কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ইসলামে ‘জামা‘আত’ বলতে কোন্ দলকে বুঝানো হয়েছে? (পর্ব-১১)

উভয় অর্থে জামা‘আতের সাথে থাকা ফরয : মহান আল্লাহ আমাদের উপর জামা‘আতবদ্ধ থাকা ফরয করেছেন এবং এই ফরযিয়াত জামা‘আতের উল্লেখিত উভয় অর্থের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। জামা‘আতবদ্ধ থাকার এই ফরযিয়াত ততক্ষণ বলবৎ থাকবে, যতক্ষণ জামা‘আত থাকবে। প্রশ্ন হচ্ছে, জামা‘আত কতদিন থাকবে? আসুন! আমরা নীচে সেই উত্তরটি তালাশ করি:

ইতিপূর্বে আমরা জামা‘আতের দু’টি অর্থ দেখে এসেছি:

প্রথমতঃ আদর্শ, পথ ও পদ্ধতিগত প্রয়োগ: এই আদর্শ, পথ ও পদ্ধতি হচ্ছে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর ছাহাবীবর্গের গৃহীত ও অনুসৃত পথ ও পদ্ধতি (مَنْهَجٌ/Methodology)। অতএব, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর ছাহাবায়ে কেরামের গৃহীত ও অনুসৃত পথ ও পদ্ধতি অনুযায়ী যে বা যারা চলবে, সে বা তারাই হচ্ছে ‘জামা‘আত। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতের মুক্তিপ্রাপ্ত দলের কথা বলতে গিয়ে বলেন, مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي ‘আমি এবং আমার ছাহাবীবর্গ যে মূলনীতির উপর আছি, তার উপর যে জামা‘আত থাকবে’। এই জামা‘আতের লোকদের মধ্যে ঈমানী বন্ধন হবে লৌহসম মযবূত, যা কিছুতেই ছিড়বার নয়। তাদের মধ্যকার পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও আন্তরিকতা হবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে, কোন সম্পর্কই এর ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে না। এই অর্থে জামা‘আত ছিল, আছে এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত থাকবে; কখনই এর বিদ্যমানতা হারিয়ে যাবে না। কেননা-

১. রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الْحَقِّ، لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ، حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللهِ وَهُمْ كَذَلِكَ ‘আমার উম্মতের একটি দল সর্বদাই হক্বের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। তাদের বিরোধীরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এমনকি এভাবে আল্লাহ্র আদেশ তথা ক্বিয়ামত এসে যাবে, কিন্তু তারা অনুরূপই থেকে যাবে’।[1]

২. অন্য বর্ণনায় এসেছে, لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي مَنْصُورِينَ، لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ ‘আমার উম্মতের একটি দল সর্বদাই বিজয়ী থাকবে। তাদের বিরোধীরা ক্বিয়ামত পর্যন্ত তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না’।[2] এসব বর্ণনা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, এই অর্থে জামা‘আত ক্বিয়ামত পর্যন্ত থাকবে এবং বিজয়ী ও প্রকাশ্যে থাকবে, শত্রুরা যতই একে মিটিয়ে দিতে চাক না কেন, তারা ব্যর্থ হবে।

৩. অন্য হাদীছে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِنَّ اللَّهَ لاَ يَجْمَعُ أُمَّتِي، أَوْ قَالَ: أُمَّةَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، عَلَى ضَلاَلَةٍ، وَيَدُ اللهِ مَعَ الجَمَاعَةِ، وَمَنْ شَذَّ شَذَّ إِلَى النَّارِ ‘আল্লাহ আমার উম্মতকে বা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মতকে কখনও গোমরাহির উপর সমবেত করবেন না। আর জামা‘আতের সাথে আল্লাহ্র হাত রয়েছে। যে ব্যক্তি (জামা‘আত থেকে) আলাদা হয়ে যাবে, সে বিচ্ছিন্নভাবেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে’।[3] এই উম্মত গোমরাহির উপর সমবেত না হওয়ার অর্থই হচ্ছে, তাদের কেউ কেউ সর্বদা হেদায়াতের পথ অবলম্বন করে চলবে; পথভ্রষ্ট হবে না। সেকারণেই গোমরাহির উপর সমবেত না হওয়ার কথা উল্লেখ করার পর জামা‘আতবদ্ধ থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে- যা প্রমাণ করে, এই অর্থে জামা‘আত ক্বিয়ামত পর্যন্ত থাকবে।

