আল-হামদুলিল্লাহি ওয়াহদাহ ওয়াছ ছালাতু ওয়াস সালামু আলা মান লা নাবিয়্যা বা‘দাহ। পাঠক সমাজ অবগত আছেন যে, ছহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ মিন্নাতুল বারীর (১ম খণ্ডে) আমরা ইমাম বুখারীর জীবনী তাহক্বীক্বসহ ও ছহীহ বুখারীর পরিচয় সংক্রান্ত বিস্তারতি আলোচনা করেছি। ফালিল্লাহিল হাম্দ। আজকের এই লেখার মাধ্যমে আমরা ছহীহ বুখারীর হাদীছ সমূহের ব্যাখ্যার অবতারণা করতে যাচ্ছি। দীর্ঘ বিরতির পর মহান আল্লাহ আমাদেরকে ছহীহ বুখারীর মূল হাদীছের ব্যাখ্যার কাজ শুরু করার তাওফীক্ব দান করেছেন সেজন্য সর্বাগ্রে তার শুকরিয়া আদায় করছি, আল-হামদুলিল্লাহ। শান্তির বারিধারা অবতীর্ণ হোক মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর। এই লেখায় হাদীছের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আমাদের অনুসরণীয় পদ্ধতি হবে নিম্নরূপ :
১. হাদীছের সঠিক ও সরল অনুবাদ।
২. হাদীছের তাখরীজ।
৩. রাবীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়।
৪. সনদের সূক্ষ্মতা।
৫. কঠিন ও অপরিচিত শব্দের অর্থ।
৬. হাদীছের ফিক্বহী ব্যাখ্যা। মতভেদপূর্ণ মাসআলা-মাসায়েলে তাহক্বীক্বী বা বিশ্লেষণমূলক আলোচনা।
৭. হাদীছের সারর্মম ও শিক্ষা।
মূল হাদীছের ব্যাখ্যায় যাওয়ার পূর্বে আমাদের জানা থাকা যরূরী যে, ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ কোনরূপ হাম্দ-ছানা ছাড়াই তার গ্রন্থ শুরু করেছেন। এটা নিয়ে অনেকেই অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। কেননা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীছ হচ্ছে,
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كُلُّ أَمْرٍ ذِيْ بَالٍ لَا يُبْدَأُ فِيْهِ بِالْحَمْدِ أَقْطَعُ.
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘প্রত্যেক যে কাজ মহান আল্লাহ্র প্রশংসা ছাড়াই শুরু করা হয়, তা অসম্পূর্ণ’।[1]
উল্লেখ্য, মুসনাদে আহমাদের[2] বর্ণনায় প্রশংসার জায়গায় আল্লাহ্র যিকিরের কথা বলা হয়েছে।
অভিযোগ উত্থাপনকারীদের দাবী অনুযায়ী এই হাদীছের অনুসরণে ইমাম বুখারীর উচিত ছিল, হাম্দ ও ছানার মাধ্যমে গ্রন্থটি আরম্ভ করা। আমরা অভিযোগের বাস্তবতা বিশ্লেষণের আগে হাদীছটির তাহক্বীক্ব দেখে নিই।
হাদীছের তাহক্বীক্ব : এই হাদীছে দু’টি ত্রুটি আছে:
