সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার নিমিত্তে, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতার পথ দেখিয়েছেন। অসংখ্য দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক, আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি, যিনি তাঁর উম্মতকে এমন সব অমূল্য সম্পদের সন্ধান দিয়েছেন, যা অর্জন করলে মানুষ প্রকৃত অর্থেই সফল, সৌভাগ্যবান ও কল্যাণপ্রাপ্ত হয়।
পরকথা হলো, মানুষের জীবনে প্রকৃত সফলতা কেবল ধনসম্পদ, পদ-পদবি বা পার্থিব প্রাচুর্যের নাম নয়; বরং সফলতা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে দুনিয়ায় শান্তিময় জীবন এবং আখেরাতে চিরস্থায়ী মুক্তি লাভ করা।
আজকের পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষ সম্পদ বলতে অর্থ, বাড়ি, গাড়ি কিংবা ক্ষমতাকেই বোঝে। অথচ এসব সম্পদ ক্ষণস্থায়ী, সময়ের পালাবদলে এগুলো হারিয়ে যায়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের এমন কিছু সম্পদের কথা শিক্ষা দিয়েছেন, যা কখনো মূল্যহীন হয় না, কখনো পুরোনো হয় না এবং যার সুফল দুনিয়া থেকে আখেরাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এগুলোই মানুষের প্রকৃত সম্পদ, প্রকৃত সৌভাগ্য এবং চিরস্থায়ী সফলতার মূলধন।
সুধী পাঠক! আসুন, আমরা নিচের হাদীছটি একটু গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ি এবং হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। এটি কোনো মনীষীর উক্তি, দার্শনিকের চিন্তা কিংবা কাল্পনিক গল্প নয়; বরং মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অমূল্য উপদেশ। তিনি দ্বীনের বিষয়ে নিজের প্রবৃত্তি থেকে কথা বলতেন না, আল্লাহ তাআলার অহীর নির্দেশনায় কথা বলতেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى - إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى ‘তিনি নিজের প্রবৃত্তি থেকে কোনো কথা বলেন না। কেবল তা অহী, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়’ (আন-নাজম, ৫৩/৩–৪)।
عَن ثَوْبَانَ t قَالَ لَمَّا نَزَلَتْ وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ قَالَ بَعْضُ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَأَيُّ الْمَالِ نَتَّخِذُ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لِيَتَّخِذْ أَحَدُكُم قَلْبًا شَاكِرًا وَلِسَانًا ذَاكِرًا وَزَوْجَةً مُؤْمِنَةً تُعِينُهُ عَلَى إِيْمَانِهِ.
ছাওবান রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আল্লাহর এই বাণী নাযিল হলো, ‘যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য সঞ্চয় করে...’ (আত-তাওবা,৯/৩৪), তখন ছাহাবায়ে কেরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে আমরা কোন সম্পদ সঞ্চয় করব? রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকে যেন একটি কৃতজ্ঞ হৃদয়, আল্লাহর যিকিরে সদা ব্যস্ত একটি জিহ্বা এবং এমন একজন মুমিনা স্ত্রী গ্রহণ করে, যে তাকে আখেরাতের কাজে সহযোগিতা করবে’।[1]
