কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর আক্বীদা বনাম হানাফীদের আক্বীদা (পর্ব-৫)

ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ কি মুরজিঈ ছিলেন? : আরবী ভাষায় মুরজিঈ (مُرْجِئِيْ) শব্দটি ‘ইরজা’ (إِرْجَاءٌ) শব্দ থেকে এসেছে। মূল অÿর (ر، ج، أ)। ‘ইরজা’ শব্দের অর্থ- ‘তা’খীর’ (تَأْخِيْرٌ) বা পিছিয়ে দেওয়া, বিলম্বিত করা, দূরে সরানো ইত্যাদি। যেমন কোনো কিছুকে দূরে সরালে, বিলম্বিত করলে, পিছিয়ে দিলে বা বাদ দিলে বলা হয়, أَرْجَأْتُ الشَّيْءَ: أَخَّرْتَهُ ‘বস্ত্তটিকে আমি দূরে সরিয়েছি/পিছিয়ে দিয়েছি’। মহান আল্লাহ বলেন, تُرْجِي مَنْ تَشَاءُ مِنْهُنَّ ‘তুমি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা সরিয়ে রাখতে পারো’ (আল-আহযাব, ৩৩/৫১)। এ অর্থেই মুরজিআদেরকে মুরজিআ বলা হয়। কারণ তারা ঈমান থেকে আমলকে দূরে সরিয়ে দেয়, আলাদা করে দেয়।[1]

‘ইরজা’ (إِرْجَاءٌ) শব্দটির আরেকটি অর্থ- إِعْطَاءُ الرَّجَاءِ বা ‘আশা দেওয়া/আশান্বিত করা’। এ অর্থেও মুরজিআদেরকে মুরজিআ বলা হয়। কারণ তারা বলে,لَا تَضُرُّ مَعَ الْإِيْمَانِ مَعْصِيَةٌ، كَمَا لَا تَنْفَعُ مَعَ الْكُفْرِ طَاعَةٌ ‘ঈমান থাকলে পাপ কোনো ÿতি করতে পারে না। অনুরূপভাবে কুফরী থাকলে আনুগত্য কোনো উপকারে আসে না’।[2] অর্থাৎ ঈমান থাকা অবস্থায় পাপ করলেও কোনো ক্ষতি নেই- এই আশায় বুক বাঁধে বলে তাদেরকে মুরজিআ বলা হয়। এ আক্বীদায় বিশ্বাসী একজন ব্যক্তিকে মুরজিঈ বলে এবং সামষ্টিকভাবে তাদেরকে মুরজিআহ (مُرْجِئَةٌ) বলে; যেমনিভাবে মু‘তাযিলা আক্বীদা পোষণকারী কোনো একজন ব্যক্তিকে মু‘তাযিলী বলে এবং তাদের সমষ্টিকে মু‘তাযিলা বলে। অনুরূপভাবে শী‘ঈ ও শী‘আ।

মুরজিআরা ৩ দলে বিভক্ত। যথা-

১. এক শ্রেণীর মুরজিআ মনে করে, অন্তরে যা রয়েছে, শুধু ততটুকুই ঈমান। এ শ্রেণীর কেউ কেউ অন্তরের আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করে। অধিকাংশ মুরজিআদের এই অবস্থা। আবার কেউ কেউ অন্তরের আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করে না। জাহ্ম ইবনে ছফওয়ান এবং তার অনুসারীরা এই মতের প্রবক্তা।

২. কেউ কেউ শুধু মুখের স্বীকৃতিকে ঈমান বলে মনে করে। কার্রামিইয়্যাদের পূর্বে আর কেউ এমন সংজ্ঞা দেয়নি।

৩. কেউ কেউ শুধু হৃদয়ের বিশ্বাস ও মুখের স্বীকৃতিকে ঈমান হিসাবে সংজ্ঞায়িত করে। ফক্বীহগণের অনেকেই এই মতের প্রবক্তা, যাদেরকে ‘মুরজিআতুল ফুক্বাহা’ (مُرْجِئَةُ الْفُقَهَاءِ) বলা হয়।[3]

