কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ঈমানের শাখা (পর্ব-২)

(৭) একথা বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ তা‘আলাকে ভালবাসা সবার উপর ওয়াজিব :

মহান আল্লাহ বলেন,وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُوْنِ اللهِ أَنْدَادًا يُحِبُّوْنَهُمْ كَحُبِّ اللهِ وَالَّذِيْنَ آمَنُوْا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ ‘আর মানবজাতির মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা আল্লাহ্র মোকাবিলায় অপরকে সমকক্ষ স্থির করে, আল্লাহকে ভালবাসার ন্যায় তারা তাদেরকে ভালবেসে থাকে এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে আল্লাহ্র প্রতি, তাদের ভালবাসা দৃঢ়তর’ (বাক্বারাহ, ২/১৬৫)

সুধী পাঠক! আয়াতটিতে আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকগণের দুনিয়াবী অবস্থা এবং পরকালে কী হবে তার কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ তারা আল্লাহ্র স্থানে অন্যদেরকে ভালবাসতে এবং তাদের ইবাদত করতে শুরু করে। অথচ আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য মা‘বূদ নেই। মহান আল্লাহ্র জন্য সকল ইবাদত করতে হবে, তাঁর কোন শরীক নেই।

অব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, أَىُّ الذَّنْبِ أَعْظَمُ عِنْدَ اللهِ قَالَ أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدًّا وَهْوَ خَلَقَكَ ‘আল্লাহ্র নিকট সবচেয়ে বড় গুনাহ কোন্টি? তিনি বলেন, আল্লাহ্র সাথে অন্য কাউকে অংশীদার স্থাপন করা। অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন’।[1]

অতএব আল্লাহ্র জন্যই সকল ভালবাসা হতে হবে, তাঁর উপর আশা-ভরসা করতে হবে, তাঁর জন্যই কেবল ইবাদত করতে হবে, সকল বিষয়ে তাঁর দিকেই ফিরে যেতে হবে, তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরীক করা যাবে না, যারা মুশরিক তারা নিজের উপর নিজেরাই যুলুম করছে, যার প্রতিফল ইহকালীন জীবনে এবং পরকালে অচিরেই পাবে।[2]

আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,ثَلاَثٌ مَنْ كُنَّ فِيْهِ وَجَدَ حَلاَوَةَ الإِيْمَانِ أَنْ يَكُوْنَ اللهُ وَرَسُوْلُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُوْدَ فِى الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِى النَّارِ ‘তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে, সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার নিকট অন্য সকল কিছু হতে অধিক প্রিয় হওয়া। কাউকে একমাত্র আল্লাহ্র জন্যই ভালবাসা। কুফরীতে প্রত্যাবর্তনকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া থেকেও বেশি অপসন্দ করা’।[3]

(৮) এ মর্মে বিশ্বাস স্থাপন করা যে, আল্লাহকে ভয় করা সবার উপর ওয়াজিব :

মহান আল্লাহ বলেন,فَلَا تَخَافُوْهُمْ وَخَافُوْنِ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِيْنَ ‘যদি তোমরা বিশ্বাসী হও, তবে তাদেরকে ভয় কর না। কেবল আমাকেই ভয় কর’ (আলে ইমরান, ৩/১৭৫)। অতএব তোমরা যে কোন চিন্তায় পড় না কেন কেবল আল্লাহকেই ভয় কর। কোন পীর-ফকীরের নয়, কোন মাযারের ভয় নয়, কোন মানুষের ভয় নয়, কোন শয়তানের ভয় নয়। মহান আল্লাহ বলেন, فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ ‘অতএব তোমরা মানুষকে ভয় কর না, বরং শুধু আমাকেই ভয় কর’ (মায়েদাহ, ৬/৪৪)। তিনি আরো বলেন, وَإِيَّايَ فَارْهَبُوْنِ ‘তোমরা শুধুমাত্র আমাকেই ভয় কর’ (বাক্বারাহ, ২/৪০)। মহান আল্লাহ বলেন, وَهُمْ مِنْ خَشْيَتِهِ مُشْفِقُوْنَ ‘তারা তাঁর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত’ (আম্বিয়া, ২১/২৮)। মহান আল্লাহ ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম ও তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে বলেন, وَيَدْعُوْنَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوْا لَنَا خَاشِعِيْنَ ‘তাঁরা আমাকে ডাকতেন আশা ও ভীতির সাথে এবং তারা ছিলেন আমার নিকট বিনীত’ (আম্বিয়া, ২১/৯০)

