কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ঈমান, জীবন ও সৌভাগ্য

ভূমিকা :

মানুষের জীবনে ঈমান বা বিশ্বাসের ব্যাপারটা গুরুত্বহীন নয়। আমরা তাকে সামান্য বা নগণ্য মনে করতে পারি না, পারি না তার প্রতি কিছুমাত্র উপেক্ষা বা অবজ্ঞা প্রদর্শন করতে অথবা বিস্মৃতির অতল সাগরে তা ডুবিয়ে দিতে। তার কারণ ঈমানের সম্পর্ক মানুষের সত্তা ও তার জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে স্থাপিত। সত্যি বলতে, ঈমান হচ্ছে মানব জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। মানুষের পরিণতি বা পরিণাম ঈমানের ভিত্তিতেই নির্ধারিত। চিরন্তন সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যের দৃষ্টিতেই ঈমানের নবতর মূল্যায়ন। এই ঈমানই মানুষকে দিতে পারে চিরকালীন জান্নাত বা জাহান্নাম। এ কারণে প্রত্যেকটি বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষেরই কর্তব্য ব্যাপারটি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। ঈমানের নিগূঢ় তত্ত্ব ও সামগ্রিক প্রভাবকে সক্রিয় মনে স্মরণ করা।

ঈমান (الإيمان)-এর পরিচয় :

ঈমান (الإيمان) শব্দটি বাবেإفعال -এর মাছদার। অভিধানিক অর্থ-اَلتَّصْدِيْقُ ‘আন্তরিক বিশ্বাস’,اَلْإِقْرَارُ وَالطَّمَأْنِيْنَةُ ‘স্বীকৃতি ও প্রশান্তি’। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রহ.) শেষোক্ত অর্থটাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কেননা, হৃদয়ে যখন আন্তরিক বিশ্বাস ও বশ্যতা স্থান পায়, তখনই কেবল স্বীকৃতি ও প্রশান্তি অর্জিত হয়।[1] শরী‘আতের পরিভাষায়, تَصْدِيْقٌ بِالْجِنَانِ، وَقَوْلٌ بِاللِّسَانِ، وَعَمَلٌ بِالْجَوَارِحِ وَالْأَرَكَانِ، يَزِيْدُ بِالطَّاعَةِ، وَيَنْقُصُ بِالْمَعْصِيَةِ ‘অন্তরে বিশ্বাস, মুখে স্বীকৃতি, আমলে বাস্তবায়নের নাম ঈমান, যা পুণ্য দ্বারা বৃদ্ধি পায় এবং পাপ দ্বারা হ্রাস পায়’।[2]

আকাঈদ বিশারদগণের মতে, ঈমান হল আন্তরিক বিশ্বাস আর মৌখিক স্বীকৃতি, পার্থিব জীবনে শরী‘আতের বিধি-বিধান চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়ন করার শর্ত। আল-কুরআনের আয়াতও তাই নির্দেশ করে। এরশাদ হয়েছে,أُوْلَئِكَ كَتَبَ فِيْ قُلُوْبِهِمُ الْإِيْمَانَ অর্থাৎ, ‘তারা তো ওরাই, যাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিপিবদ্ধ করে দিয়েছেন’ (মুযাদালাহ ৫৮/২২)। অন্যত্র এরশাদ হয়েছে, وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيْمَانِ অর্থাৎ ‘তার অন্তর ঈমান দ্বারা প্রশান্ত’ (নাহ্ল ১৬/১০৬)। আরো এরশাদ হয়েছে, وَلَمَّا يَدْخُلِ الْإِيْمَانُ فِيْ قُلُوْبِكُمْ অর্থাৎ, ‘এখনও তোমাদের অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি’ (হুজুরাত ৪৯/১৪)। উক্ত তিনটি আয়াতে কারীমায় ক্বলব অর্থাৎ অন্তরকে ঈমানের কেন্দ্রস্থল হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সুতরাং প্রকৃত ঈমানদার ঐ ব্যক্তি, যে আল্লাহর পক্ষ থেকে ঈমান সংক্রান্ত বিষয়াবলি যেমন- তাওহীদ, রিসালাত, ফেরেশতা, কিতাব, পরকাল, তাক্বদীর ইত্যাদি সম্পর্কে অন্তর থেকে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর এবং রাসূলের উপর অবতীর্ণ কিতাব ও পূর্বে নাযিলকৃত কিতাবের উপর ঈমান আনো। যে কেউ আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাবসমূহের উপর, রাসূলগণ এবং পরকালকে অস্বীকার করে, সে ভ্রষ্টতার অতলে হারিয়ে যাবে’ (নিসা ৪/১৩৬)

