কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

আত্মসমালোচনা

উপস্থাপনা :

মানবজাতিকে আল্লাহ তা‘আলা আশরাফুল মাখলূক্বাত হিসাবে স্বাধীন চিন্তাশক্তি দিয়ে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন। ফলে তার মাঝে তিন প্রকার নাফসের সম্মিলন ঘটেছে। নাফসে আম্মারাহ, নাফসে লাউওয়ামাহ এবং নাফসে মুত্বমাইন্নাহ। যা আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করে দিয়েছেন। এর মধ্যে নাফসে আম্মারাহ বা কুপ্রবৃত্তি মানুষকে জৈবিক কামনা-বাসনা ও দুনিয়ার লোভ-লালসার দিকে আকৃষ্ট করে তাকে মন্দ কাজের দিকে নিয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন,إِنَّ النَّفْسَ لأَمَّارَةٌ بِالسُّوْءِ إِلاَّ مَا رَحِمَ رَبِّيْ ‘নিশ্চয়ই মানুষের মন মন্দ কর্মপ্রবণ। কিন্তু সে মন ব্যতীত, যার প্রতি আমার পালনকর্তা অনুগ্রহ করেন’ (ইউসুফ, ৫৩)। অধিকহারে মন্দকাজ বান্দার অন্তরকে কঠিন করে তোলে ও ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

إِن الْمُؤْمِنَ إِذَا أَذْنَبَ كَانَتْ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ فِيْ قَلْبِهِ فَإِنْ تَابَ وَاسْتَغْفَرَ صُقِلَ قَلْبُهُ وَإِنْ زَادَ زَادَتْ حَتَّى تَعْلُوَ قَلْبَهُ فَذَلِكُمُ الرَّانُ الَّذِي ذَكَرَ اللهُ تَعَالَى (كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يكسِبونَ).

‘বান্দা যখন কোন পাপ করে, তখন তার অন্তরে কালো দাগ পড়ে যায়। যখন সে তওবা করে, তখন সেটা তুলে নেয়া হয়। আর ইস্তিগফারের মাধ্যমে অন্তরকে পরিষ্কার করা হয়। আর যদি পাপ বাড়তেই থাকে, তাহলে দাগও বাড়তে থাকে। আর এটাই হল মরিচা। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘বরং তাদের কৃতকর্মের ফলেই তাদের মনের উপর মরিচা জমে গেছে’ (মুত্বাফ্ফিফীন, ১৪)[1]

দুনিয়াতে প্রতিটি মানবসত্তাই মন্দ কাজে লিপ্ত হয়ে থাকে। তাই তা থেকে বেঁচে থাকার জন্য আত্মসমালোচনা একান্ত প্রয়োজন। প্রতিদিন মানুষ নিজেই নিজের পাপের হিসাব নেয়ার মাধ্যমে পুনরায় ঐ পাপে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকতে পারে। এছাড়া ব্যক্তির মাঝে যে পাপবোধ সৃষ্টি হয়, আত্মসমালোচনা তাকে ক্ষমা লাভের উপযুক্ত করে তোলে। নিমেণ এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল:

আত্মসমালোচনার পরিচয় :

مُحَاسَبَةُ النَّفْسِ শব্দটি একটি যৌগিক শব্দ। যা দু’টি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। প্রথমটি হল,مُحَاسَبَة যার শাব্দিক অর্থ, গণনা করা বা হিসাব করা। দ্বিতীয় শব্দ হল, النَّفْس যার অর্থ হল- আত্মা, অন্তর, হৃদয়। সুতরাং مُحَاسَبَةُ النَّفْسِ অর্থ হল, স্বীয় আত্মার হিসাব করা। সহজ অর্থে, আত্মসমালোচনা হল, নিজের সম্পর্কে সমালোচনা করা। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبا ‘আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশকারী হিসাবে যথেষ্ট’ (ইসরা, ১৪)

‘লিসানুল ‘আরব’ অভিধানে বলা হয়েছে, ‘মুহাসাবাহ’-এর শাব্দিক অর্থ হল- গণনা করা বা হিসাব করা। সুতরাং ‘মুহাসাবাতুন নাফস’-এর অর্থ হচ্ছে, আত্মার হিসাব গ্রহণ করা। ইংরেজীতে বলা হয়, self-criticism বা self-accountabilitz অর্থাৎ আত্মসমালোচনা।

পারিভাষিক অর্থে আত্মসমালোচনা বলতে বুঝায়, সচেতনভাবে কোন কাজ সম্পন্ন করা বা পরিত্যাগ করা, যাতে কৃতকর্ম সম্পর্কে নিজের সুস্পষ্ট ধারণা থাকে। সুতরাং যদি তা আল্লাহ্র সন্তুষ্টিমূলক কাজ হয়, তবে তা নিষ্ঠার সাথে পালন করা। আর যদি তা আল্লাহ্র অসন্তুষ্টিমূলক কাজ হয়, তবে তা থেকে সর্বতোভাবে বিরত থাকা। সাথে সাথে নিজেকে সর্বদা আল্লাহ্র সন্তুষ্টিমূলক কাজ তথা ইবাদতে ব্যস্ত রাখা।