মুমিন ব্যক্তিরাই আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর বিচার দিবসকে ভয় করে। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, وَيَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ وَيَخَافُوْنَ سُوْءَ الْحِسَابِ ‘তারা ভয় করে তাদের প্রতিপালককে এবং ভয় করে কঠোর হিসাবের দিবসকে’ (রা‘দ, ১৩/২১)। মহান আল্লাহ বলেন, وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দু’টি বাগান’ (রহমান, ৫৫/৪৬)। যে ব্যক্তি তার প্রতিপালককে ভয় করে, তাঁর সামনে যাওয়ার ভয়ে, মহান আল্লাহ যে সমস্ত কাজ করতে নিষেধ করেছেন, তা করা থেকে বিরত থাকে, আর যা করতে আদেশ করেছেন, তা বাস্তবায়ন করে, সকল ইবাদত তাঁরই জন্য করে। এর জন্য তাকে দু’টি জান্নাত দিবেন একটি নিষিদ্ধ কর্ম পরিত্যাগ করার জন্য, অপরটি সৎআমল করার জন্য’।[4]

অতএব মানবজাতি সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে চাইলে, পরকালে কল্যাণ পেতে চাইলে, দেশে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে কেবল আল্লাহকে ভয় করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, لِمَنْ خَافَ مَقَامِي وَخَافَ وَعِيْدِ ‘যারা ভয় করে আমার সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার এবং আমার কঠিন শাস্তির ভয় করে’ (ইবরাহীম, ১৪/১৪)। আদি ইবনু হাতিম রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, اتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ ‘তোমরা জাহান্নাম হতে আত্মরক্ষা কর এক টুকরা খেজুর ছাদাক্বাহ করে হলেও’।[5] রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, لَوْ تَعْلَمُوْنَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيْلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيْرًا ‘আমি যা জানি, তা যদি তোমরা জানতে, তবে তোমরা হাসতে খুবই কম এবং কাঁদতে খুব বেশী’।[6]

(৯) এ মর্মে বিশ্বাস স্থাপন করা যে, আল্লাহ্র নিকট আশা-প্রত্যাশা করা ওয়াজিব :

মহান আল্লাহ বলেন,أُوْلَئِكَ الَّذِيْنَ يَدْعُوْنَ يَبْتَغُوْنَ إِلَى رَبِّهِمُ الْوَسِيْلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ وَيَرْجُوْنَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُوْنَ عَذَابَهُ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحْذُوْرًا ‘তারা যাদেরকে আহবান করে, তারাই তো তাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে যে তাদের মধ্যে কে কত নিকটবর্তী হতে পারে, তাঁর দয়া প্রত্যাশা করে ও তাঁর শাস্তিকে ভয় করে। তোমার প্রতিপালকের শাস্তি ভয়াবহ’ (বনী ইসরাঈল, ১৭/৫৭)

উক্ত আয়াতে ‘অসীলা’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, সকল সৎআমল বাস্তবায়নের মাধ্যমে আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জন করা। কোন মৃত ব্যক্তির অসীলা নয়, পীর বাবার অসীলা নয়, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অসীলা নয়, কোন ব্যক্তির সত্তার সম্মান দ্বারা অসীলা নয়। কেননা এরূপ অসীলা কুরআন ও সুন্নাহ এবং সালাফে ছালেহীনের দেখানো পথের বিরোধী কাজ। বরং সকল পাপ কাজ বর্জনের মাধ্যমেই মানবজাতি আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জন করতে পারবে, নচেৎ নয়।[7]

