উল্লেখ্য, জামা‘আত শব্দটির প্রায়োগিক এ অর্থে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সাথে খেয়াল রাখতে হবে:
(১) শাসক গোটা মুসলিম জাহানের খলীফা বা শাসক না হওয়া সত্ত্বেও সেই জামা‘আতের অনুসরণ করা ওয়াজিব, যদিও তিনি কোন অঞ্চল বা দেশের শাসক হন। তার নাম খলীফা হোক বা বাদশাহ হোক বা আর কিছু হোক, তাতে কিছু যায় আসে না। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَيَجُوزُ تَسْمِيَةُ مَنْ بَعْدَ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ "خُلَفَاءَ" وَإِنْ كَانُوا مُلُوكًا؛ وَلَمْ يَكُونُوا خُلَفَاءَ الْأَنْبِيَاءِ بِدَلِيلِ مَا رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ وَمُسْلِمٌ فِي صَحِيحَيْهِمَا... ‘খোলাফায়ে রাশেদীনের পরে যেসব শাসক এসেছেন, তারা নবীগণের খলীফা না হয়ে সাধারণ বাদশাহ হওয়া সত্ত্বেও তাদের নাম ‘খলীফা’ দেওয়া জায়েয। এর দলীল হচ্ছে ছহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীছ...’।[1] আমীর ছান‘আনী রাহিমাহুল্লাহ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী مَنْ خَرَجَ عَنْ الطَّاعَةِ-এর ব্যাখ্যায় বলেন, قَوْلُهُ عَنْ الطَّاعَةِ أَيْ طَاعَةِ الْخَلِيفَةِ الَّذِي وَقَعَ الِاجْتِمَاعُ عَلَيْهِ وَكَأَنَّ الْمُرَادَ خَلِيفَةُ أَيِّ قُطْرٍ مِنْ الْأَقْطَارِ إذْ لَمْ يُجْمِعْ النَّاسُ عَلَى خَلِيفَةٍ فِي جَمِيعِ الْبِلَادِ الْإِسْلَامِيَّةِ مِنْ أَثْنَاءِ الدَّوْلَةِ الْعَبَّاسِيَّةِ بَلْ اسْتَقَلَّ أَهْلُ كُلِّ إقْلِيمٍ بِقَائِمٍ بِأُمُورِهِمْ إذْ لَوْ حُمِلَ الْحَدِيثُ عَلَى خَلِيفَةٍ اجْتَمَعَ عَلَيْهِ أَهْلُ الْإِسْلَامِ لَقَلَّتْ فَائِدَتُهُ ‘আনুগত্য থেকে বের হয়ে গেলো মানে এমন খলীফার আনুগত্য থেকে বের হয়ে গেলো, যার আনুগত্য করার ব্যাপারে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। এখানে যে কোন অঞ্চলের খলীফাকে বুঝানো হয়েছে বলে মনে হয়। কেননা আববাসীয় শাসনামলের মাঝামাঝি সময় থেকে (অদ্যাবধি) সমগ্র মুসলিম জাহানে একক খলীফার ব্যাপারে মানুষ একমত হয়নি; বরং প্রত্যেকটা অঞ্চলের মানুষ নিজেদের শাসক নিয়ে পৃথক হয়ে গেছে। তাছাড়া হাদীছটিকে যদি মুসলিমদের একক খলীফার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে এর ফায়দা কমে যাবে’।[2]
আল্লামা শাওকানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
