কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

সূরা নূরে বর্ণিত সামাজিক বিধানসমূহ (পর্ব-৫)

অপবাদ প্রদানকারীর তওবা :

বিদ্বানগণ অপবাদ প্রদানকারীর তওবা গ্রহণের ব্যাপারে দু’টি মত উল্লেখ করেছেন:

(ক) অপবাদ আরোপকারীর তওবা ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হবে না, যতক্ষণ না সে নিজেকে মিথ্যাবাদী বলে স্বীকার করে নেয় ঐ অপবাদের ব্যাপারে, যার কারণে অন্যকে শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। এমনটি বলেছেন সালাফদের একটি জামা‘আত; তাদের মধ্যে ওমর (রাঃ), ইমাম শাফেঈ (রহঃ), ইমাম আহমাদ (রহঃ) অন্যতম।

(খ) অপবাদ আরোপকারীর তওবা তার অবস্থাকে সুন্দর করবে ও তার আমলকে সংশোধন করবে, তার জন্য শুধু ইস্তিগফারই যথেষ্ট হবে, যদিও সে নিজেকে সে ব্যাপারে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। এমনটি বলেছেন ইমাম মালেক (রহঃ) ও আরো অনেকে।[1]

তবে ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) প্রথম মতটিকে শক্তিশালী হিসাবে গণ্য করেছেন। আর দ্বিতীয় মতটিকে দুর্বল হিসাবে উল্লেখ করেছেন।[2] তিনি আরো বলেন, অপবাদ আরোপকারীর তওবাটা হবে এ রকম যে, সে নিজেকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে। কেননা সে নিষ্কলুষ মুসলিম ব্যক্তির সম্মানহানি করেছে। সুতরাং সে নিজেকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা ছাড়া তার তৃওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। আর এটাই তো তওবার উদ্দেশ্য (অর্থাৎ নিজের অপরাধ স্বীকার করে নেয়া)। আর যারা বলে, শুধু আস্তাগফিরুল্লাহ বললেই তওবা গ্রহণযোগ্য হবে, তাদের একথা দুর্বল। কেননা এর মধ্যে অপবাদ আরোপকৃত ব্যক্তির কোন ফায়দা নেই। এর মাধ্যমে তার হারানো সম্মান ফিরে আসে না, যে বিষয়ে তাকে অপবাদ প্রদান করা হয়েছে। আর এর মাধ্যমে তওবার উদ্দেশ্যও সাধিত হয় না। কেননা এতে দু’টি হক্ব রয়েছে, একটি হাক্কুল্লাহ; তা হচ্ছে অপবাদ প্রদান কাজটি হারাম। আর এই হারাম কাজ করে ফেলার জন্য ইসেত্মগফার করা, লজ্জিত হওয়া ও এরূপ কর্ম আর না করার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প করা। দ্বিতীয়টি হাক্কুল ইবাদ, আর তা হচ্ছে সম্মানহানিকর যে কোন দোষ বান্দার সাথে সম্পৃক্ত করা।[3]

সুধী পাঠক! অন্যের প্রতি অপবাদ আরোপ করা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ। এ থেকে বেঁচে থাকা আমাদের একান্ত কর্তব্য। আর যদি ভুলক্রমে এমন কর্ম সংঘটিত হয়, তা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিকট থেকে ক্ষমা চেয়ে আল্লাহর নিকট তওবা করলে আশা করা যায়- আল্লাহ ক্ষমা করবেন। কেননা হাদীছে নববীতে এসেছে, ‘একজন মুসলিমের সম্মানহানি করা অন্য মুসলিমের উপর হারাম’।[4]

লি‘আন :

পারিবারিক জীবনে স্বামী-স্ত্রীর কেউ কারো বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনলে ক্ষেত্রে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য ইসলামী বিধান অনুযায়ী লি‘আন করা আবশ্যক। মহান আল্লাহ বলেন,

وَالَّذِيْنَ يَرْمُوْنَ أَزْوَاجَهُمْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُمْ شُهَدَاءُ إِلَّا أَنْفُسُهُمْ فَشَهَادَةُ أَحَدِهِمْ أَرْبَعُ شَهَادَاتٍ بِاللهِ إِنَّهُ لَمِنَ الصَّادِقِيْنَ - وَالْخَامِسَةُ أَنَّ لَعْنَتَ اللهِ عَلَيْهِ إِنْ كَانَ مِنَ الْكَاذِبِيْنَ - وَيَدْرَأُ عَنْهَا الْعَذَابَ أَنْ تَشْهَدَ أَرْبَعَ شَهَادَاتٍ بِاللهِ إِنَّهُ لَمِنَ الْكَاذِبِيْنَ - وَالْخَامِسَةَ أَنَّ غَضَبَ اللهِ عَلَيْهَا إِنْ كَانَ مِنَ الصَّادِقِيْنَ - وَلَوْلَا فَضْلُ اللهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ وَأَنَّ اللهَ تَوَّابٌ حَكِيْمٌ.

