২য় উদাহরণ :ছালাতে রুকূতে যাওয়ার সময় ও রুকূ হতে উঠার সময় হাত না উঠানো।
সূরা ফাতিহা এবং অন্য সূরা পড়ার পরে রুকূতে যাওয়ার সময় ও রুকূ থেকে উঠার সময় রাফউল ইয়াদায়েন বা হাত উত্তোলন করা সুন্নাত। এ ব্যাপারে অনেক ছহীহ হাদীছ বিভিন্ন হাদীছগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, তন্মধ্য হতে কিছু হাদীছ পাঠক সমীপে পেশ করা হল:
১ম হাদীছ : আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
رَايْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم اذَا قَامَ فِي الصَّلاةِ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يَكُونَا حَذْوَ مَنْكِبَيْهِ، وَكَانَ يَفْعَلُ ذَلِكَ حِينَ يُكَبِّرُ لِلرُّكُوعِ وَيَفْعَلُ ذَلِكَ اذَا رَفَعَ رَاسَهُ مِنَ الرُّكُوعِ …)
‘আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেছি, যখন তিনি ছালাতের জন্য দাঁড়াতেন, তখন উভয় হাত কাঁধ বরাবর উঠাতেন। আর তিনি যখন রুকূর জন্য তাকবীর বলতেন এবং রুকূ হতে মাথা উঠাতেন, তখনও এভাবে কাঁধ বরাবর হাত উঠাতেন ...’।[1]
২য় হাদীছ : মালেক ইবনে হুওয়াইরিছ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
انَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ اذَا كَبَّرَ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يُحَاذِىَ بِهِمَا اذُنَيْهِ وَاذَا رَكَعَ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يُحَاذِىَ بِهِمَا اذُ نَيْهِ
‘যখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছালাতের জন্য তাকবীর বলতেন, তখন কান বরাবর হাত উঠাতেন। এভাবে রুকূতে যাওয়ার সময়ও কান বরাবর হাত উঠাতেন’।[2]
৩য় হাদীছ : আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
انَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ اذَا كَبَّرَ لِلصَّلَاةِ حَذْوَ مَنْكِبَيْهِ، وَاذَا ارَادَ انْ يَرْكَعَ، وَاذَا رَفَعَ رَاسَهُ مِنَ الرُّكُوعِ، وَاذَا قَامَ مِنَ الرَّكْعَتَيْنِ فَعَلَ مِثْلَ ذَلِكَ.
‘নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ছালাত শুরুর তাকবীর বলতেন, তখন কাঁধ বরাবর হাত উঠাতেন। যখন রুকূতে যেতেন এবং রুকূ থেকে মাথা উঠাতেন, তখনও এভাবেই দু’হাত কাঁধ বরাবর উঠাতেন। আর চার রাক‘আত বিশিষ্ট ছালাতের দু’রাক‘আতের পর যখন দাঁড়াতেন, তখনও এভাবেই কাঁধ বরাবর হাত উঠাতেন’।[3]
রুকূতে যাওয়ার সময় ও রুকূ হতে উঠার সময় হাত উত্তোলন না করা প্রসঙ্গ :
প্রকৃতপক্ষে রুকূতে যাওয়ার সময় এবং রুকূ হতে উঠার সময় হাত উত্তোলন বা রাফউল ইয়াদায়েন করাই সুন্নাত। এ ব্যাপারে অনেক ছহীহ হাদীছ বিভিন্ন হাদীছ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, যার নমুনা আমরা দেখলাম। তারপরও আমাদের যে সকল ভাই একাজটি করেন না, তারা সুন্নাতের খেলাফ করেন। ফলে অনেক ছওয়াব থেকে মাহরূম হন। আর রুকূতে যাওয়ার সময় ও রুকূ হতে উঠার সময় হাত উত্তোলন না করার পক্ষে প্রদত্ত সকল হাদীছ দুর্বল। নিচে এ সংক্রান্ত হাদীছগুলোর পর্যালোচনা করা হলো:
১ম দলীল : আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:
الا اصَلِّى بِكُمْ صَلاةَ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ فَصَلَّى فَلَمْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ الا مَرَّةً.