মানুষের জীবনে ঈমান :

দ্বীন ও ঈমানহীন ব্যক্তি বাতাসের মুখে শুষ্ক পাতার মত মূল্যহীন, গুরুত্বহীন ও বঞ্চিত বস্ত্ত। যে কোন অবস্থায়ই তা স্থিতি লাভ করতে অক্ষম। তার জীবনের গতি দিকভ্রষ্ট, পক্ষ ভ্রষ্ট হয়ে পড়তে বাধ্য। দ্বীন ও ঈমানহীন ব্যক্তির কোন মূল্যই থাকতে পারে না। এ ধরনের ব্যক্তি নিজের সত্তা ও পরিচয় থেকে চিরকালই বঞ্চিত থেকে যায়। সে জানতে পারে না যে, সে কোত্থেকে এসেছে? কে তাকে পরিয়ে দিল জীবনের পোশাক? কেনইবা তাকে এখানে আনা হল? এখান থেকে কিছুকাল পর তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে? কেনইবা নিয়ে যাওয়া হবে? এগুলো সবই তার কাছে অজানা রয়ে যায়। একজন মানুষ তখনই তার এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাবে, যখন সে দ্বীনের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হবে এবং একজন চিন্তাশীল ও কঠোর ঈমানদার হবে।

ইতিহাস ও মানবীয় প্রচেষ্টা, অনুসন্ধান এবং তৎপরতা একথা অকাট্যভাবে প্রমাণ করেছে যে, মানুষের জন্য দ্বীন অপরিহার্য। দ্বীন ছাড়া একজন মানুষ পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না। দ্বীন ছাড়া মানুষের কোন উপায় নেই। তা যেমন প্রয়োজন ব্যক্তি জীবনে, তেমনি প্রয়োজন সমাজ ও সমষ্টির জন্য। একজন ব্যক্তি এই দ্বীন গ্রহণ করেই অন্তরের স্থিতি, ধৈর্য ও চরম সৌভাগ্য অর্জন করতে পারে। পারে তার নিজ মন-মগজ, চরিত্র ও জীবনকে পরিশুদ্ধ ও পরিচছন্ন করে একজন প্রকৃত ঈমানদার হতে।

আল্লাহর অস্তিত্ব সত্য। তিনি তাঁর একক সার্বভৌমত্ব, আধিপত্য, কর্তৃত্ব, ব্যবস্থাপনা-পরিচালনা শক্তির অধীন করে রেখেছেন সমগ্র বিশ্বলোক। অতএব সমস্ত সৃষ্টিকুলের নিকট ইবাদত, দাসত্ব ও আনুগত্য পাওয়ার নিরঙ্কুশ অধিকার কেবল তাঁরই। দুনিয়ার মানব সমাজের প্রতি নবী-রাসূল পাঠাবার নিয়ম তিনিই কার্যকর করেছেন এবং পাঠিয়েছেন। মানুষের পরকালীন জীবন সম্পর্কে নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে তিনি খবর পাঠিয়েছেন তা সবই সত্য। এসব কথার সত্যতা ও যথার্থতার অকাট্য দলীল হিসাবে তিনি নবী-রাসূলগণের সাথে কিতাবও নাযিল করেছেন। এ সবের সত্যতার ঈমান আনা কর্তব্য শুধু এজন্য যে, তা-ই সত্য। আর এই সত্য দ্বারাই মানুষের জীবন ও সমাজের ভেতর-বাহির, দেহ ও আত্মার, ব্যক্তি ও সমাজের ইহকালীন ও পরকালীন সঠিক কল্যাণ সাধিত হওয়া সম্ভব।

