কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

নারীর ছিয়াম: শরীআত ও বাস্তব দিকনির্দেশনা

post title will place here

রামাযান ইবাদতের বসন্তকাল। আত্মশুদ্ধি, সংযম ও আল্লাহভীতির অনুশীলনের জন্য এই মাস মহান রব আমাদের সামনে বিশেষ এক সুযোগ উন্মুক্ত করে দেন। একজন মুমিন নারীর জীবনে রামাযান কেবল সময়ের পরিবর্তন নয়; বরং দায়িত্ব, সংবেদনশীলতা ও সচেতনতার এক গভীর পাঠ। সংসার, সন্তান, কর্মজীবন ও সামাজিক বাস্তবতার ভেতর থেকেও কীভাবে শরীআতের আলোয় ছিয়াম আদায় করা যায়, এই লেখায় সে বিষয়গুলোই সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ছিয়াম নিছক পানাহার বর্জনের নাম নয়; এটি চরিত্র নির্মাণের ইবাদত। প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল গুনাহ থেকে বিরত থাকা, প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং নৈতিক উৎকর্ষ অর্জন করাই ছিয়ামের মৌলিক দাবি। মিথ্যা কথা, বেহুদা আলাপ, গীবত, চোগলখোরি, অশালীন আচরণ কিংবা ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত থেকেও যে ছিয়ামের পূর্ণতা আসে না, সে বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।[1] এই হাদীছ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ছিয়ামের সার্থকতা নিহিত আছে আত্মসংযম ও চরিত্র সংশোধনের মধ্যেই।

ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করলে ছিয়াম বাতিল হয়ে যায় এবং ক্বাযা আদায় করা ফরয হয়। তবে ভুলবশত খেলে বা পান করলে ছিয়ামের কোনো ক্ষতি হয় না। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছেন, ভুলে খাওয়া বা পান করা আল্লাহর পক্ষ থেকেই রিযিক্ব হিসেবে গণ্য হয়।[2] অনুরূপভাবে, ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে ছিয়াম নষ্ট হয়; কিন্তু অনিচ্ছাকৃত বমিতে ছিয়ামের কোনো সমস্যা নেই।[3]

নারীদের ক্ষেত্রে হায়েয ও নিফাস ছিয়ামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। বিদ্বানদের ঐকমত্য অনুযায়ী, এ অবস্থায় ছিয়াম শুদ্ধ নয়; বরং ছিয়াম রাখা নিষিদ্ধ। দিনের শেষভাগে হলেও হায়েয শুরু হলে ছিয়াম ভেঙে যাবে এবং পরে ক্বাযা আদায় করতে হবে। তবে এ অবস্থায় ছালাতের ক্বাযা নেই। এটি ইসলামের পক্ষ থেকে নারীদের জন্য একটি বড় সহজীকরণ।[4]

সমাজে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা নারীদের অপ্রয়োজনীয় দুশ্চিন্তায় ফেলে। যেমন, নাপাক অবস্থায় সকাল হলে ছিয়াম শুদ্ধ হয় না—এই ধারণা ভিত্তিহীন। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে নাপাক অবস্থায় ফজর করেছেন, অতঃপর গোসল করে ছিয়াম পালন করেছেন।[5] তেমনি রান্নার প্রয়োজনে খাবারের স্বাদ দেখা জায়েয, যতক্ষণ তা কণ্ঠনালি অতিক্রম না করে।[6] প্রচণ্ড গরম বা পিপাসার কারণে মাথায় ঠাণ্ডা পানি ঢাললেও ছিয়ামের কোনো ক্ষতি হয় না। এ বিষয়ে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আমল প্রমাণ হিসেবে বিদ্যমান।[7]

ছিয়াম অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক চুম্বন বৈধ, যদি উভয়ে নিজেকে সংযত রাখতে সক্ষম হন এবং সহবাস বা বীর্যপাতের আশঙ্কা না থাকে। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিয়াম অবস্থায় স্ত্রীকে চুম্বন করতেন, অথচ তিনি ছিলেন নিজেকে সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণকারী।[8]তবে যাদের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে, তাদের জন্য এ অনুমতি প্রযোজ্য নয়।