وَأَمَّا بَعْدَ انْتِشَارِ الْإِسْلَامِ وَاتِّسَاعِ رُقْعَتِهِ وَتَبَاعُدِ أَطْرَافِهِ فَمَعْلُوْمٌ أَنَّهُ قَدْ صَارَ فِيْ كُلِّ قُطْرٍ أَوْ أَقْطَارٍ الْوَلَايَةُ إِلَى إِمَامٍ أَوْ سُلْطَانٍ وَفِي الْقُطْرِ الْآخَرِ أَوِ الْأَقْطَارِ كَذَلِكَ وَلَا يَنْفُذُ لِبَعْضِهِمْ أَمْرٌ وَلَا نَهْيٌ فِيْ قُطْرِ الْآخَرِ وَأَقْطَارِهِ الَّتِيْ رَجَعَتْ إِلَى وَلَايَتِهِ فَلَا بَأْسَ بِتَعَدُّدِ الْأَئِمَّةِ وَالسَّلَاطِيْنِ وَيَجِبُ الطَّاعَةُ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِّنْهُمْ بَعْدَ الْبَيْعَةِ لَهُ عَلَى أَهْلِ الْقُطْرِ الَّذِيْ يُنْفُذُ فِيْهِ أَوَامِرُهُ وَنَوَاهِيْهِ وَكَذَلِكَ صَاحِبُ الْقُطْرِ الْآخَرِ فَإِذَا قَامَ مَنْ يُّنَازِعُهُ فِي الْقُطْرِ الَّذِيْ قَدْ ثَبَتَتْ فِيْهِ وَلَايَتُهُ وَبَايَعَهُ أَهْلُهُ كَانَ الْحُكْمُ فِيْهِ أَنْ يُّقْتَلَ إِذَا لَمْ يَتُبْ وَلَا تَجِبُ عَلَى أَهْلِ الْقُطْرِ الْآخَرِ طَاعَتُهُ وَلَا الدُّخُوْلُ تَحْتَ وَلَايَتِهِ لِتَبَاعُدِ الْأَقْطَارِ فَإِنَّهُ قَدْ لَا يَبْلُغُ إِلَى مَا تَبَاعَدَ مِنْهَا خَبَرُ إِمَامِهَا أَوْ سُلْطَانِهَا وَلَا يُدْرَى مَنْ قَامَ مِنْهُمْ أَوْ مَاتَ فَالتَّكْلِيْفُ بِالطَّاعَةِ وَالْحَالُ هَذِهِ تَكْلِيْفٌ بِمَا لَا يُطَاقُ وَهَذَا مَعْلُوْمٌ لِّكُلِّ مَنْ لَّهُ اطِّلَاعٌ عَلَى أَحْوَالِ الْعِبَادِ وَالْبِلَادِ فَإِنَّ أَهْلَ الصِّيْنِ وَالْهِنْدِ لَا يَدْرُوْنَ بِمَنْ لَّهُ الْوَلَايَةُ فِيْ أَرْضِ الْمَغْرِبِ فَضْلًا عَنْ أَنْ يَتَمَكَّنُوْا مِنْ طَاعَتِهِ وَهَكَذَا الْعَكْسُ وَكَذَلِكَ أَهْلُ مَا وَرَاءَ النَّهْرِ لَا يَدْرُوْنَ بِمَنْ لَّهُ الْوَلَايَةُ فِي الْيَمَنِ وَهَكَذَا الْعَكْسُ فَاعْرِفْ هَذَا فَإِنَّهُ الْمُنَاسِبُ لِلْقَوَاعِدِ الشَّرْعِيَّةِ وَالْمُطَابِقُ لِمَا تَدُلُّ عَلَيْهِ الْأَدِلَّةُ وَدَعْ عَنْكَ مَا يُقَالُ فِيْ مُخَالَفَتِهِ فَإِنَّ الْفَرْقَ بَيْنَ مَا كَانَتْ عَلَيْهِ الْوَلَايَةُ الْإِسْلَامِيَّةُ فِيْ أَوَّلِ الْإِسْلَامِ وَمَا هِيَ عَلَيْهِ الْآنَ أَوْضَحُ مِنْ شَمْسِ النَّهَارِ وَمَنْ أَنْكَرَ هَذَا فَهُوَ مُبَاهِتٌ لَا يَسْتَحِقُّ أَنْ يُخَاطَبُ بِالْحُجَّةِ لِأَنَّهُ لَا يَعْقِلُهَا.