‘আর যারা নিজেদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে অথচ নিজেরা ব্যতীত তাদের কোন সাক্ষী নেই, তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য এই হবে যে, সে আল্লাহর নামে চারবার শপথ করে বলবে যে, সে অবশ্যই সত্যবাদী। আর পঞ্চমবারে বলবে যে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয়, তাহলে তার উপর নেমে আসবে আল্লাহর লা‘নত। তবে স্ত্রীর শাস্তি রহিত হবে- যদি সে চারবার আল্লাহর নামে শপথ করে সাক্ষ্য দেয় যে, তার স্বামীই মিথ্যাবাদী। আর পঞ্চমবারে বলে যে, তার স্বামী সত্যবাদী হলে তার নিজের উপর নেমে আসবে আল্লাহর গযব। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তোমাদের কেউ অব্যাহতি পেত না। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা গ্রহণকারী ও প্রজ্ঞাময়’ (নূর ৬-১০)

লি‘আনের পরিচয় :

لِعَانٌ শব্দটি لَاعَنَ يُلَاعِنُ বা باب مفاعلة এর মাছদার। যখন দু’জন পরস্পরকে আল্লাহর অভিশাপ দিয়ে বদ দু‘আ করে, তখন তাদের ক্ষেত্রে এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।[5]

لعان-এর পারিভাষিক অর্থ বর্ণনায় মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম আত-তুওয়াইজিরী বলেন,

اَللِّعَانُ هُوَ شَهَادَاتٌ مُؤَكَّدَاتٌ بِأَيْمَانٍ مِّنَ الْجَانِبَيْنِ مَقْرُوْنَةٌ بِلَعْنٍ مِّنَ الزَّوْجِ وَغَضَبٍ مَّنَ الزَّوْجَةِ، عِنْدَ الْحَاكِمِ أَوْ نَائِبِهِ.

‘লি‘আন হচ্ছে বিচারক বা তার প্রতিনিধির নিকট স্বামী-স্ত্রী উভয়ের পক্ষ থেকে কসম দ্বারা প্রত্যায়নকৃত কতিপয় সাক্ষ্যের নাম, যাতে স্বামীর পক্ষ হতে আল্লাহর লা‘নত এবং স্ত্রীর পক্ষ থেকে আল্লাহর গযব সংযুক্ত থাকে’।[6]

লি‘আনের আয়াত নাযিল হওয়ার কারণ :

ইমান নববী (রহঃ) বলেন, আলেমগণ লি‘আনের আয়াত নাযিলকে কেন্দ্র করে মতানৈক্য করেছেন যে, তা উওয়াইমির আল-আজলানী কেন্দ্রীক অবতীর্ণ হয়েছে, না হেলাল ইবনে উমাইয়্যাহকে কেন্দ্র করে অবতীর্ণ হয়েছে। কতিপয় বিদ্বান বলেন, লি‘আনের আয়াত উওয়াইমির আল-আজলানীকে কেন্দ্র করে অবতীর্ণ হয়েছে। তারা নবী করীম (ছাঃ)-এর বাণীর মাধ্যমে প্রমাণ পেশ করেছেন। নবী করীম (ছাঃ) উওয়াইমির আল-আজলানীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘এ বিধান আল্লাহ তোমাকে ও তোমার সহধর্মিণীকে কেন্দ্র করে অবতীর্ণ করেছেন’।

ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, জমহূর আলেমের নিকটে লি‘আনের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হেলাল ইবনে উমাইয়্যাহ-এর ঘটনা। তারাও হাদীছ দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছেন, যেটি ইমাম মুসলিম (রহঃ) হেলাল ইবনে উমাইয়্যাহর ঘটনা সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন’।[7] মাওয়ারদী (রহঃ) ‘আল-হাবী’ কিতাবে বলেন, হেলাল ইবনে উমাইয়্যাহর ঘটনা উওয়াইমির আল-আজলানীর ঘটনার আগের ঘটনা।