৪. জামা‘আতবদ্ধ থাকার আদেশ সম্বলিত দলীলগুলোর দাবী হচ্ছে, জামা‘আতবদ্ধ থাকা প্রত্যেকের জন্য সম্ভব। কেননা ইসলাম কোন অসম্ভব বিষয় পালনের আদেশ করতে পারে না। আর জামা‘আত না থাকলে জামা‘আতবদ্ধ থাকাও অসম্ভব হয়ে যাবে। অতএব, এই অর্থে সর্বদাই জামা‘আত থাকবে এবং এই জামা‘আতবদ্ধ থাকা প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরয, সে যে অঞ্চলের, যে বংশের, যে মাযহাবের, যে দলের, যে সংগঠনেরই হোক না কেন।

দ্বিতীয়তঃ কাঠামোগত প্রয়োগ : মুসলিমরা যখন একজন শাসকের অধীনে একমত হবে, তাকে শাসক হিসাবে মেনে নিবে, তখন তাদেরকে জামা‘আত বলা হবে। তখন এই জামা‘আতের সাথে থাকা এবং তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া ওয়াজিব হয়ে যাবে। জামা‘আতের সাথে থাকার ব্যাপারে শরী‘আতের বহু বক্তব্য এই প্রয়োগকেই বুঝায়; বিশেষ করে যেসব বক্তব্যে শাসক ও বায়‘আতের কথা এসেছে, সেসব। যেখানেই আমীর বা শাসক ও আনুগত্যের কথা এসেছে, সেখানেই জামা‘আতের এই প্রায়োগিক অর্থ প্রযোজ্য; কোন দলীয় বা সাংগঠনিক আমীর নয়। আমাদের দেশে এই হাদীছগুলোর অপব্যাখ্যা, অপব্যবহার ও অপপ্রয়োগ হচ্ছে, যা থেকে দ্রুত ফিরে আসা অতীব যরূরী। এই অর্থে জামা‘আত কখনও থাকতে পারে, আবার কখনও নাও থাকতে পারে। এটা দুইভাবে হতে পারে:

এক. সম্পূর্ণরূপে জামা‘আত বিদ্যমান না থাকা: একটা সময় পৃথিবীর কোথাও এই জামা‘আত নাও থাকতে পারে এবং সেটা ঘটবে শেষ যামানায়। হুযায়ফা রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, فَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُمْ جَمَاعَةٌ وَلاَ إِمَامٌ؟ ‘যদি তাদের জামা‘আত এবং ইমাম না থাকে, (তাহলে আমি কী করবো)’? উত্তরে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, فَاعْتَزِلْ تِلْكَ الفِرَقَ كُلَّهَا، وَلَوْ أَنْ تَعَضَّ بِأَصْلِ شَجَرَةٍ، حَتَّى يُدْرِكَكَ المَوْتُ وَأَنْتَ عَلَى ذَلِكَ ‘তা হলে সেসব ফেরক্বা থেকে তুমি আলাদা থাকবে, যদিও তুমি একটি গাছের গোড়া দাঁত দিয়ে কামড়ে থাকো এবং ঐ অবস্থায় মৃত্যু তোমার নাগাল পায়’।[4]

