আমাদের জীবনব্যবস্থা ইসলাম নারীদের এক অনন্য মর্যাদা প্রদান করে। যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তিনিই প্রকৃতপক্ষে আমাদের জীবনধারার জন্য প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু এক শ্রেণির মানুষ ভ্রান্ত ধারণা ছড়ানোর জন্য নানা কথা বলে থাকে। ইসলামে নারীদের সম্পর্কে কিছু বিষয় রয়েছে, যা অনেকের কাছে বিভ্রান্তিকর বলে মনে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ একটা প্রশ্ন হচ্ছে, হিজাব কি নারী উন্নয়নের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে না? বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে আমরা হিজাব সম্পর্কেই বিস্তারিত আলোকপাত করব।
লক্ষ লক্ষ মানুষ একই প্রশ্ন তোলে— এই হিজাব বা পর্দার বিধান কি বড় কোনো বিধিনিষেধ নয়?
সেক্যুলার মতবাদ ধারণকারী দেশি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে হিজাবকে প্রায়ই নিপীড়ন বা সীমাবদ্ধতার প্রতীক হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়। তারা অনেক সময় মুসলিমবিশ্বকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের সুরে উপস্থাপন করে। তাদের দৃষ্টিতে নারীর পোশাকের স্বাধীনতা যেন খোলামেলা পোশাক পরিধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ!
এই তথাকথিত সেক্যুলার সমাজে, বিশেষ করে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে, এমন ঘটনাও দেখা যায়, যেখানে একটি দল মিলে কোনো নারীকে শুধু হিজাব পরার কারণে হেনস্তা করে। কখনো কখনো শ্রেণিকক্ষেও শিক্ষকেরা হিজাব পরার জন্য শিক্ষার্থীদের বিব্রত করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, শুধু বোরকা-হিজাব পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার কারণে তাকে ক্লাস টিচার থেকে শুরু করে সিনিয়রদের কাছ থেকেও নানা ধরনের হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে।
এছাড়া প্রায়ই শোনা যায়, স্কুলে পরীক্ষার সময় পরীক্ষার্থীদের নিকাব খুলতে বাধ্য করা হয়।
কিছুদিন আগে ভারতের গণমাধ্যমে একটি ভিডিও বেশ ভাইরাল হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, এক মন্ত্রী একজন হিজাবী নারীকে পুরস্কৃত করার সময় হাস্যোজ্জ্বল মুখে তার নিকাব টেনে নামিয়ে দেন, আর ঘটনাটি ঘটে গণমাধ্যমের সামনেই। এটাকেই কি নারীর স্বাধীনতা বলা যায়?
ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের নৈতিকতা বা মূলনীতি ভিন্ন হতে পারে, তবে সেই নৈতিকতা তার ব্যক্তিজীবনেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। আপনি কি কখনো দেখেছেন, কোনো আলেম রাস্তায় খোলামেলা পোশাক পরিহিত কোনো নারীকে এ কারণে তিরস্কার করছেন? সাধারণত এসব ক্ষেত্রে আলেমরা নিজেদের দৃষ্টি সংযত রাখেন এবং স্থান ত্যাগ করেন।
হ্যাঁ, এটা বলা যায় যে, আলেম-উলামা ওয়ায মাহফিলে বিভিন্ন আয়াত ও হাদীছের আলোকে যুক্তিপূর্ণভাবে হিজাবের গুরুত্ব মানুষের সামনে তুলে ধরেন। এভাবেই তারা সমাজ সংস্কারের কাজ করে থাকেন।
আর হিজাবের বিধান এমন একটি বিষয়, যা অনেক অমুসলিম নারীকে ইসলাম সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছে। বিষয়টি শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, বাস্তবে তা সত্য।
একটি ইসলামী গণমাধ্যম সম্প্রতি পাশ্চাত্যের কয়েকজন ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত নারীর কাছে জানতে চেয়েছিল যে, তাদের মুসলিম হওয়ার পেছনে কী প্রেরণা কাজ করেছে এবং হিজাব গ্রহণের কারণ কী? একই সঙ্গে প্রশ্ন রাখা হয়, হিজাব কি তাদের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে?