প্রথম ত্রুটি : হাদীছের রাবী কুররা ইবনে আব্দুর রহমান। তার বিষয় নিয়ে রিজালশাস্ত্রবিদগণের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়। নিমেণ বিস্তারিত আলোকপাত করা হল:
যারা দুর্বল বলেছেন :
(১) ইমাম আহমাদ বলেন, مُنكر الحَدِيث جدًّا ‘তিনি মুনকারুল হাদীছ রাবী’।[3]
(২) ইমাম আবু যুর‘আ আর-রাযী বলেন,الْأَحَادِيث الَّتِيْ يَرْوِيهَا مَنَاكِير ‘তিনি যে হাদীছগুলো বর্ণনা করেন, সেগুলো মুনকার’।[4]
(৩) ইমাম আবু হাতিম বলেন, لَيْسَ بِقَوي ‘তিনি মযবূত নন’।[5]
(৪) ইমাম দারাকুৎনী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَقُرَّةُ لَيْسَ بِقَوِيٍّ فِيْ الْحَدِيْثِ ‘কুররা হাদীছে মযবূত নন’।[6]
যারা তাকে মযবূত বলেছেন :
অনেকেই তাকে মযবূতও বলেছেন। যেমন-
(১) ইমাম ইবনু হিববান তাকে তার কিতাবুছ ছিক্বাত-এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন।[7]
(২) ইমাম আওযাঈ বলেন,ما أحد أعلم بالزُّهْرِيّ من قرة بْن عَبْد الرَّحْمَنِ ‘ইমাম যুহরীর বিষয়ে সবচেয়ে বেশী অবগত হচ্ছেন, কুররা ইবনে আব্দুর রহমান’।[8]
ব্যাখ্যা : ইমাম আওযাঈর একথায় বাহ্যিকভাবে মনে হচ্ছে যে, কুররা একজন মযবূত রাবী কিন্তু বাস্তবতা বিশেস্নষণ করলে বুঝা যায় যে, কারো বিষয়ে জানা আর কারো হাদীছ ভালভাবে মুখস্থ রাখা এক বিষয় নয়। এজন্য ইমাম ইবনু হিববান বলেন,
وَكَيْف يكون قُرَّة بْن عَبْد الرَّحْمَنِ أعلم النَّاس بالزهري وكل شَيْء روى عَنْهُ لَا يكون سِتِّينَ حَدِيثا بل أتقن النَّاس فِي الزُّهْرِيّ مَالك وَمعمر والزبيدي وَيُونُس وَعقيل وَابْن عُيَيْنَة.
‘কীভাবে কুররা যুহরীর হাদীছ বিষয়ে সবচেয়ে বেশী অবগত হতে পারেন, অথচ তিনি সর্বসাকুল্যে যুহরী থেকে মাত্র ৬০টি হাদীছও বর্ণনা করেননি। বরং যুহরীর হাদীছ বিষয়ে সবচেয়ে অবগত হচ্ছেন মালেক, মা‘মার, যুবায়দী, ইউনুস, উকাইল, ও ইবনু উয়ায়না’।[9] হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী বলেন,
أن مراد الأوزاعي أنه أعلم بحال الزهري من غيره لا فيما يرجع إلى ضبط الحديث ، وهذا هو اللائق.
‘ইমাম আওযাঈর উদ্দেশ্য এটা নয় যে, কুররা ইমাম যুহরীর হাদীছ ভাল মুখস্থ রাখতেন, বরং তার উদ্দেশ্য হচ্ছে তিনি ইমাম যুহরীর জীবনী বিষয়ে ভাল জ্ঞান রাখতেন। আর এই ব্যাখ্যাটাই বেশী বাস্তবসম্মত।[10]
(৩) ইমাম ইবনু আদী বলেন,
ولقرة أحاديث صالحة يرويها عنه رشدين ، وسويد بن عبد العزيز وابن وهب والأوزاعي وغيرهم ولم أر في حديثه حديثا منكرا جدا فأذكره وأرجو أنه لا بأس به.