‘আর ইসলামের ব্যাপক প্রচার-প্রসার ও এর সীমানা প্রশস্ত হওয়ার পর একথা সুবিদিত যে, এখন প্রত্যেকটা অঞ্চলের শাসনভার একেকজন শাসকের উপর পড়েছে। অন্যান্য অঞ্চলেও একই অবস্থা। তাদের কারো আদেশ-নিষেধ অন্যের অঞ্চলে বাস্তবায়িত হয় না। এমন অনেক শাসক হওয়াতে কোন দোষ নেই। এসব শাসকের প্রত্যেকের বায়‘আত সঙ্ঘটিত হওয়ার পর তার আনুগত্য করা ঐ অঞ্চলের লোকদের জন্য ওয়াজিব হয়ে যাবে, যেখানে তার আদেশ-নিষেধ কার্যকর হয়। যে অঞ্চলে কারো শাসন ক্বায়েম হয়েছে এবং সেখানকার লোকজন তার বায়‘আত নিয়েছে, সে অঞ্চলে যদি কেউ তার বিরোধিতা করতে আসে, তাহলে তওবা না করলে তাকে হত্যা করতে হবে। দূরে হওয়ার কারণে অন্য অঞ্চলের মানুষের জন্য এই শাসকের আনুগত্য করা এবং তার শাসনের আওতাভুক্ত হওয়া ওয়াজিব নয়। কেননা দূরবর্তী অঞ্চলের লোকদের কাছে এই শাসকের খবর নাও পৌঁছতে পারে, তাদের মধ্যে কে শাসনভার গ্রহণ করেছে আর কে মারা গেছে তাও জানা যায় না। আর এমতাবস্থায় তার আনুগত্যের ভার চাপিয়ে দিলে তা হবে সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপিয়ে দেওয়া। জনগণ ও বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে যার জ্ঞান আছে, তার কাছে এটা জানা বিষয়। কারণ চীন ও ভারতের মানুষ মরক্কো-এর শাসকের আনুগত্য করা তো দূরের কথা, তার সম্পর্কে জ্ঞানও রাখে না। মরক্কোবাসীর ক্ষেত্রেও তাই। অনুরূপভাবে তুর্কিস্তানের জনগণ ইয়ামানের শাসক সম্পর্কে জানে না। ইয়ামানের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। (পাঠক!) এই বিষয়টি উপলব্ধি করুন। কারণ তা শরী‘আতের সাধারণ নিয়ম এবং দলীল-প্রমাণের সাথে মিলে যায়। আর আপনি এর বিপরীত বক্তব্যকে পরিহার করুন। কেননা ইসলামের শুরুতে ইসলামী শাসনব্যবস্থা এবং বর্তমান সময়ের শাসনব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য সূর্যালোকের চেয়েও স্পষ্ট। যে ব্যক্তি এটাকে অস্বীকার করবে, সে মিথ্যুক; তার কাছে দলীল পেশ করার উপযুক্ত সে নয়; কারণ সে তা উপলব্ধি করতে পারে না’।[3] শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহ্হাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
اَلْأَئِمَّةُ مُجْمِعُوْنَ مِنْ كُلِّ مَذْهَبٍ، عَلَى أَنَّ مَنْ تَغَلَّبَ عَلَى بَلَدٍ أَوْ بُلْدَانٍ لَّهُ حُكْمُ الْإِمَامِ فِيْ جَمِيْعِ الْأَشْيَاءِ، وَلَوْلَا هَذَا مَا اسْتَقَامَتِ الدُّنْيَا، لِأَنَّ النَّاسَ مِنْ زَمَنٍ طَوِيْلٍ قَبْلَ الْإِمَامِ أَحْمَدَ إِلَى يَوْمِنَا هَذَا، مَا اجْتَمَعُوْا عَلَى إِمَامٍ وَاحِدٍ، وَلَا يَعْرِفُوْنَ أَحَدًا مِّنَ الْعُلَمَاءِ ذَكَرَ أَنَّ شَيْئًا مِّنَ الْأَحْكَامِ، لَا يَصِحُّ إِلَّا بِالْإِمَامِ الْأَعْظَمِ
