবং কতটুকু খোলা রাখতে পারব? তিনি বলেন, ‘তোমার স্ত্রী ও দাসী ছাড়া সকলের দৃষ্টি হতে তোমার লজ্জাস্থান হিফাযত করবে। বর্ণনাকরী বলেন, যতদূর সম্ভব কেউ যেন অন্যের গোপন অঙ্গের দিকে না তাকায়। বর্ণনাকারী বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাদের কেউ যখন নির্জনে থাকে? তিনি বলেন, লজ্জার ব্যাপারে আল্লাহ মানুষের চেয়ে অধিক হক্বদার’।[8]
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ يَضْمَنْ لِىْ مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الْجَنَّةَ.
সাহ্ল ইবনু সা‘দ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মাঝের বস্তু তথা মুখ এবং দুই রানের মাঝের বস্তু তথা লজ্জাস্থান হিফাযতের নিশ্চয়তা আমাকে দিবে, আমি তার জান্নাতের যিম্মাদার হব’।[9] আবু উমামা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন,
اكْفُلُوْا لِيْ بِستّ أَكْفُلْ لَكُمْ بِالْجَنَّةِ إِذَا حدَّث أَحَدُكُمْ فَلَا يَكْذِبْ وَإِذَا اؤْتُمِنَ فَلَا يَخُن وَإِذَا وَعَد فَلَا يُخْلِفْ وغُضُّوْا أَبْصَارَكُمْ وكُفُّوْا أَيْدِيَكُمْ وَاحْفَظُوا فُرُوْجَكُمْ.
‘তোমরা আমাকে ছয়টি জিনিসের নিশ্চয়তা দাও, তাহলে আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের দায়িত্ব নিব। সেগুলো হল, তোমাদের কেউ যখন কথা বলে, তখন যেন মিথ্যা না বলে। আমানতের খিয়ানত না করে, ওয়াদা ভঙ্গ না করে। তোমরা তোমাদের দৃষ্টি নিমণমুখী রাখবে, হাতকে যুলুম করা হতে বাঁচিয়ে রাখবে এবং নিজের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে’।[10]
(৩) সৌন্দর্য প্রকাশের সীমারেখা :
ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই শালীন পোশাক পরতে নির্দেশ দিয়েছে। আমরা জানি যে, সৃষ্টিগতভাবেই নারী পুরুষের চেয়ে কিছুটা দুর্বল। অপর দিকে আগ্রাসী মনোভাব পুরুষের মধ্যে বেশী। এজন্য নারীর ও সমাজের পবিত্রতা রক্ষার জন্য ইসলামে নারীর পোশাকের পরিধি বৃদ্ধি করা হয়েছে। পুরুষদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় যে, তারা নাভি থেকে হাটু পর্যন্ত শরীর ঢেকে রাখবে। বাকীটুকু রাখা সামাজিকতা ও শালীনতার অংশ, আবশ্যক নয়। অপর দিকে মহিলাদের জন্য পুরো শরীর আবৃত করে রাখতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِيْنَ يُدْنِيْنَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيْبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللهُ غَفُوْرًا رَحِيْمًا.
‘হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মুমিনদের নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়, এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়’ (আহযাব ৩৩/৫৯)।
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মুসলিম রমণীদের সৌন্দর্য বড় চাদর দ্বারা আবৃত করতে নির্দেশ প্রদান করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,
وَقَرْنَ فِيْ بُيُوْتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُوْلَى.