‘কুররা থেকে রিশদীন, আওযাঈ, সুওয়াইদ ও ইবনু ওহাব ত্রুটিমুক্ত হাদীছ বর্ণনা করে থাকেন। আর আমি তার হাদীছের মধ্যে অত্যধিক মুনকার হাদীছ পাইনি। আমি আশা করি, তার হাদীছে কোন সমস্যা নেই’।[11]
ব্যাখ্যা : ইমাম ইবনু আদীর এই মন্তব্যে লক্ষণীয় হচ্ছে, তিনি অত্যধিক মুনকার হওয়ার বিষয়টি নাকচ করেছেন, যা প্রমাণ করে, তিনি সামান্য মুনকার হওয়ার বিষয়টি মেনে নিয়েছেন। তার এই মন্তব্য আরো প্রমাণ করে যে, আমাদের আলোচিত রাবী কুররা দুর্বল হলেও অত্যধিক দুর্বল নন, বরং সামান্য দুর্বল।
সারর্মম : উপরের সকল ইমামের মন্তব্য পর্যালোচনা করলে যে সারর্মমটি বুঝা যায়, তা হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহ-এর মন্তব্যে ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন, صَدُوق لَهُ مَنَاكِير ‘সত্যবাদী কিন্তু তার বর্ণিত কিছু মুনকার হাদীছ রয়েছে’।[12]
এই জাতীয় রাবীর সকল হাদীছ পরিত্যাজ্য হয় না, বরং প্রত্যেক হাদীছের ‘ক্বারীনা’ বা বাহ্যিক লক্ষণের উপর ভিত্তি করে আলাদা সিদ্ধান্ত দিতে হয়।
দ্বিতীয় ত্রুটি : হাদীছের দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে, হাদীছটি কিছু সূত্রে মুরসাল হিসাবে বর্ণিত হয়েছে।[13] তথা ইমাম যুহরী কোন ছাহাবীর নাম উল্লেখ ছাড়াই সরাসরি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম যুহরী একজন তাবেঈ। তাবেঈ যখন সরাসরি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীছ বর্ণনা করেন, তখন তাকে মুরসাল বলা হয়। আর একই হাদীছ যখন একবার মুরসাল হিসাবে আরেকবার মাওছূল হিসাবে বর্ণিত হয়, তখন এই ইখতিলাফকে হাদীছের জন্য ত্রুটি হিসাবে গণ্য করা হয়। তখন এই ধরনের বর্ণনার মধ্যে কোন একটিকে প্রাধান্য দিতে হয়। ইমাম দারাকুৎনী এই হাদীছের ক্ষেত্রে মুরসাল হওয়াটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। কেননা ইমাম যুহরীর মযবূত ছাত্রগণ এই হাদীছটিকে মুরসাল হিসাবে বর্ণনা করেছেন।[14] সুতরাং এই হাদীছ আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত নয়। বরং এটি ইমাম যুহরীর বর্ণিত মুরসাল হাদীছ।
শাহেদ : আমরা হাদীছটির একটি শাহেদ পেয়েছি, যা অনেক মুহাক্কিক্বের দৃষ্টিগোচর হয়নি। শায়খ নাছিরুদ্দীন আলবানীও এই শাহেদ নিয়ে কোন আলোচনা করেননি।[15] শাহেদটি ইমাম আব্দুর রাযযাকের মুছান্নাফে বর্ণিত হয়েছে।
قَالَ عَبْدُ الرَّزَّاقِ قَالَ مَعْمَرٌ أَخْبَرَنِيْ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ رَفَعَ الْحَدِيْثَ قَالَ كُلُّ حَدِيْثٍ ذِيْ بَالٍ لَا يُبْدَأُ فِيهِ بِذِكْرِ اللهِ فَهُوَ أَبْتَرُ.