‘সকল মাযহাবের ইমামগণ ইজমা পোষণ করেছেন যে, যে ব্যক্তি কোন দেশ বা অঞ্চলের ক্ষমতা দখল করে, সকল ক্ষেত্রে তার বিধান গোটা মুসলিম জাহানের একক খলীফার মতই। এটা যদি না হত, তাহলে দুনিয়া ঠিক থাকত না। কেননা ইমাম আহমাদের আগে থেকে আজ পর্যন্ত এই লম্বা সময় ধরে মানুষ শুধুমাত্র একজন শাসকের অনুসরণের ব্যাপারে একমত পোষণ করেনি; অথচ তারা এমন একজন আলেমের কথাও জানেন না, যিনি বলেছেন যে, সারা জাহানের একক খলীফা ছাড়া কোন হুকুম ও বিচার বিশুদ্ধ হবে না’।[4] শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে ছালেহ আল-উছায়মীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘শাসক হওয়ার জন্য সকল মুসলিমের একক খলীফা হতে হবে এমন কোন শর্ত নেই। কেননা দীর্ঘকাল ধরে একক খলীফার শাসন শেষ হয়ে গেছে। এদিকে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘তোমরা শোন ও আনুগত্য কর, যদিও হাবশী দাস তোমাদের শাসক হন’’। অতএব, কেউ যখন কোন অঞ্চলের শাসক হবেন, তখন তিনি হবেন একক খলীফার স্থানে এবং তার কথা ও আদেশ হবে শিরোধার্য। আমীরুল মুমিনীন উছমান ইবনে আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সময় থেকে মুসলিম উম্মাহ বিভক্ত হতে শুরু করেছে। ইবনুয যুবাইর হিজাযে, বানু মারওয়ান শামে এবং মুখতার ইবনে উবাইদ ইরাকে ক্ষমতা নেন বলে মুসলিম উম্মাহ বিভক্ত হয়ে যায়। উল্লেখ্য, যে ব্যক্তি কোন অঞ্চলের শাসক নিযুক্ত হন, তিনি মুসলিমদের একক খলীফা না হওয়া সত্ত্বেও উলামায়ে কেরাম তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা এবং তার আনুগত্য করার ব্যাপারে অদ্যাবধি বিশ্বাস পোষণ করে আসছেন। এর দ্বারা আমরা কিছু নতুন প্রজন্মের ভ্রষ্টতা বুঝতে পারি, যারা বলছে, আজ মুসলিমদের কোন ইমাম নেই। অতএব, কারো জন্য বায়‘আত চলবে না। আমি জানি না, তারা কি মানুষের শাসক না থাকা অবস্থায় তাদের বিশৃঙ্খলা চাচ্ছে? নাকি তারা বলতে চাচ্ছে যে, প্রত্যেকটা মানুষ তার নিজের শাসক? এরা যদি বায়‘আত ছাড়া মারা যায়, তাহলে তাদের মৃত্যু হবে জাহেলী মৃত্যু’।[5] সঊদী ধর্মমন্ত্রী শায়খ ছালেহ ইবনে আব্দুল আযীয আলুশ-শায়খ হাফিযাহুল্লাহ বলেন,
المُسْلِمُونَ أَجْمَعُوا بِلَا نَكِيرٍ وَلَا اخْتِلَافٍ عَلَى اِنْعِقَادِ الْإِمَامَةِ الشَّرْعِيَّةِ لِإِمَامَيْنِ: هُمَا: إِمَامُ بَنِي العَبَّاسِ فِي بَغْدَادَ، وَإِمَامُ بَنِي أُمَيَّةَ فِي الأَنْدَلُسِ وَمَضَتْ الأُمَّةُ عَلَى ذَلِكَ قُرُونًا، وَكُلُّ وَاحِدٍ مِنْ هَذَيْنِ الإِمَامَيْنِ العُلَمَاءُ وَأَئِمَّةُ السُّنَّةِ فِي بَلَدِهِ يَقُولُونَ: هَذَا الإِمَامُ الَّذِي تَجِبُ بَيْعَتُهُ وَيَحْرُمُ الخُرُوجُ عَلَيْهِ، وَهَذَا إِجْمَاعٌ مِنْهُمْ عَلَى أَنَّ البَيْعَةَ لَا يَشْتَرِطُ لَهَا الخَلَافَةُ الرَّاشِدَةُ العَامَّةُ، بَلْ البَيْعَةُ مَنُوطَةٌ بِمَنْ وَلِيَ الأَمْرَ، لِأَنَّ البَيْعَةَ تَتَجَزَّأُ حَسَبَ البَلَدِ، بِحَسَبِ الوَالِي، هَذَا بَحْثٌ. وَالثَّانِي: فِي هَذِهِ المَسْأَلَةِ أَنَّ هَذَا القَوْلُ - وَهُوَ أَنَّ البَيْعَةَ لَا