এই হাদীছে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনটি সম্পদের কথা উল্লেখ করেছেন, যা স্বর্ণ-রৌপ্য, অট্টালিকা কিংবা পার্থিব অন্যান্য ধনসম্পদের চেয়েও মূল্যবান। যে ব্যক্তি এই তিনটি সম্পদের অধিকারী হয়, সে প্রকৃতার্থেই আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত।
এই হাদীছের পটভূমি অত্যন্ত শিক্ষণীয়। সূরা আত-তাওবার ৩৪ নম্বর আয়াতে স্বর্ণ-রৌপ্য জমা করে আল্লাহর পথে ব্যয় না করার কঠোর সতর্কবাণী নাযিল হলো। ছাহাবায়ে কেরাম চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাদের প্রশ্ন ছিল, যদি স্বর্ণ-রৌপ্য সঞ্চয় করা নিন্দনীয় হয়, তবে একজন মুমিনের জন্য সর্বোত্তম সম্পদ কী হতে পারে? রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রশ্নের উত্তরে এমন তিনটি সম্পদের কথা উল্লেখ করলেন, যেগুলো কখনো নষ্ট হয় না, চুরি হয় না, যাকাত দেওয়ার পর কমে যায় না; বরং মানুষকে দুনিয়ায় শান্তি এবং আখেরাতে মুক্তি এনে দেয়। এ থেকেই বুঝা যায়, ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত সম্পদ মানে অর্থসম্পদ নয়; বরং যা মানুষের ঈমান, আমল ও আখেরাতকে সমৃদ্ধ করে, সেটিই প্রকৃত ও সর্বোত্তম সম্পদ।
(১) কৃতজ্ঞহৃদয়: রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম যে সম্পদের কথা উল্লেখ করেছেন, তা হলো ‘কৃতজ্ঞহৃদয়’। কৃতজ্ঞতা বা শুকরিয়া শুধু মুখে মুখে ‘আল-হামদুলিল্লাহ’ বলার নাম নয়; বরং এটি অন্তরের এমন অবস্থা, যেখানে বান্দা সর্বদা আল্লাহর নেয়ামতকে স্বীকার করে, তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকে এবং প্রতিটি নেয়ামতকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করার চেষ্টা করে। কুরআন মাজীদে এসেছে,لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ ‘তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, তবে অবশ্যই অবশ্যই আমি তোমাদেরকে আরও বৃদ্ধি করে দেব’ (ইবরাহীম,১৪/৭)।
এ আয়াতে আমরা দেখতে পাই, কৃতজ্ঞতা শুধু একটি নৈতিক গুণ নয়; বরং এটি আল্লাহর নেয়ামত বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কৃতজ্ঞতা বা শোকরের মূল হলো অন্তরে নেয়ামতদাতাকে স্বীকার করা, মুখে তাঁর প্রশংসা করা এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে তাঁর আনুগত্যে নিয়োজিত করা। অতএব, ‘কৃতজ্ঞ হৃদয়’ এমন হৃদয়, যা নেয়ামতের জন্য অহংকার করে না, বিপদে আল্লাহর ফয়সালায় অসন্তুষ্ট হয় না এবং সুখে আল্লাহকে ভুলে যায় না; বরং সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রশংসা করে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে। এমন হৃদয়ই প্রকৃত সম্পদ। কারণ ধনসম্পদ হারিয়ে যেতে পারে; কিন্তু কৃতজ্ঞ হৃদয় মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সাহায্য করে, ঈমানকে সুদৃঢ় করে এবং তাকে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের পথে পরিচালিত করে।