ইমাম আব্দুর রাযযাক বলেন, মা‘মার বলেছেন, আমাকে আনছারের একজন ব্যক্তি হাদীছ শুনিয়েছেন, তিনি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক যে গুরুত্বপূর্ণ কথা মহান আল্লাহ্র স্মরণ ছাড়াই শুরু হয়, তা অসম্পূর্ণ’।[16]
তাহক্বীক্ব : এই সনদের আনছারী ব্যক্তিটি অপরিচিত। তিনি ছাহাবী কিনা তা স্পষ্ট নয়। আর মা‘মার ইবনে রাশেদ কোন ছাহাবী থেকে হাদীছ শুনেছেন মর্মে জানা যায় না। বরং তিনি তাবে তাবেঈ।
সারমর্ম : এই হাদীছ নিয়ে যুগ যুগ থেকে ইখতিলাফ চলে আসছে। এমনকি এই হাদীছের উপর আলাদা গ্রন্থও লিখেছেন ইমাম সাখাবী সহ অনেক মুহাদ্দিছ। এই হাদীছটি ‘হাসান’ হওয়ার পক্ষে সবচেয়ে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেন ইমাম সুবকী। আর যঈফ হওয়ার পক্ষে শায়খ আলবানীর রয়েছে শক্ত অবস্থান। তবে ‘হাসান’ হুকুম আরোপকারী মুহাদ্দিছের সংখ্যা বেশী। যেমন ইমাম ইবনু হিববান,[17] হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী,[18] ইমাম ইবনুছ ছালাহ,[19] ইমাম ইবনুল মুলাক্কিন,[20] ইমাম নববী,[21] ইমাম আজলূনী[22] প্রমুখ। তাদের এই হাদীছকে হাসান বলার অন্যতম কারণ হচ্ছে এই হাদীছের বর্ণনাকারী রাবী দুর্বল হলেও হালকা দুর্বল। এমনকি এই রাবীর কিছু হাদীছকে ইমাম মুসলিম তার ছহীহ মুসলিমে ‘ইসতিশহাদ’ হিসাবে গ্রহণ করেছেন।[23] যা প্রমাণ করে তার বর্ণিত সকল হাদীছ মুনকার নয়, বরং কিছু হাদীছ সঠিক ও গ্রহণযোগ্য। আর আমাদের আলোচ্য হাদীছটি মুনকার হাদীছের মধ্যে পড়ে না। কেননা এই হাদীছের অর্থের মধ্যে কোনরূপ অপসন্দনীয় বিষয় নেই। বরং হাদীছটির অর্থ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্যান্য হাদীছ ও কর্ম থেকে প্রমাণিত। স্বয়ং মহান আল্লাহ তাঁর পবিত্র কুরআনের প্রতিটি সূরা তাঁর নাম দিয়েই শুরু করেছেন। আর যারা যঈফ বলেছেন, তারা সনদের দিকে দৃষ্টিপাত করেছেন। প্রথমত: সনদে দুর্বল রাবী। দ্বিতীয়ত: মুরসাল ও মাওছূল হওয়া নিয়ে মতভেদ। তৃতীয়ত: হাদীছের মতনে মতভেদ। চতুর্থত: মযবূত কোন শাহেদ না পাওয়া ইত্যাদি কারণে তারা হাদীছটিকে দুর্বল বলেছেন। আর সনদগতভাবে হাদীছটি দুর্বল এই মন্তব্যই সঠিক।
ইমাম বুখারীর পক্ষ থেকে জবাব :
আমরা যদি হাদীছটিকে ছহীহ মেনে নিই, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায় যে, ইমাম বুখারী কেন তার গ্রন্থের শুরুতে কোন হাম্দ-ছানা উল্লেখ করলেন না? উত্তরে বলব, হাদীছটির মুসনাদে আহমাদ ও ইবনু মাজাহসহ বিভিন্ন কিতাবের বর্ণনা একত্রিত করলে প্রমাণিত হয় যে, হাদীছ দ্বারা মূলত আল্লাহ্র স্মরণ মুখ্য উদ্দেশ্য। সেটা তাঁর প্রশংসার মাধ্যমেও হতে পারে অথবা শুধু তাঁর নাম স্মরণের মাধ্যমেও হতে পারে। আর ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ বিস্তর কোন হাম্দ-ছানা না লিখলেও ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ লিখেছেন। সুতরাং এতে কোন সন্দেহ নেই যে, তিনি মহান আল্লাহ্র স্মরণেই কিতাব আরম্ভ করেছেন। উল্লেখ্য, ইমাম বুখারীর মত অতীতের অনেক