‘আমি কি তোমাদেরকে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছালাত পড়ে দেখাব না? তারপর তিনি ছালাত পড়লেন, কিন্তু প্রথমবার ব্যতীত আর হাত উত্তোলন করলেন না’।[4]
হাদীছটির পর্যালোচনা :
(ক) ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর এ হাদীছ সম্বন্ধে বলেন,
قال أحمد بن حنبل عن يحي بن آدم، قال: نظرت في كتاب عبد الله بن إدريس ليس فيه: "ثم لم يعد" فهذا أصح.
‘আহমাদ ইবনে হাম্বল তাঁর উস্তাদ ইয়াহ্ইয়া ইবনে আদম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি এ হাদীছটি আব্দুল্লাহ ইবনে ইদরীসের কিতাবে দেখেছি। কিন্তু সেখানে ‘তারপর তিনি আর হাত উঠালেন না’ বাক্যটি নেই’।[5]
(খ) হাদীছটি আসলে যঈফ। এ সম্বন্ধে ইমাম আবুদাঊদ হাদীছটি বর্ণনার পরে বলেন, وليس هو بصحيح بهذا اللفظ ‘উল্লিখিত হাদীছটি এ শব্দে বিশুদ্ধ নয়’।[6]
(গ) ইমাম তিরমিযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
قال عبد الله بن مبارك: لم يثبت حديث ابن مسعود أن رسول الله صلى الله عليه وسلم لم يرفع يديه إلا أول مرة.
‘ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে ‘নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমবার ব্যতীত অন্য কোথাও হাত উঠাননি’ বাক্যযুক্ত এ হাদীছ প্রমাণিত নয়’।[7]
(ঘ) এ হাদীছ সম্বন্ধে ইমাম ইবনে আবু হাতেম বলেন,
هذا خطأ، وهم فيه الثوري.
‘এ মর্মে বর্ণিত হাদীছটি ভুল। আর এ হাত না উঠানোর ব্যাপারটা ছাউরীর ধারণা মাত্র। কারণ এ একই হাদীছ, অন্য সবাই এর বিপরীত বর্ননা করেছেন’।[8]
(ঙ) হাফেয ইবনে আব্দুল বার রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
أما حديث ابن مسعود.... فإن أبا داود قال: وليس بصحيح على هذا المعنى. وقال البزار فيه أيضا : إنه لا يثبت، ولا يحتج بمثله.
‘ইবনে মাসঊদের হাত উত্তোলন না করার ব্যাপারে বর্ণিত হাদীছ সম্বন্ধে ইমাম আবুদাঊদ বলেন, এ অর্থে (হাত না উঠানোর) অর্থে হাদীছটি ছহীহ নয়। এছাড়াও ইমাম আবুদাঊদ রাহিমাহুল্লাহ এ হাদীছটি বর্ণনার পরে বলেন, এ হাদীছটি ছহীহ প্রমাণিত নয়। ইমাম ইবনে বাযযার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এ হাদীছটি ছহীহ প্রমাণিত নয়। অতএব এ রকম হাদীছ দ্বারা দলীল পেশ করা যায় না’।[9]
(চ) আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী আল হানাফী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হাত না উঠানোর হাদীছের চেয়ে ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সহ অন্যান্য ছাহাবীর বর্ণিত হাত উঠানোর হাদীছ ছহীহ ও বেশী গ্রহণযোগ্য।[10]
২য় দলীল : ছাহাবী বারা ইবনে আযেব রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,
أنَّهُ رَآى رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم حِينَ افْتَتَحَ الصَّلاةَ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى حَاذَى بِهِمَا أُذُنَيْهِ، ثُمَّ لَمْ يَعُدْ إلَى شَيْءٍ مِنْ ذَلِكَ حَتَّى فَرَغَ مِنْ صَلاتِهِ
‘তিনি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ছালাতের শুরুতে দু’হাত কানের লতি বরাবর উঠাতে দেখেন। তারপর তিনি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত আর কোথাও এ রকম হাত উঠাতে দেখেননি’।[11]
হাদীছটির পর্যালোচনা :
(ক) এ হাদীছটিতে ইয়াযীদ ইবনে আবু যিয়াদ নামে একজন রাবী আছেন, তার সম্বন্ধে রিজাল শাস্ত্রের দুই প্রখ্যাত ইমাম আলী ইবনে ইয়াহ্ইয়া আল-মাদীনী এবং ইমাম ইয়াহ্ইয়া ইবনে মাঈন রাহিমাহুমাল্লাহ বলেন,
هو ضعيف الحديث لا يحتج بمثله
‘সে একজন দুর্বল রাবী। তার বর্ণিত হাদীছ দ্বারা প্রমাণ পেশ করা যাবে না’। [12]
(খ) তার সম্বন্ধে হাদীছের জগতের আরো দুই ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক ও ইমাম নাসাঈ রাহিমাহুমাল্লাহ বলেন,
ارم به. وقال النسائي: متروك الحد يث.