তাদের উত্তরগুলো ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ এবং হিজাব সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। নিচে তাদের অভিমতগুলো পর্যায়ক্রমে উপস্থাপন করা হলো—
(১) আলিয়া উম্মে রাইয়ান, একজন ধর্মান্তরিত মুসলিম নারী। তিনি বলেন, ইসলাম গ্রহণের পর তিনি প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছেন। তার মতে, স্বাধীনতার অর্থ হলো মানুষের আরোপিত শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়া। যখন একজন মানুষ সত্যিকার অর্থে স্রষ্টার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে এবং নিজের জীবনের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করে, তখন সে স্রষ্টার জন্যই বাঁচতে শেখে; অন্যের জন্য নয়। আর তার দৃষ্টিতে এটিই প্রকৃত স্বাধীনতা। তিনি আরও বলেন, তিনি এখন হিজাব পরেন এবং এতে কিছু বিধিনিষেধ অবশ্যই রয়েছে, যা তিনি তার পালনকর্তার সন্তুষ্টির জন্য পালন করেন। তবুও তিনি নিজেকে স্বাধীন মনে করেন; কারণ তার সিদ্ধান্ত, তার পছন্দ, কোথায় যাবেন, কী করবেন বা কী করবেন না— সবকিছুই তিনি তার স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য নির্ধারণ করেন। তিনি তার জীবনধারা অন্যদের অনুসরণে গড়ে তোলেন না, যারা ভিন্ন পথে চলছে। তিনি বলেন, আমি হিজাবী আর আমি মুক্ত।
(২) নাহেলা মোরালিস, একজন ধর্মান্তরিত মুসলিম নারী। তিনি বলেন, ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে তিনি প্রকৃত মুক্তির স্বাদ অনুভব করেছেন। তার ভাষায়, হিজাব পরার পর তিনি মনে করেছেন যে, এটি তাকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করেছে। কে তাকে দেখবে আর কে দেখবে না, সেই সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই নিতে পারেন এবং এখন তার নিজের ওপর সেই অধিকার রয়েছে। তিনি আরও বলেন, তিনি নিজেকে কোনো বিলবোর্ডের মতো ভাবেন না, যেখানে মদ বিক্রির জন্য একজন নারীকে অশালীনভাবে উপস্থাপন করা হয়। তার কাছে সেটাই প্রকৃত নিপীড়ন। আর হিজাব তাকে সেই ধরনের নিপীড়ন থেকে মুক্তি দিয়েছে।
(৩) আয়েশা রোযালি, একজন ধর্মান্তরিত মুসলিম নারী, যিনি পূর্বে একজন ব্রিটিশ অভিনেত্রী ছিলেন। তিনি বলেন, শুরুতে বিষয়টি তার জন্য সহজ ছিল না। কারণ একসময় তিনি এমন একজন ছিলেন, যিনি রাস্তায় বের হতে চাইতেন পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে, মানুষ যেন তাকে দেখে মুগ্ধ হয়, বারবার তার দিকে তাকায়। তবে একই সঙ্গে যখন কোনো অসৎ দৃষ্টির মানুষ তাকাত, তখন তা তাকে অস্বস্তি দিত এবং বিরক্ত করত। ইসলাম গ্রহণের পর তাকে সেই মানসিকতা পেছনে ফেলে আসতে হয়েছে, যা তার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। তিনি আরও বলেন, একসময় তার পরিচয়ই যেন নির্ভর করত মানুষ তার দিকে তাকাচ্ছে কি-না, তার ওপর। তাই প্রথমবার যখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় হিজাব পরে হাঁটছিলেন, তখন তার মনে হয়েছিল তার অস্তিত্ব যেন আড়ালে চলে গেছে, যেন তিনি সবার কাছে অদৃশ্য হয়ে গেছেন।
তিনি একসময় অভিনয় জগতে যেতে চেয়েছিলেন, বিশেষ ধরনের পোশাক পরতেন এবং আগে কখনো হিজাব বা নিজেকে আড়ালে রাখার কথা ভাবেননি তার জন্য এই পরিবর্তন ছিল বিরাট ব্যাপার। ইসলাম গ্রহণের পর তার জীবনধারা ও ব্যক্তিত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। তিনি বলেন, শুরুতে যে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার অনুভূতি তাকে কষ্ট দিত, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটিই তার কাছে প্রশান্তির হয়ে ওঠে। তিনি রাস্তায় হাঁটা উপভোগ করতে শুরু করেন, যেই হাঁটা শুধু নিজের জন্য এবং কাউকে কিছু দেখানোর জন্য নয়। মানুষের দৃষ্টি বা মন্তব্য নিয়ে ভাবনা না করেই তিনি প্রথমবারের মতো জীবনকে উপভোগ করতে পেরেছেন। তার ভাষায়, ‘হ্যাঁ, এই অনুভূতিটাই ইসলাম আমাকে দিয়েছে’।