ইবনুছ ছব্বাগ (রহঃ) তার ‘আশ-শামেল’ গ্রন্থে হেলাল ইবনে উমাইয়্যাহর ঘটনা সম্পর্কে বলেন, একথা স্পষ্ট যে, আয়াতটি প্রথমে তার ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি বলেন, উওয়াইমির (রাঃ)-এর উদ্দেশ্যে নবী করীম (ছাঃ)-এর বাণী, إَنَّ اللهَ قَدْ أَنْزَلَ فِيْكَ وَفِيْ صَاحِبَتِكَ ‘তোমার এবং তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে আল্লাহ নাযিল করেছেন’-এর অর্থ হচ্ছে, এ বিধান শুধু হেলাল ইবনে উমাইয়্যাহর জন্য অবতীর্ণ হয়নি, কেননা এ হুকুমটি সকলের জন্য প্রযোজ্য’।[8]

ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, ‘হতে পারে আয়াতটি দু’জনকে কেন্দ্র করেই অবতীর্ণ হয়েছে। হয়তো তারা উভয়ই অল্প সময়ের ব্যবধানে এ সম্পর্কে নবী করীম (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আর আয়াত তাদের উভয়কে কেন্দ্র করে নাযিল হয়’।[9]

নিমেণ উভয়ের ঘটনা আলোকপাত করা হল-

উওয়াইমির আল-আজলানীর ঘটনা :

عَنِ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ السَّاعِدِىِّ أَخْبَرَهُ أَنَّ عُوَيْمِرًا الْعَجْلاَنِىَّ جَاءَ إِلَى عَاصِمِ بْنِ عَدِىٍّ الأَنْصَارِىِّ فَقَالَ لَهُ أَرَأَيْتَ يَا عَاصِمُ لَوْ أَنَّ رَجُلاً وَجَدَ مَعَ امْرَأَتِهِ رَجُلاً أَيَقْتُلُهُ فَتَقْتُلُوْنَهُ أَمْ كَيْفَ يَفْعَلُ فَسَلْ لِىْ عَنْ ذَلِكَ يَا عَاصِمُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَسَأَلَ عَاصِمٌ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَرِهَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَسَائِلَ وَعَابَهَا حَتَّى كَبُرَ عَلَى عَاصِمٍ مَا سَمِعَ مِنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمَّا رَجَعَ عَاصِمٌ إِلَى أَهْلِهِ جَاءَهُ عُوَيْمِرٌ فَقَالَ يَا عَاصِمُ مَاذَا قَالَ لَكَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ عَاصِمٌ لِعُوَيْمِرٍ لَمْ تَأْتِنِىْ بِخَيْرٍ قَدْ كَرِهَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَسْأَلَةَ الَّتِىْ سَأَلْتُهُ عَنْهَا قَالَ عُوَيْمِرٌ وَاللهِ لاَ أَنْتَهِى حَتَّى أَسْأَلَهُ عَنْهَا فَأَقْبَلَ عُوَيْمِرٌ حَتَّى أَتَى رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَسَطَ النَّاسِ فَقَالَ يَا رَسُوْلَ اللهِ أَرَأَيْتَ رَجُلاً وَجَدَ مَعَ امْرَأَتِهِ رَجُلاً أَيَقْتُلُهُ فَتَقْتُلُوْنَهُ أَمْ كَيْفَ يَفْعَلُ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدْ نَزَلَ فِيْكَ وَفِىْ صَاحِبَتِكَ فَاذْهَبْ فَأْتِ بِهَا. قَالَ سَهْلٌ فَتَلاَعَنَا وَأَنَا مَعَ النَّاسِ عِنْدَ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمَّا فَرَغَا قَالَ عُوَيْمِرٌ كَذَبْتُ عَلَيْهَا يَا رَسُوْلَ اللهِ إِنْ أَمْسَكْتُهَا. فَطَلَّقَهَا ثَلاَثًا قَبْلَ أَنْ يَأْمُرَهُ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.

