ভূমিকা : বর্তমান বিশ্বে যতগুলো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল রয়েছে, তার মধ্যে কাশ্মীর অন্যতম। বর্তমানে পারমাণবিক শক্তিধর তিনটি দেশই কাশ্মীরের বিভিন্ন অংশ শাসন করে আসছে। ভারত শাসন করছে জম্মু, কাশ্মীর উপত্যকা, লাদাখ ও সিয়াচেন হিমবাহ। পাকিস্তান শাসন করছে আযাদ কাশ্মীর ও গিরগিট বালতিস্তান এবং চীন শাসন করছে ডেমচক যেলা, শাকসগাম উপত্যকা ও আকসাই অঞ্চল। সে হিসেবে ভারতের দখলে আছে ৪৩% এলাকা, পাকিস্তানের দখলে আছে ৩৭% এলাকা এবং চীনের দখলে আছে ২০% এলাকা। কিন্তু তারপরেও এই অঞ্চলকে নিয়ে অস্থিরতা কমেনি।
সঙ্ঘ পরিবারের মহাপরিকল্পনা : ভারতের সঙ্ঘ পরিবারের যে মহা পরিকল্পনা, তার একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল কাশ্মীর। এ মহা পরিকল্পনা অনুসারে ২০২৮ সাল নাগাদ ভারতকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা হবে।[1] এ ক্ষেত্রে মডেল ধরা হয়েছে ইসরাঈলকে। ইসরাঈলে ফিলিস্তীনি আরবদের বসবাস রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের ইয়াহূদী নাগরিকরা যে অধিকার ভোগ করে, সেই অধিকার আরবরা পায় না। সেখানে অ-ইয়াহূদীদের কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে আরএসএস প্রধান মোহন ভগবত বলেছেন, ‘ভারতীয়দের প্রধান পরিচয় হবে হিন্দুত্ব। অন্য ধর্মের বিশ্বাসীরাও ভারতের নাগরিক হিসাবে থাকতে পারবেন। তবে তাদেরকে হিন্দুত্বের ভাবাদর্শ ও পরিচয়কে মেনে নিয়ে এখানে থাকতে হবে’। এ মহা পরিকল্পনার একটি প্রধান দিক হল, জনমিতির পুনর্বিন্যাস। ভারতের যেসব অঞ্চলে অহিন্দু সংখ্যা গরিষ্ঠতা রয়েছে, সেখানে হিন্দুদের সংখ্যা গরিষ্ঠতা তৈরি করা। আর পুরো রাজ্য ছাড়াও বিভিন্ন রাজ্যের অভ্যন্তরে যেসব অঞ্চলে অহিন্দুরা জনপ্রতিনিধি, নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করে সেখানকার জনবিন্যাসও পাল্টে দেওয়া। এ লক্ষ্যে আসাম, পশ্চিম বঙ্গ, উত্তর প্রদেশ, বিহার ও দক্ষিণের কয়েকটি রাজ্যকে প্রথম টার্গেট করা হয়েছে। এরপর অন্য রাজ্যগুলোকে বিবেচনায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সেই সাথে বিজেপি বা সঙ্ঘ পরিবারের লক্ষ্য অর্জনে শাসন বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি সামাজিক কর্তৃত্বের জন্য শিক্ষার কারিকুলাম এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গন: নাটক, সিনেমা ইত্যাদি ক্ষেত্রে হিন্দুত্ববাদী দর্শনের ব্যাপক প্রচার-প্রসার ও প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্পষ্ট আভাস : বিজেপি বা সঙ্ঘ পরিবারের লক্ষ্য যে শুধু ভারত নয়, তা অনেকটাই স্পষ্ট করে দিয়েছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের লক্ষ্য পুরো জম্মু-কাশ্মীর ও আকসাই চীন। সবটাই ভারতের অংশ’। জম্মু ও কাশ্মীরের ভারত নিয়ন্ত্রিত অংশে কেন্দ্রীয় শাসন জারির পর আযাদ কাশ্মীর আর আকসাই চীন দখলের প্রচেষ্টা চালানোর কথাই বলতে চেয়েছেন অমিত শাহ। পুলওয়ামার ঘটনার পর পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলা চালানোর মধ্য দিয়েও সেই বার্তা দিতে চেয়েছিল ভারত। কিন্তু সেই পদক্ষেপ ‘ব্যাকফায়ার’ করায় তখন আর বেশি দূর আগানো যায়নি। এখন নতুন পদক্ষেপের পর তেমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এ কারণে কাশ্মীরের ব্যাপারে ভারত যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা মোকাবেলায় ‘সম্ভাব্য’ সব কিছু করার ঘোষণাও দিয়েছে পাকিস্তান।
