কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

সমাজে প্রচলিত বিদ‘আতসমূহ (পর্ব-৪)

অপব্যাখ্যা-৩ : জামা‘আতবদ্ধ তারাবীহর ছালাত রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ছিল না। সুতরাং বর্তমানে রামাযান মাসে জামা‘আতবদ্ধভাবে তারাবীহর ছালাত আদায় করা বিদ‘আত।

জবাব

বিদ‘আতী ও একশ্রেণীর অসাধু ধর্মব্যবসায়ীরা বিদ‘আতে হাসানাকে জায়েয করার জন্য এরূপ জ্ঞানহীন কথা বলে থাকে। তাদের দাবী স্বয়ং ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব রাযিয়াল্লাহু আনহু রামাযানে তারাবীহর ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায়ের দৃশ্য দেখে এ কথা বলেন যে, نِعْمَ الْبِدْعَةُ هَذِهِ ‘কী সুন্দর নতুন সৃষ্টি’।[1] সুতরাং যেখানে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেই এটাকে বিদ‘আত হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তাই এটা বিদ‘আতে সাইয়িয়্যা বা মন্দ বিদ‘আত নয়, বরং বিদ‘আতে হাসানাহ বা উত্তম বিদ‘আত। অথচ তাদের এই ধারণাটি কয়েকটি কারণে ত্রুটিপূর্ণ। এ ব্যাপারে নিমেণাক্ত বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল করুন।

প্রশ্ন-১ : ছালাতুত তারাবীহ নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ছিল কি?

উত্তর : হ্যাঁ, অবশ্যই ছিল। এ বিষয়টি মুতাওয়াতির পর্যায়ের বর্ণনা।[2] রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনদিন মসজিদে তারাবীহর ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করেছিলেন। নিমেণাক্ত হাদীছটি তার প্রমাণ,

عَنِ ابْنِ شِهَابٍ أَخْبَرَنِيْ عُرْوَةُ أَنَّ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا أَخْبَرَتْهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم خَرَجَ لَيْلَةً مِنْ جَوْفِ اللَّيْلِ فَصَلَّى فِي الْمَسْجِدِ وَصَلَّى رِجَالٌ بِصَلَاتِهِ فَأَصْبَحَ النَّاسُ فَتَحَدَّثُوْا فَاجْتَمَعَ أَكْثَرُ مِنْهُمْ فَصَلَّى فَصَلَّوْا مَعَهُ فَأَصْبَحَ النَّاسُ فَتَحَدَّثُوْا فَكَثُرَ أَهْلُ الْمَسْجِدِ مِنْ اللَّيْلَةِ الثَّالِثَةِ فَخَرَجَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَصَلَّى فَصَلَّوْا بِصَلَاتِهِ فَلَمَّا كَانَتْ اللَّيْلَةُ الرَّابِعَةُ عَجَزَ الْمَسْجِدُ عَنْ أَهْلِهِ حَتَّى خَرَجَ لِصَلَاةِ الصُّبْحِ فَلَمَّا قَضَى الْفَجْرَ أَقْبَلَ عَلَى النَّاسِ فَتَشَهَّدَ ثُمَّ قَالَ أَمَّا بَعْدُ فَإِنَّهُ لَمْ يَخْفَ عَلَيَّ مَكَانُكُمْ وَلَكِنِّيْ خَشِيْتُ أَنْ تُفْتَرَضَ عَلَيْكُمْ فَتَعْجِزُوْا عَنْهَا فَتُوُفِّيَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَالْأَمْرُ عَلَى ذَلِكَ.

ইবনু শিহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, উরওয়া রাহিমাহুল্লাহ আমাকে বলেছেন, আয়েশা‘ রাযিয়াল্লাহু আনহা তাকে জানিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা অর্ধ রাত্রে বের হলেন। অতঃপর মসজিদে ছালাত আদায় করলেন। তাঁর ছালাতের সাথে কতিপয় ব্যক্তিও ছালাত আদায় করল। অতঃপর লোকেরা এ নিয়ে সকালে আলোচনা করতে লাগল। ফলে আগের লোকদের চেয়ে অধিক লোক একত্রিত হল। অতঃপর তিনি ছালাত পড়লেন, লোকেরাও তাঁর সাথে ছালাত আদায় করল। তারপর জনগণ সকাল করল ও আলোচনা করতে থাকল। ফলে তৃতীয় রাত্রে মসজিদে লোক সংখ্যা বেশী হল। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারপর বের হলেন এবং ছালাত আদায় করলেন। লোকেরাও তাঁর সাথে ছালাত আদায় করল। চতুর্থ রাতে মসজিদে লোক ধরল না। অবশেষে তিনি ফজরের ছালাতের জন্য বেরিয়ে আসলেন। তিনি যখন ফজর ছালাত শেষ করলেন, তখন মুছল্লীদের দিকে ফিরে তাশাহ্হুদের ন্যায় বসলেন। অতঃপর হাম্দ ছানার পর বললেন, তোমাদের স্থানের ব্যাপারে আমার ভয় হয়নি; বরং আমি ভয় করেছি এটা তোমাদের উপর ফরয হয়ে যায় কি-না। ফলে তোমরা তা আদায় করতে অক্ষমতা দেখাবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুবরণ করা পর্যন্ত বিষয়টি ঐভাবেই ছিল।[3]

