লেখকের ভূমিকা
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক রাসূলুল্লাহ, তাঁর পরিবার-পরিজন, ছাহাবীবৃন্দ এবং তাঁদের যথার্থ অনুসারীগণের উপর।
মহান আল্লাহ সবকিছুর তাক্বদীর নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং প্রতিটি লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের পেছনে চালিকাশক্তি বা কারণ ধার্য করেছেন। এই সীমাবদ্ধতা মেনে চলা দ্বীনের একটি অনিবার্য কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ‘আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে; আর তারাই হলো সফলকাম’ (আলে-ইমরান, ৩/১০৪)।
এই মহিমান্বিত আয়াতের মর্মার্থ এবং কুরআন ও সুন্নাহর অন্যান্য বক্তব্যের আলোকে দায়িত্ব পালনের যে আবশ্যকতা রয়েছে, তাতে দেখা যায় যে— দ্বীনের প্রচার, দাওয়াত এবং এই দায়িত্ব পালনের জন্য উম্মাহর মধ্য থেকে একদল লোকের প্রস্তুত হওয়া আবশ্যক, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণের জন্য দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করবে। তারাই হবে সেই মূল ‘উম্মাহ’, যাদের মাধ্যমে আল্লাহ পুরো উম্মাহকে (সাধারণ জনগণকে) জীবিত রাখেন।
দ্বীন হলো আল্লাহ, তাঁর রাসূল, মুসলিমদের শাসক এবং সাধারণ জনগণের প্রতি ঐকান্তিক কল্যাণ কামনা করা। তাই আমাদের জীবনযাত্রার বিষয়গুলো এমন কোনো জটিল আকার ধারণ করা উচিত নয়, যা আমাদের দ্বীনের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পায় এবং আমাদের মূল দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করে। আমাদের সেই মূল দায়িত্বগুলো হলো:
- আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেওয়া।
- সতর্ক করা ও সুসংবাদ প্রদান করা।
- মানুষের জন্য সত্যের সাক্ষ্য দেওয়া।
- সংস্কার সাধন ও নছীহত করা।
- স্মরণ করানো ও দ্বীন প্রচার করা।
- আল্লাহর পথে জিহাদ করা ও দ্বীনকে বিজয়ী করা।
- সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা।
এই সমস্ত শারঈ রূপরেখা ও দায়িত্বকে একটিমাত্র উদ্দেশ্যই একত্রিত করে, আর তা হলো: দ্বীনের বিজয় এবং এর সুরক্ষা।
আমরা আরো দেখতে পাই যে, বর্তমানে মুসলিম সমাজে বিশৃঙ্খলা ও পরিবর্তনের এক প্রবল ঢেউ চলছে, যা উম্মাহর গভীরে এবং এর প্রতিটি স্তম্ভে ছড়িয়ে পড়েছে।
এর বিপরীতে আমরা উম্মাহর একদল দাঈর হিম্মত ও প্রচেষ্টা দেখতে পাই, যারা উম্মাহকে এই পতন থেকে উদ্ধার করতে এবং এর অস্তিত্ব রক্ষা করতে চান। তাদের অন্যতম আহ্বান হচ্ছে, ‘ইসলামের দিকে এসো, ইসলামের দিকে এসো’; কিন্তু তা করা হচ্ছে দলাদলি ও সাম্প্রদায়িক স্লোগানের অধীনে, যা ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। এরপর একটি জামা‘আত বা দল একাধিক ‘উপদলে’ বিভক্ত হয়ে ফেরকায় পরিণত হয়েছে। তারা নিজেদের আবদ্ধ করে ফেলেছে নির্দিষ্ট কোনো ‘প্রতীক’, সংকীর্ণ ‘স্লোগান’ কিংবা নতুন কোনো ‘উপাধি’র বেড়াজালে, যা শুরুতে কেবল একটি ‘শব্দ’ হিসেবে আসে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা একটি ‘উপদল’ বা স্বতন্ত্র মতবাদে রূপ নেয়, যার ক্রমবর্ধমান স্রোত উম্মাহর