‘ইবনে মুবারক বলেন, তাকে গ্রহণ করো না, বরং প্রত্যাখ্যান কর। আর ইমাম নাসাঈ বলেন, সে হাদীছের ব্যাপারে পরিত্যাজ্য ও প্রত্যাখ্যাত’।[13]
৩য় উদাহরণ : ছালাতে নাভির নিচেহাত বাঁধা।
তাকবীরে তাহরীমার পরে ছালাতে কোথায় হাত বাঁধতে হবে, এ নিয়ে আমাদের দেশে ইখতিলাফ দেখা যায়। কিন্তু সত্য কথা বলতে কি, ছালাতে হাত নাভির উপর ও বুকের উপর বাঁধতে হবে। ছহীহ ও বিশুদ্ধ হাদীছে এটাই প্রমাণিত। পক্ষান্তরে নাভির নিচে হাত বাঁধার সকল হাদীছ যঈফ তথা দুর্বল ও ত্রুটিযুক্ত।
ছালাতে হাত বুকের উপর বাঁধার দলীলসমূহ :
১ম দলীল : সাহ্ল ইবনে সা‘দ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كَانَ النَّاسُ يُؤْمَرُونَ أَنْ يَضَعَ الرَّجُلُ الْيَدَ الْيُمْنَى عَلَى ذِرَاعِهِ الْيُسْرَى فِي الصَّلاةِ.
‘ছালাতে লোকদেরকে ডান হাত (কব্জি থেকে কনুই পর্যন্ত) বাম হাতের উপর রাখার নির্দেশ দেয়া হত’।[14]
২য় দলীল : ওয়াইল ইবনে হুযর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
عَنْ وَائِلِ بْنِ حُجْرٍ قَالَ:صَلَّيْتُ مَعَ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم ، وَوَضَعَ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى يَدِهِ الْيُسْرَى عَلَى صَدْرِهِ.
‘আমি নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছালাত আদায় করেছি। (আমি দেখেছি) নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকের উপর রাখলেন’।[15]
৩য় দলীল : ক্ববীছা ইবনে হুলব তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন,
رَايْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَنْصَرِفُ عَنْ يَمِينِهِ وَعَنْ يَسَارِهِ قَالَ وَرَايتُهُ يَضَعُ هَذِهِ عَلَى صَدرِهِ
‘আমি নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেছি, তিনি ছালাত শেষে ডান ও বাম উভয় দিক দিয়ে মুছল্লীদের দিকে মুখ করে বসতেন। আমি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আরো দেখেছি, তিনি ছালাতে হাত বুকের উপর রাখতেন’।[16]
৪র্থ দলীল : প্রখ্যাত তাবেঈ তাউস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَضَعُ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى يَدِهِ الْيُسْرَى ثُمَّ يَشُدُّ بَيْنَهُمَا عَلَى صَدْرِهِ وَهُوَ فِى الصَّلاةِ.
‘নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছালাতে বাম হাতের উপর ডান হাত রেখে দুই হাতকে শক্ত করে বাঁধতেন এবং বুকের উপরে রাখতেন’।[17]
নাভির নিচে হাত বাঁধা প্রসঙ্গ :
নাভির নিচে হাত বাঁধা প্রসঙ্গে যত হাদীছ বর্ণিত হয়েছে, সব হাদীছই দুর্বল ও ত্রুটিযুক্ত। নিচে হাদীছগুলো পর্যালোচনা করা হলো :
১ম হাদীছ : ওয়ায়েল ইবনে হুজুর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তার পিতা বলেন,
رَايْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَضَعَ يَمِينَهُ عَلَى شِمَالِهِ فِي الصَّلاةِ تَحْتَ السُّرَّةِ
‘আমি নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেছি যে, তিনি ছালাতে তাঁর বাম হাতের উপর ডান হাত রেখে নাভির নিচে রাখলেন’।[18]
হাদীছটির পর্যালোচনা :
(ক) হাদীছটি সম্বন্ধে প্রখ্যাত হানাফী মুহাদ্দিছ মুহাম্মাদ আলী নাইমাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
الإنصاف أن هذه الزيادة- أي تحت السرة_ مخالفة لرواية الثقات... فالحديث وإن كان صحيحاً من حيث السند ولكنه ضعيف من جهة المتن.