ইবনু তায়মিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এখানে অসীলার তিনটি অর্থ: (১) আল্লাহ্র আনুগত্য এবং রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জন করা। এটা ফরয। এর দ্বারা ঈমান পূর্ণতা পায়। (২) রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দো‘আর মাধ্যমে ও তাঁর শাফা‘আত দ্বারা অসীলা। এটা ছিল তাঁর জীবদ্দশায়। আর ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ্র অুনমতিক্রমে তিনি মানবজাতির জন্য শাফা‘আত করবেন। এভাবেই মানবজাতি আল্লাহ্র নৈকট্য লাভ করবে। (৩) নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যাত-সত্তা বা মান-সম্মান দ্বারা অসীলা করা। এরূপ আমল ছাহাবীগণ করতেন না, তাঁর জীবদ্দশায়ও না এবং তাঁর মৃত্যুর পরেও না। আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ এবং তার সাথীগণ বলেছেন, এরূপ আমল শরী‘আতে জায়েয নয়। এরপর তারা এরূপ আমল করতে নিষেধ করেন এবং বলেন, কোন ব্যক্তি যেন এরূপ না বলে যে, আমি নবীগণের মাধ্যমে তাদের যাত-সত্তা ও সম্মান দ্বারা অসীলা করছি।[8]

অতএব মানবজাতি আল্লাহ্র রহমত থেকে নিরাশ হবে না, তাঁরই উপর আশা-ভরসা করবে, তাঁকেই ভয় করবে। আল্লাহ্র ভয়ে অন্যায়-অপকর্ম-পাপ করা থেকে দূরে থাকবে এবং তাঁর রহমত এবং প্রত্যাশায় সকল সৎআমল করবে, তাহলেই আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জনে ধন্য হবে এবং ভয়াবহ কঠিন দিনে পরিত্রাণ পাবে।[9] মহান আল্লাহ বলেন,وَادْعُوْهُ خَوْفًا وَطَمَعًا إِنَّ رَحْمَتَ اللهِ قَرِيْبٌ مِنَ الْمُحْسِنِيْنَ ‘আল্লাহকে ভয়-ভীতি ও আশা-আকাঙ্খার সাথে ডাকো, নিঃসন্দেহে আল্লাহ্র রহমত সৎকর্মশীলদের অতি সন্নিকটে’ (আ‘রাফ, ৭/৫৬)

হে মানবজাতি! তোমরা আল্লাহ্র রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, কোন পাপ করে বসলে সাথে সাথে আল্লাহ্র দিকে রুজূ‘ হও তথা ইস্তিগফার পড়ে ক্ষমা প্রার্থনা কর। মহান আল্লাহ বলেন,قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِيْنَ أَسْرَفُوْا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوْا مِنْ رَحْمَةِ اللهِ إِنَّ اللهَ يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ جَمِيْعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ ‘হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহ্র রহমত হতে নিরাশ হয়ো না। মহান আল্লাহ তোমাদের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দিবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু’ (যুমার, ৩৯/৫৩)

হে মানবজাতি! তোমরা আল্লাহ্র ইবাদতের সাথে অন্য কাউকে অংশীদার স্থাপন কর না। কারণ শিরকের গুনাহ মহান আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। মহান আল্লাহ বলেন,إِنَّ اللهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ ‘নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সাথে অন্য কাউকে অংশীদার স্থাপন করলে তাকে ক্ষমা করেন না, তবে শিরকের পাপ ব্যতীত অন্য পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন’ (নিসা, ৪/৪৮)

অতএব হে মানবজাতি! যারা কবর-মাযার কেন্দ্রিক ইবাদত করছো, আল্লাহ্র জন্য সকল ইবাদত কর, শিরকী কাজ ছেড়ে দাও। নচেৎ পরকাল শূন্য হয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। তাই আসুন! আমরা তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও সৎআমল করার মাধ্যমে আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জনে ধন্য হই। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি,

إِنَّ اللهَ خَلَقَ الرَّحْمَةَ يَوْمَ خَلَقَهَا مِائَةَ رَحْمَةٍ فَأَمْسَكَ عِنْدَهُ تِسْعًا وَتِسْعِيْنَ رَحْمَةً وَأَرْسَلَ فِىْ خَلْقِهِ كُلِّهِمْ رَحْمَةً وَاحِدَةً فَلَوْ يَعْلَمُ الْكَافِرُ بِكُلِّ الَّذِىْ عِنْدَ اللهِ مِنَ الرَّحْمَةِ لَمْ يَيْأَسْ مِنَ الْجَنَّةِ وَلَوْ يَعْلَمُ الْمُؤْمِنُ بِكُلِّ الَّذِىْ عِنْدَ اللهِ مِنَ الْعَذَابِ لَمْ يَأْمَنْ مِنَ النَّارِ.