মধ্যে, বিশেষ করে উদীয়মান শ্রেণির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর আমরা দেখি, এই দলীয় শৃঙ্খলে আবদ্ধ অনেকেই বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাত ও উত্তেজনার গোলকধাঁধায় নিমজ্জিত এবং তারা নিজ নিজ মতবাদ রক্ষায় ও তার সমর্থনে নানা পথ অবলম্বন করে। এর ফলে একের পর এক ফেতনা বা গোলযোগের সৃষ্টি হয়, যার উত্তাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকে; মানুষের অন্তরে বিদ্বেষ দানা বাঁধে এবং বিচ্ছিন্নতা ও শত্রুতার ধূলিকণা উড়তে থাকে। তখন কলমগুলো কেবল জেদ আর আভিজাত্যের লড়াইয়ে বিষাক্ত শব্দ নিক্ষেপ করতে থাকে। আর এই অনৈক্য ও বিভেদই কোনো দলের সদস্যদের শক্তি ও সাহস ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়।
পরস্পরের প্রতি বিমুখতা ও পিঠ প্রদর্শনের ফলাফল কেবল দুর্বলতা, ফাটল আর বিচ্ছিন্নতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ তাআলা যথার্থই বলেছেন,وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ ‘আর তোমরা নিজেদের মধ্যে বিবাদ করো না, অন্যথা তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের শক্তি (হাওয়া) বিলুপ্ত হবে’ (আল-আনফাল, ৮/৪৬)।
এভাবেই সময়ের পরিক্রমায় উম্মাহর দেহ থেকে এক-একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, যতক্ষণ না বিভিন্ন দল-উপদল মিলে একে গ্রাস করে নেয়; আর বর্তমানে এই ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে ধাবিত হচ্ছে।
এ থেকে আমরা দেখতে পাই যে, আল্লাহর দিকে দাওয়াতের পথটি অনেকের কাছেই আজ বক্র বা জটিল হয়ে গেছে এবং তাদের বোধশক্তিতে দাওয়াতের প্রকৃত অর্থ বদলে গেছে। তারা এখন ‘দাওয়াতের পথ’কে কেবল তাদের নিজস্ব দল বা গোষ্ঠীর চশমা দিয়ে দেখে অথবা তাদের প্রতিপক্ষ দলগুলোর বিরোধিতার নিরিখে বিচার করে।
আমরা আরও দেখতে পাই যে, এই দলগুলোর বিষয়ে প্রচুর আলোচনা-পর্যালোচনা ও তর্ক-বিতর্কের ফলে সত্য কখনো চাপা পড়ে যায়, আবার কখনো আংশিক জয়ী হয়। মানুষ এখন এক বিভ্রান্তিকর ও যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির মধ্যে দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে, যেখানে বিশৃঙ্খলা তাদের মারাত্মকভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।
একদল মানুষ পাশ্চাত্যকরণের (Westernization) প্রবল স্রোতে হারিয়ে গেছে। কারণ তারা তাদের বাস্তবতার সামনে কোনো সঠিক দিশা বা দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে পায়নি।
অন্য দলকে বিশেষ কোনো জামা‘আত বা দল তাদের দলীয় বৃত্তে টেনে নিয়েছে। ফলে তারা ‘দলে যোগদান’, ‘ভ্রাতৃত্ব-সংহতি’ এবং ‘আনুগত্য’-এর মতো বিশেষ বিশেষ স্লোগানের বেড়াজালে প্রবেশ করে আনন্দিত হয়েছে।
আরেক দল আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষায় আছে এবং কেবলই প্রশ্ন করছে— প্রকৃত পথটি কোথায়?
এখান থেকেই একটি বড় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, তা হলো:
দাওয়াতী কাজে সক্রিয় সমসাময়িক দল ও সংগঠনগুলোতে যোগদানের শারঈ বিধান কী?