সুধী পাঠক! উক্ত হাদীছে স্পষ্ট হল যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনদিন জামা‘আতের সাথে তারাবীহর ছালাত আদায় করেছেন। তবে মানুষের আগ্রহ ও উদ্দীপনা দেখে তিনি আশঙ্কা করলেন যে, মানুষেরা ধারণা করবে যে, এই ছালাত ফরয। তাই তিনি তাদেরকে এই ছালাত তাদের বাড়ীতে আদায়ের ব্যাপারে পরামর্শ দিলেন। এই ছালাতটি নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ছিল এবং স্বয়ং তিনি নিজেই তা আদায় করেছেন। সুতরাং এটা বিদ‘আত হওয়ার প্রশ্নই আসে না।

প্রশ্ন-২ : ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কেন মানুষদেরকে এক ইমাম ও এক ক্বারীর পিছনে একত্রিত করলেন?

উত্তর : যখন নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশঙ্কা করলেন যে, মানুষেরা ধারণা করবে যে, ছালাতুত তারাবী ফরয। তাই তিনি তাদেরকে মসজিদে আসতে নিষেধ করেছিলেন এবং তাদের বাড়ীতে ছালাত আদায়ের পরামর্শ দিয়েছিলেন। এটা হল ধারণা বা আশঙ্কা। অতঃপর যখন বিষয়টি স্থির হল এবং মানুষেরা নিশ্চিত হল যে, এই ছালাত ফরয নয়, বরং সুন্নাত এবং ফরয হওয়ার ভয়ও নেই; তখন ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দেখলেন, মানুষেরা খণ্ড খণ্ড জামা‘আতে এবং প্রত্যেক জামা‘আতে একজন ইমামের পিছনে ছালাত আদায় করছে। যার ফলে ক্বারীদের তেলাওয়াতের মাঝে গণ্ডগোল শুরু হয়ে যায়। এমতাবস্থায় ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকে একজন ক্বারীর অধীনে একত্রিত করলেন। ফলে পরস্পরের মাঝে আর কোন গণ্ডগোল থাকল না।[4] নিম্নের হাদীছে এই বিষয়টিই প্রস্ফুটিত হয়েছে।

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ كَانَ النَّاسُ يُصَلُّوْنَ فِىْ مَسْجِدِ رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فِىْ رَمَضَانَ بِاللَّيْلِ أَوْزَاعًا يَكُوْنُ مَعَ الرَّجُلِ شَيْءٌ مِنْ الْقُرْآنِ فَيَكُوْنُ مَعَهُ النَّفَرُ الْخَمْسَةُ أَوْ السِّتَّةُ أَوْ أَقَلُّ مِنْ ذَلِكَ أَوْ أَكْثَرُ فَيُصَلُّوْنَ بِصَلَاتِهِ قَالَتْ فَأَمَرَنِىْ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم لَيْلَةً مِنْ ذَلِكَ أَنْ أَنْصِبَ لَهُ حَصِيْرًا عَلَى بَابِ حُجْرَتِىْ فَفَعَلْتُ فَخَرَجَ إِلَيْهِ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم بَعْدَ أَنْ صَلَّى الْعِشَاءَ الْآخِرَةَ قَالَتْ فَاجْتَمَعَ إِلَيْهِ مَنْ فِي الْمَسْجِدِ فَصَلَّى بِهِمْ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم لَيْلًا طَوِيْلًا..

আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মসজিদে রামাযানের রাত্রিতে জনগণ বিক্ষিপ্তভাবে ছালাত পড়ছিল। সামান্য কুরআন পড়া জানে এমন ব্যক্তির সাথে পাঁচজন, ছয়জন কিংবা তার চেয়ে কম বা বেশী সংখ্যক লোকেরা জামা‘আতে ছালাত পড়ছিল। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক রাত্রে আমার ঘরের দরজায় একটি চাটাই বিছিয়ে দিতে আমাকে নির্দেশ দিলেন। আমি তাই করলাম। অতঃপর তিনি বের হলেন এশার ছালাতের শেষ সময়ের পর। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, অতঃপর মসজিদে যারা ছিল তারা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে জমা হল এবং তিনি তাদের সাথে দীর্ঘ রাত্রি পর্যন্ত ছালাত আদায় করলেন...।[5]

এই হাদীছে জানা গেল যে, তারাবীহ ছালাতের খণ্ডাকৃতির জামা‘আত পূর্ব থেকেই চালু ছিল। অতঃপর সেই ছালাতই রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুছল্লীদেরকে নিয়ে তিনদিন পড়েন। তারপর ফরয হওয়ার আশঙ্কায় তিনি জামা‘আতে পড়া ছেড়ে দেন। কিন্তু ছাহাবীদের পূর্বের আমল অব্যাহত ছিল।[6] এমনকি ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর যুগ পর্যন্ত চালু ছিল। যেমন-

عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَبْدِ الْقَارِيِّ أَنَّهُ قَالَ خَرَجْتُ مَعَ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رضي الله عنه لَيْلَةً فِي رَمَضَانَ إِلَى الْمَسْجِدِ فَإِذَا النَّاسُ أَوْزَاعٌ مُتَفَرِّقُوْنَ يُصَلِّي الرَّجُلُ لِنَفْسِهِ وَيُصَلِّي الرَّجُلُ فَيُصَلِّىْ بِصَلَاتِهِ الرَّهْطُ فَقَالَ عُمَرُ إِنِّيْ أَرَى لَوْ جَمَعْتُ هَؤُلَاءِ عَلَى قَارِئٍ وَاحِدٍ لَكَانَ أَمْثَلَ ثُمَّ عَزَمَ فَجَمَعَهُمْ عَلَى أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ....