ইবনুল হাজ্জ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, الْمُحَاسَبَةُ حَبْسُ الْأَنْفَاسِ وَضَبْطُ الْحَوَاسِّ وَرِعَايَةُ الْأَوْقَاتِ وَإِيثَارُ الْمُهِمَّاتِ. ‘আত্মসমালোচনা হল, আত্মাকে বেঁধে রাখা, ইন্দ্রিয়সমূহকে নিয়ন্ত্রণ করা, সময়ের সদ্ব্যবহার করা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহকে অগ্রাধিকার দেয়া’।[2]

ইবনুল ক্বাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আত্মসমালোচনার অর্থ হচ্ছে, ‘নিজের করণীয় এবং বর্জনীয় পৃথক করে ফেলা। অতঃপর সর্বদা ফরয ও নফল কর্তব্যসমূহ আদায়ের জন্য প্রস্তুত থাকা এবং হারাম বা নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ পরিত্যাগ করার উপর সুদৃঢ় থাকা। তিনি আরো বলেন, আত্মসমালোচনার অর্থ হল, প্রতিটি কাজে সর্বপ্রথম আল্লাহ্র হক্বসমূহের প্রতি দৃষ্টি দেয়া, অতঃপর সে হক্বগুলো যথাযথভাবে আদায় করা হচ্ছে কি-না সেদিকে লক্ষ্য রাখা’।[3]

উল্লেখ্য, নফসের জিহাদ হল আল্লাহ্র আনুগত্যের মাঝে নিম্ন থাকা এবং তার নাফরমানী থেকে দূরে থাকা। যেমন নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মুজাহিদ হল সেই ব্যক্তি, যিনি আল্লাহ্র আনুগত্যে অটল থাকার জন্য স্বীয় অন্তরের সাথে জিহাদে লিপ্ত হন। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَالَّذِيْنَ جَاهَدُوْا فِيْنَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِيْنَ ‘আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তাদেরকে আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সাথেই আছেন’ (আনকাবূত, ৬৯)

নফসের জিহাদ চার ধরনের। যথা: (ক) উপকারী ইলমের মাধ্যমে নফসের সাথে জিহাদ করা, (খ) উত্তম কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে নফসের সাথে জিহাদ করা, (গ) আল্লাহ্র পথে দাওয়াত প্রদানের মাধ্যমে নফসের সাথে জিহাদ করা, (ঘ) কষ্টের সময় ধৈর্য ধারণ করার মাধ্যমে নফসের সাথে জিহাদ করা। মহান আল্লাহ উপরিউক্ত চারটি বিষয় সূরাতুল আছরে উল্লেখ করেছেন।

আত্মসমালোচনার গুরুত্ব ও হুকুম :

আমাদের আত্মসমালোচনা করতে হবে। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সময় অবহেলায় হেসে-খেলে নষ্ট করার সময় কোথায়? নিশ্চয়ই আত্মসমালোচনা করার মাধ্যমে একজন বান্দা তার প্রতিপালকের দিকে অগ্রসর হতে পারে। পরকালে মুমিনদের জন্য পাথেয় পৌঁছে দেয়ার সবচেয়ে সুন্দর উপায়। সুতরাং যে ব্যক্তি হিসাব গ্রহণের দিন আসার পূর্বেই তার স্বীয় আত্মার হিসাব করবে, তার হিসাব ক্বিয়ামতের দিন হালকা হবে। সে তার কৃতকর্মের হিসাব সুন্দরভাবে প্রদান করতে সক্ষম হবে এবং মহান আল্লাহ্র নিকটে তার প্রত্যাবর্তন কতইনা সুন্দর হবে এবং তার বাসস্থাস কতইনা চমকপ্রদ হবে।

পক্ষান্তরে যিনি আত্মসমালোচনা করেন না, তার দুঃখ, আফসোস, পরিতাপ বাড়তেই থাকে। যার ফলে তার পাপে নিমজ্জিত থাকা বেড়েই যায়, এমনকি সে ইহকাল এবং পরকাল উভয় স্থানেই লাঞ্ছনা ও ঘৃণার স্বীকার হয়। এজন্য মহান আল্লাহ আমাদেরকে আত্মসমালোচনা করার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا اتَّقُوْا اللهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللهَ إِنَّ اللهَ خَبِيْرٌ بِمَا تَعْمَلُوْنَ.