এই প্রশ্নটির স্বরূপ নিচের বিষয়গুলোর মাধ্যমে ফুটে ওঠে—
আমাদের যুগে বিদ্যমান এসব দল (ইসলামী দল ও জামা‘আতসমূহ) কি দলীল এবং বিষয়বস্তুর বিচারে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য? নাকি এগুলো সেসব উপদলেরই ধারাবাহিকতা, যারা খোলাফায়ে রাশেদার যুগের পর মূল মুসলিম জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল— যদিও তাদের নাম, স্লোগান এবং কর্মপদ্ধতি ও পরিকল্পনায় কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে? যদি তাদের মধ্যে কোনো সাধারণ বা অভিন্ন দিক থেকে থাকে, তবে তা কী?
অথবা এমনও কি হতে পারে যে, সময়ের বিবর্তনে এবং পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই দলগুলোই মুসলিমদের জন্য এমন এক ‘শ্বাস নেওয়ার পথ’ (সুযোগ) হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার মাধ্যমে তারা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং মুসলিমদেরকে কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’-এর প্রকৃত দাবি ও অধিকারের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে?
অতীতের সেসব ফেরকা বা দল, যারা মূল মুসলিম জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, আসলে তারা ছিল যালেম। কারণ তারা ছিরাতুল মুস্তাক্বীম থেকে বিচ্যুতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কেননা এসব দল ভ্রান্ত মতবাদ ও কুপ্রবৃত্তি লালন করেছিল। এছাড়া তারা এমন এক মুসলিম শাসন ব্যবস্থার অধীনে বাস করত, যেখানে আল্লাহর আইন কার্যকর ছিল। বর্তমানের দল ও সংগঠনগুলোর অবস্থা এর বিপরীত; কারণ তারা এমন সব সরকারের অধীনে বাস করছে, যারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইসলামী শরী‘আর শাসন থেকে বিচ্যুত, যদিও তারা কোনো না কোনোভাবে ইসলামের নাম ঘোষণা করে।
এমতাবস্থায়, এই দল বা সংগঠনগুলোর কাঠামোর মধ্যেই কি উম্মাহর মুক্তির উপায় নিহিত নাকি এর বাইরে অন্য কিছু আছে? শরী‘আহ কোন ধরনের দলের সাথে যোগদানের অনুমতি দেয়? সেই মূল ‘মুসলিম জামা‘আত’ কোনটি?- যা থেকে এই দলগুলো বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে সেটি কোথায়? তার বৈশিষ্ট্য ও পরিচয়ই-বা কী? এই সমসাময়িক দলগুলোকে কি সংস্কার বা সংশোধন করা সম্ভব, যাতে তারা একটি ঐক্যবদ্ধ জামা‘আতে পরিণত হয় এবং সবাই সেদিকেই ফিরে আসে? অথবা (এই জামা‘আতগুলোকে কি সংস্কার করে এমন এক) পথে (পরিণত করা সম্ভব), যার উচ্চতাকে ইসলাম উচ্চতর করেছে এবং তাকে সুবিন্যস্ত করেছে ও তা ব্যতীত অন্য সব পথকে প্রত্যাখ্যান করেছে; যে পথের মাধ্যমে একজন মুসলিম তার রবের আনুগত্য করে এবং সেই পথের ওপর অটল থেকেই তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করবে?