ইমাম তাদের গ্রন্থের শুরুতে লম্বা কোন হাম্দ-ছানা লিখেননি, বরং শুধু ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ দিয়ে তাদের গ্রন্থ লেখা আরম্ভ করেছেন। যেমন- ইমাম আবুদাঊদ তার সুনানে, ইমাম মালেক তার মুওয়াত্ত্বাতে, ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে, ইমাম আব্দুর রাযযাক তার মুছান্নাফে ইত্যাদি। এসব মুহাদ্দিছ তাদের এই প্রখ্যাত গ্রন্থগুলো শুধু ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ দিয়ে শুরু করেছেন। শুধু তাই নয় স্বয়ং রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন রাজা-বাদশাহগণের নিকট যেসব চিঠি লিখেছেন, সেখানেও তিনি শুধু ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ দিয়ে শুরু করেছেন, বিস্তারিত কোন হাম্দ-ছানা লেখেননি।[24] ঠিক তেমনি সুলায়মান আলাইহিস সালাম যে চিঠি লিখেছিলেন, তাও তিনি শুধু ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ দিয়ে শুরু করেছিলেন।[25] সুতরাং কোন কাজের শুরুতে মহান আল্লাহ্র নাম দিয়ে শুরু করাই যথেষ্ট। বিস্তারিত ভূমিকা ও হাম্দ-ছানা যরূরী নয়। কেউ চাইলে করতে পারে।
ছহীহ বুখারীর অধ্যায় সমূহ :
ছহীহ বুখারীতে মোট ৯৭টি ‘অধ্যায়’ রয়েছে। ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ ‘অহির সূচনা’ অধ্যায় দিয়ে শুরু করেছেন এবং ‘তাওহীদ’ অধ্যায় দিয়ে শেষ করেছেন।
অধ্যায় বিন্যাসের রহস্য :
তার অধ্যায় বিন্যাসের গূঢ় রহস্য নিয়ে অনেক মুহাদ্দিছ আলোচনা করেছেন। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, ইমাম বুলক্বিনী। তার মন্তব্যের সারমর্ম নিমেণ পেশ করা হল :
‘ইমাম বুখারী অহির আলোচনা দিয়ে তার বই শুরু করেছেন, কেননা অহিই হচ্ছে অভ্রান্ত সত্যের একমাত্র উৎস। ইসলামী শরী‘আতের ভিত্তি হচ্ছে অহি। তাই তিনি উৎসের আলোচনা দিয়েই তার গ্রন্থ শুরু করেছেন। তারপরে ঈমানের আলোচনা করেছেন। কেননা অহির দাওয়াতের প্রধান দাবী হচ্ছে ঈমান-আক্বীদা ও সঠিক বিশ্বাস। তারপরে ইল্ম বা জ্ঞানের আলোচনা করেছেন। কেননা ইসলামী শরী‘আতের বাকী বিষয়গুলো জানতে জ্ঞান অর্জন করা যরূরী। ইসলামের অপর নাম হচ্ছে জ্ঞান। ইসলামের বিপরীত সকল কিছুই হচ্ছে অজ্ঞতা। জ্ঞান যেখানে আছে, ইসলাম সেখানে আলো ছড়াবেই। তাইতো পবিত্র কুরআনের প্রথম আয়াতটিও ‘পড়!’ নির্দেশ দিয়ে শুরু হয়েছে। ইল্মের পরে ছালাতের আলোচনা করেছেন। কেননা ঈমানের পরেই আসে আমল। আর আমলের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও যরূরী আমল হচ্ছে ছালাত। তারপর তিনি একাধারে ইসলামের ৫টি স্তম্ভের আলোচনা করেছেন। ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ ও যাকাত এই মৌলিক স্তম্ভসমূহ তথা ইবাদতের আলোচনা শেষে মু‘আমালাত বা দুনিয়াবী লেনদেনের আলোচনা শুরু করেন। মহান আল্লাহ্র হক্ব সংশ্লিষ্ট আলোচনা শেষে বান্দার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের আলোচনা শুরু করেন। আর বান্দার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে যরূরী হচ্ছে ক্রয়-বিক্রয়। কেননা ক্রয়-বিক্রয় মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। তাই ক্রয়-বিক্রয়ের আলোচনা দিয়ে মু‘আমালাতের আলোচনা শুরু করেছেন। মহান আল্লাহ্র হক্ব ও বান্দার হক্ব সংশ্লিষ্ট আলোচনা শেষে তিনি জিহাদের আলোচনা শুরু করেন। কেননা জিহাদের মধ্যে একই সাথে মহান আল্লাহ ও বান্দা উভয়ের হক্ব জড়িত রয়েছে।