(২) যিকিরকারীজিহ্বা: কৃতজ্ঞ হৃদয়ের পর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয় সম্পদের কথা উল্লেখ করেছেন, তা হলো ‘যিকিরকারীজিহ্বা’। এটি এমন এক অমূল্য সম্পদ, যা কোনো অর্থ দিয়ে কেনা যায় না; কিন্তু এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি, অন্তরের প্রশান্তি এবং আখেরাতের মুক্তি অর্জন করতে পারে। যিকির অর্থ শুধু সুবহানাল্লাহ, আল-হামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার বলা নয়; বরং আল্লাহকে স্মরণ করে তাঁর আদেশ মানা, নিষেধ থেকে বিরত থাকা, কুরআন তেলাওয়াত করা এবং দু‘আ, ইস্তিগফার, তাহলীল, তাকবীর, তাহমীদ এসবই যিকিরের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا - وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো এবং সকাল-সন্ধ্যা তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করো’ (আলআহযাব,৩৩/৪১-৪২)।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, أَلَا بِذِكْرِ ٱللَّهِ تَطْمَئِنُّ ٱلْقُلُوبُ ‘জেনে রেখো! আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে’ (আর-রা‘দ, ১৩/২৮)।
এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে, প্রকৃত মানসিক প্রশান্তি ধনসম্পদ, ক্ষমতা বা খ্যাতিতে নয়; বরং আল্লাহর স্মরণে নিহিত। এই প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ، وَالَّذِي لَا يَذْكُرُ مَثَلُ الْحَيِّ وَالْمَيِّتِ ‘যে ব্যক্তি তার রবের যিকির করে এবং যে যিকির করে না, তাদের দৃষ্টান্ত জীবিত ও মৃত ব্যক্তির ন্যায়’।[2]
এই হাদীছে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝিয়েছেন যে, যিকির মানুষের হৃদয়কে জীবন্ত রাখে। যিকিরহীন হৃদয় ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে যায় এবং আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়। আরেক হাদীছে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
أَلاَ أُنَبِّئُكُمْ بِخَيْرِ أَعْمَالِكُمْ وَأَزْكَاهَا عِنْدَ مَلِيْكِكُمْ وَأَرْفَعِهَا فِي دَرَجَاتِكُمْ وَخَيرٍ لَكُمْ مِنْ إِنْفَاقِ الذَّهَبِ والفِضَّةِ وَخَيْرٍ لَكُمْ مِنْ أَن تَلْقَوا عَدُوَّكُمْ فَتَضْرِبُوا أَعْنَاقَهُمْ وَيَضْرِبُوا أَعْنَاقَكُمْ؟ قَالَوا بَلَى قَالَ ذِكرُ الله تَعَالٰـى.
‘আমি কি তোমাদেরকে তোমাদের উত্তম কাজের সন্ধান দেব না, যা তোমাদের রবের নিকট সবচেয়ে পবিত্র, তোমাদের মর্যাদা সবার চেয়ে বেশি বৃদ্ধিকারী, সোনা-রূপা দান করার চেয়েও উত্তম এবং শত্রুর সম্মুখীন হয়ে গর্দান কাটা ও কাটানোর চেয়ে শ্রেয়?’ ছাহাবীগণ বললেন, অবশ্যই বলে দিন। তিনি বললেন, ‘আল্লাহ তাআলার যিকির’।[3]
ইবনুল ক্বাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যিকির হৃদয়ের প্রাণ এবং তার খাদ্য ও শক্তি। হৃদয় যিকির থেকে বিচ্ছিন্ন হলে তা এমন দুর্বল হয়ে পড়ে, যেমন পানি থেকে বিচ্ছিন্ন মাছ দুর্বল হয়ে পড়ে।[4]
যিকির এমন একটি ইবাদত, যার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। বান্দা যত বেশি আল্লাহকে স্মরণ করবে, ততই সে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে। কেননা যিকির হলো ঈমানের প্রাণ। যে হৃদয় যিকিরে সজীব থাকে, সে হৃদয়ে শয়তানের প্রভাব দুর্বল হয়ে যায়।
যিকিরকারীজিহ্বারবৈশিষ্ট্য: একজন মুমিনের জিহ্বা সর্বদা আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত থাকে। মিথ্যা, গীবত, চোগলখোরি ও অশ্লীল ভাষা থেকে বিরত থাকে। কুরআন তেলাওয়াতে অভ্যস্ত হয়। অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার করে। মানুষের সঙ্গে উত্তম ভাষায় কথা বলে। এমন জিহ্বাই রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভাষায় প্রকৃত সম্পদ।