تَكُونُ إِلَّا مَعَ الإِمَامَةِ العُظْمَى - يَلْزَمُهُ أَنَّ البَيْعَةَ قَدْ ذَهَبَتْ مُنْذُ أَزْمَانٍ، وَأَنْ قَوْلَ النَّبِيِّ عَلَيْهِ الصَلَاةُ وَالسَلَامُ: مَنْ مَاتَ وَلَيْسَ فِي عُنْقِهِ بَيْعَةٌ مَاتَ مِيْتَةً جَاهِلِيَّةً. أَنَّ هَذَا مَخْصُوصٌ بِبَعْضِ الأَزْمِنَةِ دُونَ بَعْضٍ، وَهَذَا تَحَكُّمٌ فِي دَلَالَةِ النُّصِّ وَتَحَكُّمٌ أَيْضًا فِي كَلَامِ أَهْلِ السُّنَّةِ، فَالبَيْعَةُ لَيْسَ لَهَا زَمَنٌ يَحُدُّهَا عِنْدَ أَهْلِ السُّنَّةِ، بَلْ هِيَ مَاضِيَةٌ وَلَمْ يَحُدَّهَا أَحَدٌ، وَالقَوْلُ بِأَنَّ البَيْعَةُ مَنُوطَةٌ بِالْإِمَامَةِ العُظْمَى هَذَا يَلْزَمُ مِنْهُ هَذَيْنِ اللَّازِمِينَ البَاطِلَيْنِ
‘মুসলিমরা বিনা মতভেদে একই সময়ে দু’জন শাসকের শাসনকার্য বৈধ হওয়ার ব্যাপারে ‘ইজমা’ পোষণ করেছেন: সেই দু’জন শাসক হচ্ছেন, বাগদাদে আববাসীয় শাসক এবং আন্দালুসিয়ায় উমাইয়্যা শাসক। মুসলিম উম্মাহ এভাবে কয়েক শতাব্দী অতিবাহিত করেছিল এবং ঐসব এলাকার আলেম-উলামা ও ইমামগণ বলেছিলেন, এই শাসকের হাতে বায়‘আত গ্রহণ করা ওয়াজিব এবং তার বিরুদ্ধাচরণ করা হারাম। তাদের এ বক্তব্যই এ ব্যাপারে ‘ইজমা’ হিসাবে গণ্য যে, বায়‘আত সঙ্ঘটিত হওয়ার জন্য সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্র একক খলীফা বা শাসক হওয়া শর্ত নয়; বরং শাসক হলেই তার ক্ষেত্রে বায়‘আত প্রযোজ্য হবে। কারণ দেশ ও শাসকভেদে বায়‘আত একাধিক হতে পারে। এটা একটা ভাববার বিষয়। দ্বিতীয়ত: আমরা যদি বলি যে, মুসলিম উম্মাহ্র একক খলীফা বা শাসক ছাড়া বায়‘আত চলবে না, তাহলে বহু যুগ থেকে বায়‘আত নেই বলে প্রমাণিত ও অবধারিত হয়ে যাবে এবং এটাও অবধারিত হয়ে যাবে যে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিম্নোক্ত বাণীটি শুধুমাত্র কিছু কিছু যুগের জন্য প্রযোজ্য, তিনি বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি মারা গেলো, অথচ তার গর্দানে বায়‘আত নেই, তার জাহিলী মরণ হলো’’। এভাবে বললে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্ত বাণীর মর্মার্থের সাথে স্বেচ্ছাচারিতা করা হবে; স্বেচ্ছাচারিতা করা হবে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের বক্তব্যের সাথেও। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের নিকট বায়‘আতের জন্য নির্দিষ্ট কোন যুগ নেই; বরং বায়‘আত চলবে এবং কেউ এটাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। সুতরাং যদি বলা হয় যে, বায়‘আত সঙ্ঘটিত হওয়ার জন্য সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্র একক খলীফা বা শাসক হওয়া শর্ত, তাহলে এই দু’টি বাতিল বিষয় অবধারিত হয়ে যাবে’।