ব্রাশ করা নিয়েও নারীদের মধ্যে দ্বিধা দেখা যায়। খাদ্যনালিতে কিছু প্রবেশ না করলে ছিয়াম অবস্থায় ব্রাশ করা জায়েয। তবে সন্দেহ এড়ানোর জন্য দিনে ব্রাশ না করাই অধিক সতর্কতা।[9]

অতি বৃদ্ধা নারী কিংবা এমন রোগী, যাদের সুস্থ হওয়ার আশা নেই, তাদের জন্য ছিয়াম ফরয নয়। এ ক্ষেত্রে ক্বাযাও আদায় করতে হবে না; বরং প্রতিদিনের পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাবার খাওয়াতে হবে।[10] গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীর ক্ষেত্রে নিজের বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে ছিয়াম না রাখার অনুমতি রয়েছে। পরবর্তীতে সেই দিনগুলোর ক্বাযা আদায় করতে হবে।[11]

হায়েয বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে রক্ত বন্ধ হয়ে গেলে এবং এতে কোনো শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা না থাকলে ছিয়াম শুদ্ধ হবে। তবে ছাহাবী যুগে এ ধরনের চর্চা না থাকায় এবং শরীরের স্বাভাবিকতার প্রতি সম্মান রেখে এ কাজ পরিহার করাই উত্তম বলে আলেমগণ মত দিয়েছেন।[12]

অনিয়মিত বা দীর্ঘস্থায়ী রক্তপাতের ক্ষেত্রে যদি তা হায়েয হিসেবে চিহ্নিত না হয়, তবে সেটি ইস্তেহাযা হিসেবে গণ্য হবে। সে অবস্থায় নারী ছিয়াম ও ছালাত আদায় অব্যাহত রাখবে এবং কেবল অভ্যাসগত হায়েযের দিনগুলোতেই বিরত থাকবে।[13]

পরিশেষে বলা যায়, ছিয়াম নারীদের জন্য কোনো কঠিন বোঝা নয়; বরং এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে রহমতপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ এক বিধান। সঠিক জ্ঞান ও সচেতনতা থাকলে একজন নারী সংসার ও সমাজের দায়িত্ব পালনের মাঝেও পূর্ণ আত্মিক প্রশান্তির সাথে ছিয়াম আদায় করতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে ছহীহ বুঝ ও আন্তরিকতার সাথে ছিয়াম পালনের তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

 

মো. আকরাম হোসেন

প্রভাষক, পাঁচটিকরী আলিম মাদরাসা, ভোলাহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯০৩।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৩৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৫৫।

[3]. আবূ দাঊদ, হা/২৩৮০, হাদীছ ছহীহ।

[4]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৩৫।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯২৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১১০৯।

[6]. ইবনে আবী শায়বা, ৩/৪৭।

[7]. আবূ দাঊদ, হা/২৩৪৮, হাদীছটি ছহীহ।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯২৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১১০৬।

[9]. ছহীহ ফিক্বহুস সুন্নাহ, ১/১১৭।

[10]. সূরা আল-বাক্বারা, ২/১৮৪; ছহীহ বুখারী, হা/৪৫০৫; আল-মুগনী, ৪/৩৯৬; ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা, ১১/১৬৪।

[11]. ইবনু মাজাহ, হা/১৬৬৭; মুসনাদ আহমাদ ৪/৩৪৭; মাজমূ‘ ফাতাওয়া শায়খ বিন বায, ১৫/২২৭।

[12]. ছহীহ ফিক্বহুস সুন্নাহ, ১/১২৮; ইবনু উছায়মীন রাহিমাহুল্লাহ, হায়েয ও নিফাসের বিধান সংক্রান্ত ৯০টি ফতওয়া।

[13]. ইবনু উছায়মীন রাহিমাহুল্লাহ, হায়েয ও নিফাসের বিধান সংক্রান্ত ৯০টি ফতওয়া।

Magazine