দুই. কোন এলাকায় বা কোন সময় জামা‘আত বিদ্যমান না থাকা: শাসকের শাসন থেকে কোন কোন এলাকা বের হয়ে যেতে পারে। ইসলামের ইতিহাসে এমনটি বহু ঘটেছে, বিশেষ করে দূরবর্তী, মরু ও দ্বীপাঞ্চলে। অনুরূপভাবে কোন কোন সময় জামা‘আত নাও থাকতে পারে। আর কোন শাসক মারা গেলে বা অপসারিত হলে সামান্য সময়ের জন্য এমনটি ঘটে থাকে। জামা‘আতের সামান্য সময়ের এই অবিদ্যমানতায় কোন ক্ষতি নেই। তবে এই বিরতিতে মুসলিমদের দ্রুত শাসক মনোনীত করা যরূরী; ঠিক যেমনটি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর পরে ছাহাবায়ে কেরাম করেছিলেন। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর পরে তারা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হাতে দ্রুত বায়‘আতের ব্যবস্থা করেছিলেন। সাঈদ ইবনে যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি কি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর সময়কালটা দেখেছেন? তিনি বলেন, জী, হ্যাঁ, দেখেছি। তাকে বলা হলো, শাসক হিসাবে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বায়‘আত কখন সঙ্ঘটিত হয়েছিল? তিনি বললেন, يَوْمَ مَاتَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَرِهُوْا أَنْ يَبْقَوْا بَعْضَ يَوْمٍ وَلَيْسُوْا فِيْ جَمَاعَةٍ ‘যেদিন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা গিয়েছিলেন (সেদিন তার বায়‘আত সঙ্ঘটিত হয়েছিল)। তারা (ছাহাবায়ে কেরাম) একদিনের কিছু অংশও জামা‘আত ছাড়া থাকতে অপসন্দ করেছিলেন’।[5]

বিদ্যমান থাকা বা না থাকার দিক থেকে জামা‘আতের উভয় প্রকার অর্থের মধ্যে সম্পর্ক: পাঁচটি অবস্থা বিশ্লেষণ করলে জামা‘আত শব্দের আদর্শগত ও কাঠামোগত উভয় প্রকার অর্থের মধ্যে পার্থক্য বুঝা যাবে:

প্রথম অবস্থা : সঠিক মানহাজ বা আদর্শ গ্রহণ ও নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হেদায়াত অনুসরণপূর্বক সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের শুধুমাত্র একজন শাসকের অধীনে সমবেত হওয়া। এটা পূর্ণাঙ্গ অবস্থা। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, চার খলীফা এবং উমাইয়া খলীফাগণের শাসনামলে এই অবস্থাই বিদ্যমান ছিল। সকল মুসলিম হক্বের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে একজন শাসকের অধীনে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতেন। এই অবস্থায় শাসকের অধীনে থাকা এবং মুসলিম জামা‘আতের সাথে থাকা ফরয।

দ্বিতীয় অবস্থা: সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের একজন বিদ‘আতী ও পথভ্রষ্ট শাসকের অধীনে সমবেত হওয়া। এটা একটা কল্পিত অবস্থা, শুধু বুঝানোর জন্য এমন অবস্থা মনে মনে ভাবা হচ্ছে। কারণ মুসলিম ইতিহাসে এমনটি ঘটেনি। ‘ত্বয়েফা মানছূরা’ বা বিজয়ী দল থাকার কারণে কখনই এই অবস্থার সৃষ্টি হবে না।

তৃতীয় অবস্থা : হক্বের উপর টিকে থাকা অবস্থায় মুসলিমদের দেশভিত্তিক বা অঞ্চলভিত্তিক বিভক্ত হয়ে যাওয়া। এই অবস্থায় হক্ব আঁকড়ে ধরার পাশাপাশি আঞ্চলিক বা দেশীয় শাসকের সাথে থাকা যরূরী। যেমনটি ঘটেছিল আববাসীয় শাসনামলের প্রথম দিকে। এ ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের বক্তব্য ইতিপূর্বে আমরা দেখে এসেছি।

চতুর্থ অবস্থা : কোন দেশ হক্বের উপর, কোন দেশ ভ্রষ্টতার উপর আবার কোন দেশ কুফরের উপর থাকা অবস্থায় মুসলিমদের দেশভিত্তিক বা অঞ্চলভিত্তিক বিভক্ত হয়ে যাওয়া। এক্ষেত্রে একজন মুসলিমের কয়েক ধরনের অবস্থান হতে পারে:

অবস্থান-১: একজন মুসলিম যদি মুসলিম শাসকের অধীনে হক্বের উপর থাকে, তাহলে তো এমনিতেই সে জামা‘আতের উভয় প্রকার অর্থ বাস্তবায়ন করল। অর্থাৎ একদিকে সে বিশুদ্ধ মানহাজের উপর আছে, অন্যদিকে মুসলিম শাসকের অধীনে আছে আর এভাবে সে জামা‘আতের দু’টো প্রয়োগকেই বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হচ্ছে।