এসব সংজ্ঞার মধ্যে ঈমানের সবচেয়ে দূরতম ও ত্রুটিপূর্ণ সংজ্ঞা হচ্ছে জাহ্ম এবং তার অনুসারীদের সংজ্ঞা। কেননা তাদের বক্তব্য মেনে নিলে ইবলীস, ফির‘আউন সহ অন্যান্য মূল পথভ্রষ্টেরও পূর্ণ মুমিন হিসাবে গণ্য করা অবধারিত হয়ে যাবে। কারণ, তারা বলে, শুধু হৃদয়ের অবগতিই হচ্ছে ঈমান। এরপর ভ্রষ্টতর সংজ্ঞা হচ্ছে কার্রামিইয়্যাদের সংজ্ঞা। এরপর ‘মুরজিআতুল ফুক্বাহা’-এর সংজ্ঞা।

ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর মধ্যে শেষোক্ত শ্রেণীর ‘ইরজা’ সামান্য পরিমাণ ছিল। অর্থাৎ শুধু হৃদয়ের বিশ্বাস ও মুখের স্বীকৃতিকে তিনি ঈমান হিসাবে আখ্যায়িত করতেন; আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করতেন না। ঈমানের যে দু’টি মাসআলায় ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর ভুল হয়েছে, তার মধ্যে এটি একটি।[4] ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

اَلْإِيْمَانُ إِقْرَارٌ بِاللِّسَانِ، وَتَصْدِيْقٌ بِالْجِنَانِ. وَالْإِقْرَارُ لَا يَكُوْنُ وَحْدَهُ إِيْمَانًا، لِأَنَّهُ لَوْ كَانَ إِيْمَانًا لَكَانَ الْمُنَافِقُوْنَ كُلُّهُمْ مُؤْمِنِيْنَ. وَكَذٰلِكَ الْمَعْرِفَةُ وَحْدَهَا لَا تَكُوْنُ إِيْمَانًا، لِأَنَّهَا لَوْ كَانَتْ إِيْمَانًا لَكَانَ أَهْلُ الْكِتَابِ كُلُّهُمْ مُؤْمِنِيْنَ. قَالَ تَعَالٰى فِيْ حَقِّ الْمُنَافِقِيْنَ: [وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَكَاذِبُونَ]، وَقَالَ تَعَالٰى فِيْ حَقِّ أَهْلِ الْكِتَابِ: [الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمُ.

‘‘মুখের স্বীকৃতি ও অন্তরের বিশ্বাস হচ্ছে ঈমান। শুধুমাত্র মুখের স্বীকৃতি ঈমান হতে পারে না। কেননা যদি শুধু মুখের স্বীকৃতি ঈমান হত, তাহলে সকল মুনাফিক্ব মুমিন হয়ে যেত। অনুরূপভাবে শুধু অন্তরের বিশ্বাস ঈমান হতে পারে না। কেননা যদি শুধু অন্তরের বিশ্বাস ঈমান হত, তাহলে সমস্ত আহলে কিতাব বা আসমানী কিতাবধারীরা মুমিন হয়ে যেত। মহান আল্লাহ মুনাফিক্বদের ব্যাপারে বলেন, ‘আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, অবশ্যই মুনাফিক্বরা মিথ্যাবাদী’। তিনি আহলে কিতাবদের সম্পর্কে বলেন, ‘যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তাকে চিনে, যেরূপ চিনে নিজেদের সন্তানদেরকে’।’’[5] আরেকটি ভুল হচ্ছে, ‘ঈমান বাড়েও না, কমেও না’।[6] ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَالْإِيْمَانُلَايَزِيْدُوَلَايَنْقُصُ ‘আর ঈমান বাড়েও না, কমেও না’।[7] তিনি আরো বলেন, وَإِيْمَانُ أَهْلِ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ لَا يَزِيْدُ وَلَا يَنْقُصُ ‘আসমান ও দুনিয়াবাসীদের ঈমান বাড়েও না, কমেও না’।[8]

তবে, পথভ্রষ্ট দুই শ্রেণীর মুরজিআদের আক্বীদা থেকে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত; যাদের একশ্রেণী শুধু মুখের স্বীকৃতিকে ঈমান মনে করে। আরেক শ্রেণী শুধুমাত্র অন্তরের বিশ্বাসকেই ঈমান জানে। এদের আক্বীদা-বিশ্বাসের সাথে ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর বিন্দুমাত্র কোনো সম্পর্ক নেই; যেমনটি আমরা একটু আগে খোদ ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর যবানীতেই শুনে এসেছি। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলে দিয়েছেন, শুধুমাত্র মুখের স্বীকৃতি ঈমান হতে পারে না। যদি তাই হত, তাহলে সকল মুনাফিক্ব মুমিন হয়ে যেত। অনুরূপভাবে শুধু অন্তরের বিশ্বাস ঈমান হতে পারে না। যদি তাই হত, তাহলে সমস্ত আহলে কিতাব বা আসমানী কিতাবধারীরা মুমিন হয়ে যেত।

ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর এই অবস্থানের ব্যাপারে আরো কিছু কথাঃ

এক. ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত গণ্য না করলেও তিনি অন্যান্য পথভ্রষ্ট মুরজিআর মত আমলকে অবজ্ঞা ও অবহেলা করেননি কখনই। বরং ঈমানের পাশাপাশি আমল ছিল তার জীবনের একমাত্র সাধনা। তার নিজের আমল এবং সারা জীবনের নিরলস ফিক্বহ চর্চা সেকথাই প্রমাণ করে। শরী‘আতের কোন্টা ফরয, কোন্টা ওয়াজিব, কোন্টা সুন্নাত, কোন্টা নফল, কোন্টা হারাম, কোন্টা মাকরূহ, কোন্টা মুবাহ জনগণকে এসব বুঝাতেই পার করেছেন সারাটি জীবন।

অন্যান্য মুরজিআ তো বদকার ও পাপীকে এমনভাবে আশান্বিত করে যে, সে যা খুশী বলতে পারে, যা খুশী করতে পারে- কোনো অসুবিধা নেই, যদি ঈমান থাকে। কোনো মুসলিম এমন আক্বীদা পোষণ করতে পারে না। ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত গণ্য না করে সালাফে ছালেহীনের বিরোধিতা করলেও প্রবৃত্তিপূজারীদের সামনে এমন কোনো পথ খোলা রেখে গেছেন কি?! কখনই না। তিনি এমনটি করতে পারেন না, বলতে পারেন না। অতএব, মুরজিআ বলতে সাধারণত যেসব ভ্রষ্টদের কথা ব্রেইনে আসে, তিনি তাদের ধারেকাছেও ছিলেন না।

দুই. সেকারণে সালাফে ছালেহীন যেসব পথভ্রষ্ট মুরজিআর নিন্দা করেছেন, ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ ও তার মত আক্বীদা পোষণকারীরা মোটেও তাদের অন্তর্ভুক্ত নন। এখানে আমি পথভ্রষ্ট মুরজিআদের নিন্দায় উলামায়ে কেরামের কিছু বক্তব্য তুলে ধরছি: ইবরাহীম নাখাঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, لَفِتْنَتُهُمْ - يَعْنِي الْمُرْجِئَةَ - أَخْوَفُ عَلَى هَذِهِ الْأُمَّةِ مِنْ فِتْنَةِ الْأَزَارِقَةِ. ‘এই উম্মতের জন্য মুরজিআদের ফেতনা আযারেক্বার[9] ফেতনার চেয়েও ভয়ানক’।[10] ইমাম যুহরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, مَا اُبْتُدِعَتْ فِي الْإِسْلَامِ بِدْعَةٌ أَضَرُّ عَلَى أَهْلِهِ مِنْ الْإِرْجَاءِ. ‘ইসলামে এমন কোনো বিদ‘আত সৃষ্টি হয়নি, যা মুরজিআদের আক্বীদার চেয়ে মুসলিমদের জন্য অধিক ক্ষতিকর হতে পারে’।[11] ইমাম আওযাঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, كَانَ يَحْيَى بْنُ أَبِي كَثِيرٍ وَقَتَادَةُ يَقُوْلَانِ: لَيْسَ شَيْءٌ مِنْ الْأَهْوَاءِ أَخْوَفُ عِنْدَهُمْ عَلَى الْأُمَّةِ مِنْ الْإِرْجَاءِ. ‘ইয়াহ্ইয়া ইবনু আবী কাছীর ও ক্বাতাদাহ রহিমাহুমাল্লাহ বলতেন, এই উম্মতের জন্য মুরজিআদের আক্বীদার চেয়ে ভয়ঙ্কর আর কিছু নেই’।[12]

ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ এসব নিন্দার আওতাভুক্ত হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না; বরং তিনি ছিলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের ইমাম।