(৪) আয়েশা মার্সিডিয (একজন ধর্মান্তরিত মুসলিম নারী), যিনি ইস্ট লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন ও বেড়ে উঠেন। তিনি একসময় নিজেকে নাস্তিক হিসেবে ভাবতেন। তিনি বলেন, যখন কেউ মুসলিম হওয়ার কথা ভাবেন, তখন প্রথমেই তার উচিত আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেওয়া। হিজাব একটি প্রক্রিয়ার অংশ, যার মাধ্যমে মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে কেন চুল ঢাকতে হয়, কেন শরীর আবৃত রাখতে হয় এবং কেন কিছু বিষয় থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, যারা ইসলাম গ্রহণের কথা ভাবছেন, কিন্তু দ্বিধায় আছেন, যেমন- আমি আল্লাহকে বিশ্বাস করি, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ মেনে চলতে চাই; কিন্তু হিজাব পরতে বা কিছু অভ্যাস ছাড়তে প্রস্তুত নই— তাদের জন্য এ অনুভূতিগুলো একেবারেই স্বাভাবিক। ইসলাম গ্রহণের শুরুর দিকে এমন দ্বিধা থাকতেই পারে, তবে স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হলে পরিবর্তনও আসতে শুরু করে।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, এমন অনেক বিষয় ছিল, যা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি— পর্দা করা বা পার্টি-সংস্কৃতি থেকে দূরে থাকা তার মধ্যে অন্যতম। কিন্তু যতই তিনি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করেছেন এবং ইসলামকে জানতে শুরু করেছেন, ততই স্বাভাবিকভাবে তার মনে হয়েছে যে, তিনি তার রবকে সন্তুষ্ট করতে চান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাই তার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এবং তার রহমত, ভালোবাসা ও সত্তাকে অনুভব করা জরুরী। মানুষকে সময় নিয়ে বুঝতে হবে যে, সে কার ইবাদত করছে এবং কেন করছে। ধীরে ধীরে এই উপলব্ধি মানুষকে সঠিক পথে এগিয়ে নেয়।
এ প্রসঙ্গে কেউ প্রশ্ন করতে পারে, একজন নাস্তিকও কি হিজাবের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে পারে? তিনি বলেন, হ্যাঁ, সেটি সম্ভব। কারণ শালীনতা ও নিজেকে আড়াল করে রাখা অনেক ক্ষেত্রে মানবিক স্বভাবের অংশ। অনেকে ধর্মীয় বিশ্বাস ছাড়াও ব্যক্তিগত বা সামাজিক কারণে হিজাব পালন করতে পারেন। তিনি আরও বলেন, স্বভাবগতভাবে একজন নারী এমন একজন পুরুষকে খোঁজেন, যার সঙ্গে তিনি নিরাপত্তা, প্রশান্তি ও সুখ অনুভব করেন। একইভাবে একজন পুরুষও তার স্ত্রীর প্রতি বিশ্বাস রাখতে চান এবং একটি আত্মিক প্রশান্তির বন্ধন গড়ে তুলতে আগ্রহী হন। পারিবারিক সুখ-শান্তি বজায় রাখতে এই পারস্পরিক বিশ্বাস ও বন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একারণেই পারিবারিক পরামর্শদাতারাও একটি সুস্থ দাম্পত্য জীবনের জন্য পরস্পরের প্রতি আনুগত্য, আস্থা ও সম্মানকে অত্যাবশ্যক বলে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। একটি সুস্থ বিবাহের জন্য পরস্পরের প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বাস থাকা প্রয়োজন।
আর এক্ষেত্রেই ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য পর্দার বিধান এর মাধ্যমে সমাধান নিয়ে এসেছে। সূরা আন-নূরে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ ‘মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে, এটাই তাদের জন্য উত্তম। তারা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত’ (আন-নূর, ২৪/৩০)। আর তার পরের আয়াতে বলেন,وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاءِ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِنْ زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ‘আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, যেন তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে। আর যা সাধারণত প্রকাশ পায়, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য তারা প্রকাশ করবে না। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে। আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, নিজেদের ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীগণ, তাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে, অধীনস্থ যৌনকামনামুক্ত পুরুষ অথবা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া কারো কাছে নিজদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। আর তারা যেন নিজদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদচারণা না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার’ (আন-নূর, ২৪/৩১)।
লক্ষ করুন! পর্দার নির্দেশ আগে পুরুষদের দেওয়া হয়েছে আর বলা হয়েছে তাদের দৃষ্টি নত রাখতে। আর পুরুষদের দৃষ্টি নত রাখাই তাদের হিজাব।
এখন আমরা আলোচনা করব— ইসলামপ্রদত্ত এই সুরক্ষামূলক বিধানব্যবস্থা যদি কোনো পরিবার বা সমাজ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে তার সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে?
