কিছু কিছু ঘটনা, কিছু কিছু মৃত্যু সমাজকে আন্দোলিত করে। বিবেককে করে বেদনাতুর। নুসরাত জাহান রাফির মৃত্যু এমনিই একটি ঘটনা, যা গোটা দেশবাসীকে কাঁদিয়েছে। তার মৃত্যুর পর টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া মানুষের যে আহাজারি শুনেছি, তাতে মনে হয়েছে বিবেক বলতে এখনো কিছু অবশিষ্ট আছে। সেই সাথে হাযারো প্রশ্ন, কেন ঘটছে এসব ঘটনা? দিন দিন কেন বেড়ে যাচ্ছে মানুষের পাশবিকতা। বিচার কেন হয় না এসব ঘৃণ্য অপরাধীদের? কারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় এইসব নরপশুকে?[1]
চলতি ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আলিম পর্যায়ের আরবী প্রথম পত্রের পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল নুসরাত। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হল, ষড়যন্ত্র করে নুসরাতকে মাদরাসার ছাদে ডেকে নিয়ে হাত মোজা, পা মোজা এবং নেকাব পরা একদল দুর্বৃত্ত তাকে কেরোসিন জাতীয় পদার্থ ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। শতকরা ৮০ ভাগ পুড়ে যাওয়া নুসরাতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করানো হয়। চারদিনের মতো বেঁচে থেকে সবাইকে কাঁদিয়ে নুসরাত জাহান রাফি চিরনিদ্রায় শায়িত হয়। বীভৎস এই হত্যাকাণ্ডে পুরো দেশ উদ্বেলিত হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিও সোচ্চার হয়।
এর আগেও ২০১৭ সালে দাখিল পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির চোখে চুন জাতীয় দাহ্য পদার্থ ছুড়ে মেরেছিল বখাটেরা। তখন চট্টগ্রামের পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দাখিল পরীক্ষা দিয়েছিল সে। সেই সময় সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিনহাজুর রহমান পরীক্ষা কেন্দ্র ঘুরে নুসরাত জাহান রাফির মাথায় হাত রেখে বলেছিল, ‘আমি আশ্চর্য হয়েছি চোখে প্রচণ্ড জ্বালা-পোড়া নিয়ে নুসরাত জাহান রাফি সাহসিকতার সঙ্গে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে, আমরা নুসরাতের পাশে আছি, থাকব’।[2] কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল, প্রশাসন সেই সময় কিছুই করেনি।
গত ২৭ মার্চ ২০১৯ যৌন হয়রানির ঘটনার পর নুসরাত জাহান রাফিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন এবং ইন্সপেক্টর কামাল হোসেন। সেই জেরার ঘটনা কোন না কোনভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। সেই ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায় যে, তারা নুসরাত জাহান রাফিকে অনেক আপত্তিকর ও বিভ্রান্তিমূলক প্রশ্ন করেন। আর নুসরাত জাহান রাফি দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে জবাব দিতে থাকে। শুধু তাই নয়, নুসরাত এক পর্যায়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। এ নিয়ে ব্যারিস্টার সাইয়্যেদুল হক সুমন রিট পিটিশন দায়ের করেন, যা তিনি তাঁর ফেসবুক লাইভ ভিডিওতে জানিয়েছেন। তবে সম্প্রতি খবরে জানা গেল যে, সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের স্বার্থে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, যৌন নির্যাতনের শিকার নারী বা শিশুদের জবানবন্দী নেওয়ার দায়িত্ব নারী ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট।[3] আমরা মনে করি, এই বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক। আদালতের এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন হোক-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সহশিক্ষার ফলশ্রুতিতে ছাত্রী শিক্ষকের হাতে ধর্ষিত হওয়ার খবর শোনা যায়। দিন-রাত চলে প্রেম-প্রীতির নোংরা প্রতিযোগিতা ও অশ্লীলতার ছড়াছড়ি। যে সহশিক্ষা ব্যবস্থা মেয়ের বাবাকে তার বাড়ীতে পুনরায় তার মেয়েকে জীবিত ফিরে আসার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। যেখানে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা চলে, সেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে ইসলাম সমর্থন করে না। কেননা, নারী-পুরুষ একত্রে থাকলে অপকর্ম ঘটবেই। এটা কেউ এড়াতে পারবে না। সেটা আস্তিক হোক আর নাস্তিক হোক, ইমাম হোক আর মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক হোক। তাই সর্বক্ষেত্রেই উচিত ইসলামী শরী‘আহ মোতাবেক নারী-পুরুষ আলাদা করে দেওয়া। সেটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক, ট্রেন-বাসে হোক আর শপিং কমপ্লেক্সে হোক। কেননা নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হলে নারীদের জন্য আলাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শপিং কমপ্লেক্সে, যানবাহন, হাসপাতাল তৈরি করে দিতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানে শুধু নারীরাই কাজ করবে, ফলে অনেক নারীর নিরাপদ কর্মসংস্থান হবে। এই নিয়ম অনুসরণ না করে হাযার চেষ্টা করেও নারী নিপীড়ন বন্ধ করা যাবে না। অতএব, আমাদের পরামর্শ একটাই, ছেলে ও মেয়েদের সহশিক্ষা প্রথা বাতিল করে শিক্ষার প্রতিটি স্তরে ইসলামী শিক্ষা অপরিহার্য করুন। ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ ঘটান। দেশে ঈমানী পরিবেশ সৃষ্টি করুন। তাহলে অবশ্যই যাবতীয় অনাচার-ব্যভিচার থেকে দেশ রক্ষা হবে, ইনশাআল্লাহ।
আমরা নারীরা যদি অশালীন পোশাক পরা হতে বিরত থাকি, তবে অবশ্যই আমরা ইভটিজিং নামক নিকৃষ্ট ব্যাধির হাত হতে অনেকাংশে রক্ষা পাব। মোটকথা, পরিপূর্ণ পর্দা ব্যবস্থা ও পুরুষের সাথে সংমিশ্রণ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকাই নারীর জন্য নিরাপদ এবং ব্যভিচার থেকে বাঁচার একমাত্র পথ।৪ হ্যাঁ, নুসরাত হিজাব পরিধান করতো ঠিকই কিন্তু তার অধরে টকটকে লাল যে রঙ দেখা যেত তা কি খুব যরূরী ছিল? নিশ্চয়ই না।৫ বোরকা পরিহিতা অবস্থায়ও অধরযুগলে এমন উজ্জ্বল লিপস্টিকের ব্যবহার খুব সঙ্গত মনে হয়নি। কারণ, তরুণীদের অধরের উজ্জ্বল লিপস্টিকও সহপাঠী ছাড়াও উঠতি বয়সী তারুণ্যকে বিভ্রান্ত ও ভ্রষ্ট করে থাকে। কখনও কখনও শরী‘আভিত্তিক অতিরিক্ত উজ্জ্বল পোশাকও অঘটন ঘটাতে ভূমিকা রাখে। কাজেই নারীদের সবসময়ই শালীন ও মার্জিত পোশাকের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বিষয়টি বিজ্ঞজনেরা ভেবে দেখতে পারেন।
শিক্ষালয়কে সাধারণত শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ বিচরণভূমি হিসাবেই মনে করা হয়ে থাকে। একারণেই বাবা-মা সন্তানদের স্কুলের গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে বাড়ী ফিরে যান নিশ্চিন্তে। ভাবনাটা এমন- ওখানে তাদের সন্তান নিরাপদেই থাকবে। আবার ছুটির পর তাকে নিতে আসেন উদ্বিগ্ন বাবা-মা। অথচ কোন কোন ক্ষেত্রে ঐ শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। ফেনীর সোনাগাজী ইসলামীয়া সিনিয়র ফাযিল মাদরাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে মাদরাসার ছাদে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা সঙ্গত কারণেই অভিভাবকদেরকে আতঙ্কিত করে তুলেছে।
নুসরাতের বাবা-মা সন্তানকে মাদরাসায় পাঠিয়ে ভেবেছিলেন তাদের সন্তান সেখানে নিরাপদেই থাকবে। কিন্তু তারা কি ভেবেছিলেন যাদের ওপর ভরসা করে তারা নুসরাতকে শিক্ষার্জনের জন্য পাঠিয়েছিলেন, তারাই পশুসুলভ হিংস্রতা নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে? জীবন শুরুর পরপরই নিভিয়ে দেবে তার জীবন প্রদীপ? আসলে আমরা ভেবে পাচ্ছি না, ভরসার জায়গাটা কোথায়? কারণ-
রক্ষক যদি ভক্ষক হয়, কে করিবে রক্ষা,
ধার্মিক যদি চুরি করে, কে দিবে তারে শিক্ষা?
সুধী পাঠক! আমরা এও জানতে চাই, মাদরাসা কিংবা স্কুল-কলেজে শিক্ষক নিয়োগের সময় কেন শিক্ষকদের পূর্বাপর জীবন ইতিহাস খতিয়ে দেখা হয় না?
নুসরাত আপুর হত্যার পেছনে আরেকটা রহস্য থেকেই যায়। সেটা হল আপুর হত্যার পর এক পক্ষ মাদরাসা বন্ধের জন্য উঠে-পড়ে লেগে গেছে। আচ্ছা, এর আগেও তো অনেক নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিল, কই তখনতো মাদরাসা বন্ধের দাবি উঠেনি। তাহলে নুসরাত আপুর হত্যার পর কেন মাদরাসা বন্ধের দাবি উঠল?
যাহোক, নুসরাত আপুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে এখনও তোলপাড় চলছে গোটা দেশে। হয়তো চলবে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত। কিন্তু প্রশ্ন হল, নুসরাত জাহান রাফি আপুর হত্যার পেছনে এত লোক জড়িত কেন? কাদের স্বার্থে বলি হল আমার দ্বীনী আপু নুসরাত জাহান রাফি? এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া নিশ্চয়ই বড় দায় নয় কি?
[1]. ড. আব্দুল লতিফ মাসুম, নুসরাতের মৃত্যু এবং সমাজের দায়, উপসম্পাদকীয়, দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১৮ এপ্রিল ২০১৯।
[3]. নির্যাতিত নারীর জবানবন্দী, সম্পাদকীয়, দৈনিক ভোরের দর্পন, শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০১৯ ইং।
৪. শাইখ আব্দুল্লাহ শাহেদ আল মাদানী, তোমরা অশ্লীলতার কাছেও যেয়ো না (রাজশাহী : ওয়াহীদিয়া ইসলামিয়া লাইব্রেরী, প্রথম প্রকাশ-জানুয়ারী ২০১৫ ঈসায়ী), পৃঃ ৬১।
৫. শালীন পোশাকের গুরুত্ব, সম্পাদকীয়, দৈনিক সংগ্রাম, ৩০ এপ্রিল ২০১৯, মঙ্গলবার ।