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর প্রত্যেকের উচিত চিন্তা করে দেখা, সে আগামীকালের জন্য কী প্রেরণ করেছে। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, নিশ্চয়ই সে বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা সম্যক অবহিত’ (হাশর, ১৮)। ইবনে কাছীর রাহিমাহুল্লাহ আলোচ্য আয়াতের (وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ) ব্যাখ্যায় বলেন,

حَاسِبُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوا، وَانْظُرُوا مَاذَا ادَّخَرْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ مِنَ الْأَعْمَالِ الصَّالِحَةِ لِيَوْمِ مَعَادِكُمْ وَعَرْضِكُمْ عَلَى رَبِّكُمْ

‘তোমরা নিজেদের আমলনামার হিসাব নিজেরাই গ্রহণ কর, চূড়ান্ত হিসাব দিবসে তোমাদের কাছ থেকে হিসাব গৃহীত হবার পূর্বেই। তোমরা লক্ষ্য কর, তোমার পক্ষ থেকে সৎ আমলের কতটুকু জমা করতে পেরেছ এবং তোমাদের রবের সামনে যেদিন উপস্থিত হবে সেদিন তোমার পক্ষ থেকে কী পেশ করবে’।[4]

‘মুহাসাবাতুন নাফস’ তথা আত্মসমালোচনা করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য অপরিহার্য কাজ। এ মর্মে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللهَ إِنَّ اللهَ خَبِيْرٌ بِمَا تَعْمَلُوْنَ وَلَا تَكُونُوْا كَالَّذِيْنَ نَسُوا اللهَ فَأَنْسَاهُمْ أَنْفُسَهُمْ أُوْلَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُوْنَ.

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য উচিত আগামীকালের জন্য (অর্থাৎ আখিরাতের জন্য) সে কী প্রেরণ করেছে, তা চিন্তা করা। আর তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছে, ফলে আল্লাহ তাদেরকে আত্মভোলা করে দিয়েছেন। নিশ্চয়ই তারা ফাসিক্ব’ (হাশর, ১৮)। ইবনুল ক্বইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

وقد دل على وجوب محاسبة النفس قوله تعالى... لينظر أحدكم ما قدم ليوم القيامة من الأعمال: أمن الصالحات التى تنجيه، أم من السيئات التى توبقه؟

‘আলোচ্য আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ রাববুল আলামীন প্রত্যেক মুমিনের জন্য আত্মসমালোচনাকে আবশ্যক করে দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ বলেছেন, তোমাদের অবশ্যই চিন্তা করা উচিত যে, আগামী দিনের জন্য তুমি যা প্রেরণ করেছ তা তোমার জান্নাতের পথ সুগম করছে, নাকি তোমাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?’।[5]

ইমাম ছা‘আলিবী রাহিমাহুল্লাহ তার স্বীয় তাফসীরে বলেন, ইয্যুদ্দীর ইবনে আব্দুস সালাম রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,

أجمع العلماءُ على وجوبِ محاسَبَةِ النفسِ فيما سَلَفَ من الأعمال وفيما يُسْتَقْبَلُ منها

‘একজন ব্যক্তি কী আমল করেছে এবং ভবিষ্যতে কী আমল করবে, সে সম্পর্কে আত্মসমালোচনা করা আবশ্যক এ মর্মে আলেমগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন’।[6] অপর এক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আত্মসমালোচনাকারীদের প্রশংসা করে বলেন,إِنَّ الَّذِيْنَ اتَّقَواْ إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُواْ فَإِذَا هُمْ مُّبْصِرُوْنَ ‘যাদের মনে আল্লাহ্র ভয় রয়েছে, তাদের উপর শয়তানের আগমন ঘটার সাথে সাথেই তারা সতর্ক হয়ে যায় এবং তখনই তাদের বিবেচনা শক্তি জাগ্রত হয়ে উঠে’ (আ‘রাফ, ২০১)

আত্মসমালোচনার গুরুত্ব সম্পর্কে খলীফাতুল মুসলিমীন ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নিমেণাক্ত বাণীটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন,

حَاسِبُوْا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوْا وَزِنُوْا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُوْزِنُوْا فَإِنَّهُ أَهْوَنُ عَلَيْكُمْ فِيْ الْحِسَابِ غَدًا أَنْ تُحَاسَبُوْا أَنْفُسَكُمُ الْيَوْمَ وَتَزَيَّنُوْا لِلْعَرْضِ الأَكْبَرِ يَوْمَئِذٍ تُعْرَضُوْنَ لاَ تَخْفَى مِنْكُمْ خَافِيَةٌ.