মানুষের মনে ও জীবনে ঈমানের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আমরা যখন কথা বলি, তখন আমরা প্রকৃত ও সুদৃঢ় প্রত্যয়ের কথাই মনে করি। মনে করি, এ ধরনের ঈমানেই সমগ্র হৃদয় দেশকে সমুদ্ভাসিত করে তুলতে পারে। দুর্বল ও টলমান ঈমান কখনোই আমাদের লক্ষ্য নয়। কেননা তা থাকলেও নিদ্রিত, সমাহিত, প্রাণ শক্তিহীন। অথচ আমাদের প্রয়োজন জীবন্ত ঈমানের। যদিও এ ধরনের ঈমান ও ঈমানদার লোক খুব বেশী পাওয়া যায় না। ঈমানের যথার্থ মূল্যায়নে সন্দেহপরায়ণ বস্ত্তবাদীদের সাথে আমরা যে বিতর্কে লিপ্ত হই, তা শুধু এ জন্য যে, তারা যেন জানতে-বুঝতে পারে, যে ঈমানের বিরোধিতা তারা করছে, তা যখন হৃদয়ের গভীর কন্দরে পৌছতে পারবে, হৃদয়-মনের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে, তখন তা ব্যক্তি ও সমষ্টিসহ সমগ্র জীবনকে আলোক-উদ্ভাসিত করে দিতে পারবে। আর এটা হল সাধারণ ঈমান।

কেননা প্রকৃত ইসলামী ঈমান আরো অনেক বৈশিষ্টের অধিকারী। মানব জীবনে তার ফলও অনেক ব্যাপক, গভীর ও কল্যাণকর। ইসলামী আক্বীদাহ, বিশ্বাস, বস্ত্ত ও প্রাণ-শক্তি উভয়কেই পরিব্যাপ্ত করে আছে। আর তা হল তাওহীদের আক্বীদাহ। এই আক্বীদাই সত্য, শক্তিশালী, দ্বীন ও বিজ্ঞানের মানদণ্ড- উত্তীর্ণ। এই আক্বীদাহ তাগূতী শক্তির নিকট বিনয় গ্রহণকে কুফর, ফিস্ক ও যুলুম মনে করে। পরস্পর পরস্পরকে অদ্বিতীয় বানিয়ে নিতে সুস্পষ্ট ভাষায় অস্বীকার করে। এই হচ্ছে প্রকৃত ঈমান। আর একজন মুসলিমের জন্য এই ঈমানই কাম্য। মহান আল্লাহ বলেন, ‘প্রকৃত মুমিন সে সকল লোক, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে, অতঃপর একবিন্দু সন্দেহকে তারা প্রশ্রয় দেয়নি, আর নিজেদের সত্তা ও ধন-সম্পদ দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে। তারাই সত্যিকারের ঈমানদার’। (হুজুরাত ৪৯/১৫)

ঈমানের এই অনুভূতির উপলব্ধি অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে তখনই, যখন ইচ্ছা-শক্তি ব্যক্তির অনুগত হবে। যার প্রতি ঈমান আনা হয়েছে, তাঁর প্রতি হবে চিন্তা অবনত, তাঁর সব আদেশ-নিষেধ মেনে নিবে ঐকামিত্মক সমেত্মাষ, সদিচ্ছা ও আত্মসমর্পণের ভাবধারা সহকারে। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের শপথ! এই লোকেরা কখনোই ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা তোমাকে তাদের পারস্পরিক ব্যাপারে চূড়ান্ত ফায়ছালাকারীরূপে মেনে নিবে। অতঃপর তোমার দেয়া ফায়ছালা ও সিদ্ধান্তে তারা কোনরূপ দ্বিধা বা সঙ্কোচবোধ করবে না। আর তোমার দেওয়া ফায়ছালাকেই তারা অকুণ্ঠ মনে মেনে নিবে’ (নিসা ৪/৬৫)