কাশ্মীরীদের কান্না : ভারতবর্ষ বিভাজনের সময় জম্মু ও কাশ্মীর একটি অখণ্ড দেশীয় রাজ্য ছিল। এ দেশীয় রাজ্যটির তৎকালীন মহারাজা হরি সিং রাজ্যটির জনমানুষের ইচ্ছা ও স্বার্থের পরিপন্থী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে আজ রাজ্যটি ত্রিধাবিভক্ত হয়ে এর ৪৩, ৩৭ ও ২০ শতাংশ যথাক্রমে ভারত, পাকিস্তান ও চীনের নিয়ন্ত্রণে।
কাশ্মীর এই উপমহাদেশের বুকে এমনই এক ভাগ্যবিড়ম্বিত জনপদ, যেখানকার মানুষ সুদীর্ঘ অর্ধশতাব্দীরও অধিককাল ধরে আযাদীর জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি কাশ্মীরে হাযারো মুসলিম নারীর লুণ্ঠিত সম্ভ্রম, নির্যাতিত মুজাহিদদের হাহাকার, স্বাধীনতাকামী তরুণ-যুবকদের আর্তচিৎকারের মাঝেও প্রতিনিয়ত আকুল আওয়ায ওঠে স্বাধীনতার। সম্প্রতি খবরে এসেছে, ভারত শাসিত কাশ্মীরে অবৈধভাবে শিশুদের পর্যন্ত আটক করছে পুলিশ।[2] অথচ বিশ্ব বিবেক কাশ্মীরের ব্যাপারে এখনও মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে।
শুধু তাই নয়, পাশ্চাত্য ইয়াহূদীবাদী এবং ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদী মিডিয়া কাশ্মীরী জনতার এই আযাদী আন্দোলনকে সন্ত্রাস, বিচ্ছিন্নতাবাদ অ্যাখ্যা দিয়ে বিশ্ববাসীকে ধোঁকা দিয়ে চলেছে। তাই কাশ্মীরের যমীনে হাযারো শহীদের খুন, সেখানকার সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলিমদের কুরবানী, আযাদীর জন্য তাদের হাহাকার, তাদের সংগ্রাম চাপা পড়ে যাচ্ছে।[3] কাশ্মীরীদের এই কান্নার শেষ কোথায়? বা কোনদিন তাদের এই কান্না থামবে? তার সদুত্তর পাওয়ার নিশ্চয়তাটুকুও নেই।
৩৭০ ধারা বাতিল ও অকার্যকর : ভারতীয় সংবিধানে আর্টিকেল ৩৭০ যুক্ত করে তাতে জম্মু-কাশ্মীরকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় সংবিধানের শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে, The constitution applies to the state of Jammu and Kashmir with cartain exceptions and modifications as praided in article 370 and the constitutions (Application to Jammu and Kashmir) order, 1954.[4]
১৯৫৭ সালে কাশ্মীর আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং দেশটির সংবিধানের অনুচ্ছেদ নম্বর ৩৭০ এ অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি অকাশ্মীরী ভারতীয়দের তথায় ভূমি ক্রয়ের অধিকার হরণ করা হয়। চলতি ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারতের রাষ্ট্রপতি দেশটির সংবিধানের ধারা ৩৭০ এবং ৩৫(ক) অকার্যকর করে মূলত: জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা খর্ব করেন। ধারা দু’টি অকার্যকরের ফলে জম্মু ও কাশ্মীর পৃথক রাজ্যের মর্যাদা হারিয়ে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়। ভারত সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলেও ভারতের বর্তমান বিজেপি সরকার হিন্দুত্ববাদ মতাদর্শের উত্থানে একনিষ্ঠভাবে কাজ করে চলেছে। এ বার্তার মধ্য দিয়ে সেটিই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসে। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত জম্মু ও কাশ্মীরে স্বাধীনতাকামীদের সাথে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ তিন গুণ বেড়ে যায়।[5]
জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের হাইকোর্টের রায় : ভারতের দাবি, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভারতের এই দাবিকে অসার প্রমাণ করে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের হাইকোর্ট। বছর দুয়েক আগে দেয়া এক রায়ে স্পষ্ট করে বলে-জম্মু ও কাশ্মীর কখনোই ভারতের অংশ ছিল না এবং এখনো এর অংশ নয়। এই রায়ে আদালত বলেছে, ভারতের সংবিধানে জম্মু ও কাশ্মীরকে সীমিত সার্বভৌম ভূ-খণ্ডের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি হাসনাইন মাসুদি ও বিচারপতি জনক রাজ কোতয়ালের ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় দিয়েছেন। এই দুই বিচারপতির দেওয়া ৬০ পৃষ্ঠার এই রায়ে বলা হয়েছে, ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদে এই রাজ্যকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে; যা সংশোধন, বাতিল বা রদ করা যাবে না। আদালত বলেছে, সংবিধানের ৩৫(ক) অনুচ্ছেদের বিদ্যমান আইনে কাশ্মীরকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। সংবিধানে ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদকে অস্থায়ী বিধান হিসাবে উল্লেখ করা হলেও একবিংশ ধারায় এটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ধারা সংবিধানে, ৩৭০ নম্বর ধারাকে ‘স্থায়ী’, ‘অপরিবর্তনশীল বিশেষ বিধান’ নাম স্থায়ী স্থান করে নিয়েছে। আইনসভায় এটি সংশোধন, বাতিল বা রদ করা যাবে না। এরপরও বিজেপি সরকার গায়ের জোরের অনেকটা গোঁয়ার্তুমি করে সম্প্রতি বাতিল করে দিয়েছে।
উপসংহার : ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর ভারতের একমাত্র রাজ্য; যেখানে মুসলিম জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ। ভারতবর্ষ বিভাজন-পরবর্তী রাজ্যটির মুসলিম জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ভাবে অত্যাচার ও নিষ্পেষণের শিকার হওয়ার কারণে তারা ক্রমেই ভারত বিদ্বেষী হয়ে ওঠে এবং ১৯৮০-পরবর্তীকালে তা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ কথাটি অনস্বীকার্য যে, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে জাতিসংঘের গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী গণভোটের ব্যবস্থা করা হলে রাজ্যটির জনমানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ স্বাধীনতা অথবা পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভুক্তির সপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করবে।
[1]. মাসুম খলীলী, কাশ্মির সঙ্ঘাতের শেষ কোথায়? দৈনিক নয়া দিগন্ত; ৮ আগস্ট, ২০১৯।
[2]. বিবিসি বাংলা, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯।
[3]. সমর ইসলাম, কাশ্মীরের কান্না (ঢাকা: বইঘর প্রকাশনী, পঞ্চম সংস্করণ-২০১৭), পৃঃ ১১।
[4]. জাকারিয়া পলাশ, কাশ্মীর ইতিহাস ও রাজনীতি (ঢাকা: সূচীপত্র প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারী-২০১৭), পৃঃ ৬৫।
[5]. জি. মুনীর, ইতিহাসের কাশ্মীর, দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১৯ আগস্ট, ২০১৯।