‘তোমরা নিজেদের আমলনামার হিসাব নিজেরাই গ্রহণ কর, চূড়ান্ত হিসাব দিবসে তোমাদের কাছ থেকে হিসাব গৃহীত হবার পূর্বেই। আর তোমরা তোমাদের আমলনামা মাপ করে নাও চূড়ান্ত দিনে মাপ করার পূর্বেই। কেননা আজকের দিনে নিজের হিসাব নিজেই গ্রহণ করতে পারলে আগামীদিনের চূড়ান্ত মুহূর্তে তা তোমাদের জন্য সহজ হয়ে যাবে। তাই সেই মহাপ্রদর্শনীর দিনের জন্য তোমরা নিজেদেরকে সুসজ্জিত করে নাও, যেদিন তোমরা (তোমাদের আমলসহ) উপস্থিত হবে এবং সেদিন তোমাদের কিছুই গোপন থাকবে না’।[7] হাসান বাছরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

المؤمن قوّام على نفسه يحاسب نفسه لله وإنما خفّ الحساب يوم القيامة على قوم حاسبوا أنفسهم في الدنيا وإنما شقّ الحساب يوم القيامة على قوم أخذوا هذا الأمر من غير محاسبة.

‘মুমিন ব্যক্তিকে স্বীয় আত্মার পরিচালক হিসাবে আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্যই আত্মসমালোচনা করতে হবে। যারা দুনিয়াতে আত্মসমালোচনা করবে, ক্বিয়ামতের দিন অবশ্যই তাদের হিসাব হালকা হবে। পক্ষান্তরে যারা এ থেকে বিরত থাকবে, ক্বিয়ামতের দিন তাদের হিসাব কঠিন হবে’।[8]

ইমাম শাফেঈ রাহিমাহুল্লাহ-এর আত্মসমালোচনা সম্পর্কে একটি প্রসিদ্ধ বাণীতে তিনি বলেন,

أَعْقَلُ النَّاسِ مَنْ تَرَكَ الدُّنْيَا قَبْلَ أَنْ تُتْرَكَهُ وَأَنَارَ قَبْرَهُ قَبْلَ أَنْ يُّسْكِنَهُ وَأَرْضَى رَبَّهُ قَبْلَ أَنْ يَّلْقَاهُ وَصَلَّى الْجَمَاعَةَ قَبْلَ أَنْ تُصَلَّي عَلَيْهِ الْجَمَاعَةُ وَحَاسَبَ نَفْسَهُ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبَهُ.

‘সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি তিনিই, যিনি দুনিয়াকে পরিত্যাগ করেন দুনিয়া তাকে পরিত্যাগ করার পূর্বেই। কবরকে আলোকিত করেন কবরে বসবাস করার পূর্বেই। স্বীয় রবকে সন্তুষ্ট করেন তার সাথে সাক্ষাৎ লাভের পূর্বেই, জামা‘আতের সাথে ছালাত আদায় করেন তার উপর জামা‘আতের ছালাত (অর্থাৎ জানাযার ছালাত) পঠিত হবার পূর্বেই। নিজের হিসাব নিজেই গ্রহণ করেন হিসাব দিবসে তার হিসাব গ্রহণ করার পূর্বেই’। মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

رحم الله عبداً قال لنفسه ألست صاحبه كذا؟ ألست صاحبة كذا؟ ثم ذمها ثم خطمها ثم ألزمها كتاب الله عز وجل فكان لها قائدا.

‘আল্লাহ্র রহম ঐ বান্দার প্রতি, যে তার নফসকে (কোন মন্দ কাজের পর) বলে, তুমি কি এর সাথী নও? তুমি কি এর সঙ্গী নও? অতঃপর তাকে নিন্দা করে, অতঃপর তার লাগাম টেনে ধরে, অতঃপর আল্লাহ্র কিতাবের উপরে তাকে আটকে রাখে তখন সে হয় তার পরিচালক’।[9] মায়মুন ইবনে মিহরান রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

لا يكون العبد تقياً حتى يكون لنفسه أشد محاسبة من الشريك لشريكه .

‘কোন বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত পরহেযগার হতে পারে না, যতক্ষণ না সে তার অন্তরের হিসাব করে, এমনকি অংশীদারের চেয়েও বেশী শক্ত করে হিসাব করে’।[10]

আত্মসমালোচনার উপকারিতা :

আত্মসমালোচনার উপকারিতা অনেক। নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হল :

(১) নিজের দোষ-ত্রুটি নিজের সামনে প্রকাশ করার মাধ্যমে মানুষ স্বীয় ভুল-ত্রুটি সম্পর্কে জানতে পারে। ফলে তার হৃদয় ভাল কাজের দিকে আকৃষ্ট হয় এবং মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকতে পারে।

(২) আত্মসমালোচনা দ্বীনের উপর দৃঢ়তা অর্জনের সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম, যা মানুষকে আল্লাহ্র দরবারে মুহসিন ও মুখলিছ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে।

(৩) আত্মসমালোচনার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহ্র নে‘আমতসমূহ, অধিকারসমূহ জানতে পারে। আর সে যখন আল্লাহ্র নে‘আমত ও তার অবস্থান সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে, তখন সে আল্লাহ্র নে‘আমতের শুকরিয়া আদায়ে উদ্বুদ্ধ হয়।