এমন পরিস্থিতিতে পারস্পরিক বিশ্বাস ও আনুগত্য ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। স্বভাবগতভাবেই অধিকাংশ নারীর মধ্যে নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা এবং প্রশংসা পাওয়ার একটি প্রবণতা থাকে।
যখন এই সহজাত প্রবণতাসম্পন্ন কোনো নারী হিজাব ছাড়া বাইরে বের হন, তখন তার সামনে সাধারণত দু’টি পথ উন্মুক্ত থাকে—
(ক) তিনি নিজেকে মার্জিত ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করবেন তথা পোশাক, আনুষঙ্গিক উপকরণ, চুলের সাজ এবং দৈহিক সৌন্দর্যের মাধ্যমে। অথবা (খ) তিনি উদাসীন ও অনাকর্ষণীয়ভাবে নিজেকে উপস্থাপন করবেন।
এ দুই অবস্থার মাঝামাঝি কোনো অবস্থান বাস্তবে খুব একটা দেখা যায় না। স্বভাবগত কারণেই মানুষ নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে এবং প্রশংসা পেতে আগ্রহী থাকে। ফলে বাইরে বের হওয়ার সময় স্বাভাবিকভাবেই অনেকেই চেষ্টা করেন নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলতে।
এখানে একটি প্রশ্ন সামনে আসে, রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া কত শতাংশ পুরুষ এমনভাবে চিন্তা করেন যে, আমার সামনে দিয়ে যাওয়া এই নারী অন্য কারও স্ত্রী বা পরিবারের সদস্য হতে পারেন, তাই তার দিকে দৃষ্টি সংযত রাখা উচিত? এর উত্তর জানতে চাইলে কেউ নিজেই সামাজিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ধারণা নিতে পারেন।
এ ধরনের একটি সামাজিক সমীক্ষা কিছুদিন আগে পরিচালিত হয়েছিল। নিউইয়র্ক শহরে এক নারী প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে খোলামেলা পোশাক পরে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান। এ সময় তাকে মোট ১০৮ বার মৌখিক হয়রানির শিকার হতে হয় অর্থাৎ বারবার অশোভন মন্তব্যের সম্মুখীন হতে হয়। এ সময় লক্ষ করা যায়, অনেক পুরুষই অসৎ উদ্দেশ্যে তার দিকে তাকাচ্ছিল। তবে এখানে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। পরবর্তীতে একই নারী নিজের সাজসজ্জা পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ হিজাব পরিধান করে একই স্থানে দাঁড়িয়ে পরীক্ষাটি পুনরায় পরিচালনা করেন। তখন ফলাফল ভিন্ন ছিল। আগের মতো কেউ তার দিকে খারাপ দৃষ্টিতে তাকায়নি, এমনকি কোনো অশোভন মন্তব্যও করা হয়নি।
এ প্রসঙ্গে বলা যায়, স্বামী-স্ত্রী উভয়েই বিষয়টি অনুধাবন করুন বা না-ই করুন, লাগামহীন উন্মুক্ততা ও পর্দাহীনতা ধীরে ধীরে পারস্পরিক বিশ্বাসে প্রভাব ফেলতে পারে। এতে ঈর্ষা ও অবিশ্বাসের মতো অনুভূতি জন্ম নিতে পারে।
স্বভাবগতভাবেই কোনো পুরুষ তার স্ত্রীর প্রতি অসৎ দৃষ্টিভঙ্গি সহ্য করতে চান না, এতে তার মধ্যে ঈর্ষা ও রক্ষাকর্তার প্রবণতা জাগ্রত হয়। একইভাবে একজন নারীও চান, তার স্বামী যেন কেবল তার প্রতিই আগ্রহী থাকেন এবং অন্য কারও প্রতি দৃষ্টি না দেন। এই পারস্পরিক অনুভূতিই দাম্পত্য সম্পর্কে শান্তি ও সম্প্রীতি গড়ে তোলে, বিশেষত যখন উভয়েই শালীনতা ও পর্দার বিধান মেনে চলেন।
এবার যদি আমরা বিপরীত একটি পরিস্থিতি কল্পনা করি, যেখানে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই নিজেদের শালীনতা ও পর্দা সম্পর্কে সচেতন, তাহলে দৃশ্যপট ভিন্ন হয়। সেখানে স্বামীর মনে স্ত্রীর প্রতি অযথা সন্দেহ বা উদ্বেগ থাকে না। অন্য কেউ কী দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, সে চিন্তাও তাকে তাড়িত করে না। ফলে তিনি অধিক মানসিক প্রশান্তি ও স্বস্তিবোধ করেন।