এখানেঅনুধাবনীয়বিষয়: ১. যিকির মানুষের হৃদয়কে জীবন্ত রাখে। ২. আল্লাহর স্মরণই প্রকৃত প্রশান্তির উৎস। ৩. যে জিহ্বা যিকিরে ব্যস্ত থাকে, তা সাধারণত গুনাহ থেকে নিরাপদ থাকে। ৪. যিকির দুনিয়া ও আখেরাত উভয় ক্ষেত্রেই সফলতার অন্যতম মাধ্যম। ৫. একজন মুসলিমের প্রতিদিনের জীবন তাসবীহ, তাহমীদ, তাকবীর, তাহলীল, ইস্তিগফার ও কুরআন তেলাওয়াত দ্বারা সমৃদ্ধ হওয়া উচিত।
(৩) মুমিনাস্ত্রী: রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই হাদীছে তিনটি সর্বোত্তম সম্পদের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথম দুটি হলো কৃতজ্ঞ হৃদয় ও যিকিরকারী জিহ্বা। এরপর তিনি তৃতীয় যে সম্পদের কথা বলেছেন, তা হলো وَزَوْجَةٌ مُؤْمِنَةٌ تُعِينُهُ عَلَى إِيمَانِهِ ‘আর এমন একজন মুমিনা স্ত্রী, যে স্বামীকে ঈমানের কাজে সহযোগিতা করে’।[5]
এখানে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু ‘মুমিনা স্ত্রী’ বলেননি; বরং বলেছেন, ‘যে ঈমানের ব্যাপারে সহযোগিতা করবে’। অর্থাৎ স্ত্রীর সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ শুধু তার ঈমান নয়; বরং সেই ঈমানের বাস্তব প্রকাশ, যা স্বামীকে আল্লাহর আনুগত্যে উদ্বুদ্ধ করে। কেন নেককার স্ত্রীকে ‘উত্তম সম্পদ’ বলা হয়েছে? মানুষ সাধারণত সম্পদ বলতে অর্থ, স্বর্ণ, জমি, ব্যবসা কিংবা বাড়িঘরকে বুঝে থাকে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়ে দিলেন, প্রকৃত সম্পদ এমন কিছু, যা মানুষের ঈমান, চরিত্র ও আখেরাতকে সমৃদ্ধ করে। তাই অন্য একটি হাদীছে তিনি বলেন,الدُّنْيَا مَتَاعٌ وَخَيْرُ مَتَاعِ الدُّنْيَا الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ ‘দুনিয়া ভোগের সামগ্রী। আর দুনিয়ার সর্বোত্তম ভোগ্যসম্পদ হলো নেককার স্ত্রী’।[6]
এখানে ‘ভোগ্যসম্পদ’ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থাৎ নেককার স্ত্রী এমন এক নেয়ামত, যা মানুষকে শুধু দুনিয়ার শান্তিই দেয় না; বরং আখেরাতে সফলতারও মাধ্যম হয়। কুরআনের আলোকে নেককার স্ত্রীর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ ‘আর নেককার নারীরা অনুগত থাকে এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজেকে সংরক্ষিত রাখে, যেভাবে আল্লাহ সংরক্ষিত রেখেছেন’ (আন-নিসা, ৪/৩৪)।
এই আয়াতে আল্লাহ নেককার স্ত্রীর দুটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন, ১. তিনি আল্লাহর আনুগত্যশীল এবং ২. তিনি স্বামীর অনুপস্থিতিতেও বিশ্বস্ত ও আমানতদার। এগুলোই একটি সুখী মুসলিম পরিবারের ভিত্তি। জীবনসঙ্গী নির্বাচনের সর্বপ্রথম মানদণ্ড। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لأَرْبَعٍ لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَلِجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ ‘চারটি কারণে নারীকে বিবাহ করা হয়; তার সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য ও দ্বীনের জন্য। অতএব, তুমি দ্বীনদার নারীকে প্রাধান্য দাও; নচেৎ তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে’।[7]