‘তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করবে, প্রাচীন জাহিলী যুগের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না’ (আহযাব ৩৩/৩৩)। বর্বর যুগের সৌন্দর্য প্রদর্শনের অর্থ হচ্ছে মাথা, মুখ, ঘাড়, গলা, বুক, হাত, পা ইত্যাদিকে অনাবৃত রাখা যেন মানুষ তা দেখতে পায়।[11]
সৌন্দর্য প্রকাশের সীমা সম্পর্কে আল্লাহ সূরা নূরের ৩০-৩১ আয়াতে নির্দেশনা দিয়েছেন, যে আয়াত দু’টি এ পর্বের প্রথম দিকে গত হয়ে গেছে।
আলোচ্য আয়াত দু’টিতে আল্লাহ তা‘আলা প্রথমে স্বভাবত যা প্রকাশ পায় বা সাধারণভাবে যা বেরিয়ে থাকে, এমন সৌন্দর্য-অলঙ্কার ছাড়া সকল সৌন্দর্য আবৃত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর স্বামী, কয়েক প্রকারের আত্মীয়, নারী ও শিশুদের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশের অনুমতি প্রদান করেছেন। এ নির্দেশনা ও কুরআন-হাদীছের আলোকে মুসলিম ইমাম ও ফক্বীহগণ উল্লেখ করেছেন যে, মহিলাদের আওরাত বা সতর চার পর্যায়ের :
প্রথম পর্যায় : স্বামীর সামনে স্ত্রীর সতর :
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোন কোনরূপ পর্দা নেই। কোন পোশাকের বিধান নেই। স্বামী স্ত্রীর পোশাক আর স্ত্রী স্বামীর পোশাক। আল্লাহ বলেন, هُنَّ لِبَاسٌ لَكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَهُنَّ ‘তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ’ (বাক্বারাহ ২/১৮৭)।
দ্বিতীয় পর্যায় : অন্যান্য মহিলার সামনে সতর :
উপরে উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহ মুমিন নারীদেরকে আপন নারীগণের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু অমুসলিম নারীর সামনে যেমন ইয়াহূদী, খ্রীস্টান, হিন্দু নারীদের সামনে মুসলিম নারী তার আবরণ প্রকাশ করতে পারবে না।[12] ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন,
فَلَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِالْلَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى عَوْرَتِهَا إِلَّا أَهْلُ مِلَّتِهَا.
‘আল্লাহ্র উপরে এবং আখিরাতের উপর ঈমান স্থাপন করেছে এমন কোন নারীর জন্য বৈধ নয় যে, তার নিজের ধর্মের মহিলা ছাড়া অন্য কোন মহিলা তার আবৃত গুপ্তাঙ্গ দর্শন করবে’।[13] ইবনু আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন,
هُنَّ الْمُسْلِمَاتُ لَا تُبْدِيْهِ لِيَهُودِيَّةٍ وَلَا نَصْرَانِيَّةٍ وَهُوَ النَّحْر والقُرْط والوٍشَاح وَمَا لَا يَحِلُّ أَنْ يَرَاهُ إلا محرم.
‘আপন নারীগণ, মুসলিম নারীগণ। গ্রীবা, বক্ষদেশ, কর্ণ বা কর্ণের অলঙ্কার, গলার অলঙ্কার ও দেহের সে সকল অঙ্গ মাহরাম নিকটাত্মীয় ছাড়া কারো সামনে অনাবৃত করা বৈধ নয়। মুসলিম রমণী তার দেহের সে সকল স্থান কোন ইয়াহূদী-খ্রীস্টান নারীর সামনে অনাবৃত করতে পারবে না’।[14]
মুজাহিদ (রহঃ) বলেন, لَا تَضَعُ الْمُسْلِمَةُ خِمَارَهَا عِنْدَ مُشْرِكَةٍ ‘কোন মুসলিম মহিলা কোন মুশরিক মহিলার সামনে নিজের মাথার ওড়না সরাবে না’।[15]
তৃতীয় পর্যায় : মাহরাম মানুষের সামনে সতর :
পিতা, শ্বশুর, ভ্রাতা ও অন্যান্য নিকটতম আত্মীয় যাদের সাথে বিবাহ চিরতরে হারাম, তাদের সামনে মুসলিম রমণী নিজের শরীর আবৃত করে থাকবে। তবে মুখ, মাথা, গলা, ঘাড়, বাজু, পা ইত্যাদি অনাবৃত রেখে তাদের সামনে যেতে পারেন। তবে এদের সামনেও প্রয়োজন ছাড়া যতটুকু সম্ভব শরীর আবৃত রাখতে হবে।
ইবনু আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا এর ব্যাখ্যায় বলেন,
وَالزِّينَةُ الظَّاهِرَةُ الْوَجْهُ وَكُحْلُ الْعَيْنِ وَخِضَابُ الْكَفِّ وَالْخَاتَمُ فَهَذَا تُظْهِرُهُ فِىْ بَيْتِهَا لِمَنْ دَخَلَ عَلَيْهَا.