তিন. ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর এ দু’টি ভুলের ব্যাপারে হক্ব ও সঠিক কথা হচ্ছে, এটি ছিল তার ভুল ও পদস্খলন। কিতাব ও সুন্নাহ্র নিক্তিতে সবকিছু মাপলে এবং মাত্রাতিরিক্ত আবেগ, অন্ধভক্তি ও প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে দূরে থাকলে এই মন্তব্যকেই হক্ব বলতে হবে। উল্লেখ্য, ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ ও অন্যান্য সকল মুজতাহিদ ইমামের সব বক্তব্য ইজতিহাদ ও হক্ব অনুসন্ধানের উপর ভিত্তিশীল। অর্থাৎ তারা সবাই ইজতিহাদ করেছেন এবং হক্ব অনুসন্ধান করেছেন। আর একথা গোপন নয় যে, কোন মুজতাহিদ ভুল ও পদস্খলনের ঊর্ধ্বে নন। তাই বলে, কেউ ভুল করলে তার অনুসারীদের কখনই উচিৎ হবে না, কুরআন-হাদীছের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে তার বক্তব্যের প্রতি অন্ধভক্তি দেখানো। কারণ ব্যক্তি দিয়ে হক্ব চেনা যায় না। সেজন্য ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,

كُلُّ قَائِلٍ إِنَّمَا يُحْتَجُّ لِقَوْلِهِ لَا بِهِ إِلا اللهَ وَرَسُوْلَهُ.

‘আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ধ ছাড়া অন্য সব বক্তার বক্তব্যের পক্ষে দলীল খুঁজতে হবে। এমনটা নয় যে, তাদের বক্তব্য দিয়ে দলীল পেশ করা হবে’।[13] সেজন্যই ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ সহ প্রসিদ্ধ সব ইমাম নিজেদের অন্ধ অনুসরণ ও অন্ধভক্তি থেকে তাদের অনুসারীদের সতর্ক করেছেন।[14]

বর্তমান যুগের একজন গবেষক আলেম ও ছহীহ আক্বীদার কর্ণধার মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুর রহমান আল-খামীস বলেন,

قَوْلُهُ هٰذَا هُوَ الْفَارِقُ بَيْنَ عَقِيْدَةِ الْإِمَامِ أَبِيْ حَنِيْفَةَ فِي الْإِيْمَانِ وَبَيْنَ عَقِيْدَةِ سَائِرِ أَئِمَّةِ الْإِسْلَامِ مَالِكٍ وَالشَّافِعِيِّ وَأَحْمَدَ وَإِسْحَاقَ وَالْبُخَارِيِّ وَغَيْرِهِمْ وَالْحَقُّ مَعَهُمْ. وَقَوْلُ أَبِيْ حَنِيْفَةَ مُجَانِبٌ لِّلصَّوَابِ وَهُوَ مَأْجُوْرٌ فِي الْحَالَيْنِ، وَقَدْ ذَكَرَ ابْنُ عَبْدِ الْبَرِّ وَابْنُ أَبِي الْعِزِّ مَا يُشْعِرُ أَنَّ أَبَا حَنِيْفَةَ رَجَعَ عَنْ قَوْلِهِ وَاللهُ أَعْلَمُ.

‘ঈমানের এই দু’টি মাসআলাই ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ এবং ইমাম মালেক, শাফেঈ, আহমাদ, ইসহাক্ব, বুখারীসহ ইসলামের অন্যান্য সব ইমামের মধ্যে পার্থক্য। এই দু’টি মাসআলাতেই ‘হক্ব’ রয়েছে অন্যদের সাথে এবং ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর বক্তব্য সঠিক নয়। তবে, তিনি উভয় অবস্থায় নেকী পাবেন। ইবনু আব্দিল বার এবং ইবনু আবিল ইয রাহিমাহুল্লাহ যে বক্তব্য পেশ করেছেন, তাতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, তিনি তার এ বক্তব্য থেকে ফিরে এসেছিলেন’।[15]