(৪) আত্মসমালোচনার মাধ্যমে মানুষের মাঝে পরকালীন জবাবদিহিতার উপলব্ধি সৃষ্টি হয়। মায়মুন ইবনে মিহরান বলতেন, ‘মুত্তাক্বী ব্যক্তি সেই, যে নিজের জবাবদিহিতা এমন কঠোরভাবে গ্রহণ করে যেন সে একজন অত্যাচারী শাসক’।[11]

(৫) আত্মসমালোচনা জীবনের লক্ষ্যকে সবসময় সজীব করে রাখে। এর মাধ্যমে আমরা অনুভব করতে পারি আমাদেরকে এই পৃথিবীর বুকে অনর্থক সৃষ্টি করা হয়নি। পার্থিব জীবন শুধু খাওয়া-দাওয়া, হাসি-তামাশার নয়, এ জীবনের পরবর্তী যে অনন্ত এক জীবন, তার জন্য যে আমাদের সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে, আত্মসমালোচনা আমাদেরকে সর্বক্ষণ তা স্মরণ করিয়ে দেয়।

(৬) আত্মসমালোচনার ফলে কোন পাপ দ্বিতীয়বার করতে গেলে বিবেকে বাধা দেয়। ফলে পাপের কাজ থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ আমাদের জন্য সহজ হয়ে যায়।[12]

আত্মসমালোচনা না করার পরিণাম :

আমরা কারো সমালোচনা সইতে পারি না। কেউ প্রশংসা করলে আমাদের ভালো লাগে আর সমালোচনা করলে কষ্ট পাই। এটাই মানব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। তবে ইসলামের শিক্ষা হল নিজের দোষগুলো নিজেই খুঁজে বের করে তা সংশোধনের চেষ্টা করা। অন্যের দোষ-ত্রুটি খোঁজার চেষ্টা না করা। কারণ নিজের দোষ-ত্রুটি নিজের সামনে প্রকাশ করার মাধ্যমে মানুষ তা জানতে পারে। ফলে তার হূদয় ভালো কাজের দিকে আকৃষ্ট হয় এবং মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকতে সচেষ্ট হয়। তাছাড়া আত্মসমালোচনা দ্বীনের ওপর দৃঢ়তা অর্জনের সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম। আত্মসমালোচনার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহ্র নে‘আমতগুলো জানতে পারে, মহান প্রভু সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করতে পারে এবং নে‘আমতের কৃতজ্ঞতা আদায়ে উদ্বুদ্ধ হয়। সবচেয়ে বড় কথা হল আত্মসমালোচনার ফলে কোন পাপ দ্বিতীয়বার করতে গেলে বিবেকে বাধা দেয়। ফলে পাপের কাজ থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হয়ে যায়। সুতরাং আত্মসমালোচনা না করার ফলাফল খুবই ভয়াবহ। ইবনুল ক্বাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

وأضر ما عليه الإهمال وترك المحاسبة والاسترسال وتسهيل الأمور وتمشيتها فإن هذا يؤول به إلى الهلاك وهذه حال أهل الغرور يغمض عينيه عن العواقب ويمُشِّى الحال ويتكل على العفو فيهمل محاسبة نفسه والنظر فى العاقبة وإذا فعل ذلك سهل عليه مواقعة الذنوب وأنس بها وعسر عليها فطامها ولو حضره رشده لعلم أن الحمية أسهل من الفطام وترك المألوف والمعتاد.

‘আত্মসমালোচনা পরিত্যাগ করার অর্থ কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে চলা। এতে মানুষের অন্তর পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, মুহাসাবা পরিত্যাগ করার ফলে দ্বীনের প্রতি তার শিথিলতা চলে আসে, যা তাকে নিশ্চিতভাবেই দুনিয়াবী জীবন ও পরকালীন জীবনে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। কেবলমাত্র আত্মাহংকারী, প্রতারিত আত্মাই মুহাসাবা পরিত্যাগ করতে পারে। ফলশ্রুতিতে সে কোন কিছুর পরিণাম চিন্তা করে না। সমস্ত পাপ তার কাছে অত্যন্ত সহজ বিষয় হয়ে যায়। অবশেষে একসময় পাপ থেকে বেরিয়ে আসাটা তার কাছে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। কখনো যদি সে সৎপথের সন্ধান পায়ও, তবুও সে তার অন্যায় অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসাটা অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করে’।[13]

আত্মসমালোচনার পদ্ধতি :