প্রকাশ্য সৌন্দর্য-অলঙ্কার হল মুখমণ্ডল, চোখের সুরমা, করতলের মেহেদি ও আংটি। মহিলারা এগুলো তাদের বাড়ীতে আগমনকারী সকলের সামনে প্রকাশ করবে। এ সম্পর্কে তিনি বলেন,
وَالزِّينَةُ الَّتِىْ تُبْدِيْهَا لِهَؤُلاَءِ مِنَ النَّاسِ قُرْطَاهَا وَقِلاَدَتُهَا وَسِوَارُاهَا فَأَمَّا خَلْخَالُهَا وَمِعْضِدَتُهَا وَنَحْرُهَا وَشَعْرُهَا فَإِنَّهَا لاَ تُبْدِيْهِ إِلَّا لِزَوْجِهَا.
‘এ সকল মানুষের জন্য (আয়াতে উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ) তারা যে অলঙ্কারের স্থান প্রকাশ করবে তা হল কানের দুলদ্বয়, গলার হার ও হাতের বালা। বাজুতে পরিহিত অলঙ্কার, পায়ের মল, বক্ষ, চুল ইত্যাদি স্বামী ছাড়া কারো সামনে প্রকাশ করবে না’।১৬
চতুর্থ পর্যায় :
উপরে উল্লিখিত মাহরাম ব্যতীত অন্য সকল আত্মীয় ও অনাত্মীয় পুরুষের সামনে মুসলিম মহিলারা পুরো দেহই আবৃতব্য গুপ্তাঙ্গ। কেবলমাত্র মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয়ের বিষয়ে কিছু মতানৈক্য রয়েছে। তবে সারকথা হচ্ছে, বিবাহ বৈধ এরূপ সকল আত্মীয় ও সকল অনাত্মীয়ের সামনে মুসলিম নারীর উপর ফরয দায়িত্ব হচ্ছে, তিনি পুরো দেহ আবৃত রাখবেন।
(চলবে)
[1]. ইবনু কাছীর, ৬/৪১।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/২৪৬৫।
[3]. আবুদাঊদ, হা/২১৪৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৯২২০।
[4]. আবুদাঊদ, হা/২১৪৯; তিরমিযী, হা/২৭৭৭।
[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৬২৪৩; মিশকাত, হা/৮৬।
[6]. মা‘আলিমুস সুনান, ৩/২২৩ পৃঃ।
[7]. তায়সীরু কারীমির রহমান ফী তাফসীরে কালামিল মান্নান, ১/৫৪৭ পৃঃ।
[8]. আবুদাঊদ, হা/৪০১৭।
[9]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৪৭৪; মিশকাত, হা/৪৮১২।
[10]. সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১৫২৫।
[11]. ইবনু কাছীর, ৪/৪১০।
[12]. প্রাগুক্ত, ৬/৪৭।
[13]. বায়হাক্বী, ৭/৯৫ পৃঃ; ইবনু কাছীর, ৬/৪৭ পৃঃ।
[14]. ইবনু কাছীর, ৬/৪৭ পৃঃ।
[15]. ইবনু কাছীর, ৬/৪৮ পৃঃ।