এই হাদীছের অর্থ এই নয় যে, সৌন্দর্য, বংশ বা সম্পদের কোনো মূল্য নেই। বরং এগুলোর মধ্যে দ্বীনদারিতা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, যা স্বামীর জন্য জান্নাতের পথে সহায়ক হবে। নেককার স্ত্রী এমন একজন, যিনি— ১. স্বামীকে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত জামাআতের সাথে পড়ার জন্য উৎসাহিত করেন। ২. তাহাজ্জুদ, কুরআন তেলাওয়াত ও যিকিরে সহযোগিতা করেন। ৩. হারাম উপার্জন থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করেন। ৪. সন্তানদের ইসলামী আদর্শে গড়ে তোলেন। ৫. পরিবারে তাক্বওয়া ও সুন্নাহর পরিবেশ সৃষ্টি করেন।
একারণেই রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘সুন্দরী স্ত্রী’ বা ‘ধনী স্ত্রী’ বলেননি। তিনি বলেছেন, تُعِينُهُ عَلَى إِيمَانِهِ ‘যে তাকে আখেরাতের কাজে সহযোগিতা করে’। এই একটি বাক্যই ইসলামে আদর্শ দাম্পত্য জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। ইসলাম শুধু দ্বীনদার স্ত্রী নির্বাচন করতে বলেনি, বরং একজন আদর্শ স্ত্রীর বৈশিষ্ট্যও বর্ণনা করেছে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল,أَيُّ النِّسَاءِ خَيْرٌ؟ ‘কোন নারী সর্বোত্তম?’ তিনি উত্তরে বলেন,الَّتِي تَسُرُّهُ إِذَا نَظَرَ وَتُطِيعُهُ إِذَا أَمَرَ وَلَا تُخَالِفُهُ فِي نَفْسِهَا وَلَا مَالِهَا بِمَا يَكْرَهُ ‘সে নারী, যাকে দেখলে স্বামী আনন্দিত হয়, স্বামী কোনো বৈধ নির্দেশ দিলে তা পালন করে এবং নিজের ব্যাপারে ও স্বামীর সম্পদের ব্যাপারে এমন কিছু করে না, যা স্বামী অপছন্দ করে’।[8]
এই হাদীছ আমাদের শেখায় যে, একজন উত্তম স্ত্রীর সৌন্দর্য কেবল বাহ্যিক রূপে নয়; বরং তার ঈমান, চরিত্র, আনুগত্য, বিশ্বস্ততা ও উত্তম ব্যবহারে। নেককার স্ত্রী স্বামীর জন্য আল্লাহর সর্বোত্তম নেয়ামত। কেননা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বর্ণ-রৌপ্যের পরিবর্তে এমন তিনটি সম্পদের কথা বলেছেন, যা মানুষের দ্বীনকে সংরক্ষণ করে এবং আখেরাতের সফলতার কারণ হয়। আর নেককার স্ত্রীকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ সংসারজীবনে তিনিই স্বামীর দ্বীনদারিতার সবচেয়ে বড় সহযোগী হতে পারেন।
অনেক মানুষ মনে করেন, বিয়ের উদ্দেশ্য শুধু পারিবারিক জীবন, সন্তান বা দুনিয়াবী সুখ। কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের শিক্ষা দেয় যে, একজন মুসলিম স্বামী-স্ত্রীর সর্বোচ্চ লক্ষ্য হওয়া উচিত পরস্পরকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের পথে সহযোগিতা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ‘তোমরা সৎকাজ ও তাক্বওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করো’ (আল-মায়েদা, ৫/২)।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি— ১. প্রকৃত সম্পদ হলো ঈমান, যিকির ও নেককার পরিবার। ২. কৃতজ্ঞতা আল্লাহর নেয়ামত বৃদ্ধি করে এবং বান্দাকে বিনয়ী রাখে। ৩. যিকির মানুষের হৃদয়কে জীবন্ত রাখে এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করে। ৪. জীবনসঙ্গী নির্বাচনে দ্বীনদারিতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ৫. একজন নেককার স্ত্রী স্বামীর দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জীবনের সফলতার অন্যতম মাধ্যম। ৬. মুসলিম পরিবার গড়ে ওঠে পারস্পরিক তাক্বওয়া, দয়া, ভালোবাসা ও আল্লাহর আনুগত্যের উপর।