উপরের সকল আলোচনা ছিল অহি সংশ্লিষ্ট। অহি সংশ্লিষ্ট আলোচনা শেষে তিনি সৃষ্টিজীবের ইতিহাসের আলোচনা শুরু করেন। জান্নাত, জাহান্নাম, আসমান, যমীন, নবীদের ইতিহাস, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুদ্ধাবলীর ঘটনা ইত্যাদির আলোচনার মাধ্যমে পৃথিবীর একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস টানেন। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইতিহাসের পরে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিয়ে এসেছিলেন, তা নিয়ে আলোচনা করেন। তথা কুরআন, তাফসীর ইত্যাদি। আর তার মৃত্যুর পরেও যে মহান আল্লাহ এগুলো হিফাযত করেছেন, তা প্রমাণ করেন। সৃষ্টির ইতিহাস শেষে সৃষ্টির অন্যতম সদস্য মানুষের টিকে থাকার অন্যতম মাধ্যম বিবাহ নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। কেননা বিবাহই হচ্ছে মানব জাতির অস্তিত্বের একমাত্র বৈধ রক্ষাকবচ। বিবাহের আলোচনার পরে মানুষের জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট মৌলিক যরূরী বিষয়ের উপর আলোচনা শুরু করেন। যেমন অন্ন, বস্ত্র ও শিক্ষা হচ্ছে মানুষের মৌলিক চাহিদা। মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে খেতে হবে, তাই তিনি বিবাহের পরে অন্ন তথা খাবারের হুকুম-আহকাম নিয়ে আলোচনা করেছেন। খাদ্যের সাথে অন্যতম সংশ্লিষ্ট বিষয় হচ্ছে স্বাস্থ্য। মানুষ অসুস্থ হলে চিকিৎসা যরূরী। তাই তিনি খাদ্যের পরে চিকিৎসা নিয়ে আলোচনা করেছেন। খাবারের পরে অন্যতম মৌলিক অধিকার হচ্ছে লজ্জা নিবারণের জন্য পরিধেয় জিনিস পোশাক, যা মানুষের ভূষণ। তাই তিনি খাদ্যের পরে বস্ত্র ও তা পরিধানের হুকুম-আহকাম নিয়ে আলোচনা করেছেন। শিক্ষা হচ্ছে মানুষের তৃতীয় মৌলিক অধিকার, যার উপর ভিত্তি করে এ সমাজ টিকে আছে। তাই তিনি সমাজে চলার জন্য সমাজের মৌলিক নিয়ম-ক্বানূন, আদব-ক্বায়দা ও সভ্যতার মাপকাঠি নিয়ে আলোচনা করেছেন। মানুষের এই সভ্য সমাজে চলতে গেলে বিভিন্ন বিপদাপদ আসতে পারে। আর সেই বিপদাপদ থেকে বাঁচার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে দু‘আ। এছাড়া জীবনে চলতে-ফিরতে সংঘটিত হওয়া বিভিন্ন ভুল-ভ্রান্তি থেকে ক্ষমা পাওয়ার মাধ্যমও হচ্ছে দু‘আ। তাই তিনি আদব-ক্বায়দার আলোচনার পরে দু‘আ ও তওবা-ইস্তিগফার নিয়ে আলোচনা করেছেন।