সাহল ইবনু সা‘দ আস-সাঈদী (রাঃ) হতে বর্ণিত, উওয়াইমির আল-আজলানী (রাঃ) আছেম ইবনু আদী আনছারী (রাঃ)-এর কাছে এসে তাকে বললেন, হে আছেম! যদি কেউ তার স্ত্রীর সাথে অন্য কোন পুরুষকে (ব্যভিচারে লিপ্ত) পায়, তবে তোমার অভিমত কী? সে কি তাকে হত্যা করবে? আর তখন তো তোমরা তাকে (ক্বিছাছ হিসাবে) হত্যা করবে। যদি তা না হয়, তবে সে কী করবে? হে আছেম! তুমি আমার জন্য এ বিষয়ে রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস কর। তখন আছেম রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু রাসূল (ছাঃ) এ রকম প্রশ্ন করা অপসন্দ করলেন এবং এটি দূষণীয় মনে করলেন। আছেম রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট থেকে যা শুনলেন, তাতে বড়ই দুঃখিত হলেন। যখন আছেম ফিরে এলেন, তখন উওয়াইমির তার কাছে এসে বললেন, হে আছেম! রাসূল (ছাঃ) তোমাকে কী বলেছেন? আছেম উওয়াইমিরকে বললেন, তুমি আমার কাছে ভাল কথা নিয়ে আসনি। তুমি যে বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে বলেছ, তা রাসূল (ছাঃ) খুবই অপসন্দ করেছেন।

উওয়াইমির (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! আমি এ বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস না করে ক্ষান্ত হব না। তখন উওয়াইমির গেলেন এবং লোক সমাবেশে রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যদি কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীর সঙ্গে অন্য কোন পুরুষকে (ব্যভিচারে লিপ্ত) দেখতে পায়, তাহলে সে কি তাকে হত্যা করে ফেলবে? এরপর তো (ক্বিছাছ হিসাবে) আপনারা তাকে হত্যা করে ফেলবেন। অথবা সে কী করবে? তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, তোমার ও তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে (আল্লাহর) হুকুম নাযিল হয়েছে। তুমি যাও, তোমার স্ত্রীকে নিয়ে এসো।

সাহল বলেন, এরপর তারা উভয়ে (স্বামী-স্ত্রী) লি‘আন করল। আর আমিও তখন লোকজনদের সাথে রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট হাযির ছিলাম। যখন লি‘আন শেষ করলেন, তখন উওয়াইমির বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমি তাকে আমার স্ত্রী হিসাবে রেখে দিই, তাহলে তো আমি তার উপর মিথ্যারোপকারী হয়ে গেলাম। তখন রাসূল (ছাঃ) তাকে নির্দেশ দেওয়ার আগেই তিনি তার স্ত্রীকে তিন তালাক্ব দিলেন’।[10]

হেলাল ইবনে উমাইয়্যাহ-এর ঘটনা :

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ هِلاَلَ بْنَ أُمَيَّةَ قَذَفَ امْرَأَتَهُ عِنْدَ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِشَرِيْكِ بْنِ سَحْمَاءَ فَقَالَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْبَيِّنَةَ أَوْ حَدٌّ فِىْ ظَهْرِكَ فَقَالَ يَا رَسُوْلَ اللهِ إِذَا رَأَى أَحَدُنَا عَلَى امْرَأَتِهِ رَجُلاً يَنْطَلِقُ يَلْتَمِسُ الْبَيِّنَةَ فَجَعَلَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ الْبَيِّنَةَ وَإِلَّا حَدٌّ فِىْ ظَهْرِكَ فَقَالَ هِلاَلٌ وَالَّذِىْ بَعَثَكَ بِالْحَقِّ إِنِّى لَصَادِقٌ فَلَيُنْزِلَنَّ اللهُ مَا يُبَرِّئُ ظَهْرِىْ مِنَ الْحَدِّ فَنَزَلَ جِبْرِيْلُ وَأَنْزَلَ عَلَيْهِ (وَالَّذِيْنَ يَرْمُوْنَ أَزْوَاجَهُمْ) فَقَرَأَ حَتَّى بَلَغَ (إِنْ كَانَ مِنَ الصَّادِقِيْنَ) فَانْصَرَفَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَرْسَلَ إِلَيْهَا فَجَاءَ هِلاَلٌ فَشَهِدَ وَالنَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ إِنَّ اللهَ يَعْلَمُ أَنَّ أَحَدَكُمَا كَاذِبٌ فَهَلْ مِنْكُمَا تَائِبٌ ثُمَّ قَامَتْ فَشَهِدَتْ فَلَمَّا كَانَتْ عِنْدَ الْخَامِسَةِ وَقَّفُوْهَا وَقَالُوْا إِنَّهَا مُوْجِبَةٌ قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ فَتَلَكَّأَتْ وَنَكَصَتْ حَتَّى ظَنَنَّا أَنَّهَا تَرْجِعُ ثُمَّ قَالَتْ لاَ أَفْضَحُ قَوْمِىْ سَائِرَ الْيَوْمِ فَمَضَتْ فَقَالَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَبْصِرُوْهَا فَإِنْ جَاءَتْ بِهِ أَكْحَلَ الْعَيْنَيْنِ سَابِغَ الأَلْيَتَيْنِ خَدَلَّجَ السَّاقَيْنِ فَهْوَ لِشَرِيْكِ بْنِ سَحْمَاءَ فَجَاءَتْ بِهِ كَذَلِكَ فَقَالَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَوْلاَ مَا مَضَى مِنْ كِتَابِ اللهِ لَكَانَ لِىْ وَلَهَا شَأْنٌ.