আব্দুর রহমান ইবনু আব্দুল ক্বারী বলেন, রামাযানের কোন এক রাত্রে আমি ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে মসজিদের দিকে বের হলাম। তখন লোকেরা পৃথক পৃথক হয়ে বিচ্ছিন্ন ছিল। কেউ একাকী ছালাত পড়ছিল, আবার কেউ ছালাত পড়ছিল আর তার ছালাতের সাথে একদল লোক ছালাত আদায় করছিল। ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি যদি তাদেরকে একজন ক্বারীর পিছনে একত্রিত করি তাহলে তা ভাল হবে। অতঃপর ইচ্ছা করলেন এবং উবাই ইবনু কা‘বের সাথে লোকদেরকে একত্রিত করলেন .....।[7]

সুধী পাঠক! উক্ত আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে যে, তারাবীহর ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করা ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক চালু করা নতুন কোন বিষয় নয়। বরং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ছাহাবীগণ খণ্ড খণ্ড জামা‘আতে আদায় করতেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনদিন জামা‘আতের সাথে আদায় করেন। কিন্তু ফরয হওয়ার আশঙ্কায় তিনি এটা ছেড়ে দিয়েছিলেন। জানা আবশ্যক যে, ফরয হওয়ার বিষয়টি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্যই ছিল, উম্মতের জন্য নয়। অতএব উম্মতের জন্য তারাবীহ্র ছালাত জামা‘আতের সাথে পড়ার বিধান স্বাভাবিক। বিদ‘আতে হাসানাহর কোন রকম দলীলই এখানে নেই।

প্রশ্ন-৩ : ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কেন একজন ক্বারীর পিছনে মানুষদেরকে একত্রিত করলেন, অথচ তাঁর পূর্বে তো কেউ এটা করেননি? এমনকি প্রথম খলীফা আবুবকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমনটি করেননি কেন?

উত্তর : এ ব্যাপারে নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আমল রয়েছে, যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। আর ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পর বাকী থাকল আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সময়ের কথা। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর পর মাত্র দু’বছর কয়েক মাস খেলাফতকালে এ ব্যাপারে কোন অবকাশ পাননি। কেননা তাঁর খেলাফত ছিল ইসলামের প্রথম খেলাফত। জানা কথা যে, তাঁর সময়ে তিনি রিদ্দার যুদ্ধ, রোম ও পারস্যদের সাথে যুদ্ধ, মুরতাদ তথা ধর্মত্যাগী সাথে যুদ্ধের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আর তিনিই প্রথম তাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে জয়লাভ করেন। এমনকি শাম ও ইরাক পর্যন্ত ইসলামের বিজয় সাধন করেন। আর নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর পর মাত্র দু’বার তিনি রামাযান মাস পেয়েছিলেন।[8] তাছাড়া তখন যাকাতের মত ফরয ইবাদতকে অস্বীকার করা হচ্ছিল। সুতরাং তিনি ফরয ইবাদত পুনরুদ্ধার ও তা সংরক্ষণ কাজে ব্যস্ত ছিলেন। অতএব রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই জামা‘আতে তারাবীহর ছালাত আদায়ের সূচনাকারী। আর ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কেবল সেটাই পুনরায় চালু করেছিলেন। আবুবকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সংক্ষিপ্ত খেলাফতকালে এবং ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রথমার্ধে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অস্থিরতা ও সমস্যার কারণে উক্ত জামা‘আত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অতঃপর পরিস্থিতি শান্ত হলে পূর্ণাঙ্গ জামা‘আত চালু হয়।[9]

প্রশ্ন-৪ : ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু نِعْمَالْبِدْعَةُهَذِهِ ‘কী সুন্দর নতুন সৃষ্টি’ কেন বললেন?

উত্তর : নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মারা যাওয়ার পর খলীফা আবু বকর ছিদ্দীক্ব রাযিয়াল্লাহু আনহু রিদ্দার যুদ্ধ, ধর্মত্যাগী ও ভণ্ড নবীদের সাথে যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন। অতঃপর যখন ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা হলেন, তখন তিনি দেখলেন, রামাযান মাসে মসজিদে মানুষেরা বিক্ষিপ্তভাবে ভিন্ন ভিন্ন জামা‘আত করে ছালাত আদায় করছে। তাই তিনি এক জামা‘আতে পরিণত করে ছালাতের শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্যবর্ধন করেছিলেন। সুতরাং তিনি নতুন করে জামা‘আত চালু করেননি। নিম্নের হাদীছ থেকে সেটাই প্রমাণিত হয়-

عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَبْدِ الْقَارِيِّ أَنَّهُ قَالَ خَرَجْتُ مَعَ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رضي الله عنه لَيْلَةً فِيْ رَمَضَانَ إِلَى الْمَسْجِدِ فَإِذَا النَّاسُ أَوْزَاعٌ مُتَفَرِّقُوْنَ يُصَلِّي الرَّجُلُ لِنَفْسِهِ وَيُصَلِّي الرَّجُلُ فَيُصَلِّي بِصَلَاتِهِ الرَّهْطُ فَقَالَ عُمَرُ إِنِّيْ أَرَى لَوْ جَمَعْتُ هَؤُلَاءِ عَلَى قَارِئٍ وَاحِدٍ لَكَانَ أَمْثَلَ ثُمَّ عَزَمَ فَجَمَعَهُمْ عَلَى أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ ثُمَّ خَرَجْتُ مَعَهُ لَيْلَةً أُخْرَى وَالنَّاسُ يُصَلُّوْنَ بِصَلَاةِ قَارِئِهِمْ قَالَ عُمَرُ نِعْمَ الْبِدْعَةُ هَذِهِ وَالَّتِي يَنَامُوْنَ عَنْهَا أَفْضَلُ مِنْ الَّتِي يَقُوْمُوْنَ يُرِيْدُ آخِرَ اللَّيْلِ وَكَانَ النَّاسُ يَقُوْمُوْنَ أَوَّلَهُ.

আব্দুর রহমান ইবনু আব্দুল ক্বারী বলেন, রামাযানের কোন এক রাত্রে আমি ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে মসজিদের দিকে বের হলাম। তখন লোকেরা পৃথক পৃথক হয়ে বিচ্ছিন্ন ছিল। কেউ একাকী ছালাত পড়ছিল, আবার কেউ ছালাত পড়ছিল আর তার ছালাতের সাথে একদল লোক ছালাত আদায় করছিল। ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি যদি তাদেরকে একজন ক্বারীর পিছনে একত্রিত করি তাহলে তা ভাল হবে। অতঃপর ইচ্ছা করলেন এবং উবাই ইবনু কা‘বের সাথে লোকদেরকে একত্রিত করলেন। তারপর অন্য এক রাত্রে তাঁর সাথে আমি বের হলাম। তখন লোকেরা একজনের পিছনে ছালাত আদায় করছিল। তখন (এই দৃশ্য দেখে) ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, কী সুন্দর নতুন সৃষ্টি! তবে তারা যা পড়ছে তার চেয়ে উত্তম সেটাই যার জন্য তারা ঘুমাত অর্থাৎ শেষ রাত্রের ছালাত। তবে লোকেরা প্রথমাংশেই পড়ত।[10]

উক্ত হাদীছে স্পটষ্ট হয়েছে যে, ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজে নতুন করে চালু করেননি। বরং পূর্ব থেকে বিক্ষিপ্তাকারে চালু থাকা জামা‘আতকে তিনি এক ইমামের পিছনে একত্রিত করেন। লোকদের এক ইমামের পিছনে জামা‘আতের ছালাত পড়ার দৃশ্য দেখেই তিনি বলেছিলেন, نِعْمَ الْبِدْعَةُ هَذِهِ ‘কী সুন্দর নতুন সৃষ্টি’। উক্ত বাক্যে الْبِدْعَةُ শব্দটি শাব্দিক অর্থ তথা ‘নতুন সৃষ্টি’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, দ্বীন বা শারঈ অর্থে ছিল না। আর শারঈ অর্থে না হলে সেটা বিদ‘আত নয়। এমনটিই সালাফী বিদ্যানগণ বলেছেন।[11] এছাড়া ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর উদ্দেশ্যেও ছিল শাব্দিক অর্থের প্রতি, শারঈ অর্থের প্রতি নয়।[12]

প্রশ্ন-৫ : বিদ‘আতীরা ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ব্যাপারে বলে যে, তিনি তারাবীহর ছালাত জামা‘আত করে পড়ার বিধান চালু করে গেছেন, যা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ছিল না। সুতরাং তিনি বিদ‘আত করেছেন।

উত্তর : বিদ‘আতীদের উক্ত ধারণা বাড়াবাড়ি ও ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর উপর অপবাদ দেয়ার শামিল। যদি ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিদ‘আত চালু করতেন, তাহলে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর ব্যাপারে এমন আকাঙ্ক্ষা কেন করলেন যে, আমার জন্য আপনার চেয়ে বেশি প্রিয় এমন কোন ব্যক্তি আপনি রেখে যাননি, যার সময়ের অনুসরণ করে আল্লাহ্র আল্লাহ্র নৈকট্য লাভ করব? নিম্নের হাদীছটি মনোযোগ দিয়ে পাঠ করুন!

