কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

মাতা-পিতা কি সন্তানের বোঝা? (পূর্ব প্রকাশিতের পর)

মাতা-পিতাই সন্তানের জান্নাত-জাহান্নাম :

মাতা-পিতা হচ্ছে সন্তানের জন্য জান্নাত বা জাহান্নাম। যদি সন্তান তাদের মাতা-পিতাকে ভাল রাখে, তাহলে তাদের ঠিকানা হবে জান্নাত। আর যদি তারা তাদের সাথে যুলুম, অন্যায় ও অবিচার করে, তাহলে তাদের বাসস্থান হবে জাহান্নাম।

عَنْ أَبِىْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ السُّلَمِىِّ عَنْ أَبِى الدَّرْدَاءِ أَنَّ رَجُلًا أَتَاهُ فَقَالَ إِنَّ لِى امْرَأَةً وَإِنَّ أُمِّىْ تَأْمُرُنِى بِطَلَاقِهَا قَالَ أَبُو الدَّرْدَاءِ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ الْوَالِدُ أَوْسَطُ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ فَإِنْ شِئْتَ فَأَضِعْ ذَلِكَ الْبَابَ أَوِ احْفَظْهُ.

আবুদ-দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে বললেন, আমার একজন স্ত্রী আছে। আমার মা তাকে তালাক্ব দিতে বলেন। আবুদ-দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি বলতে শুনেছি যে, ‘মাতা-পিতা হচ্ছে (সন্তানের জন্য) জান্নাতের মধ্যম দরজা। চাইলে এই দরজা তুমি নষ্ট কর অথবা ঠিক রাখ’।[1]

ন্তানের প্রতি মাতা-পিতার ভক্তি :

মাতা-পিতা চায় তার সম্মান দুনিয়াতে বেঁচে থাকুক। তাই তারা তাদের জীবনকে তাদের জন্য উৎসর্গ করে থাকেন শুধুমাত্র তাদের কল্যাণের জন্য।

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ كَانَتِ امْرَأَتَانِ مَعَهُمَا ابْنَاهُمَا جَاءَ الذِّئْبُ فَذَهَبَ بِابْنِ إِحْدَاهُمَا فَقَالَتْ لِصَاحِبَتِهَا إِنَّمَا ذَهَبَ بِابْنِكِ وَقَالَتِ الأُخْرَى إِنَّمَا ذَهَبَ بِابْنِكِ فَتَحَاكَمَتَا إِلَى دَاوُدَ عَلَيْهِ السَّلاَمُ فَقَضَى بِهِ لِلْكُبْرَى فَخَرَجَتَا عَلَى سُلَيْمَانَ بْنِ دَاوُدَ عَلَيْهِمَا السَّلَامُ فَأَخْبَرَتَاهُ فَقَالَ ائْتُوْنِى بِالسِّكِّيْنِ أَشُقُّهُ بَيْنَهُمَا فَقَالَتِ الصُّغْرَى لَا تَفْعَلْ يَرْحَمُكَ اللهُ هُوَ ابْنُهَا فَقَضَى بِهِ لِلصُّغْرَى.

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দু’জন মহিলার নিকট দু’টি সন্তান ছিল। হঠাৎ একটি বাঘ এসে দু’জনের মধ্যে কোন একজনের সন্তানকে নিয়ে চলে গেল। তখন একজন অপরজনকে বলতে লাগল বাঘ তোমার সন্তানকে নিয়ে চলে গেছে। তাই তারা দু’জনে দাঊদ আলাইহিস সালাম-এর নিকট বিচার নিয়ে গেল। তিনি বড়জনের পক্ষে ফায়ছালা দিলেন। এরপর তারা বের হয়ে দাঊদ আলাইহিস সালাম-এর ছেলে সুলায়মান আলাইহিস সালাম-এর নিকট গিয়ে ঘটনা পেশ করল। তিনি তাদেরকে বললেন, তোমরা একটি চাকু নিয়ে আস। আমি তা দিয়ে সন্তানটিকে দু’ভাগে ভাগ করে দিব। তখন ছোটজন বললেন, এটা করবেন না। আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন। এ সন্তানটি বড়জনের। তখন তিনি ছোটজনের পক্ষে ফায়ছালা দিলেন’।[2]

আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

جَاءَتْنِىْ امْرَأَةٌ وَمَعَهَا ابْنَتَانِ لَهَا فَسَأَلَتْنِىْ فَلَمْ تَجِدْ عِنْدِىْ شَيْئًا غَيْرَ تَمْرَةٍ وَاحِدَةٍ فَأَعْطَيْتُهَا إِيَّاهَا فَأَخَذَتْهَا فَقَسَمَتْهَا بَيْنَ ابْنَتَيْهَا وَلَمْ تَأْكُلْ مِنْهَا شَيْئًا ثُمَّ قَامَتْ فَخَرَجَتْ وَابْنَتَاهَا فَدَخَلَ عَلَىَّ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَحَدَّثْتُهُ حَدِيْثَهَا فَقَالَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنِ ابْتُلِىَ مِنَ الْبَنَاتِ بِشَىْءٍ فَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ كُنَّ لَهُ سِتْرًا مِنَ النَّارِ.

জনৈক মহিলা তার দু’টি মেয়ে সন্তান নিয়ে আমার নিকট আসে। আমার নিকট একটি খেজুর ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আমি সেটাই তাকে দিয়ে দিলাম। তিনি সেটা নিয়ে তার দুই সন্তানের মাঝে ভাগ করে দিলেন। তিনি নিজে তা থেকে কিছুই খেলেন না।[3]

মাতা-পিতার কথা না শোনার ফল :

প্রত্যেক সন্তানের উচিত মাতা-পিতাকে মান্য করা। তাদের কথামত চলা। তাদের সাথে কোন ধরনের বেয়াদবী না করা।

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَمْ يَتَكَلَّمْ فِى الْمَهْدِ إِلَّا ثَلاَثَةٌ عِيْسَى وَكَانَ فِىْ بَنِىْ إِسْرَائِيْلَ رَجُلٌ يُقَالُ لَهُ جُرَيْجٌ كَانَ يُصَلِّى فَجَاءَتْهُ أُمُّهُ فَدَعَتْهُ فَقَالَ أُجِيْبُهَا أَوْ أُصَلِّى فَقَالَتِ اللَّهُمَّ لَا تُمِتْهُ حَتَّى تُرِيَهُ وُجُوْهَ الْمُوْمِسَاتِ وَكَانَ جُرَيْجٌ فِىْ صَوْمَعَتِهِ فَتَعَرَّضَتْ لَهُ امْرَأَةٌ وَكَلَّمَتْهُ فَأَبَى فَأَتَتْ رَاعِيًا فَأَمْكَنَتْهُ مِنْ نَفْسِهَا فَوَلَدَتْ غُلَامًا فَقَالَتْ مِنْ جُرَيْجٍ فَأَتَوْهُ فَكَسَرُوْا صَوْمَعَتَهُ وَأَنْزَلُوْهُ وَسَبُّوْهُ فَتَوَضَّأَ وَصَلَّى ثُمَّ أَتَى الْغُلَامَ فَقَالَ مَنْ أَبُوْكَ يَا غُلَامُ قَالَ الرَّاعِى قَالُوْا نَبْنِى صَوْمَعَتَكَ مِنْ ذَهَبٍ قَالَ لَا إِلَّا مِنْ طِيْنٍ.

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তিনজন শিশু ছাড়া অন্য কেউ দোলনায় থেকে কথা বলেনি। প্রথমজন ঈসা আলাইহিস সালাম, দ্বিতীয়জন বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তি যাকে ‘জুরাইজ’ নামে ডাকা হত। একদা ইবাদতে রত থাকা অবস্থায় তার মা এসে তাকে ডাকল। সে ভাবল, আমি কি তার ডাকে সাড়া দেব, না ছালাত আদায় করতে থাকব। তার মা বলল, হে আল্লাহ! ব্যভিচারিণীর মুখ না দেখা পর্যন্ত তুমি তাকে মৃত্যু দিও না। জুরাইজ তার ইবাদতখানায় থাকত। একবার তার নিকট একটি নারী আসল। তার সঙ্গে কথা বলল কিন্তু জুরাইজ তা অস্বীকার করল। অতঃপর নারীটি একজন রাখালের নিকট গেল এবং তাকে দিয়ে মনোবাসনা পূর্ণ করল। পরে সে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করল। তাকে জিজ্ঞেস করা হল এটি কার থেকে? স্ত্রীলোকটি বলল, জুরাইজ থেকে। লোকেরা তার নিকট আসল এবং তার ইবাদতখানা ভেঙ্গে দিল। আর তাকে নামিয়ে আনল ও তাকে গালিগালাজ করল। তখন জুরাইজ ওযূ করল এবং দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করল। অতঃপর নবজাত শিশুটির নিকট এসে তাকে জিজ্ঞেস করল, হে শিশু! তোমার পিতা কে? সে জবাব দিল, সেই রাখাল। তারা বলল, আমরা আপনার ইবাদতখানাটি সোনা দিয়ে তৈরি করে দিচ্ছি। সে বলল, না। তবে মাটি দিয়ে।[4]