একইভাবে যখন একজন পুরুষ তার দৃষ্টি সংযত রাখেন, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই কেবল তার স্ত্রীর প্রতিই আগ্রহী থাকেন। এর ফলে স্ত্রীর মনেও স্বামীকে নিয়ে কোনো অযথা সন্দেহ বা উদ্বেগ জন্ম নেয় না। তিনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে, তার স্বামী বাইরে গেলেও অন্য কোনো নারীর প্রতি দৃষ্টি দেবেন না বা তুলনা করবেন না। ফলে দাম্পত্য জীবনে অস্বস্তি নয়, বরং মানসিক প্রশান্তি ও স্থিতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
পর্দার এই অনুশীলন দাম্পত্য সম্পর্কে এক ধরনের নিরাপত্তা ও স্বস্তি এনে দেয়, যা উভয়কেই আরও সুখী করে তোলে।
একজন মুসলিম নারী হিসেবে হিজাব সম্পর্কে আমার অভিমত হলো হিজাব একটি মর্যাদাপূর্ণ বিধান, যা একজন নারীকে সমাজে অবমূল্যায়িত হওয়া থেকে রক্ষা করে। এটি তার সম্মান বৃদ্ধি করে এবং তাকে আরও মূল্যবান করে তোলে। তার সম্মতি ছাড়া কেউ তার ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশ করতে পারে না, এটি তার আত্মমর্যাদার প্রতীক।
আগে উল্লেখিত সামাজিক পর্যবেক্ষণের কথাটি আবার স্মরণ করা যেতে পারে। যখন ওই নারী খোলামেলা পোশাকে রাস্তায় চলাফেরা করছিলেন, তখন তিনি অসংখ্য কুদৃষ্টি ও অশোভন মন্তব্যের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু হিজাব পরিধান করে বাইরে গেলে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে যায়।
এর মাধ্যমে তিনি যেন একটি সুস্পষ্ট বার্তা দেন— তিনি কেবল বাহ্যিক আকর্ষণের বস্তু নন; বরং তার চিন্তাধারা, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্বই তাকে প্রকৃত অর্থে মর্যাদাবান করে তোলে। একই সঙ্গে তিনি নিজের ব্যক্তিগত সীমানা নির্ধারণ করতে পারেন যে, কে তার নিকটবর্তী হতে পারবে আর কে পারবে না।
হিজাব পরিধানের ফলে যারা কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয় বা যাদের দৃষ্টিভঙ্গি অগভীর, তারা স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কারণ তখন আর বাহ্যিক প্রদর্শন নয়, বরং ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধই হয়ে ওঠে মুখ্য।
হিজাব পরিধানের ক্ষেত্রে যারা কেবল বাহ্যিক দিকেই মনোযোগ দেয় এবং যাদের নৈতিক মানদণ্ড নিম্ন, তারা স্বাভাবিকভাবেই এতে আগ্রহী হয় না। কারণ এ পর্যায়ে এসে হিজাব আর তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যম থাকে না।
এই অবস্থায় হিজাবের অর্থ দাঁড়ায় শুধু তাদের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখা, যারা আপনার প্রকৃত সত্তাকে মূল্য দেয় এবং যারা আপনার চেহারার দিকে নয়; বরং আপনার আত্মিক গুণাবলির দিকে মনোনিবেশ করে এবং যাদের নৈতিক মানদণ্ড উন্নত।
ভুলে যাবেন না! নারী সমাজ হিসেবে আপনি অন্যদের দ্বারা সুন্দর বা অসুন্দর হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঊর্ধ্বে। তাই অন্যের ইচ্ছা বা প্রত্যাশার ভিত্তিতে জীবনযাপন বা পোশাক নির্বাচন করার প্রয়োজন নেই। আপনার পোশাক নির্বাচন হওয়া উচিত স্রষ্টার নির্দেশনা অনুযায়ী। এটাই আপনার জন্য কল্যাণকর।
যিনি শূন্য থেকে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন এবং আপনার পদতলে মাটি সুদৃঢ় করেছেন, তিনি-ই আপনাকে সর্বাধিক ভালোবাসেন। কিছু মানুষ হয়তো আপনার বাহ্যিক সৌন্দর্যের কারণে আপনাকে ভালোবাসতে পারে, কিন্তু মহান আল্লাহ আপনাকে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা থেকেই। তিনি আপনাকে এমন এক অনন্য সৌন্দর্য দিয়েছেন, যা অন্য কারও সঙ্গে তুলনীয় নয়।