এটিই সেই প্রশ্ন, যা এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। আর একজন মুসলিম কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলীল-প্রমাণ এবং সমসাময়িক দলগুলোর বাস্তবতার সঠিক উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করে এর উত্তর খুঁজছেন, ঠিক যেমন একজন অভাবী ব্যক্তি ধূলিকণার মধ্যে তার হারিয়ে যাওয়া মূল্যবান আংটি খুঁজে বেড়ায়।
তাই উম্মাহর কল্যাণকামনা এবং ইসলাম ও মুসলিম জামা‘আতকে বিচ্যুতির ব্যাধি থেকে রক্ষা করার স্বার্থে এই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্টভাবে তুলে ধরা আলেমদের জন্য অনিবার্য হয়ে পড়েছে— যাতে সবকিছু সঠিক পথের ওপর অটল থাকে। যেমনটি আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নির্দেশ দিয়েছেন, فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ ‘সুতরাং আপনি সেভাবেই দৃঢ় থাকুন, যেভাবে আপনাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে’ (হূদ, /১১২)। একইভাবে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমে তাঁর উম্মাহকেও এই নির্দেশ দিয়েছেন, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, فَاسْتَقِيمُوا إِلَيْهِ ‘সুতরাং তোমরা তাঁর দিকেই সোজা হয়ে থাকো (অটল থাকো)’ (ফুছছিলাত, ৪১/৬)।
ছহীহ মুসলিম ও অন্যান্য হাদীছগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে উপদেশ চাইলে তিনি তাকে বলেন, قُلْ: آمَنْتُ بِاللَّهِ، ثُمَّ اسْتَقِمْ ‘বলো, আমি আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি, অতঃপর তার ওপর অটল থাকো’।[1]
‘বলো, আমি আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি’— নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উক্ত বাণীর মাধ্যমে আক্বীদা সংশোধনের মর্ম এবং ‘অতঃপর তার ওপর অটল থাকো’-এর মাধ্যমে আমল সংশোধনের মর্ম একত্রিত করে দিয়েছেন। আর এই দুই ধরনের সংশোধনের ওপর ভিত্তি করেই মুসলিম উম্মাহর প্রকৃত প্রতিষ্ঠা বা জাগরণ সম্ভব হয়।
এই বিষয়টি স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তা ইসলামের এক মজবুত রশির সাথে যুক্ত। এটি আল্লাহ, তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, মুসলিম শাসক এবং সাধারণ জনগণের প্রতি ঐকান্তিক কল্যাণ কামনার একটি অনিবার্য অংশ। এটি দ্বীনের বাইরের কোনো বিষয় নয়; বরং পবিত্র শরী‘আর বিধানে এর অনেক নজির রয়েছে, যা প্রাচীন ও আধুনিককালের আলেমগণ নিরলসভাবে বর্ণনা করে আসছেন। যেমন: হাদীছ বর্ণনাকারী (রাবী), সাক্ষী, ভ্রষ্টতার দিকে আহ্বানকারী এবং দ্বীনের মধ্যে কুপ্রবৃত্তি ও বিদ‘আতের অনুসারীদের অবস্থা বর্ণনা করা। এছাড়া বিভিন্ন ফেরকা বা দল এবং মুফতী, বিচারক ও লেখকদের অবস্থা বিশ্লেষণ করাও এর অন্তর্ভুক্ত। এর মাধ্যমে তাদের জীবনচরিতে বিদ্যমান এমন সব প্রতিবন্ধকতা উল্লেখ করা হয়, যা অন্যদের পরিবর্তে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মাযহাব, মতামত বা সংবাদ অনুসরণ ও গ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এভাবেই উম্মাহর কাছে সত্য প্রকাশ এবং নছীহতের বিভিন্ন পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। আর ‘ত্বয়েফা মানুছূরা’-এর ছত্রছায়ায় এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত পথ, যার মাধ্যমে মুসলিমদের থেকে বহিরাগত আবর্জনা বা বিচ্যুতি দূর করা হবে; ঠিক যেভাবে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা হয়।