মাতা-পিতাকে মান্য করার দৃষ্টান্ত :

সারা পৃথিবীতে মাতা-পিতাকে মান্য করার অপূর্ব দৃষ্টান্ত যিনি রেখেছিলেন, তিনি হচ্ছেন নবী ইসমাঈল আলাইহিস সালাম। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে পিতাকে মান্য করতে হয়। কিভাবে তাদের কথা শুনতে হয়। এমনকি তিনি নিজের জীবন দিয়েও পিতার আদেশ মান্য করার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তার কারণেই মুসলিম জাতির উপর যে কুরবানীর বিধান রয়েছে, তা মূলত পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও ছেলে ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে।[5] এ ছাড়া তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন স্ত্রীর সাথে মাতা-পিতার ক্ষেত্রে কেমন ভূমিকা পালন করতে হয় এবং পিতার সাথে সন্তানেরাও যে কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে তাও তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন। যা নিমেণর হাদীছে সুস্পষ্ট ফুটে উঠেছে। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর মনে জাগল, তখন তিনি তার স্ত্রী (সারা)-কে বললেন, আমি আমার পরিত্যক্ত পরিজনের খবর নিতে চাই। রাবী বলেন, অতঃপর তিনি আসলেন এবং সালাম দিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ইসমাঈল কোথায়? ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-এর স্ত্রী বলল, তিনি শিকারে গেছেন। তিনি পুত্রবধূকে তাদের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, আমরা অতি দুরবস্থায়, অতি টানাটানি ও খুব কষ্টে আছি। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেন, সে যখন আসবে, তখন তুমি তাকে আমার এ নির্দেশের কথা বলবে, তুমি তোমার ঘরের চৌকাঠখানা বদলিয়ে ফেলবে। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম যখন আসলেন, তখন স্ত্রী তাকে খবরটি জানালেন। তিনি স্ত্রীকে বললেন, তুমি সেই চৌকাঠ। অতএব তুমি তোমার পিতার নিকট চলে যাও। রাবী বলেন, অতঃপর ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর আবার মনে পড়ল। তখন তিনি স্ত্রী (সারা)-কে বললেন, আমি আমার নির্বাসিত পরিবারের খবর নিতে চাই। অতঃপর তিনি সেখানে আসলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, ইসমাঈল কোথায়? ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-এর স্ত্রী বলল, তিনি শিকারে গেছেন। পুত্রবধূ তাকে বললেন, আপনি কি আমাদের এখানে অবস্থান করবেন না? কিছু পানাহার করবেন না? তখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেন, তোমাদের খাদ্য ও পানীয় কী? স্ত্রী বলল, আমাদের খাদ্য হল গোশত এবং পানীয় হল পানি। তখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম দো‘আ করলেন, হে আল্লাহ! তাদের খাদ্য এবং পানীয় দ্রব্যের মধ্যে বরকত দিন। রাবী বলেন, আবুল কাসেম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর দো‘আর কারণেই বরকত রয়েছে। রাবী বলেন, আবার কিছুদিন পর ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর মনে তাঁর নির্বাসিত পরিজনের কথা জাগল। তখন তিনি তাঁর স্ত্রী (সারা)-কে বললেন, আমি আমার পরিত্যক্ত পরিজনের খবর নিতে চাই। অতঃপর তিনি এলেন এবং ইসমাঈলের দেখা পেলেন, তিনি যমযম কূপের পিছনে বসে তার একটি তীর মেরামত করছেন। তখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ডেকে বললেন, হে ইসমাঈল! তোমার রব তাঁর জন্য একখানা ঘর নির্মাণ করতে আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বললেন, আপনার রবের নির্দেশ পালন করুন। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেন, তিনি আমাকে এও নির্দেশ দিয়েছেন যে, তুমি যেন আমাকে এ বিষয়ে সহায়তা কর। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বললেন, তাহলে আমি তা করব অথবা তিনি অনুরূপ কিছু বলেছিলেন। অতঃপর উভয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ইমারত বানাতে লাগলেন। আর ইসমাঈল আলাইহিস সালাম তাঁকে পাথর এনে দিতে লাগলেন। আর তারা উভয়ে দো‘আ করছিলেন, হে আমাদের রব! আপনি আমাদের এ কাজ কবুল করুন। আপনি তো সবকিছু শোনেন এবং জানেন। রাবী বলেন, এরই মধ্যে প্রাচীর উঁচু হয়ে গেল আর বৃদ্ধ ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এতটা উঠতে দুর্বল হয়ে পড়লেন। তখন তিনি (মাক্বামে ইবরাহীমের) পাথরের উপর দাঁড়ালেন। ইসমাঈল তাঁকে পাথর এগিয়ে দিতে লাগলেন। আর উভয়ে এ দো‘আ পড়তে লাগলেন, হে আমাদের রব! আপনি আমাদের এ কাজটুকু কবুল করুন। নিঃসন্দেহে আপনি সবকিছু শোনেন ও জানেন।[6]