‘আল্লাহ যেদিন রহমত সৃষ্টি করেন, সেদিন একশ’ রহমত সৃষ্টি করেছেন। নিরানববইটি তাঁর কাছে রেখে দিয়েছেন এবং একটি রহমত সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে পাঠিয়ে দিয়েছেন। যদি কাফের আল্লাহ্র কাছে সুরক্ষিত রহমত সম্পর্কে জানে, তাহলে সে জান্নাত লাভে নিরাশ হবে না। আর মুমিন যদি আল্লাহ্র কাছে যে শাস্তি আছে সে সম্পর্কে জানে, তাহলে সে জাহান্নাম থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করবে না’।[10] জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ আনছারী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর মৃতুর তিনদিন পূর্বে একথা বলতে শুনেছি যে, لَا يَمُوْتَنَّ أَحَدُكُمْ إِلَّا وَهُوَ يُحْسِنُ بِاللهِ الظَّنَّ ‘তোমাদের মধ্যে যে কেউ মৃত্যুবরণ করবে, সে যেন আল্লাহ্র প্রতি সুধারণা রেখে মৃত্যুবরণ করে’।[11]

(১০) এ মর্মে বিশ্বাস স্থাপন করা যে, আল্লাহ্ উপর ভরসা করা ওয়াজিব :

হে মানবজাতি! আল্লাহ্র উপর ভরসা কর, তবে এমনটি নয় যে, কাজ-কর্ম বাদ দিয়ে বসে থাকবে। সৎআমল করবে, অন্যায়-পাপ থেকে দূরে থাকবে। অতঃপর আল্লাহ্র উপর ভরসা করবে। মহান আল্লাহ বলেন,وَعَلَى اللهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُوْنَ ‘সুতরাং মুমিনরা যেন আল্লাহ্র উপরই নির্ভর করে’ (তাগাবুন, ৬৪/১৩)

আমাদের জীবনের প্রতিটি ব্যাপারে আমরা আল্লাহ্র উপর ভরসা করব, আল্লাহ্র প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ও তাঁর প্রতি সুধারণা রাখব, জীবনের যেকোন কঠিন বিষয় হোক না কেন তাঁরই নিকট কাকুতি-মিনতি করব। কেননা তাঁরই দিকে রুজূ‘ হলে সকল বিষয় সহজ হয়ে যাবে। বান্দার ঈমান অনুযায়ী আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় হয়ে থাকে এবং তাঁরই উপর ভরসা করে থাকে। বান্দার ঈমান যত মযবূত হবে, ততই আল্লাহ্র উপর ভরসা শক্তিশালী হবে।[12]

যে ব্যক্তি আল্লাহ্র হয়ে যায়, তার জন্য আল্লাহ্ই যথেষ্ট। মহান আল্লাহ বলেন, وَقَالُوْا حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيْلُ ‘তারা বলেছিল, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং মঙ্গলময় কর্মবিধায়ক’ (আলে ইমরান, ৩/১৭৩)। তিনি আরো বলেন, وَعَلَى اللهِ فَتَوَكَّلُوْا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِيْنَ ‘আল্লাহ্র উপরই ভরসা কর, যদি তোমরা মুমিন হও’ (মায়েদাহ, ৫/২৩)। অন্যত্র তিনি বলেন, وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللهِ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللهَ بَالِغُ أَمْرِهِ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্র উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, আল্লাহ তার ইচ্ছা পূরণ করবেনই’ (তালাক, ৬৫/৩)