এখানে সবচেয়ে সূক্ষ্ম একটি বিষয় লক্ষণীয়, তা হলো— নাম ও শারঈ পরিভাষাগুলোর ক্ষেত্রে ‘ইলমি ভাষা’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক ভাষা মেনে চলা, যাতে শ্রোতা ও গবেষক অতীত ও বর্তমানের যোগসূত্র বুঝতে পারেন এবং অতীতের সমস্ত উপাদান ও অবস্থানের সাথে নিজের বিচ্ছেদ অনুভব না করেন। এছাড়া নতুন উদ্ভাবিত ‘স্লোগান’গুলো যেন বোধশক্তিকে বিভ্রান্ত না করে, বিশেষ করে সেই সব স্লোগান, যেগুলোকে পুঁজি করা হয় এবং বাহ্যিক চাকচিক্য দিয়ে অনেককে আকৃষ্ট করা হয়— যদিও সেগুলো ভেতর থেকে অন্তঃসারশূন্য। আপনি যদি গভীরভাবে দেখেন, তবে দেখতে পাবেন যে, এগুলোর সারমর্ম প্রাচীনকালের বিভিন্ন ভ্রান্ত ‘ফেরকা’র মতাদর্শেরই প্রতিফলন। পবিত্র শরী‘আহ প্রত্যাখ্যান করে এমন কতশত চিন্তাধারা, মতবাদ ও পথ যে এগুলোর আড়ালে ঢুকে পড়েছে! ‘ইলমি ভাষা’ বা ‘দ্বীনি ভাষা’কে বদলে দেওয়া অস্বাভাবিক বোঝা চাপানো ছাড়া আর কিছুই নয়, যা ঘরে সদর দরজার বদলে পেছনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করার শামিল। ভাষাকে কলুষিত করা মানেই দ্বীনকে কলুষিত করা।[2]
অতএব, পর্যবেক্ষণ, গবেষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া অবশ্যই একমাত্র ‘ইলমি ভাষা’র ছাঁচেই হতে হবে। আমাদের উচিত, ‘ইসলামী জামা‘আত ও দলসমূহ’— এমন স্লোগান ব্যবহার না করে ‘ফেরকা’ (উপদল) শব্দটি ব্যবহার করা। কারণ মুসলিম জামা‘আত একটিই, যা একাধিক হয় না (যার মানদণ্ড হলো নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর ছাহাবায়ে কেরামের অনুসৃত মূলনীতি)। আর মূল মুসলিম জামা‘আত ব্যতীত বাকিরা সবাই মুসলিম জামা‘আতেরই অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন ‘ফেরকা’। একইভাবে সুন্নাহর বিপরীতে আমাদের ‘বিদআত’ শব্দটি ব্যবহার করা উচিত এবং বিদআতপন্থি ও কুপ্রবৃত্তির অনুসারীদের বিপরীতে ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত’ পরিভাষাটি ব্যবহার করা উচিত।
অনুরূপভাবে ‘আধ্যাত্মিক বিপ্লব’ (اَلْاِنْقِلَابُ الرُّوْحِيُّ) বা ‘রাজনৈতিক বিপ্লব’ (اَلْاِنْقِلَابُ السِّيَاسِيُّ)-এর পরিবর্তে ‘আল্লাহর দিকে দাওয়াত’ (اَلدَّعْوَةُ إِلَى اللهِ), ‘জিহাদ’ (اَلْجِهَادُ), ‘সশস্ত্র জিহাদ (اَلنَّفِيْرُ)’ ও ‘শাসনকর্তা নিয়োগ’ (تَنْصِيْبُ الْوُلَاةِ)—পরিভাষাগুলো ব্যবহার করা উচিত। কেননা ইসলাম করুণা ও হেদায়াতের জীবনব্যবস্থা, এতে কোনো জোর-জবরদস্তি বা অন্যায় নেই।