‘সত্য কথা বলতে কি উল্লিখিত হাদীছে ‘নাভির নিচে’ শব্দটি অতিরিক্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা সকল ছিক্বাহ তথা গ্রহণযোগ্য রাবীদের বর্ণনার বিপরীত। অতএব হাদীছটি সনদের দিক দিয়ে ছহীহ হলেও মতনের দিক দিয়ে দুর্বল’।[19]
(খ) হাদীছটি সম্বন্ধে আল্লামা মুহাম্মাদ হায়াত সিন্ধি রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
(( في زيادة –تحت السرة-نظر، بل هي غلط. منشأه السهو. فإني راجعت نسخة صحيحة من المصنف....إلا أنه ليس فيها تحت السرة...)
‘হাদীছে উল্লিখিত ‘নাভির নিচে’ শব্দটির ব্যাপারে কথা আছে। বরং এ শব্দটির বৃদ্ধিটা ভুল ও অসাবধানতার কারণে ঘটেছে। কারণ আমি মুছান্নাফে ইবনু আবী শায়বার বিশুদ্ধ কপি দেখেছি, পড়েছি। কিন্তু তাতে এ শব্দটির (নাভির নিচে) উল্লেখ নেই’।[20]
(গ) প্রখ্যাত হানাফী মুহাদ্দিছ বুখারীর ব্যাখ্যাকার আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
ويستدل علماءنا الحنفية بدلائل غير وثيقة
‘নাভির নিচে হাত বাঁধার ব্যাপারে আমাদের হানাফী আলেমরা যে প্রমাণ পেশ করেন, তা নির্ভরযোগ্য নয়’।[21]
২য় হাদীছ : আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ مِنَ السُّنَّةِ وَضْعَ الْكَفِّ عَلَى الْكَفِّ فِى الصَّلاةِ تَحْتَ السُّرَّةِ
‘ছালাতে কব্জির উপর কব্জি রেখে নাভির নিচে রাখা সুন্নাত’।[22]
হাদীছটির পর্যালোচনা :
(ক) হাদীছটিতে আব্দুর রহমান ইবনে ইসহাক আবু শায়বা আল-ওয়াসেতি নামে একজন রাবী (বর্ণনাকারী) আছেন। সকল ইমাম তাকে যঈফ বলেছেন।
(খ) উল্লিখিত রাবী সম্বন্ধে বলতে গিয়ে প্রখ্যাত হানাফী আলেম ইমাম যাইলাঈ আল-হানাফী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
قال فيه أحمد بن حنبل، وأبو حاتم: منكر الحديث.
‘উল্লিখিত রাবীর ব্যাপারে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ও আবু হাতেম বলেন, আব্দুর রহমান ইবনে ইসহাক মিথ্যা ও অগ্রহণযোগ্য হাদীছ বর্ণনা করেন। তার হাদীছ অগ্রহণযোগ্য’।[23]
(গ) উল্লিখিত রাবী সম্বন্ধে ইমাম ইয়াহ্ইয়া ইবনে মাঈন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ليس بشيء ‘তিনি কোন কিছুই নন (অগ্রহণযোগ্য)’ ।[24]
(ঘ) ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ উল্লিখিত রাবী সম্বন্ধে বলেন, فيه نظر ‘তার গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে আপত্তি আছে’।[25]
(ঙ) ইমাম বায়হাক্বী রাহিমাহুল্লাহ হাদীছটি সম্বন্ধে বলেন,
لم يثبت إسناده. تفرد به عبد الرحمن بن إسحاق الواسطي، وهو متروك.