উপরোল্লিখিত মানুষের জীবনের মৌলিক বিষয়গুলোর মূল নিয়ন্ত্রক হচ্ছেন মহান আল্লাহ। তিনি যেভাবে ভাগ্যে লিখেছেন, সেভাবেই হবে। তাই ইমাম বুখারী এরপরেই ভাগ্য ও ভাগ্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ের আলোচনা করেছেন। এভাবে চলতে চলতে একদিন মানুষের জীবন শেষ হয়ে যাবে, তাই তিনি এরপরে মানুষের মৃত্যু পরবর্তী সম্পত্তি বণ্টনের আলোচনা করেছেন। উপরের হুকুম-আহাকামগুলোর আলোকে একজন মুমিন তার জীবন পরিচালিত করবে। মুমিনের জন্য যেহেতু গোনাহের কাজে লিপ্ত হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়, তাই তিনি এতক্ষণ যাবৎ গোনাহ সংশ্লিষ্ট কোন বিষয় আলোচনা করেননি। গোনাহের আলোচনা তিনি সবশেষে করে বুঝাতে চেয়েছেন যে, মুমিনের উচিত গোনাহ থেকে দূরে থাকা। গোনাহ ও গোনাহগারের হুকুম সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় যেমন, হুদূদ, ক্বিছাছ, দিয়াত, মুরতাদের হুকুম, ইত্যাদির আলোচনা শেষে তিনি বিভিন্ন ফিতনার আলোচনা করেন এবং ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য যে বিষয় দিয়ে গ্রন্থ শুরু করেছিলেন সেই বিষয় দিয়ে গ্রন্থ শেষ করেন। গ্রন্থটি শুরু করেছিলেন অহি দিয়ে, শেষে এসে এই অহি তথা পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ অাঁকড়ে ধরার প্রতি আহবান জানান। গ্রন্থের শুরুতে ঈমান ও আক্বীদার আলোচনা করেছিলেন, ঠিক তেমনি শেষে এসে উভয় জগতে সাফল্যের চাবিকাঠি তাওহীদের আলোচনা করেন। উপরের সকল কিছুর ফায়ছালা যেহেতু ক্বিয়ামতের মাঠে পাল্লায় মেপে নির্ধারণ করা হবে, তাই তিনি মীযানের আলোচনা দিয়ে তার গ্রন্থের ইতি টানেন।[26] ফালিল্লাহিল হাম্দ।
(চলবে)
[1]. ইমাম ইবনু মাজাহ, সুনান, হা/১৮৯৪।
[2]. ইমাম আহমাদ, মুসনাদ, হা/৮৬৯৭।
[3]. ইমাম ইবনু আবি হাতিম, আল-জারহু ওয়াত তা‘দীল, ৭/১৩১ পৃঃ।
[4]. প্রাগুক্ত।
[5]. প্রাগুক্ত।
[6]. ইমাম দারাকুৎনী, সুনান, হা/৮৮৩।
[7]. কিতাবুছ ছিক্বাত, ৭/৩৪২ পৃঃ।
[8]. ইমাম ইবনু আবি হাতিম, আল-জারহু ওয়াত তা‘দীল, ৭/১৩১ পৃঃ।
[9]. কিতাবুছ ছিক্বাত, ৭/৩৪২ পৃঃ।
[10]. তাহযীবুত তাহযীব, ৩/৪৩৮ পৃঃ।
[11]. ইমাম ইবনু আদী, আল-কামিল, ৭/১৮২ পৃঃ।
[12]. হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী, তাক্বরীবুত তাহযীব, রাবী নং-৫৫৭৬।
[13]. ইমাম দারাকুৎনী, সুনান, হা/৮৮৩; ইলাল দারাকুৎনী, হা/১৩৯১।
[14]. ইমাম আবুদাঊদ, সুনান, হা/৪৮৪০।
[15]. নাছিরুদ্দীন আলবানী, সিলসিলা যঈফাহ, হা/৯০২; ইরওয়াউল গালীল, হা/১ ও ২।
[16]. ইমাম আব্দুর রাযযাক, মুছান্নাফ, হা/২০২০৮।
[17]. ইমাম ইবনু হিববান, ছহীহ ইবনু হিববান, হা/১ ও ২।
[18]. হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী, ফাতহুল বারী, ১/৭৭ পৃঃ।
[19]. ইমাম ইবনুল মুলাক্কিন, আল-বাদরুল মুনীর, ৭/৫২৯-৫৩০ পৃঃ।
[20]. প্রাগুক্ত।
[21]. ইমাম নববী, আল-মিনহাজ, ১/৪৩ পৃঃ।
[22]. ইমাম আজলূনী, কাশফুল খফা, হা/১৯৬৪।
[23]. হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী, তাক্বরীবুত তাহযীব, রাবী নং-৫৫৭৬।
[24]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৫৫৩।
[25]. সূরা নামল, ২৭/৩০।
[26]. হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী, ফাতহুল বারী, পৃঃ ৪৭০-৪৭৩।