অবস্থান-২: যদি সে কোন কাফের দেশে থাকে, তাহলে তার জন্য জামা‘আতের প্রথম অর্থ বাস্তবায়ন করা যরূরী। অর্থাৎ সে বিশুদ্ধ মানহাজ ও হক্বের উপর অটল থাকবে। এর পাশাপাশি সেখান থেকে মুসলিম রাষ্ট্রে হিজরত করার চেষ্টা চালাবে। যখনই সম্ভব হবে, হিজরত করবে। সাথে সাথে তার হৃদয়টা থাকবে ইসলাম ও মুসলিমদের সাথে; কুফর ও কাফেরদের সাথে নয়।

অবস্থান-৩: যদি সে কোন মুসলিম রাষ্ট্রে থাকে এবং ঐ মুসলিম রাষ্ট্রের শাসক যালেম ও ফাসেক্ব হয়, তাহলে এই অবস্থায়ও ঐ শাসকের অধীনে থাকা যরূরী; তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা চলবে না। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

أَلَا مَنْ وَلِيَ عَلَيْهِ وَالٍ فَرَآهُ يَأْتِي شَيْئًا مِنْ مَعْصِيَةِ اللهِ فَلْيَكْرَهْ مَا يَأْتِي مِنْ مَعْصِيَةِ اللهِ وَلَا يَنْزِعَنَّ يَدًا مِنْ طَاعَةٍ ‘সাবধান! যার উপরে কোন শাসক অধিষ্ঠিত হয়েছে, সে যদি তার শাসককে কোন পাপকাজ করতে দেখে, তাহলে সে যেন তার শাসকের সংঘটিত পাপকে ঘৃণা করে এবং সে যেন তার শাসকের আনুগত্য হতে হাত গুটিয়ে না নেয়’।[6] হাসান বাছরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَاللَّهِ مَا يَسْتَقِيمُ الدِّينُ إِلَّا بِهِمْ، وَإِنْ جَارُوا وَظَلَمُوا ‘আল্লাহ্র কসম! শাসকশ্রেণী যুলম-অত্যাচার করলেও তারা ছাড়া দ্বীন-ধর্ম সুন্দরভাবে চলতে পারে না’।[7] ছহীহ বুখারীর ভাষ্যকার ইবনু বাত্ত্বাল রাহিমাহুল্লাহ তার বিখ্যাত ‘শারহু ছহীহিল বুখারী’-তে আবুবকর ইবনুত-ত্বাইয়্যিব রাহিমাহুল্লাহ-এর বরাতে উল্লেখ করেন,

أَجْمَعَتِ الأُمَّةُ أَنَّهُ يُوجِبُ خَلْعَ الإِمَامِ وَسُقُوطَ فَرْضِ طَاعَتِهِ كُفْرُهُ بَعْدَ الإِيمَانِ، وَتَرْكُهُ إِقَامَةَ الصَّلَاةِ وَالدُّعَاءَ إِلَيْهَا، وَاخْتَلَفُوا إِذَا كَانَ فَاسِقًا ظَالِمًا غَاصِبًا لِلأَمْوَالِ؛ يَضْرِبُ الأبشار وَيَتَنَاوَلُ النُّفُوسَ المُحَرَّمَةَ وَيُضِيعُ الحُدُودَ وَيُعَطِّلُ الحُقُوقَ فَقَالَ كَثِيرٌ مِنْ النَّاسِ: يَجِبُ خَلْعُهُ لِذَلِكَ. وَقَالَ الجُمْهُورُ مِنْ الأُمَّةِ وَأَهْلِ الحَدِيثِ: لَا يُخْلَعُ بِهَذِهِ الأُمُورِ، وَلَا يَجِبُ الخُرُوجُ عَلَيْهِ؛ بَلْ يَجِبُ وَعْظُهُ وَتَخْوِيفُهُ وَتَرْكُ طَاعَتِهِ فِيمَا يَدْعُو إِلَيْهُ مِنْ مَعَاصِي اللهِ.