আগে দুই ধরনের হিজাবের কথা বলা হয়েছে তথা নারীর হিজাব এবং পুরুষের হিজাব। পাশাপাশি নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার ক্ষেত্রেও কিছু সীমারেখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন- বিপরীত লিঙ্গের এমন কারও সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় হাসি-ঠাট্টা বা অন্তরঙ্গ আলাপচারিতা, যিনি আপনার পরিবারের সদস্য নন, তা থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
বাস্তবে প্রায়ই দেখা যায়, যখন নারী-পুরুষ উভয়ই এই শরীআতসম্মত বিধানগুলো উপেক্ষা করে, তখন পারস্পরিক আকর্ষণ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে ওঠে চুম্বকের দুই মেরুর মতো। এর ফলেই সামাজিক জীবনে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। বৈধ সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ কমে গিয়ে তা অবৈধ সম্পর্কে রূপ নিতে শুরু করে। দাম্পত্য কলহ, নৈতিক অবক্ষয় এবং শেষ পর্যন্ত তা বিভিন্ন অপরাধের দিকে গড়ায়।
এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়েরই দায়িত্ব রয়েছে। যখন উভয় পক্ষই নিজেদের ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়, তখন দায়ও উভয়ের ওপর বর্তায়।
সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (রাযিয়াল্লাহু আনহুDরাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর একটি গবেষণা অনুযায়ী, ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫ লাখ গর্ভপাত সংঘটিত হয়েছে আর এই গর্ভপাতকৃত শিশুদের ৮৬% অবৈধ ছিল। আবার একই সংস্থার অন্য এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে সেখানে প্রায় ১৪ লাখ শিশু বিবাহবহির্ভূতভাবে জন্মগ্রহণ করেছে।
এই বাস্তবতায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাকেই একা সন্তানের দায়িত্ব বহন করতে হয়। সন্তানের পিতার সহযোগিতা ও সমর্থন ছাড়া বছরের পর বছর তিনি সন্তান লালনপালন করেন। এমন পরিস্থিতিতে একজন মায়ের মানসিক অবস্থার কথা ভাবুন এবং সেই সন্তানের জীবনসংগ্রাম কত কঠিন হতে পারে, যে পিতৃহীন পরিবেশে বড় হচ্ছে।
এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি প্রতিরোধে কুরআনে কারীমে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে— বিশেষত সূরা নূরের দু’টি আয়াতে, যা পর্দার বিধান আলোচনা করতে গিয়ে পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিষয়টি এখন আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
পরিশেষে বলা যায়, হিজাব বা পর্দার বিধান কেবল একটি ধর্মীয় অনুশাসন নয়; বরং এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে শালীনতা, মর্যাদা এবং পারস্পরিক বিশ্বাস রক্ষার একটি সুষম ব্যবস্থা। এটি মানুষকে আত্মসম্মানবোধে দৃঢ় করে, সম্পর্ককে সুস্থ ও স্থিতিশীল রাখে এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই এই বিধানের অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা উপলব্ধি করে তা সচেতনভাবে অনুসরণ করাই হতে পারে একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনের পথ। মহান আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন- আমীন!
মিরপুর, ঢাকা।