উল্লেখ্য, ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ এ মাসআলায় ইচ্ছাকৃত ভুল করেননি এবং ইচ্ছাকৃতভাবে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরোধিতা করেননি; বরং এটা ছিল তার ইজতিহাদের ফল, অনিচ্ছাকৃত ভুল। অসম্ভব, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআন-হাদীছের বিরোধিতা করতে পারেন না। তাকে বলা হয়েছিল, أَتُخَالِفُ النَّبِيَّ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم ‘আপনি কি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরোধিতা করেন?’ তিনি বলেছিলেন, لَعَنَ اللهُ مَنْ يُخَالِفُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم بِهِ أَكْرَمَنَا اللهُ وَبِهِ اسْتَنْقَذَنَا ‘যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরোধিতা করে, আল্লাহ তার উপর লা‘নত করুন। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমেই আল্লাহ আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন এবং তাঁর মাধ্যমেই আমাদেরকে নিষ্কৃতি দিয়েছেন’।[16] শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

وَمَنْ ظَنَّ بِأَبِيْ حَنِيْفَةَ أَوْ غَيْرِهِ مِنْ أَئِمَّةِ الْمُسْلِمِيْنَ أَنَّهُمْ يَتَعَمَّدُوْنَ مُخَالَفَةَ الْحَدِيْثِ الصَّحِيْحِ لِقِيَاسِ أَوْ غَيْرِهِ فَقَدْ أَخْطَأَ عَلَيْهِمْ وَتَكَلَّمَ إمَّا بِظَنِّ وَإِمَّا بِهَوَى... وَقَدْ بَيَّنَّا هَذَا فِي رِسَالَةِ "رَفْعِ الْمَلَامِ عَنْ الْأَئِمَّةِ الْأَعْلَامِ" وَبَيَّنَّا أَنَّ أَحَدًا مِنْ أَئِمَّةِ الْإِسْلَامِ لَا يُخَالِفُ حَدِيْثًا صَحِيْحًا بِغَيْرِ عُذْرٍ بَلْ لَهُمْ نَحْوٌ مِنْ عِشْرِيْنَ عُذْرًا...

‘আবু হানীফা বা মুসলিমদের অন্য কোন ইমামের ব্যাপারে কেউ যদি ধারণা করে যে, কোন ক্বিয়াসের কারণে বা অন্য কোন কারণে তারা ছহীহ হাদীছের বিরোধিতা করেছেন, তাহলে সে তাদের ব্যাপারে ভুল মন্তব্য করবে এবং হয় ধারণা থেকে, নচেৎ প্রবৃত্তি থেকে কথা বলবে।...এ বিষয়টি আমরা ‘রফঊল মালাম আনিল আইম্মাতিল আ‘লাম’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছি। সেখানে আমরা বলেছি, বিনা ওযরে ইসলামের কোন ইমাম ছহীহ হাদীছের বিরোধিতা করেননি; বরং এক্ষেত্রে তাদের প্রায় ২০টি ওযর রয়েছে...’।[17]

অতএব, হক্ব অনুসন্ধিৎসুর উচিত হবে, এ মাসআলায় ইমাম হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর এ বক্তব্য পরিত্যাগ করে তার নিম্নবর্ণিত বক্তব্য গ্রহণ করা। তিনি বলেছেন,

[1]৭. মাজমূ‘উল ফাতাওয়া, ২০/৩০৪।

إِذَا قُلْتُ قَوْلًا يُخَالِفُ كِتَابَ اللهِ وَخَبْرَ الرَّسُوْلِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فَاتْرُكُوْا قَوْلِيْ

‘আমি যদি এমন কথা বলি, যা আল্লাহ্র কিতাব ও রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীছ বিরোধী, তাহলে তোমরা আমার কথা বর্জন কর’।[18]

তাহলে ঈমানের পরিচয় ও হ্রাস-বৃদ্ধির ব্যাপারে সঠিক বক্তব্য কী? আগামী পর্বে আমরা এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

 (চলবে)

-আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী


[1]. দ্রষ্টব্য: ইবনে ফারেস (মৃত্যু: ৩৯৫ হি.), মু‘জামু মাক্বাইসিল লুগাহ, তাহক্বীক্ব: আব্দুস সালাম হারূন, (দারুল ফিকর, প্রকাশকাল: ১৩৯৯ হি./১৯৭৯ খৃ.), ২/৪৯৫; ইবনে কুতাইবা (মৃত্যু: ২৭৬ হি.), গরীবুল হাদীছ, তাহক্বীক্ব: আব্দুল্লাহ জাবূরী, (বাগদাদ: মাকতাবাতুল আনী, ১ম প্রকাশ: ১৩৯৭ হি.), ১/২৫৩; আব্দুল ক্বাহের বাগদাদী (মৃত্যু: ৪২৯ হি.), আল-ফারকু বায়নাল ফিরাক্ব ওয়া বায়ানুল ফিরক্বাতিন নাজিয়াহ, (বৈরূত: দারুল আফাক্ব আল-জাদীদাহ, ২য় প্রকাশ: ১৯৭৭ খৃ.), পৃ: ১৯০।