মাতা-পিতাকে মান্য করার ফল :

মাতা-পিতার সেবা করা নিঃসন্দেহে সৎআমল সমূহের অন্তর্ভুক্ত। তাই মাতা-পিতার সেবা করে আমাদেরকে এ সৎআমলের চেষ্টা করতে হবে। যাতে করে আমরা আমাদের বিপদ হলে তা থেকে উদ্ধার হতে পারি। কারণ এমন কোন মানুষ নেই, যে বিপদে পড়ে না এবং তা থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করে না। তাই বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য হলেও আমরা যেন আমাদের মাতা-পিতার সাথে সৎ আচরণ করতে পারি। মাতা-পিতার সেবা করে বিপদ থেকে যে উদ্ধার পাওয়া যায়, তার বাস্তব দৃষ্টান্ত নিম্নের হাদীছে:

عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ خَرَجَ ثَلاَثَةٌ يَمْشُوْنَ فَأَصَابَهُمُ الْمَطَرُ فَدَخَلُوْا فِىْ غَارٍ فِىْ جَبَلٍ فَانْحَطَّتْ عَلَيْهِمْ صَخْرَةٌ قَالَ فَقَالَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ادْعُوا اللهَ بِأَفْضَلِ عَمَلٍ عَمِلْتُمُوْهُ فَقَالَ أَحَدُهُمُ اللَّهُمَّ إِنِّىْ كَانَ لِىْ أَبَوَانِ شَيْخَانِ كَبِيْرَانِ فَكُنْتُ أَخْرُجُ فَأَرْعَىْ ثُمَّ أَجِىءُ فَأَحْلُبُ فَأَجِىءُ بِالْحِلَابِ فَآتِى بِهِ أَبَوَىَّ فَيَشْرَبَانِ ثُمَّ أَسْقِى الصِّبْيَةَ وَأَهْلِىْ وَامْرَأَتِىْ فَاحْتَبَسْتُ لَيْلَةً فَجِئْتُ فَإِذَا هُمَا نَائِمَانِ قَالَ فَكَرِهْتُ أَنْ أُوْقِظَهُمَا وَالصِّبِيْةُ يَتَضَاغَوْنَ عِنْدَ رِجْلَىَّ فَلَمْ يَزَلْ ذَلِكَ دَأْبِىْ وَدَأْبَهُمَا حَتَّى طَلَعَ الْفَجْرُ اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّىْ فَعَلْتُ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ وَجْهِكَ فَافْرُجْ عَنَّا فُرْجَةً نَرَى مِنْهَا السَّمَاءَ قَالَ فَفُرِجَ عَنْهُمْ.

আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘একবার তিনজন লোক পথ চলছিল, তারা বৃষ্টিতে পতিত হল। অতঃপর তারা এক পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিল। হঠাৎ পাহাড় হতে এক খণ্ড পাথর পড়ে তাদের গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তখন তারা একে অপরকে বলল, নিজেদের কৃত কিছু সৎ কাজের কথা চিন্তা করে বের কর, যা আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য তোমরা করেছ এবং তার মাধ্যমে আল্লাহ্র নিকট দো‘আ কর। তাহলে হয়ত আল্লাহ তোমাদের উপর হতে পাথরটি সরিয়ে দিবেন। তাদের একজন বলতে লাগল, হে আল্লাহ! আমার আববা-আম্মা খুব বৃদ্ধ ছিলেন এবং আমার ছোট ছোট সন্তানও ছিল। আমি তাদের ভরণ-পোষণের জন্য পশু পালন করতাম। সন্ধ্যায় যখন আমি বাড়ী ফিরতাম, তখন দুধ দোহন করতাম এবং আমার সন্তানদের আগে আমার আববা-আম্মাকে পান করাতাম। একদিন আমার ফিরতে দেরী হয় এবং সন্ধ্যা হওয়ার আগে আসতে পারলাম না। এসে দেখি তারা ঘুমিয়ে পড়েছেন। যখন আমি দুধ দোহন করলাম, যেমন প্রতিদিন দোহন করি। তারপর আমি তাঁদের শিয়রে (দুধ নিয়ে) দাঁড়িয়ে রইলাম। তাদেরকে জাগানো আমি পসন্দ করিনি এবং তাদের আগে আমার বাচ্চাদেরকে পান করানোও অসঙ্গত মনে করি। অথচ বাচ্চাগুলো দুধের জন্য আমার পায়ের কাছে পড়ে ক্রন্দন করছিল। এভাবে ভোর হয়ে গেল। হে আল্লাহ! আপনি জানেন আমি যদি শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্যই এ কাজটি করে থাকি, তবে আপনি আমাদের হতে পাথরটা খানিক সরিয়ে দিন, যাতে আমরা আসমানটা দেখতে পাই। তখন আল্লাহ পাথরটাকে একটু সরিয়ে দিলেন এবং তারা আসমান দেখতে পেল।[7] 

উপসংহার :

পরিশেষে বলতে চাই, আমরা যারা পৃথিবীর বুকে আছি, চলে গেছি বা চলে যাব, তারা প্রত্যেকেই মাতা-পিতার স্বাদ নিয়েছি। আমরা যদি আমাদের মাতা-পিতার সাথে খারাপ আচরণ করি, তাহলে আমরা যখন মাতা-পিতা হব, তখন আমাদের সন্তানেরা আমাদের সাথে খারাপ আচরণ করবে। আর যদি আমরা তাদের সাথে ভাল আচরণ করি, তাহলে আমাদের সন্তানরাও আমাদের সাথে ভাল আচরণ করবে। আমার এক উস্তায বলতেন, এক ছেলে তার পিতাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। টেনে নিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ ব্যক্তিটি তার ছেলেকে বলছে, বাবা! তুমি আমাকে আর টেনে নিয়ে যেও না। কারণ আমি তোমার দাদাকেও এ পর্যন্ত টেনে নিয়ে এসেছিলাম।

তাই আমাদের উচিত হবে, আমাদের মাতা-পিতার সাথে ভাল ব্যবহার করে তাদের সুখের উপকরণ হয়ে তাদের মাঝে থাকা। অনেকে অভিযোগ করে পিতা যে তার সন্তানের সাথে ভাল ব্যবহার করে না, তাহলে সন্তান কী করে তার পিতার সাথে ভাল ব্যবহার করবে। আমি এর উত্তর এভাবে দিয়ে থাকি যে, পিতা ভুল করলে পিতাকে আল্লাহ্র কাছে জবাবদিহি করতে হবে। পিতার ভুলের কারণে তোমাকে তো পাকড়াও করা হবে না। তাই সন্তানকে লক্ষ্য করে বলছি, হে সন্তান! তুমি নিজে ভুল না করে তুমি তোমার দায়িত্ব যথাযথ পালন করছ কি-না সেটা লক্ষ্য কর। আল্লাহ আমাদের প্রত্যেক সন্তানকে তাদের নিজ দায়িত্ব তথা মাতা-পিতার সাথে ভাল ব্যবহার করে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ লাভ করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!



[1]. তিরিমিযী, হা/১৯০০, সনদ ছহীহ।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৭৬৯ ।

[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬২৯ ।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৩৬।

[5]. সূরা ছফফাত, ১০৮-১০৯।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৬৫।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/২২১৫।

Magazine