একইভাবে অভ্যুত্থান বা আন্দোলন (اَلْاِنْتِفَاضَةُ) শব্দের পরিবর্তে (শারঈ শব্দ ব্যবহার করা উচিত); কেননা কেবল রোগাক্রান্ত ব্যক্তি- যেমন জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তি বা ভীরু ব্যক্তিই কম্পিত বা আন্দোলিত হয়। ‘আন্দোলন ও ইসলামী আন্দোলন’ (اَلتَّحَرُّكُ وَالْحَرَكَةُ الْإِسْلَامِيَّةُ)-এর পরিবর্তে ‘দাওয়াত’ (اَلدَّعْوَةُ), ‘সতর্কীকরণ’ (اَلْاِنْذَارُ) ও ‘পৌঁছে দেওয়া’ (اَلْبَلَاغُ)—পরিভাষাগুলো ব্যবহার করা উচিত। কারণ আরবী ভাষায় اَلتَّحَرُّكُ বা আন্দোল/নড়াচড়া শব্দটি প্রতিটি সচল বস্তুর ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়, এমনকি যদি তা স্থান পরিবর্তন না করে বা তার মধ্যে জীবন না থাকে যেমন গাছের নড়াচড়া। আর اَلتَّحَرُّكُ বা আন্দোল/নড়াচড়া ভালোর জন্যও হতে পারে আবার মন্দের জন্যও হতে পারে।
আমাদের উচিত দ্বীনের স্তরসমূহ প্রকাশের ক্ষেত্রে (বিবেক, অনুভূতি, মানবতা) পরিভাষাগুলোর পরিবর্তে (ইসলাম, ঈমান, ইহসান) পরিভাষাগুলো ব্যবহার করা। এরকম আরো দীর্ঘ তালিকা রয়েছে, যা উপস্থাপন করতে গেলে কলেবর বৃদ্ধি পাবে। হায় আল্লাহ! এই নতুন উদ্ভাবিত পরিভাষাগুলোর কারণে জ্ঞানের ওপর এবং এর প্রকৃত সত্যের ওপর কত বড় অবিচারই-না করা হয়েছে! এগুলো সংশয় উসকে দেয়, সালাফে ছালেহীনের গৌরবোজ্জ্বল আদর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং বিবাদ ও শত্রুতা পুনরুজ্জীবিত করে।
আপনি যেমনটি দেখেছেন, (জ্ঞানের ভাষা) পরিবর্তন করা যেমন কাঠামোগত বা শব্দের দিক থেকে হয়, তেমনি তা অর্থের দিক থেকেও হতে পারে। এটি করা হয় বিদআত ও বিভ্রান্তিকর কুপ্রবৃত্তিগুলোকে শারঈ শব্দ ও পরিভাষা দিয়ে ব্যক্ত করার মাধ্যমে; এটি ছিল মূলত ‘ইখওয়ানুছ ছাফা’-দের[3] কর্মপন্থা, যা তাদের লেখনিতে দেখা যায়।
এই উভয় পন্থাই[4] শরী‘আর ওপর একটি অবিচার। প্রথমটি হলো (পথভ্রষ্টতার পোশাক), আর দ্বিতীয়টি হলো (বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী); কারণ তারা বাতিলের সারমর্ম গ্রহণ করেছে এবং তাকে শরী‘আর বহিরাবরণ দিয়ে ঢেকে দিয়েছে।
মূল উত্তরের আগে আমি সাতটি গবেষণামূলক আলোচনার মাধ্যমে একটি ভূমিকা প্রদান করা জরুরী মনে করছি। যদিও এর ফলে মূল প্রশ্ন ও উত্তরের মাঝে সময়ের ব্যবধান দীর্ঘ হবে, তবে গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা বা সমস্যার আলোচনার আগে ভূমিকা পেশ করা একটি সুবিদিত পদ্ধতি।
(ইনশা-আল্লাহ! চলবে)
মূল: ড. বাকর ইবনে আব্দুল্লাহ আবূ যায়েদ
পরিমার্জন: সা‘দ ইবনে আব্দুর রহমান আল-হুছায়্যিন
অনুবাদ: আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী
বিএ (অনার্স), উচ্চতর ডিপ্লোমা, এমএ এবং এমফিল, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব;
অধ্যক্ষ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।
[1]. মুসনাদ আহমাদ, হা/১৫৪১৬, ‘ছহীহ’।
[2]. এখানে শব্দের মারপ্যাঁচে ফেলে মানুষকে বিভ্রান্ত না করার এবং ইসলামী পরিভাষাগুলো ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। বিভিন্ন ফেরকা মূলত: এই কাজটাই করে থাকে। —অনুবাদক
[3]. ‘ইখওয়ানুছ ছাফা’ হলো একটি গোপন ও বাতেনী দল, যারা গ্রিক দর্শন এবং বাতেনী আক্বীদা (গুপ্ত বিশ্বাস)কে ইসলামী আক্বীদার সঙ্গে সংমিশ্রিত করেছিল। —অনুবাদক
[4]. অর্থাৎ শব্দ বা তার অর্থ পরিবর্তন করা। —অনুবাদক