[2]. শাহরিস্তানী (মৃত্যু: ৫৪৮ হি.), আল-মিলাল ওয়ান নিহাল, (মুআসসাসাতুল হালাবী, তা. বি.), ১/১৩৯।

[3]. মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়াহ, ৭/১৯৫।

[4]. দ্রষ্টব্য: ইবনু আবিল ইয (মৃঃ ৩২১ হিঃ), আল-আক্বীদা আত্ব-ত্বহাবিইয়্যা, (পাদটীকা: মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আল-আলবানী (বৈরূত: আল-মাকতাবুল ইসলামী, ২য় প্রকাশ, ১৪১৪ খৃঃ), পৃঃ ৬২।

[5]. ইমাম আবু হানীফা, কিতাবুল ওয়াছিয়্যাহ, (বৈরূত: দারু ইবনি হাযম, ১ম প্রকাশ: ১৪১৮ হি./১৯৯৭ খৃঃ), পৃঃ ২৭-২৮।

[6]. দ্রষ্টব্য: আল-ফারকু বায়নাল ফিরাক্ব ওয়া বায়ানুল ফিরক্বাতিন নাজিয়াহ, পৃঃ ১৯১; আল-মিলাল ওয়ান-নিহাল, ১/১৪১।

[7]. আবু হানীফা, কিতাবুল ওয়াছিয়্যাহ, তাহক্বীক্ব: আবু মু‘আয মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল হাই উওয়াইনা, (বৈরূত: দারু ইবনি হাযম, ১ম প্রকাশ: ১৪১৮ হি./১৯৯৭ খৃ.), পৃঃ ২৯।

[8]. মোল্লা আলী ক্বারী, মিনাহুর রওযিল আযহার ফী শারহি ফিক্বহিল আকবার, (বৈরূত: দারুল বাশাইর আল-ইসলামিয়্যাহ, ১ম প্রকাশ: ১৪১৯ হি./১৯৯৮ খৃ.), পৃঃ ২৫৫।

[9]. খারেজীদের নিকৃষ্টতম গ্রুপ হচ্ছে ‘আযারেক্বাহ’, নাফে‘ ইবনে আযরাক্ব-এর নামানুসারে তাদেরকে এ নামে নামকরণ করা হয়।

[10]. মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়াহ, ৭/৩৯৪-৩৯৫।

[11]. প্রাগুক্ত, ৭/৩৯৫।

[12]. প্রাগুক্ত।

[13]. ইমাম বাযযার (মৃঃ ৭৪৯ হিঃ), আল-আ‘লামুল আলিইয়্যাহ ফী মানাক্বিবি ইবনে তাইমিয়াহ, তাহক্বীক্ব: যুহাইর আশ-শাবীশ, (বৈরূত: আল-মাকতাবুল ইসলামী, ৩য় প্রকাশ ১৪০০ হিঃ), পৃঃ ২৯।

[14]. আব্দুর রাযযাক্ব ইবনে আব্দুল মুহসিন আল-আববাদ, যিয়াদাতুল ঈমান ওয়া নুক্বছানুহূ ওয়া হুকমুল ইসতিছনা ফীহি, (রিয়ায: দারু কুনূযি ইশবীলিয়া, সঊদী আরব, ২য় প্রকাশ ১৪২৭ হিঃ/২০০৬ খৃঃ), পৃঃ ৩৩৪-৩৩৭।

[15]. মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুর রহমান আল-খামীস, ই‘তিক্বাদুল আইম্মাতিল আরবা‘আহ, (সঊদী আরব: দারুল আছেমাহ, ১ম প্রকাশ ১৪১২ হিঃ/১৯৯২ খৃঃ), পৃঃ ১৯-২০।

[16]. ইবনু আব্দিল বার্র (মৃঃ ৪৬৩ হি.), আল-ইনতিক্বা ফী ফাযাইলিছ ছালাছাতিল আইম্মাহ, (বৈরূত: দারুল কুতুবিল ইলমিইয়্যাহ, তা. বি.), পৃঃ ১৪১।

Magazine