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের দৃষ্টি এমন এক সম্পদের দিকে ফিরিয়ে দিয়েছেন, যা কখনো চুরি হয় না, আগুনে পুড়ে না, মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয় না এবং ক্বিয়ামতের দিনও মানুষের উপকারে আসে। সেই সম্পদ হলো একটি কৃতজ্ঞ হৃদয়, একটি যিকিরকারী জিহ্বা এবং এমন একজন দ্বীনদার জীবনসঙ্গিনী, যিনি আখেরাতের পথে সহযোগিতা করেন। যে ব্যক্তি এই তিনটি নেয়ামত লাভ করে, সে প্রকৃত অর্থেই আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত। কারণ এগুলোই মানুষের দুনিয়ার শান্তি, পারিবারিক বরকত এবং আখেরাতের চিরস্থায়ী সফলতার ভিত্তি। আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রত্যেককে কৃতজ্ঞ হৃদয়, যিকিরে সজীব জিহ্বা এবং এমন পরিবার দান করুন, যারা পরস্পরকে জান্নাতের পথে সহযোগিতা করে- আমীন!
প্রিয় ত্বলেবুল ইলম ভাইয়েরা! আমরা ইলম অর্জনের জন্য দিন-রাত পরিশ্রম করি, কিতাব পড়ি, পরীক্ষা দিই, সনদের জন্য চেষ্টা করি। কিন্তু আমরা ভেবে দেখেছি কি, যে তিনটি সম্পদকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ বলেছেন, সেগুলো অর্জনের জন্য আমরা কতটুকু চেষ্টা করছি?
দুঃখের বিষয় হলো, অনেক ত্বলেবুল ইলম ইলম অর্জন করছে; কিন্তু কৃতজ্ঞ হৃদয় গড়ে তুলছে না। সামান্য কষ্ট, সামান্য অভাব বা সামান্য পরীক্ষায় অভিযোগে ভরে যায় অন্তর। অথচ কৃতজ্ঞ হৃদয়ই আল্লাহর আরও নেয়ামত লাভের চাবিকাঠি।
আবার অনেকের জিহ্বা কিতাবের আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক ও দুনিয়াবী কথায় ব্যস্ত; কিন্তু আল্লাহর যিকিরে শুষ্ক। অথচ যে জিহ্বা যিকিরে সজীব নয়, সেই জিহ্বা থেকে ইলমের বরকতও ধীরে ধীরে কমে যায়।
আর ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনেকেই দ্বীনের চেয়ে সৌন্দর্য, অর্থ, বংশ বা দুনিয়াবী বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে এমন সংসার গড়ে ওঠে, যা আখেরাতের সফরে সহযোগী না হয়ে অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের এমন জীবনসঙ্গীর কথা বলেছেন, যিনি আখেরাতের পথে সাহায্য করবেন।
প্রিয় শিক্ষার্থীগণ! মনে রাখবেন, একজন আলেমের প্রকৃত পরিচয় শুধু তার জ্ঞান নয়; তার কৃতজ্ঞ হৃদয়, যিকিরময় জিহ্বা এবং তাক্বওয়াভিত্তিক পারিবারিক জীবন। এগুলো ছাড়া ইলমের সৌন্দর্য পূর্ণতা পায় না।
তাই আসুন, আমরা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার সংকল্প না করে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশিত এই তিন অমূল্য সম্পদ অর্জনেরও দৃঢ় সংকল্প করি। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের এমন হৃদয় দান করেন, যা সর্বদা শোকরগুজার; এমন জিহ্বা দান করেন, যা সদা তাঁর যিকিরে সজীব এবং এমন পরিবার দান করেন, যা আমাদের জান্নাতের পথে এগিয়ে দেয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের ইলমকে আমলে, আমলকে ইখলাছে এবং জীবনকে তাঁর সন্তুষ্টিতে পরিপূর্ণ করে দিন- আমীন!