‘মুসলিম উম্মাহর মাঝে ‘ইজমা’ হয়েছে যে, শাসক যদি ঈমান আনার পর আবার কুফরী করে এবং ছালাত ক্বায়েম না করে ও তার দিকে আহবান না করে, তাহলে তাকে অপসারণ করা ওয়াজিব হয়ে যাবে এবং তাকে আনুগত্য করা আর ফরয থাকবে না। তবে যদি শাসক ফাসেক্ব, যালেম ও সম্পদ লুটকারী হয়, মানুষদেরকে মারধর করে, নিষিদ্ধ প্রাণ হত্যা করে, শরী‘আত নির্ধারিত দ-বিধি কার্যকর না করে, জনগণের অধিকার বিনষ্ট করে, তাহলে তার আনুগত্যের বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে, এগুলোর অপরাধে শাসককে অপসারণ করা ওয়াজিব। অন্যদিকে মুসলিম উম্মাহর জমহূর এবং আহলেহাদীছগণ বলেছেন, এসব অপরাধের কারণে শাসককে অপসারণ করা চলবে না এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাও যরূরী নয়; বরং ওয়াজিব হল, তাকে সদুপদেশ প্রদান করা, আল্লাহ ও পরকালের বিষয়ে তাকে ভীতি প্রদর্শন করা এবং তিনি যে পাপের দিকে আহবান করছেন, সে বিষয়ে তার আনুগত্য বর্জন করা’।[8] মুহাক্কিক্ব উলামায়ে কেরামের এ জাতীয় বক্তব্যের অভাব নেই।

পঞ্চম অবস্থা: দ্বিতীয় অর্থে জামা‘আতের অস্তিত্ব না থাকা, অর্থাৎ কোন সময় কোন এলাকায় শাসক নাও থাকতে পারে। তবে, সারা বিশ্বে একযোগে মুসলিম শাসন থাকবে না- এমনটা শেষ যামানায় ছাড়া ঘটবে না, যেমনটি আমরা হুযায়ফা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হাদীছে দেখে এসেছি।

প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান যুগে কি তাহলে ‘জামা‘আত’ নেই?

বর্তমান যুগে ‘জামা‘আত’ নেই বলতে যদি এর দ্বারা জামা‘আতের প্রথম অর্থ তথা আদর্শ, পথ ও পদ্ধতি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে একথা স্পষ্ট ছহীহ হাদীছবিরোধী। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الْحَقِّ، لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ، حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللهِ وَهُمْ كَذَلِكَ ‘আমার উম্মতের একটি দল সর্বদাই হক্বের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। তাদের বিরোধীরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এমনকি এভাবে আল্লাহ্র আদেশ তথা ক্বিয়ামত এসে যাবে, কিন্তু তারা অনুরূপই থেকে যাবে’।[9]

আর যদি এর দ্বারা জামা‘আতের দ্বিতীয় অর্থ উদ্দেশ্য হয়, তাহলে হতে পারে দুনিয়ার কোথাও কোথাও জামা‘আত নেই। যেমন কেউ কাফের রাষ্ট্রে থাকলে দ্বিতীয় অর্থে তার কোন জামা‘আত নেই; কিন্তু প্রথম অর্থে আছে।

 (চলবে)


[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯২০।

[2]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২০৩৬১; সুনানে তিরমিযী, হা/২১৯২; সুনানে ইবনে মাজাহ, হা/৬, হাদীছটি ‘ছহীহ’।

[3]. সুনানে তিরমিযী, হা/২১৬৭, ‘ছহীহ’।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৬০৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৪৭।

[5]. তারীখুত ত্ববারী, (দারুত তুরাছ, বৈরূত, ২য় প্রকাশ: ১৩৮৭ হি.), ৩/২০৭।

[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৫৫।

[7]. ইবনে রজব হাম্বালী, জামে‘উল উলূমি ওয়াল হিকাম, (তাহক্বীক্ব: শু‘আইব আরনাঊত্ব, মুআস-সাসাতুর রিসালাহ, বৈরূত, ৭ম প্রকাশ: ১৪২২ হি./২০০১ খৃ.), ২/১১৭।

[8]. ইবনু বাত্ত্বাল, শারহু ছহীহুল বুখারী, ৮/২১৫-২১৬।

[9]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯২০।

Magazine