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا يَقُوْلُ وُضِعَ عُمَرُ عَلَى سَرِيْرِهِ فَتَكَنَّفَهُ النَّاسُ يَدْعُوْنَ وَيُصَلُّوْنَ قَبْلَ أَنْ يُرْفَعَ وَأَنَا فِيْهِمْ فَلَمْ يَرُعْنِىْ إِلَّا رَجُلٌ آخِذٌ مَنْكِبِىْ فَإِذَا عَلِىٌّ فَتَرَحَّمَ عَلَى عُمَرَ وَقَالَ مَا خَلَّفْتَ أَحَدًا أَحَبَّ إِلَىَّ أَنْ أَلْقَى اللهَ بِمِثْلِ عَمَلِهِ مِنْكَ وَايْمُ اللهِ إِنْ كُنْتُ لَأَظُنُّ أَنْ يَجْعَلَكَ اللهُ مَعَ صَاحِبَيْكَ وَحَسِبْتُ أَنِّىْ كُنْتُ كَثِيْرًا أَسْمَعُ النَّبِىَّ ﷺ يَقُوْلُ ذَهَبْتُ أَنَا وَأَبُوْ بَكْرٍ وَعُمَرُ وَدَخَلْتُ أَنَا وَأَبُوْ بَكْرٍ وَعُمَرُ وَخَرَجْتُ أَنَا وَأَبُوْ بَكْرٍ وَعُمَرُ .

ইবনু আববাস রযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, (মৃত্যুর পর) ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর লাশ খাটের উপর রাখা হল। খাটটি কাঁধে তুলে নেয়ার পূর্ব পর্যন্ত লোকজন তা ঘিরে দু‘আ পাঠ করছিল। আমিও তাদের মধ্যে একজন ছিলাম। হঠাৎ একজন আমার কাঁধে হাত রাখায় আমি চমকে উঠলাম। চেয়ে দেখলাম, তিনি আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনি ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জন্য আল্লাহ্র নিকট অশেষ রহমতের দু‘আ করছিলেন। তিনি বলছিলেন, হে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু! আমার জন্য আপনার চেয়ে বেশি প্রিয় এমন কোন ব্যক্তি আপনি রেখে যাননি, যার কালের অনুসরণ করে আল্লাহ্র নৈকট্য লাভ করব। আল্লাহ্র কসম! আমার এ বিশ্বাস যে, আল্লাহ আপনাকে আপনার সাথীদ্বয়ের সঙ্গে রাখবেন। আমার মনে আছে, আমি অনেকবার নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, আমি, আবুবকর ও ওমর গেলাম, আমি, আবুবকর ও ওমর প্রবেশ করলাম এবং আমি, আবুবকর ও ওমর বের হলাম ইত্যাদি।[13]

সুধী পাঠক! যদি এই বিষয়টি বিদ‘আতই হত, তাহলে এ ব্যাপারে ছাহাবীরা কেন নীরব ছিলেন? কেন এ বিষয়ের উপর সবাই ঐকমত্য হয়েছিলেন, বিরোধিতা করেননি? তাহলে কি প্রখ্যাত ছাহাবী উবাই ইবনু কা‘ব রাযিয়াল্লাহু আনহু বিদ‘আতী ইমাম ছিলেন? (নাঊযুবিল্লাহ) অথচ হাদীছে এসেছে যে, আনাস ইবনু মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাই ইবনু কা‘ব রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন, আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে لَمْ يَكُنِ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا পড়ে শুনানোর জন্য আমাকে আদেশ করেছেন। তখন উবাই ইবনু কা‘ব জিজ্ঞেস রাযিয়াল্লাহু আনহু করলেন, আল্লাহ তা‘আলা কি আমার নাম করেছেন? নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। তখন তিনি কেঁদে ফেললেন’।[14] এরকম একজন জলীলুল কদর ছাহাবী উবাই ইবনু কা‘ব রাযিয়াল্লাহু আনহু কিভাবে সজ্ঞানে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক চালুকৃত তথাকথিত বিদ‘আতী ছালাতের ইমামতি করলেন?

উল্লেখ্য, যদি বিদ‘আতীরা বলে যে, ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতি শ্রদ্ধা, ভদ্রতা ও ভয়ের কারণে ছাহাবীরা তাঁর বিদ‘আতী ছালাতের ব্যাপারে ঐকমত্য হয়েছিলেন, তাহলে এর উত্তরে বলব, ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মৃত্যুর পরেও কেন জামা‘আতের সাথে তারাবীহর ছালাত চালু ছিল? তাহলে কি তাঁর মৃত্যুর পরেও ছাহাবীরা তাঁকে ভয় পেতেন? এমনকি তাঁর পরবর্তী দুই খলীফা ওছমান ও আলী রযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর সময়েও জামা‘আতে তারাবাহীর ছালাত আদায়ের বিধান অবশিষ্ট ছিল। তাহলে কি আমরা বলব যে, তাঁরাও তাঁদের খেলাফাতের সময়ে ওমর রযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর বিদ‘আত অব্যহত রেখেছিলেন? কখনোও নয়। ওছমান ও আলী রযিয়াল্লাহু আনহুমা ও অন্যান্য ছাহাবীরা বিদ‘আতের ব্যাপারে কখনোও একমত ছিলেন না। তাছাড়া আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ছাহাবীগণ, তাবেঈগণ ও তাবে‘ তাবেঈগণের যুগ ছিল সর্বোত্তম যুগ।[15] এই সময়ে বিদ‘আতীদের কোন আস্ফালন ছিল না।[16] সুতরাং খলীফা ওমর রযিয়াল্লাহু আনহুমা বিদ‘আতী ছালাত চালু করেছিলেন এবং ওছমান ও আলী রযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর যুগেও তা অব্যাহত ছিল মর্মে তাদের ধারণা ভিত্তিহীন।

আরো উল্লেখ্য যে, তারাবীহ্র ছালাত জামা‘আতে পড়া যদি বিদ‘আতই হত, তাহলে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে কেন উৎসাহ দিয়েছেন? নিম্নের হাদীছটি পাঠ করুন!

عَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ صُمْنَا مَعَ رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَلَمْ يُصَلِّ بِنَا حَتَّى بَقِيَ سَبْعٌ مِنَ الشَّهْرِ فَقَامَ بِنَا حَتَّى ذَهَبَ ثُلُثُ اللَّيْلِ ثُمَّ لَمْ يَقُمْ بِنَا فِي السَّادِسَةِ وَقَامَ بِنَا فِي الْخَامِسَةِ حَتَّى ذَهَبَ شَطْرُ اللَّيْلِ فَقُلْنَا لَهُ يَا رَسُولَ اللهِ لَوْ نَفَّلْتَنَا بَقِيَّةَ لَيْلَتِنَا هَذِهِ فَقَالَ إِنَّهُ مَنْ قَامَ مَعَ الْإِمَامِ حَتَّى يَنْصَرِفَ كُتِبَ لَهُ قِيَامُ لَيْلَةٍ ثُمَّ لَمْ يُصَلِّ بِنَا حَتَّى بَقِيَ ثَلَاثٌ مِنْ الشَّهْرِ وَصَلَّى بِنَا فِي الثَّالِثَةِ وَدَعَا أَهْلَهُ وَنِسَاءَهُ فَقَامَ بِنَا حَتَّى تَخَوَّفْنَا الْفَلَاحَ قُلْتُ لَهُ وَمَا الْفَلَاحُ قَالَ السُّحُوْرُ.

আবুযার রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিয়াম পালন করলাম কিন্তু তিনি আমাদের সাথে ছালাত (তারাবীহ) পড়লেন না। অবশেষে যখন মাসের সাত দিন অবশিষ্ট থাকল, তখন তিনি আমাদের সাথে ছালাত পড়লেন- এমনকি রাতের তৃতীয়াংশ পর্যন্ত। তারপর ষষ্ঠ রাত্রে তিনি আমাদের সাথে ছালাত পড়লেন না। অতঃপর পঞ্চম রাতে আমাদের সাথে ছালাত পড়লেন- এমনকি অর্ধ রাত পর্যন্ত। তারপর আমরা বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! বাকী রাতগুলো যদি আমাদের জন্য নফল করে দিতেন! (কতই না ভাল হত)। তখন তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি ইমাম ছালাত শেষ করা পর্যন্ত তার সাথে ছালাত আদায় করবে তার জন্য পুরো রাত্রি ছালাত আদায় করার ছওয়াব লিখে দেয়া হবে’। অতঃপর তিনি মাসের তিন রাত অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত আমাদের সাথে ছালাত পড়লেন না। তারপর তিনি তৃতীয় রাত্রে তাঁর পরিবার ও স্ত্রীদেরসহ আমাদের সাথে ছালাত পড়লেন। এমনকি আমরা ফালাহ ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা করছিলাম। রাবী বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, ফালাহ কী? তিনি বললেন, সাহারী।[17]

ইমাম আবু দাঊদ রাহিমাহুল্লাহ (২০২-২৭৫ হি./৮১৭-৮৮৯ খ্রি.) ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের রাহিমাহুল্লাহ (১৬৪-২৪১ হি./৭৮০-৮৫৫ খ্রি.) বক্তব্য উল্লেখ করে বলেন,

سَمِعْتُ أَحْمَدَ قِيْلَ لَهُ يُعْجِبُكَ أَنْ يُّصَلِّيَ الرَّجُلُ مَعَ النَّاسِ فِيْ رَمَضَانَ أَوْ وَحْدَهُ ؟ قَالَ يُصَلِّي مَعَ النَّاسِ وَسَمِعْتُهُ أَيْضًا يَقُوْلُ يُعْجِبُنِيْ أَنْ يُّصَلِّيَ مَعَ الْإِمَامِ وَيُوْتِرُ مَعَهُ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِنَّ الرَّجُلَ إِذَا قَامَ مَعَ الْإِمَامِ حَتَّى يَنْصَرِفَ كَتَبَ اللهُ لَهُ بَقِيَّةَ لَيْلَتِهِ. 

‘আমি ইমাম আহমাদকে বলতে শুনেছি, তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রামাযান মাসে যে একাকী ছালাত পড়ে সে আপনাকে আকৃষ্ট করে, না যে লোকদের সাথে জামা‘আতের সাথে ছালাত পড়ে সে? তিনি বলেন, যে লোকদের সাথে ছালাত আদায় করে সে। ইমাম আবুদাঊদ আরো বলেন, আমি তাঁকে এটাও বলতে শুনেছি যে, আমাকে ঐ ব্যক্তি আকৃষ্ট করে যে ইমামের সাথে ছালাত আদায় করে এবং বিতর পড়ে। যেমন নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যখন কোন ব্যক্তি ইমাম ছালাত শেষ করা পর্যন্ত তার সাথে ছালাত আদায় করে তখন আল্লাহ তার জন্য পুরো রাত্রি ছালাত আদায় করার ছওয়াব নির্ধারণ করে দেন’।[18] শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ (১৩৩২-১৪২০ হি./১৯১৪-১৯৯৯ খ্রি.) উক্ত হাদীছ উল্লেখ করে বলেন,

فَإِنَّهُ ظَاهِرُ الدَّلَالَةِ عَلَى فَضِيْلَةِ صَلَاةِ قِيَامِ رَمَضَانَ مَعَ الْإِمَامِ.