ইবনু আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مِنْ أُمَّتِى سَبْعُوْنَ أَلْفًا بِغَيْرِ حِسَابٍ هُمُ الَّذِيْنَ لَا يَسْتَرْقُوْنَ وَلاَ يَتَطَيَّرُوْنَ وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُوْنَ ‘আমার উম্মতের সত্তর হাযার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাঁরা (হবে) ঐ সকল লোক যারা ঝাড়-ফুঁক করে না, অবৈধভাবে মঙ্গল-অমঙ্গল নির্ণয় করে না এবং তাঁরা একমাত্র তাদের প্রতিপালকের উপর ভরসা রাখে’।[13]

মানবজাতির উচিত হবে, বাড়ীতে বসে না থেকে সৎ আমল করা, কাজ করা। এরপর আল্লাহ্র উপর ভরসা করা। নিজ হাতের উপার্জন খাওয়া এবং মানুষের নিকট চাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করা।

যুবাইর ইবনু আওয়াম রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,لِأَنْ يَأْخُذَ أَحَدُكُمْ حَبْلَهُ فَيَأْتِىَ بِحُزْمَةِ الْحَطَبِ عَلَى ظَهْرِهِ فَيَبِيْعَهَا فَيَكُفَّ اللهُ بِهَا وَجْهَهُ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَسْأَلَ النَّاسَ أَعْطَوْهُ أَوْ مَنَعُوْهُ ‘তোমাদের মধ্যে কেউ রশি নিয়ে তার পিঠে কাঠের বোঝা বয়ে আনে এবং তা বিক্রি করার মাধ্যমে রিযিক্ব অন্বেষণ করে, ফলে আল্লাহ তার চেহারাকে (যাঞ্চা করার লাঞ্ছনা হতে) রক্ষা করেন, যা মানুষের নিকট চাওয়া থেকে অনেক উত্তম। কারণ অন্যের নিকট চাইলে সে কিছু দিবে অথবা না করবে’।[14] অন্যত্র তিনি বলেন,مَا أَكَلَ أَحَدٌ طَعَامًا قَطُّ خَيْرًا مِنْ أَنْ يَأْكُلَ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ وَإِنَّ نَبِىَّ اللهِ دَاوُدَ عَلَيْهِ السَّلَامُ كَانَ يَأْكُلُ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ ‘নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায় না। আল্লাহ্র নবী দাঊদ আলাইহিস সালাম নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন’।[15]

 (চলবে)


[1]. বুখারী, হা/৪৪৭৭; মুসলিম, হা/৮৬।আহমাদ, হা/৪১৩১।

[2]. দ্রষ্টব্য: তাফসীর ইবনে কাছীর, হা/১৪২।

[3]. বুখারী, হা/১৬; মুসলিম, হা/ ৪৩; আহমাদ, হা/১২০০২।

[4]. তাফসীর আস-সা‘দী (বৈরুত : মুয়াস্সাতুর রিসালাহ, ১৪২২ হিঃ), পৃঃ ৮৩১।

[5]. বুখারী, হা/১৪১৭; মুসলিম, হা/১০১৬; আহমাদ, হা/১৮২৭২।

[6]. বুখারী, হা/৪৬২১; মুসলিম, হা/২৩৫৯।

[7]. তাফসীর আত-তাবারী, ৮/৪০২-৪০৪ পৃঃ।

[8]. ইবনু তায়মিয়া, ক্বায়েদা জালীলা ফী আত-তাওয়াসসুল ওয়াল অসীলা, পৃঃ ৮৩-৮৬।

[9]. তাফসীর ইবনু কাছীর, ৯/৩২-৩৩ পৃঃ।

[10]. বুখারী, হা/৬৪৬৯; মুসলিম, হা/২৭৫৫; আহমাদ, হা/৮৪১৫।

[11]. মুসলিম, হা/২৮৭৭; আহমাদ, হা/১৪১৫৭।

[12]. তাফসীর আস-সা‘দী, পৃঃ ৮৬৮।

[13]. বুখারী, হা/৬৪৭২; মিশকাত, হা/৫২৯৫।

[14]. বুখারী, হা/১৪৭১।

[15]. বুখারী, হা/২০৭২।

Magazine