আত্মসমালোচনা প্রধানতঃ দু’ভাবে করা যায়। যথা-

প্রথমতঃ কোন কাজ শুরু করার পূর্বে আত্মসমালোচনা করা : কোন কাজের সংকল্প তথা ইচ্ছা করার পূর্বেই সে কাজটি সম্পর্কে চিন্তা করতে হবে যে, কাজটি ইহলৌকিক ও পরলৌকিক জীবনের জন্য উত্তম, নাকি ক্ষতিকর? কাজটি কি হারাম, নাকি হালাল? কাজটিতে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি নিহিত রয়েছে, নাকি অসন্তুষ্টি রয়েছে? অতঃপর কাজটি যদি উত্তম হয়, তাহলে আল্লাহ্র উপর পূর্ণ ভরসা রেখে কাজে নেমে পড়তে হবে। পক্ষান্তরে কাজটি যদি খারাপ হয়, তাহলে একইভাবে পূর্ণ একনিষ্ঠতা ও তাওয়াক্কুলের সাথে তা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রতিদিন সকালে আন্তরিকভাবে প্রত্যয় দীপ্ত হতে হবে যেন সারাদিন সৎ কার্যাবলীর সাথে সংযুক্ত থেকে অসৎ কার্যাবলী থেকে বিরত থাকা যায়।

দ্বিতীয়তঃ আমল শেষ করার পর আত্মসমালোচনা করা : ইহা তিনটি পদ্ধতিতে করা যায়। যথা-

(ক) আল্লাহ্র আদেশসমূহ আদায়ের ব্যাপারে আত্মসমালোচনা করা : আমাদের উপর নির্দেশিত ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত ও নফল বিষয়াবলী পর্যালোচনা করা। নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হবে যে, আমি কি আমার উপর আরোপিত ফরয বিষয়গুলো আদায় করেছি? আদায় করলে তার সাথে সাথে নফল বা মুস্তাহাব বিষয়গুলো কতটুকু আদায় করেছি? কারণ ফরযের কোন অপূর্ণতা হলে নফল বিষয়গুলো সেটাকে পূরণ করে দেয়।[14]

সাথে সাথে এটাও খেয়াল করতে হবে যে, উক্ত ইবাদতসমূহে আল্লাহ্র হক্ব পরিপূর্ণ আদায় করা হয়েছে কিনা? উল্লেখ্য, ইবাদতে আল্লাহ্র হক্ব ছয়টি। যথা- (ক) আমলের মধ্যে খুলূছিয়াত (একনিষ্ঠতা) থাকা, (খ) বান্দার মাঝে আল্লাহ্র জন্য নছীহত থাকা (তথা- আল্লাহ্র একত্বের প্রতি সঠিক বিশ্বাস পোষণ করা), (গ) রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য থাকা, (ঘ) একাগ্রতা থাকা, (ঙ) নিজের উপর আল্লাহ্র ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের পূর্ণ উপলব্ধি থাকা, (চ) অতঃপর এ সকল বিষয়ের প্রত্যেকটি পালনের ক্ষেত্রে নিজের ত্রুটি হচ্ছে- এ বিষয়ে অনুতপ্তভাব থাকা।[15] অতঃপর এ সমস্ত হক্ব যথাযথভাবে আদায় করা হয়েছে কিনা আমল সম্পন্ন করার পর তা সম্পর্কে চিন্তা করতে হবে।

(খ) অপ্রয়োজনীয় এবং অহেতুক কাজ পরিত্যাগ করা : দ্বীনী দৃষ্টিকোণ থেকে যে হালাল কাজ করার চেয়ে না করাই বেশী উত্তম মনে হয়, তা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। কোন নির্দোষ কিন্তু গুরুত্বহীন কাজ করে থাকলে তা থেকেও নিজেকে সাধ্যমত নিয়ন্ত্রণ করা। অর্থাৎ, আগামীতে কেন এটা করব এবং এর দ্বারা কি আমি আল্লাহ্র পথে আরো অগ্রসর হতে পারব? এর দ্বারা কি ইহকালীন ও পরকালীন জীবনে আমার বা মানবসমাজের কোন লাভ হবে? তা অন্য কোন লাভজনক কাজ থেকে আমাকে বিরত করছে কি? ইত্যাদি প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না পেলে সে পথে আর অগ্রসর না হওয়া।[16]

(গ) ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং সৎআমল করা : পূর্ণ সতর্কতার পরও যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে কোন পাপ হয়ে যায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে লজ্জিত হয়ে আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা ও তওবা করা। সাথে সাথে সৎআমল দ্বারা এই অপরাধের ক্ষতিপূরণ করার চেষ্টা করা। মহান আল্লাহ বলেন,إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّـيِّئَاتِ ذَلِكَ ذِكْرَى لِلذَّاكِرِيْنَ ‘নিশ্চয়ই ভালকাজ মন্দকাজকে দূর করে দেয়, আর এটা স্মরণকারীদের জন্য স্মরণ’ (হূদ, ১১৪)। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,اتَّق اللهَ حَيْثُمَا كُنْتَ وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا ‘তুমি যেখানেই থাক আল্লাহকে ভয় কর। আর কোন পাপ কাজ সংঘটিত হয়ে গেলে সাথে সাথে সৎআমল কর যাতে করে তা মিটে যায় (তথা মোচন হয়ে যায়)’।[17]