ইবনু আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, হেলাল ইবনু উমাইয়্যাহ রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে শারীক ইবনু সাহমার সঙ্গে তার স্ত্রী ব্যভিচারের অভিযোগ করল। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, ‘সাক্ষী (হাযির কর) নতুবা শাস্তি তোমার পিঠে পড়বে। হেলাল বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যখন আমাদের কেউ তার স্ত্রীর উপর অন্য কাউকে দেখে, তখন সে কি সাক্ষী তালাশ করতে যাবে? তখন নবী করীম (ছাঃ) বলতে লাগলেন, সাক্ষী নতুবা শাস্তি তোমার পিঠে। হেলাল বললেন, শপথ সে সত্তার, যিনি আপনাকে সত্য নবী হিসাবে পাঠিয়েছেন, নিশ্চয়ই আমি সত্যবাদী। অবশ্যই আল্লাহ তা‘আলা এমন বিধান অবতীর্ণ করবেন, যা আমার পিঠকে শাস্তি থেকে মুক্ত করে দিবে।

তারপর জিবরীল (আঃ) এলেন এবং রাসূল (ছাঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করা হল, ‘যারা নিজেদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে’ থেকে নবী করীম (ছাঃ) পাঠ করলেন, ‘যদি সে সত্যবাদী হয়ে থাকে’ পযমর্ত্ম। তারপর নবী করীম (ছাঃ) ফিরলেন এবং তার স্ত্রীকে ডেকে আনার জন্য লোক পাঠালেন। হেলাল এসে সাক্ষ্য দিলেন। আর রাসূল (ছাঃ) বলছিলেন, আল্লাহ তা‘আলা তো জানেন যে, তোমাদের দু’জনের মধ্যে অবশ্যই একজন মিথ্যাচারী। তবে কি তোমাদের মধ্যে কেউ তওবা করবে? স্ত্রী লোকটি দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিল। সে যখন পঞ্চমবারের কাছে পৌঁছল, তখন লোকেরা তাকে বাধা দিল এবং বলল, নিশ্চয়ই এটি তোমার উপর অবশ্যম্ভাবী। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, এ কথা শুনে সে দ্বিধাগ্রস্ত হল এবং ইতস্তত করতে লাগল। এমনকি আমরা মনে করতে লাগলাম যে, সে নিশ্চয়ই প্রত্যাবর্তন করবে। পরে সে বলে উঠল, আমি চিরকালের জন্য আমার বংশকে কলুষিত করব না। অতঃপর সে তার সাক্ষ্য পূর্ণ করল।

নবী করীম (ছাঃ) বললেন, এর প্রতি দৃষ্টি রেখ, যদি সে কাল ডাগর চক্ষু, বড় নিতম্ব ও মোটা নলা বিশিষ্ট সন্তান প্রসব করে, তবে ও সন্তান শারীক ইবনু সাহমার। পরে সে ঐরূপ সন্তান জন্ম দিল। তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, যদি এ বিষয়ে আল্লাহর কিতাব কার্যকর না হত, তাহলে অবশ্যই আমার ও তার মধ্যে কী ব্যাপার যে ঘটত’।[11]

লি‘আন সংঘটিত হওয়ার সময় :

এ কথা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, দুই অবস্থায় লি‘আন আবশ্যক হয়ে পড়ে:

প্রথম অবস্থা : যখন কোন পুরুষ তার স্ত্রীর উপর ব্যভিচারের অভিযোগ আনে আর সে অভিযোগের স্বপক্ষে চারজন সাক্ষী না থাকে, তখন লি‘আন আবশ্যক হয়।

দ্বিতীয় অবস্থা : যখন কোন পুরুষ তার স্ত্রীর গর্ভের সন্তান অস্বীকার করে, তখন লি‘আন আবশ্যক হয়।[12]