‘রামাযান মাসে ইমামের সাথে রাতের ছালাত আদায়ের ফযীলতের ব্যাপারে এই হাদীছ স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে’।[19] তাছাড়া ইবনু হাজার আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহ (৭৭৩-৮৫২ হি./১৩৭২-১৪৪৯ খ্রি.) বলেন,

هَذَا تَصْرِيْحٌ مِنْهُ بِأَنَّ الصَّلَاةَ فِيْ آَخِرِ اللَّيْلِ أَفْضَلُ مِنْ أَوَّلِهِ لَكِنَّ لَيْسَ فِيْهِ أَنَّ الصَّلَاةَ فِيْ قِيَامِ اللَّيْلِ فُرَادَى أَفْضَلُ مِنَ التَّجْمِيْعِ.

‘এটা স্পষ্ট যে, এই ছালাত প্রথম রাত্রিতে আদায়ের চেয়ে শেষ রাত্রিতে আদায় করা বেশি ফযীলতপূর্ণ। কিন্তু এটা ঠিক নয় যে, এই ছালাত জামা‘আতে আদায়ের চেয়ে একাকী ছালাত আদায় করা বেশী ফযীলতপূর্ণ’।[20]

সুধী পাঠক! উক্ত হাদীছে জামা‘আতের সাথে তারাবীহ পড়ার স্থায়িত্ব এবং এর জন্য রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক উৎসাহ প্রদানও প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি এ ব্যাপারে বিশেষ ফযীলতও বর্ণিত হয়েছে।

পরিশেষ বলা যায় যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মৃত্যুর পর ফরয হওয়ার আশঙ্কা দূর হয়ে গেছে। সুতরাং তারাবীহ্র ছালাত উম্মতের জন্য জামা‘আতের সাথে পড়ার ব্যাপারে কোন বাধা নেই। কারণ খণ্ড খণ্ড জামা‘আত পূর্ব থেকেই অব্যাহত ধারায় চালু ছিল। শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ (১৩৩২-১৪২০ হি./১৯১৪-১৯৯৯ খ্রি.) বলেন,

قٌلْتُ وَهَذِهِ الْأَحَادِيْثُ ظَاهِرَةُ الدَّلَالَةِ عَلَى مَشْرُوْعِيَّةِ صَلَاةِ التَّرَاوِيْحِ جَمَاعَةً لِاِسْتِمْرَارِهِ صلى الله عليه وسلم فِيْ تِلْكَ اللَّيَالِيْ وَلَا يُنَافِيْهِ تَرْكُهُ صلى الله عليه وسلم لَهَا فِي اللَّيْلَةِ الرَّابِعَةِ فِيْ هَذَا الْحَدِيْثِ لِأَنَّهُ صلى الله عليه وسلم علله بِقَوْلِهِ خَشِيْتُ أَنْ تُفْرَضَ عَلَيْكُمْ وَلَا شَكَّ أَنَّ هَذِهِ الْخَشْيَّةَ قَدْ زَالَتْ بِوَفَاتِهِ صلى الله عليه وسلم بَعْدَ أَنْ أَكْمَلَ اللهُ الشَّرِيْعَةَ وَبِذَلِكَ يَزُوْلُ الْمَعْلُوْلُ وَهُوَ تَرْكُ الْجَمَاعَةِ وَيَعُوْدُ الْحُكْمُ السَّابِقُ وَهُوَ مَشْرُوْعِيَّةُ الْجَمَاعَةِ وَلِهَذَا أَحْيَاهَا عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رضي الله عنه كَمَا سَبَقَ وَيَأْتِيْ وَعَلَيْهُ جَمْهُوْرُ الْعُلَمَاءِ.

‘আমি বলছি, জামা‘আতের সাথে তারাবীহ্র ছালাত পড়া শারঈ বিধান হওয়ার ব্যাপারে এ সমস্ত হাদীছ স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। কারণ উক্ত রাত্রিগুলোতে ছালাত আদায়ে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ধারাবাহিকতা রয়েছে। ৪র্থ রাত্রে তারাবীহ না পড়ার কারণে তা নিষিদ্ধ হওয়া বুঝায় না। কারণ এর উদ্দেশ্য ছিল রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বক্তব্য ‘আমি আশঙ্কা করছি তোমাদের উপর ফরয হয়ে যায় কি-না’। নিঃসন্দেহে তাঁর মৃত্যুর পর শরী‘আত পূরণের মাধ্যমে উক্ত সন্দেহ দূর হয়ে গেছে। আর এ জন্য জামা‘আত ত্যাগ করার কারণও দূর হয়ে গেছে। তাই সেটা পূর্বের হুকুমে ফিরে যাবে অর্থাৎ শারঈ জামা‘আত। আর এজন্যই ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তা পুনরায় চালু করেছিলেন। এটাই অধিকাংশ বিদ্বানের বক্তব্য’।[21] সুতরাং জামা‘আতে তারাবীহর ছালাত আদায় করা কোনক্রমেই বিদ‘আত নয়। বরং এটা বিদ‘আতীদের বিদ‘আত প্রতিষ্ঠার একটা উপলক্ষ্য মাত্র। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিকটা বুঝার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