সালাফে ছালেহীনের আত্মসমালোচনার কতিপয় দৃষ্টান্ত :

ছাহাবীগণ ছিলেন এই দুনিয়ার বুকে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অনুসরণ এবং অনুকরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত। তারা সবসময়ই নিজের কর্মের ফলাফল নিয়ে চিন্তা করতেন। নিমেণ তাদের আত্মসমালোচনার কতিপয় দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হল- আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

خَرَجْتُ مَعَهُ حَتَّى دَخَلَ حَائِطًا فَسَمِعْتُهُ وَهُوَ يَقُوْلُ وَبَيْنِيْ وَبَيْنَهُ جِدَارٌ وَهُوَ فِيْ جَوْفِ الْحَائِطِ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ أَمِيْرُ الْمُؤْمِنِيْنَ بَخٍ بَخٍ وَاللهِ لَتَتَّقِيَنَّ اللهَ أَوْ لَيُعَذِّبَنَّكَ.

‘আমি একবার ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে বের হলাম। পথিমধ্যে তিনি একটি বাগানে ঢুকলেন। এমতাবস্থায় আমার ও তাঁর মধ্যে বাগানের একটি দেয়াল আড়াল হয়েছিল। আমি তাঁকে বলতে শুনলাম, তিনি নিজেকে সম্বোধন করে বলছেন, ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব! আমীরুল মুমিনীন মারহাবা! মারহাবা! আল্লাহ্র শপথ! হে ইবনুল খাত্ত্বাব! অবশ্যই তোমাকে আল্লাহ্র ভয়ে ভীত হতে হবে। অন্যথা তিনি তোমাকে শাস্তি দিবেন’।[18]

ইসলামের তৃতীয় খলীফা ওছমান রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন কোন কবরের নিকট দাঁড়াতেন, তখন তিনি এত পরিমাণে কাঁদতেন, যাতে তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। তাকে বলা হল, জান্নাত-জাহান্নামের বর্ণনায় আপনি কাঁদেন না, অথচ কবর দেখলে আপনি কাঁদেন কেন? জবাবে তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে,

إِنَّ الْقَبْرَ أَوَّلُ مَنْزِلٍ مِنْ مَنَازِلِ الْآخِرَةِ فَإِنْ نَجَا مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَيْسَرُ مِنْهُ وَإِنْ لَمْ يَنْجُ مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَشَدُّ مِنْهُ وَقَالَ رَسُولُ اللهِ مَا رَأَيْت منْظرًا قطّ إِلَّا الْقَبْر أَفْظَعُ مِنْهُ.

‘নিশ্চয়ই কবর হল পরকালের পথের প্রথম মানযিল। যদি এখানে কেউ মুক্তি পায়, তাহলে পরের মানযিলসমূহ তার জন্য সহজ হয়ে যায়। আর যদি এখানে মুক্তি না পায়, তাহলে পরেরগুলো আরও কঠিন হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি কবরের চেয়ে ভয়ঙ্কর কোন দৃশ্য আর দেখিনি’।[19]

বারা ইবনে আযিব রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম। হঠাৎ তিনি একদল লোককে দেখতে পেয়ে বললেন, ওরা কি উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়েছে? একজন বললেন, তারা একটি কবর খুড়ছে। বর্ণনাকারী বলেন, একথা শুনে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন এবং সঙ্গী-সাথীদের আগে দ্রুতবেগে কবরের নিকটে পৌঁছে হাঁটু গেড়ে বসলেন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি কী করছেন তা দেখার জন্য আমি তাঁর মুখোমুখি বসলাম। তিনি কেঁদে ফেললেন, এমনকি অশ্রুতে মাটি ভিজে গেল। অতঃপর তিনি আমাদের দিকে ফিরে বসে বললেন, হে ভাইয়েরা! এ রকম দিবসের জন্য পাথেয় প্রস্ত্তত রেখ’।[20]