‘উল্লিখিত হাদীছের সনদ ছহীহ প্রমাণিত নয়। আর আব্দুর রহমান ব্যতীত অন্য কেউ বর্ণনা করেননি। আর তিনি হচ্ছেন অগ্রহণযোগ্য’।[26]
(চ) হানাফী মুহাদ্দিছ আল্লামা আইনী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, إسناده غير صحيح. ‘উল্লিখিত হাদীছের সনদ ছহীহ নয়’।[27]
(ছ) ইমাম ইবনে হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, إسناده ضعيف‘হাদীছটির সনদ যঈফ’।[28]
(জ) ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘হাদীছটি সর্বসম্মতিতে যঈফ’।[29]
(ঝ) ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীছটি সম্বন্ধে বলেন, ضعيف ‘হাদীছটি যঈফ’।[30]
৩য় হাদীছ : আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
...تَعْجِيلِ الْفِطْرِ، وَتَاخِيرِ السَّحُورِ، وَوَضْعِ الْيُمْنَى عَلَى الْيُسْرَى فِي الصَّلاةِ تَحْتَ السُّرَّةِ.
‘তিনটি বিষয় নবুওয়াতের চরিত্র। সময় হওয়ার সাথে সাথে ইফতার করা, দেরী করে অর্থাৎ শেষ সময়ে সাহরী খাওয়া এবং ছালাতে বাম হাতের উপর ডান হাত রেখে নাভির নিচে বাঁধা’।[31]
হাদীছটির পর্যালোচনা :
(ক) হাদীছটি সম্বন্ধে বিশ্বখ্যাত মুহাদ্দিছ আব্দুর রহমান মুবারকপুরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, لم أقف على سند هذا الحديث ‘এ হাদীছের আমি কোন সনদ খুঁজে পাইনি’।[32]
(খ) হাদীছটি সম্বন্ধে আল্লামা আইনী আল হানাফী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
إنه رواه ابن حزم، فسنده غير معلوم لينظر فيه.
‘ইমাম ইবনে হাযম হাদীছটির কোন সনদ উল্লেখ ছাড়াই বর্ণনা করেছেন। অথচ হাদীছের রেওয়ায়েত গ্রহণ করতে হলে হাদীছের সনদ জানা হতে হবে, যাতে বুঝা যায় যে হাদীছটি কেমন’।[33]
(গ) হাদীছটি সম্বন্ধে মুহাদ্দিছ জাকারিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
لا أصل له بذكر الخصلة الأخيرة
‘হাদীছে উল্লিখিত শেষ বিষয় (নাভির নিচে বাঁধা) সম্বলিত হাদীছের কোন ভিত্তি নেই’।[34]
(ঘ) তাছাড়াও হাদীছটিতে বলা হয়েছে, সময় হওয়ার সাথে সাথে ইফতার করা। অথচ আমরা যারা এ হাদীছ দ্বারা দলীল পেশ করি, তারা তো হাদীছটি পূর্ণ মানছি না। কারণ আমরা সময় হওয়ার সাথে সাথে ইফতার করি না।
(চলবে)
[1]. বুখারী, হা/৭৩৫, ‘আযান’ অধ্যায়; মুসলিম, হা/৩৯০, ‘ছালাত’ অধ্যায়।
[2]. বুখারী, হা/৭৩৭, ‘আযান’ অধ্যায়; মুসলিম, হা/৩৯১, ‘ছালাত’ অধ্যায়।
[3]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৭১৭; ইবনে খুযায়মা, ১/২৯৪ পৃঃ; আবুদাঊদ, হা/৭৪৪; তিরমিযী, হা/৩৪২৩; ইবনে মাজাহ, হা/৮৬৪।