সম্মানিত উলামায়ে কেরাম, শায়খ-মাশায়েখ, দাঈ ও ত্বলেবুল ইলম! আমরা এমন এক আমানতের বাহক, যার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহকে চিনে এবং হেদায়াতের পথ খুঁজে পায়। তাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো আমরা কি শুধু ইলমের বাহক, নাকি ইলমের বাস্তব নমুনাও?
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন তিনটি সম্পদের কথা বলেছেন, যা একজন মুমিনের প্রকৃত সৌভাগ্য তথা কৃতজ্ঞ অন্তর, আল্লাহর যিকিরে সজীব জিহ্বা ও আখেরাতের পথে সহায়ক দ্বীনদার জীবনসঙ্গী। গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যায়, একজন দাঈ, আলেম বা স্কলারের সফলতার ভিত্তিও এই তিনটি বিষয়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে।
আজ আমাদের সবার উচিত নিজেদেরকে প্রশ্ন করা, আমার জিহ্বা কি মানুষের সামনে বক্তৃতার চেয়ে আল্লাহর যিকিরে বেশি সজীব? আমার অন্তর কি মানুষের প্রশংসা পাওয়ার চেয়ে আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়ায় বেশি পরিপূর্ণ? আমার ঘর কি দাওয়াতের শক্তি, নাকি দাওয়াতের দুর্বলতা?
ইলম, বক্তৃতা, জনপ্রিয়তা, অনুসারী, সামাজিক মর্যাদা—এসবই নেয়ামত। কিন্তু যদি কৃতজ্ঞতা হারিয়ে যায়, যিকির কমে যায় আর ঘরে দ্বীনের পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে বাহ্যিক সাফল্যের আড়ালে অন্তরের দেউলিয়াত্ব তৈরি হতে পারে।
তাই আসুন, আমরা কেবল ভালো বক্তা বা ভালো লেখক হওয়ার চেষ্টা না করে, আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য বান্দা হওয়ার চেষ্টা করি। কারণ ক্বিয়ামতের দিন মানুষ আমাদের করতালি, অনুসারীর সংখ্যা বা ভাইরাল বক্তব্য দিয়ে বিচার হবে না; বিচার হবে ইখলাছ, তাক্বওয়া ও আমল দিয়ে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের এমন ইলম দান করুন, যা আমল সৃষ্টি করে; এমন যিকির দান করুন, যা অন্তরকে জীবিত রাখে; এমন শোকর দান করুন, যা নেয়ামত বৃদ্ধি করে এবং এমন পরিবার দান করুন, যা আমাদের জান্নাতের পথে সহযাত্রী হয়- আমীন!
আব্দুল গাফফার মাদানী
শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।
[1]. তিরমিযী, হা/৩০৯৪; ইবনু মাজাহ, হা/১৮৫৬, হাদীছ ছহীহ।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৪০৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৫৯।
[3]. তিরমিযী, হা/৩৩৭৭; ইবনু মাজাহ, হা/৩৭৯০; আহমাদ, হা/২১১৯৫, ২৬৯৭৭, হাদীছ ছহীহ।
[4]. আল-ওয়াবিলুছ ছাইয়িব মিন কালিমিত তাইয়িব, পৃ. ৪২-৪৩।
[5]. তিরমিযী, হা/৩০৯৪; ইবনু মাজাহ, হা/১৮৫৬।
[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৬৭।
[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৯০; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৬৬।
[8]. নাসাঈ, হা/৩২৩১; আহমাদ, হা/৭৪২১; ইরওয়াউল গালীল, হা/১৭৮৬; সিলসিলা ছহীহা, হা/৮৩৩৮; ছহীহ আল-জামে‘, হা/৩২৯৮।