হানযালা আল-উসাইদী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একদা তিনি কাঁদতে কাঁদতে আবুবকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আবুবকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে হানযালা! তোমার কী হয়েছে? তিনি বললেন, হে আবুবকর! হানাযালা তো মুনাফিক্ব হয়ে গেছে। আমরা যখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে অবস্থান করি এবং তিনি আমাদের জান্নাত-জাহান্নাম স্মরণে নছীহত করেন, তখন মনে হয় যেন আমরা সেগুলো প্রত্যক্ষভাবে দেখছি। কিন্তু বাড়ী ফিরে আসার পর স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজন এবং সহায়-সম্পদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি এবং অনেক কিছুই ভুলে যাই। আবুবকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহ্র কসম! আমাদেরও তো একই অবস্থা! চল, আমরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে যাই। অতঃপর আমরা সেদিকে রওয়ানা হলাম। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, হানযালা! কী খবর? তখন উত্তরে তিনি অনুরূপ বক্তব্যই পেশ করলেন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার নিকট থেকে তোমরা যে অবস্থায় প্রস্থান কর, সর্বদা যদি সেই অবস্থায় থাকতে তাহলে ফেরেশতারা অবশ্যই তোমাদের মজলিসে, বিছানায় এবং পথে-ঘাটে তোমাদের সাথে মুছাফাহা করত। হে হানযালা! সেই অবস্থা তো সময় সময় হয়েই থাকে’।২১

উপরিউক্ত হাদীছগুলো থেকে আত্মসমালোচনায় গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায় এবং পরকালের জন্য প্রস্ত্ততি গ্রহণের আবশ্যকতা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।

উপসংহার :

আত্মসমালোচনা, অন্যের ত্রুটি ধরার পূর্বে নিজের ত্রুটি ধরতে আমাদের শিক্ষা দেয়। অন্যের নিন্দা করার পূর্বে নিজের মধ্যে বিদ্যমান খারাপ দূর করতে উদ্বুদ্ধ করে। এর দ্বারা আমরা নিজেদেরকে যেমন সংশোধন করে নেয়ার চেষ্টা চালাতে পারব, তেমনি অন্যের মাঝে ভুল দেখতে পেলে ভালবাসা ও সেণহের সাথে তাকেও শুধরে দেয়ার চেষ্টা করতে পারব। এভাবে সমাজ পরিণত হবে পারস্পরিক সহযোগিতা, ভালবাসা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ এক শান্তিময় সমাজ।

পরিশেষে বলব, আত্মসমালোচনা আমাদের পার্থিব জীবনে দায়িত্বশীলতা সৃষ্টি করে, পরকালীন জবাবদিহিতার চিন্তা বৃদ্ধি করে এবং বিবেককে শাণিত করে। করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভে সাহায্য করে। সর্বোপরি জীবনের উচ্চতম লক্ষ্যকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে একজন প্রকৃত মানুষ হয়ে গড়ে উঠার কাজে সর্বদা প্রহরীর মত দায়িত্ব পালন করে। অতএব আসুন! আমরা নিজেদেরকে একজন প্রকৃত মানুষ হিসাবে, প্রকৃত মুসলিম হিসাবে গড়ে তোলার জন্য জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ সতর্কতার সাথে ফেলি। নিজেকে সচ্চরিত্রবান, নীতিবান ও আদর্শবান হিসাবে গড়ে তুলি। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সেই তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

[1]. ইবনে মাজাহ, হা/৪২২২; মিশকাত, হা/২৩৪২।

[2]. আল-মাদখাল, ১ম খ-, পৃঃ ১৪।

[3]. আল-ফাওয়ায়েদ।

[4]. তাফসীর ইবনে কাছীর, ১৩/৪৯৯।

[5]. ইগাছাতুল লাহাফান, ১/৮৪।

[6]. তাফসীরে ছা‘আলিবী, ৪/৩৯৮-৩৯৯।

[7]. জামিঊত তিরমিযী, হা/২৪৫৯, সনদ মওকূফ ছহীহ।

[8]. ইবনুল ক্বাইয়িম আল-জাওযিয়্যাহ, ইগাছাতুল লাহফান, ১ম খ-, পৃঃ ৭৯।

[9]. প্রাগুক্ত।

[10]. প্রাগুক্ত।

[11]. ইহ্য়াউ উলূমিদ্দীন, ৩/৩৯৫।

[12]. ইগাছাতুল লাহফান, ১/১৫৬; নাযরাতুন নাঈম, আলোচনা নং ৩৩১৭, ৩৩২৪।

[13]. ইগাছাতুল লাহফান, ১/৮২-৮৩।

[14]. আবুদাঊদ, মিশকাত, হা/১৩৩০, সনদ ছহীহ ।

[15]. ইহয়াউ উলূমিদ্দীন, ৪/৩৯৪।

[16]. ইহয়াউ উলূমিদ্দীন, ৪র্থ খ-, পৃঃ ৩৯৪।

[17]. জামিঊত তিরমিযী, হা/১৯৮৭; মিশকাত, হা/৫০৮৩।

[18]. মুওয়াত্ত্বা মালেক, হা/৩৬৩৮, ২৮৩৭; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৭ম খ-, পৃঃ ১৩৫।

[19]. জামিঊত তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, মিশকাত, হা/১৩২।

[20]. মুসনাদে আহমাদ, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১৭৫১।

[21]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৫০, মিশকাত, হা/২২৬৮।

Magazine