[চলবে]


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/২০১০ ‘তারাবীহর ছালাত’ অধ্যায়-৩১, ‘যে রামাযান মাসে তারাবীহর ছালাত আদায় করে তার ফযীলত’ অনুচ্ছেদ-১; মিশকাত হা/১৩০১;।

[2]. আলী ইবনু নায়েফ আশ-শুহূদ (একত্রিতকারী), আল-মুফাছ্ছাল ফির রাদ্দি আলা শুবহাতি ‘আদা-ইল ইসলাম, ১৩ তম খণ্ড, পৃ. ১২৫।

[3]. ছহীহ বুখারী হা/২০১২, ১/২৬৯ পৃঃ; ইফাবা হা/১৮৮২।

[4]. আলী ইবনু নায়েফ আশ-শুহূদ (একত্রিতকারী), আল-মুফাছ্ছাল ফির রাদ্দি আলা শুবহাতি ‘আদা-ইল ইসলাম, ১৩ তম খ-, পৃ. ১২৫।

[5]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৩৫০, সনদ ছহীহ; ছহীহ বুখারী, হা/২০১২।

[6]. أى على الصلاة أوزاعا -ছালাতুত তারাবীহ, পৃঃ ১২।

[7]. ছহীহ বুখারী হা/২০১০, ‘রামাযানের ছালাত’ অধ্যায়।

[8]. আল-মুফাছ্ছাল ফির রাদ্দি আলা শুবহাতি ‘আদা-ইল ইসলাম, ১৩ তম খণ্ড, পৃ. ১২৬।

[9]. ওবাইদুল্লাহ মুবারকপুরী, মির‘আতুল মাফাতীহ শারহু মিশকাতিল মাছাবীহ (বানারাস, ভারত : ইদারাতুল বুহূছিল ইলমিয়্যাহ ওয়াদ দাওয়াতি ওয়াল ইরশাদ, ৩য় সংস্করণ, ১৪০৪ হি./১৯৮৪ খ্রি.), ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩২৮।

[10]. ছহীহ বুখারী হা/২০১০; মিশকাত হা/১৩০১।

[11]. আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায, মাজমূঊ ফাতাওয়া, ৫ম খ-, পৃ. ১৭৯।

[12]. আল-মুফাছ্ছাল ফির রাদ্দি আলা শুবহাতি ‘আদা-ইল ইসলাম, ১৩ তম খ-, পৃ. ১২৬।

[13]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৬৮৫ ‘ছাহাবীগণের ফযীলত’ অধ্যায়-৬২, অনুচ্ছেদ-৬।

[14]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৮০৯ ‘আনছারগণের ফযীলত’ অধ্যায়-৬৩, ‘উবাই ইবনু কা‘ব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ফযীলত’ অনুচ্ছেদ-১৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৯৯; তিরমিযী, হা/৩৭৯২’ মিশকাত, হা/২১৯৬।

[15]. ছহীহ বুখারী, হা/২৬৫১, ৬৪২৮, ৬৬৯৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৩৫; নাসাঈ, হা/৩৮০৯; মিশকাত, হা/৬০০১; আব্দুল মুহসিন আল-আববাদ, শারহু সুনানি আবী দাঊদ, ১৯ তম খণ্ড, পৃ. ২৯৫; মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানী, দুরূসুন লিশ শায়খ মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানী, ৩৮ তম খণ্ড, পৃ. ২।

[16]. ছহীহ মুসলিম, হা/২; ঈমাদুস সাইয়েদ মুহাম্মাদ ইসমাঈল আশ-শারবীনী, কিতাবাতু ‘আদা-ইল ইসলামি ওয়া মুনা-ক্বাশাতিহা (দারুল কুতুবিল মিছরিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪২২ হি./২০০২ খ্রি.), পৃ. ১১৩।

[17]. তিরমিযী হা/৮০৬; আবু দাঊদ হা/১৩৭৫; নাসাঈ হা/১৬০৫; ইবনু মাজাহ হা/১৩২৭।

[18]. ছালাতুত তারাবীহ, পৃ. ১৫; গৃহীত : আবুদাঊদ, আল-মাসাইল, পৃ. ৬২।

[19]. মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানী, ছালাতুত তারাবীহ (রিয়ায : মাকতাবাতুল মা‘আরিফ, ১ম সংস্করণ, ১৪২১ হি.), পৃ. ১৫।

[20]. ইবনু হাজার আসক্বালানী, ফাৎহুল বারী শারহু ছহীহিল বুখারী (বৈরূত : দারুল মা‘আরিফাহ, ১৩৭৯ হি.), ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২৫৩।

[21]. ছালাতুত তারাবীহ, পৃ. ১৩।

Magazine