ঈমানের এই উপলব্ধি ও অনুভূতি ক্রমশ মানসিক উচ্চতা ও তেজস্বিতা লাভ করবে এবং বাস্তব জীবনে ব্যক্তিকে সে ঈমানের দাবী অনুযায়ী কর্মে অনুপ্রাণিত করবে। এরূপ ঈমানই প্রতিফলিত হবে চরিত্রে, দৈনন্দিন আচার-আচরণে। এই ঈমানই তাকে আল্লাহর পথে জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্ত্তত করবে। সে জিহাদ হবে ধন-মাল আল্লাহর পথে ব্যয় করার মাধ্যমে। সে জিহাদ হবে নিজেকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করার কঠোর কাঠিন্যকে সহ্য করে। কুরআনে এরূপ ঈমানের পরিচয় দান পর্যায়ে ঘোষণা রয়েছে, ‘নিশ্চিতরূপে মুমিন কেবলমাত্র সেসব লোক, আল্লাহর (কথা) উল্লেখ হলেই যাদের অন্তর কেঁপে উঠে। আর তাদের সামনে কুরআনের বাণীর আলোচনা হলেই তাদের ঈমান বৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি লাভ করে এবং তারা সব সময়ই তাদের আল্লাহর উপর পূর্ণ নির্ভরতা রাখে। এরা সেসব লোক যারা রীতিমত ছালাত ক্বায়েম করে এবং আল্লাহর দেয়া রিযিক্ব থেকে তারা ব্যয় করে। এরাই সত্যিকারের মুমিন’ (আনফাল ৮/২-৪)

কুরআন ব্যক্তির ঈমানকে সবসময় জীবন্ত চরিত্র ও সুষ্ঠু কাজ-কর্মের প্রতীকরূপে উল্লেখ করে। কেননা এর সাহায্যেই একজন প্রকৃত ঈমানদার লোক কাফের ও মুনাফিক্ব থেকে সতন্ত্র সত্তা ও মর্যাদার অধিকারী প্রমাণিত হয়। নিমেণাক্ত আয়াতে এই বিষয়টি বিধৃত হয়েছে, ‘অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, যারা বিনয়-নম্র নিজেদের ছালাতে। যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ হতে বিরত থাকে। যারা যাকাত দানে সক্রিয়। যারা নিজেদের যৌন অঙ্গকে সংযত রাখে’ (মুমিনূন ২৩/১-৫)। ব্যক্তি জীবনে প্রকৃত ঈমানদার ধন-মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদে লিপ্ত থাকবে। আল্লাহর দ্বীনকে সু-প্রতিষ্ঠিত করতে তারা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে।

এককথায়, ঈমানীয় বিষয়গুলির প্রতি আন্তরিক অকুণ্ঠ বিশ্বাস থেকে শুরু করে দ্বীনের জন্য জিহাদ করা পর্যন্ত সবকিছুই এই ঈমানের মধ্যে শামিল। ঈমানের অপরিহার্য ও অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল এগুলি। এর কোন একটা বাদ পড়লে ঈমান পূর্ণাঙ্গ হবে না। ঈমান তার বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা নিয়ে বহাল থাকবে না। কুরআন মাজীদের ঘোষণাবলি থেকেই ব্যক্তি জীবন ও সমষ্টিতে ঈমানের এই তাৎপর্য প্রতিভাত। এসব উপাদান ও উপকরণ নিয়েই গড়ে ওঠে প্রকৃত ঈমান। এরূপ হলেই বলা যায় সত্যিকার ঈমান, যথার্থ ঈমান। এর কোন একটা বাদ পড়লে তাকে ঈমান নামে অভিহিত করা যাবে না। তখন যা থাকবে সেটাকে একটা ‘মতবাদ’ বা অভিমত বলা যেতে পারে। কেননা প্রকৃত ঈমান তো সেটাই, যার দিগন্ত উজ্জ্বলকারী সূর্য মন ও জীবনের সমগ্র দিক ও আনাচে-কানাচে উজ্জ্বল-উদ্ভাসিত করে তুলবে।

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

 

[1]. দ্রষ্টব্য: আছ-ছরেমুল মাসলূল, পৃঃ ৫১৯।

[2]. আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল হামীদ আল-আছারী, আল-ওয়াজীয ফী আক্বীদাতিস-সালাফিছ-ছলেহ, পৃঃ ১০৩।

Magazine