[4]. আবুদাঊদ, হা/৭৪৮; ‘ছালাত’ অধ্যায়; তিরমিযী, হা/২৫৭, ‘ছালাত’ অধ্যায়; নাসাঈ, ২/১৯৫ পৃঃ, ‘ছালাত শুরু’ অধ্যায়।
[5]. বুখারী, পৃঃ ৭, ‘রাফঊল ইয়াদায়েন’ অধ্যায়।
[6]. আবুদাঊদ, হা/৭৪৮; ‘ছালাত’ অধ্যায়; মুবারকপুরী, আবকারুল মিনান, পৃঃ ৬৮১।
[7]. তিরমিযী, ‘হাত উত্তোলন’ অধ্যায়; ইবনে আবদুল হাদী, তানকীহ আত-তাহফীক, ২/১৩৪ পৃঃ; আবকারুল মিনান, পৃঃ ৬৮১।
[8]. ইবনে আবু হাতেম, কিতাবুল ইলাল, ১/৯৬।
[9]. ইবনে আব্দুল বার, তামহীদ, ৯/২২০ পৃঃ।
[10]. আল্লামা আইনী, উমদাতুল কারী, ৬/১২০ পৃঃ।
[11]. সুনানে দারাকুৎনী, ১/২৯৩ পৃঃ।
[12]. ইবনুল জাউজী, আল-যু‘আফা, ২/১৩৬ পৃঃ; ইবনে আবদুল হাদী, তানকীহ, পৃঃ ১৩৫-১৩৭।
[13]. ইবনে হাজার, আত-তাহজীব, ১৩/২৮৮ পৃঃ; উকাইলী, আল-যু‘আফা, ৪/৩৮০ পৃঃ; বিস্তারিত দেখুন: তানকীহ, পৃঃ ১৩৫-১৩৭।
[14]. বুখারী, হা/৭৪০, ‘আযান’ অধ্যায়।
বিঃদ্রঃ আরবীতে যিরা‘আ শব্দের অর্থ- হাতের কুনুই থেকে নিয়ে মধ্যমা আঙ্গুলের আগা পর্যন্ত বুঝায়। কুরআন, হাদীছ সহ সব আরবী অভিধান দ্রষ্টব্য।
[15]. ছহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/৪৭৯।
[16]. মুসনাদে ইমাম আহমাদ, ৫/২২৬ পৃঃ; তিরমিযী, ২/৩২ পৃঃ; ইবনে মাজাহ, ১/২৬৬ পৃঃ; মুছান্নাফে ইবনু আবী শায়বা, ১/৩৯০ পৃঃ; দারাকুৎনী, ১/২৫৮ পৃঃ; বায়হাক্বী, ২/২৯ পৃঃ।
[17]. আবুদাঊদ, হা/৭৫৯, ১/৪৮১ পৃঃ; সুনানে বায়হাক্বী, হা/২৪২৫, ২/৩৪০ পৃঃ।
[18]. আবুদাঊদ, ‘ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা’ অধ্যায়; মুসনদে ইমাম আহমাদ ও মুসান্নাফে ইবনু আবী শায়বাহ।
[19]. নাঈমাবী, তালীকুল হাসান আলা আছার আল সুনান, ১/৬৯ পৃঃ।
[20]. মুহাম্মাদ হায়াত সিদ্ধি, ফাতহুল গফূর, পৃঃ ২০।
[21]. আইনী, উমদাতুল কারী, ৫/২৭৯ পৃঃ; মুকারকপুরী, আবকারুল মিনান, পৃঃ ৩৮০-৩৯৯।
[22]. আবুদাঊদ, হা/৭৫৬, ‘ছালাত’ অধ্যায়; আহমাদ, ১/১১০ পৃঃ; ইবনে শায়বাহ, ১/৩৯১ পৃঃ।
[23]. ইমাম জাইলাঈ, নাসবুর রায়া, ১/৩১৪ পৃঃ।
[24]. প্রাগুক্ত।
[25]. ইমাম বুখারী, আল-যু‘আফা আছ-ছগীর, পৃঃ ২৬৬।
[26]. ইমাম বায়হাক্বী, মা‘রেফাত আল-সুনান, ১/৪৯৯ পৃঃ।
[27]. আইনী, উমদাতুল কারী, ৫/২৮৯ পৃঃ; বিস্তারিত: মুবারকপুরী, আবকারুল মিনান, ৩৮০/৩৯৯ পৃঃ।
[28]. ইবনে হাজার, আদ-দেরায়াহ, ১/১২৮ পৃঃ; জাকারিয়া, তানকীহুল কালাম, পৃঃ ২৮৪-২৮৫।
[29]. ইমাম নববী, শরহে ছহীহ মুসলিম, ১/১৭৩ পৃঃ।
[30]. আলবানী, সিলসিলা যঈফাহ।
[31]. ইমাম বুখারী, আল-যু‘আফা আছ-ছগীর, পৃঃ ২৬৬।
[32]. মুবারকপুরী, তুহফাতুল আহওয়াজী, ১/২১৫ পৃঃ; মুবারকপুরী, আবকারুল মিনান, পৃঃ ৩৯৭।
[33]. আইনী, উমদাতুল কারী, ৫/২৮৯ পৃঃ।
[34]. জাকারিয়া গুলাম, তানকীহুল কালাম, পৃঃ ২৮৫।