[6] যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছ শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ এক সময় সমগ্র মুসলিম জাহানের একক খলীফা ছাড়া বায়‘আত সম্পন্ন হবে না বলে মন্তব্য করলেও পরবর্তীতে তিনি এই মত থেকে ফিরে আসেন। শায়খ আলবানীর বিখ্যাত ছাত্র শায়খ আলী হালাবী হাফিযাহুল্লাহ প্রণীত ‘মাসায়েল ইলমিইয়্যাহ ফিস সিয়াসাতি ওয়াদ দা‘ওয়াতিশ শার‘ইয়্যাহ’ (مسائل علمية في السياسة والدعوة الشرعية) গ্রন্থটি তিনি সম্পাদনা করেন এবং যরূরী অবস্থায় একাধিক শাসক থাকতে পারেন বলে এই বইয়ের তথ্যকে তিনি গ্রহণ করেন। শায়খ হালাবী বলেন, وَلَمَّا رَاجَعَ نَفَعَهُ اللهُ بِعُلُومِهِ كِتَابَنَا هَذَا، وَصَحَّحَهُ وَوَقَفَ عَلَى هَذِهِ الكَلِمَاتِ العِلْمِيَّةِ العَالِيَةِ الَّتِي تُجِيزُ مِثْلَ هَذَا التَّعَدُّدِ لِلضَّرُورَة، تَبَنَّاهُ وَانْشَرَحَ لَهُ صَدْرُهُ، وَاطْمَأَنَّ بِهِ ‘(শায়খ আলবানী) যখন আমার প্রণীত এই বইটি সম্পাদনা ও সংশোধন করেছিলেন এবং উচ্চ গবেষণালব্ধ বক্তব্যগুলো অবগত হয়েছিলেন, যেগুলো যরূরী কারণে একাধিক শাসকের বৈধতা দেয়, তখন এটাকেই তিনি গ্রহণ করেছিলেন, এর জন্য তার বক্ষ প্রসারিত হয়েছিল এবং এতেই প্রশান্তি লাভ করেছিলেন -আল্লাহ তার ইলমের মাধ্যমে উপকৃত করুন-’।[7]
বুঝা গেলো, যারা বলছে, যে খলীফার আনুগত্য করা ওয়াজিব, তিনি কেবল মুসলিম উম্মাহ্র একক খলীফা এবং যারা বিভিন্ন দেশের শাসক, তাদের বায়‘আত ও আনুগত্য করা ওয়াজিব নয়, তাদের এই বক্তব্য দলীল বিরোধী, ইজমা বিরোধী, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মূলনীতি বিরোধী এবং বাস্তবতা বিরোধী। তাদের এই বক্তব্য শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে বিপস্নব এবং তাদের বায়‘আত ছিন্নের দিকে ঠেলে দেয়। আর এটাই হচ্ছে খারেজীদের বক্তব্য।[8]
(চলবে)
[1]. মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়াহ, ২০/৩৫।
[2]. সুবুলুস সালাম, (দারুল হাদীছ, তা. বি.), ২/৩৭৪।
[3]. আস-সায়লুল জাররার, (দারু ইবনি হাযম, প্রথম প্রকাশ, তা. বি.), পৃঃ ৯৪১।
[4]. আদ-দুরার আস-সানিইয়্যাহ ফিল আজবিবাতিন নাজদিইয়্যাহ, (তাহক্বীক্ব: আব্দুর রহমান ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ক্বাসেম, ৬ষ্ঠ প্রকাশ: ১৪১৭ হি./১৯৯৬ খৃ.), ৫/৯।
[5]. আশ-শারহুল মুমতে‘, (দারু ইবনিল জাওযী, ১ম প্রকাশ: ১৪২২-১৪২৮ হি.), ৮/৯।
[6]. বক্তব্যটি নিমেণাক্ত লিঙ্ক থেকে সংগৃহীত:
https://books.google.com.bd/books?id=CmsuDwAAQBAJ&pg=PA609&lpg=PA609&dq#v=onepage&q&f=false
[7]. আলী আল-হালাবী, মাসায়েল ইলমিইয়্যাহ ফিস সিয়াসাতি ওয়াদ দা‘ওয়াতিশ শার‘ইয়্যাহ, (মাকতাবাতু ইবনিল ক্বাইয়িম, কুয়েত, দ্বিতীয় প্রকাশ: ১৪২২ হি./২০০১ খৃ.), পৃ: ৭৪, টীকা নং- ২।
[8]. দ্রষ্টব্য: আব্দুস সালাম সুহাইমী, আল-জিহাদু ফিল ইসলাম: মাফহূমূ ওয়া যওয়াবিত্বুহূ ওয়া আনওয়া‘উহূ ওয়া আহদাফুহূ, (মাকতাবাতু দারিন নাছীহাহ, সঊদী আরব ও দারুল মাদীনাহ আন-নাবাবিইয়্যাহ, মিশর, প্রথম প্রকাশ: ১৪২৯ হি./২০০৮ খৃ.), পৃঃ ৮৬।