লি‘আনের শর্তসমূহ :

(১) রাষ্ট্রপতি বা প্রশাসক কিংবা তাদের প্রতিনিধির সম্মুখে প্রাপ্ত বয়স্ক স্বামী-স্ত্রীর মাঝে লি‘আন সংঘটিত হতে হবে।

(২) লি‘আনের পূর্বে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর প্রতি ব্যভিচারের অভিযোগ থাকতে হবে।

(৩) স্বামীর এ অপবাদকে স্ত্রীর অস্বীকার এবং লি‘আন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত স্বীর মতের উপর অটল তাকবে।[13]

লি‘আনের পদ্ধতি :

(১) সর্বপ্রথম স্বামী চারবার বলবে, আমি আল্লাহর কসম করে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমার এই স্ত্রীকে যেনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার যে অপবাদ আরোপ করছি, সে বিষয়ে আমি সত্যবাদী। স্ত্রী উপস্থিত থাকলে তার দিকে ইঙ্গিত করবে। আর পঞ্চমবার উক্ত সাক্ষ্য-এর সাথে আরো বৃদ্ধি করে বলবে, أَنَّ لَعْنَتَ اللهِ عَلَيْهِ إِنْ كَانَ مِنَ الْكَاذِبِيْنَ ‘সে যদি মিথ্যাবদী হয়, তাহলে তার উপর আল্লাহর লা‘নত বর্ষিত হবে’ (নূর ৭)

(২) অতঃপর স্ত্রী চারবার বলবে, আমি আল্লাহর কসম করে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাকে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার যে অপবাদ দিয়েছে, তাতে সে মিথ্যাবাদী। আর পঞ্চমবার উক্ত সাক্ষ্যের সাথে আরো বৃদ্ধি করে বলবে,أَنَّ غَضَبَ اللهِ عَلَيْهَا إِنْ كَانَ مِنَ الصَّادِقِيْنَ ‘যদি সে (স্বামী) সত্যবাদী হয়, তাহলে তার (স্ত্রীর) প্রতি আল্লাহর গযব পতিত হবে’ (নূর ২৪/৯)[14]

লি‘আনের মাধ্যমে যা বর্তাবে :

লি‘আন সম্পন্ন হলে পাঁচটি হুকুম সাব্যস্ত হবে:

(১) স্বামীর উপর থেকে মিথ্যা অপবাদের শাস্তি রহিত হবে।

(২) স্ত্রী ব্যভিচারের শাস্তি রজম হতে মুক্তি পাবে।

(৩) উভয়ের মাঝে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

(৪) উভয়ে এক অপরের জন্য চিরস্থায়ীভাবে হারাম হয়ে যাবে।

(৫) যদি কোন সন্তান হয়, তাহলে সে সন্তান স্বামী পাবে না এবং স্ত্রী পাবে।[15]

 (চলবে)


[1]. ফাতহুল ক্বাদীর, ৪/১১-১২।

[2]. বাকর আবু যায়েদ, আল হুদূদ ওয়াত তা‘যিরাত ইনদা ইবনিল ক্বাইয়িম, (দারুল আছেমাহ, রিয়াদ, দ্বিতীয় প্রকাশ, ১৪১৫ হিঃ), পৃঃ ২৪৪।

[3]. প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৪৫-৪৬।

[4]. তিরমিযী, হা/১৯২৭, সনদ ছহীহ।

[5]. দ্রষ্টব্য: আল-মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিইয়্যাতুল কুয়েতিইয়্যাহ, ৭/২৪৯।

[6]. মুখতাছারুল ফিক্বহিল ইসলামী, ১/৮৪৮।

[7]. শারহুন নববী ‘আলা মুসলিম, ১০/১১৯।

[8]. শারহুন নববী ‘আলা মুসলিম, ১০/১২০।

[9]. প্রাগুক্ত।

[10]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৯২।

[11]. ছহীহ বুখারী হা/৪৭৪৭।

[12]. সাইয়্যেদ সাবেক্ব, ফিক্বহুস-সুন্নাহ, ২/২৭১ (প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ১৯৮৮)।

[13]. মুখতাছারুল ফিক্বহিল ইসলামী, ১/৮৪৮।

[14]. মুখতাছারুল ফিক্বহিল ইসলামী, ১/৮৪৯।

[15]. প্রাগুক্ত, ১/৮৪৯।

Magazine